Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩২

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩২

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩২
রিদিতা চৌধুরী

ছাদের ওই মুহূর্তটুকু শেষ হওয়ার পর থেকেই সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা যেন একটা অজানা ঝড়ে তোলপাড় করছে। রিদির সেই ভিজে চুল, জলের বিন্দু লেগে থাকা স্নিগ্ধ মুখশ্রী—সবটাই তার চোখের ওপর একটা অস্পষ্ট ছায়া হয়ে লেগে আছে। অথচ নিজের ভেতরে জমে থাকা এই তীব্র আবেগকে আড়াল করতে সে বারবার নিজেকে কঠোর করে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
​নিচে ড্রয়িংরুমে আসতেই ফারিস আর সুজনের অট্টহাসি তার কানে এল। কিন্তু সেই হাসি এখন তার কাছে বড় বেশি বেমানান মনে হচ্ছে। সোফায় এসে বসতেই ফারিস তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল, “কিরে, তোকে ভীষণ অস্থির লাগছে! কোনো সমস্যা?”

সৌহার্দ্য কোনো প্রতিউত্তর না করে শুধু মাথা দুলিয়ে ‘না’ বুঝাল। তবে তার ভেতরে এক তীব্র দোটানা—ডাক্তারের কথাগুলো পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত যেমন টেনশন কাজ করছে, তেমনি বউটাকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতেও তার মন সায় দিচ্ছে না। অগত্যা নিজেকে সামলে নিয়ে সৌহার্দ্য ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল, “কাল চলে যাবি?”
​ফারিস টিভির দিকে চোখ রেখেই বলল, “দুই দিন পর এখানে একটা মিটিং আছে, সেটা সেরে যাবো? কেন জানতে চাচ্ছিস?”
​সৌহার্দ্য সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দুই এক দিনের মধ্য ঢাকা যেতে হবে কয়েকটা ওটি আছে! কিছু ইমার্জেন্সি রোগীও আছে।”
​এরপর সৌহার্দ্য আর কোনো কথা বাড়াল না। ফারিস আর সুজনকে থাকতে বলে দ্রুত শার্টটা বদলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত প্রায় ৯টা। চৌধুরী বাড়ির রান্নাঘরে পৃথা আর সাথী—দুই জা মিলে রাতের রান্নায় ব্যস্ত। কাজের ফাঁকে পৃথার মনটা বড্ড বিষণ্ণ হয়ে আছে। রিদি থাকলে কত সুন্দর আড্ডা হতো, অথচ আজ কতদিন সে একা একা কাটায়! সাথী বাচ্চাদের সামলাতে ব্যস্ত থাকে, আর আরবান? সে তো বেশির ভাগ সময় হাসপাতালেই পড়ে থাকে। আরবান আর পৃথার সম্পর্কটা আজকাল বেশ অন্যরকম একটা মোড় নিয়েছে। দূরত্ব পুরোপুরি না মিটলেও, আরবান এখন পৃথার অনেক খেয়াল রাখে। সম্পর্কের এই নতুন সমীকরণটা পৃথাকে অদ্ভুত এক আবেশে ঘিরে রাখে।
​হঠাৎ রান্নাঘরে আরবানকে দেখে পৃথা কিছুটা চমকে গেল। আরবান পৃথার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“এক কাপ কফি নিয়ে এসো প্লিজ!”
​সাথীর সামনে আরবানের এমন হঠাৎ আবদারে পৃথা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, গাল দুটো রাঙা হয়ে উঠল তার। তবে মাথা নেড়ে সায় দিতে ভুলল না। সাথী ওদিকে মুচকি মুচকি হাসছে, আরবানকেও ভাবীর হাসিতে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। একটা গলা খাঁকারি দিয়ে সে দ্রুত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
​আরবান চলে যেতেই সাথী পৃথাকে আলতো খোঁচা দিয়ে বলল, “বাহ্, যাও যাও স্বামীর সেবা করে এসো, বেচারা দেখছি আজকাল বউ ছাড়া কিছু বুঝছে না!”
​লজ্জায় পৃথার গাল দুটো যেন আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল, এই মানুষটাকে কিছু বলে লাভ নেই। বাড়িতে থাকলে সারাদিন একেকবার একেক বাহানায় ওকে ডাকবেই। ওদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে,তাদের বিয়েটা পরিস্থিতির চাপ জোর করেই হয়েছিল। লজ্জাটুকু চেপে পৃথা কফি বানিয়ে আরবানের রুমের দিকে পা বাড়াল।

​রুমে প্রবেশ করতেই আরবান তার হাত থেকে কফির মগটা নিয়ে নিল। তারপর পৃথার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কিছুটা ইতস্তত বোধ করে বলল, “তুমি চাইলে কিন্তু এই রুমে থাকতে পারো?”
​পৃথা এখনো রিদির রুমটাতেই থাকে। আরবান সেদিনই বলেছিল, কিন্তু লজ্জায় পৃথা আসতে পারেনি। একটা পুরুষের সাথে একই রুমে থাকা—বিষয়টা ভাবতেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। পৃথা মাটির দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে নিচু স্বরে বলল, “আমার একটু সময় লাগবে!”
​আরবানের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা রুক্ষ স্বরেই বলল, “আমি তোমাকে বাসর করার অফার দিই নাই যে এত লজ্জা পাচ্ছ? আর আমাদের প্রয়োজন না—একজন আরেকজনকে বোঝার জন্য একটু কাছাকাছি থাকা!”
​পৃথাকে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরবান মুহূর্তের মধ্যে একহাতে হেঁচকা টানে তাকে নিজের কাছে নিয়ে এল। তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিসে কণ্ঠে বলল, “কি করলে এই লাজুক লতার লজ্জা ভাঙবে হুম?”

​জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের এত কাছাকাছি আসা! অস্বস্তিতে আর লজ্জায় পৃথার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। ভালো না খারাপ, তা বোঝার মতো শক্তিও যেন নেই তার; মনে হচ্ছিল এখনই সে জ্ঞান হারাবে। মিনমিন করে পৃথা বলল, “থা.. থাকব এই রুমে, প্লিজ ছাড়ুন!”
​আরবান তার অস্বস্তিটা বুঝতে পারল। আলতো করে তাকে ছেড়ে দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “খাওয়া-দাওয়া শেষে আমি তোমাকে এই রুমে চাই!”
​কথাটা বলেই সে বারান্দার দিকে পা বাড়াল। পেছনে পৃথা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনি তখনও থামেনি, আর লজ্জায় তার গাল দুটো যেন এখনও ধিকিধিকি জ্বলছে।
রাত তখন প্রায় বারোটা। পড়ার ক্লান্তি শেষে রিদি সবেমাত্র বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে, ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে সৌহার্দ্যের নাম ভেসে উঠতেই রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে সৌহার্দ্যের সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ওষুধ খেয়েছ?”

​রাত আটটার দিকেই সৌহার্দ্য দারোয়ানের মাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নতুন কিছু ওষুধ পাঠিয়েছে। রিদি কিছুটা দ্বিধা আর মিনমিনে স্বরে উত্তর দিল, “হুম খেয়েছি, কিন্তু ডাক্তার কি বলল, বললেন না তো?”
​সৌহার্দ্যের কণ্ঠে যেন হঠাৎ করেই বিরক্তির পাহাড় জমল। কিছুটা উষ্মা নিয়ে সে বলে উঠল, “ডাক্তার কি বলছে সেটা জেনে এখন কি করবে? একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে তোমার উচিত ছিল না নিজের ব্যাপারে একটু সচেতন হওয়া?”
​সৌহার্দ্যের এমন অপ্রত্যাশিত রাগে রিদি ভয়ে কুঁকড়ে গেল। আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় জানতে চাইল, “কোন সমস্যা হয়েছে? বলুন না ডাক্তার সাহেব?”
​রিদির ভয় পাওয়া কণ্ঠস্বর শুনে সৌহার্দ্যের রাগ মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। কণ্ঠে একরাশ প্রশান্তি আর স্নিগ্ধতা মিশিয়ে সে শান্ত স্বরে বলল, “সমস্যা আছে, তবে খুব বেশি জটিল না। ওষুধগুলো নিয়মিত খাও, ঠিক হয়ে যাবে।”

​এরপর দুজনেই চুপ। ফোনের লাইনে অস্ফুট নিস্তব্ধতা, অথচ কেউ ফোনটা কাটছে না। মাঝখানের এই নীরবতা যেন অনেকটা না বলা কথার ভিড়। হঠাৎ সেই স্তব্ধতা ভেঙে সৌহার্দ্য খুব ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো, “আই ওয়ান্ট টু সি ইউ… ক্যান ইউ কাম টু দ্য রুফ, প্লিজ সুইট হার্ট?”
​রিদি নির্বাক হয়ে রইল। গলায় কোনো শব্দ যেন দলা পাকিয়ে আটকে আছে। সৌহার্দ্যের কণ্ঠে এখন এক অদ্ভুত আকুতি। মুহূর্তের নীরবতা ভেঙে সে আবার আগের চেয়েও ব্যাকুল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “প্লিজ লক্ষ্মীটি, আসবে?”
​রিদির মনের ভেতর তখন আবেগের এক তীব্র লড়াই চলছে। সৌহার্দ্যের ডাকে সাড়া দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে তাড়িত করছে, তবুও নিজেকে কঠোরভাবে সামলে নিয়ে সে বলল, “এত রাতে ছাদে গেলে খালমনি বকা দিবে!”

​কথাটা বলেই রিদি হাতের ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওপাশ থেকে সৌহার্দ্য আর কোনো প্রতিউত্তর না, করে ফোনটা কেটে দিল। ফোনের ওপাশে তখন ডেড সাইলেন্স। রিদির দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার। জীবনটা কেন এত জটিল? এত তিক্ত একটা জীবন নিয়ে যখন পৃথিবীতেই আসতে হলো, তবে বিধাতা একটু সুখের ছোঁয়া দিলে কি খুব ক্ষতি হতো?
সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার পথে। শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালের চেম্বারে রোগী দেখায় ব্যস্ত সৌহার্দ্য। সৌহার্দ্য চট্টগ্রামে এসেছে শুনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সপ্তাহে একদিন বসার জন্য অনেক অনুরোধ করে চুক্তিবদ্ধ করেছে। তবে সে নিজের সুবিধামতো সময় বেছে নিয়ে শর্ত দিয়ে দিয়েছে—১০ থেকে ১৫ জনের বেশি রোগী দেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, তার সময়ের সিংহভাগ জুড়ে থাকে হার্ট ফাউন্ডেশন।
​রোগী দেখার ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ তার মোবাইলে রিদির কল। স্ক্রিনে নম্বরটা ভেসে উঠতেই সৌহার্দ্যের কপালে ভাঁজ পড়ল। রিদি সাধারণত নিজে থেকে ফোন করে না। সৌহার্দ্যের মনে মুহূর্তেই আশঙ্কার মেঘ জমল। সে দ্রুত ফোনটি রিসিভ করে, অপর প্রান্তের কিছু শোনার আগেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড, হার্ট? কোন সমস্যা হয়েছে?”
​সৌহার্দ্যের এই আকস্মিক ব্যাকুলতা দেখে রিদি থমকে গেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে মিনমিনে ভীত কণ্ঠে বলল, “আপনি কোথায় আছেন, ডাক্তার সাহেব? দুই নাম্বার গেটে মারামারি হচ্ছে, আমার ভীষণ ভয় করছে। আমাকে একটু নিয়ে যাবেন প্লিজ?”

​সৌহার্দ্য কোনো দিকে না তাকিয়েই দ্রুত চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল, “কাম ডাউন, জান। আমি আশে পাশের আছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি, একদম ভয় পেও না। প্লিজ লক্ষ্মীটি আমার, কোনো একটা সেফ জায়গায় থাকো, ওকে?” বলেই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল, ফোনটা ওভাবে লাইনে রেখে একটু পর পর রিদিকে সাহস দিচ্ছে!
​দুই নম্বর গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সৌহার্দ্য বুঝে গেল পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত—রাজনৈতিক কোনো ঝামেলা চলছে। গাড়ি থেকে নেমেই সে দ্রুত ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। দেখল, একটা দোকানের কোণে রিদি ভয়ে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সৌহার্দ্য দ্রুত রিদির কাছে পৌঁছে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে গমগমে কণ্ঠে অভয় দিয়ে বলল, “ডোন্ট প্যানিক, মাই হার্ট! আই অ্যাম হিয়ার!”
​তড়িঘড়ি করে রিদিকে নিয়ে ঝামেলাপূর্ণ এলাকা পার হয়ে সে নিজের গাড়ির কাছে চলে এল। এখনো রিদির বুক কাঁপছে আতঙ্কে, অনেক ভয় পেয়ে গেছে মেয়েটা, ঢাকায় চৌধুরী ম্যানশন থেকে কলেজ বেশি দূরে না হওয়ায় এসব জামেলায় কখনো পড়তে হয়নি। সৌহার্দ্য তাকে গাড়িতে বসিয়ে এসির তাপমাত্রা কমিয়ে দিল।
রিদির দিকে এগিয়ে আলতো করে রিদির মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় তুলে নিয়ে নরম স্বরে বলল, “এত ভয় পাচ্ছ কেন, আমার ভবিষ্যৎ ডাক্তার ম্যাডাম?”

​সৌহার্দ্যের আদুরে স্পর্শে রিদির ভেতরটা একটু শান্ত হলো। সে দুহাতে শক্ত করে সৌহার্দ্যকে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের মাঝে মুখ ডুবিয়ে নাক টানতে টানতে অভিযোগের সুরে বলল, “আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম, হার্টলেস ডাক্তার!”
​সৌহার্দ্যের ভীষণ হাসি পেল। তার বউ এখন তার হার্টের গভীরে ঢুকে তাকেই বলছে ‘হার্টলেস ডাক্তার’! সে আলতো হেসে রিদিকে শান্ত করে বলল, “ওকে, এখন শান্ত হও। তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়েই আমাকে আবার ফিরতে হবে।”
​বলেই সে রিদিকে ঠিকমতো বসিয়ে সিটবেল্ট পরিয়ে দিল, তারপর নিজে সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল।
বিকেলের ম্লান আলোয় ছাদের কার্নিশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে ফারিস। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে রায়েদা শেখের বাড়ির ছাদের দিকে। গত কয়েক দিন ধরে সে মরিয়া হয়ে মেয়েটার দেখা পাওয়ার চেষ্টা করছে, অথচ প্রতিবারই যেন নিপুণ কৌশলে সে আড়ালে চলে যায়।
​দীর্ঘদিন দেখা না পাওয়ার হতাশায় ফারিসের মনটা বিষিয়ে আছে। কালই তাকে ঢাকা ফিরতে হবে। রাগে আর অভিমানে গজগজ করতে করতে সে বিড়বিড় করে উঠল, “শশুরের বেয়াদব মেয়ে! তোকে একবার হাতের কাছে পাই, তখন এক হালি বাচ্চা ধরিয়ে না দিলে আমার নাম ফারিস খন্দকার নয়!”
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৌহার্দ্য ফারিসের এই
ছেলেমানুষি বিরক্তি নিয়ে শুনছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শীতল কণ্ঠে বলল, “স্টুপিড সব চিন্তা বাদ দিয়ে সম্পর্কটা কিভাবে ঠিক করবি, সেটা ভাব।”

​ফারিস কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ছাদের দরজায় রায়েদা শেখের আবির্ভাব। তাকে দেখেই সৌহার্দ্যর সিগারেটের ধোঁয়া যেন থমকে গেল। সৌহার্দ্য দ্রুত হাত থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটি ফেলে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রায়েদা শেখ এগিয়ে এসে সরাসরি সৌহার্দ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হাতে ওটা কী?”
​সৌহার্দ্যর চেহারা মুহূর্তেই পাথরের মতো গম্ভীর হয়ে গেল। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কিছু না, খালামনি।”
​রায়েদা শেখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকে মেপে নিলেন। এরপর স্বাভাবিক স্বরেই বললেন, “রিদির পরীক্ষার খুব বেশি বাকি নেই। হাতে সময় থাকলে ওকে কি একটু পড়াতে পারবে?”
​সৌহার্দ্যর ভ্রু জোড়া কুঁচকে উঠল। চোখেমুখে বিরক্তি ঝরিয়ে সে প্রশ্ন করল, “ওটাকে পড়ালে আমি কী পাব?”
​রায়েদা শেখ যেন আকাশ থেকে পড়লেন। কিছুটা বিস্ময় আর বিরক্তিতে বললেন, আশ্চর্য তোমার বউকে তুমি পড়াবে? আমি তোমাকে কি দিবে?
​সৌহার্দ্যর কণ্ঠস্বর এবার আরও শীতল হলো। সে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওটা এখন আর আমার বউ না। আমার বউ হলে সে আমার কাছেই থাকত। যেহেতু তোমার কাছেই আটকে রেখেছ, তখন সে তোমারই মেয়ে।”
​রায়েদা শেখ মেজাজ হারিয়ে ফেললেন। অধৈর্য হয়ে বললেন, “নাটক বন্ধ করো! সরাসরি বলো, কী চাই তোমার?”

​সৌহার্দ্য এক চুলও নড়ল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, “বেশি কিছু না। আমার জন্য রান্না করে দেবে, ঘর গুছিয়ে রাখবে। আর মাঝেমধ্যে টিপস হিসেবে কয়েকটা চুমু খাবে। চাইলে রা…”
​কথা শেষ করতে পারল না সৌহার্দ্য। রায়েদা শেখের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন,
“নির্লজ্জ, বেয়াদব ছেলে! তুমি আমার ঝাড়ু-পেটা খাবে! তোমাকে পড়াতে হবে না, আমার পাশের বাসার নাদিমকে বলব ওকে পড়াতে; ছেলেটা সুন্দর, পড়াও ভালো বোঝায়।”
​‘নাদিম’ নামটা কানে আসতেই সৌহার্দ্যর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। রাগে তার মুখটা লাল হয়ে উঠল, মনে হলো যেন চোখের কোণ দিয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল, “আসছি আমি, আমার বউ আমি পড়াবো! আর ওই পাশের বাসা কালকের মধ্যে বিদায় করবে, না হলে তোমার এত শখের বাড়ি থাকবে না!”
​কথাগুলো শেষ করেই সে কোনোদিকে না তাকিয়ে ঝড়ের গতিতে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল।
​ফারিস এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই খালা-বোনপোর কথার লড়াই দেখছিল। একে অপরের প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া তিরের মতো কথাগুলো তাকে অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ রায়েদা শেখের তীক্ষ্ণ ও ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর তার ভাবনার জগত চুরমার করে দিল। ফারিসের দিকে তাকিয়ে রায়েদা শেখ ধমকের সুরে বললেন, “তুমি আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

​ফারিস কিছুটা থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বলল, “তো কী করব, ফুফি? তুমি এমন একটা বেয়াদব পয়দা করেছ যে, সে আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে! দেশের মানুষ যদি এটা জানে, তবে আমার ইজ্জত কি আর থাকবে?”
​ফারিসের কথায় রায়েদা শেখের রাগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। গর্জে উঠে তিনি বললেন, “সব কটা বেয়াদব! আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ!”
​বলেই তিনি রাগে গজগজ করতে করতে ছাদ থেকে নেমে গেলেন। তার পিছু পিছু সেই ক্ষোভ আর আক্ষেপের রেশ থেকে গেল বাতাসে। আসলেই, তার ভাই-বোনদের কারোরই একটা ছেলেও তার মনের মতো হলো না! আর কপাল দেখো, এই বেয়াদব দুটো ছেলের দখলেই কিনা পড়ল তার অতীব সভ্য আর শান্ত স্বভাবের মেয়ে দুটো!
রাত প্রায় ১১টা। হাসপাতালের ব্যস্ততা আর ক্লান্তি শেষে সৌহার্দ্য সোজা এসে দাঁড়াল রায়েদা শেখের বাসার সামনে। উদ্দেশ্য—রিদিকে পড়ানো। কয়েকবার কলিংবেল বাজানোর পর দরজা খুলল রিদি। দরজার ওপাশে এলোমেলো চুল, শরীরজুড়ে ক্লান্তির ছাপ, ঘামে ভেজা বিধ্বস্ত এক সৌহার্দ্যকে দেখে রিদি কিছুটা থমকে গেল। সৌহার্দ্য কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই ক্লান্ত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোমার রুম কোনটা?”

​রিদি হকচকিয়ে গেল। রাতবিরাতে হঠাৎ এমন প্রশ্নে সে আমতা আমতা করে জানতে চাইল, “আমার রুম দিয়ে আপনি…?”
​কথাটা শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে সে ধমকের স্বরে বলল, “স্টুপিড মহিলা! কথা না বাড়িয়ে রুম কোনটা সেটা বলো।”
রিদির ভেতরটা রাগে ফুঁসে উঠলেও পরিস্থিতি বুঝে সে চুপ করে রইল এবং হাতের ইশারায় নিজের রুমটা দেখিয়ে দিল। রুমের দিকে যেতে যেতে সৌহার্দ্য পেছন ফিরে আবার বলল, “একগ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এসো।”
​রিদি এক গ্লাস শরবত বানিয়ে যখন রুমে ঢুকল, দেখল সৌহার্দ্য খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে বসে আছে। তার চোখ দুটো যেন আবেশে বুজে আসছে। শরবতটা এগিয়ে দিতেই সৌহার্দ্য কোনোদিকে না তাকিয়েই গম্ভীর স্বরে বলল, “যে সাবজেক্টগুলোতে সমস্যা হচ্ছে সেগুলো বের করো। আর শোনো, কাল থেকে তিনটার দিকে আমার বাসায় গিয়ে পড়বে, ওই সময়টা আমি ফ্রি থাকার চেষ্টা করব। ওকে?”
​রিদি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে নিজের বইগুলো নিয়ে সৌহার্দ্যর পাশে বসল। পড়ার মাঝখানে হঠাৎ ‘অ্যানাটমি’র ‘আপার লিম্ব’ টপিক গুলো বোঝাতে গিয়ে সৌহার্দ্যর হাত বারবার রিদির শরীরে স্পর্শ করে বোঝাচ্ছিল। ব্যাপারটা কাকতালীয় কি না তা বোঝার আগেই সৌহার্দ্যর ছোঁয়া দীর্ঘ হতে লাগল। বিরক্ত হয়ে রিদি হাত সরিয়ে দিয়ে ঝংকার দিয়ে উঠল, “লুচ্চা ডাক্তার, গায়ের ওপর হাত দিচ্ছেন কেন? আমি এমনিতে বুঝতে পারছি!”

​সৌহার্দ্য ধীরগতিতে রিদির দিকে ফিরল। তার চোখে অদ্ভুত এক নেশাতুর দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর ফিসফিসানি হয়ে এল, “প্র্যাকটিক্যালি বোঝালে দ্রুত মাথায় ঢুকবে, জান।”
​রিদির আপাদমস্তক রাগে জ্বলে উঠল। “ছিঃ! আমি আপনার কাছে আর পড়ব না। অসভ্য, লুচ্চা ডাক্তার! সরুন এখান থেকে!
বলেই রিদি উঠে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু সৌহার্দ্য বিদ্যুতগতিতে রিদির হাত টেনে তাকে বিছানায় ফেলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে রিদি তার শরীরের নিচে বন্দি। সৌহার্দ্য ঝুঁকে এসে রিদির কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল, হার্ট… আই ক্যান্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ এনিমোর… জাস্ট ওয়ান কিস, প্লিজ?
​সৌহার্দ্যর শরীরের উষ্ণতা আর তার তীব্র ঘ্রাণে রিদির সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। নিঃশ্বাস যেন আটকে আসছে তার। তবুও নিজেকে সামলে সৌহার্দ্যর বুকে দুহাত রেখে সে ফুঁসে উঠল, “লুচ্চা ডাক্তার! বউ মানেন না আমার নাটক করছেন? আপনার এই কন্ট্রোলের খেতায় আগুন !” বলে রিদি রাগের মাথায় সে সৌহার্দ্যর বুকের ওপর দাঁত বসিয়ে দিল।
​ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল সৌহার্দ্যর। দাঁতে দাঁত চেপে সে হিসহিসিয়ে উঠল, “স্টুপিড জংগি বিড়াল! তোমার এই ইঁদুরের দাঁতগুলো আমি উপড়ে ফেলব!”

​ বলেই রিদির উপর থেকে উঠে ঘরে থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও দরজার কাছে এসে আবার থামল। ঘুরে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “মনে থাকে যেন, কাল তিনটায় আমার বাসায় যাবে!”
​রিদি উল্টো আরো দ্বিগুণ রাগে ফুঁসে বলল, “আপনার বাসায় তো যাবো ও না! এখানে এসব করছেন, ওখানে নিয়ে গিয়ে কী করবেন?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩১

​সৌহার্দ্য আগুনের মতো দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে বলল, “স্টুপিড আমার বাসায় নিয়ে তোমাকে থালা-বাসন মাজাবো! এর বেশি তোমার দ্বারা সম্ভব নয়!” বলেই সে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
​রিদি তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা বিদ্রূপাত্মক ভেংচি কাটল। বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল, “বেটা হাওয়াইয়া! বউ মানিস না, আবার আসিস কন্ট্রোল হারাতে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here