অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৪
রিদিতা চৌধুরী
“ডাঃ চৌধুরী, লং টাইম নো সি!”
পেছন থেকে ভেসে আসা সেই পরিচিত অপ্রত্যাশিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই সৌহার্দ্যের পায়ের গতি থমকে গেল। সে ধীরস্থিরভাবে ঘুরে তাকাল। ঠিক তার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন, যাকে এই মুহূর্তে সে কোনোভাবেই আশা করেনি। সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন লোকটার অস্তিত্বকেই সে অস্বীকার করতে চাইছে।
বিরক্তির এক চরম শিখরে দাঁড়িয়ে সৌহার্দ্য শীতল কণ্ঠে বলল, “ইয়েস, মিঃ শিকদার, লং টাইম নো সি! বাট আই ডোন্ট হ্যাভ টাইম টু টক টু ইউ রাইট নাউ। আই হ্যাভ টু গো।(হ্যাঁ, মিঃ শিকদার, অনেক দিন পর দেখা হলো! তবে এখন আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই আমার। আমাকে যেতে হবে।)
শাহাবীর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “অ্যাটিটিউড সেম, নট ব্যাড! তা এত তাড়া কিসের ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরীর?”
সৌহার্দ্য দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, “আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে বাইরের কারো সাথে কথা বলতে আমি ইচ্ছুক না।” আর এক মুহূর্তের জন্যও সে দাঁড়াল না; গাড়িতে উঠে হাওয়ার বেগে ছুটে চলে গেল। যেন সামনে দাড়িয়ে থাকা মানুষটা তার কাছে একদম গুরুত্বহীন!
সৌহার্দ্যের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে শাহাবীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরল। চমকে ঘুরে তাকিয়েই সে দেখল সুজনকে। শাহাবীর আলতো হাতে বন্ধুকে জড়িয়ে নিল। সুজনের চোখেমুখে এক বুক অভিমান, সে অভিযোগের সুরে বলল, “হঠাৎ করে কেন এমন খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দিলি? দেশে আসবি, জানালি না কেন?”
শাহাবীর আরও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান হাসল, “আরো পরে আসার কথা ছিলো, কিন্তু মম অসুস্থ ছিলো এইজন্য আসা! এই ত্যাড়াটা এখনো ঠিক হয়নি না? বেয়াদবটা যেভাবে অ্যাটিটিউড দেখিয়ে চলে গেল!”
সুজন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তাতে কি তোর কোনো হাত নেই বলছিস? তুই ওকে…”
শাহাবীর একটু গম্ভীর হয়ে সুজনকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “সে সব বাদ দে। তবে অযোগ্য কারো হাতে আমি আকরাম খানের শেষ চিহ্ন তুলে দিতে চাই না, ব্যাস! রিদির পরীক্ষা শেষ হলে, আমি ওকে আমেরিকা নিয়ে যাবো!”
সুজন একটু হতাশ হলো। এদের দুজনকে বুঝিয়ে লাভ নেই, কেউ কাউকে বুঝতে চায় না। এরা দুটো আন্তর্জাতিক লেভেলের ত্যাড়া, ত্যাড়া পুরস্কার দিলে মনে হয় একজনকে দেওয়া সম্ভব হবে না!
সে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, আমি যাই। পরে দেখা হবে, আমার একটা ওটি আছে! বিকেলে টাইম পেলে তোর অফিসে আসবো!” বলেই সে চলে গেল।
সুজন চলে যেতে ,ঠিক সেই মুহূর্তে শাহাবীর কাওকে ফোন করল। কিছুক্ষণ পরই লোকটা দ্রুত পায়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে নত হয়ে বলল, “স্যার, রেডি! পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আর রেপ কেসটার ফাইল—দুটোই এখানে আছে।”
শাহাবীর গম্ভীর মুখে ফাইলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার চোখেমুখে গভীর মনোযোগ, যেন প্রতিটি শব্দের ভেতরে সে কোনো গোপন সত্য খুঁজছে।
লোকটা ভয়ে ভয়ে নিচু স্বরে বলল, “স্যার, মেয়েটাকে কিন্তু রেপ করা হয়নি। আর ওটা আত্মহত্যাও না। মৃত্যুর আগে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, তারপর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নাটক সাজানো হয়েছে!”
শাহাবীর লোকটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। মুহূর্তের অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে সে শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে, তুমি এখন আসতে পারো।”
লোকটি নড়ল না, বরং শাহাবীরের তীব্র দৃষ্টির সামনে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “স্যার… একটা ভুল হয়ে গেছে। আমার অসাবধানতার কারণে সৌহার্দ্য স্যার… মানে, রিপোর্টগুলো তিনি আগেই দেখে ফেলেছেন! সরি স্যার!”
কথাটা শুনে শাহাবীরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের মনিতে এক অজানা ঝড় বয়ে গেল, সে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর সে শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল, “বুঝলাম। তুমি যাও।”
লোকটি দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করল। শাহাবীর ফাইলগুলো শক্ত করে মুঠোবন্দী করল। তার চোখ এখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। সে জানে, এই রিপোর্টের প্রতিটি শব্দ এখন গেম চেঞ্জার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইলগুলো নিয়ে সে দ্রুত পায়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে গেল— যেন নিশ্চিত কোনো লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে।
কলেজ থেকে ফিরে রিদি আর শরীর টানতে পারল না। ড্রয়িংরুমের সোফায় ধপ করে গা এলিয়ে দিল সে। পায়ের অসহ্য ব্যথায় নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও নেই।
রিদিকে এভাবে আছড়ে পড়তে দেখে সাহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিরে, কী হয়েছে তোর? এভাবে লটপটিয়ে পড়ে গেলি যে?”
রিদি চোখ না খুলেই ক্লান্ত গলায় জবাব দিয়ে বলল, “ভাই, ওই অসভ্য ডাক্তার আমার সব এনার্জি লস্ট করে দিয়েছে। পা দুটো মনে হচ্ছে খুলে পড়ে যাবে, হাঁটার ক্ষমতা নেই।”
সাহান ভ্রু কুঁচকে, বাঁকা চোখে তাকাল। তার কণ্ঠে একটু তীক্ষ্ণতা নিয়ে সে বলল, “কেন, ওই সাদা বিলাইটা আবার কী করেছে তোর সাথে?”
রিদির বুঝতে বাকি রইল না যে সাহান উল্টোপাল্টা কিছু ভাবছে। সে নাক-মুখ কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলল, কি করবে আর! ক্লাসে পুরো ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রেখেছিল। অসভ্য লোক একটা!” বলেই কোনোমতে ব্যাগটা টেনে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে ওপরের দিকে হাঁটা দিল।
গত তিনদিন ধরে জ্বরের তীব্র দহনে রিদি যেন এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। শরীরের প্রতিটি কোষে যেন আগুনের হলকা, স্পর্শ করলেই মনে হয় হাত পুড়ে যাবে। নড়ার মতো ন্যূনতম শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই তার। সদ্য ওষুধ খেয়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। রিদির শিয়রে বসে নিভৃতে মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে শাহাবীর। তার চোখের কোণে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। শাহাবীর বারবার অস্থির হয়ে রিদির কপালে হাত দিয়ে দেখছে—জ্বরের প্রকোপ কিছুটা কমল কি?
পাশে বসে থাকা আরিফা খান ছেলের এই ব্যাকুলতা দেখে বিষণ্ণ হাসলেন। আলতো স্বরে বললেন, “ও ঠিক হয়ে যাবে বীর, এত অস্থির হস না বাবা।”
মায়ের দিকে ফিরে শাহাবীরের কণ্ঠে বিষাদের সুর। সে ভাঙা গলায় বলল, “মম, ও যদি সব সত্যিটা জানতে পারে? যদি আমাকে ভুল বুঝে চিরতরে দূরে সরে যায়? ও ছাড়া রক্ত সম্পর্কের আর কেউ নেই আমার। আকরাম খানের মতো সে-ও কি আমাকে ছুড়ে ফেলে দেবে?”
শাহাবীরের এই অনিশ্চয়তা আরিফা খানের বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে দিল। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “তুই ভাইয়াকে ভুল বুঝছিস বীর। উনি যা কিছু করেছেন, সব আমার জন্য—আমার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। অপরাধ যদি কারো হয়ে থাকে, তবে সেটা আমার! তাহলে আমাকে কেন এত ভালোবাসি? আমাকে ও তো ঘৃনা করার কথা!
শাহাবীর কোনো উত্তর দিল না। বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘশ্বাস। সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা হিসাব-নিকাশগুলো তাকে কিছুতেই শান্তি দিচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, এই মেয়েটি যেদিন জানতে পারবে যে তার মা-বাবা না থাকলেও রক্তের সম্পর্কের কেউ একজন ছিল, তবুও তাকে এত সাফার করে হয়ছে,—সেদিন কি রিদি এই সম্পর্ককে মেনে নেবে? নাকি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে?
নিজের অস্তিত্বের এই জটিল সমীকরণগুলো শাহাবীরের মস্তিষ্কে জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। সে রিদির নিথর দেহটির দিকে শেষবারের মতো এক পলক তাকিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
রাত তখন দুটো। হাসপাতালের করিডোরের নিস্তব্ধতায় কেবল সৌহার্দ্যের ক্লান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। করিডোরের বড় জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশটার দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাত্রই একটা দীর্ঘ ওটি (OT) শেষ করে বের হয়েছে সে, কিন্তু শরীর ও মনের ক্লান্তি যেন তাকে আরও গভীর কোনো চিন্তার সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ করেই সুজন এসে নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর সুজন মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “কী ভাবছিস এত?”
সৌহার্দ্য আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই, এক অদ্ভুত গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, “কী ভাবব? আমার কি ভাবার মতো কিছু অবশিষ্ট আছে?”
তার গলার স্বরে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, নেই কোনো অস্থিরতা; বরং এক গভীর শূন্যতা। সুজন আড়চোখে সৌহার্দ্যের শান্ত অথচ পাথুরে মুখটার দিকে তাকাল। তার মনের অলিগলিতে কী খেলা চলছে, তা বোঝার সাধ্য কার? সুজন কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করল। সে আমতা আমতা করে বলে উঠল, “রিদি তোকে মন থেকে ভালোবাসে, সৌহার্দ্য। এখনো সময় আছে, ভুলটা শুধরে নে। এমন অমূল্য কাউকে একবার হারিয়ে ফেললে, চাইলেই কি আর ফিরে পাবি? তাছাড়া, শাহাবীর তো আজ স্পষ্টই বলে দিয়েছে, পরীক্ষা শেষ হলেই সে রিদিকে আমেরিকা নিয়ে যাবে।”
সৌহার্দ্যের ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে উঠল, কিন্তু সুজনের কথাগুলো যেন সৌহার্দ্যের নিস্পৃহতা ভেদ করতে পারল না। সে আগের মতোই শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন পৃথিবীটা এখন তার কাছে অনুভূতিহীন। তার এমন শীতলতায় কোনো বিকার নেই।
সুজন একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বিরক্তির সাথে বিড়বিড় করে উঠল, “শালা রোবট একটা!” এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজের ডেস্কের দিকে চলে গেল।
সকাল দশটা। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের মৃদু আলো রিদির ঘরের পর্দা ভেদ করে বিছানায় এসে পড়েছে, কিন্তু রিদির ঘুমের কোনো বিরাম নেই। টানা তিন দিনের জ্বরের দাপট মেয়েটাকে একেবারে নিস্তেজ করে দিয়েছে। এত দীর্ঘ সময় রিদি সাধারণত ঘুমায় না, কিন্তু শরীরের প্রতিটি কোষ এখন ক্লান্তিতে অবসন্ন।
আরিফা খান নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করলেন। রিদির কপালে হাত রাখতেই স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল—জ্বর নেই। তবে মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে আরিফা খানের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। ওর চেহারায় হুবহু নিজের মৃত মায়ের আদল। যেন কেউ নিখুঁত তুলিতে এঁকে রেখেছে প্রতিটি রেখা। আরিফা খান পরম মমতায় রিদির কপালে একটি কোমল চুমু খেলেন, তারপর আলতো করে ওকে ঝাঁকিয়ে বললেন, “ওঠ চাঁদ, অনেক বেলা হয়েছে। অন্তত কিছু মুখে দে।”
রিদি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো। সামনে ফুফিকে দেখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল ওর মলিন মুখে। সে অভিমানী শিশুর মতো ফুফির কোলে মুখ গুঁজে দিল। আরিফা খান চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন, “সোনা, কিছু না খেলে শরীর সারবে কীভাবে? ওঠ, খেয়ে নে।”
রিদি নাক-মুখ কুঁচকে আবদারের স্বরে বলল, “উহুঁ ফুফি, একদম ইচ্ছে করছে না। মুখ কেমন তিতা হয়ে আছে।”
ঠিক তখনই দরজায় শাহাবীরের উপস্থিতি। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক বাটি সুপ নিয়ে সে ঘরে ঢুকল। রিদিকে সজাগ দেখে শাহাবীর দ্রুত এগিয়ে এসে ওর কপালে হাত ছোঁয়াল। শীতল হাতের স্পর্শে রিদি যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি পেল। শাহাবীর গম্ভীর অথচ নরম স্বরে বলল, “আজ কলেজে যাওয়ার টাইম নেই, তাই নিশ্চিন্তে খেয়ে নে।” সে বাটি থেকে চামচ ভরে সুপ রিদির মুখের কাছে ধরল।
রিদি অবাক হয়ে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে রইল। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এত যত্ন করে কেউ তাকে খাওয়াবে, এটা সে কল্পনাও করেনি। ওই বাড়িতে জ্বর নিয়ে পড়ে থাকলেও রিমা চৌধুরীর কটু কথার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হতে হতো তাকে। যদিও অন্য সবার ভালোবাসায় সেগুলো গায়ে মাখতো না, আজ কারো এতটুকু ভালোবাসা পাওয়ার ব্যাকুলতা রিদির মনের জমে থাকা বরফ অনেকটা গলিয়ে দিল।
শাহাবীর শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কি হলো? আমার হাতে খেতে সমস্যা আছে?”
রিদি কোনো কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে না-সূচক উত্তর দিল, মানে সমস্যা নেই। শাহাবীরের মনের ভেতর এক অজানা আনন্দ খেলে গেল। সে মৃদু হেসে পরম মমতায় রিদিকে খাইয়ে দিতে লাগল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফা খান এই দৃশ্যটা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন। তার মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনের কথা। একদিন আকরাম খানও ঠিক এভাবেই আগলে রাখতেন তাকে। ভাইয়ের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা মনে করে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
খাওয়ার ফাঁকে রিদি এক দৃষ্টিতে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে ছিল। শাহাবীর ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে বলল, “কী হলো? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
রিদি খানিকটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, আপনার চেহারাটা কেমন যেন মামমামের সাথে মিলে যায়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী তো আপনার সাথে ফুফির চেহারার মিল থাকার কথা, কারণ আপনি তো ফুফির ছেলে। এটা এমন উল্টো হলো কেন?”
রিদির প্রশ্নে শাহাবীরের হৃদপিণ্ডে যেন একটা ধাক্কা লাগল। সে মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল। তারপর খুব সাবধানে, নির্লিপ্ত গলায় বলল, “তোর ভুল হচ্ছে রিদি। মানুষের চেহারার সাথে চেহারা মিল থাকতেই পারে। এই সব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে, চুপচাপ খেয়ে নে।”
শাহাবীর দ্রুত বাকিটুকু খাইয়ে দিয়ে কোনো সুযোগ না দিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যেন তার কোন পিছুটান লুকানোর এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা!
শাহাবীর চলে যাওয়ার পর রিদি বালিশের পাশে থাকা ফোনটা তুলে নিল। সুমিকে কয়েকবার কল দিলো সাড়া না পেয়ে মেজাজ বিগড়ে গেল ওর। বিরক্ত হয়ে ফোনটা ছুড়ে ফেলে পড়ার টেবিলের দিকে হাত বাড়াল। ডাক্তারি পড়ার এই ইঁদুর-দৌড় ওর এখন আর একদম ভালো লাগে না। একটা ক্লাস মিস মানেই বিশাল এক খেসারত। রিদি মনে মনে আরহানকে দুষে বিড়বিড় করে বলল, “আরহান ভাইয়াটা জন্য আমার জীবনটা পড়াশোনার চাপে তেজপাতা হয়ে যাচ্ছে!” বলেই সে একরাশ অনিচ্ছা নিয়ে বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিল।
পরপর কয়েকটি ওটির চাপে টানা দুই দিন সৌহার্দ্য ক্লাসে আসতে পারেনি। আজ যখন সে ক্লাসরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল, চোখজোড়া স্বাভাবিকভাবেই পুরো ক্লাসরুম খুঁজে ফিরছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই মুখটি না দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, মনের ভেতর কোথাও যেন এক দলা অস্বস্তি দানা বাঁধল। চোখের পলক ফেলে সে বিরক্তিটুকু আড়াল করার চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণ যান্ত্রিকভাবে লেকচার দেওয়ার পর সৌহার্দ্যের স্থির দৃষ্টি গিয়ে পড়ল পৃথার ওপর। গলার স্বর কিছুটা কঠোর করে সে প্রশ্ন করল, “ইউর নেম?”
পৃথা একটু তটস্থ হয়েই উঠে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে বলল, “পৃথা হাসান, স্যার।”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে, অদ্ভুত এক বিরক্তিকর ভঙ্গিতে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “তোমাদের সাথে থাকে ওটা… বোঁচা নাক, ওটা কি আজকে আসেনি?”
পৃথার মনে মনে এক পশলা গালি বেরিয়ে এলেও, মুখে সে একরাশ কৃত্রিম কোমলতা ফুটিয়ে বলল, “না স্যার, আসেনি।”
শুনে মনে হলো সৌহার্দ্যের বিরক্তি যেন এক মুহূর্তের জন্য চরমে পৌঁছাল। সে আর কোনো কথা বাড়াল না। বাকি আধা ঘণ্টা কোনোমতে ক্লাস শেষ করে সে দ্রুত পায়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
শাহাবীর মার্কেট থেকে রিদির জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বের হচ্ছিল। ব্যাগগুলো দুই হাতে সামলাতে গিয়ে সে যখন ব্যস্ত, তখনই হঠাৎ কারো সাথে প্রবল ধাক্কা খেল সে। ব্যাগগুলো ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে সে নিচু হতেই কানে এলো এক তীক্ষ্ণ, চঞ্চল ও ঝরঝরে মেয়েলি কণ্ঠস্বর, “এই কানা লোক চোখে দেখেন না? নাকি চোখ আন্ডারপ্যান্টের ভেতর নিয়ে হাঁটেন?
এমন অদ্ভুত বেপরোয়া মন্তব্য শুনে শাহাবীর চমকে উঠে তাকাল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিশোরী বয়সের এক মেয়ে—বয়স খুব বেশি হলে যুথির সমান হবে, অথবা বড়জোর একটু বেশি। প্রথম দর্শনেই শাহাবীরের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। বাচ্চা একটা মেয়ের মুখে এমন অসংলগ্ন কথা সে সহ্য করতে পারল না। চোখের দৃষ্টিতে আগুনের হলকা নিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “বেয়াদব মেয়ে! ছোট মুখে বড় কথা? থাপ্পড় মেরে গাল লাল করে দেব! নাক টিপলে এখনো দুধ বের হবে, অথচ কথা বলার কি ধরন!”
শাহাবীরের এমন ভয়ঙ্কর রূপ দেখে রিভা মুহূর্তের জন্য কিছুটা হকচকিয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের জেদ চেপে ধরে সে কিছু বলতে গেল। কিন্তু শাহাবীর তাকে থামিয়ে দিয়ে তার রক্তচক্ষু আর কঠোর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “সরো সামনে থেকে!”
কথাটা বলেই সে রিভাকে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে হনহন করে ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেল। রিভা অবাক হয়ে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের রাগকে একটু দমিয়ে ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বলল, “রাক্ষস একটা! যেভাবে তাকাচ্ছিল! আমি যে একটা ছোট মানুষ, আমার যে ভয় লাগতে পারে—সেদিকে কোনো খেয়াল আছে? অদ্ভুত এক লোক!”
মূলত, রিভা এক সপ্তাহ আগে ঢাকা এসেছে। গ্রামের বাড়ি থেকে আসার পর থেকেই রিদিকে না পেয়ে তার মনটা এমনিতেই বিষণ্ন ছিল। একটু মন ভালো করার আশায় মার্কেট করতে বেরিয়েই এই অদ্ভুত পরিস্থিতির শিকার হলো সে।
আজ তিনদিন পর রিদি কলেজে এলো, তবে দুঃখের বিষয়—তার একটা বন্ধুকেও সে খুঁজে পেল না। আজ হয়তো কেউই আসেনি। মন খারাপ করা আকাশ নিয়ে করিডোর দিয়ে রিদি যেই ক্লাসরুমের দিকে এগোতে যাবে, অমনি সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল সৌহার্দ্য। তাকে দেখেই রিদি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু সৌহার্দ্যের গম্ভীর ও গমগমে কণ্ঠস্বর তাকে থমকে দিল, “ইউ দেড় ব্যাটারি, ক্লাসে আল্টিমেটাম দেওয়া শর্তেও ক্লাস মিস দিয়েছ কেন?”
টানা তিনদিনের তীব্র জ্বরে রিদির শরীরটা এমনিতেই নিস্তেজ হয়ে আছে। পড়াশোনার চাপ আর অসুস্থতার ক্লান্তিতে তার ভেতরটা তখন অস্থির। সৌহার্দ্যের এমন হঠাৎ আগমনে মেজাজ তিরতিরে হয়ে গেল রিদির। সে বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে বলল, “সেটা আমার ইচ্ছা, আপনাকে বলতে হবে কেন?”
সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হিসহিসিয়ে বলল, “ওকে, দেন এখন আমার থেকে পানিশমেন্ট ও পেতে হবে, চলো।” বলেই সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে রিদির হাতটা শক্ত মুঠোর মধ্যে পুরে নিয়ে তাকে টেনে নিয়ে নিজের চেম্বারের ভেতর ঢুকে দরজাটা ‘ঢাস’ করে বন্ধ করে দিল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল সবটা।
চেম্বারের ভেতর আসার পর হাতটা ছাড়িয়ে নিতে রিদি রাগে ফুঁসে উঠল, “এটা কি করলেন অসভ্য লোক? কেউ দেখে নিলে কি হতো? আর আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন অসভ্য ডাক্তার?”
সৌহার্দ্য রাগ নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “তোমার রূপ দেখার জন্য এখানে আনা হয়নি! তুমি আমার ক্লাস মিস দিয়েছ, তার পানিশমেন্ট পেতে হবে এখন!”
সৌহার্দ্যের কথা শুনে রিদি রাগে ফেটে পড়ল। এমনিতেই তিনদিনের জ্বরে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না, তার ওপর এই লোকের পানিশমেন্ট! রিদি বিরক্তি নিয়ে বলল, “অসভ্য লোক, সেইদিন দেড় ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেও আপনার পানিশমেন্ট শেষ হয়নি? মন ভরেনি?”
সৌহার্দ্য রিদিকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে শীতল কণ্ঠে বলল, “না, তোমাদের মতো স্টুপিড ছাত্রীদের এসব পানিশমেন্টে কাজ হয় না। তাই আমি ভেবেছি যারা এখন থেকে আমার ক্লাস মিস করবে, তাদের থেকে ফাইন নেব!”
রিদি নাক-মুখ কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করল—’আগে জানতাম অসভ্য লুচ্চা ডাক্তার, এখন দেখি ধান্দাবাজ! এগুলো করেই তো এত টাকা বানিয়েছে অসভ্য ডাক্তার!’ সৌহার্দ্য কিছু বলার আগেই রিদি ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে তার দিকে এগিয়ে দিল।
সৌহার্দ্য টাকাটা হাতে নিয়ে রিদির দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “হোয়াট ইজ দিস? তোমার কি আমাকে ভিখারি মনে হয়?”
রিদি বিড়বিড় করে বলল, “তুই শুধু ভিখারি না, ভিখারির হেড! অসভ্য লোক, নিজের বউ মানিস না দায়িত্ব নেওয়ার ভয়ে!”
রিদির নীরবতা দেখে সৌহার্দ্যের বিরক্তি আরও বাড়ল। সে কঠোর স্বরে বলল, “তুমি আমার সতেরোটা ক্লাস মিস করেছ, ফাইন হিসেবে সতেরো হাজার টাকা ছাড়ো।”
রিদি যেন বেয়াক্কেল বনে গেল! কলেজে এমন কোনো নিয়ম তার জানা নেই যেখানে ক্লাস টিচারকে ফাইন দিতে হয়। সে রাগে গজগজ করতে করতে বলল, “এটা মগের মুল্লুক পেয়েছেন নাকি? আমি আপনার নামে অথরিটির কাছে কমপ্লেন করব! ঘুষের দায়ে জেলে পুরে দেব! একদম বলদ পেয়েছেন আমাকে? ডিএসপি আকরাম খানের মেয়ে আমি! আপনার ধান্দাবাজি আমার সাথে চলবে না!”
রিদির কথার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সৌহার্দ্য নির্বাক কণ্ঠে বলল, “ওকে দেন, আগে টাকা বের করো, তারপর যা করার করবে!”
রিদি বুঝল, এই অসভ্য লোকের সাথে তর্ক করে লাভ নেই। সে একটু নরম হয়ে মিনতি ভরা কণ্ঠে বলল, “স্যার, আমার কাছে তো এখন এত টাকা নেই। আপনাকে পরে পরিশোধ করে দেব, প্রমিস!”
সৌহার্দ্য চেয়ারে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে বলল, “ওসব বাকির কাজ আমি করি না। তবে তুমি যেহেতু আমার না মানা বউ, সেহেতু তুমি চাইলে তোমার জন্য স্পেশাল একটা অফার দিতে পারি?” বলেই সে মাথা উঁচিয়ে রিদির দিকে তাকাল।
রিদি মনে মনে গাল দিয়ে বলল—’এই অসভ্য ইতর লোকের কাছ থেকে শেখা উচিত কীভাবে জুতা মেরে গরু দান করতে হয়!’ কিন্তু মুখে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলল, “ঠিক আছে স্যার, বলুন!”
সৌহার্দ্য একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “যদিও এগুলোতে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই, তবুও তোমার উপকার করতে চেয়ে দিচ্ছি অফারটা।” রিদি উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সৌহার্দ্য গমগমে কণ্ঠে বলল, “দেন ইউ ক্যান গিভ মি সেভেনটিন কিসেস অ্যাজ আ ফাইন। ইউ ক্যান গিভ দেম এনিহোয়্যার, আই হ্যাভ নো প্রবলেম।(“চাইলে তুমি আমাকে জরিমানা হিসেবে সতেরোটা চুমু দিতে পারো। সেগুলো যেকোনো জায়গায় দিতে পারো, আমার কোনো সমস্যা নেই।)
কথাটা কানে যেতেই রিদি চেঁচিয়ে উঠল, “কি? ছিঃ অসভ্য লোক! আপনার থেকে ভালো কিছু আশা করা বোকামি, লুচ্চা ডাক্তার!”
সৌহার্দ্য নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে একটু আফসোস নিয়ে বলল, “ওকে দেন টাকা দাও, তোমার উপকার করতে চাইলাম, নিলে না!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৩
রিদির রাগে-লজ্জায় মুখটা লাল চেরির মতো হয়ে গেছে। সে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—সৌহার্দ্য এমন কিছু চাইতে পারে সেটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থেকে আবারও গমগমে স্বরে বলল, “হোয়াটস রং? আই’ম গেটিং লেট। গিভ মি মাই মানি।
রিদি বুঝল, এই বেয়াদব লোক তাকে এমনি এমনি যেতে দেবে না। সে লজ্জায় লাল হয়ে মিনমিনিয়ে বলল, “এতগুলো পারব না… একটা দিতে পারি!” কথাটি বলেই সে লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে রইল, শরীরে তখন এক অদ্ভুত শিহরণ আর অনুভূতির দোলা।
সৌহার্দ্যের ভাবনায় কোনো পরিবর্তন নেই। সে নির্বিকার হয়ে বলল, “ওকে, দেন কাম!” বলেই সে তার গালটা বাড়িয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় জোরে একটা টোকা পড়ল।
