Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১০

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১০

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১০
Tahmina Akhter

হুট করে পার্কের পাশে মানুষের হট্টগোল পরে গেল। মানুষ সেদিকেই যাচ্ছে। মেঘালয়ের মনটা কেন যেন ধুক করে উঠল! আলোকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে চলে গেল হট্টগোলের দিকে। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখল তার মা মাহরীন অচেতন হয়ে পিচঢালা রাস্তায় পরে আছে। মেঘালয় মাহরীনের সামনে হাঁটুগেড়ে বসল। গাল ধরে কয়েকবার “মা” বলে ডাকল কিন্তু মাহরীনের দিক থেকে কোনো সাড়া নেই৷ ততক্ষণে আলো চলে এসেছে। মাহরীনের সামনে বসে মাহরীনের হাত ধরে কয়েকবার ডাক দিলো। কিন্তু মাহরীন নিশ্চুপ।

— কারো কাছে পানি হবে?
মেঘালয় চিৎকার করে বলল। পাশের ফুচকা স্টলের একজন লোক পানি এনে দিলো। আলো হাত বাড়িয়ে পানি নিয়ে মাহরীনের চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। কিন্তু, মাহরীন…
মেঘালয় উঠে দাঁড়ালো তারপর ড্রাইভারকে কল করতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রাইভার কার নিয়ে সেখানে এলো। ভাগ্যিস গাড়িটা এখানে ছিল। মেঘালয় ভিড় কমাতে বলল সবাইকে উদ্দেশ্য করে।
মূহুর্তের মধ্যে সবাই সড়ে দাঁড়াল। মেঘালয় তার মাকে কোলে তুলে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। মাহরীনকে গাড়ির সিটে বসিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখল আলো দাঁড়িয়ে আছে। মেঘালয় বুঝতে পারল আলোর কি চাই?
— উঠে বসুন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মেঘালয় সরে দাঁড়াতেই আলো মাহরীনের বাম পাশে বসল আর মেঘালয় ডানপাশে। ড্রাইভার ততক্ষণে গাড়ি স্টার্ট করে রওনা হলো সিএইচসিআর হসপিটালের উদ্দেশ্য। মেঘালয় ইতিমধ্যে কাব্য এবং মাশফিকে কল করে জানিয়ে দিলো। এবং এটাও বলল যেন মাহরীনের রিপোর্টগুলো নিয়ে অতিদ্রুত হসপিটালে চলে আসে।
আলো সব শুনছে। কিন্তু বোধগম্য হচ্ছে না আসলে মাহরীনের কি হয়েছে? মাহরীন কি আগে থেকেই অসুস্থ? সেদিনও মানুষটা হুট করে অসুস্থ হয়ে পরাতে আলোর সঙ্গে তার দেখা হলো। মাহরীনের হাত ধরা অবস্থায় কথাগুলো ভাবছিল আলো। ঠিক সেইসময় মেঘালয়ের কথা শুনে আলো মাথা উঁচু করে তাকালো।

— আপনার বাবাকে কল করে বলে দিন। নয়ত দুশ্চিন্তা করবে।
মেঘালয় মোবাইল বাড়িয়ে রেখেছে আলোর দিকে। আলো দেখল খুব চমৎকার একটা মোবাইল ফোন। কিন্তু এই মোবাইল কিভাবে ইউজ করতে হয় সে তো জানে না?
— আমি তো এই মোবাইল ইউজ করে অভ্যস্ত নই। আমি বাবার নাম্বারটা বলছি, আপনি ডায়াল করে দিন।
মেঘালয়ের তখন অবাক হবার কথা কিন্তু ওকে কোনো সেন্স যেন কাবু করতে পারল না। মায়ের জন্য করা দুশ্চিন্তা তাকে আর অন্যকিছুতে মনোযোগী করতে পারল না। আলো নাম্বার বলল। মেঘালয় সেই নাম্বারে কল ডায়াল করে আলোর দিকে বাড়িয়ে দিলো। আলো মোবাইল হাতে নিয়ে কানে ধরল। আফসার সাহেব কল রিসিভ করতেই, আলো সংক্ষিপ্ত আকারে সব ঘটনা খুলে বলল৷ এখন যে সে হসপিটালে যাচ্ছে সেটাও বলল। আফসার সাহেব জানালেন, তিনি রওনা হচ্ছেন। হসপিটালের নাম জিজ্ঞেস করল। আলো হসপিটালের নাম বলে কল রেখে দিতে বলল ওর বাবাকে। আফসার সাহেব কল কেটে দিলো।

এদিকে গাড়ি এবার রেলগেট পেরিয়ে জিইসির পথে। মেঘালয় মাহরীনের দিকে তাকিয়ে আলোকে বলল,
— মা, লিউকেমিয়ার প্যাশেন্ট৷ স্টেইজ টুতে আছে। দিনদিন মা’র শরীর খারাপ হচ্ছে।
মেঘালয় চুপ হয়ে যায়৷ মাহরীনের মুখের দিকে তাকিয়ে আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—মায়ের অনেক ইচ্ছা আপনাকে আমার স্ত্রী হিসেবে দেখার৷
আলো মেঘালয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারল না। মাহরীনের অচেতন মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সব ইচ্ছা কি পূরণ করা সম্ভব?

এরপর মেঘালয় আর কথা বাড়ায় না। মাহরীন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মাহরীনকে এডমিট করানো হলো। এই হাসপাতালে মাহরীনের চিকিৎসা চলছে। ইতিমধ্যে মাশফি, তানিয়া, কাব্য, ইতি হসপিটালে পৌঁছে গেছে। মাশফি মাহরীনের রিপোর্ট গুলো মেঘালয়ের কাছে দিতেই মেঘালয় রিপোর্টগুলো নিয়ে মাহরীনের ডাক্তারের কেবিনের প্রবেশ করল। ডাক্তার নতুন করে সব টেস্ট করার জন্য সাজেস্ট করল। মেঘালয় সব শুনল। তারপর, ডাক্তারকে বলল,
— একটু কি উন্নতি হয়নি? এত এত চিকিৎসা দেয়ার পরও কি মায়ের হেলথ ভালো হবার চান্স নেই?
— রোগ সম্পর্কে আবেগী কথা বলা যায় না। আপনি নিজেও ডাক্তার। আমি সন্দেহ করছি যে আপনার মা এখন স্টেইজ ফোরে আছে। চিকিৎসা চললে বড়োজোর তিনমাস তিনি বেঁচে থাকবেন….

মেঘালয়ের যেন পুরো আকাশ ভেঙে পরল মাথার ওপর। মা’কে ছাড়া সে নিজেকে কল্পনা করতে পারে না। সেদিনকার বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মেঘালয়ের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। চোখের জল গড়িয়ে পরার আগেই ডাক্তার এক্সকিউজ মি বলে বের হয়ে আসে। বুকটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কি করলে মা’কে বাঁচানো যাবে? কি করলে তাদের মা তাদের ছেড়ে অসীম যাত্রায় রওনা হবে না? কি করলে মায়ের আঁচলে ঢেকে থাকবে সারাজীবন? মেঘালয়কে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতে দেখে মাশফি এবং কাব্য দু’জনেই এগিয়ে যায়। মাশফি জিজ্ঞেস করে,
— কি বলল, ডাক্তার?
মেঘালয় হুট করে মাশফিকে জড়িয়ে ধরল। কাব্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তানিয়া, ইতি আর আলোর একই অবস্থা। অজানা আশংকার ওদের বুক কেঁপে ওঠে।

— ভাইয়া, মা..। মাকে ছাড়া কিভাবে থাকব আমি? রাতবিরেতে যখন বাড়িতে ফিরব তখন আমার জন্য কে টেবিলে বসে অপেক্ষা করবে?বলো না ভাইয়া? কোথায় নিয়ে গেলে, মা সুস্থ হবে??
মাশফি আর কাব্য যেন নিজেদের মধ্যে নেই। ছেলে মানুষ নাকি কাঁদতে পারে না। কাব্য, মাশফি আর মেঘালয় যেন তাদের মায়ের শেষ পরিণতির খবর শুনে এতটাই ভেঙে পরল যে তাদের চোখের কোনে পানির উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।

এরপরের অবস্থা থমথমে। মাহরীনের চিকিৎসা চলছে। মেঘালয়, কাব্য আর মাশফি হসপিটালে রয়ে গেছে। আলোকে ওর বাবা এসে নিয়ে গেছে ঘন্টাখানেক আগে।
পুরো একটা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালের স্নিগ্ধ রোদের পরশে মেঘালয় চোখ খুলল। করিডরে পেতে রাখা সারিবদ্ধ চেয়ারে তিন ভাই রাত কাটিয়ে দিয়েছে। কাব্য আর মাশফি তখন চেয়ার গা এলিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেঘালয় ওয়াশরুম গিয়ে মুখে পানির ছিটা দিয়ে বের হয়ে সোজা চলে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে মাহরীনের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পেল মেঘালয়।
কেবিনে ঢুকতেই মেঘালয় দেখতে পেলো মাহরীনের ক্লান্ত মলিন চেহারা। ধীরপায়ে এগিয়ে যায় মাহরীনের বেডের পাশে। মাহরীন যেন মেঘালয়ের উপস্থিতি টের পেলো। কোনোমতে চোখ খুলে হাসিমুখে বলল,

— তোদের আবারও বিরক্ত করছি তাই না, মেঘ?
মেঘালয় তার মায়ের কথা শুনে মাহরীনের হাত ধরে কান্না ধরা গলায় বলল,
— কে বলল মা এমন কথা?
— আমার সময় হয়ে গেছে রে মেঘালয়। আমি বোধহয় বাঁচব না বেশিদিন।
— এমন কথা বলো না। ঠিক হয়ে যাবে তুমি। ডাক্তারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমরা ভারতে নিয়ে যাব তোমাকে। সেখানকার চিকিৎসা অনেক ভালো।
— আর ভালো লাগে না হসপিটাল আর হসপিটালের গন্ধ। মেঘালয়?
— বলো, মা?
তখনও মেঘালয় শক্ত করে ওর মায়ের হাত চেপে ধরে রেখেছে।
— আলো রাজি হয়েছে?
মেঘালয় চুপ হয়ে যায়। কি বলবে তার মা’কে? আলোর সঙ্গে তার সম্পূর্ণ কথা হয়নি। মেয়েটা তাকে কি যেন বলতে চেয়েছিল? কিন্তু..

— চুপ করে আছিস কেন?
মাহরীনের কথায় মেঘালয় ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে আসে। মাহরীনের হাতটা তার কপালে ঠেকিয়ে বলল,
— আলো রাজি হয়েছে, মা। তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে দেখবে তোমার মেঘালয় তোমার ইচ্ছা অনুসারে ঘোড়ায় চড়ে আলোকে বউ বানিয়ে তোমার বাড়িতে নিয়ে আসবে। আচ্ছা মা, ঘোড়া ম্যানেজ করবে কোত্থেকে?
মেঘালয়ের সুন্দর মিথ্যা কথা শুনে মাহরীনের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
— তুই সত্যি বলছিস! আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না!
— হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি কথা বলছি আমি। তুমি এবার নিজের শরীরের দিকে নজর দাও। তোমার ছোট ছেলের বউকে তোমার বরণ করতে হবে তো,মা?

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৯

মাহরীনের ঠোঁটের কোণ থেকে যেন হাসি সড়ছে না। মেঘালয় জানে না সে কেন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে? তবে এতটুকু বুঝতে পারল, আলোকে তার যে করেই হোক বিয়ের জন্য রাজি করাতে হবে। মায়ের শেষ ইচ্ছে সে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সে পূরণ করবেই৷

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১১