Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৯

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৯

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৯
Tahmina Akhter

আলোর বাবা আলোর কথা রাখলেন। মাহরীনকে কল করে জানিয়ে দিলেন আলো এখনই বিয়ে করতে রাজি নয়। মাহরীন যেন এই ভয়টা পাচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। কারণ, আলো মেয়েটা একটু ডিফারেন্ট। বিলাসিতা, টাকা-পয়সার দিকে তেমন ওর আর্কষণ নেই। কাব্যের রিসিপশনের দিন বুঝতে পেরেছেন তিনি। মেয়েটাকে সেদিন ঘরের ভেতরে রেখে যাচাই করেছেন। আলমারীর চাবি লকের জায়গায় ঝুলিয়ে রেখে বের হয়ে গিয়েছিলেন। আলমারীতে প্রায় পনেরো ভরির মত স্বর্নালংকার ছিল। ক্যাশ ছিল পাঁচ লক্ষ টাকা। মেয়েটা এতটাই নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে রেখেছিল যে,খাটের যেই জায়গায় বসেছিল সেই জায়গাটা অব্দি একটু কুঁচকাতে দেয়নি।

ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেছে। কাব্য আর ইতির ফ্লাইট আগামী সপ্তাহে। এরই মাঝে যদি মেঘালয় আর আলোর মাঝে কিছু একটা করা যেত!
আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতেই মাহরীন সিদ্ধান্ত নিলো সে আজ আলোর কোচিংয়ে যাবে। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা জরুরি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাহরীন কাউকে না জানিয়ে ড্রাইভারকে নিয়ে রওনা হলো কোচিংয়ে। ড্রাইভার সেই কোচিং সেন্টার চেনে বলে ব্যাপারটা আরও সহজ হয়ে গেল।
আলো সবেমাত্র কোচিংয়ে ভেতরে ঢুকতেই যাবে তার আগেই মাহরীন আলোর সামনে এসে দাঁড়ালো। আলো মাহরীনকে দেখে অবাক হয়ে যায়।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— আন্টি, আপনি এখানে!
— তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।
—কিন্তু আন্টি আমার ক্লাস..।
— আমি ছুটি নিয়েছি। কাব্যের পরিচয় দিয়েছি বলে সহজ হয়েছে। এখন চলো আমার সঙ্গে।
আলোকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনের ছোট্ট একটা পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলো তারা। চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলীতে শেখ রাসেল নামক শিশুপার্কে তারা প্রবেশ করল। সারিবাঁধা গাছ। স্মৃতি-স্তম্ব, শহীদ মিনার, পাশেই ব্যস্ত রাস্তা । যেখানে রোজ হাজার হাজার গাড়ি ছুটে চলে নিজ গন্তব্যে। ঢালু পথ পেরিয়ে সামান্য পাহাড়ের ওপরে গেলেই দেখা মিলে বাংলাদেশ রেলওয়ে জাদুঘরের। ভেতরে আছে অসংখ্য তারসংযোগের টেলিফোন, রেলপথের ছোট প্রজেক্ট, কিছু ট্রেনের যন্ত্রাংশ সহ আর অনেককিছুই আছে।
মাহরীন আলোকে নিয়ে স্মৃতি স্তম্ভের সামনের সিঁড়িতে বসল। চারপাশে কোলাহল মাহরীনকে স্পর্শ করছে না। আলোর মাথায় হাত রেখে আদুরে সুরে মাহরীন জিজ্ঞেস করলো,

— আমার মেঘালয় কি দেখতে খারাপ? নাকি যোগ্যতা কম? ওকে রিজেক্ট করার কারণ কি আলো?
— উনার সঙ্গে দাঁড়াবার যোগ্যতা আমার নেই, আন্টি। আমি দেখতে কালো, আমরা মধ্যবিত্ত। আপনারা বড়লোক। উনি ডাক্তার মানুষ। উনি আমার থেকেও ভালো মেয়ে ডির্জাভ করে।
আলো ধীরে ধীরে নিজের কথাগুলো মাহরীনের সামনে উপস্থাপন করল। মাহরীন সবটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, আলোর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাস্তায় ছুটে চলা চলন্ত গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

— কিন্তু, আমি তো চাই তুমিই আমার মেঘালয়ের বউ হবে। বাহ্যিক যোগ্যতা দিয়ে মানুষ কেমন হয় বিচার করতে পারি না, আমি?
আলো বিস্মিত হয়ে গেল। মাহরীনের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আলো। মনে মনে ছক আঁকতে শুরু করল। মাহরীনকে কোনোভাবে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, তিনি আলোকে হয়ত অধিক পছন্দ করে ফেলেছেন। আলো নিজের কমতির কথা কেন জানি মাহরীনকে বলতে ইচ্ছে করছে না! কে বা চায় নিজের কমতি সম্পর্কে বলতে? কে চাইবে তাকে কেউ করুনার চোখে দেখুক? তাছাড়া, মাহরীনকে সে মায়ের স্থানে বসিয়েছে। মেঘলায়কে সে বিয়ে না করুক কিন্তু মাহরীনের সঙ্গে সু-সম্পর্ক রাখতে চায়।

— আন্টি, আপনি একবার উনাকে এখানে আসতে বলবেন? উনার সঙ্গে আমি কথা বলব। যদি উনার সঙ্গে কথা বলার পর আমি হয়ত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।
আলোর কথা শুনে মাহরীনের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
— উনিটা কে? আমার মেঘালয়?

মাহরীনের কথায় এবার আলোর কেন জানি লজ্জা পাচ্ছে! সামান্য একটা শব্দকে ঘিরে কেউ মজা করতে পারে!
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আলোর এবার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কারণ, তার বাসায় ফিরে যাবার সময় হয়ে গেছে। বাসায় ফিরে যাবার সময় এদিক-সেদিক হলেই সিতারা বেগম তো চেঁচামেচি করবেই। তার বাবাও চিন্তা করবে। এদিকে মাহরীন আর আলো আধঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছে মেঘালয়ের জন্য। মাহরীন মেঘালয়কে এখানে আসতে বলেছে আর্জেন্ট।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেঘালয় এসে পৌঁছেছে সেখানে। মাহরীনের মোবাইলে সে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করল। কোথায় আছে ওরা? মাহরীন স্থানের নাম বলার পাঁচমিনিট পর মেঘালয় সেখানে উপস্থিত হলো। মাহরীনের পাশে আলোকে দেখে মেঘালয় থমকে যায়। ভেবেছিল আলোর সঙ্গে তার মায়ের পাতানো সম্পর্ক শেষ। কিন্তু, এখনও সম্পর্ক টিকে আছে। এদিকে আলোর লজ্জা লাগছে। সেদিনকার ঘটনার পর থেকে মেঘালয়ের দিকে তাকানোর সাহসটুকু হারিয়ে গেছে।

— আমি ওদিকটায় আছি। তুই আলোর সঙ্গে কথা বল।
মেঘালয়কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মাহরীন চলে গেল। মেঘালয় বোকার মত তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কি কথা বলবে? আলো সেদিন না জানিয়েছে। মেঘালয় মেনে নিয়েছে। কারণ, বিয়ে-শাদির ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি ব্যাপারটা চলে না। আলোর সিদ্ধান্তকে সে পূর্ণ সম্মান জানিয়েছে। কিন্তু, তার মা যে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি আজই বুঝতে পারল। মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, আলোর থেকে ঠিক দুইহাত দূরে বসে পরল। আলো খানিকটা সরে বসল৷ মেঘালয় এবার স্মৃতি স্তম্বের লাল টাইলসের মেঝেতে দৃষ্টি রেখে বলল,

— আপনি যদি সেদিন হ্যা বলতেন তাহলে আমার অনুমান ভুল প্রমাণিত হত। অবশ্য না করেছেন শুনেও খানিকটা অবাক হয়েছি।
— অবাক হোননি। আপনার ইগোতে লেগেছে বোধহয়?
কথাটি কটাক্ষের সুরে বলল আলো। কারণ, সে এখনও মেঘালয়ের সঙ্গে মোটেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে না। মেঘালয়ের তার প্রতি বিরুক্তি জন্মালে চলবে। কারণ, ছেলের মা হাজারবার চেষ্টা করুক কিন্তু ছেলে রাজি না হলে বিয়ে হবে কি করে? নিজের বুদ্ধির কথা ভেবে আলো যেন ভেতরে ভেতরে স্বস্তি পাচ্ছে ।
মেঘালয় আলোর কথা শুনে অবাক হলো। আলো টের পেলো কীভাবে? আসলেই তার ইগোতে লেগেছে। যদিও সে জানত আলো তাকে রিজেক্ট করবে। কিন্তু রিজেক্ট করেছে শোনার পর মেঘালয়ের অস্বস্তি হয়। কারণ, মেঘালয়কে রিজেক্ট করার কোনো কারণ নেই। মেঘালয়ের মত ছেলেদের মেয়ের বাবা-মায়েরা খুঁজছে। মেয়েটা যে শক্ত ধাঁচের আরও একবার সে টের পেলো।

— আমি মাহরীন আন্টিকে সন্মান করি, ডাক্তার সাহেব। উনি আমার কাছে ছুটে এলেন আজ। কিন্তু, উনাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু, আমিও যে অপারগ হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার মত মেয়ে আপনার যোগ্য কখনোই হতে পারে না। আপনি আপনার মত কাউকে ডিজার্ভ করেন।
আলো অদূরে পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়া অস্তমিত সূর্যটার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল। মেঘালয় মাথা নীচু করে সব শুনল। তারপর, মাথা তুলে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি যেই ফ্যাক্টগুলো বলছেন সেগুলো আমিও জানি। কিন্তু, এই পৃথিবীতে সব জায়গায় ফ্যাক্টের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে যায়। মেঘালয়ের কাছ থেকে এমন উত্তর সে আশা করেনি। ভেবেছে মানুষটা তার কথায় সায় দেবে!

— তো আপনি কি বলতে চাইছেন আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হওয়া উচিত। বিয়ের মত একটা চিরস্থায়ী সম্পর্কে দুই ফ্যামিলির স্ট্যাটাস, মিল-অমিল, গুন-খুঁত এগুলো কোনো ফ্যাক্ট না, আপনি বলতে চাইছেন?
— অবশ্যই ফ্যাক্ট আছে। কিন্তু, এই ফ্যাক্ট নির্ভর করছে মেনে নেওয়া কিংবা মেনে না নেওয়াতে। মেনে নিলে কোনো ফ্যাক্টের ভ্যালু নেই। আর মেনে না নিলে হাজারটা ফ্যাক্ট দাঁড় করানো যায়।

আলোর হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নিজের ওপর ধিক্কার জানাতে ইচ্ছে করছে। তার এমন সোনায় বাঁধানো কপালই যদি ছিল তাহলে তাকে এতবড় খুঁত কেনো শরীরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে? মাহরীন কেন তার জীবনে এলো? মাহরীন এসেই তার জীবনে ম্যাজিক করছে? আলোর বুকের ওপর চাপ যেন দ্বিগুণ হলো। ভেবেছিল মেঘালয়কে সাধারণ কিছু কথা বলে ফিরিয়ে দেবে। এবং সামনের দিকে যেন বিয়ের আলাপ নিয়ে কোনো কথা না-হয় সেই ব্যাপারে বলবে।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৮

কিন্তু, সাধারণ কথায় মনে হচ্ছে না মেঘালয় রাজি হবে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে সবটা জানাবে মেঘালয়কে। সবটা জানার পর নিশ্চয় আর আলোকে বিয়ে করতে চাইবে না। কোনো পুরুষ চায় না তার স্ত্রীর খুঁত থাকুক। অতি নিখুঁত সুন্দরী স্ত্রীরা মাঝে মাঝে স্বামীকে আকৃষ্ট করতে পারে না। সেখানে আলোর কি আছে? না আছে সৌন্দর্য আর না আছে পরিপূর্ণ দেহ। কাটাছেঁড়া দেহটাকে নিয়ে বড়াই করতেও আলোর মুখে বাঁধে।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১০