অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৩
নুরিয়া ইসলাম
গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে দেয় অ্যাম্বুলেন্সের বিকট সাইরেন। ক্লাব থেকে ট্র্যাকে দুর্ঘটনার পর এরিকের রক্তাক্ত দেহ টেনে হিঁচড়ে তোলা হয়েছে স্ট্রেচারে। তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক, সারা শরীরে কাঁচ ও পাথরের ক্ষত, পোড়া চামড়া, ছেঁড়া জামা, রক্তে ভেজা মাথা।
এরেন, এলিনা, অ্যালেক্স একসাথে ছুটে আসে পাশে, সবার মুখে আতঙ্ক, দৌড়ে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। এক নার্স গলা চিৎকার করে বলে,
— “ICU প্রস্তুত রাখুন! পেশেন্ট unconscious, গুরুতর হেড ট্রমা!”
স্ট্রেচার দ্রুত ভিতরে ঠেলতে থাকে নার্স ও ডাক্তাররা।
এদিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে এসে পৌঁছান মিস্টার রিচার্ড অ্যাসফোর্ড আর মিসেস অ্যানজেলা অ্যাসফোর্ড—এরিকের মা-বাবা।
রিচার্ড অ্যাসফোর্ড, কঠোর ব্যবসায়ী, স্যুট-পরা তীক্ষ্ণ চেহারার সেই মানুষটা এবার যেন অন্য এক রূপে। কিন্তু চোখে ভাসছে কুন্ডলী পাকানো রাগ, দৃষ্টি গরম, কণ্ঠে আগুন।এরিকের মা, ছুটে গিয়ে নার্সদের হাত জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন—
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
— “আমার ছেলে… আমার এরিক… ও কি… ও ঠিক আছে তো? ও বাঁচবে তো?”
ডাক্তাররা তখনই ভিতরে নিয়ে যায় এরিককে। ICU রুমের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বাইরের করিডোরে দাঁড়িয়ে সবাই নিঃশব্দ, থমথমে। মিস্টার রিচার্ড হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে রাগে কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠেন,
— “ওই মেয়েটা… ওই মেয়েটার কারণেই আমার ছেলে আজ এখানে। আমার ছেলে এমন reckless হতে পারে না যদি না ওই মেয়েটা ওকে emotional mess-এ ফেলে না দিত!”
এরেন, এলিনা, অ্যালেক্স চমকে ওঠে। এরেন বলার চেষ্টা করে,
— “স্যার, না… ব্যাপারটা এমন না—”
কিন্তু রিচার্ড রাগে হাত তোলে—
— “না! তোমরা চুপ! আমার ছেলে কারো পেছনে ছুটে নিজেকে শেষ করে দেবে? কে শেখালো ওকে এত দুর্বল হতে? কে ওর মাথায় ঢুকালো প্রেম-ভালোবাসা করে জীবন শেষ করতে হয়?”
এরিকের মা পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে চায়,
— “রিচার্ড, প্লিজ! এই সময় দোষারোপ করে—”
রিচার্ড এবার আরও উচ্চস্বরে বলে,
— “আমি আমার ছেলেকে এমনভাবে দেখিনি আগে! ওর চোখের সামনে আমি আমার ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়েছি! সব দিয়েছি—আর এখন ও নিজের জীবন ছুঁড়ে দিচ্ছে একটা মেয়ের জন্য? একটা মেয়ে, যাকে নিয়ে কোনোদিন আমায় জানায়ওনি!”
অ্যানজেলা এবার আর সহ্য করতে না পেরে চুপচাপ বসে পড়েন দেয়ালে হেলান দিয়ে। কান্নায় গলা ভেঙে আসে।
— “আমার এরিক… আমার সেই ছোট্ট এরিক, যে একসময় আমার কোলে ঘুমাত… আজ হাসপাতালের বেডে পড়ে আছে! ও কখন এত একা হয়ে গেলো, রিচার্ড? আমরা কি সত্যিই কিছুই বুঝতে পারিনি ওর?”
রিচার্ডের মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। চোখে রাগের পাশাপাশি হঠাৎ কিছুটা অপরাধবোধও ফুটে ওঠে, কিন্তু তিনি মুখে কিছু বলেন না।
ICU-এর ভিতর থেকে একটা লাল আলো জ্বলে ওঠে। ডাক্তার এসে জানান,
— “পেশেন্ট সেফ আছে এখন, কিন্তু আগামী ২৪ ঘন্টা খুব ক্রিটিক্যাল।”
সবাই নিঃশ্বাস চেপে ধরে।
অফিসে কাঁচের দেওয়ালের ওপারে ছড়িয়ে থাকা শহরটা আজকে যেন আরও বেশি নীরব মনে হচ্ছিল মিস্টার রিচার্ড অ্যাসফোর্ডের কাছে। মাঝবয়সী এই কর্পোরেট জায়ান্টের কপালের ভাঁজ গভীর হয়ে উঠছে দিনে দিনে, কারণটা তার ছেলে—এরিক। রিচার্ড অ্যাসফোর্ড অফিসে বসে এরিকের কথায় ভাবছেন। তার ছেলে দিন দিন তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখনি লাগাম টানতে হবে। না হলে তার ছেলে যেই খেলায় নেমেছে সেটা খুবই ভয়ংকর। সে বাবা হয়ে কীভাবে নিজের ছেলেকে বিপদের মুখে ফেলবে? আর তারউপর কালকে রাতে বাইক রেসিং করতে গিয়ে কতবড় অঘটনটাই না ঘটিয়েছে সে। এরিকের রাগ ভালো না তা রিচার্ড আগে থেকেই যানে কিন্তু এখানে ঘটনা অন্য। এরিকের Accident এর জন্য তিনি ইনায়াকেই দোষী মনে করছেন। এরিককে যে করে হোক ওই মেয়ের থেকে দূরে রাখতে হবে। রিচার্ড আঙুলের মাথা দিয়ে ডেস্কের ওপর টুকটুক শব্দ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর গম্ভীর গলায় ইন্টারকমে বললেন,
—“জ্যাক, আমার রুমে এসো। জরুরি।”
সেক্রেটারি জ্যাক দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই রিচার্ড ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটি ছবি বের করলেন। ছবিতে একজন তরুণী—শান্ত চোখ, মাথায় ওড়না, গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রয়েছে ক্যামেরার দিকে।
—“ছবির এই মেয়েটি কে, জানতে চাই। নাম, ঠিকানা, পরিবার—সব। কাল সকালেই রিপোর্ট চাই।”
জ্যাক থমকে গেলেও মাথা নাড়ল সম্মতিতে। রিচার্ড জানে, ছেলের পথ সোজা করতে হলে এখনই হস্তক্ষেপ করা দরকার।
সন্ধ্যার আকাশটা আজ ভারী মেঘে ঢাকা। চারদিকে কেমন একটা নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে, যেন প্রকৃতিও বুঝে গেছে—কিছু একটা ভেঙে গেছে চিরতরে।ঘড়ির কাঁটা ঠিক ৭টা ছুঁইছুঁই। ICU কেবিনের নিস্তব্ধতায় শুধুই একটানা শব্দ ভেসে আসে—“বিপ… বিপ… বিপ…”
মনিটরের এই যান্ত্রিক ছন্দটাই এখন এরিক অ্যাসফোর্ডের জীবনের একমাত্র চিহ্ন।
বেডে নিথর পড়ে আছে এরিক। মাথা ও কপালে পুরু ব্যান্ডেজ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, ব্যান্ডেজে মোড়া হাত, শরীরজুড়ে কাচের ফালি আর পাথরের দাগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস ভারী। যেন নিঃশ্বাস নয়, যুদ্ধ।
রুমের এক কোণে বসে আছেন এরিকের মা।
রাতভর জেগে চোখ ফোলা, কান্না শুকিয়ে গলা বসে গেছে। চুপচাপ ছেলের হাত ধরে রেখেছেন—ভঙ্গুর, ঠান্ডা, নিস্তেজ হাত। মাঝে মাঝে তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে, মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই গলা বুজে আসে।
ঠিক তখন দরজার হালকা চাপা শব্দ হয়। এরেন, এলিনা, অ্যালেক্স ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে। সবার মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে লাল ছায়া। কারো চোখ কারো সঙ্গে ঠিকঠাক মেলে না।
এরেন ফিসফিস করে বলে—
—“Holy shit… এরিক… তুই এমন করলি কেন রে ভাই…”
তার চোখের কোণে জমে থাকা জল সরে আসে। তাও নিজেকে শক্ত রাখে। এলিনা কেবিনের মাঝামাঝি এসে থেমে যায়, তারপর ধীরে ধীরে এরিকের পাশে বসে পড়ে। চোখ ঠেসে ধরে কান্না আটকে রাখে।
—“এত রাগ জমেছিলো ওর ভেতরে… অথচ আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। আসলে বুঝেও বুঝিনি।”
অ্যালেক্স মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, ঠোঁট চেপে রাখে। এরপর কাঁপা গলায় বলে—
—“এরিক, যেই ছেলেটাকে সবাই প্লেবয় বলত… সেই ছেলেটা আজ একটা মেয়ের ভালোবাসায় এইরকম ভেঙে পড়বে, কে ভেবেছিল?”
—“আমরা তো হাসতাম ওর নিয়ে… ইনায়ার নাম শুনলে ঠাট্টা করতাম… এখন সেই ইনায়ার নাম মুখে নিয়েই এই ছেলেটা শুয়ে আছে নিঃশব্দে।”
এরিকের মা উঠে দাঁড়ান। খুব আস্তে এগিয়ে গিয়ে এরিকের কপালে হাত রাখেন। তার গলা কাঁপে—
—“তোমরা তো বন্ধু ছিলে, বুঝতে পারোনি… কিন্তু আমি? আমি মা হয়ে কিছু বুঝলাম না… এত কষ্ট নিয়ে সে একা একা এইভাবে ছুটে গেল মৃত্যুর কাছে? একবারও আমাকে কিছু বলল না…?”
তার গলায় কান্না নেই, কিন্তু কথায় এমন একটা ব্যথা, যেন প্রতিটি শব্দ বুক চিরে বেড়িয়ে আসছে।
এরেন এবার ধীরে এসে এরিকের বাঁ হাতটা ধরল।
—“এই যুদ্ধে তুই একা না ভাই… ইনায়া না থাকুক, আমরা আছি। তুই শুধু একবার চোখ খোল… প্লিজ… শুধু ফিরে আয়।”
ঘরের বাতাস থমকে যায়। মনিটরের বিট আগের তুলনায় একটু দ্রুত হতে থাকে…”বিপ… বিপ… বিপ-বিপ…”
এরিকের আঙুল সামান্য নড়ে ওঠে। তিন বন্ধু এবং মা—সবাই কেঁপে ওঠে। এলিনা ফিসফিস করে বলে ওঠে—
—“ও আমাদের শুনতে পারছে… এরিক! আমরা এখানে আছি…”
এরিক চোখ খোলে না, কিন্তু চোখের কোণে একটুখানি কাঁপুনি দেখা যায়। ঠোঁট সামান্য কাঁপে। তার মুখ যেন শব্দ খুঁজছে।
—”ই…না…য়া…”
শব্দটা খুব দুর্বল, কিন্তু তীক্ষ্ণ। ঘরের প্রতিটি হৃদয় ছিঁড়ে দিয়ে যায়। এরিকের মা কাঁদতে শুরু করেন এবার, খুব নীরবে—
—“আমার ছেলে কথা বলেছে! ডাক্তার… ডাক্তার কোথায়?”
স্ক্রিনে হৃদস্পন্দনের গ্রাফ আরও একটু উঠছে।
একটা জীবনের টান, একটা প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা, একটা ভালোবাসার যন্ত্রণা।
অফিসের ভারী পর্দা টেনে দেওয়া, ঘড়িতে রাত ৯ টা বাজে। মিস্টার রিচার্ড অ্যাসফোর্ড তার বিলাসবহুল অফিসচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন, একহাতে ক্রিস্টালের গ্লাস, অন্য হাতে ছেলের রিপোর্ট ফাইল। চোখে ঘোর অন্ধকার। তাঁর কপালের শিরাগুলো টানটান হয়ে আছে। চিন্তায় ভাঁজ পড়ে আছে গম্ভীর মুখে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, টেবিলের ওপর রাখা বেল বাজালেন। দরজায় টোকা, তারপর জ্যাক ভেতরে প্রবেশ করল।
— “স্যার, আপনি ডাকছিলেন?”
মিস্টার রিচার্ড গর্জে উঠলেন,
— “তোমাকে মেয়েটার সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছিলাম! কী জানলে? বলো! আমি সময় নষ্ট করার লোক নই।”
সেক্রেটারির কণ্ঠে ঘাম-চাপা নার্ভাস ভঙ্গি,
— “জি স্যার… মেয়েটি আমাদের সেলস ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার তানভীর শেখের বোন… ইনায়া শেখ।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর বিস্ফোরণ। মিস্টার রিচার্ড দাঁড়িয়ে পড়লেন চেয়ার ঠেলে,
— “কি?! সামান্য একজন স্টাফের বোন?! এই রকম একটা মধ্যবিত্ত মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলে… এরিক অ্যাসফোর্ড?! এটাই এখন আমাকে শুনতে হচ্ছে?”
তার কণ্ঠে তীব্র ঘৃণা,
— “একটা অচেনা, মূল্যহীন পরিবার থেকে আসা মেয়ের জন্য এরিক আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে? নিজ বাবাকে! আমাকে! তার রক্ত, তার জন্মদাতা!”
দ্রুত পায়চারি শুরু করলেন তিনি।
— “এই মেয়েটার সাহস তো দেখছি আকাশ ছোঁয়… কিন্তু আমি রিচার্ড অ্যাসফোর্ড। আমার ছেলেকে কেউ বশ করতে পারবে না!”
তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলেন,
— “তানভীর শেখকে আমার অফিসে নিয়ে আসো। এখনই! পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার সামনে চাই ওকে!”
জ্যাক দৌড়ে বেরিয়ে যায়। মিস্টার রিচার্ড দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকেন, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে জ্বলন্ত প্রতিজ্ঞা—
—”আমি ছেলেকে হারাতে পারি না, কিন্তু তার জন্য এই মেয়েটাকেও সহজে ছাড়বো না।”
কিছুক্ষণ পরে টোকা পড়ে দরজায়। সেক্রেটারি মাথা নিচু করে বলে,
— “স্যার, মিস্টার তানভীর শেখ এসেছেন।”
— “ভেতরে পাঠাও,” গলায় শীতল হুকুম মি.রিচার্ডের। মি. রিচার্ডের হুকুমে জ্যাক তানভীরকে ভেতরে প্রবেশ করতে বলে। তানভীর ভেতরে ঢোকে। মাথা উঁচু মুখে সংযত ভদ্রতা।
— “স্যার, আপনি দেখা করতে চেয়েছিলেন?” মিস্টার রিচার্ড চেয়ারে বসেই তাকান তার দিকে। ঠান্ডা গলায় বলেন,
— “হ্যাঁ, তানভীর। বসো, তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।” তানভীর তার সামনে বসে এবং মি.রিচার্ড বলেন,
—”তোমার বোনের নাম ইনায়া, তাই তো?” তানভীর একটু অবাক, তারপর মাথা নেড়ে বলে,
— “জি স্যার, ইনায়া শেখ। হঠাৎ আমার বোন, না মানে আপনি কিভাবে চেনেন ওকে? কিছু হয়েছে কি?” রিচার্ড এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকেন। এরপর তিনি কিছু ছবি তানভীরের সামনে টেবিলে ছুঁড়ে দেন। ছবিগুলো দেখে তানভীর কপাল কুঁচকায় এবং একটি ছবি হাতে নিয়ে ভালো করে পরখ করতেই তানভীরের মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে।এতো ইনায়া, তার সাথে ছেলেটাকে ও তার পরিচিত মনে হয় কিন্তু তিনি মনে করতে পারেন না। কিন্তু এসব কি? ইনায়া এতো ঘনিষ্ঠ অবস্থায় কেন ছেলেটার সাথে? তানভীর এসব ভাবতে ভাবতেই মি. রিচার্ড কণ্ঠে স্পষ্ট অসন্তোষ নিয়ে বলেন—
—”চিনতে পারছো তোমার বোনকে? এই তোমাদের পারিবারিক শিক্ষা?” তানভীর তৎক্ষনাৎ মি. রিচার্ডের কথার প্রেক্ষিতে বলে,
—”এটা ইনায়া হতেই পারে না, অসম্ভব। আমি আমার বোনকে ভালো করে চিনি, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে!” রিচার্ড রেগে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়, কণ্ঠ গর্জে ওঠে,
—“ভান করো না! আমার ছেলের জীবন ধ্বংসের পথে যাচ্ছে—তোমার বোনের কারণে! তুমি তো এমপ্লয়ি, অথচ নিজেকে ভাই বলেই প্রমাণ দিতে পারোনি! এতদিন কোম্পানিতে কাজ করছো, অথচ ঘরে কী চলছে জানো না? নাকি ইচ্ছে করেই চুপ ছিলে?” তানভীর রাগ ও অপমানে গলা কেঁপে ওঠে, মুখ শক্ত হয়ে যায় এবং বলে ওঠে,
—“আমার বোনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত কিছু আমার জানা নেই। কিন্তু আমার এতটুকু বিশ্বাস আছে ও এমন কোনো কাজ করবে না যার কারণে ওর পরিবার বা ওর ভাইয়ের সম্মান নষ্ট হয়! আর ঘটনার দায় কারোর একার না” রিচার্ড চোখ রাঙিয়ে, ঠাণ্ডা হেসে বলে ওঠে,
—“তুমি কি এখন আমার ছেলের সঙ্গে তুলনা করছো? তুমি কী বলছো বুঝেছো?” তানভীর অপমানিত গলায় হলেও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে বলে,
—“আমি শুধু বলছি—একটা ইন্সিডেন্টের দায় কারও একার না। আপনি আজ আমার বোনকে নিয়ে যেভাবে কথা বলছেন, সেটা অন্যায়। আমি একজন এমপ্লয়ি ঠিকই, কিন্তু তার আগে একজন ভাই। আর আমি আমার বোনকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি।”
রিচার্ড ঠাণ্ডা গলায়, কিন্তু কণ্ঠে হুমকি নিয়ে বলে,
—“তুমি এখনো বুঝছো না, তানভীর শেখ। এই একটা ভুল তোমার চাকরি, তোমার সম্মান, তোমার বোনের ভবিষ্যৎ—সবকিছু শেষ করে দিতে পারে। আমার ছেলের জীবন নিয়ে খেলা করেছো—এর মূল্য তোমাদের দিতে হবে।”
তানভীর জবাব দেয় চোখে চোখ রেখে,
—“আমার পরিবারে আপনি আঘাত করেছেন, স্যার। আমি চুপ থাকব না। সত্যিটা জানার পর যদি আমার বোন দোষী হয়, আমি নিজে ওকে শাস্তি দেব। কিন্তু আগে—আমি তাকে বিশ্বাস করবো।”
রিচার্ড আর কিছু না বলে চোখ সরিয়ে নেন। তানভীর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যায়—মনের ভিতরে ঘূর্ণিঝড়।
ইনায়া সবে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে বই হাতে করে বসেছে। গত দুই সপ্তাহ বই হাতে করেনি। পড়াশোনার অবস্থা ও বেগতিক। আজকে থেকে মনকে স্থির করেছে যে সে এসব কিছুর দিকে আর ঘুরেও তাকাবে না আর পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হবে। এসব চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে যায়। ইনায়া চমকে ওঠে। হাতের বইটা পড়ে যায়, বিছানার এক কোণে সরে আসে। তানভীর ভেতরে প্রবেশ করে। তানভীরের চোখ রক্তাভ, হাতে কয়েকটা কাগজ দেখে মনে হচ্ছে ছবি হতে পারে। তার শরীর থরথর করছে রাগে। পেছনে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে ভাবী—সে বুঝতে পারছে কিছু একটা খুব খারাপ ঘটেছে। তাই অস্ফুটেই ইনায়া বলে ওঠে,
—”ক..কি হয়েছে ভাইয়া….” কিন্তু ইনায়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই তানভীর হাতে থাকা ছবিগুলো ছুঁড়ে মারে ইনায়ার দিকে। তানভীর দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে,
—”এইসব কী ইনায়া?! কী দেখছি আমি? এই ফটোর এই মেয়েটা কি তুমি?” ফটোগুলোতে স্পষ্ট দেখা যায় এরিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ চুম্বনের মুহূর্ত।
ইনায়া স্তব্ধ হয়ে যায়। মুখে আতঙ্ক, হাতে ঠান্ডা ঘাম।
এবং সে বলে ওঠে,
—””ভাইয়া… প্লিজ… প্লিজ একটা মিনিট দাও… ওটা—
তানভীরের চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট, গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
—”এই ফটোগুলো সত্য কি না? ওটা তুমি ছিলে, হ্যাঁ বা না?” ইনায়ার মুখ শুকিয়ে যায়, সে ঠিক এই ভয়ই পেয়েছিল। কিন্তু এই ফটোগুলো কোথায় থেকে আসল? কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইনায়া চোখ নামিয়ে নিয়ে কাঁপা গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে—
—“সবটা যেমন দেখছো, ঠিক তেমন নয় ভাইয়া, আমি—” তানভীর আঁচড় কেটে তাকে চুপ করিয়ে দেয়—
—“অন্য কথা নয়! শুধু সত্যিটা জানাতে চাচ্ছি—হ্যাঁ কিনা, সেটা বলো! আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চায় ইনায়া!”
তানভীরের চোখ আরও লাল হয়ে ওঠে,মনে চাপা ক্ষোভ। ইনায়া স্তব্ধ হয়ে যায়, তারপর কেঁদে বলে—
—“হ্যাঁ ভাইয়া… সত্যি…কিন্তু আমি—” ইনায়া বলতে যায় কিন্তু তানভীর তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয় এবং বলে,
—”আবশেষে ওই বিধর্মী না মোহররম ছেলেটার সাথে তুমি! ছিঃ তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছি আমি?”
তানভীরের বলা এসব কথা শুনে ইনায়া কান্নায় ফেটে পড়ে এবং কিছু বলার চেষ্টা করে কিন্তু তানভীর এবারও তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
—”আমি আমার বোনকে চিনতে যে ঠিক কতটা ভুল করেছি যে আমাকে আজ এসব দেখতে হচ্ছে। একজন মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে এমন করতে লজ্জা করলো না তোমার?” তার ভাইয়ের এমন কঠোর কথা গুলো ঠিক ইনায়ার হৃদয়ে আঘাত করছিল কিন্তু ইনায়া বুঝতে পারছিলো যে তার ভাইকে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করে লাভ হবে না বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাই ইনায়া মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে সে পরে সময় নিয়ে তার ভাইকে সবকিছু বুঝিয়ে বলবে। এরই মাঝে তানভীর আবার বলে ওঠে,
—”আমার বিশ্বাস ছিলো তোমার উপর কিন্তু তুমি এতো বাজেভাবে তা ভেঙে গুড়িয়ে দেবে, আমি অন্তত তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি। আজ আমাকে অপমানিত হতে হলো।” তানভীরের এসব কথা শুনে মারিয়া পাশ থেকে বলে ওঠে,
—”শান্ত হও তুমি।কীসব বলছো? কোথাও একটা ভুল আছে। ইনায়া এমন করতে পারে না।” মারিয়া ইনায়ার পাশে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, এতে ইনায়া আরও সজোরে কেঁদে ওঠে। তানভীর রাগান্বিত কন্ঠে বলে ওঠে,
—”ওর আর পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই। কাল থেকে আর ইউনিভার্সিটি যাবে না তুমি।” এবং মারিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,
—”ওর বাইরে যাওয়া ও বন্ধ। বাবা-মা ওর দায়িত্ব আমাকে দিয়ে গিয়েছিল কিন্তু আমি তা ঠিকমতো পালন করতে পারিনি কিন্তু আর না। ওর ফোন নিয়ে নাও মারিয়া। আজকের পর থেকে বাইরের জগৎ থেকে ওর সব যোগাযোগ বন্ধ। আমিও দেখি ও কীভাবে ওই ছেলেটার সাথে যোগাযোগ করে।” ইনায়া তার ভাবীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে এবং তানভীরের কথার প্রেক্ষিতে মারিয়া কিছু বলতে নিলে তানভীর তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
—”ওর দিকে হয়ে তুমি আর একটা কথা বলবে না। আমার আদেশ তোমাকে পালন করতে হবে। ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে এসো, রাইট নাও!” এই বলে তানভীর রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায়।মারিয়া ইনায়ার চুলে হাত বুলিয়ে ইনায়ার মুখটা তোলে এবং ইনায়া বলে,
—”বিশ্বাস কর ভাবী, আমি কিছু করিন… ” চোখের পানি মোছাতে মোছাতে মারিয়া বলে,
—”আমি বুঝি তোমায়, ইনায়া। তোমার ভাই ও বোঝে। এখন রেগে আছে, পরে তুমি তাকে বুঝিয়ে বললে ঠিক বুঝবে দেখো।” মারিয়ার কগলথায় ইনায়ার কান্না কিছুটা থামে। সে জানে সত্য কখনো চাপা থাকে না কিন্তু তার সম্মানে এভাবে দাগ লাগছে কিন্তু ইনায়া এখন helpless, সে কিছুই করতে পারছে না, এটাই তাকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
রাত এগারোটা বাজে। বাইরে প্রবল বর্ষন। আমেরিকায় আবহাওয়ার কোনো ঠিক থাকে না। বাইরে শীতল হাওয়া বইছে। এদিকে জ্ঞান ফেরার পর এরিক একটা কিচ্ছু মুখে তোলেনি। মি. রিচার্ড এসেছিলেন এবং দেখা কে চলে গিয়েছেন অবশ্য যেতে চাইছিলেন না ছেলের কাছ থেকে কিন্তু অ্যনজেলা জোর করেই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এরিকের বন্ধুরা ও ছিল কিন্তু ওদেরকে ও বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে এরিক। এখন এরিকের মাথার পাশে বসে আছেন অ্যনজেলা। ছেলেকে একপ্রকার জোর করেই খাবার খাইয়ে দিয়ে ঔষধ ও খাইয়ে দিয়েছেন। এরিক এখনো তেমন সুস্থ হয়নি। সবে সবে এতোবড় একটা Accident হয়েছে তার ক্ষতিগুলো শুকাতে টাইম লাগবে। ডাক্তার কিছুক্ষণ আগেই চেক-আপ করে গিয়েছেন, কমপ্লিট রেস্টে থাকতে বলেছেন আর স্ট্রেস নিতে তো একেবারেই নিষেধ করেছেন।
বেডে শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিল এরিক। শরীরটা তেমন ভালো না। দেওয়ালের দিকে তাকিয়েই কিছু একটা চিন্তা করছিল। বুকের বা পাশটা কেমন যেন চাপ ধরে আছে। যে দিকেই তাকায় শুধু একটা মুখই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এভাবে কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে এরিক হঠাৎই বলে ওঠে,
—”মা, আমার ফোনটা কোথায়?” অ্যানজেলা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
—”তোমার Accident এর পরে এরেন ফোনটা নিয়ে এসেছিল, ঠিক কোথায় রেখেছে, আশেপাশেই কোথাও আছে হয়তো।” এরিক চোখ দুটো বন্ধ করে বলে,
—”ফোনটা আমার এক্ষুনি চাই মা, খুঁজে দাও” এটা বললে অ্যানজেলা এরিকের শিওর থেকে উঠে গিয়ে চারপাশ খুঁজে ফোনটা নিয়ে এসে এরিককে দেয়। এরিক ব্যান্ডেজ করা হাতে ফোনটা নেয় এবং ফোনটা অন করতেই অনেকগুলো মিসড্ কল স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এতে এরিকের চোখ ছোট হয়ে আসে। এরিক তৎক্ষনাৎ কল লিস্টে গিয়ে ওই নাম্বারে কল লাগায় এবং ২-৩ সেকেন্ডের মধ্যে কল রিসিভ হয়। এরিক বলে ওঠে,
—”ইয়াহ্ জ্যাক বলো…. ” ফোনের ওপাশ থেকে যে পাঁচ মিনিট যাবত কী বলল, অ্যানজেলা কিছুই বুঝতে পারল না শুধু লক্ষ্য করলো কীভাবে এরিকের ভাবমূর্তি পাল্টে যাচ্ছে। কথা শেষ হলে এরিক এক টানে ক্যানোলাটা খুলে ফেলে এবং সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে তড়তড়িয়ে তাজা র*ক্ত বের হতে থাকে। অ্যানজেলা দৌঁড়ে গিয়ে এরিকের হাত চেপে ধরে এবং বলে ওঠে,
—”এরিক, কি করছিস এসব? তুই এখনো সুস্থ না বাবা। উঠি তো ঠিকমতো দাঁড়াতেই পরছিস না, কোথায় যাচ্ছিস এমন দূর্যগপূর্ন রাতে?” হসপিটালের পোশাক গায়ে থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে এরিক এদিকে সদ্য আঘাত পাওয়া ক্ষততে টান লেগে র*ক্ত বের হতে থাকে এবং সাদা ব্যান্ডেজ লাল হয়ে ওঠে। কপালের ব্যন্ডেজটার ও অবস্থা তেমন ভালো না। ওদিকে খেয়াল না করেই এরিক একটি কালো রঙের হুডি আর কালো জিন্স পরে অ্যানজেলার তাকে আটকানোর শত চেষ্টাকে উপেক্ষা করে বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে যায় এই দূর্যোগপূর্ন রাতে। মায়ের মন সব আগে থেকেই বুঝতে পারে কোনোকিছু খারাপ হতে যাচ্ছে না তো? এই কথা চিন্তা করে ছেলের জন্য অ্যনজেলার মন কেঁদে ওঠে।
রাত তখন প্রায় দেড়টা। আকাশ যেন ভারি অভিমানে কেঁদে চলেছে অবিরত, আকাশজোড়া মেঘে চাপা পড়ে আছে চাঁদ। ঝিরঝির বৃষ্টিতে চারপাশটা কুয়াশা আর সোঁদা মাটির গন্ধে ভরে উঠেছে। এমন এক বৃষ্টিস্নাত রাত, যখন শহরের কোলাহল থেমে গিয়েছে, রাস্তাগুলো নিস্তব্ধ, আর প্রতিটি জানালার পেছনে কেউ না কেউ হয়ত গভীর কিছু নিয়ে ভেবে চলেছে। চারদিকে নিঃস্তব্ধতা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে নামছে। বৃষ্টির একটানা শব্দ বাইরে বাজছে, জানালার কাঁচে জলবিন্দু জমে ঝরে পড়ছে ধীরে ধীরে। ইনায়া নিঃসঙ্গভাবে বিছানার কোণে বসে আছে। ঘর অন্ধকার, শুধু জানালার পাশে একটা ছোট্ট টেবিলল্যাম্প নিঃশব্দ আলো ফেলে রেখেছে তার ক্লান্ত চোখে।
হঠাৎ বৃষ্টির শব্দের মাঝেই আরেকটি শব্দ কানে এসে ঠেকলো ইনায়ার। জানলা দিয়ে সোজা নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল একটি কালো বাইক।বাইকটা তার বড্ড চেনা, কিন্তু তার খেয়াল আসতেই বুকের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হলো। হার্টবিট অত্যন্ত জোরে চলছে, মুখ শুকনো হয়ে উঠেছে এবং এমন শীতল আবহাওয়ায় ও ইনায়া ঘামতে থাকে। নিজের সন্দেহকে ভুল প্রমাণ করতে আবারও রাস্তার দিকে চেয়ে দেখে একবার। সে দেখতে পায় সেদিনকার মতোই ঠিক লম্বা, চওড়া একজন সুদর্শন পুরুষ বাইক থেকে নামছে। বৃষ্টি ভিকলজে পুরো একাকার, হাতে, পায়ে এবং কপালে তার ব্যান্ডেজ জড়ানো, পায়ে আঘাতের কারণে সামান্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে সামনে আসল। স্ট্রিট লাইটের সামান্য আলোতেই সেই সুদর্শন পুরুষটিকে চিনতে অসুবিধা হলো না ইনায়ার। তার চোখ সোজা ইনায়ার চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে, কপালে চুলগুলো চিপকে আছে, মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, তার মাঝেই ওইভাবে দাঁড়িয়ে আছে এরিক। ইনায়ার শরীরের সমস্ত লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায় এরিকের এমন দৃষ্টি দেখে, সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে জানলা লাগিয়ে দিতে গেলে এরিক চিতকার করে উঠে বলে,
—”ইনায়া! আজকে তোমাকে আমার কথা শুনতেই হবে। নিচে এসো!” এরিক এতোটাই জোর দিয়ে বলে কথাটা যেন ইনায়া তার কাছে বাধ্য। ইনায়া শুষ্ক একটা ঢোক গিলে ফিরে তাকায়। দেখে এরিক ওইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। বুক জুড়ে বেদনা, চোখে উদ্ভ্রান্ত আগুন। তবুও ইনায়া নিচে যায় না। একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো অনুভূতি নেই যেন তার মধ্যে। এদিকে এরিক দাঁড়িয়ে থাকে, পাগলের মতো, পাথরের মতো।
পাঁচ মিনিট… দশ মিনিট… এক ঘণ্টা…
বৃষ্টি আরও ঘন হয়, বাতাসে ঠান্ডা কামড় বসায় হাড়ে। এরিক যেন কোনো কিছুর ধার ধারে না। তার চোখ জানালার দিকে স্থির। ভেজা চুল তার কপাল বেয়ে গাল ছুঁয়ে পড়ে যাচ্ছে, শরীর কাঁপছে, ঠোঁট নীল হয়ে গেছে, কিন্তু তবু তার ঠোঁট বলছে—
—“আমি সারারাত দাঁড়িয়ে থাকব, ইনায়া। তুমি না আসা পর্যন্ত আমি যাবো না… আমি মর*তেও রাজি…”
তাকে দেখতে দেখতে ইনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কিন্তু ভেতরের ভয়, সামাজিক সংকোচ, ভাইয়ের রাগ—সবটা একসঙ্গে তাকে আটকে রাখে।
কিন্তু এরিক তো কোনো কিছুরই পরোয়া করে না, একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে পাথরের মতো। এভাবেই এরিক বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে এবং ইনায়া জানলার সামনে। দেখতে দেখতে রাত ও ফুরিয়ে আসে, বৃষ্টি থামার কোনো নামই নেই বরং আরও তীব্র হতে থাকে, আজানা কোনো বিপদের আশঙ্কা।
ঘড়ির কাঁটা যখন ভোরের দিকে এগোয়, তখনই আচমকা একটি দরজার শব্দ হয়। তানভীর, বাইরের ঝাপসা আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে সে এগিয়ে এসে জানালা দিয়ে দেখে—একটি ছেলে তার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে, পায়ে, কপালে বিভিন্ন জায়গায় ব্যান্ডেজ জড়ানো। আরও ছোটখাটো ক্ষত রয়েছে শরীরে। মনে হচ্ছে এখনি ঢলে পড়ে যাবে কিন্তু চোখে ভাঙা নির্লিপ্তি, ঠোঁট রক্তাক্ত, কিন্তু সুদর্শন মুখটা তীব্র এক আগুনে পুড়ছে। তার মধ্যে একটা জিদ কাজ করছি এবং সে একদৃষ্টিতে উপরতলার ঘরের জানলা, ঠিক ইনায়ার ঘরের জানলার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এতে তানভীরের বুঝতে বাকি থাকে না ছেলেটা আসলে কে। এরিকের চিন্তা মাথায় আসতেই তানভীরের রক্তে আগুন ধরে যায়।
সে চিৎকার করে ওঠে, “এই ছেলে এখানে কী করছে!?” এত চিতকারে মারিয়ার ঘুম ও ভেঙে যায়। তানভীর ছুটে নেমে আসে এবং মারিয়া ও পেছনে আসে। দরজা খুলে গেটের কাছে এসে আচমকা এরিকের হুডি টেনে ধরে তানভীর। তারপরই ঠাস করে এক ঘুষি লাগায় এরিকের চোয়ালের উপর! এতে এরিক দু কদম পিছিয়ে যায় তবুও তার ভাবমূর্তির কোনো পরিবর্তন হয় না। ওদিকে তানভীরকে দেখে ইনায়ার গলা শুকিয়ে যায়। মারিয়া দৌড়ে এসে আটকাতে চায় কিন্তু তানভীর কোনোভাবেই তার কথা শোনে না। এরিকের হুডির কলার চেপে ধরেই তানভীর বলে ওঠে,
—“তোকে কে অধিকার দিয়েছে আমার বোনের কাছে আসার!? কে তোকে সাহস দিয়েছে আমার বোনের জীবন এলোমেলো করার, তার সম্মানে আঘাত করার?” তানভীর আবারও একটা ঘুষি বসিয়ে দেয় এরিকের চোয়ালে। এরিক পড়ে যেতে যেতে নিজেকে দাঁড় করায়। ঠোঁট ফেটে গেছে, তার ধবধবে ফর্সা মুখখানা রক্তিম হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে চুপচাপ জানালার দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সেই জানালার পেছনে ইনায়ার মুখটা কাঁদতে কাঁদতে লুকিয়ে যায়। তানভীর আরও একবার ধাক্কা দেয়, এরপর এক লাথি। মরিয়া তানভীরকে আবারও আটকাতে চেয়ে বলে,
—”ছেড়ে দাও ওকে। দেখ ওর অবস্থা এমনিতেও ভালো মনে হচ্ছে না। প্লিজ ছেড়ে দাও।” কিন্তু তানভীর ছাড়ে না। এবং বলে ওঠে,
—“আমার বোনের আশেপাশে ওকে দেখতে চায় না আমি। ও আমার বোনের জীবনের অভিশাপ!”
এরিক কিছু বলে না, ঠোঁট কেটে র*ক্ত পড়ছে, শরীর ভারসাম্য হারিয়ে পড়তে যাচ্ছে। তার চোখে তবু একই দৃষ্টি—পাগলের মতো, পোড়ার মতো, জ্বলন্ত একটিমাত্র চাওয়া,শুধুমাত্র ইনায়া।
আর পারছিল না ইনায়া। এভাবে এরিককে আঘাত তার ভাই। বুকের ভেতরে কেমন যেন অশান্তি হচ্ছে তার, চাপা কষ্ট। ওই মুহুর্তেই ওরনাটা বিছানা থেকে নিয়ে জলভেজা চোখে, ওরনাটা গায়ে টেনে নিয়ে ছুটে আসে সে দরজার দিকে। সিঁড়ি ভেঙে নিচে ছুটে এসে, দরজা পার হয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই এরিককে আড়াল করে ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
—“ভাইয়া… প্লিজ… আর না। ও অসুস্থ, দেখো না… কেমন ভিজে গেছে… প্লিজ, আর মারো না!”
তানভীর থেমে যায়। মুখে অগ্নি, চোখ রাগে লাল হয়ে আছে। ইনায়ার এমন আকুতি দেখে সে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর এরিকের কলার ছেড়ে দিয়ে বলে,
—“এই একটাই বারের জন্য ছেড়ে দিলাম। আমি আর দেখতে চাইনা ওকে। চলে যেতে বল এক্ষুনি! ”
ইনায়া এবার এরিকের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং ওর মুখটা পরখ করতেই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরতে থাকে। ইনায়া বুঝে উঠতে পারে না, যেই এরিকের জন্য আজকে তাকে এতো কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, সেই এরিকের জন্য তার কেন কান্না পাচ্ছে। চোখের জল বৃষ্টির সাথে ধুয়ে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার জন্য ইনায়ার ফেলা এই চোখের জল এরিককের চোখ এড়ায় না। সে একই তীব্রতার সাথে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর দাঁড়িয়ে থাকার সামর্থ্য তেমন নেই। সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে অবস্থা শোচনীয়, শরীরে একবিন্দু বল পায় না এরিক। ইনায়াকে সামনে পেয়ে যেন তার পুরো দুনিয়া আবার ও ফিরে পেছে সে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,
—”আপনি প্লিজ ফিরে যান এরিক। প্লিজ আমার কথাটা একবার শুনুন।” এরিক একবার হেসে ওঠে ইনায়ার কথায়। এই যে সে বলে যে সে নাকি এরিককে ভালোবসে না, তাহলে এগুলো কি? তার চোখে তো এরিক স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ইনায়া তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। ইনায়া এরিকের কাছে বার বার চলে যাওয়ার মিনতি করতে থাকে, তখনই এরিক তার কাঁপা কাঁপা হাতে ইনায়ার হাত ধরে ফিসফিস করে…
—“তুমি শুধু… শুনে নাও… একবার… একটাবার কান পেতে শোনো…” কণ্ঠটা ভাঙা, নরম, কাঁপা। কিছু বলতে গিয়েও আর পারে না। শরীর অসাড় হয়ে আসে। এরিকের মনে হলো সে এখনই জ্ঞান হারাবে। চোখ বুজে আসছে, মনে হয় আর দেখা হবে না ইনায়াকে, কন্ঠ প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে ঠান্ডায় তাই অনেক চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলে বলে,
—”আ..আই লাভ ই..ইউ ইনায়া!” ইনায়া তাকিয়ে থাকে, কাঁদতে কাঁদতে। এদিকে তানভীর খপ করে ইনায়ার হাত চেপে ধরে তাকে ভেতরে নিতে চায়, কিন্তু ইনায়ার চোখ পড়ে এরিকের কাঁপা দেহে, ঠোঁটের রক্তে, আর তার পাগলপারা দৃষ্টিতে। পসেসিভ, অসহায়, অথচ ভালোবেসে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া ছেলেটা… তার জন্যই কি সে কাঁদে এতটা?
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২২
আকাশ থেকে তখন একটানা বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। এরিক লুটিয়ে পড়ে মাটিতে, চোখদুটো আবছা ইনায়ার দিকেই তাকিয়ে থাকে। যেতে যেতে পেছন ফিরে ভাইয়ের বাঁধন ছেড়ে ইনায়ার তার কাছে আসার ব্যকুলতা এরিকের ঠোঁটে হাসি নিয়ে আসে।এরপর ঝাপসা দৃশ্যটা ও ধীরে ধীরে কালো হতে থাকে চোখের সামনে। কিছুই থামাতে পারে না এরিক। আজ তার খুশি হওয়ার দিন। ঠিক যেন আকাশও কিছুই আর থামাতে পারছে না—ভালোবাসা, পাগলামি, কান্না—সব একসাথে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে, যা থামার নয়…
