Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩১
রিদিতা চৌধুরী

দরজাটা সজোরে বন্ধ হওয়ার শব্দে সৌহার্দ্যের নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা সে শক্ত করে ধরে স্থির দাঁড়িয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে। খালার সেই কঠোর চোখের চাহনি আর রুক্ষ আচরণ তাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে—এই বাড়ির অন্দরমহলে তার প্রবেশাধিকার আপাতত নিষিদ্ধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌহার্দ্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। তার বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে; সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, সবাই মিলে তার সেই সহজ-সরল, ভোলাভালা বউটাকে বিষিয়ে তুলছে, উসকে দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে। রাগে, ক্ষোভে আর তীব্র বিরক্তিতে শরীর কাঁপছে তার। সিঁড়ির রেলিংয়ে সজোরে একটা বাড়ি দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করল, “ছেহ্! বালের একটা বিয়ে করেছি… মনে হচ্ছে বিয়ে না, আজীবন ওয়েটিং লিস্টে নাম লিখিয়েছি!”

​নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে সৌহার্দ্য থমকে দাঁড়াল। করিডোরের অস্পষ্ট আলোয় ফারিস আর সুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। সে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, কিন্তু ওরা যেন সেটা খেয়ালই করল না—উল্টো ঝাপিয়ে এসে সৌহার্দ্যকে জড়িয়ে ধরল। সারাদিনের ক্লান্তি আর খালার আচারণে এমনিতেই সৌহার্দ্যর মেজাজ তুঙ্গে ছিল, তার ওপর এত রাতে ওদের হুটহাট উপস্থিতি তার বিরক্তিকে যেন আরো উসকে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কি চাস তোরা? এত রাতে কোত্থেকে উদয় হয়েছিস?”
​ফারিস সতর্ক হলো। সে বোঝার চেষ্টা করল সৌহার্দ্য তার দেওয়া সেই ‘সিগনেচার’ সংকেতটা ধরতে পেরেছে কি না। যদি ধরে ফেলে, তবে আজ আর রক্ষা নেই! যদিও সৌহার্দ্যর পাথুরে চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই—সে ভালো থাকুক বা মন্দ, সব সময় যেন একটা মুখোশ পরেই থাকে। ফারিস পরিস্থিতির হালকা করার জন্য ঠাট্টার স্বরে বলল, “কিরে ভাই? কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হচ্ছে নাকি? মুখটা ওরকম করে রেখেছিস কেন? আমাদের দেখে খুশি হসনি? কত কষ্ট করে তোকে সারপ্রাইজ দিতে এলাম আর তুই এমন করছিস?”
​সৌহার্দ্য ফারিসের কথার কোনো জবাব দিল না। ফ্ল্যাটের দরজার লকের দিকে মনোনিবেশ করে সে সুজনের দিকে তাকাল। তার ভ্রুর ভাঁজে তখনও বিরক্তি, কিন্তু গলায় কিছুটা নরম সুর। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কোনো সমস্যা?”

​সৌহার্দ্যর মাথা যতই গরম থাকুক, সুজনের চোখমুখের অস্থিরতা সে ঠিকই টের পেল। বাইরের রূঢ়তা আর ভেতরের ভালোবাসার দোলাচলে সৌহার্দ্যর কাছে এই বন্ধুরাই যে তার অর্ধেক পৃথিবী!
সৌহার্দ্যর কথার রেশ কাটতে না কাটতেই সুজন মুখটা আরো মলিন করে ফেলল। সৌহার্দ্যর পিছু পিছু ঘরে ঢুকে সে সোফায় ধপাস করে গা এলিয়ে দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ স্বরে বলল, “পালিয়ে এসেছি, ভাই। বাবা জোর করে বিয়ে দিতে চাইছে—বাবার কোনো এক বন্ধুর মেয়ের সাথে!”
​সৌহার্দ্যর চোখে তখনো বিরক্তির আঁচ। সোফার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গম্ভীর স্বরে বলল, “মেয়েমানুষের মতো পালিয়ে এলি কেন? বিয়ে করতে সমস্যা কী? বয়স হয়েছে, সংসারী হওয়া উচিত।”
​কথাটা শুনে ফারিস যেন বজ্রাহত! সে সৌহার্দ্যর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল; যেন ভূতের মুখে রাম নাম শুনছে। এত বড় একটা কথা সৌহার্দ্যর মতো মানুষের মুখে! নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে ফারিস বলে উঠল, “ভাই, তোর সিস্টেম ঠিক হয়ে গেছে? তোর মুখে এসব কথা?”

​সৌহার্দ্য ফারিসের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “ইডিয়ট!”
​সুজন এখানে এসেছিল একটু শান্তির খোঁজে, কিন্তু এই দুইজনের তর্কাতর্কির বহর দেখে তার বিরক্তি চরমে পৌঁছাল। সে হাত তুলে থামানোর ভঙ্গিতে বলল, “চুপ করবি তোরা? তোদের দুইজনের বিবাহিত জীবন, দেখে আমার বিয়ের মিটে গেছে!” বলেই সুজন সোফায় চোখ বুজে শুয়ে পড়ল।
​ফারিস পাল্টা কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতেই সৌহার্দ্য একটা কুশন সজোরে তার দিকে ছুড়ে দিল। এরপর কোনো কথা না বাড়িয়ে সে নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেল এবং ‘ধপাস’ শব্দে দরজাটা আটকে দিল।
সকালের মিষ্টি রোদ এসে সরাসরি চোখে পড়তেই রিদি বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলল। গত রাতে ঘুমাতে দেরি হওয়ায় আজ শুক্রবারের ছুটির আমেজে একটু বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জানালার পর্দাটা টানা না থাকায় সেই সুযোগ হলো না। গতকাল থেকেই শরীরটা বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে, কাল রাতেও খাবার ছোঁয়নি সে। অতিরিক্ত চটপটি খাওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন; পেটটা কেমন যেন ফুলে আছে, অস্বস্তিতে দম আটকে আসে। রিদি কোনোমতে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। পাশেই পড়ে থাকা মোবাইলটা হাতে নিতেই তার মুখটা বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছাল। সেই একই অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজ—‘মিস ইউ ম্যাডাম? ভুলে গেলেন?’

​রিদি বুঝে উঠতে পারে না, এই মানুষরূপী ভূতটা কোথা থেকে বারবার তার জীবনে উদয় হয়! বিরক্তিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নম্বরটা ব্লক করে সে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। জীবনে এমনিতেই ঝামেলার শেষ নেই, তার ওপর এমন উটকো উপদ্রব!
সকাল নয়টার মিষ্টি রোদ রান্নাঘরের জানলা দিয়ে এসে পড়েছে নাস্তার টেবিলে। রিদি নিস্পৃহ হয়ে বসে আছে প্লেটের দিকে তাকিয়ে। ধোঁয়া ওঠা পরোটা আর ভাজির গন্ধে তার স্বাভাবিক ক্ষিদেটা আজ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। গত কয়েকটা দিন ধরেই তার পেঠ ফাঁপা দিয়ে থাকে—খাওয়ার রুচি নেই, সারাক্ষণ কেমন একটা অবসাদ। তার মধ্যে গতকাল চটপটি, ফুসক, খাওয়ার পর যেন সমস্যা আরো বেশি হচ্ছে!
​রায়েদা শেখ পাশে বসেই রিদির এই নিস্তেজ ভাবটা লক্ষ্য করছিলেন। উদ্বেগের গলায় তিনি বললেন, “কি হলো রিদি, খাচ্ছিস না কেন? রাতেও তো তোকে প্রায় কিছুই খেতে দেখলাম না। শরীরটা কি খুব খারাপ লাগছে? ইদানীং তোকে একদমই ঠিকঠাক খেতে দেখছি না।”

​রিদি কোনো উত্তর দিতে পারল না। খালাকে উদ্বিগ্ন করতে তার ইচ্ছে করছে না, তাই মুখে জোর করে একটা হাসি ফুটিয়ে সে মাথা নাড়ল—অর্থাৎ তেমন কিছু হয়নি। এরপর দ্বিধা নিয়ে প্লেট থেকে এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে সবে মুখে দিতে যাবে, অমনি এক তীব্র বমি ভাব তার গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল। রিদি আর সামলাতে পারল না, নাকে-মুখে হাত চেপে দ্রুত দৌড়ে বেসিনের দিকে ছুটে গেল।
​পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রায়েদা শেখের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। কিছু একটা ভেবে তিনি ধীর পায়ে রিদির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন পরম মমতায় পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে হঠাৎ করেই প্রশ্ন করলেন, “রিদি, পিরিয়ড কবে থেকে মিস?”
​রিদি তখন বমি আর মাথা ঘোরার যন্ত্রণায় দিশেহারা। খালার এই প্রশ্নটা তার ক্লান্ত মস্তিষ্কে খুব একটা গুরুত্ব পেল না। তার পিরিয়ড এমনিতে অনিয়মিত, তাই পাত্তা না দিয়েই সে একটু ভেবে বলল, “হবে ৩ মাসের মতো।”

​কথাটা শোনার পর রায়েদা শেখের হাত যেন স্থবির হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। রিদির উত্তরের সাথে নিজের মনে কি যেন হিসেব মেলাতেই তার সারা মুখ রাগে আর বিস্ময়ে লাল হয়ে উঠল। তিনি কোনো কথা না বলে ঝড়ের বেগে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া তখন বেশ জমজমাট। টিভির পর্দায় চলছে উত্তেজনাকর ম্যাচ, আর সোফায় গা এলিয়ে তা উপভোগ করছে সৌহার্দ্য, ফরিস ও সুজন। হাসিখুশি আড্ডার মাঝে হঠাৎই বেজে উঠল সৌহার্দ্যের ফোনটা। স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই সে অবহেলায় ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকাল।
​ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটা শুনেই সৌহার্দ্যের হাতের মুঠো আলগা হয়ে এল। রায়েদা শেখের সেই চিরচেনা কর্কশ আর রাগে টগবগ করা কণ্ঠ। চিৎকার করে তিনি বলে উঠলেন, “নির্লজ্জ ছেলে! বউ মানিনা মানিনা বলে বলে এমন একটা কাজ করতে লজ্জা করলো না তোমার?”

​সৌহার্দ্য এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। কানে আসা কথাগুলোর মানে তার মগজে ঢুকছে না। সে কি করেছে? এমন কী অপরাধ তার অজ্ঞাতসারে ঘটে গেল? ফরিস আর সুজনের দিকে একবার তাকিয়ে সে বিরক্তি আর দ্বিধায় কুঁকড়ে গেল, কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব শান্ত রেখে বলল, “কি করছি বলা যাবে?”
​রায়েদা শেখ যেন এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়লেন। ওপাশ থেকে গর্জে উঠে বললেন, “নাটক করছো কেন? তোমার বউ প্রেগনেন্ট হলো কিভাবে? বউ মানোনা যে…..”
​কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি, তার আগেই সৌহার্দ্য ঠাস করে ফোনটা কেটে দিল। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেছে,। সোফায় সে একরকম পাথরের মতোই থ হয়ে বসে রইল!
সুজন আর ফারিস এতক্ষণ সৌহার্দ্যের অভিব্যক্তির পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল। হঠাৎ সৌহার্দ্যকে এমন অস্বাভাবিকভাবে থ হয়ে বসে থাকতে দেখে সুজন দ্রুত ওর পাশে গিয়ে বসল। ওর হাতের কব্জি চেপে নাড়ি পরীক্ষা করতেই সুজনের মুখটা বিচলিত হয়ে উঠল। ফারিসের দিকে তাকিয়ে উদ্বেগের সুরে বলল, “ওর পালস খুব দুর্বল! তাড়াতাড়ি ওর রুম থেকে মেডিকেল কিটটা নিয়ে আয়।”

​ফারিসও হতভম্ব। ঠিক কী এমন কথা ফোনে শুনল সৌহার্দ্য যে ওর এই অবস্থা? সে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে মেডিকেল কিট নিয়ে এল। সুজন দ্রুত একটা ওষুধ বের করে সামান্য জল সহযোগে সৌহার্দ্যকে খাইয়ে দিল। কয়েক মুহূর্ত পর সৌহার্দ্য কিছুটা স্বাভাবিক হতেই ফারিস উদ্বিগ্ন হয়ে তোতলামি ভরা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কো… কোনো প্রবলেম সৌহার্দ্য?”
​সৌহার্দ্য মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝাল। তারপর বড় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বলল, “বাবা হচ্ছি!”
​এই কথা শুনে ফারিস আর সুজনের গলায় যেন জল আটকে গেল, দুজনেই একসাথে কাশতে শুরু করল। যে ছেলেটি সারাদিন বলে বেড়াই সে ‘বউ মানে না’, সেই ছেলে বাবা হতে চলেছে—এই অবিশ্বাস্য খবর শুনে তাদের চোখ কপালে ওঠারই কথা। পরিস্থিতি সামলে নিয়ে ফারিস সৌহার্দ্যের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে খোঁচা মেরে বলল, “বউ মানি মানি না বলে এত নাটক করলি, শেষে গোলপোস্ট পর্যন্তই চলে গেলি?”
​সুজনও সাথে সাথে তাল মিলিয়ে নাটকীয় স্বরে বলে উঠল, “মুখে ‘বউ মানি না’… কাজে দেখি ফ্যামিলি প্যাকেজ!”

​সৌহার্দ্যের মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে আছে। একদিকে ভিত্তিহীন অপবাদ, অন্যদিকে বন্ধুদের এই ফাজলামি—সব মিলিয়ে তার মাথা যেন হ্যাং হয়ে আছে। বিরক্তিতে তার নাক-মুখ কুঁচকে গেল। রাগে ওদের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠে ধমক দিল, “চুপ করবি ইডিয়েট!”
​বলেই দুপদাপ পায়ে নিজের রুমের দিকে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। খাটের ওপর ধপাস করে বসে কপালে হাত দিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বিড়বিড় করতে লাগল, “চার বছরে একটা চুমু পর্যন্ত খেতে পারলাম না, বল কিভাবে গোলপোস্টে গেল?”
সকাল গড়িয়ে দুপুর। রিদি আর রিভা সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। টিভির পর্দায় চলছে ‘টম অ্যান্ড জেরি’। রিভা তন্ময় হয়ে কার্টুন দেখছে আর চিপস খাচ্ছে। রিদির এসব দেখতে ভালো লাগছে না, কিন্তু রিভার জেদের কাছে সে অসহায়। জীবন গেলেও রিভা এখন চ্যানেল পাল্টাবে না, তাই অগত্যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রিদিকে ও দেখতে হচ্ছে।
​হঠাৎই রিদির হাতের ফোনটা একটা মৃদু টুং শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সৌহার্দ্যের মেসেজ, সাথে দুটো জ্বলজ্বলে অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট—”স্টুপিড মহিলা! প্রেগনেন্ট হলে কিভাবে?”

​মেসেজটা পড়ে রিদি কাশতে শুরু করল। সে বুঝতে পারছে, তার খালা এই জটিলতার জাল বুনেছেন। কিছুক্ষণ আগেই খালা তাকে একটা প্রেগনেন্সি কিট ধরিয়ে দিয়েছিলেন পরীক্ষা করার জন্য। রিদি যখন বুঝতে পারল খালা কত বড় ভুল বুঝেছেন, সে তখন থেকেই তাকে বুঝিয়ে বলছে। কিন্তু খালা যে সরাসরি এই খবর সৌহার্দ্যের কানে পৌঁছে দেবেন, তা রিদি ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি।
রিদি কিছু একটা ভেবে দুষ্টামি করে ​সৌহার্দ্যের আরও রাগিয়ে দেওয়ার জন্য চটপট টাইপ করে ফেলল, “সবাই যে ভাবে হয়, সে ভাবে হয়ছি অসভ্য ডাক্তার!”
​অনেকক্ষণ কোনো উত্তর নেই। রিদি ভাবল, সৌহার্দ্য হয়তো আর মেসেজ করবে না। ফোনটা পাশে নামিয়ে রাখতে যাবে, এমন সময় আবার টুং শব্দ। মেসেজটা দেখে রিদি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল—

​”হোয়াট ইজ দিস! কোনো প্রসেসিং ছাড়াই ডিরেক্ট আউটপুট? আমি তো এখনো ‘স্টার্ট’ বাটনই চাপলাম না, এদিকে বেবি অলরেডি লোডিং হয়ে বসে আছে!”
মেসেজটা দেখেই রিদির গাল রাগে লাল হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করল, “হার্টলেস লুচ্চা ডাক্তার!”
ফোনটা পাশে নামিয়ে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘হার্টলেস ডাক্তার’-এর নাম। রিংটোনটা যেন তার বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বাড়িয়ে দিল। রিদি কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সৌহার্দ্যের সেই ভারি, গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হঠাৎ এমন মিথ্যা অপবাদের কারণটা বলেন তো ম্যাডাম?”

​সৌহার্দ্যের কণ্ঠস্বরটা আজ যেন একটু অন্যরকম, এক অদ্ভুত মায়া মেশানো গম্ভীরতা যা রিদির হৃদস্পন্দনকে থমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রিদি তোতলাতে তোতলাতে পেট ফাঁপা আর বমি ভাব হওয়ার কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু সৌহার্দ্য তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজের চিরচেনা গম্ভীর গলায় বলল, “উহু, খালামনি। এত ছোট কারণে এত বড় কথা বলবেন না। আসল প্যাঁচটা কোথায় বাজিয়েছ, সেটা বলো?”
​রিদির লজ্জায় শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। সে চুপ করে রইল। রিদিকে নীরব দেখে সৌহার্দ্য একটু ধমকের সুরেই বলল, “রিদিতা, আর ইউ গোয়িং টু সে সামথিং অর নট?”
​সৌহার্দ্যের কণ্ঠে প্রথমবারের মতো নিজের নামটা শুনে রিদি যেন একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন নামটা তার পরিচিত হলেও, আজ সৌহার্দ্যের ঠোঁটে এটি অন্যরকম এক মাদকতা ছড়াচ্ছে! তার ঘোর ভাঙার আগেই সৌহার্দ্য আবার তাগাদা দিল। রিদি কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল, “থ্রি মান্থ পিরিয়ড মিসিং!”
​রিদির কথা শুনে সৌহার্দ্য যেন পাথরের মতো জমে গেল। একজন মানুষ কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হলে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারে, সেটা ভেবে তার রাগ আর বিরক্তি যেন এক বিন্দুতে মিলল। সৌহার্দ্য রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত অথচ কঠোর গলায় বলল, “ডক্টরের কাছে যেতে হবে। দ্রুত রেডি হয়ে নিচে আসো, আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউ।”

রিদি ভাবল, না গিয়ে উপায় নেই। এটা সত্যিই কোনো সাধারণ বিষয় নয়; প্রায়ই এমনটা হয়, গতবার ও ডাক্তার দেখিয়ে অবহেলায় ডাক্তারের পরামর্শ আর টেস্টগুলো কখনোই গুরুত্ব দিয়ে করা হয়নি। রিদি চটজলদি তৈরি হয়ে নিচে নেমে আসতে দেখল, বাড়ির বাইরে সৌহার্দ্য গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কড়া রোদে তার ফর্সা মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে, চোখের দৃষ্টিতে একরাশ বিরক্তি আর উদ্বেগ। রিদিকে দেখেই সে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে ফোনের দিকে মনোযোগ সরিয়ে পকেটে হাত ঢোকাল। গাড়ির দরজা খুলে দিলে রিদি ভেতরে গিয়ে বসতে, গাড়ি স্টার্ট দিলো! পুরো পথটা অদ্ভুত এক নীরবতায় কাটল, সৌহার্দ্য কোনো বাক্য ব্যয় করল না,
প্রায় ঘন্টা খানেক হলো ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে সৌহার্দ্য রিদি , ডাক্তারের একটা ইমারজেন্সি অপারেশন থাকার কারনে লেট হচ্ছে , দীর্ঘক্ষণ পর দরজা টেলে প্রবেশ করলো মহিলা গাইনি বিশেষজ্ঞ, রাবেয়া খান, সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, সরি মাই বয় ,অনেকক্ষণ ওয়েট করালাম!
সৌহার্দ্য হালকা হেসে বলল, নো প্রবলেম ম্যাম!

তারপর রিদির তোয়াক্কা না করেই ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে ওর সমস্যা গুলো অবলীলায় বলে দিচ্ছে, এদিকে রিদি লজ্জায় লাল হয়ে আছে! এই লোক তাকে একটা কথাও বলতে দিচ্ছে না! রাবেয়া খান সৌহার্দ্য মুখ থেকে সব শুনে রিদিকে কিছু প্রশ্ন করে চেকআপ করে কিছু পরিক্ষা লিখে দিলো!সৌহার্দ্য সব টেস্ট গুলো করিয়ে রিদিকে বায়েদা শেখ এর বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল!
দুপুর প্রায় তিনটা। ছাদের আলস্যমাখা দুপুরে রিদি গোসল সেরে ভেজা চুলগুলো নিয়ে কাপড় শুকাতে এসেছে। পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার ঘন ভেজা চুল, মুখের ওপর কয়েকটা অবাধ্য লতানো চুল লেগে আছে, আর সদ্য ধোয়া স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে জলের বিন্দুগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। রিদি আপনমনে গুনগুন করে গান গাইছে আর কাপড় মেলছে, নিজের চারপাশ নিয়ে সে সম্পূর্ণ উদাসীন।
​ঠিক তখনই সৌহার্দ্য এক কাপ কফি নিয়ে ছাদে পা রাখল। সবেমাত্র কফিতে একটা চুমুক দিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার দৃষ্টি পড়ল রিদির দিকে। দৃশ্যটা এতটাই অনাকাঙ্ক্ষিত আর মায়াবী ছিল যে, সৌহার্দ্যের বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি যেন এক নিমেষে থমকে গেল। গিলে ফেলা কফিটা গলায় আটকে গিয়ে সে তীব্র বিষম খেল, কাশতে কাশতে তার নাজেহাল অবস্থা।

​ওপাশের ছাদ থেকে রিদি দ্রুত রেলিংয়ের কাছে এগিয়ে এল। সৌহার্দ্যের এমন করুণ অবস্থা দেখে সে উদ্বেগ চেপে রাখতে পারল না, উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠল, “কি হলো আপনার? মাথায় চাপড় মারুন!”
​রিদি কী বলছে, সেদিকে সৌহার্দ্যের কোনো হুঁশ নেই। তার চোখের পলক পড়ছে না, একদৃষ্টিতে সে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে। কপালের কাছে চিকন ঘামের রেখা ফুটে উঠেছে, বুকের ভেতরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো তোলপাড় করছে। সবটুকু আত্মসংযম হারিয়ে সৌহার্দ্য চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিল এবং নিজেকেই নিজে শাসিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “কন্ট্রোল সৌহার্দ্য, কন্ট্রোল!”
​সৌহার্দ্যের এই অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর আচরণ রিদির মোটেও ভালো লাগল না। সে বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “অসভ্য ডাক্তার, মা…”
​রিদি পুরো কথাটি শেষ করার আগেই সৌহার্দ্য তার গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে উঠল, “স্টুপিড! গেট আউট অফ দ্য রুফ।”

​রিদি অবাক হয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে একচোট ভেংচি কাটল। রাগে গজগজ করতে করতে নিচে নামার সময় সে বিরবির করে বলল, “ অসভ্য লোক! জীবনেও ভালো হবে না! ছাদটা যেন ওনার দাদার!”
​রিদির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্য চোখ বন্ধ করে হাতের মুঠো শক্ত করে খিচে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “উফ সৌহার্দ্য! কবে থেকে তুই এত কন্ট্রোললেস হয়ে গেলি? এই দেড় ব্যাটারির জীবনটা তো পুরো শেষ করে দিল!”
ছাদ থেকে নামতে সবে পা বাড়িয়েছে সৌহার্দ্য, ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ‘ডাঃ রাবেয়া খান’-এর নাম দেখে সে কিছুটা অবাক হলো। ভ্রু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ওনার কিছুটা আচ্ছন্ন ও হতাশা ভরা কণ্ঠস্বর, “সৌহার্দ্য, তোমার স্ত্রীর আল্ট্রা রিপোর্টটা এইমাত্র হাতে পেলাম।”
​সৌহার্দ্যর পেশাদার সত্তা মুহূর্তেই সজাগ হয়ে উঠল। সে কিছুটা বিচলিত গলায় প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে ম্যাম? কোনো জটিলতা?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩০

​ডাঃ রাবেয়া খান কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে বললেন, “আসলে রিপোর্টটা দেখে যা বুঝছি, তাতে তোমার স্ত্রীর বেশ বড় ধরনের একটা সমস্যা আছে। পুরো ফাইলটা না দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন, তুমি কাল একবার আমার চেম্বারে এসো!
​ওনার প্রতিটি শব্দ সৌহার্দ্যর মাথায় যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করল। তবুও নিজেকে শান্ত রেখে বলল, ওকে ম্যাম!

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here