অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮
Maha Aarat
আইরা উঁকি দিয়ে ড্রয়িং এ তাকাতেই এক্সিডেন্টের দিকে নিঁখুত দৃষ্টি ফেললো সে।লোকটার চোখেমুখে দূ:শ্চিনতা আর ক্লান্তির ভার।ভাইয়ার কথাগুলোতে উনার মনোযোগ আছে কি না বুঝা যাচ্ছে না উনি শান্ত ভঙ্গি অথচ অশান্ত দৃষ্টি নিয়ে মেঝেতে তাকিয়ে আছেন।
‘বাড়িতে তো আর রাখতে চাচ্ছি না।আমার ভয় করে।ভাবছি ফুপির বাসায় পাঠিয়ে দিবো ফ্ল্যাট পাওয়ার আগ পর্যন্ত।’
মাহেরের আচমকা এমন মন্তব্যে আরহাম চমকালেন।মাহেরের এত দূ:শ্চিন্তার কারন তাহলে এটাই।আরহাম খানিক ভেবে বললেন, ‘ওখানেও তো তোমার ভাই যেতে পারবে।’
মাহের সত্যিই এবার দূ:শ্চিন্তায় পড়ে গেলেন।ফুপির বাসায় যাওয়া যাবে না তাহলে মামার বাসায়?মাহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিলেন তখন আচমকা মনে পড়ে হাফসার ছোটবেলায় আরাফ এর সাথে ওর দূর্ঘটনার কথা।মাহের যেনো কোনো তাল খুঁজে পাচ্ছেন না।
কান খাড়া করে ভাই আর মিস্টার এক্সিডেন্টের আলাপে সব ধ্যান দৃষ্টি ডুবিয়ে রেখেছিলো এমন সময় ঘাড়ে হাত পড়তেই চিৎকার দিয়ে উঠে সে।মুহুর্তেই মাহের আর আরহামের দৃষ্টি পিছনে ঘুরে।ততক্ষণে আইরা আড়াল হয়ে গেছে।
রুমে এনে মিসেস আফসানা জিজ্ঞেস করলেন, ‘উঁকি মেরে কি দেখছিলে?’
আইরা আমতা আমতা করে বলল, ‘ক্ কথা শুনছিলাম।’
আম্মু আর বিষয়টা নিয়ে ঘাটলেন না।আম্মুকেও দূ:শ্চিন্তায় দেখে আইরা জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি শুনেছেন আম্মু?’
‘হাফসার বিষয়ে কথা বলছিলো ওরা?’
‘হু।’
‘খারাপ লাগছে মেয়েটার জন্য।’
‘তোমার কেন খারাপ লাগছে?’
‘যতটুকু শুনলাম..
‘আমি চুপিচুপি শুনলাম আপুর ওপর একটা ইন্সিডেন্ট বয়ে গেছে।সেটা হয়তো ভালো কোনো বিষয় নয়।তাই উনার ভাই এতো দূ:শ্চিন্তা করছেন।’
বর্ষার মৌসুমের একটা সুন্দর অনুভূতি হলো কোনো ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হতে হয় না।বরং পরিবেশে সবসময় বিরাজ করে শীতল,স্নিগ্ধ বাতাস।গন্ধরাজ আর কাঠগোলাপের মিশেলে সুগন্ধিতে রুমের প্রতিটা কোণা কোণা মৌ মৌ করছে।হাফসা তিলাওয়াত শেষ করে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।বারান্দার পর্দাটা ঝুলছে ধীর গতিতে।হাফসা চা’য়ে চুমুক দিলো।গত কিছুদিন তাকে একটা জিনিস খুব ভাবিয়েছে।তাঁর ভাইয়ের তাকে নিয়ে এতো দূ:শ্চিন্তা হাফসাকে দূর্বল করে দেয়।মা-বাবার শূন্যতা অনুভব করিয়ে দেয়।মা বাবা বেঁচে থাকলে তো তাকে ঘরে একা থাকা লাগতো না।কোনো ইন্সিডেন্ট ও হতো না।
গতকালকের ঘটনা নিয়ে সারাটাদিন মন খারাপ ছিল ওর।
তবে একটা জিনিস তাকে ভাবাচ্ছে।লোকটা হুট করে উপস্থিত হলেন কীভাবে?তিনি বুঝলেন কীভাবে? জানলেন কীভাবে?সেটা যেকোনো ভাবেই হোক,উনার তো ভেতর ঘরে আসার কথা না।তাও কেনো আসলেন?
খানিকক্ষণ চিন্তার পসরাগুলো মস্তিষ্কে হাজারো প্রশ্নের মেলা বসায়।হাফসা তৎক্ষনাৎ সেটা সরিয়ে ফেলে।কোনো গায়রে মাহরাম কে নিয়ে সে ভাবতে চায় না।কৃতজ্ঞ তো হওয়া উচিত।সেটা নিশ্চয়ই ভাইয়া বাকি রাখেন নি।
বাতাসের বেগ বাড়ে হঠাৎ।রুমে ঝুলে থাকা ক্যালেন্ডারটা
শব্দ করে নড়ে উঠতেই আঁতকে উঠে হাফসা।পরক্ষণেই স্থির হতেই মনে পড়ে কালকের ঘটনা।মাহের রিযালকে আঘাত করেছেন।গাল লাল করে দিয়ে বলেছেন, ‘আমার বোনের ছায়ার সীমানায়ও যদি তোমাকে দেখি তোমার কি করবো আমি নিজেই জানিনা।’
ডিনারের সময় খাবার সার্ভ করতে করতে আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাইমুনাকে আনবে না?ওর দাদূমণির অসুস্থতা কমেছে?’
‘আজকে আর খোঁজ নিই নি।’
আইরা মাকে চোখে চোখে ইশারা দিয়ে কিছু বোঝাতেই মা ধীরে ধীরে প্রসঙ্গ তুলেন, ‘মাহের কী বিষয়ে কথা বলল?’
‘তেমন কিছু না।’
‘হাফসার বিষয়ে কি বলল?ছেলেটাকে খুব টেন্সড লাগছিলো।’
আরহাম কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন, ‘উনার বোনের কথা।’
‘কি হয়েছে?’
আরহাম যেনো মায়ের এই বিষয়ে প্রশ্নগুলো হজম করতে পারছেন না।তবুও উত্তর দিলেন, ‘একা আর কি বাড়িতে।তাই টেন্সড।’
‘এখন কি ডিশিসন হলো?’
‘হয়নি কিছু।’
‘আচ্ছা আমরা তো একা থাকি।তুমি সারাদিন বাইরে থাকো।আর বাড়িতে থাকলেও না থাকার মতো।’
‘হু।’
‘হাফসাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসি।নতুন ফ্ল্যাটে উঠার আগ পর্যন্ত থাকলো।আমাদেরও সময় কাটলো।আর..
আম্মুর কথা শেষ হতে না হতেই আরহাম বিষম খেলেন।স্বাভাবিক হয়েই আম্মুর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘কেনো?’
‘আরে মেয়েটা একা না?একা মানুষ থাকা যায়।আর মেয়েটা ভীষণ ভীতু ও।কখন কি না কি দূর্ঘটনা ঘটে যায়।তার চেয়ে বরং আমাদের বাসায় থাকলে ভালো সময় কাটবে,সেইফ থাকবে।’
আরহাম আম্মুর এমন অবাধ্য আবদারে না হ্যাঁ বলতে পারছেন না ‘না’ বলতে পারছেন।না বললে আম্মু সাথে সাথে জিজ্ঞেস করে বসবেন ‘কেনো?’
আর হ্যাঁ?এই সম্মতি আরহাম দিতে চান না।কোনোভাবেই না।উনার ঈমান দূর্বল করেছে মেয়েটা।নিষিদ্ধ মানুষের প্রতি কেনো সিমপ্যাথি থাকবে?হাফসার অসহায়বোধ ছাড়াও এমন নিষিদ্ধ সিমপ্যাথির কারনটাও যে ভিন্ন সেটা আরহাম প্রকাশ করতে চান না।
এমন একটা মানুষ এ বাসায় থাকবে?সে ভুল করেও কখনো আরহামের সামনে পড়বে না বা আরহামও কখনো তাঁর মুখোমুখি হবেন না তবুও তো তিনি জানবেন, ‘মেয়েটা এ বাসায়ই আছে।’
আরহাম প্রস্তুত হচ্ছিলেন ‘না’ বলার জন্য।মা কি ভাববেন সেটা উনার বিষয় অমনি আইরা বাঁধসেঁধে বলে, ‘ভাইয়া তোমার কোনো আপত্তি থাকার কথা না।আপু তো তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না।তোমার সামনেও যাবে না।আপু আমার আর আম্মুর সাথে থাকবে।সো তোমার এখানে কোনো অবজেকশন থাকার প্রশ্নই উঠে না।’
আরহাম বুঝে উঠতে পারলেন না কি বলবেন।আম্মুর চোখে আলাদা আনন্দ।হাফসাকে তিনি বেশ পছন্দ করেন।আরহামের অপ্রকাশিত নিষেধকে প্রাধান্য না দিয়ে তাঁরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল রইলো।
শেষ রাতে আম্মু মাহেরের সাথে কথা বলে নিলেন।মাহের প্রথম ঘোর আপত্তি জানালেও মা’সম আন্টির কথা ফেলতে পারেন নি।আইরা খুশিতে আম্মুর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘দেখেছো তোমার আর আমার থিংকিং কতো মিল?তাও তুমি ভাইয়াকে কেন বেশী ভালোবাসো?’
আম্মু মুচকি হেসে কেবল উত্তর দিলেন, ‘বাচ্চামি ছেড়ে তুমার বোঝটা যেদিন পরিপূর্ণ হবে সেদিন বুঝবে।’
শহর থেকে বেশ দূরে এসে গাড়ি থামালেন আরহাম।গাড়ির গরম এসির বাতাস থেকে বাইরে বেরোতেই ঠান্ডা শীতল বাতাস গা ছু্ঁয়ে গেলো।আরহাম শার্টের গোটানো হাতাগুলো নামিয়ে কিছুটা কেঁপে উঠলেন।
হাতঘড়িতে সময় দেখলেন, ৭ টা বেজেছে মিনিট তিনেক আগে।আরহাম খালি জায়গা দেখে ঘাসের ওপর বসে পড়লেন।
ফজর নামাজ আদায় করেই বেরিয়েছিলেন তিনি।শহর থেকে বেশ দূরের এই জায়গাটা কোনো এক সময় আরহামের খুব পছন্দ ছিল।সেই সময়টা আর নেই।সেই পরস্তিতিও আর নেই।তাই এখানে আসারও কারন নেই।
আরহাম দূরের দোকানে চোখ বুলালেন।বৃদ্ধ কেবল টংয়ের দোকানের সাটার উঠিয়েছেন।আরহাম দূর থেকে হাত ইশারায় বুঝালেন এক কাপ চা।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে চাও এসে পৌঁছলো।আরহাম তাতে লম্বা চুমুক বসালেন।
আরহামের আজকে এখানে আসা নিজের একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে।
উমায়েরের প্রতি আরহামের কোনো একটা অনুভূতি তো আছে নাহলে মেয়েটার নাম শুনলেই বুকটা ধ্বক করে উঠে কেন?আর তাঁর অসহায়ত্ব আরহামকে এতো পোড়াচ্ছে কেন?অতীতের চ্যাপ্টার তো অনেক আগেই ক্লোজ হয়ে গিয়েছে।আরহাম তো কবেই তাকে মুছে দিয়ে মাইমুনাকে স্ত্রীরূপে গ্রহন করেছেন।তাহলে এতদিন পরে এই নিষিদ্ধ অনুভূতি মাথাচাড়া হয়ে উঠার কারন কি?
আমি নিজেও আপনাকে নিয়ে ভাবতে চাই না।দিনদিন আমার ঈমান দূর্বল হয়ে যাচ্ছে।কোনোকিছুতে মন বসাতে পারছি না।আপনাকে নিয়ে না চাইতেও যেখানে ভাবনা চলে আসছে সেখানে আম্মু যখন বললেন আপনি আমাদের বাসায় কিছুদিন থাকবেন আমি আরো ভেঙে পড়েছি।আপনি আমার সামনে আসবেন না বা আমিও আপনার এিসীমনাায় যাবো না তবুও এটা জানবো আপনি আমার কাছাকাছি আছেন।নিজের প্রতি,
আমার স্ত্রীর প্রতি অন্যায় হয়ে যাচ্ছে আমার।এসব থেকে মুক্তি চাই।মাহের গতরাতে বলেছিলো সে একজন ভালো পাএ পেয়েছে।এবার সে এগোতে চায়।
আপনাকে কাউকে দিয়ে যদি বলাতে পারতাম,আমার একটা অনুরোধ আপনি দ্রুত বিয়েটা করে নিন।তখন ভাবনা চলে আসলে বুঝবো আমি পরপুরুষের স্ত্রীকে নিয়ে ভাবছি।প্লিজ আই রিকুয়েষ্ট।
তবে আজ থেকে আপনাকে নিয়ে মোটেও ভাববো না।আমার নফসের সাথে আমার যুদ্ধের শক্তি কমে যাচ্ছে।আমি শয়তানের ধোঁকায় পড়েছি।নফসের সাথে জুলুম করেই যাচ্ছি।সবকিছুর পর এটাই সত্যি, আমি মাইমুনাকে সত্যি ভালোবাসি।উনিই আমার একমাত্র হালাল অনুভূতি।
আরহামের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হলো বেশ।কিন্তু ডিনারে আইরা আসলো না।তাঁর ঘরে জোর গলায় তাঁর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
আম্মু আরহামকে খাবার দিতে দিতে বললেন, ‘হাফসা এসেছে।আইরার হাসি যেন থামছে না।মেয়েটার সাথে কথা বলে পাগল করে ফেলবে।’
আরহামের হাত থেমে গেলো।আম্মু বলতে লাগলেন, ‘মাহের এসেছিলো বিকেলে।তোমার ফোন বন্ধ কেন আজ সারাদিন থেকে?’
আরহামের মনে পড়লো সকালে উনি ফোন অফ করেছিলেন আর অপেন করা হয়নি।
পরক্ষণেই মনে পড়লো মাইমুনার কথা।আজ সারাদিন একবারও কথা বলেন নি।আরহাম দ্রুত খাবার সেড়ে রুমে গেলেন।
কল দিতেই মাইমুনা ফোন ধরলেন।সালামের জবাব দেওয়ার আগেই কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল, ‘কি হয়েছে আপনার?আমাকে এতো ইগনোর করছেন কেন?’
আরহাম অপরাধবোধে ভোগলেন।তাকে সামলানোর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সরি হানি।আমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।আর আপনার কেয়ারে এুটি করবো না।প্লিজ ক্ষমা করুন আমাকে।’
মাইমুনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘এখন কথা বলুন আমার সাথে।আমি কালকেই আসতে চাই।’
‘বেশ।আমি সময়মতো এসে যাব।’
‘অপেক্ষা করছি।’
‘মিস ইউ ব্যাডলি।’
‘আমি সারাটাদিন ওয়েট করেছি।এমন তো কখনো ছিলেন না আপনি।’
‘সরি তো।ভুল হয়ে গেছে।ফরগিভ মি।আর কোনো ভুল হবে না ইন শা আল্লাহ।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭
মাইমুনা তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে।অনেকক্ষণ কথা বলেও আরহাম তাকে কোনো কিছু বলেই কান্না থামাতে পারছেন না।মাইমুনার সাথে কথোপকথন শেষ করে ফোন পকেটে ডুকিয়ে ড্রয়ার থেকে চাবিটা বের করে নিচে নামলেন।মায়ের রুম লক করা।আরহাম নক করে বললেন,আম্মু আমি একটু বেরোচ্ছি।টেনশন করবেন না একদম।ইমার্জন্সী।’
আম্মু কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেলেন না।
আরহাম বাইরে বেরোতেই দেখলেন দূটো ছাঁয়া।আইরার কন্ঠ শোনা যাচ্ছে।আরহাম লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোনোদিকে দৃষ্টি না দিয়ে বাইরের দিকে এগোলেন।
