Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১১

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১১

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১১
নুরিয়া ইসলাম

ক্যালিফোর্নিয়ার মেঘে ঢাকা আকাশ, বাতাসে ভাসছে হাজারো কুয়াশা।তারই বুক চিরে আঁকাবাঁকা রাস্তায় গর্জন তুলে ছুটে চলে এরিকের বাইক। সান ফ্রান্সিসকোর দিগন্ত ছোঁয়ার আগেই, হঠাৎই এরিক বাইক ঘুরিয়ে নেয় এক নির্জন, রহস্যে মোড়া পথে। ইনায়ার বুকের ভেতর বাজতে থাকে অজানা আশঙ্কার ঢাক, সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“বাইক ঘুরালেন কেন? আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
তার কথা শূন্যে মিলিয়ে যায়, কারণ এরিক কোনো উত্তর না দিয়ে আরও জোরে বাইক ছুটাতে থাকে।
আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বাইকটা ঢুকে পড়ে ঘন জঙ্গলের গহীনে। চারপাশে গাছের ছায়া, বাতাসে ঝিঁঝিঁ পোকার মৃদু সুর, আর আতঙ্কে ইনায়া তার কোমল হাত দিয়ে এরিককে মারতে শুরু করে, তার স্পর্শে এরিকের মনেও অজানা উত্তেজনা জেগে ওঠে।

হঠাৎ বাইকটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। মুহূর্তের মধ্যে ইনায়া ছিটকে পড়তে গেলে, এরিক এক হাতে তাকে শক্ত করে ধরে ফেলে। মূলত এরিক শুধু ইনায়াকে একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিল, কিন্তু অজান্তেই তারা হারিয়ে যায় জঙ্গলের গভীরে ফেরার পথ নেই, বাইকের টায়ারও পানচার। এমন সময়, হঠাৎ গগন কাঁপিয়ে নামে প্রবল বৃষ্টি, এই বৃষ্টি তাদের বিপদকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।
বৃষ্টির তোড়ে তারা দিগ্বিদিক ছুটতে ছুটতে তাদের চোখে পড়ে জঙ্গলের মাঝে এক ছোট্ট কটেজ, ভেজা শরীর আর কাঁপা হাতে দৌড়ে গিয়ে দু’জনেই সেখানে আশ্রয় নেয়।
ইনায়া আধভেজা অবস্থায় , চোখে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে এরিকের দিকে এগিয়ে আসে, কাঁপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“কী সমস্যা আপনার?আপনি ইউনিভার্সিটিতেও আমাকে শান্তিতে থাকতে দেন না, এখন আবার জঙ্গলে এনে ভয় দেখান! কেন করেন আপনি আমার সাথে এমন?”
এরিক ইনায়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“Keep your fucking voice low, baby girl. Don’t forget, তুমি এখন জঙ্গলে একা আমার সাথে। Watch your fucking tongue. Don’t test me. You really won’t like the consequences.”
এরিক কোনো কথা না বলে ইনায়াকে পাশ কাটিয়ে কটেজের কোণায় রাখা ছোট্ট সোফায় গিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে পড়ে। ইনায়া দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।কিন্তু কিছুক্ষণ পর, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে—মাগরিবের সময় হয়ে গেছে।ভেতরে ভয় আর অস্থিরতা থাকলেও, ঈমানের টান তাকে থামতে দেয় না।সে ব্যাগ থেকে ম্যাট বের করে।তাকে ব্যাগ থেকে ম্যাট বের করতে দেখে এরিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

“এখন আবার কী করছো?”
ইনায়া শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলে,
“আমাকে নামাজ পড়তে হবে।”
এরিক মৃদু ব্যঙ্গ করে বলে,
“Seriously? এই জঙ্গলের মধ্যে, এই পরিস্থিতিতে?”
ইনায়া তার দিকে না তাকিয়ে ম্যাটটা মাটিতে বিছিয়ে বলে,
“বিপদের সময়েই তো আল্লাহকে বেশি মনে করতে হয়।”
সে কিবলার দিক আন্দাজ করে দাঁড়িয়ে যায়, ঠোঁটে ধীরে ধীরে তাকবির উচ্চারিত হয়। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক,তবুও তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি বিরাজ করছে ।এরিক সোফায় বসে ইনায়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,

“সে বুঝতে পারে না, কীভাবে এই মেয়েটা এত ভয় আর অনিশ্চয়তার মাঝেও এত শান্ত থাকতে পারে।কী আছে এই নামাজের মধ্যে,যে এই মেয়েটা নামাজকে সবসময় এত প্রায়োরিটি দেয়।”
এরিকের ভাবনার মাঝেই, ইনায়া নামাজ শেষ করে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।তখনি পিছন থেকে এরিককের তাচ্ছিল্যে ভরা কন্ঠস্বর ভেসে আসে, সে ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“Where is your Allah now, babygirl? তাকে বল না, আমাদের এইখান থেকে বের করতে।”
ইনায়া শান্ত চোখে তার দিকে তাকায়, কণ্ঠে অবিচল দৃঢ়তা
“তিনি আছেন… সবসময়। কিন্তু আপনি হয়তো বুঝবেন না।”
ইনায়ার কথা শুনে এরিকের ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো, সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
“ওহ,really,তাহলে বল না, তোমার আল্লাহ’কে প্রকাশ্যে আসতে, আমিও দেখি তিনি দেখতে কেমন?
এরিকের এই ধরনের আজগুবি কথায় ইনায়া দাঁত কটমট করে এরিকের দিকে তাকালো।এরিক তা দেখে একটা ডেভিল হাসি দিয়ে বললো,

“এইদিকে আসো বেবিগার্ল, আর কতক্ষণ এই ঠান্ডায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকবা!তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
ইনায়া এরিককের কথা কানেই তুললো না, সে ঠাঁই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল আর ধীর কন্ঠে এরিককে খোঁচা মেরে, একটা বাক্যই আওড়ালো,
“ধন্যবাদ আপনাকে!আমার বিষয়ে এতটা ভাবার জন্য।”
ইনায়ার এই হেয়ালিপনায় এরিকের রাগ চরমে ওঠে গেল, সে ঠান্ডা অথচ কঠোর কণ্ঠে বলে,
“এদিকে এসো, আমার পাশে বসো। আমাকে দ্বিতীয়বার বলতে বাধ্য করো না।”
ইনায়া এরিকের কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে দরজার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, চোখে স্পষ্ট অবজ্ঞা ফুটে উঠে । তার এই ঘাড় ত্যাড়ামি একদম সহ্য হয় না এরিকের। তাইতো সে দাঁতে দাঁত চেপে শীতল কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে,
“Don’t fucking test me, babygirl. তুমি কল্পনাও করতে পারবে না, আমি কী করতে পারি। If you push me, I can be your worst fucking nightmare.

তাই ভালোয় ভালোয় বলছি, অবাধ্য হলে ফল ভালো হবে না। এখনই আমার পাশে এসে বসো।”
ইনায়া আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে গিয়ে এরিকের পাশে বসে। চারপাশে ঘন জঙ্গল, ঝুম বৃষ্টি, আর ইনায়ার মনে অজানা আতঙ্ক ভিড় করে। এই নির্জনতায় এরিক যদি কিছু করে ফেলে, নিজেকে রক্ষা করার কোনো উপায় নেই।
শক্ত মনের মেয়ে হয়েও এই মুহূর্তে ইনায়ার বুকের ভেতর ভয় ঢেউ খেলে যায়, একা একটা ছেলের সঙ্গে অজানা কটেজে সবকিছুই যেন আরও অনিশ্চিত আর অজানা হয়ে উঠে তার কাছে।
সন্ধ্যা নামার আগে ক্যালিফোর্নিয়ার জঙ্গল ভয় আর রহস্যের ছায়ায় ঢেকে যায়। বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে, গাছের ডালপালা অন্ধকারের আঁচলে ঢেকে ফিসফিসিয়ে ওঠে অজানা ভাষায়। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ছায়ারা নড়ে, কোথাও হঠাৎ ডানা ঝাপটানোর শব্দে বুক কেঁপে ওঠে। সূর্যের শেষ আলো গাছের গায়ে রক্তিম ছোপ ফেলে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।মনে হয়, জঙ্গল তার গোপন রহস্য নিয়ে জেগে আছে, আর এক পা বাড়ালেই অজানা ভয় এসে বুক চেপে ধরবে।

ঘুমের গভীরে ডুবে থাকা ইনায়া টেরই পায়নি, কখন নিজের শত্রুর কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। এরিক মুগ্ধ দৃষ্টিতে ইনায়ার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কয়েক মুহূর্তে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।নিজেও বুঝে ওঠে না, কেন এই মেয়েটা পাশে থাকলে তার বুক এত জোরে ধুকপুক করে। ভালোবাসা নয়, কিন্তু কোনো অজানা টান বারবার তাকে নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার দিকে টেনে নেয়; এই ভাবনায় সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কিছুক্ষণ আগেই মেয়েটা কত মিনতি করেছিল তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। ধীরে ধীরে বৃষ্টি থেমে আসে, চারপাশে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকে ইনায়া চমকে উঠে বসে,
ইনায়াকে উঠতে দেখে এরিক বাঁকা হেসে স্বভাবসুলভ মুখে গাম্ভীর্য এনে বলল,

“ওয়াও,শেষ পর্যন্ত ম্যাডামের ঘুম ভাঙ্গলো। কাঁধটা কি এতোটাই আরামদায়ক ছিল, নাকি আমার উপরেই ঘুমানোর নতুন শখ হয়েছে তোমার?”
ইনায়া এরিকের কোন কথার জবাব না দিয়ে কাট কাট গলায় জিজ্ঞেসা করে,
আমরা কী সারা রাত জঙ্গলেই কাটাবো নাকি?
এরিক ইনায়ার দিকে এক ভ্রু উঁচু করে বাঁকা হেসে বলল,
“তোমার সাথে জঙ্গলে রাত কাটাতে আমার কোনো আপত্তি নেই, বরং বেশ মজাই লাগবে মনে হচ্ছে!”
ইনায়া এরিককের কথায় বিরক্ত হয়ে বলে দাঁত কটমট করে বললো,
আপনার বাজে কথা রাখুন। এইখান থেকে কী করে বেরোবো এই চিন্তা করুন। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে, ভাইয়া নিশ্চয়ই চিন্তা করছে। দয়া করে কিছু করুন।

এরিক ভাবলেশহীন মুখে ইনায়ার প্রতিটি নড়াচড়া গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করে কেন করছে জানে না, কিন্তু অদ্ভুত এক ভালো লাগায় মন ভরে যায়। ইনায়া হঠাৎ ডাক দিলে সে বাস্তবে ফিরে আসে।
ইনায়াঃ “কি হলো? চলুন, আমাদের তো এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে হবে।”
এরিক নীরবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
এই ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন জঙ্গলের মধ্যে তারা দু’জন গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে একটা ক্ষীণ আলো দেখতে পেয়ে ওই দিকেই ছুটতে শুরু করল।
আলোটা কোথা থেকে আসছে, সেটা জানার কৌতূহলে এগিয়ে যেতে থাকে।
চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, হালকা ঠান্ডা বাতাস, আর বৃষ্টির শেষ ফোঁটা এই পরিবেশে তারা নীরবে এগিয়ে চলে।
হঠাৎ ইনায়া পা পিছলে পড়ে যেতে গেলে এরিক দ্রুত হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে, ইনায়া একটু বিরক্ত হয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
ইনায়া শুধু এই মুহুর্তে নিরাপদে ফেরার কথা ভাবে, আর এরিক চুপচাপ তার অনুভূতিগুলোকে বুঝতে চেষ্টা করে।হাঁটতে হাঁটতে তারা হাইওয়েতে গিয়ে একটা গাড়ি থামিয়ে লিফট নেয়।

মিস্টার তানভীর তখন থেকেই হলরুমে অস্থির পায়ে হাঁটছিলেন। মারিয়া এগিয়ে এসে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“এতো চিন্তা করো না, ইনায়া ঠিক আসবে।”
তানভীর কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“তুমি বুঝবে না মারিয়া, ঘড়ি দেখেছো? এত দেরি তো সে কখনো করে না।”
হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে।
মারিয়া দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখে, ইনায়া কাকভেজা, ক্লান্ত চোখে দাঁড়িয়ে।
মারিয়া ওকে দ্রুত ঘরে টেনে আনে।
মিস্টার তানভীর গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চায়,
“এতক্ষণ বাইরে কী করছিলে? তোমার ইউনিভার্সিটি তো অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে।”
ইনায়া কাঁপা কণ্ঠে, চোখ নামিয়ে বলল,
“ভাইয়া, আজ কেন জানি একটাও ক্যাব পাইনি… তাই দেরি হয়ে গেছে।”
তানভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বোনের ভয়ে কাঁপা মুখটা দেখে ধীরে কাছে গিয়ে মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেয়।
কিছু না বলে, শুধু ভালোবাসায় ভরা চোখে তাকিয়ে চলে যায়।

USC ক্যাম্পাসের শান্ত পরিবেশে বেঞ্চে বসে জুলি হেডফোনে হারিয়ে ছিলো নিজের সুরের জগতে। হঠাৎ, নরম বাতাসে গোলাপের সুবাস ভেসে আসে তার নাকে,সে চোখ মেলে সামনে তাকাতেই , এ্যালেক্স একগুচ্ছ লাল গোলাপ হাতে নিয়ে জুলির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, চোখে তার গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠে । এ্যালেক্স ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দেয় জুলির দিকে, আস্তে করে বলে,
“আই লাভ ইউ”
জুলি একটু বিরক্ত হয়ে এ্যালেক্সের দিকে তাকায় এতবার বলার পরও কেন ছেলেটা বুঝতে চায় না, সে তার ভালোবাসা চায় না। বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও কেন ফিরে আসে, এই ভাবনায় জুলি নিঃশ্বাস ফেলে।
কাট কাট গলায় নয়, বরং নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

“আর কতবার বললে বুঝবি, আমার পক্ষে তোকে ভালোবাসা সম্ভব নয়, এ্যালেক্স।”
এ্যালেক্স হতাশায় গোলাপের গুচ্ছটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে, তারপর জুলির হাত দুটো শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বলে,
“কেন পারিস না বল? কী এমন কমতি আছে আমার মধ্যে ? ছোটবেলা থেকে তোকে ভালোবাসি, সবাই জানে তবুও তুই কখনো আমার ডাকে সাড়া দিসনি।”
জুলি চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“দেখ এ্যালেক্স, তুই জানিস কেন আমি আর কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাই না। আমার অতীত জানিস। আমি আর দ্বিতীয়বার কষ্ট পেতে চাই না।
এ্যালেক্স: “সবাই এক নয়, জুলি। আমায় একবার ভালোবাসার সুযোগ দে। ভালোবাসার প্রতিটা মুহূর্তে তোকে আগলে রাখব। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তোকে কোনোদিন কষ্ট দেব না।”
জুলি কোনো উত্তর না দিয়ে নীরবে চলে যায়, তার চোখে একরাশ বেদনা। পেছনে এ্যালেক্স গোলাপের গুচ্ছ হাতে নিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা শূন্যতা।

USC ক্যাম্পাস,
সেইদিনের ঘটনার পর ইনায়া সাহস করে ভার্সিটিতে ফিরলেও টানা দুইদিন ক্লাসে যেতে পারেনি।
আজ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে ক্লাসরুমে ঢোকে সে।
আজ কারও মুখে কোনো বাজে কথা নেই। হলরুম জুড়ে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে ।
সে নিজের সিটের দিকে এগোতেই চোখে পড়ে, এরিক দুই পা মেলে বেঞ্চে বসে আছে।
ইনায়া তাকে দেখেও না দেখার ভান করে সামনে এগোতেই, হঠাৎ পিছন থেকে গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠে ভেসে আসে,
এরিকঃ “কোথায় যাচ্ছ জুনিয়র, বেবি? আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার সাহস কবে থেকে হলো তোমার?”
ইনায়াঃ সাহস আমার বরাবরই মিস্টার এরিক অ্যাসফোর্ড। আশা করি, নতুন করে আপনাকে আর প্রমান দিতে হবে না।

এরিকঃ “জুনিয়র বেবি, তুমি কিন্তু আমার ধৈর্যের পরিক্ষা নিচ্ছো। একবার আমি কন্ট্রোল হারালে, তুমি সামলাতে পারবে না। চুপচাপ পাশে এসে বসো।
এরিকের কথা শুনে ইনায়া এরিককের চোখে চোখ রেখে বললো,
“আমার মনে হয় আপনি ভুল ক্লাসে এসেছেন, সিনিয়র? এটা ভয় দেখানোর ক্লাস নয়।
এরিক ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“না বেবি, আমি তো একদম ঠিক জায়গায় এসেছি।”
এরিক এইবার বেঞ্চের উপর থেকে পা সরিয়ে ইনায়ার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
তোমার এই সাহসটা আমার খুবই পছন্দ, জানো?
কিন্তু মনে রেখো, আগুন নিয়ে খেললে পোড়ার ভয় থাকেই।আজ তোমাকে একটু বেশিই ডিস্টার্ব করতে ইচ্ছে করছে তাই তো ছুটে এসেছি। চুপচাপ আমার পাশে বসো, বেবিগার্ল। না বলার চেষ্টা করো না, কারণ আমার ধৈর্য খুব সীমিত। আর যদি না বসো, ক্লাসটা তোমার জন্য একটু বেশিই কঠিন হয়ে যাবে।”
ইনায়া আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, ক্লাসের সবার কৌতূহলী দৃষ্টি এড়িয়ে চুপচাপ এরিকের থেকে একটু দূরে গিয়ে বসে।

কিন্তু এই নীরবতার মাঝেও একজোড়া চোখ তার দিকে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে থাকে।ইনায়াকে এরিকের পাশে বসতে দেখে অলিভিয়ার মুখে রাগের ছায়া নেমে আসে, মনে মনে ফুঁসতে থাকে সে,
“এই মেয়ে আবার এরিকের পাশে কী করছে? সবসময় দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা এরিক শুধু আমার!এই মেয়েকে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে।
কিছুক্ষণ পর স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন।তিনি এরিককে দেখে একটু অবাক হলেও, কোনো কথা না বলে ক্লাসে মনোযোগ দিলেন।
এরিক তখনও গভীর দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। ইনায়া সেটা টের পেয়ে হালকা কণ্ঠে বলল,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১০

“এভাবে তাকিয়ে থাকলে সবাই ভাববে, আমি আপনার কোনো সমস্যা করে ফেলেছি।”
এরিক ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“সমস্যা তো করেছই, বেবিগার্ল। এত বড় সমস্যা করেছো যে, আমি বুঝতে পারছি না, তোমাকে ক্লাসে মনোযোগ দিতে দেবো নাকি শুধু তোমাকেই দেখবো!”
ইনায়া চোখে লুকানো লালিমা নিয়ে, একটু কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“দয়া করে আমাকে এভাবে দেখা বন্ধ করুন, এতে আমি অস্বস্তি বোধ করছি। ”

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১২