অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৭
রিদিতা চৌধুরী
পুরো ড্রয়িংরুমে মুহূর্তের মধ্যে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল। সোহানা বেগমের যে কণ্ঠস্বরটি এতোক্ষণ বিদ্রূপে মুখরিত ছিল, তা যেন নিমেষেই জমে বরফ হয়ে গেল। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল এক অজানা আতঙ্কে। সবাই হতবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য—পরনে কালো রঙের একটি ফরমাল শার্ট, হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখের ওপর হালকা ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চাহনিতে এক তীব্র আগ্নেয়গিরির তেজ। তার উপস্থিতি যেন ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে দিল।
সৌহার্দ্য কারোর দিকে না তাকিয়েই সরাসরি এগিয়ে সোহানা বেগমের সামনের সোফায় গিয়ে বসল। পায়ের ওপর পা তুলে, বড্ড অবহেলায় যেন গোটা পরিস্থিতিটাকে তুচ্ছজ্ঞান করছে সে।
সোহানা বেগমের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে অত্যন্ত শান্ত অথচ ধারালো গলায় বলল, “কী যেন বলছিলেন? ‘সে ইট ইন ফ্রন্ট অফ মি’? বলুন, এখন তো সামনেই আছি।”
সোহানা বেগম ভয়ে শুকনো ঢোক গিললেন। এই ছেলেটার রাগের ধরণ তাঁর অজানা নয়। অতীতে নিজের ছেলের সঙ্গে সামান্য বল নিয়ে ঝগড়া হওয়ার পর যে ভয়াবহ পরিণতির সাক্ষী তিনি হয়েছিলেন, তা আজও তাঁর মেরুদণ্ডে শিহরণ জাগায়। আর ভাষার ধার? সেটা তো আরও ভয়ঙ্কর। তিনি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে তোতলামি করে বললেন, “ন-না তো বাবা, আমি কী বলব? তুমি বোধহয় ভুল শুনছো!”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর চোয়াল শক্ত করে, বজ্রের মতো গর্জে উঠা কণ্ঠে বলল, “হোয়াট আর ইউ ট্রাইং টু সে? দ্যাট আই কান্ট হেয়ার প্রপারলি?”
মহিলা ভয়ে কাঁপছেন। অসহায় চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, যদি কেউ তাঁর হয়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করে। কিন্তু সবাই পাথরের মূর্তির মতো নির্বাক। আরবান ঠোঁট টিপে মুচকি হাসছে। সে ভালোভাবেই চেনে তার এই খালাকে। আজ ঠিক সময়ে সৌহার্দ্য না এলে হয়তো তারা প্রতিবাদ করতো। যেখানে সৌহার্দ্য আছে, সেখানে অন্য কারো কিছু বলার প্রয়োজনই পড়ে না।
এদিকে রিদি সুযোগ বুঝে ঘোমটা টেনে কোনোমতে ঘর থেকে সরে যেতে চাইল। কিন্তু তার আগেই সৌহার্দ্যের ঘর কাঁপানো গম্ভীর ধমক আছড়ে পড়ল তার পিঠের ওপর—
“ইউ, ঘোমটাওলি মিসেস হাফ-ব্যাটারি! ডোন্ট ইউ ডেয়ার মুভ ফ্রম দেয়ার।”
কথাটা শেষ করেই সৌহার্দ্য কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে রিদির হাত ধরে হেঁচকা টানে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার কোমর। সোহানা বেগমের দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গম্ভীর গলায় বলল, “কী যেন বলছিলেন? ফিরে তাকায় না? এই তো, আপনার সামনেই কোলে তুলে নিলাম। এর থেকে বেশি কিছু করাটা এখানে সম্ভব না, আমি আবার ভদ্র ছেলে, আর সবার সামনে লজ্জা-শরমের একটা ব্যাপার তো থাকেই!”
রিদি থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতরটা তীব্র উত্তেজনায় ধুকপুক করছে। ড্রয়িংরুমের বাকিদের অবস্থা তখন নাজেহাল—এমন বেপরোয়া আচরণ তারা কল্পনাও করতে পারেনি। সারহান চৌধুরী লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলেন, বাকিদের অবস্থাও একই রকম। রিদির কান লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, সে নামার জন্য ছটপট করছে!
সৌহার্দ্য বিরক্তির স্বরে ধমকে বলল, ইউ”দেড় ব্যাটারি, মৃগীরোগীর মতো করছো কেন? জীবনে প্রথম স্বামীর কোলে উঠছো, একটু ফিল করো!”
ছেলের এমন নিলজ্জ কথা শুনে সারহান চৌধুরী খুক খুক করে কেশে উঠলেন, আর শাহেদা চৌধুরী কোনোরকমে সেখান থেকে সরে পড়লেন।
সবার সামনে সৌহার্দ্যের এমন নির্লজ্জ কথা শুনে রিদির লজ্জায় সারা শরীরে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল, মুহূর্তে তার সমস্ত শরীর নিস্তেজ হয়ে এল। লজ্জায় মেয়েটার অবস্থা তখন যেন নাজেহাল। নিজের ভেতর জমে ওঠা তীব্র লজ্জা আর রাগে রিদির ছটফটানি ক্রমশই বেড়েই চলছিল; এমনটা কেবল ওই বেয়াদব লোকের দ্বারাই সম্ভব।”
রিদির ছটপটানিতে বিরক্ত হয়ে সৌহার্দ্য রিদিকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোখে-মুখে রাগ আর বিতৃষ্ণা মিশিয়ে। সোহানা বেগমের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, “বাড়ির বাইরে হোক বা ভেতরে, আমার বউকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার আগে নিজের শরীরের অর্গানগুলো ঠিক রাখার ব্যবস্থা করে নেবেন!”
বলেই, আর কারো দিকে না তাকিয়ে, হনহন করে ওপরের দিকে চলে গেল সে।
রিদির বুকের ভেতরটা তখনো ধুকপুক করছে, যেন এক চিলতে ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে। নিজের অজান্তেই হাতটা বুকের ওপর চেপে ধরল সে। লজ্জায় তার মুখটা টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে, মনে হচ্ছে গাল দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছে। সৌহার্দ্যের সেই আকস্মিক স্পর্শের রেশ এখনো তার শরীরের প্রতিটি কোণে লেপ্টে আছে, শিহরণ জাগিয়ে দিচ্ছে বারবার। তার কেবলই মনে হচ্ছে, সৌহার্দ্য কি তবে তার মুখটা দেখে ফেলেছিল? যদিও ঘোমটাটা টানা ছিল, তবুও ভয় আর লাজ মিলেমিশে একাকার তার অনুভূতি।
ওর ভাবনার মাঝেই রিভা এসে রিদির পিঠে এক চিমটি কেটে দুষ্টু হেসে বলল, “ওফ! আমার ভাইয়াটা তো দেখছি আস্ত রোমান্টিক! যেভাবে হুট করে কোলে তুলে নিল— ইস, সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানাবে!”
রিভার কথার রেশ কাটতে না কাটতেই সাথী এসে যোগ দিল, রিদির হাতটা ধরে দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, “বাহ্! ড্রয়িংরুমেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে বেডরুমে গিয়ে না জানি কী হবে!”—বলেই রিদিকে একটা চোখ টিপে দিল সে।
ওদের এমন খোঁচা মারা কথায় রিদির কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। লজ্জায় সে কোথায় লুকোবে ভেবে পাচ্ছে না। মনে মনে সৌহার্দ্যকে উদ্দেশ্য করে বেশ খানিকটা গালমন্দ করল সে— ‘কী বেয়াদব আর নির্লজ্জ লোক! আমাকে এমন লজ্জায় ফেলে দিয়ে নির্বিকারভাবে চলে গেল, যেন কিছুই হয়নি!’
দুপুরে ভারী খাওয়ার ফলে রাতে আর কেউই তেমন কিছু খেল না। শুধু রিদি ওর শাশুড়ির ডায়াবেটিসের কথা মাথায় রেখে দুটো রুটি তৈরি করে দিল। রান্নার পাট চুকিয়ে আমেনা খালাকে দিয়ে সে সব গুছিয়ে রাখল। এরপর রিদি আমেনা খালাকে পাঠাল সৌহার্দ্যের কাছে—জানতে, ও কিছু খাবে কি না। কিন্তু আমেনা খালা ফিরে এসে যখন জানালো সৌহার্দ্য কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছে, “ওই দেড় ব্যাটারিকে পাঠান”—রিদির মনের ভেতর রাগের এক দহন শুরু হলো। অভিমানে, ক্ষোভে রিদি তখন মনে মনে সৌহার্দ্যকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে কোনোমতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল ঘুম না এলেও কোন রকম রাতটা পার করে দিলো।
প্রতিদিনের চেয়ে আজ একটু ভোরেই ঘুম ভেঙেছে রিদির। বাড়িতে মেহমান এসেছে। কে যে কী খাবে তার তো ঠিক নেই, তাই রিদি ঠিক করলো নান রকমের নাস্তা বানাবে। রান্নার জোগাড় করতে করতেই সাথী এসে হাজির। দুই জন মিলে আমেনা খালার হাত ধরেই গরম গরম কয়েকটা আইটেম বানিয়ে ফেলল।
নাস্তা বানানো শেষ করতে না করতেই সবাই একে একে টেবিলে এসে বসলো। আজ সবার সাথে সৌহার্দ্যও এসেছে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সারাত ঘুমায়নি মনে হয়। দেখতেই কেমন অগোছালো লাগছে ওকে।
রিদি একটা প্লেট এগিয়ে দিতেই সৌহার্দ্য আড়চোখে একবার তাকালো। রিদির মাথায় পাতলা ঘোমটা। প্রতিদিনের মতো দশ হাত ঘোমটা না, তবুও মুখটা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। সেটাই বোধহয় ওর পছন্দ হলো না। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে নিলো।
অন্যদিকে সারহান চৌধুরীর মুডটা আজ বেশ ভালো। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। ছেলের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “তোমার উপর আমার বিশ্বাস ছিলো । আমি জানতাম একদিন তুমি ওকে মেনে নেবে। আজ আমি ভীষণ খুশি তোমার উপর।”
সৌহার্দ্য বাবার কথা খুব মন দিয়ে শুনলো। তারপর ধীরে সুস্থে এক লোকমা খাবার মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে শান্ত গলায় বলল, “আমি ওটাকে মেনে নিয়েছি, তোমাকে কে বলল?”
কথাটা শুনে সারহান চৌধুরী একদম বোকা বনে গেলেন। কাল সবার সামনে বউকে নিয়ে যা কাণ্ড করলো দেখে তিনি ভেবেছিলেন সব ঠিক হয়ে গেছে। ছেলের কথায় রাগে ওনার গা কাঁপছে। বাকিরা অবশ্য এসবে অভ্যস্ত। ওরা জানে, সৌহার্দ্যের মনের কথা বোঝা আর আকাশ ফুঁড়ে মাটিতে ঢোকা একই কথা।
রাগে চোয়াল শক্ত করে সারহান চৌধুরী বললেন, “তাহলে কাল সবার সামনে ওই অসভ্যের মতো মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলে কেন?”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে বাবার দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তারপর খুব নরম, ভদ্র গলায় জবাব দিলো, “ওকে দেন। সবার আড়ালে কোলে তুলে নেবো। আর ইউ হ্যাপি?”
ছেলের কথা শুনে সারহান চৌধুরী স্তব্ধ। মুখে কিছু বলার ভাষা নেই। তিনি জানেন ওনার ছেলের মুখের ধার। কিন্তু এতটা নির্লজ্জ কথা বলবে, সেটা ভাবতেও পারেননি। রাগে লজ্জায় দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বললেন, “অসভ্য ছেলে।”
ওদিকে আরহান খাবার মুখে দিচ্ছিল। ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে খাবার আটকে গেল গলায়। কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ। সাথী দৌড়ে পানি এগিয়ে দিয়ে পিঠ মালিশ করে দিলো।
রিদির তখন ইচ্ছে করছে মাটিটা দুই ভাগ হয়ে যাক। সে এক ছুটে তার ভেতর ঢুকে পড়ুক। এত বেহায়া, নির্লজ্জ পুরুষ মানুষ সে জীবনে দেখেনি। লজ্জায়, অপমানে গাল দুটো আগুন হয়ে গেছে ওর। সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারলো না। কাঁপা কাঁপা পায়ে কোনোমতে রান্নাঘরের দিকে পালিয়ে গেল। এই মানুষটার সামনে থাকলে আল্লাহ জানে আবার কী শুনতে হয়!
রিদি চলে যেতেই সৌহার্দ্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে একবার রান্নাঘরের দিকে তাকালো। সাথীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ভাবি, এক কাপ কফি পাঠিয়ে দেন।”
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। কারো দিকে না তাকিয়ে ভারী পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল !
লজ্জায় রিদির মুখটা টকটকে লাল। রান্নাঘরের এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। সাথী এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি বানিয়ে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে রিদির সামনে ধরলো। তারপর চোখ টিপে বলল, “যান ম্যাডাম, আপনার বর অপেক্ষা করছে। কফি পাঠাতে বলল।”
সাথীর খোঁচা খেয়ে রিদি লজ্জা পেলেও সেটা গিলে ফেলল। মুখ বাঁকিয়ে বলল, ” আমি পারবো না ভাবি। তোমার ওই অসভ্য দেবরের জন্য আমি কফি নিয়ে যাবো না। আমেনা খালাকে পাঠাও।”
আমেনা খালা কথাটা শুনেই মুখটা কালো করে ফেললেন। প্রতিবাদের সুরে বললেন,”আমি বাপু নিতে পারুম না”, “তোমার জামাই মুখটারে এমন বানাইয়া রাখে যেন হের হাগা কষা হয়েছে”, “আমার ডর লাগে”!
আমেনা খালার কথা শুনে রিদি হাসিটা কোনোমতে চেপে রাখলো। কিন্তু সাথী আর পারলো না। হো হো করে হেসে উঠলো।
ওদের হাসি দেখে আমেনা খালা এবার একটু আফসোস করে বললেন, “এমন সুন্দর একটা পোলা মুখটা সারাদিন কালা কইরা রাখে কেন আল্লাহ জানে। একটুখানি হাসলে না জানি কত সুন্দর লাগতো।” বলতে বলতেই নিজের মনেই মাথা নাড়তে লাগলেন ওনি।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬
শেষমেশ উপায় না পেয়ে রিদি কাঁপা কাঁপা বুক নিয়েই সৌহার্দ্যের ঘরের দরজা পর্যন্ত গেল। হাতে ধরা কফির কাপটা থরথর করে কাঁপছে, ছলকে পড়ে যাবে যেন। দরজার ওপাশে পা রাখার সাহসটুকুও মরছে বারবার। বুকের ভেতরটা যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে—ধুপ, ধাপ, ধুপ… মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা এখুনি বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে।
নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। কাঁপা ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ভেসে এলো সৌহার্দ্যের গম্ভীর, কঠোর কণ্ঠস্বর। শব্দগুলো দরজা ভেদ করে সোজা বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল—
“আই ওয়ান্ট ইউ ইন দিস রুম। নাউ।”
