অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৪
নুরিয়া ইসলাম
আকাশটা যেন দিনের পর দিন বিষণ্ণতা গিলে খেয়ে ফেলেছে। ঘন ধূসর মেঘে ঢেকে আছে চারদিক, রোদের দেখা নেই বহুদিন।জানালার কাঁচে একটানা ঝরে পড়ছে বৃষ্টি বড় নিঃশব্দে, অথচ গভীর ক্লান্তির একেকটা ফোঁটা যেন চিৎকার করে জানিয়ে দিচ্ছে মানুষের অসহ্যতা।
ক্যালিফোর্নিয়ার শহুরে রাস্তাগুলো একরকম থমকে গেছে, জল জমে ভেসে যাচ্ছে গলিপথ।
এই টানা কয়েক সপ্তাহে প্রকৃতি যেমন বিপর্যস্ত, ঠিক তেমনই বিপর্যস্ত ইনায়ার মনও।
সেই দিনের পর থেকে এরিকের আর কোনও খোঁজ নেই।
শেষবার যখন ইনায়া তাকে দেখেছিল, তখন তার শরীর নিথর, চোখ বুঁজে আছে—জ্ঞানহীন দেহটাকে মৃত্যুর ছায়া স্পর্শ করে গিয়েছিল।
তারপর… নিঃশব্দে কেটে গেছে এতগুলো দিন, অথচ ইনায়া আজও জানে না কী হয়েছিল সেই মুহূর্তের পর।
বাইরের বৃষ্টি তার মনের ঝড়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।এক দোটানায় ডুবে গেছে সে। এরিকের পাগলামি, তার চোখের গভীর সেই চাহনি, আর অসংখ্যবার তাকে বোঝাতে চাওয়া ভালোবাসা—সব আজ যেন কোনো অদৃশ্য সুতোয় ইনায়ার হৃদয়ে জড়িয়ে বসে আছে।
সে ভাবতে চাই না কোন চরিএহীন পুরুষের ব্যাপারে তবুও তার হৃদয় যেন তার কথা আজ শুনছে না। মনের মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। কই এতোদিন এইসব অনুভূতি কোথায় ছিলো। সে যে ওই বিধর্মী মানুষটার নিষিদ্ধ অনুভূতিতে সারা দিবে না,দিবে না সে। কেন দিবে?সে কোন রকম ভুল করবে না। সে এমন কোন কাজ করবে না ;যাতে তার আর তার পরিবারের সম্মান নষ্ট হয়। কিন্তু তার এই মনকে কী বলে বুঝাবে সে?আজ যে এই মনটাও তার সাথে বেইমানি করছে?নিজেকে বোঝাতে চায় ইনায়া।
তবুও… হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক দুর্বল কণ্ঠ যেন প্রতিনিয়ত বলে, ‘তুই নিজেই তো পালাচ্ছিস সত্যি থেকে।’
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ইনায়ার মনের মধ্যে একটা অস্থির গোলকধাঁধা বয়ে চলে । চাইলেই সে বের হতে পারে না। ভাবনায়, দ্বিধায়, অস্বস্তিতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে সে।
হঠাৎ সোফিয়ার ফোনটা বেজে ওঠে। বুকের ধুকপুকানি যেন সেই রিংটোনের সঙ্গে তাল মেলায়। মারিয়া চুপিচুপি ফোনটা তার হাতে ধরিয়ে দেয়।
ইনায়ার হাত কাঁপে। মুখ শুকিয়ে আসে। তার মনে হয় কিছু একটা খুব খারাপ হতে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন সংকুচিত হয়ে আসে।
“ইনু…” ওপাশ থেকে সোফিয়ার কণ্ঠ শোকহত শুনায়। “এরিক… এরিক কোমায় চলে গেছে।”
শব্দটা যেন সোজা এসে বুকে গেঁথে যায় ইনায়ার। কোমা… কোমা!
ইনায়ার মনে হয়, চারপাশটা হঠাৎ থেমে গেছে। সেই বৃষ্টির শব্দ, সেই নিঃশব্দ কান্না, সব এক মুহূর্তে হিম হয়ে যায়। তার মাথার ভেতর কেবল একটি কথাই বাজতে থাকে—এরিক কোমায়… কেন এমন হলো? এমনটা না হলেও তো পারতো, তাই না আল্লাহ?
এক মুহূর্তে সবকিছু থেমে যায়। সময় থমকে দাঁড়ায়।
বৃষ্টি যেন হঠাৎ আরও গাঢ় সুরে পড়তে শুরু করে। জানালার কাচ বেয়ে নামে জলের ধারা—ঠিক ইনায়ার চোখের জলের মতো।
বুকের ভেতর কান্না আটকে রাখা যায় না আর।সে উঠে আসে জানালার পাশে। তারপর নিঃশব্দে সেজদায় নত হয়ে পড়ে।
গাল বেয়ে অশ্রু গড়ায়, বুক কেঁপে ওঠে—
দু’হাত তুলে, দুনিয়ার সমস্ত হাহাকার দিয়ে সে প্রার্থনা করে:
“হে আল্লাহ, আজ আমার জন্যই হয়তো এরিক এই অবস্থায়… আমি কীভাবে নিজেকে ক্ষমা করব?
তুমি ওকে মাফ করে দাও। ফিরিয়ে দাও তাকে… আমার জন্য নয়, তার মায়ের জন্য, তার আপনজনের জন্য।”
সিজদায় থাকা অবস্থায় ইনায়া অনুভব করে তার ভেতরের জমে থাকা তীব্র ঘৃণা, ভয় আর বিভ্রান্তি অশ্রু হয়ে গলে যাচ্ছে।
তার মধ্যে যে প্রতিরোধ ছিল, সেটাও যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
তার মনে পড়ে এরিকের সেইসব মুহূর্ত—যখন সে তার জন্য বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়েছিল,যখন সে বলেছিল, “তুমি শুধু একবার দেখো আমার দিকে,আমি বদলে যাবো তোমার জন্য।”
নামাজ শেষ করে বিছানার কোণে মুখ গুঁজে কাঁদে ইনায়া।
তার চোখে কেবল একটাই প্রশ্ন,
এই টান,এই অনুভূতি ,এই পিছুটান কি শুধুই পাপ?
তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে ওঠে:
“ইয়া রব, তাকদিরে যা রাখেননি, হৃদয়েও তার স্থান দিয়েন না।”
হাসপাতালের সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা নিস্তব্ধ ঘরটা এক বিষণ্নতার চাদরে মোড়ানো। দেয়ালের ধূসর ছায়া আর মন্থর বাতাস সব মিলিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। জীবনের সমস্ত রঙ এই ঘরের দোরগোড়ায় এসে থেমে গেছে। এরিক বিছানায় শুয়ে আছে একদম নিশ্চল। চোখ বন্ধ, ঠোঁটে কোনো চঞ্চলতা নেই, কেবল নাকের পাশে রাখা অক্সিজেন মেশিনের সিসকার শব্দ জানান দিচ্ছে সে এখনো বেঁচে আছে—একটা প্রাকৃতিক শরীর, যেখানে প্রাণ নেই, আছে কেবল যন্ত্রের আশ্রয়।
তার মাথার পাশে পেছনের কোনো এক গভীর আঘাতের ক্ষতচিহ্ন রক্ত শুকিয়ে কালচে ছোপে পরিণত হয়েছে। হাতের পাশে ক্যানুলা গাঁথা, নীল রঙের স্যালাইন পাইপটা বিছানায় এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে যেন ওর ভেঙে পড়া জীবনটাকে ধরে রাখার শেষ প্রচেষ্টামাএ।
এরিকের পাশেই বসে আছে অ্যানজেলা। মাথা নিচু, গালে নেমে আসা চুল ভিজে গেছে চোখের জলে। তার মুখে বলিরেখা নেই, তবু বয়স একলাফে বিশ বছর বেড়ে গেছে। সে নীচু গলায় ফিসফিস করে—
“এরিক… এতো পাগলামি তুই কেন করিস? একবারও আমার কথা তোর মনে হয় না?”
তার গলা কেঁপে ওঠে, চিবুকের পাশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে বিছানার সাদা চাদরে।
“তোর মা যে মরে যাবে তোর কিছু হলে… বাবা… আমি আর কিছুই চাই না, শুধু চাই তুই সুস্থ হয়ে যা … এই চোখে তোকে আমার সেই তেজী এরিককে দেখতে চাই।”
ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা খুলে গেল একটানা ধাতব কড়কড় শব্দে। ভিতরে ঢুকলেন মিস্টার রিচার্ড। কপালে ভাঁজ, ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরা, চোখে লুকানো আতঙ্ক আর জমে থাকা ক্রোধের আগুন। কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলেন বিছানার দিকে তাকিয়ে।
তার কণ্ঠ একসময় স্তব্ধতা ভেঙে চেঁচিয়ে ওঠে, “এই অবস্থার জন্য ওই মেয়েটা দায়ী। ইনয়া। ওই মুসলমান মেয়েটাই আমার ছেলেকে এই জায়গায় এনে ফেলেছে। আমি আগেই বলেছিলাম, ওই মেয়ে আমার ছেলের জন্য অভিশাপ! ”
অ্যানজেলা ধীরে মুখ তোলে। চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে দুর্বলতার চিহ্ন নেই।
“চুপ করো, রিচার্ড! আবার সেই একই কথা? সবসময় ওই মেয়েকেই দোষারোপ করো কেন?
তার গলায় ঝরে পড়ে এক মাতৃস্নেহময় আর্তনাদ,
“তুমি জানো না … তোমার ছেলে ছন্নছাড়া, জেদি। একবার সে যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইনয়াকে নিজের জীবনে আনবে, সে আনবেই। কেউ তাকে থামাতে পারবে না। কিন্তু আমি ভাবি,এই সম্পর্কের পরিণতি কী হবে, রিচার্ড? ইনয়া এসেছে এমন এক সমাজ থেকে, যে সমাজ এই সম্পর্ককে কোনো বৈধতা দেবে না। ওরা মেনে নেবে না আমার ছেলেকে। আর আমার এরিক? সে নিজের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সারাজীবন লড়বে। সমাজের বিরুদ্ধে, ধর্মের বিরুদ্ধে। সে জিতলেও, কতখানি ভেঙে যাবে জানো?”
মিস্টার রিচার্ড এবার গর্জে ওঠেন,
তুমি আমার ছেলেকে ভুলের দিকে ঠেলে দিচ্ছো, অ্যানজেলা? তুমি বুঝতে পারছো না, নিষিদ্ধের আকর্ষণ কী ভয়ানক? আমি কিছুতেই এরিককে শেষ হতে দেবো না, বুঝলে! ওই মুসলিম মেয়েটা এরিককে ফাঁদে ফেলেছে …আমি ওই মেয়ের মায়া-জাল থেকে এরিককে টেনে বার করব।”
তার কণ্ঠে বিদ্বেষ, ভয়, আর নিজের ছেলেকে হারানোর আশঙ্কায় একসাথে কাঁপছে।
কিন্তু অ্যানজেলা থেমে যায় না। ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে স্বামীর চোখে চোখ রাখেন। তার গলায় ঝরে পড়ে এক অসীম যন্ত্রণার দীপ্তি:
“তুমি বুঝতেই পারছো না, কী ভয়ানক ভুল করছো! এরিককে তুমি ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো। এখন ও নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে, অথচ তুমিই দাঁড়িয়ে আছো তার ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে।”
তার চোখে জল, কিন্তু সেই চোখে আছে এক মাতৃহৃদয়ের দৃঢ়তা।
“তুমি কি সত্যিই এরিককে ভালোবাসো না, রিচার্ড? তাহলে কেন তার ভালোবাসাকেই শত্রু ভেবে বসেছো? এমন কিছু কোরো না, যা একদিন তোমার নিজের ছেলেকে তোমার প্রতি ঘৃণায় ভরে দেবে—সারাজীবনের মতো।”
রিচার্ডের মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। বাইরে তাকিয়ে থাকেন তিনি, কিন্তু ভিতরে ভিতরে কেবল বাড়ে ইনায়ার প্রতি একরাশ ঘৃণার আগুন।
অ্যানজেলা আবার বসে পড়েন এরিকের পাশে। সন্তানের নিথর হাতটা নিজের উষ্ণ হাতে তুলে নেন, ঠোঁটে কাঁপা কাঁপা শব্দে বলেন,
“তোর মা এখনো তোর পাশে আছে, এরিক। শুধু একবার চোখ খোল বাবা… একবার… ফিরে আয়।”
ঘরের মধ্যে কেবল মেশিনের শব্দ শুনা যাচ্ছে । বাইরের আলো জানালার কাঁচে পড়ে ঝলমল করছে, কিন্তু ভেতরের ঘরটা যেন এক দমবন্ধ অন্ধকারে ডুবে আছে।
আর মিস্টার রিচার্ড?তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন দরজার পাশে। বাইরে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু তার মনের ভিতরে ইনায়ার প্রতি বিদ্বেষ তীব্র হয়ে উঠে। ভিতরে ভেতরে বলেন নিজেকে,
“না… ওই মেয়েকে আমি আমার ছেলের জীবনে আসতে দেব না। নিজের ছেলেকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে যদি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ বাবা হতে হয় হবো।
রাতের নিস্তব্ধতা আরও ভারি হয়ে এসেছে। ঘরের কোণে রাখা রকিং চেয়ারে দুলছেন মিস্টার তানভীর, চোখে গভীর চিন্তার ছায়া। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো তার মুখের গম্ভীরতা ছুঁয়ে যাচ্ছে। সময় থেমে আছে যেন।
মারিয়া ধপ করে পাশের সোফায় বসে বলে উঠলো,
“এইসব কী বলছো তুমি? পাগল হয়ে গেছো নাকি? তুমি ইনায়ার বিয়ে দিতে চাও? তোমার কী ইনায়ার উপর ভরসা নেই?”
মিস্টার তানভীর ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। গলার স্বর শান্ত, কিন্তু চোখে ঝলকে ওঠা অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে,
“আমার নিজের বোনের উপর বিশ্বাস আছে, মারিয়া। কিন্তু ও ছেলেটার উপর একটুও নয়। আমি ওর চোখে একরকম উন্মাদনা দেখেছি। ইনায়াকে পাওয়ার জন্য সে যেকোনো কিছু করতে পারে। আমি আমার বোনের জীবন, এভাবে নষ্ট হতে দিতে পারবো না। যেখানে ধর্ম নেই, সেখানে ভালোবাসা পাপ। আমি ইনায়াকে সেই পাপের আগুনে পোড়াতে দিতে পারি না।”
তার কথা শেষ না হতেই হঠাৎ দরজায় ধীরে ধীরে ভেসে এলো একটা টোকা দেওয়ার শব্দ। ঘরে যেন আরও একবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
“এসো,” সায় দিলেন তানভীর।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো আদিল। মুখে স্বাভাবিকতার ছায়া থাকলেও চোখে কিছুটা দ্বিধা ফুটে উঠেছে ।
“ভাইয়া, আপনি ডাকছিলেন?”নরম কণ্ঠে প্রশ্ন করলো সে।
মিস্টার তানভীর আবার চেয়ারে বসে বললেন,
“তোমার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ছিলো আদিল। আমি আশা করবো, তুমি আমার কথা রাখবে।”
আদিল একটু চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কী কথা ভাইয়া? সিরিয়াস কিছু?”
তানভীর মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, খুবই সিরিয়াস। আদিল, আমি চাই তুমি ইনায়াকে বিয়ে করো।”
শুনেই যেন আদিলের নিঃশ্বাস আটকে গেল। চোখ মেলে চেয়ে বললো,
“ভাইয়া! আপনি কী বলছেন! ইনায়া তো আমার বোনের মতো।”
তানভীর এবার একটু গম্ভীর হয়ে আদিলকে থামিয়ে দিলেন।
“ইনায়ার সঙ্গে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল বহু বছর আগে, আদিল। তুমি তখন ছোট ছিলে। তোমার বাবার সঙ্গে আমার একটা প্রতিজ্ঞা হয়েছিল। আমি চাই, তুমি সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করো না। ইনায়ার সুখ এখন তোমার হাতে। আমি জানি না, তুমি কী ভাবছো, কিন্তু আমি জানি—এই মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত না নিলে একটা ভয়ানক ঝড় আমার বোনের জীবন তছনছ করে দিতে পারে।”
তানভীর থেমে গেলেন। ঘরে আবারো নেমে এলো নিঃশব্দতা।
“আমি তোমায় সময় দিলাম আদিল,” তিনি বললেন ধীরে, “ভেবে জানিয়ো আমায়।”
ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে;অদৃশ্য এক টানাপড়েনে। এক পাশে ভালোবাসা আর দায়িত্বের কোমল টান, আর অন্য পাশে ধর্ম, নৈতিকতা, আর পুরনো প্রতিজ্ঞার শক্ত বেড়াজাল। মেঝেতে জমে থাকা নিঃশব্দ কান্নাগুলো কোনো শব্দে প্রকাশ পায় না, শুধু হৃদয়ের অতলে বাজে তাদের নিরব সুর। প্রতিটি নিঃশ্বাসে জমে থাকে অজস্র অপূর্ণতা, প্রতিটি চাহনিতে লুকিয়ে থাকে না বলা কথা।
নিশ্ছিদ্র নীরবতা ঘিরে রেখেছে চারপাশ। বিকেলের পড়ন্ত রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে ইনায়ার মুখে এসে পড়েছে, তবুও তার চোখে আলো নেই। জানালার বাইরে চেয়ে থাকা সেই চোখজোড়ায় যেন ঘন কুয়াশা জমেছে। আকাশটাও আজ বিষাদের চাদরে মোড়া রংহীন, প্রাণহীন। ইনায়া তখন থেকে ঠোঁট চেপে ধরে ভেতরের কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
একসময় হালকা শব্দে দরজা খোলার শব্দ হয়। ইনায়ার ভাবি মারিয়া হাতে এক থালা খাবার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। কারো উপস্থিতি অনুভব করেই ইনায়া ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরে তাকায়।
মারিয়া মৃদু হেসে বলে,
— “খাবার নিয়ে এলাম ননদীনি, কিছু খাওনি আজ।”
কিন্তু ইনায়ার মুখ থেকে হঠাৎই বেরিয়ে আসে গুমরে ওঠা একটি প্রশ্ন,
— “ভাবি, আমি আর পারছি না। আমাকে এই বন্দি দশা থেকে মুক্ত করে দাও? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ভাবি…”
মারিয়া থমকে যায়, একটু এগিয়ে এসে স্নেহময়ী হাতে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে বলে,
— “খুব শীঘ্রই তোমার মুক্তি মিলবে, ননদীনি।”
ইনায়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে।
— “মানে কী ভাবি! কী বলতে চাইছেন আপনি?”
মারিয়া এবার একটু নিচু স্বরে, যেন কোনো সুসংবাদ দিচ্ছে এমন ভঙ্গিতে বলে,
— “তোমার ভাই তোমার বিয়ে ঠিক করেছে।”
মুহূর্তেই যেন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হৃদয়টা স্যাঁত করে ওঠে ইনায়ার। একবার থেমে, ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— “কার সাথে?”
মারিয়া হালকা হেসে বলে,
— “আদিলের সাথে।”
বজ্রাঘাতের মতো শব্দটা আঘাত হানে ইনায়ার ভেতর। সে হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে,
— “ভাবি! আদিলের সাথে মানে? ভাইয়া কী পাগল হয়ে গেছে নাকি! আদিল তো আমার ভাইয়ের মতো!”
মারিয়া এবার গম্ভীর হয়। ধীরে ধীরে ইনায়ার হাত ধরে তাকে বিছানায় বসায়। গলার স্বরটা কোমল, কিন্তু স্থির।
— “আমি বুঝি তোমার মনের অবস্থা, ননদীনি। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তোমার ভাইয়ের। তুমি জানো না, সে কতোটা তোমার ভালো চায়। আর আদিল? সে অনেক ভালো ছেলে। সে তোমায় সম্মান করবে, ভালো রাখবে।”
এই বলে মারিয়া ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
ঘরটা পুনরায় নিঃশব্দ হয়ে পড়ে, আর ইনায়া একাকীত্বের নিঃসীম গভীরতায় তলিয়ে যেতে থাকে। তার চোখ থেকে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে, ঠোঁট কাঁপে। সে দু’হাত তুলে কান্নাভেজা কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে প্রশ্ন রাখে,
— “আল্লাহ্, এটা কী হয়ে গেল? আমার সাথেই এমনটা কেন হলো?”
জানালার বাইরে তীব্র হাওয়ার সুর তার বুকভাঙা কান্নার সঙ্গী হয়ে উঠে। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকে ইনায়া, তার ভেতরের যন্ত্রণাগুলো আজ আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আদিল চুপচাপ নিজের ঘরের এক কোণে বসে থাকে। তার চারপাশে এক অলক্ষ্য ভার নেমে এসেছে। জানালার ধারে বসে সে বাইরে তাকিয়ে থাকে।সন্ধ্যার আলো ক্রমশ নিভে আসছে, বিকেলের সোনালি রোদ গলে গিয়ে ধূসর কুয়াশায় পরিণত হচ্ছে। দেয়ালে ছায়ারা লম্বা হয়ে উঠেছে, ঘরের প্রতিটি কোণে নিঃশব্দ আর গুমোট একটা স্তব্ধতা জমে আছে। অথচ আদিলের ভেতর ঠিক তার উল্টো একটা ঝড় চলছে যেটা, থামার নাম নেই।
সব কিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গেল হঠাৎ! এই মুহূর্তে মাথায় কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—“এটা কী থেকে কী হয়ে গেল?”
তার হাতে ফোন, স্ক্রিনে ভেসে আছে সেই চেনা নাম,‘জুলি’। নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলছে, মানে ও এখন অনলাইনে আছে। কিন্তু আঙুল এগিয়ে গেলেও সে কিছু লিখে উঠতে পারে না। গলা শুকিয়ে আসে, বুকের ভেতর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করলেই একটা ছবি ভেসে ওঠে,জুলির হাসি, তার চুপচাপ দৃষ্টি, আর সেই কোমল কণ্ঠস্বর যেটা শুনলেই আদিলের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যেত।
কিন্তু এই বাস্তবতা… বড় নির্মম।
পরিবার ইনায়াকে বেছে নিয়েছে তার জন্য। বিয়ের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে নিঃশব্দে, অথচ আদিলের মন যেন পিছনে ছুটছে, জুলির দিকেই।
“জুলি যদি জানতে পারে আমি বিয়ে করছি? যদি ও ভাবে, আমিও অন্যদের মতো?…”
আদিলের বুকের ভিতর হাহাকার জমে ওঠে । সে জানে,তার ভালোবাসা অন্য রকম, নিঃস্বার্থ, কাঁচের মতো স্বচ্ছ। কিন্তু সে তা বোঝাবে কাকে? জুলিকে সে ভালোবেসেছে কারণ ছাড়া, কারণ খুঁজে সে পায়নি;শুধু ভালোবেসে ফেলেছে।
চেনা দিনের প্রতিটা ছোট আনন্দ জুলির নামেই সযত্নে মনের গহীনে বেঁধে রেখেছে সে। তার হাসির শব্দ, মৃদু অভিমান, হঠাৎ চুপ করে যাওয়া—সবকিছু আজ তীব্রভাবে কেবল মনে পড়ছে। অথচ, কিছু বলার নেই, কিছু করার নেই।
সে ওয়ালেট থেকে জুলির ছবি বের করে ভেজা কন্ঠে বলে ওঠে,
“জুলি, আপনাকে ছাড়া নিজের জীবন কল্পনাও করতে পারি না আমি। অন্য কারও হাতে নিজেকে তুলে দিতে মন চায় না। আপনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, আমি ভেঙে যাবো, ভেতরটা চুরমার হয়ে যাবে। তবু নিজেকে আটকাতে পারিনি,ভালোবেসে ফেলেছি আপনাকে, সব কিছুর ঊর্ধ্বে, নীরবে, নিঃশব্দে।”
এই স্বীকারোক্তি কখনো কারো কানে পৌঁছায় না।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আদিল ধীরে ধীরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ঘরের অন্ধকারে তার চোখের সামনে স্বপ্ন আর বিষাদ একসাথে ঘোলাটে হয়ে যায়।
জানে, সবকিছু এইভাবেই চলবে;বিয়েটা বুঝি হয়েই যাবে ইনায়ার সঙ্গে, হাসিমুখে ছবি তোলা হবে, পরিবার খুশি হবে।
কিন্তু তার হৃদয়ের অলিখিত চিঠিগুলো কখনো পৌঁছাবে না জুলির কাছে।
তার বুকের ভেতর একটা কথাই সে বারবার বাজতে শুনে,
“আমি শুধু চেয়েছি তোমায়…”
দেখতে দেখতে দিনগুলো গলে যায় মোমের মতো, আর আজকের দিনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আজ ইনায়ার বিয়ে।
ইনায়াদের বাড়ি আলোয় আলোয় ভেসে গেছে, স্বর্গের বারান্দা ছুঁয়ে ফেলেছে পৃথিবী। বাতাসে মেঘের মতো ঘুরে বেড়ায় সানাইয়ের সুর, মিষ্টি হাসির গুঞ্জন। ইনায়া লাল পাড়ের শাড়িতে অনিন্দ্যসুন্দর, এক অনুপম ছবি যেন।
অথচ এই দৃশ্যের উল্টো প্রান্তে, হাসপাতালের ধূসর ঘরে, নিথর বিছানায় পড়ে আছে এরিক;যার চোখ বন্ধ, মুখ নিস্পন্দ, শরীর কোমার কারাগারে বন্দি।
তবু সময় থেমে থাকে না।
ইনায়ার বিয়ের খবর এক কান থেকে আরেক কানে ছড়িয়ে পড়ে,পৌঁছে যায় এরিকের বন্ধুদের কানেও। কেউ কিছু না বললেও, তাদের নিঃশব্দ ফিসফাসে ঝরে পড়ে বিষাদের ছায়া।
“আজ ইনায়ার বিয়ে…”
এই কথাটা যেন একটা অদৃশ্য ঝড় হয়ে বাজে এরিকের স্নায়ুর ঘুমন্ত গহ্বরে।
কেঁপে ওঠে নিথর শরীরটা!
চোখের পাতায় টান পড়ে, শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয় বিস্ময়ের বিদ্যুৎ!
বন্ধুরা চমকে ওঠে,
“এরিক! এরিক নড়ছে!”
ডাক্তার দৌড়ে আসে, হাহাকার-হাসির মিশেলে চিৎকার করে ওঠে সবাই, “এরিক কোমা থেকে উঠছে!”
কিন্তু সেই মুহূর্তটাই যেন অন্ধকার থেকে উঠে আসা কোনো ভয়াল হিংস্রতা বয়ে আনে।
এরিক চোখ মেলে তাকায়,তার চোখে ফুটে উঠে এক প্রকার হিংস্রতা।হাতের ক্যানুলা এক টানে ছিঁড়ে ফেলে দেয় সে।
হাসপাতালের বিছানা হলো তার জন্য শেকল—সে ছিঁড়তে চায় সেই শিকল, ছুটে যেতে চায়…
ইনায়ার কাছে।
সে গর্জন করে ওঠে, এরেনের কলার চেপে ধরে প্রশ্ন করে,
“কী হয়েছে? আমার… ইনায়ার ?”
এরেন এগিয়ে এসে কাঁপা গলায় বলতে চায়, “তুই দুর্বল, ভাই, আরাম কর…”
কিন্তু এরিক শোনে না, রক্তলাভ চোখে তাকিয়ে থাকে সে এরেনের দিকে,
“বল! এখনই বল! ইনায়ার কি হয়েছে?”
এরেন হেরে গিয়ে, ফিসফিস করে কেবল একটি বাক্য বলে—
“আজ… ইনায়ার বিয়ে…”
সেই মুহূর্তটা যেন ভূমিকম্প হয়ে হানা দেয় এরিকের মস্তিষ্কে।
এরিকের চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়, রক্তে-জলে জ্বলে ওঠে তার চাহনি।
সে আর্ত গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এরেনের উপর,
“তুই মিথ্যা বলছিস! মিথ্যা! ইনায়া শুধু আমার! ও অন্য কারোর হতে পারে না…!”
এ্যালেক্স কাছে আসে, শান্ত কণ্ঠে বলে, “এরিক, মিথ্যা না… ইনায়া আজ অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে…”
ইনায়া অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে , কথাটি শুনেই এরিকের শরীরের প্রতিটি শিরা বিস্ফোরিত হয়ে পড়ে।সে একটানে হাতের ক্যানুলা ছিঁড়ে ফেলে, হাতের ফিনকি দিয়ে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ে, সেই দিকে এরিকের হুস নেই, বরং সে চিৎকার করে ওঠে,
—“না!!! ইনায়া শুধু আমার! কেউ ওকে ছুঁতে পারবে না! ওকে যদি কেউ নিজের ভাবনাতে নিয়ে আসে, তাকেই আমি শেষ করে দেব!”
হাসপাতালের স্টাফ, গার্ড সব ছুটে আসে,এরিককে থামাতে।কিন্তু কেউ তাকে থামাতে পারে না।
সে এক উন্মাদ ঝড়, চোখে আগুন, শরীরে রক্ত, বুকে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে ইনায়াকে পাওয়ার নেশা!
—“আজই সব শেষ করব!”
এরিক দৌড়াতে শুরু করে,
হাসপাতালের করিডোর, রিসেপশন, লিফট,সব কিছু মুছে যায় তার চোখে।
সে শুধু ছুটে চলে,
পিছনে বন্ধুদের আর্ত চিৎকার,
নার্সদের হাহাকার,ডাক্তারদের হুকুম,কিছুই পৌঁছায় না তার কর্ণকুহরে।
তার বুকের ভেতরে শুধু একটাই নাম বারবার দগ্ধ হয়ে বাজে,
ইনায়া… ইনায়া… আমার ইনায়া…
ইনায়া আজ এক নতুন রূপে নিজেকে দেখছে। তার নরম তুলতুলে শরীরে লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা আগুনের শিখা হয়ে জ্বেলে উঠেছে। অলংকারে ঝলমল করছে তার গলা, কপাল, কান। সে আয়নার সামনে বসে রয়েছে । আয়নার ফ্রেমে ধরা পড়েছে এক অনন্যা রূপকথার বধূ, যার চোখে একধরনের স্বপ্নমাখা অস্পষ্টতা। সে তাকিয়ে আছে নিজ চোখে, যেন আয়নার ভেতরের মেয়েটাকেই চিনে উঠতে পারছে না।
ঘরটা নিস্তব্ধ। শুধু হালকা বাতাসে পর্দার নড়াচড়া আর আয়নার পাশ ঘেঁষে সাজানো বাতির মৃদু কাঁপা আলো ছড়িয়ে পড়েছে ।
হঠাৎ—
ঝনঝন করে জানালার পাশে কিছু একটা পড়ার শব্দ হয়। ইনায়া চমকে ওঠে,ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে। সে মাথা ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকায়, আর ঠিক তখনই,তার সামনে এরিককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে?কী বিভৎস লাগছে এরিককে?হাতে রক্ত, উষ্কখুষ্ক চেহারা। ইনায়ার মনে প্রশ্ন উদিত হলো, আচ্ছা উনি এখানে কেন এসেছে?উনি কী আমার জন্য এসেছে?ইনায়ার ভাবনার মাঝেই এরিক বলে উঠে,
“বা খুব সুন্দর লাগছে তো তোমায়?কী পড়েছো এটা?এতো লাল আর খুব ভারী মনে হচ্ছে? তোমাদের বিয়েতে বুঝি লাল পড়ে?কার জন্য পড়েছো?নিশ্চয়ই অন্য কারো জন্য?
কথাগুলো বলতে বলতে এরিক ইনায়ার দিকে এক কদম এক কদম করে এগোতে থাকে। আর ইনায়া পিছাতে থাকে। ইনায়ার এরিকের ভয়ংকর চেহারা দেখে ভয়ে ঢক গিলে বলে,
এরিক…আমি?
এরিক ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইনায়াকে ইশারা করে চুপ থাকতে,
হুস,একদম চুপ। আমি একটা কথা জিজ্ঞেসা করেছি, তার জবাব দাও। কার জন্য বউ সেজেছো? বলো।
ইনায়া কাঁপছে। ঠোঁট থরথর করছে। মুখ খুলে কিছু বলতে চাইলেও শব্দ বেরোয় না।
ঠিক সেই মুহূর্তে, এরিক পকেট থেকে একটা ভেজা রুমাল বের করে হঠাৎই ইনায়ার মুখে চেপে ধরে। ইনায়ার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে… শরীর ঢলে পড়ে।
এরিক ধীরে ধীরে তার চুলগুলো আলতোভাবে ছুঁয়ে দেয়, যেন খুব প্রিয় কারো ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
– “তুমি শুধু আমার। শুধু এই এরিক অ্যাসফোর্ডের। ডিসটেনিও আমাদের আলাদা করতে পারবে না। অশান্ত এই আমি’টাকে শান্ত করতে তোমাকেই লাগবে, মুনলাইট।”
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক উন্মদনা ফুটে উঠেছে। তারপর ইনায়াকে কোলে তুলে নিয়ে, চতুর্দিকে পাগলের মতো হেসে উঠল।
– “সময় এসে গেছে… তোমার এরিকের দুনিয়ায় বন্দি হওয়ার।”
কথাটি বলেই এরিক পাগলের মতো হাসতে থাকে। তারপর ইনায়াকে কোলে তুলে বেরিয়ে যায়।
ধুলোবালি জমে থাকা একটি জং ধরা গুদামঘর। চারদিকে অন্ধকার, শুধুমাত্র ছাদের ফুটো দিয়ে পড়া এক চিলতে আলো মাটি ছুঁয়ে ধুলোমলিন বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এক সময় ধীরে ধীরে চোখ মেলে ইনায়া। চারপাশটা প্রথমে ঝাপসা লাগে তার চোখে। মাথা ভার হয়ে আছে, শরীর অবশ হয়ে ওঠে । কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় ।
হঠাৎ সামনে ঝুঁকে আসে এক মুখ… পরিচিত, অথচ এখন বড্ড অচেনা লাগছে ।
এরিক!
ইনায়া একটু ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের দিকে তাকায়, আর তখনই বুকটা হঠাৎ ধক করে ওঠে।
সে দৃশ্য দেখে ইনায়ার শ্বাস আটকে আসে।
একটি চেয়ারে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা তার ছোট্ট ভাতিজি। মুখে কাপড় গুঁজে দেয়া, চোখে ভয় আর অসহায়ত্বের ছাপ।
— “এরিক, এসব কী?” ইনায়ার গলা কেঁপে ওঠে। “আপনি আমার ভাতিজিকে কেন বেঁধে রেখেছেন?”
এরিক হালকা হাসে, তারপর ধীর পায়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়।
— “কেন সোনা,” সে বলে, ঠোঁটে এক অদ্ভুত মুচকি হাসি, “আমার সারপ্রাইজটা তোমার পছন্দ হয়নি? তোমাকে আমার করে পাওয়ার জন্য একটু কৌশল অবলম্বন করতে হলো।”
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তার কথার মানে ধরার চেষ্টা করছে।
— “বুঝতে পারোনি এখনো?” এরিক আবার বলে, তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক ঝলসে ওঠে।
ইনায়া ধীরে মাথা নাড়ে।
— “বোকা মেয়ে,” এবার হো হো করে হেসে ওঠে এরিক, “আজ এই মুহূর্তেই আমি তোমাকে বিয়ে করছি।”
এই কথা শুনে ইনায়া যেন চমকে ওঠে, গলা ধরে যায় তার।
— “না! না, এটা কিছুতেই সম্ভব নয়!”
— “কেন সম্ভব নয়?” এবার এরিকের কণ্ঠে বিরক্তির ফুটে ওঠে।
— “ সেটা আপনি জানেন, এরিক!” ইনায়ার চেহারায় রাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে ,
“আপনার আর আমার বিয়ের কোনও বৈধতা নেই। আমি মুসলিম, আপনি খ্রিষ্টান। এই সম্পর্ক ধর্ম অনুযায়ী নিষিদ্ধ।”
এরিক এবার ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ওঠে।
— “ধর্ম? তুমি ভুলে যাচ্ছো, এটা আমেরিকা। এখানে ধর্ম নয়, আইন চলে। আইন অনুযায়ী তুমি আমার জন্য বৈধ। আর আমি, এরিক অ্যাসফোর্ড, কখনও নিয়মের তোয়াক্কা করি না।”
ইনায়ার চোখে জল জমে ওঠে। সে নিচু গলায় বলে ওঠে,
— “আপনি ভুল করছেন এরিক। আপনি নিষিদ্ধতাকে বৈধতা দিতে চাইছেন।”
এরিক একটু থামে, তার ঠান্ডা দৃষ্টি ইনায়ার মুখের উপর পড়ে ।
— “আমি শুধু তোমাকে চাচ্ছি। । সই করো এই কাগজে।”
ইনায়া চোয়াল শক্ত করে বলে,
— “না, আমি করবো না সই। আপনার পাগলামিকে আমি মেনে নিতে পারবো না।”
এরিক তখন চোখ রাঙিয়ে বলে,
— “ঠিক আছে। তাহলে তোমার ভাতিজিকে মেরে ফেলি।”
এরিকের এই কথায় যেন বাজ পড়ে ইনায়ার বুকে। চোখ থেকে গড়াতে থাকে টপটপ করে অশ্রু।
— “আপনি খুব খারাপ, এরিক! আপনি এটা করতে পারেন না!”
এরিক আরেকবার হেসে ওঠে, অন্ধকারের মধ্যে তার চোখ দুটো ভয়ানক জ্বলজ্বল করে ওঠে।
— “আমাকে চ্যালেঞ্জ করো না বেবিগার্ল। আমি তোমাকে পেতেই সব কিছু করতে পারি। Now, sign it.”
ইনায়া একবার কাঁপা হাতে তার ভাতিজির দিকে তাকায়, তারপর এরিকের দিকে। বুকের মধ্যে দ্বন্দ্ব, যন্ত্রণা, অপমান সব এক হয়ে জট পাকিয়ে যায়।
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিচু গলায় বলে,
— “এরিক, আপনি ঠিক করছেন না। এইভাবে সই করলেই বিয়ে বৈধ হয়ে যায় না। আপনি আমার ধর্মমতে বিধর্মী।”
— “আমি বৈধতা বুঝি না,” ঠান্ডা গলায় বলে এরিক, “আমি শুধু চাই, তোমার অস্তিত্বের উপর আামার নামের সিলমোহর বসুক। আমার ‘মিসেস অ্যাসফোর্ড’ হও, এটাই যথেষ্ট।”
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৩
তীব্র মানসিক যুদ্ধের পরে, একসময়ের স্বাধীনচেতা ইনায়া কাগজটা হাতে নেয়। ভেতরে তীব্র যন্ত্রণা, চোখে জল, আর হাতে একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে সে সই করে দেয়।
এরিক সেই সইয়ের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক বিজয়ী হাসি হেসে বলে ওঠে,
“Congratulations… আইন অনুযায়ী, এখন থেকে তুমি মিসেস এরিক অ্যাসফোর্ড।”
