Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২২

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২২

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২২
নুরিয়া ইসলাম

রাত অনেক গভীর হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা বৃষ্টিও অবশেষে থেমেছে। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছে , যেন পুরো শহরটাই নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে । বৃষ্টির শেষ কণাগুলো এখনো জানালার কাঁচে আটকে টুপটাপ ঝরে পড়ছে, বাইরে গাছের পাতায় জমে থাকা জলকণাগুলো চাঁদের আলোয় হালকা দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এমন গভীর, নিস্তব্ধ রাতে মিস্টার রিচার্ড গম্ভীর মুখে হলরুমের সোফায় বসে রয়েছেন ,
ঘরের ঘড়ির টিক টিক শব্দ প্রায় থেমে গেছে। তখনি এরিক শিস বাজাতে বাজাতে দরজায় প্রবেশ করে, কাঁধে তার জ্যাকেট ঝুলানো।
মিস্টার রিচার্ড এরিককে দেখা মাএ গম্ভীর স্বরে বলে ওঠেন,

“দাঁড়াও।
এরিক শুনেও না শুনার ভান করে চলে যেতে নিলে,মিস্টার রিচার্ড পিছন থেকে আবারো কড়া গলায় বলে ওঠলেন,
আমি দাঁড়াতে বলেছি, এরিক।
এরিক অন্যমনস্ক গলায় বলে,
“এসব নাটক প্রতিদিন ভালো লাগে না। কোনো জরুরি কথা থাকলে সকালে বলো, আজকে অনেক ক্লান্ত—রেস্ট নিতে চাই।”
মিস্টার রিচার্ড রাগে ফুসে উঠে, ছবিগুলো এরিকের মুখের উপর ছুঁড়ে দেন,
“এইগুলো কী এরিক?তোমার বাবার নামটা বাজারে তুলে দিয়ে এসেছো! আর কোনো লজ্জা বাকি আছে?”
এরিক মেঝেতে পড়ে থাকা ছবিগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল এবং ঠান্ডা, তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে বলল—

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আমি কী করি, কার সাথে থাকি, সেটা একান্তই আমার ব্যাপার। এইসব ছবিতে তোমার রাতের ঘুম নষ্ট না হলেও চলবে। তুমি তোমার মতো থাকো আর আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। Stay f*cking away from my life!
“নিজেকে সংযত করে কথা বলো এরিক, ভুলে যেওনা কে তুমি কার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছ!”
এরিক বিরক্ত হয়ে বলল,
“এসব নাটক রাখ তো। কি এমন হয়েছে? আমার ইচ্ছে করছে তাই আমি ওকে কিস্ করেছি। সো এখানে তো খারাপের কিছু আমি দেখতে পাচ্ছি না।”
মি.রিচার্ড ছেলের এমন নির্লজ্জের মতো কথা শুনে রাগে কিড়মিড় করতে করতে বললেন,
“তোমার এসব কাজ আমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট করছে। লোকে তো তোমায় কিছু বলবে না, বলবে তো আমাকে। এসব অসভ্যতামি বন্ধ কর।”
এরিকের ঠোঁটে কোনে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বললো,
“অসভ্যতামির climax তো এখনো বাকি। এখনই হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থা, আগে বেঁচে তো থাকো তারপর নাহয় দেখবে।”

“এরিক! লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় উঠে গিয়েছ তুমি।”
এরিক বিরক্তিতে হাই তুলে বলল,
“আর কিছু বলতে চাইলে পরে বলো, আজকে বিরক্ত করো না। এমনিই মুড ভালো নেই।”
মিস্টার রিচার্ড রেগে দাঁতে দাঁত পিষে বলে ওঠে,
ওই মেয়েটা কে? উত্তর দাও!
এরিক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে ওঠে,
Don’t, Don’t you dare Mr.Richard! ওর কথা মুখে ও আনবে না তুমি। আমি কার সাথে থাকি, সেটা আমার সমস্যা। তোমাকে কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য না।”
এরিকের এমন Possessiveness দেখে রিচার্ড একটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
— Oh I see, এতো Possessive? সে কি তোমায় জাদু করেছে নাকি?
এরিক একদম ঠাণ্ডা অথচ স্থির কণ্ঠে বলল,
“Mind your own business! বললাম না, একটা ও বাজে কথা আমি শুনতে চাই না!
রাগের চোটে এরিকের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে, ঘাড়ের এবং কপালের রগ গুলো ফুলে ওঠে। মি.রিচার্ড আবারও বলে ওঠে,

“এরিক! তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ?
এরিক হেসে মাথা কাত করল, সেই হাসি ছিল বিষে মাখা তাচ্ছিল্য।
এরিক: “হুমকি? না, ওটা সতর্কতা। আমার জীবন তোমার সম্মানের দাস নয়। তুমি তোমার ভণ্ডামি নিয়ে বাঁচো, আমাকে আমার মতো বাঁচতে দাও।”
“ভণ্ডামি? এসব ভণ্ডামি মনে হয় তোমার?
কথার মধ্যে এরিক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
“বাবা হয়েছেন বলে কি আমার ওপর মালিকানা পেয়েছেন? বাবার নাম দিয়ে পুরো জীবন চালাতে চাই না আমি।
আপনি যদি চান আমি আপনার মতো হই তাহলে Sorry, সেই আশা বাদ দিন।
আমি আমার মতো বা আপনার আদর্শের কার্বন কপি হতে আসিনি।”
কথাটি বলেই এরিক নিজের রুমে চলে যায়।

রাতভর এক বিন্দু ঘুম আসেনি এরিকের চোখে। চারিদিকে তাকাতে থাকে অস্থিরভাবে মনে হচ্ছে বিশেষ কাউকে খুঁজছে! এরিকের বন্ধুরা জিজ্ঞেসা করলে এরিক কিছু বলে না। সে নিজের মতোই থাকে আজকাল; তাকে বেশি কথা বলতে বা বন্ধুদের সাথে তেমন একটা মিশতেও দেখা যায় না।কোনোকিছুতেই যেন তার মন নেই। কিছু একটা চিন্তা করতে করতে এরিক যখন হলওয়ে বরাবর এগিয়ে যায়;তখনি চোয়াল শক্ত করে, দাঁত কামড়ে , রুক্ষ চোখে পাগলের মতো তাকিয়ে আছে চারপাশে। ইনায়া আসেনি আজ।এরিকের বুকের ভেতর এক অপার শূন্যতা ও হাহাকার ঢেউ তুলে যাচ্ছে; যেন নিঃশ্বাসের মাঝেও ভারী কষ্ট জমে আছে। ঠিক তখনই সে সোফিয়াকে কয়েকজন ফ্রেন্ডদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।আর এক মুহূর্ত ও সময় নষ্ট না করে এরিক সোজা এগিয়ে যায় সোফিয়ার দিকে এবং শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,

— “Hey, সোফিয়া, where’s Inaya? … কোথায় ও?”
হঠাৎই এরিকের গলার আওয়াজ শুনে সোফিয়া তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং সোফিয়ার বন্ধুরা অবাক দৃষ্টিতে এরিকের দিকে তাকিয়ে থাকে, কারণ ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে rich, crush boy heartthrob যে কিনা সব মেয়েদের ড্রিমবয়; সে কিনা ইনায়ার খোঁজ করছে। ওদের জানা মতে এরিক জীবনে কারোর খোঁজ করা তো দূরে থাক ঘুরে দ্বিতীয়বার তাকানোর মতো ছেলে না আর আজ সে কিনা ইনায়ার খোঁজ করছে? অদ্ভুত লাগে বিষয়টি যদিও তারা এরিককে, ইনায়ার সাথে দেখেছে অনেকবার কিন্তু ওদের মনে হয়েছিল এরিক Just ইনায়াকে ইউজ করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে কিন্তু আজ তো এরিক স্বয়ং ইনায়ার খোঁজ করছে। সোফিয়ার বন্ধুদের তার দিকে এমন হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে এরিক বিরক্ত হয়ে বলে,

—”Like what are you guys looking at?”
এরিকের কথার টোন শুনে সোফিয়ার বন্ধুরা কিছুটা ভড়কে যায়; কারণ তারা জানে এরিক রেগে গেলে কতটা ভয়ংকর হয়ে যায়। ওরা কিছু বলতে পারেনা দেখে এরিক রেগে গিয়ে বলে,
—”গেট আউট ফ্রম মাই আইস রাইট নাও! কাউকে দেখতে চাইনা আমি এখানে।”
এরিক কথাগুলো উচ্চারণ করার সাথে সাথে সোফিয়ার বন্ধুরা সবাই ভয় পেয়ে সেখান থেকে কোনো মতে চলে যায়। এবার এরিক সোফিয়ার দিকে ঘুরে বলে,
—”এবার বলো, কি হয়েছে ইনায়ার?”
সোফিয়া একটু দ্বিধা নিয়ে উত্তর দেয়,
— “ও আসবেনা আজকে।”
সোফিয়ার উত্তর শুনে এরিকের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা যায় না উল্টে ও আবার প্রশ্ন করে,
— “তার মানে তোমার সাথে ওর কথা হয়েছে। কিছু বলেছে, কেন আসবে না?”
সোফিয়া মাথা নাড়িয়ে একটু নিচু গলায় বলে,
— “না, কিছু তো বলেনি। শুধু আসবেনা বলে ফোন কেটে দিয়েছে।”

এরিক বিরক্ত আর হতাশ হয়ে কিছু না বলে চলে যায়, ফাঁকা করিডোরে। বুকের গভীরে উদ্ভ্রান্ত অস্থিরতা আর ক্ষুব্ধ রাগ প্রবল ঢেউয়ের মতো ছুটে বেড়ায়; করিডোরের শেষ প্রান্তে গিয়ে আর রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে দেওয়ালে একটা ঘুষি মারে এরিক। সঙ্গে সঙ্গে হাতের চামড়া ফেটে গলগল করে র*ক্ত বের হতে থাকে। চোখ দুটো লাল হয়ে আসে ওর। দেওয়ালে আরও দুই-একটা ঘুষি মেরে এরিক তাও নিজের রাগকে সংবরন করতে পারে না। এদিকে সাদা দেওয়াল র*ক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে এরিক ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় নিচতলায় সিঁড়ির দিকে এবং সিঁড়িতে গিয়ে বসে পড়ে। নিজের রাগকে কিছুটা কন্ট্রোল করে এরিক নিজে নিজে ভাবে,

—”তুমি আসবে না, হ্যাঁ? আমাকে এভাবে ইগনোর করবে? ভাবছ আমি সহ্য করবো?” যদিও তার মধ্যে কিছুক্ষণ আগে অপরাধবোধ কাজ করছিল কিন্তু রাগের চোটে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এরিক। আর ভাবে,
— কিসের সময় দেবে সে? ইনায়া শুধু তার এটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে মেনে নিতে হবে।তাই আর কোন কিছুর পরোয়া না করে এরিক ফাঁকা সিঁড়ির ধাপে বসেই তার রক্তা*ক্ত হাত দিয়ে ফোন বের করে বারবার কল করে ইনায়াকে। একবার। দুইবার। দশবার…
ফোন বেজে যায়—কিন্তু কেউ রিসিভ করে না।
বারবার স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো নিভে যায়, ইনায়ার নামের পাশে ‘No Answer’ লেখা ওঠে।
এরিকের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে;চোখে রাগে আগুন জ্বলে ওঠে।
নিজেকে আর সামলাতে পারে না সে;ফোনটা হাতে নিয়ে জোরে আছাড় মারে সিঁড়ির চার কোণে!
স্ক্রিন ফেটে যায়, টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। চারিদিক স্তব্ধ, ঠিক যেন এরিকের ভিতরের ঝড়ও এতক্ষণে ফেটে বের হতে চায়।
নিজেই নিজের মনে বিড়বিড় করে,

— “কেন রিসিভ করছো না? আমার থেকে পালিয়ে কোথায় যাবে, বেবিগার্ল ? ভাবছো এসব এড়িয়ে গেলে আমার কাছ থেকে পার পাবে তুমি? তাহলে তুমি ভুল ভাবছো! এই এরিক অ্যাসফোর্ড কে তুমি এখনো চেনো না।”
এবার সে পকেট থেকে আরেকটা ফোন বের করে ইনায়াকে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, সব মাধ্যমে লিখে ক্লিয়ার হুমকি দেয়,

— “Listen, বেবিগার্ল, তোমার এভাবে গা ঢাকা দেওয়া আমি কিছুতেই সহ্য করবো না।” তোমাকে আমার মুখোমুখি হওয়াই লাগবে। “ইগনোরেন্স” আমার একদম পছন্দ নয়। ফোন রিসিভ করো নইলে আরও খারাপ কিছু হবে। আমি ঠিক একইভাবে তোমার বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো, সবার সামনে জিজ্ঞেস করবো,তখন কী করবে?আমার থেকে তোমার মুক্তি নেই, বেবিগার্ল। যত তাড়াতাড়ি সেটা বুঝতে পারবে ততই তোমার মঙ্গল।”
এরিক জানে যে ও ভুল করেছে। এটাও জানে যে ও ইনায়াকে হার্ট করেছে আর ও নিজেও হার্ট হয়েছে। যেহেতু ও প্রথমবার প্রেমে পড়েছে এবং আগে এমন কোনো অনুভূতির সাথে পরিচিত নয় তাই এমন পাগলামি করছে। সে নিজে বুঝতে পারছে না আসলে কি করলে সে সব ঠিক করতে পারবে। কি করলে ইনায়া পুরোপুরি তার হয়ে যাবে।

একটা নিঃসাড়, অচেনা সপ্তাহ কেটে যায়। ইনায়া ইউনিভার্সিটিতে আসে না, কারও কোনো উত্তর নেই। এরিক বারবার ফোন দেয় আর একটাবার ইনায়ার গলা শোনার জন্য অপেক্ষা করে কিন্তু ইনায়া কথা বলে না। জোর করে হুমকি দিয়ে যদিও এরিক ইনায়াকে দিয়ে ফোন রিসিভ করাতে পারে; কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয় না। ইনায়া একটা শব্দ পর্যন্ত বলে না। আর এতে ইনায়ার ঘৃণা আরও তীব্র হতে থাকে। এরিক আসলেই বোঝেনা যে জোর করে কখনোই কারোর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব না।

ইনায়াকে এই এক সপ্তাহে প্রতিদিন কল দেয় এরিক। আর যদি ফোন রিসিভ না করে তাহলে হুমকি দেয়। এই জন্য ইনায়া ও ফোন রিসিভ করে ফেলে রাখে। আসলে, এরিকের কথা শোনার মতো রুচি তার আর নেই। ইনায়া ভয় পায় না এরিককে কিন্তু নিজের সম্মানের ভয় তো তার আছে। এরিক যা বলে ঠিক তাই-ই করে, ও ভালো করেই জানে ও যদি এরিকের কথা না মানে, এরিক ঠিক তার আত্মসম্মানেই আঘাত করবে। তাই বাধ্য হয়ে রিসিভ করে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। এরিক ফোন করে ইনায়াকে, বেশ কয়েকবার চেষ্টা করাতে শেষমেশ আবারও হুমকি দিয়েই ইনায়াকে ফোন রিসিভ করালো এরিক। ইনায়া ফোন রিসিভ করতেই এরিক বলে ওঠে,
—”ইনায়া, কথা বলো! শুধু বলো, ঠিক আছ তো?”
কিন্তু ওপাশে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে ।

সময় নদীর স্রোতপ্রবাহের মতো বয়ে যায়; এভাবে কেটে যায় আরও এক সপ্তাহ।
একটা হিমেল সকালে ইনায়া যখন ক্যাম্পাসে ফিরে আসে, তখন পুরো পরিবেশে এক অদ্ভুত থমকে থাকা চাপা টান অনুভূত হয়।
তার মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ, চোখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট। দূর থেকে ইনায়াকে দেখতে পেয়ে এরিকের বুকের গভীরে জমে থাকা অভিমান-রাগ একসাথে মাথা চাড়া দেয়। সে ছুটে আসে ইনায়ার সামনে, থেমে দাঁড়ায়—

— “কোথায় ছিলে? এমনভাবে লুকিয়ে থেকে কী আমার থেকে কখনও রক্ষা পাবে, তুমি? চলো আমার সাথে।”
ইনায়া মুখ তুলেও তাকায় না, কোনও জবাব নেই। এরিক ওর হাতটা ধরতে চাইলে ও কয়েক পা পিছু হটে যায়। সেদিন রাতের ঠিক এমন দৃশ্যটি মনে আসতেই এরিক আর ইনায়ার হাতটা ধরে না। শুধু নিরবে চেয়ে থাকে ইনায়ার দিকে। কিন্তু ও যে এতোদিন কষ্ট পেল তার কি? এরিকের মন চাইছে, এক্ষুনি তুলে নিয়ে গিয়ে ইনায়াকে বুঝিয়ে দিতে যে ও ইনায়াকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। ইনায়ার এই নির্লিপ্ততা এরিককে আরও তাতিয়ে দেয়। ইনায়া তার দিকে একবার তাকায় না পর্যন্ত। রেগে গিয়ে সে সামনে এসে কড়া গলায় বলে—

— “আই ওয়ান্ট অ্যান্সার, ড্যামেট! মুখোমুখি এড়িয়ে গেলে সব প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না!”
কিন্তু তবুও ইনায়া চুপ থাকে৷ বন্ধুদের আড়ালে গা ঢাকা দেয়, যেন ওর উপস্থিতিই বাতাসে মিলিয়ে যায়।
এরিকের রাগে চোখ জ্বলজ্বল করতে থাকে।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ইউনিভার্সিটি গেট দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়।মনে হয়, কিছুই আর ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে নেই।

এরিক সোজা ক্লাবে চলে আসে। বারের টেবিলে বসে একের পর এক গ্লাস ড্রিংক করতে থাকে।
—‘এত ড্রিংক করেও আজ শান্তি পাচ্ছি না! F*ck my life! “থ্রিলিং,” কিছু একটা করতে হবে।”
এটা বলে একবারে পুরো একটি হুইস্কির বোতল শেষ করে ফেলে এরিক। শেষ করার সাথে সাথে সে খালি বোতলটি ক্লাবের মাঝখানে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে, সাথে সজোরে শব্দ করে বোতলটি ভেঙে যায়। ক্লাবের সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এরিকের দিকে।এরিকের হাতে কাচের ভাঙা অংশ ঢুকে ঝরঝর করে র*ক্ত পড়ছে, কিন্তু সেই দিকে আপাতত কোনো খেয়াল নেই। উন্মাদের মতো আরও কয়েকটা বোতল শেষ করে, সেই বোতল গুলো ও একইভাবে ভাঙলো; পুরোপুরি ড্রাংক হয়ে তবেই বেরিয়ে গেল। হাতের র*ক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে থাকল মেঝেতে।
এরেন, এলিনা, অ্যালেক্স পিছু নেয় এরিকের ;তারা জানে এরিক কতটা রেগে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়েছে। এরেন হাঁপাতে বলে,

— “এরিক, প্লিজ! ফিরে চল ভাই। এমন কিছু করিস না, যাতে তোর ক্ষতি হয়। আমরা আছি না , ইনায়ার সাথে তোর সব ঠিক করে দেব।”
এরিক ওদের দিকে তাকিয়ে ধীরে হেসে ওঠে,
— “ক্ষতি!আমি তো নিজের উপরেই সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করতে যাচ্ছি,এরেন। এবার আমার একটা শাস্তি হওয়া দরকার কিন্তু আমি চাই ও নিজে আমাকে শাস্তি দিক তাই নিজের কোনো ক্ষতি আমি করব না। So, chill guys. কিছু একটা “থ্রিলিং” করব আজ। তোরা উপভোগ কর।”
—”উপভোগ কর মানে? তুই কি করবি? দেখ এরিক, তুই এখন পুরোপুরি ড্রাংক, ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিস না,নিজের মধ্যে অবধি নেই। এখন কোনো বোকামি করবি না তুই। চল এখান থেকে।” এই বলে এলিনা, এরিকের হাত ধরে নিয়ে যেতে নিলে এরিক ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পেছনের দিকে চলে যায়।তখনি এরেন, এলিনা পিছন থেকে এরিককের চিৎকারের আওয়াজ পেলো, সে চিৎকার করছে আর বলছে,

—”চলো আজ থ্রিলিং কিছু করা যাক। আজ এক অন্য নিয়মে বাইক রেসিং হবে। এতোদিন তো নিয়মের মধ্যে রেস হয়েছে। আজকের বাইক রেসিং এর কোন রুলস্ থাকবে না। যে এই রেসে আমাকে হারাতে পারবে তাকে আমি নিজে ১০ মিলিয়ন ড্লার দেব।”
এরিকের কথা শুনে চারদিকে হৈ হৈ পড়ে গেল।উৎসুক জনতার ভিড় দেখা গেলো। এমন রেস তো আগে কখনো কেউ ঘোষণা করেনি তাই সকলের মধ্যে আরও বেশি আগ্রহ দেখা গেল।

কিছুক্ষণ পর শুরু হয় নো রুলস ডেঞ্জারাস বাইক রেস। রাতের ঝলকানি, ট্র্যাক জুড়ে তীব্র উচ্ছ্বাস, চারপাশে পাগলের মতো কনটেস্টেন্টরা ইঞ্জিন গর্জায়। এরিক, কালো লেদার জ্যাকেট, গ্লাভস পরে নেয়। মুখে রক্তিম আলোর ছটা পড়ে তার। দেখতে তো গ্রিক গডের মতো সুদর্শন সে, পুরোপুরি কালোতে তার সাদা ফর্সা ত্বক আরও জ্বলজ্বল করছে। তার এই রূপ দেখে মেয়েগুলো তো পুরোই চিৎকার করতে করতে পাগল হয়ে গিয়েছে। ভিড়ের মধ্যে শুধু একটা নামেরই জয়জয়কার হচ্ছে, আর সেটা হলো এরিক। রেসিং শুরু হওয়ার পূর্ব মুহুর্তে সবাই সবার পজিশন নিয়ে এক লাইনে হেলমেট হাতে নিয়ে দাঁড়ায় এবং এরিক ও কালো হেলমেট নিয়ে স্টার্টিং লাইনে দাঁড়ালো। মনের মধ্যে এখনো তোলপাড় চলছে। ইনায়ার মুখটা ভেসে ওঠে তার সামনে আর অস্ফুটেই মনটা হাহাকার করে ওঠে, হয়তো আজ মরে গেলেও কোনো আপসোস থাকবে না তার। হেলমেট পরার মুহূর্তে সে নিজেই ফিসফিস করে,

—“আজ শুধু গতির সাথে ছুটতে চাই! আমার নাগাল যেন আর কেউ না পায়।”
স্টার্টিং ফ্ল্যাগ উঠতেই গর্জে ওঠে একসাথে সব ইঞ্জিন। চারপাশের গর্জন যেন মাটির তলা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ধুলো উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। সবাই এক ঝাঁপে সামনে ছুটে যায়। এরিকের বাইকও মুহূর্তেই লাফিয়ে ওঠে ট্র্যাকে। তার চোখে শুধুই আগুন জ্বলে ওঠে , ঠোঁট শক্ত করে চেপে রেখেছে, বুকের ভেতর ঢাকের মতো ধুকপুক করছে হার্টবিট। ইনায়ার ঠান্ডা, নির্লিপ্ত মুখ, তার ঘৃণাভরা চোখ আর মুখ না খোলা অভিযোগগুলো মাথার ভেতর বারবার বাজছে। সেইদিন রাতের ঘৃণাভরা দৃষ্টি, তার ইনায়ার বলা কথাগুলো এখন ঠিক বিষের মতোই বিঁধছে এরিকের হৃদয়ে।

—”আপনার এই কুৎসিত মুখটা আমাকে আর কোনো দিন দেখাবেন না।”
—”কেন এসেছেন আপনি এখানে? চলে যান!”
—”আপনি আর কোনোদিন আমার সামনে আসবেন না।”
এই কথাগুলো বারবার রিপিট হচ্ছিল এরিকের মস্তিষ্কে। এমন অবস্থায় নিজেকে ধরে রাখাও ভার হয়ে যাচ্ছে।একে তো সে পুরোপুরি ড্রাংক আবার ইনায়ার কণ্ঠ যেন শোঁ শোঁ করে কান ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে।
এরিকের আঙুল শক্ত হয়ে আছে থ্রটলের ওপর। সে বাইকের গতি হুট করে অনেক বাড়িয়ে দেয়। রাস্তার বাতাস ছিন্নভিন্ন করে ধুলো আর বালির ঝড় তুলতে তুলতে সে এক ঝটকায় দুইজন রাইডারকে ওভারটেক করে সামনে চলে আসে। রেসটা হঠাৎ আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামনের এক বাইকার আবারও আচমকা সামনে এসে পরে, এরিক ব্রেক কষার সময় এক মুহূর্তের জন্য অন্য মনস্ক হয়। ইনায়ার নীরব মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠে, সে বাইকের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। একটান দিয়ে আবারও সামনে চলে আসে। কিন্তু তার মস্তিষ্কে এখন রেস নেই, শুধু ইনায়া।

প্রতিবার যখন সে ব্রেক কষতে যাচ্ছে, মাথায় ঘুরে ফিরে আসে — ইনায়ার মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া, দূরে সরে যাওয়া। সে আর রেসের ট্র্যাকের বাঁকগুলো নিয়ে ভাবছে না, শুধু দৌড়াচ্ছে, যেন ইনায়াকে জিততে না পেরে এই রেসটা জেতাটা তার একমাত্র প্রতিশোধ। ট্র্যাকের একটা তীক্ষ্ণ বাঁকে সে হঠাৎ বাইকটাকে অতিরিক্ত হেলিয়ে ফেলে। সামনের এক বাইকার আচমকা তার সামনে এসে পড়ে। এরিক তড়িঘড়ি ব্রেক কষে, বাইকের চাকায় একটা হিংস্র শব্দ হয়। হ্যান্ডেল কেঁপে ওঠে, কিন্তু সে থামে না। বরং থামার বদলে সে আরও গতি বাড়িয়ে দেয়, যেন নিজের রাগ উগড়ে দিচ্ছে ট্র্যাকে। বাইকটার স্পিডোমিটার লাল দাগ ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার চোখ লালচে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে বাতাসের ধাক্কায়। পরের বাঁকটা ছিল ভয়ংকর তীক্ষ্ণ। ট্র্যাকের পাশে গার্ডরেল আর নিচে পাথুরে ঢালু জমি। এরিক হঠাৎ আবার কল্পনায় ইনায়াকে দেখে —

নীরব মুখ, ঘৃণার ছাপ, ঠোঁট কামড়ে চুপ থাকা ইনায়া। এক মুহূর্তের জন্য তার মনোযোগ সরে যায়।
হাত কেঁপে যায়, হ্যান্ডেলের ব্যালেন্স ছুটে যায়। বাইকটা হঠাৎ ডান দিকে হেলে পড়ে।
—”F*ck….” নিজের অজান্তেই এরিক চিৎকার করে ওঠে।
বাইক চাকার ভয়ংকর স্কিডিং শব্দে ট্র্যাকের মাটি ছিটকে উঠে। বাইকটা গার্ডরেল টপকে পাশের ঢালু পাথুরে জায়গায় ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে। ধাতুর সঙ্গে পাথরের কর্কশ শব্দে চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। ধুলো আর ভাঙা পাথর উড়ে ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২১

ঝড়ের বেগে ছিটকে পড়ে এরিক রাস্তায়। একটা বিকট শব্দ, চারপাশে ক্লাবের আতঙ্কের চিৎকার, তার হেলমেটটা মাটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পাশে গড়িয়ে যায়। বাইকটা কিছুটা দূরে উল্টে পড়ে, ধোঁয়া উঠছে ইঞ্জিন থেকে। এরিক অচেতন হওয়ার আগে শেষ যা দেখে—
“ইনায়ার চোখ, সেই অপরিসীম ঘৃণা আর দুঃখের ছায়া।”
জ্ঞান হারানোর পূর্বে শুধু চারদিকে চিৎকার শুনতে পায় এরিক। এতে তার বিরক্ত লাগে। ওদিকে এরিকের বন্ধুরা দৌড়ে এই দিকেই ছুটে আসে এই বলে,
— “Eric! Eric! Ambulance ডাকো কেউ!”
ব্যাস এইটুকুই, এরপর সব অন্ধকার…

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৩