Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৮
রিদিতা চৌধুরী

“আই ওয়ান্ট ইউ ইন দিস রুম নাউ” — কথাগুলো বাতাসের ভেতর দিয়ে তীরের মতো এসে রিদির কানের পর্দায় লাগতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে বরফ-ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল ধীরে ধীরে। ভেতরে যাওয়া মানেই তো নিজের পায়ে হেঁটে বাঘের খাঁচার দরজাটা নিজ হাতে বন্ধ করে দেওয়া।
গলা শুকিয়ে একদম কাঠ। জিভটা তালুর সাথে লেগে আছে। তবু রিদি নিজেকে সামলাল। কাঁপা আঙুলে আলতো করে দরজায় টোকা দিল একবার। টক…টক… শব্দটা ঘরের ভারী নিস্তব্ধতায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। শুধু নিস্তব্ধতা। গাঢ়, চাপা, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা।

রিদি একটা শ্বাস নিল। তারপর ধীরে, প্রায় শব্দহীনভাবে দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখল।
ঘরটা অস্বাভাবিক রকমের বিশাল। মেঝের দামি কার্পেটের , দেয়ালজুড়ে হালকা ধূসর রং। জানালার ভারী পর্দাটা অর্ধেক তোলা। বাইরের সকালের ঝকঝকে রোদ চিরে চিরে ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর, আর ঠিক বিছানার সাদা চাদরের ওপর সোনালি রেখা এঁকে দিয়েছে।
সৌহার্দ্য বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। পরনে কালো শার্ট, ওপরের দুটো বোতাম খোলা। হাতে ল্যাপটপ। নীলচে আলো তার ধারালো চোয়াল, গম্ভীর চোখ-মুখটাকে আরও অচেনা, আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। রিদি দরজা ঠেলতেই সে একবার চোখ তুলে তাকাল। শুধু একবার। তারপর নিঃশব্দে ল্যাপটপটা পাশে সরিয়ে রাখল। কিন্তু চোখ সরাল না। সেই স্থির, গভীর, পড়ে ফেলার মতো চোখ রিদির ওপরই আটকে রইল।

রিদি সাহস করে চোখ তুলতে পারছে না। মেঝের দামি কার্পেটের জটিল নকশার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা দ্রাম দ্রাম করে লাফাচ্ছে। পা দুটো থরথর করে কাঁপছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি মেঝের ওপরই হাঁটু মুড়ে বসে পড়বে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন নিঃশেষ হয়ে আসছে।
কোনোরকমে কাঁপা-কাঁপা হাতে ট্রে থেকে কফির কাপটা নামিয়ে ড্রয়ারের ওপর রাখল সে। রাখার সময় চিনামাটির কাপটা কেঁপে উঠে চাপা একটা ঠুং শব্দ তুলল। ব্যাস, এটুকুই। এবার পালাতে হবে। এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে।
কিন্তু পেছন ফেরার আগেই সৌহার্দ্যের গলার স্বর ঘরের বাতাসটাকে মুহূর্তে জমিয়ে দিল— গম্ভীর, নিচু, আদেশের মতো।
“স্টপ দেয়ার।

সৌহার্দ্যের এমন ঘর কাঁপানো ধমকে রিদি আর এক পাও সামনে বাড়াতে পারল না। ঠিক দরজার কাছে এসে পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে, কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না।
সৌহার্দ্য কফির কাপটা হাত বাড়িয়ে নিল। তারপর একদম নিজের মতো করে, ধীরে সুস্থে চুমুক দিচ্ছে। চোখটা স্থির হয়ে আছে রিদির দিকেই। ঘোমটার আড়াল ভেদ করে যেন সে চোখের ভাষা পড়ে ফেলছে। প্রায় দশ মিনিট পর, ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সৌহার্দ্য গমগমে গলায় বলল, “ওটা সরাও।” আমি দেখবো!
রিদি থতমত খেয়ে গেল। বুঝতেই পারল না সৌহার্দ্য ঠিক কী সরাতে বলছে, বেয়াদব লোক কি দেখার কথাই বা বলছে। ঘোমটার আড়ালে লুকানো মুখটা আরও নিচু হয়ে গেল ওর। কাঁচুমাচু হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল, যেন পালানোরও উপায় নেই। তার মধ্য টেনশন হচ্ছে আবার এই নির্লজ্জ বেডা কি থেকে কি বলে দেই সেটার ঠিক নেই,
সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভাঙল। রাগ আর বিরক্তি চেপে হিসহিস করে উঠল, “দেড় ব্যাটারি, তোমার ঘোমটা সরাতে বলছি। স্টুপিড।”

কথাটা শুনে রিদির ভেতরটা কেঁপে উঠল। ভয় তো ওর আগে থেকেই ছিল। জানত আজ না হয় কাল এই মুহূর্তটা আসবেই। তবু ঘোমটা সরানোর পর সৌহার্দ্য যখন দেখবে, কলেজে যেই মেয়েটা তার সাথে মুখে মুখে তর্ক করে এসেছে, সেই মেয়েটাই এখন ওর বিয়ে করা বউ, তখন লোকটার চেহারাটা কেমন হবে, সেই ভাবনাতেই রিদির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। যা রাগ ওকে না, আবার তুলে আচাড় মারে , যা গালিগালাজ করছে!
ওর এলোমেলো ভাবনার মাঝেই আবার ভেসে এল সৌহার্দ্যের ঠান্ডা, কিন্তু পাথরের মতো কঠোর কণ্ঠস্বর, “কি হলো? ইজ়ন’ট মাই ওয়ার্ডস গোয়িং ইনটু ইয়োর ইয়ার্স?(“আমার কথা কি তোমার কানে যাচ্ছে না?”)
রিদি বুঝল, এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। গলার স্বরটা যতটা সম্ভব নরম করে, মিনমিন করে কোনোমতে বলল, “আ-আমি দেখতে ভালো না। আপনি ভয় পাবেন।” একদম পেতনির মত!
সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ বিরক্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল, “বাহ! মিউটের দেখি হাজবেন্ড পেয়ে একদিনেই বুলি খুলে গেছে। আই থিংক কাছে গিয়ে কড়া করে কয়েকটা চুমু খেলেই ঘোমটাও খুলে যাবে? আই অ্যাম রাইট?”
মুখের ওপর এমন নির্লজ্জ কথাটা শুনে রিদি ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। লজ্জায়, রাগে ওর কান গরম হয়ে যাচ্ছে। রাগে কিরমির করে বলল, “এই অসভ্য, লুচ্চা ডাক্তার! একদম কাছে আসবেন না।”
সৌহার্দ্য মুখে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ দেড় ব্যাটারি। নাটক শেষ হলে এবার ঘোমটা খোলো।”

রিদি কাঁপা কাঁপা হাতে অনেক কষ্টে ঘোমটাটা খুলে চোখ তুলে তাকাল সৌহার্দ্যের দিকে। মনে ভেবে রেখেছিল, সৌহার্দ্য হয়তো চমকে উঠবে, অবাক হবে, বা রেগে কিছু একটা বলবে। কিন্তু লোকটা নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি। আগের মতোই ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে আছে। ওর এই অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতা দেখে রিদিই এবার অবাক হয়ে গেল। কোনোমতে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি… আপনি জানতেন আমি?”
সৌহার্দ্য এবার ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে রিদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে, অথচ ঠান্ডা গলায় বলল, “স্টুপিড, তোমার কি মনে হয় ডা. সৌহার্দ্য চৌধুরী এতটাই বোকা? তার একমাত্র বউ তার নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াবে, আর সে টের পাবে না?” কথাটা বলেই আবার নিজের কাজে মন দিল, যেন কথাটা বলা ওর জন্য নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার।
রিদি অপলক তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের মুখের দিকে। বোঝার চেষ্টা করল লোকটা রেগে আছে, নাকি স্বাভাবিক আছে। কিন্তু সৌহার্দ্যের পাথরের মতো মুখ দেখে কিছুই আন্দাজ করা যায় না। কিছু না বলেই যখন রিদি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখনই পেছন থেকে ভেসে এল সেই গম্ভীর, তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর, “ইউ বোচা নাক, রুমটা ক্লিন করে দিয়ে যাও।”

রিদির ভেতরটা রাগে ফুঁসে উঠলেও মুখে কিছু বলল না। রাগটা গিলে নিয়ে কোনোমতে পুরো রুমটা গুছিয়ে, ধুলো মুছে যখন যাবে বলে পা বাড়িয়েছে, তখন আবার একই সুরে আদেশ এল, “বাথরুমে আমার কিছু ড্রেস আছে। ওগুলো ওয়াশ করে দাও।”
রিদি ভালো করেই বুঝল, সৌহার্দ্য ইচ্ছে করেই ওকে দিয়ে এসব করাচ্ছে। তবু ও আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ গিয়ে সুন্দর করে কাপড়গুলো ধুয়ে, নিংড়ে বারান্দায় মেলে দিল। কাজ করতে ওর নিজের কাছেই কেমন অদ্ভুত লাগছে। এই তো, ওর স্বামীর ঘর। স্বামীর ব্যবহার করা জিনিসগুলো নিজের হাতে ছুঁয়ে দিচ্ছে, গুছিয়ে দিচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠছে। অন্যরকম একটা মায়া, অন্যরকম একটা অধিকারবোধ খেলা করছে।
সব কাজ শেষ করে রিদি সৌহার্দ্যের সামনে এসে চুপচাপ দাঁড়াল। মনে ভাবল, হয়তো এবার লোকটা আরও কিছু বলবে।

রিদিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে, ওর সেই চিরচেনা বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কি চাই? এই কয়টা কাজের বিনিময়ে হিসেবে আদর খেতে চাচ্ছ? ওকে, দেন কাম।”
রিদি হতভম্ব হয়ে গেল। সে কি আদর চাইতে এসেছে নাকি! ও তো ভেবেছিল সৌহার্দ্য হয়তো আরও কিছু বলবে, বা কাজের প্রশংসা করবে। রাগে কিরমির করে বলে উঠল, “ছিঃ! অসভ্য লোক। আপনার মুখে কিছু আটকায় না। আমি কোন দুঃখে ওসব খেতে চাইব?”
সৌহার্দ্যের বোধহয় রিদির কথাটা পছন্দ হলো না। নাক-মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে ওভাবে হা করে দাঁড়িয়ে না থেকে বিদায় হও, স্টুপিড।”
রিদি রাগে গজগজ করতে চলে যাচ্ছিল। দরজার কাছে যেতেই পেছন থেকে সৌহার্দ্য খুব ভদ্রভাবে ডেকে উঠল, “এক্সকিউজ মি। ওটা দুঃখে না, সুখে খায়। যদিও আমি এসব ব্যাপারে খুব একটা এক্সপার্ট না। তুমি চাইলে দুইজন মিলে কিছুক্ষণ রিসার্চ করতে পারি? কি বলো করবে?”
কলারটা ঠিক করতে কথাগুলো এমন ভঙ্গিতে বলল যেন খুব দরকারি, বৈজ্ঞানিক আলোচনা করছে।
রিদি রাগে, ক্ষোভে, লজ্জায় একদম ফেটে পড়ল। সৌহার্দ্যের এমন নির্লজ্জ কথায় লজ্জায় ওর কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। কেমন বেহায়া, ঠোঁটকাটা বেয়াদব লোক জুটেছে কপালে! রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘর থেকে বের হতে বিড়বিড় করে বলল, “লুচ্চা ডাক্তার।”
সৌহার্দ্য ওর যাওয়ার দিকে ভ্রু গুটিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল, “স্টুপিড।”

ফ্ল্যাশব্যাক
ক্লাসরুমে সৌহার্দ্য রিদিকে চিনতে পারেনি। চিনবেই বা কীভাবে? পাঁচ বছর বয়সের কয়েক বার দেখা একটা বাচ্চা মেয়ের মুখ মনে রাখা যায় না। আর না বিয়ের পর তাদের মধ্যে কখনো কথা বা দেখা হইছে।
সে দিন কলেজের পর বাড়িতে যখন আবার দেখা হলো, রিদির অদ্ভুত ভাবে ঘোমটা পরা কথা না বলা, দেখে ওর কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল। তবু পাত্তা দেয়নি। নিজের কাজ, নিজের জগৎ নিয়েই ছিল ব্যস্ত।
কিন্তু বাড়ি ফেরার পর থেকে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা। বউ আছে অথচ নেই। বউটাকে মনেই খুঁজছিল ও। ঈগো বাধা দিল, কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারল না। নিজেকেই নিজে বোঝাল, মেয়েটা বাচ্চা। বয়সই বা কত? বিয়ের কথা ভুলে গেছে হয়তো, বা লজ্জায় সামনে আসছে না।
পরে যখন কলেজ গেটে রিদির সাথে ধাক্কা। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে হঠাৎ মনের অজান্তে। তখন নিজের উপরেই রেগে গেল সৌহার্দ্য। ঘরে বউ রেখে অন্য মেয়ের জন্য এমন অনুভূতি? এটা তো কোনো চরিত্রবান পুরুষের কাজ না। নিজেকে ধিক্কার দিয়ে আর ওই বিষয় নিয়ে ভাবল না।

কিন্তু নিয়তি যেন ছাড়ছিল না। ফুচকার দোকানের সামনে আবার রিদি। ফুচকা খাচ্ছে আপনমনে। মনের অজান্তেই কেয়ারটা বেরিয়ে এল,। কিন্তু রিদির মুখে মুখে তর্ক শুনে বিরক্ত হয়ে চেম্বারের দিকে চলে গেল।
ঠিক তখনই সুজনের ফোন। পাঠানো ফাইলটা ভুল ছিলো। ফাইলটা জরুরি। ওই মুহূর্তেই লাগবে। সৌহার্দ্য তাড়াহুড়া করে বাড়ি ফিরল ফাইলের জন্য। গাড়ি গেটের সামনে আসতেই চোখ আটকে গেল। কলেজের সেই নাক বোচা মেয়েটা, রিদি, ওর বাড়িতেই ঢুকছে।
সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ পাথরের মতো তাকিয়ে রইল, বুঝলো না এই মেয়ে এখানে কেন? তখনই ইমারজেন্সি ওটির ডাক আসল। ফাইলটা নিয়ে ছুটে যেতে হলো। ওই ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল তখনকার মত।
কিন্তু অস্থির মন শান্ত হচ্ছিল না কিছুতেই। তাই দারোয়ানকে ফোন দিল। গলা শক্ত করে বলল, “বাড়ির ভেতরে বাইরে, সব সিসিটিভি ফুটেজ এখনই পাঠাও। আর্জেন্ট।”
ফুটেজ পাঠানোর সাথে সাথে ল্যাপটপ খুলে ফুটেজ চালু করল। তারপর? আধ ঘন্টা। একটা পলকও ফেলেনি। হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল শুধু।
অবাক হয়ে দেখলো,দেড় ব্যাটারি মেয়েটা ওকে নাকে দড়ি দিয়ে কিভাবে ঘুরিয়েছে। ও টেরই পায়নি! তারপর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো সে ও দেখবে এই দেড় ব্যাটারি কত দিন তার সাথে নাটক চালিয়ে যেতে পারে!

সকাল থেকেই বাড়িটা কেমন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। মেহমানরা সবাই একে একে বিদায় নিয়েছে। রায়দা শেখও গ্রামে ফিরে গেছেন, সাথে করে নিয়ে গেছেন রিভাকে; কারণ সামনেই ওনার দেবরের মেয়ের বিয়ে। সৌহার্দ্য সেই সকালেই বেরিয়ে গেছে, আরবান জানিয়ে দিয়েছে ভাইয়ের আজ বড় একটা ওটি (OT) আছে, ফিরতে হয়তো রাত হবে। সাথী তার বাচ্চা দুটোকে নিয়ে নিজের রুমে ব্যস্ত। চারপাশের এই শূন্যতায় রিদির যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে, সময় যেন কাটছেই না।
​ রিদি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল শাহেদা চৌধুরীর ঘরের দিকে। তিনি বিছানায় হেলান দিয়ে বই পড়ছিলেন। রিদি নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে তাঁকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল, “আম্মু, কিছু খাবেন? আমি বানিয়ে আনি?”
​শাহেদা চৌধুরী বই থেকে চোখ সরিয়ে রিদিকে আলতো করে সরিয়ে কপালে একটা চুমু খেলেন। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবু কি ফিরেছে?”

​রিদি ওনার হাত থেকে বইটা নিয়ে পাশে রেখে তাঁর কোলে মাথা গুঁজে দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “না আম্মু, ওনার ফিরতে অনেক রাত হবে। ভাইয়া বলল একটা বড় সার্জারি আছে।”
​শাহেদা চৌধুরী রিদির মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “সব ঠিক হয়ে যাবে রে। আমি আমার ছেলেকে চিনি। ওর চোখের কোণে তোর জন্য লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা আমার চোখ এড়াতে পারেনি। মায়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়।”
​রিদি চুপ করে রইল। সৌহার্দ্যের গত কালকের আচরণে মনের ভেতর যে দোলাচল, তাতে ভালোবাসা না কি অবহেলা— রিদির কাছে সেটা বুঝে ওঠা দায়। তবে মনে মনে সে এক অটল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, নিজেকে ছোট করবে না। কেউ যদি তাকে মনে প্রাণে না চায়, তবে সে জোর করে কোনো সম্পর্কের দাবিদার হয়ে থাকতে রাজি নয়।

​শাহেদা চৌধুরী রিদির মাথায় হাত বুলিয়ে পরম আদরে বললেন, “চল তো, তোর চুলে একটু তেল দিয়ে দিই। চুলগুলো কেমন উসকোখুসকো হয়ে আছে।”
​রিদি হেসে সম্মতি জানাল, “তাহলে ছাদে চলুন না আম্মু? খোলা আকাশের নিচে বসে থাকলে ভালো লাগবে।” শাহেদা চৌধুরীও রাজি হলেন, ছাদে তাঁর এমনিতেই যাওয়া হয় না অনেকদিন।
বউ শাশুড়ির গল্প শেষে রিদি ​ছাদ থেকে নেমে বিকালের নাস্তা গুছিয়ে নিল। আমেনা খালাকে রাতের রান্নার প্রয়োজনীয় মসলাপাতি বুঝিয়ে দিয়ে যেই সে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়িয়েছে, দেখল অধপরিচিত এক ভদ্রমহিলা সোফায় বসে আছেন। রিদি অবাক হয়ে কাছে যেতেই ভদ্রমহিলা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। রিদির বুঝতে অসুবিধা হলো না, ইনি তার ফুফু আরিফা খান।

অডিও-ভিডিও কলে কথা হলেও মুখোমুখি দেখা অনেকদিন। আকরাম খান মারা যাওয়ার পর ভিসা জটিলতায় তিনি দেশে আসতে পারেননি। তবে সারহান চৌধুরীর মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করেছিলেন রিদিকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে। কিন্তু শাহেদা চৌধুরীর দৃঢ় জিদ—সৌহার্দ্য দেশে ফিরে রিদিকে মেনে না নিলে তিনি নিজ হাতে রিদিকে তাদের হাতে তুলে দেবেন—তাতে আরিফা খান পেরে ওঠেননি।
​আরিফা খান রিদির মুখটা দুহাতে আগলে নিয়ে আদরমাখা চুমুতে ভরিয়ে দিলেন, “আমার চাঁদটা ফুফুর ওপর খুব অভিমান করে আছে, তাই না?”

​রিদি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, “না ফুফুমণি, এতটুকুও অভিমান নেই। আমি জানি তুমি কোন সমস্যায় ছিলে।”
​ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “কুফুর আদর নেওয়া হচ্ছে, অথচ আমাকে ভুলে যাওয়া হলো!” রিদির ফুফুতো ভাই সাহান রাগ করার ভান করে দাঁড়িয়ে আছে। রিদি হেসে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। সাহান তার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। প্রায় ভিডিও কলে কথা হয়, আরিফা খানের দুই ছেলে—বড় ছেলে শাহাবীর শিকদার, আমেরিকায় সফল ব্যবসায়ী, আর ছোট সাহান শিকদার, পড়াশোনায় ব্যস্ত।
​রিদি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দুষ্টুমির ছলে জিজ্ঞেস করল, “তোমার ওই পেঁচামুখো বড় ছেলেটা আসেনি? রিদির সাথে শাহাবীর এর সম্পর্ক তেমন ভালো না , ওদের মাঝে কথা হয়নি কখনো! ছোট বেলায় যখন দেশে আসত দেখতো পেঁচার মত মুখ বানিয়ে এক পাশে বসে থাকত!
আরিফা খান একটু হেসে বলল, নারে ওর নাকি এখন সময় নেই , কাজের চাপ বেশি!
​সবাই যখন আলাপচারিতায় ব্যস্ত, তখন সারহান চৌধুরী আর শাহেদা চৌধুরী এসে যোগ দিলেন। হাসিমুখে কুশল বিনিময় করলেন। রিদি সবাইকে নাস্তা দিয়ে হাসি মুখে সাহানের পাশে বসল। ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো সৌহার্দ্য। তার দৃষ্টি ঘরের কোনে সোফায় বসা , রিদির ওপর স্থির হলো, ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাওয়ার সময় ভারি গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিয়ে বলল, “ইউ, দেড় ব্যাটারি! কাম টু মাই রুম।”

কথাটা বলে ​কারো দিকে না তাকিয়েই তিনি সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এমন ভাবে গেল নিচে এত মানুষ যেন তার চোখে লাগলো না, সারহান চৌধুরী তো আশ্চর্য বনে ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল!
আরিফা খান সোজা হয়ে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর চোয়াল শক্ত। সৌহার্দ্যের ব্যবহারে তিনি প্রচণ্ড অস্বস্তিতে আছেন। ওনার নিজের বড় ছেলেটাও কম কথা বলে, গম্ভীর স্বভাবের, কিন্তু বড়দের সামনে কখনো এমন ঔদ্ধত্য দেখায় না। অন্তত ন্যূনতম আদব-কায়দাটুকু তার জানা আছে। অথচ সৌহার্দ্যর কাণ্ড দেখে আরিফা খাননের মনে হলো, ছেলেটা আস্ত বেয়াদব।
​সারহান চৌধুরী গলা পরিষ্কার করে পরিস্থিতির অস্বস্তি কাটাতে চাইলেন। আরিফা খান এর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “আরিফা বোন, তুমি কিছু মনে করো না। সৌহার্দ্য আসলে খুব একটা কথা বলে না তো, তাই এমন মনে হচ্ছে।”
​আরিফা খান এক চিলতে কৃত্রিম হাসি টেনে বললেন, “না ভাইজান, সমস্যা নেই। সৌহার্দ্য হয়তো আমাদের চিনতে পারেনি, কত ছোটবেলায় শেষ দেখা হয়েছিল। আমি কিছু মনে করিনি।”

​ওদিকে রিদি কিছুটা বিব্রত। সাহান তার কনুই দিয়ে রিদিকে আলতো খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এটা তোর জামাই না? তোকে ওইভাবে ‘দেড় ব্যাটারি’ বলল কেন?” সাদা বিলাইটা?
​রিদি রাগে গজগজ করে সাহানের পিঠে একটা চাপড় মারল। “বাজে নামে ডাকবি না একদম ওনাকে!” বলেই সে দ্রুত একটা কফি বানিয়ে নিয়ে সৌহার্দ্যের রুমের দিকে পা বাড়াল।
সৌহার্দ্য সোফায় দুই পা ছড়িয়ে গা এলিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ, পরনের কালো শার্টের উপরের দিকের দুটো বোতাম খোলা। সামনে টেবিলজুড়ে ফাইলপত্র এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। রিদি কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে খুব নিচু স্বরে ডেকে বলল, “আপনার কফি।”
​সৌহার্দ্য চোখ মেলে তাকাল। রিদির আপাদমস্তক একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করে সে গম্ভীর স্বরে বলল, “আমি কি কফি চেয়েছি?”

​রিদি থমকে গেল। সৌহার্দ্যর কণ্ঠস্বরের কঠোরতা যেন বাতাসের তাপমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। সে আমতা আমতা করে বলল, “না মানে… বাইরে থেকে এলেন, তাই ভাবলাম হয়তো খাবেন।”
​সৌহার্দ্য এবার কোনো উত্তর দিল না। তার শান্ত মুখমণ্ডলের বিপরীতে গলার স্বর হয়ে উঠল হিমশীতল ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল, “ওটা কে?”
​রিদি সৌহার্দ্যের কথার ধরনে বুঝলো না। কার কথা বলছে সে বুঝলো না ? তবু বিরক্তি চেপে সে পাল্টা প্রশ্ন করল, “কার কথা বলছেন?”
​সৌহার্দ্যর চোখ তখনো রিদির ওপর স্থির। গলার স্বরটা এবার আরও নিচু আর রুক্ষ করে বলল, “যার সাথে এতক্ষণ চিপকে ছিলি, তার কথা বলছি। কে ওটা?”
​রিদির প্রচুর রাগ হলো। এতদিন অন্তত রাগের মাথায় হলেও মানুষটা ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করত, আজকে সোজা ‘তুই’তে নেমে এল! এই লোকটা কি পুরোপুরি বেয়াদব? রিদি রাগে গজগজ করে বলল, “অসভ্য লোক! ওরা আমার ফুফু আর ফুফাতো ভাই!”
​সৌহার্দ্য একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল, “বাহ! এতদিন পর কোথা থেকে উদয় হলো ওরা? যখন ১৫ বছরের এক নাবালিকাকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে যখন বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে হলো, তখন তোমার ওই ফুফু কোথায় ছিল?”

​সৌহার্দ্যর কথাগুলো যেন তীরের মতো রিদির বুকের ভেতর বিঁধে গেল। সৌহার্দ্যের প্রতিটি শব্দে মিশে থাকা আক্ষেপগুলো রিদিকে জানান দিল—এই বিয়েটা তার কাছে এখনো কেবলই একটা বোঝা। রিদির বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল। যে মানুষটাকে সেই নাবালিকা বয়স থেকে সে না দেখেই ভালোবেসে এসেছে, তার মুখে বিয়েটা নিয়ে সব সময় বিয়েটা না মানা, আক্ষেপ করা কেন যেন রিদি মেনে নিতে পারলোনা!
​রিদি নিজের মনের অসহায়ত্বের ওপর নিজেই হাসল। চোখ বন্ধ করে, ভাঙা গলায় বলল, “এখন না হয় সেটা শুধরে নিন। আপনি চাইলে আমাকে ডিভোর্স দিতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই।”
​সৌহার্দ্য রিদির মুখে ‘ডিভোর্স’ শব্দটা শুনে খুব শান্ত দৃষ্টিতে একবার তাকাল। তারপর ধীর অথচ ভারী গলায় প্রশ্ন করল, “ডিভোর্স চাচ্ছ?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৭

​রিদির কণ্ঠে কোনো শব্দ নেই। সে নিচে তাকিয়ে আছে, যেন দম আটকে আছে তার। সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে রিদির প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভীষণ গম্ভীর স্বরে কেবল বলল, “ওকে। ইউ উইল গেট ইট, অন টাইম।”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here