Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৩

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৩

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৩
রিদিতা চৌধুরী

রাত তখন প্রায় তিনটে। চারপাশ নিঝুম, নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা। অথচ রিদির মনের ভেতর তখন চলছে এক তুমুল ঝড়। বিছানায় ছটফট করতে করতে বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে বালিশের পাশে রাখা ফোনটার দিকে। স্ক্রিনটা এখন অন্ধকার, কিন্তু রিদির মনের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে সৌহার্দ্যের সেই শেষ মেসেজটা। যতবারই সেই কথাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে, রিদির মনে হচ্ছে তার সমস্ত রক্ত যেন হুড়মুড় করে এসে জমা হয়েছে গালে—মুহূর্তেই তার মুখটা লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠছে। মেসেজের ভাষা আর ভঙ্গি দেখে রিদির বুঝতে বাকি নেই যে, সৌহার্দ্য একদম ধরে ফেলেছে—ফেইক আইডির মালিক রিদি!
​এসিটা বেশ খানিকটা কমিয়ে দেওয়া, হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ঘর জমে যাওয়ার কথা। অথচ রিদির গাল দুটো দাউদাউ করে জ্বলছে, আর সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। শীতেও তার ত্বকের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অদ্ভুত এক উষ্ণ শিহরণ। সে দুহাতে মুখ চেপে ধরল, যেন নিজের এই তীব্র লজ্জার বহিঃপ্রকাশকে আড়াল করতে চাইছে।

​ফেইক আইডিটা থেকে একটু দুষ্টুমি করতে চেয়েছে রিদি, কিন্তু নিজেই যে এমন গোলকধাঁধায় ফেঁসে যাবে, তা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। যে মানুষটাকে সে সবসময় গম্ভীর, নির্লিপ্ত আর পেশাদার এক ডাক্তার হিসেবে দেখে এসেছে—সেই মানুষটার ভেতরে যে এমন রসিক আর উদ্দাম এক সত্তা লুকিয়ে আছে, তা রিদির কল্পনার অতীত।
​বালিশে মুখ গুঁজে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “ছিঃ… কি অসভ্য! কি লুচ্চা ডাক্তার একটা!”
রাত প্রায় চারটে। ভোরের নিস্তব্ধতা চারপাশকে ঘিরে ধরেছে। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সৌহার্দ্য। টানা ডিউটির ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে, তার ওপর সন্ধে থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি, ক্ষিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। রান্নাঘরের দিকে এক পা বাড়াল সে, কিন্তু পরক্ষণেই থমকে গেল। লন্ডনে থাকাতে সে খালার বাসায় থাকতো, তাকে কখনো কিছু করতে হয়নি!সৌহার্দ্য রান্নাঘরের গলিঘুঁজিও চেনে না, আর নিজে হাতে কিছু বানানো তার কাছে হিমালয় জয়ের সমান!

রিদিকে একবার ডাকবে কি না ভাবল, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, বেশ রাত পর্যন্ত দুষ্টুমি করে মেয়েটি এতক্ষণে ঘুমিয়েছে, এখন ঘুম ভাঙ্গা ঠিক হবে না ভেবে আর ডাকলো না!
​এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে নিজের ঘরে ফেরার পথে রিদির ঘরের সামনে এসে তার পা আটকে গেল। দরজাটা সামান্য ভেজানো। মৃদু ধাক্কায় ভেতরটা দৃশ্যমান হতেই সৌহার্দ্যের নিঃশ্বাস মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। ডিম লাইটের নীলচে আলোয় রিদি এলোমেলো ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে টি-শার্টটা কিছুটা উপরে উঠে গেছে, বেরিয়ে আছে মসৃণ উদর; পাজামাটাও অনেকটা উপরে উঠে এসেছে।
​সৌহার্দ্য দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ভ্রু কুঁচকে বিরবির করে উঠল, “এভাবে কেউ ঘুমায়? দরজাটা লক করে ঘুমালে কি হতো, স্টুপিড!”

তবুও এগিয়ে যেয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে আলতো করে কাঁথাটা টেনে তার শরীরে জড়িয়ে দিল। এরপর সম্মোহিতের মতো গিয়ে বসল রিদির পাশে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছোট গোলগাল, শ্যাম বর্ণের চেহারাটার দিকে। কী এক অদ্ভুত ক্ষমতা এই মেয়েটার! তাকে দিনের পর দিন নাজেহাল করে ছাড়ছে! রিদি আহামরি সুন্দরী হয়তো নয়, কিন্তু তার চোখ আর চেহারায় এমন এক সম্মোহনী মায়া আছে, যা যে কাউকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট।
​ঘুমন্ত রিদির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের শিশির চিকচিক করছে। সৌহার্দ্য একটু ঝুঁকে পড়ল। নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আলতো করে রিদির নাকের উপরের ঘামটুকু মুছে দিয়ে, তার নাকটা হালকা টিপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “আমার বোঁচা নাক!”
​একটুও আওয়াজ না করে, নিজের মনের অদ্ভুত ভালো লাগাটাকে লুকিয়ে সে বেরিয়ে গেল নিজের রুমের দিকে।

নিজের রুমে ফিরে সৌহার্দ্য দ্রুত শাওয়ারটা সেরে নিল। ঠান্ডা জল শরীরে কিছুটা সজীবতা দিলেও মনের ক্লান্তি কাটল না। বিছানায় উপুড় হয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল সে। কাল সকালে আবার ক্লাস আছে। গত দুই সপ্তাহে টানা কয়েকটি ওটি (OT) থাকায় বেশ কয়েকটা ক্লাস নেওয়া হয়নি। অবশ্য সৌহার্দ্যের পক্ষে নিয়মিত ক্লাস নেওয়াও সম্ভব হয় না; মাসে হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাসই তার নেওয়া হয়।
​বালিশে মুখ গুঁজেও সে স্থির হতে পারছিল না। রিদির সেই নীল আলোয় মাখা ঘুমন্ত মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। অদ্ভুত এক ঘোর তাকে পেয়ে বসল। তবুও চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে চোখ বুঝলো!
​ভোর ছয়টার অ্যালার্মের শব্দে রিদির ঘুম ভাঙল। কোনোরকমে গায়ে ওড়নাটা জড়িয়ে সে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে ছুটল। ওযু সেরে নামাজটা পড়ে নিল সে, যেন মনের অস্থিরতা কিছুটা প্রশমিত হয়। এরপর কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে চোখ বুজে রইল রিদি।

​রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার কথা ভেবেও গেল না সে। আজ পড়ার পাহাড় জমে আছে, বিশেষ করে বায়োকেমিস্ট্রির একটা কঠিন টপিক কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠার জোগাড়। হঠাৎ সৌহার্দ্যের কথা মনে পড়ল তার। মানুষটা গম্ভীর হলেও পড়া বোঝানোর দক্ষতা অসাধারণ। কিন্তু পরক্ষণেই ভয় তাকে গ্রাস করল। অসভ্য লোকটার মেজাজের কি কোনো ঠিক আছে? এই ভালো, তো এই খারাপ! যদি আবার ঝাড়ি মারে?
​তবুও পড়ার তাগিদে সব সংকোচ আর ভয় একপাশে সরিয়ে রিদি এগিয়ে গেল সৌহার্দ্যের রুমের দিকে। দরজার সামনে এসে তার বুকের ধুকপুকানি যেন বেড়ে গেল। ভয় হচ্ছে, তবুও আলতো হাতে দরজাটা ঠেলে সে ভেতরে পা রাখল।

​ঘরে পা রাখতেই ‘ক্রিড অ্যাভেনটাস’ পারফিউমের মাদকতা মাখা মিষ্টি গন্ধে রিদির চোখটা বুজে এল। কিন্তু পরক্ষণেই যা দেখল, তাতে লজ্জায় তার মুখটা চেরির মতো লাল হয়ে উঠল। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সৌহার্দ্য; শরীরের ওপরের অংশটা অনাবৃত, কোমর পর্যন্ত কেবল একটা কাঁথা জড়ানো। রিদি চোখ বন্ধ করে তড়িঘড়ি পিছন ফিরে চলে যেতেই চাইল, ঠিক তখনই ভেসে এল সৌহার্দ্যের ঘুম জড়ানো কন্ঠস্বর—”কাম হিয়ার বেবি!”
​রিদির হৃৎপিণ্ড যেন গলায় এসে ঠেকল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, রাতের সেই মেসেজগুলোর রেশ ধরেই সে এভাবে ডাকছে! লজ্জায় কাষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই এবার ভেসে এল সৌহার্দ্যের বিরক্ত ভরা কন্ঠস্বর—” দেড় ব্যাটারি দাঁড়িয়ে না থেকে কি চাই বলো!”
রিদি মনে মনে নিজের রাগটা কোনোমতে চেপে আমতা আমতা করে বলল, “একটা সাবজেক্ট বুঝছি না, একটু বুঝিয়ে দেবেন?”

​সৌহার্দ্য আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসল। বিছানায় হেলান দিয়ে বসা মানুষটার চোখজোড়া ঘুমের ঘোরে লাল হয়ে আছে। রিদির দিকে এক পলক তাকিয়ে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল সে। রিদি সৌহার্দ্য থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে বইটা খুলল, কিন্তু আড়চোখেও তার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। লোকটা কেমন অসভ্য! পাশেই তো টি-শার্টটা পড়ে আছে, অথচ এভাবে অনাবৃত শরীরে বসে আছে! রিদির মনের ভেতর তখন লজ্জা আর বিরক্তির এক অদ্ভুত লড়াই চলছে।
​সৌহার্দ্য রিদির অস্বস্তিটা স্পষ্ট টের পেল, কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না। সে রিদির দিকে একটু ঝুঁকে বইয়ের টপিকটা বোঝাতে শুরু করল। কিন্তু দুই-তিনবার বুঝিয়ে দেওয়ার পরেও রিদির মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। ঢুকবে কীভাবে? তার দৃষ্টি বারবার সরে যাচ্ছে সৌহার্দ্যের সেই উন্মুক্ত, সুঠাম বুকের দিকে। শরীরের লোমশ আর বলিষ্ঠ পেশিগুলোর সেই অদ্ভুত সৌন্দর্য রিদির মনোযোগ পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিচ্ছে। রিদি মনে মনেই নিজেকে ধিক্কার দিল—’ছিঃ! আমি কবে থেকে এত বেহায়া হয়ে গেলাম?’
​ওর ভাবনার মাঝেই সৌহার্দ্য বিরক্ত গলায় ঝাঝিয়ে উঠল, “তুমি পড়তে এসেছো, না আমাকে বিরক্ত করতে?”

​রিদি লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “প্লিজ, গায়ে কিছু জড়ান না!”
​সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম শিখরে পৌঁছে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। পাশ থেকে টি-শার্টটা টেনে নিয়ে কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিল সে। এরপর আবার রিদির দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে পড়াটা বুঝিয়ে দিল। রিদি যখন বিষয়টা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য গমগমে স্বরে ঘোষণা করল, “আজ তোমাদের একটা ক্লাস টেস্ট নেব!”
​রিদি মাথা নাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই নিচ্ছিল, তখন সৌহার্দ্যের গম্ভীর কণ্ঠস্বর তাকে আটকে দিল, “গতবার টেস্টে তোমার থেকে যে সিক্স মার্ক কাটা হয়েছিল, সেটা বাড়িয়ে দিলে হ্যাপি হবে?”
​রিদির মনে মনে একটু খুশি হলো! এমনিতেই তার প্রিপারেশন খুব একটা ভালো ছিল না, তাই অন্তত এই একটা সুবিধা পেলে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। খুশিতে গদগদ হয়ে রিদি বলে উঠল, “দিবেন? দিলে তো ভালোই হয়!”

​সৌহার্দ্য তার গম্ভীর মুখটা রিদির একদম কাছাকাছি এগিয়ে আনল। ঠান্ডা গলায় সে বলল, “ওকে, দেন, একটা মর্নিং কিস করো?”
​কথাটা কানে যেতেই রিদির মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। রাগে নাক-মুখ কুঁচকে, তেতে উঠে সে চিৎকার করে উঠল, “অসভ্য, লুচ্চা, ধান্দাবাজ লোক একটা!”
​বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, রাগে গজগজ করতে করতে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রিদি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। মেয়েটাকে এভাবে রাগাতে, তার সাথে দুষ্টুমি করতে তার অদ্ভুত ভালো লাগে। কথায় কথায় এই পুঁচকে মেয়েটি যেভাবে সাপের মতো ফনা তুলে যেভাবে তেড়ে আসে, তা সৌহার্দ্যর বেশ উপভোগ্য মনে হয়। রিদির যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সে বিরবির করে বলল, “ভাবা যায়! যে সৌহার্দ্য চৌধুরীর সামনে কথা বলতে পুরো মেডিকেল টিম থরথর করে কাঁপে, সেখানে আমার পুঁচকে বউটা আমাকে পাত্তাই দেয় না!” নিজের মনেই এক চিলতে হাসি হেসে সৌহার্দ্য ফ্রেশ হতে চলে গেল।

​রিদি রেডি হয়ে নিচে নামতে নামতে আটটা বেজে গেছে। নাস্তার টেবিলে বাড়ির সবাই আগেই বসে পড়েছে। সৌহার্দ্যকে সেখানে দেখে রিদি একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। সৌহার্দ্য একবার রিদির দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেও পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে নিল। খুব সামান্য কিছু খেয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে উঠে দাঁড়াল।
​রিদি দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য পেছন থেকে কোনোদিকে না তাকিয়ে, গম্ভীর মুখে গমগমে কণ্ঠে নির্দেশ দিল, “খেয়ে দেন আসো!”
​রিদি থমকে দাঁড়িয়ে মিনমিনে স্বরে বলল, “দেরি হয়ে গেছে!”
​সৌহার্দ্য আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শীতল গলায় বলল, “আই অ্যাম টেলিং হোয়াট আই’ম সেয়িং, ডু ইট ফাস্ট।”

​বলেই সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
সারহান চৌধুরী এতক্ষণ তার ছেলের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। রিদির প্রতি সৌহার্দ্যের এই অযাচিত যত্ন আর শাসনের ভেতরে তিনি এক অদ্ভুত নির্ভরতার ছায়া খুঁজে পেলেন। ছেলের এই রূপ দেখে তিনি স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনের কোণে একটা চাপা ভয় ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, নিজের মৃত বন্ধুকে দেওয়া কথাটি হয়তো তিনি ঠিকঠাক রাখতে পারবেন।
​হঠাৎ করেই সারহান চৌধুরীর মস্তিষ্কের পর্দায় ভেসে উঠল সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি। আকরাম খানের এক্সিডেন্টের ঠিক আগের দিন—ফোনটা যখন এসেছিল, আকরাম খানের কণ্ঠস্বর ছিল অস্বাভাবিক আতঙ্কিত। সেই কাঁপা কাঁপা গলায় আকরাম খান বলেছিল, “আমার সামনে বিপদ, সারহান! তোর সাথে দেখা করে সব খুলে বলব। কিন্তু তার আগে যদি আমার কিছু হয়ে যায়… রিদিকে তোর দায়িত্বেই নিতে হবে। শাহেদা ভাবীকে কথা দিয়েছি, তার বোনের শেষ চিহ্নটুকু আমি তার হাতে তুলে দেব।”
​বন্ধুর সেই শেষ আকুতি আর আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর আজও তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেসব স্মৃতি মনে পড়তেই সারহান চৌধুরীর চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি আর নাস্তা চালিয়ে যেতে পারলেন না। চোখের জল আড়াল করতে তিনি চোখ বন্ধ করে নিলেন এবং নিঃশব্দে নাস্তার টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।

কলেজ গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই রিদি দেখতে পেল সায়েমকে। কোনো কিছু না ভেবেই সে দ্রুত এগিয়ে গেল সায়েমের পিঠে একটা জোরদার চাপড় বসিয়ে চমকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু রিদির হাত সায়েমের পিঠ স্পর্শ করার আগেই সায়েম তীব্র বেগে সরে গেল। রিদি অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল—সায়েমের এমন অস্বাভাবিক আচরণ তার বোধগম্য হলো না। সে ভ্রু কুঁচকে সায়েমের দিকে তাকাতেই সায়েম থমথমে গলায় বলল, “তুই আমার থেকে দূরে থাক, বোন!”
​মনে মনে সায়েম বলল—তোর ওই খাটাশ জামাইয়ের চড় খাওয়ার কোন শখ আমার নেই! কয়েক দিন আগের ঘটনাটা সায়েম রিদির হাত ধরে কিছু একটা বলছিল, যা কোনোভাবে সৌহার্দ্যের চোখে পড়ে যায়। এরপর সৌহার্দ্য তাকে নিজের চেম্বারে ডেকে রীতিমতো থ্রেট দিয়েছে—রিদির সাথে কথা বললে যেন অন্তত এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখা হয়!

সায়েমের এই অদ্ভুত ব্যবহার দেখে পৃথা ও সুমি অবাক হলেও আর কথা বাড়াল না, এমনিতেই ক্লাসের জন্য দেরি হয়ে গেছে। তারা দ্রুত ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়াল।
​ক্লাসে ঢুকেই চারজন এক নতুন মুখ দেখে থমকে গেল। সায়েম কৌতূহলী হয়ে মেয়েটির সাথে পরিচিত হতে এগিয়ে গেল, কিন্তু মেয়েটি বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। রিদি বিরক্তিতে আর পাত্তা না দিয়ে সোজা গিয়ে নিজের সিটে বসল। পৃথা আর সুমি পাশের এক সহপাঠীর কাছ থেকে জানতে পারল, মেয়েটি অন্য এক মেডিকেল কলেজ থেকে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। তার পোশাক-আশাকের ধরন দেখে রিদির অস্বস্তি হলো, সে নাক মুখ কুঁচকে বসে রইল।
​ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাসে প্রবেশ করলেন সৌহার্দ্য। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট; চোখেমুখে এক হিমশীতল গাম্ভীর্য। সে যখন প্রজেক্টরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখনই নতুন মেয়েটি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করল। সে বেশ উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল, “হাই স্যার! আমি সিনিয়র প্রফেসর ডা. এহেসান তালুকদারের মেয়ে, তুলিকা তালুকদার।”
​মেয়েটির অসংলগ্ন পোশাকে কলেজে আসা আর তার ঔদ্ধত্য দেখে সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছালো। সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে গমগমে গলায় বললেন, “সিট ডাউন। এটা হাই-হ্যালো করার জায়গা নয়। পরিচয় জানার প্রয়োজন হলে আমি নিজেই জেনে নেব। এখানে বাবার পরিচয়ের চেয়ে নিজের পরিচয় বেশি জরুরি, প্লিজ মেক দ্যাট।”

​বলেই সে নিজের লেকচারে ফিরে গেল। অপমানিত বোধ করা তুলিকা চুপচাপ বসে পড়ল। সায়েম এটা দেখে হো হো করে হেসে উঠলেও, পরক্ষণেই সৌহার্দ্যের শীতল চোখের দিকে তাকাতেই হাসিটা কোনো রকমে গিলে ফেলল। মনে মনে গজগজ করে বলল, “ সাদা বান্দর! আর কাউকে পাঠাতে চাইতে পারলি না? শেষ পর্যন্ত এই খাটাশটাকেই পাইলি, যে কি না নিজের বউকেও কথা শোনাতে ছাড়ে না!”
​প্রায় ঘণ্টাখানেক ক্লাস নেওয়ার পর সৌহার্দ্য সবাইকে প্রশ্নপত্র বিলি করে দিলো। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “২০ মিনিট সময়, এর মধ্যেই শেষ করতে হবে।”
​ক্লাস জুড়ে নিস্তব্ধতা, সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখছে। হঠাৎ রিদির তলপেটে তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। যন্ত্রণায় রিদির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এমন অস্বস্তিকর মুহূর্তে কী করবে ভেবে সে দিশেহারা হয়ে পড়ল। লজ্জায় আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে সে আড়চোখে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল। সৌহার্দ্য তখন থেকেই রিদির দিকে লক্ষ্য ছিলো। রিদির এমন করুন আর অস্বস্তিকর চাহনি দেখে সৌহার্দ্য স্থির থাকতে পারল না। ধীর পায়ে রিদির সিটের কাছে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এনি প্রবলেম?”

​রিদি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। কি ভাবে বলবে এই সমস্যার কথা, অথচ না বলে উপায়ও নেই। রিদির চোখের কোণে জল আর অস্বস্তি দেখে সৌহার্দ্য পরিস্থিতিটা ঠিকই আঁচ করতে পারল। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রিদির খাতাটা তুলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তুমি আমার চেম্বারে যাও। আমি আসছি।”
​সৌহার্দ্যের কণ্ঠে কোনো বাড়তি কৌতুহল নেই, বরং এক ধরনের অভয় ছিল। রিদি কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করেই দ্রুত ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল। রিদি বেরিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য নিজের ফোনটা বের করে কাউকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল।
​রিদি যখন সৌহার্দ্যের চেম্বারে গিয়ে ঢুকল, তখনই এক নার্স এসে তার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে গেল। নার্স মিষ্টি হেসে বলল, “রিদি ম্যাম, সৌহার্দ্য স্যার এটা আপনাকে দিতে বলেছেন। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন।”

​নার্সের কথা শুনে রিদির বুকের ভেতরটা একটু হালকা হলো। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে সে মৃদু হেসে বলল, “না আপু, আপাতত ঠিক আছে। ধন্যবাদ।”
​নার্স চলে যাওয়ার পর রিদি নিজের কাজ সেরে নিল। কিন্তু মনের ভেতর এক অদ্ভুত লজ্জা কাজ করছে। বিরবির করে বলল, “লোকটা কি অসভ্য? আমি মুখ খোলার আগেই কীভাবে সব বুঝে গেল?” কথাটা ভাবতেই রিদির গাল দুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল।
প্রায় আধ ঘণ্টা পর সৌহার্দ্যে চেম্বারে ঢুকতেই রিদি এক অদ্ভুত সংকোচে আড়ষ্ট হয়ে পড়ল। লজ্জায় যেন ওর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। রিদির এমন জড়োসড়ো অবস্থা দেখে সৌহার্দ্য বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই রিদির মনে হলো পৃথিবীটা যেন এই মুহূর্তেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাক! সৌহার্দ্য শান্ত অথচ কাঠখোট্টা গলায় বলল, “হোয়াটস প্রবলেম? ইটস নরমাল। এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে?”
​রিদি ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল। অসভ্যটা! সব বোঝে, অথচ কেমন করে যেন ইচ্ছে করেই ওকে লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে। রিদির ভেতরের চাপা রাগ বুঝতে না পেরে সৌহার্দ্যই ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “ব্যথা আছে?”
​রিদি কোনো কথা না বলে শুধু একবার মাথা নাড়ল। সৌহার্দ্য ড্রয়ার থেকে একটা ওষুধ বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিল। ওষুধটা খেয়ে রিদি আমতা আমতা করে বলল, “আমার লেখাগুলো তো… সব শেষ হয়নি।”
​সৌহার্দ্য ওর খাতাটা হাতে নিয়ে একবার উল্টেপাল্টে দেখল, তারপর চিন্তিত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন কি লিখতে পারবে?”

​রিদি সম্মতি জানালে সৌহার্দ্য খাতাটা ওর হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়াল, “ঠিক আছে, তুমি লিখে রাখো। আমি রাউন্ড দিয়ে আসছি।” বলেই সে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।
​কিন্তু রিদির পেটের তীব্র মোচড় দেওয়া ব্যথা ওকে কিছুতেই লিখতে দিচ্ছিল না। অস্বস্তিতে ঘামছিল সে, খাতাটা অসম্পূর্ণ রেখেই কোনোমতে গুছিয়ে নিয়ে সৌহার্দ্য ফিরতেই সে খাতাটা এগিয়ে দিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু সৌহার্দ্য বাধা দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল “একটু ওয়েট করো। আমি বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব, একা যেতে হবে না।”

বলেই ​কাউকে ফোন করে বাকি রোগীগুলো দেখার দায়িত্ব দিয়ে সৌহার্দ্য রিদিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। গাড়ির সামনের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুঝে বসে ছিল রিদি। ব্যথায় শরীর যেন ভেঙে আসছিল। ড্রাইভ করতে করতে সৌহার্দ্য বারবার আড়চোখে রিদির ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ গাড়ির ভেতরের স্তব্ধতা ভেঙে সৌহার্দ্যের গম্ভীর স্বর ভেসে এল, “বেশি প্রবলেম হচ্ছে?”
​রিদি মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দিল। সৌহার্দ্য কথা বাড়াল না, কিন্তু গাড়িটা একপাশে থামিয়ে দ্রুত পায়ে নেমে গেল। মিনিটখানেক পর ফিরে এল কিছু ডার্ক চকলেট আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসি নিয়ে ফিরল।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে দেখল, রিদি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে সিটেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২২

​সৌহার্দ্য খুব সাবধানে, যাতে রিদির ঘুম না ভাঙে, ওকে নিজের বাহুবন্ধনে তুলে নিল। পালকের মতো হালকা রিদিকে কোলে নিয়ে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে রিদিকে ওর বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দিয়ে সৌহার্দ্য সোজা চলে গেল ডাইনিংয়ে। কাউকে না পেয়ে নিজেই গরম পানি করে হট ব্যাগে ভরে আবার
​রিদির রুমে ফিরে এসে দেখল, রিদি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সৌহার্দ্য ধীর স্থির হাতে রিদির জামার ওপর দিয়ে হট ব্যাগটা ব্যথার জায়গায় চেপে ধরল, তারপর গায়ে কাঁথাটা টেনে দিল যত্ন করে। নিজের ক্লান্তিতে ওর পাশেই শরীর এলিয়ে দিলো!

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here