অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬১
Maha Aarat
সারা রাত পার হয়েছে আনমনা হয়ে মন খারাপ নিয়ে।উনার এতো তেজ,যেমনটা ভালোবাসাও।গোটা একটা দিন পার হলো,কোনো খোঁজ অব্দিও নেন নি।হাফসার ঘুম লেগেছে সুবহ সাদিকের পর।তাই আজ উঠতে বেশ দেরী হলো তার।ঘুম ঘুম চোখে ঢুলতে ঢুলতে ড্রয়িং রুমে দেখে বিস্মিত হয় সে।এলোমেলো ভাবে মাথায় কাপড় টেনে হুড়মুড়িয়ে সালাম দিলেও আরহামের কোনো নড়চড় নেই।একটু পাশে গিয়ে আরেকটু খুঁটিয়ে দেখলো উনাকে।হালকা ঠোঁট নাড়িয়ে হয়তো সালামের উত্তর দিলেন।অতপর আবার চুপচাপ পুরনো নিউজপেপারে চোখ ডুবালেন।হাফসা আবারও আহত হলো।লোকটা এখনো কালকের রাগ নিয়ে আছেন?
খানিক পরে মাহের আসলেন চা নিয়ে।ঘরে দূই দুইজন মেয়েলোক জমিদারি করলে পুরুষকে তো একটু খাটাখাটুনি করতে হবেই।মাহেরের সাথে কথাবার্তায় সম্মতি দিচ্ছেন তিনি।হাফসা ফ্রেশ হয়ে আবারও ড্রয়িং রুমের এক কোণায় এসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহের তাগদা দিয়ে বললেন, ‘আরহামের জন্য খাবার তৈরি করো।’
এবার আরহাম পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালেন।তিনিও দেখতে চান কালকের ঘটনার পরও সে কিচেনে যাওয়ার সাহস দেখায় কীভাবে।মাহেরের বলার পরেও সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নখ খুঁটতে দেখে একটু অবাক হলেন মাহের।আরহাম তাকে মিনমিনে স্বরে কিছু বলতেই মাহের মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালেন।হাফসাকে এসে বসার কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলে আরহাম গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন এবার।সে যদি এরকম গোল গোল চোখে গাল ফুলিয়ে তাকায়,আরহাম রাগ করে থাকবেন কীভাবে।হাফসা ধীরে ধীরে সামনে এসে বসতেই আরহাম ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।সামনে মুখ গোমড়া করে চুপচাপ বসে থাকা হাফসাকে ফোনের স্ক্রীনে নিঁখুতভাবে দেখছেন আরহাম।আর এদিকে সে মাঝে মাঝে মাথা তুলছে,আরহামকে ফোনে ব্যস্ত থাকতে দেখে নীরব অভিমানে আবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।দেখা শেষ হলে আরহাম বললেন, ‘রেডি হয়ে আসুন।’
‘এখুনি?’
আরহাম ভ্রু কুঁচকাতেই সে চটজলদি উঠতে উঠতে বলল, ‘এ্ এখুনি যাচ্ছি।’
আরহাম অপেক্ষা করতে থাকলেন।খানিক পরে দেখলেন আরেকজন ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে বেরোচ্ছে।একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন আরহাম।অতপর আইরার উদ্দেশ্যে খানিক ধমকে বললেন, ‘তুমি এত দেরী করে উঠো আর মাহের ডিউটিতে যায় সকালে।এভাবেই চলে?’
আরহাম কথা শেষ করার পূর্বেই হাফসা তাৎক্ষণিক সামনে হাজির হলো।এই কথা তো তারও।হাজবেন্ড সকালে বাইরে যাবেন,ফিরবেন রাতে।উনার জন্য নিশ্চয়ই ভালো মন্দ রান্না প্রয়োজন আইরার বেলায় সেটা বুঝলে তার বেলায় কেনো বুঝেন না!
আরহাম চুপচাপ প্রসঙ্গ পাল্টে নিলেন নয়তো কেইস বিগড়ে যাবে।বোনের সাথে আলাপ সম্পূর্ণ হতে না হতেই মাহের ফিরে এলেন।হাতে খাবারের পার্সেল।বাইরে থেকে এসেছেন তিনি।প্লেটে সার্ভ করতে করতে আরহামকে উঠে আসতে বললে আরহাম বললেন, ‘এটা কেন করেছো!’
‘তোমার বউকে তুমি রান্না করতে দিচ্ছো না।রান্না করবে কে।’আইরার দিকে একপলক তাকিয়ে ফের বললেন, ‘আর এদিক দিয়ে তো আশা করি না!’
আইরা চোখ পাকিয়ে তাকালো।সুযোগ পেয়ে তাকে ভেজে নেওয়া হচ্ছে? আচ্ছা সেও সময়মতো ছিঁড়ে খাবে।চারজনের একসাথের আড্ডায় খাবার সম্পূর্ণ হতেই আরহাম যাওয়ার তাড়া দিলেন।দূই পক্ষেরই মর্মান্তিক মুহুর্তে পরিণত হলো গোটা পরিবেশ।বোনকে বিদায় দিতে হবে জেনেও ভাইয়েরা স্ট্রং থাকে কীভাবে, বুঝে আসে না আইরার।
সন্ধ্যেয় কলিং বেল বাজতেই দৌড়ে আসে আইরা।এই একটা মানুষ তার সারাটাদিনের কাঙ্খিত অপেক্ষা।মাহেরের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে একগ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এসে দেখে টেবিলে সাদা গোলাপ।আইরা জানতে চায়, ‘এটা কি?’
চরম উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো সে।মাহের তখন বিছানায় বসে সোজ খুলছিলেন।আইরার এমন হঠাৎ প্রশ্নে হকচকিয়ে উত্তর দিলেন, ‘ও্ ওটা কুড়িয়ে এনেছি।’
‘কুড়িয়ে নিয়ে এলেন কেন?’
মাহের কিছুটা খাপছাড়া ভঙ্গিতে বললেন, ‘আশেপাশে কোনো গার্বেজ/ডাস্টবিন ছিলো না তাই।’
আইরার মুখ শুকিয়ে গেলো মুহুর্তেই।নিজের রাগটুকু হজম করেও প্রশ্ন করলো, ‘আশপাশে ডাস্টবিন পাননি।তাই বাসায় নিয়ে এসেছেন।যান এখন ডাস্টবিনে ফেলে আসুন।’
ফুলগুলো ঝাড়া মেরে টেবিলে ফেলে রেখে গেলে মাহের নিজের চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরলেন।রাগে উনার মাথা ফেটে যাচ্ছে।অমির যুক্তিতে ফুল কিনে এনেছিলেন তাঁর জন্য।সে এতটুক পর্যন্ত বলে দিয়েছে যে, ‘স্যার ফুল দিয়ে আপনার কিছু বলতে হবে না শুধু বলবেন, ‘তোমার জন্য ‘
ব্যাস এতটুকু বললেই হবে।
তিনি এতটুকু বলতে না পারলেও চুপ তো থাকতে পারেন।সে তো অবুঝ না।উল্টো ডাস্টবিনের কথা বলে ইসস…এই রকম দূর্ঘটনা কি উনার সাথেই হচ্ছে বারবার।
ইশার সালাত শেষে বিশ্রাম নিচ্ছিলো হাফসা,সাথে বইয়ে মনোযোগ গাঁথা।আরহামও একপাশে চুপচাপ শুয়ে রইলেন।হাফসা বই রেখে অনেক চেষ্টা করে জড়তা মাড়িয়ে চেষ্টা করলো একদিন নিজ থেকে জড়িয়ে ধরবে।সেই উদ্দেশ্যে আরহামকে ধরতে গেলেই আরহাম এপাশ না ফিরেই গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘হয়েছে।কেঁদেকেটে এখন জড়িয়ে ধরতে হবে না।আপনি পড়ায় মনোযোগ দিন।’
হাফসা মিনমিনে স্বরে বলল, ‘সরি।’
‘পড়ায় মনোযোগ দিন।সীরাতের বই হাতে,মাথায় থাকে যেনো।’
‘আই এম সরী।’
‘ওকে।’
‘সত্যিই দূ:খিত।’
‘এখন কি করার।নিজে থেকে চুমুটুমু তো আর দিবেন না!’
তাঁর ফোলানো মুখ চুপসে যায় মুহুর্তেই।আরহাম সেটা লক্ষ্য করে বললেন, ‘উমায়ের দিবেন চুমু্?এটা আমি আরহাম বিশ্বাস করবোই না।কখনোই না।’
বলতে না বলতেই গালে হাত চলে আসে আরহাম।কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে এমন দূর্ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।গালে কিছু একটা ছুঁয়ে গেলো,কিছু একটা।চোখের সামনে দিয়েই তো,তবুও কেন জানি বিশ্বাস হতে চাইছিলো না আরহামের।হাফসা আর বসে থাকেনি।দরজা থেকে আড়াল হওয়ার আগে আরহামকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মুখ বাঁকিয়ে চলে যেতেই হুঁশ ফিরলো উনার।
ড্রয়িং রুমের সেন্টার টেবিলে বড় পাত্রে জালমুড়ি মাখানো হয়েছে।আরহাম কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে নেমে আসলেন।হাফসা খেয়াল করলো যখন একেবারে পাশে চলে এসেছেন।সবার অগোচরে ঝুঁকে জালমুড়ি মুঠোতে ভরার অজুহাতে হাফসার কানের পাশে ফিসফিস করে বললেন, ‘জান,এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে কি হলো!আমি ফিল করতেই তো পারিনি।’
হাফসার কান গলে যেনো শীশার বোতল বুরিয়ে গেলো।লজ্জ্বায় কান থেকে গরম ধোঁয়া উদগীরণ হচ্ছে।জিদ করে দূর্ঘটনা টা ঘটাতে তাঁর যতটুকু না লজ্জ্বা লেগেছে এবার আরহামের এমন সম্বোধনে বোধহয় ঘাটতি টা দ্বিগুণ হারে ফিরে এলো।একেবারে মুখোমুখি টেবিলে বসে তাঁর দিকে ভ্রু উঁচিয়ে ঘন ঘন তাকাচ্ছেন আরহাম।উনার মুচকি হাসি তাকে লজ্জ্বায় ফেলছে বারবার।এরই মধ্যে খুব জালে বিষম উঠলো মাইমুনার।আরহাম দ্রুত তাকে পানি এগিয়ে দিলেন।মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মাইমুনাকে নিয়ে।এর পরের সময়টুকু আরহাম আর খুব একটা তাকালেন না,উনার সব কেয়ারিং ছিলো আপুকে নিয়েই।কোনো কারন ব্যতীতই মন খারাপ হয়ে এলো তাঁর।আপুকে দেখে একটু হলেও ঈর্ষা হয় তাঁর। এমন কত সন্ধ্যের আড্ডা,সকালের ঘোরাঘুরি, জোৎস্নার দর্শক,রাতের ব্যস্ত শহর,বা নিস্তব্ধ নাজুক আঁধার রাত্রিতে উনার বাহুতে ঘুমানোর মুহুর্ত হয়েছে উনার।সেই মুহুর্তগুলো বোধহয় হাজার কোটি দামের মূল্য ও নয়।এসব ভাবতেই নিংড়ে উঠা মনকে একসময় খুব করে শাসিয়ে নেয় হাফসা।আপু তো তাঁর নিজের বোনের মতো,নিজের অংশ।উনার খুশিই তো তাঁর খুশি।আনমনে হেসে উঠে হাফসা।এখন আর তাঁর ঈর্ষা হচ্ছে না।খাওয়া শেষে চুপিচুপি নিজের ঘরে চলে গেলো সে।কয়েকদিন পর রামাদ্বান।রুমটাকে সুন্দর খুশবু ছড়িয়ে নতুন রুপে সাজিয়ে নিতে হবে।রামাদান মানেই তো সেরা কিছু!
আইরা ঘুমায়নি।দূটো রাত থেকে তাঁর ঘুম হচ্ছে না।কালকের ঘটনাটা স্বপ্নস্বপ্ন মনে হলেও আজকে নিশ্চিত হতে ডোর খুলে স্টাডি রুমে উঁকি মেরেছিলো সে।হালকা আলোয় ধোঁয়ার স্ফুলিঙ্গ ভেসে ভেসে যাচ্ছে।নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে আবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।মাহের উল্টো হয়ে মাথা হেলান দিয়ে সোফায় বসে বসে একাধারে সিগারেট টানছেন।আইরার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিল না।সে ধীর পায়ে দরজা ঠেলতে ঠেলতে এদিকে এগোলো।মাহের এসব ধ্যানে নেই।চোখ বুজে লাগাতার ফুঁ টানছেন।তীব্র ধোঁয়ায় কাশি উঠে গেলো আইরার।মাহের চমকে দ্রুত পিছু ফিরলেন।টিমটিমে আলোর একটু সম্মুখেই তাঁর মুখ।মুখে ওরনা চাপা আর টলমলে চোখ নিশ্চল চোখে তাকিয়ে আছে।মাহের বুঝতে পারলেন,এরকম দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে সে নির্বাক।
আইরার প্রশ্নার্ত দৃষ্টি।মাহের মিনিটকয়েক সময় নিলেন পরিস্থিতি বুঝে উঠতে।অতপর সিগারেট হাতের পিছে সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস উগড়ে কঠিনস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কেন উঠে এসেছো?’
বেশ কিছুক্ষণ পর উত্তর এলো,
‘নতুন না পুরাতন অভ্যেস?’
মাহেরের কন্ঠে যতটুকু রূঢ়তা আইরার কন্ঠ ততটাই মোলায়েম।
মাহের কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেলেন।আইরার থেকে মনোযোগ সরিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন তিনি।শুনতে পেলেন এক দূর্বল কন্ঠ,নিভে যাওয়া আশায় ক্ষত হওয়া পোড়া অনুভূতির আঁচড়, ‘আমি ঠিক কি দিয়ে নিজেকে স্বান্তনা দিবো একটু শিখিয়ে দিন।আপনাকে নিজে পছন্দ করে গ্রহন করার এটাই কি অন্তিম শাস্তি? না আরও বাকি।আমি নিতে পারছি না।প্লিজ এটা স্বপ্ন হয়ে যাক না!’
আইরার ভেজা কন্ঠস্বর মাহেরের কঠিন খোলসে মোড়ানো হৃদয়ে আঁচড় কাটতে পারেনি।নিজের কড়াস্বর ধরে রেখে বললেন, ‘যাও।রুমে যাও।নেক্সট টাইম নক না করে আমার রুমে ঢুকবে না।আই ডোন্ট লাইক দিস।’
আইরার মাঝরাতের কান্না আর বালিশে মিশে যাওয়া নোনতা পানির সাক্ষী কেবল একজনই।সম্পর্কের এতোদিনে এসে আজ বুঝলো সে,জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত তার নিজের হাতেই নেয়া।
সকালে নাস্তার টেবিলে রোজকার মতোই বসলো সে।কিছুক্ষণের মধ্যে মাহেরও শার্টের স্লিভ গোটাতে গোটাতে এসে ঠিক পাশের চেয়ারে বসলেন।আইরা সার্ভ করে দিয়ে নিজের পাতে তুললো।খুব স্বাভাবিকভাবে খাবার খাচ্ছে সে।পার্থক্যটা শুধু এটাই,অন্যসময় হলে সে কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলতো,আর আজ পরিবেশটা কেমন থমথমে, নাজুক।মাহের খাচ্ছেন না,তিনি খাবার নাড়ছেন আর মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছেন।
ডিমপোচ টা খেয়েই উঠে যেতে নিলো সে।মাহের উসখুস করছেন।রাতের ঘটনার জন্য কিভাবে কি বলবেন বুঝে উঠতে না পেরে বললেন, ‘একটু বসো।’
‘রেডি হবো।দেরি হচ্ছে।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৬০
বলে দাঁড়ালো না সে।নিজেকে গুছিয়ে পিছন পিছন নেমে এলো চুপচাপ।মাহের ভাবলেন, ড্রাইভ করতে করতে গুরুত্বপূর্ণ কথা সেরে নিবেন।কিন্তু এই আগ্রহ পুরোদমে হারিয়ে ফেললেন যখন দেখলেন সে পিছনের সিটে বসেছে।রাগে কিড়মিড় করতে করতে স্টিয়ারিং টা শক্ত হাতে চেপে গাড়ি স্টার্ট দিলেন।মিররে মাহেরের রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখ লক্ষ্য করছিলো আইরা।মনে মনে আওড়ালো, আপনাকে অনেকেই ভালোবাসবে,কিন্তু আপনার অপেক্ষা, অবজ্ঞা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য এগুলোকে আমার মতো কে ভালোবাসবে?
