অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৫
নুরিয়া ইসলাম
রাত গভীর। ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তাগুলো তখন নিঃশব্দ। দিনের জৌলুশ, আলোর ঝলকানি, গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল সব থেমে গেছে অনেক আগেই। শহরের প্রাণ এখন বিশ্রামে। একমাত্র বাতাসই জানে, আজকের রাতটা শান্ত নয়, বুকে লুকিয়ে রেখেছে এক আগ্নেয়গিরির কান্না।
বিয়েবাড়ির ঝলমলে আলো নিভে এসেছে। অতিথিরা বিদায় নিয়েছে, হলঘরের রঙিন চেয়ারে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা। কিন্তু সে নিস্তব্ধতার ভেতরেও এক ঘরে ব্যাকুলভাবে পায়চারি করে চলেছেন একজন পুরুষ—মিস্টার তানভীর শেখ।চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার গভীর ছায়া। মোবাইলের স্ক্রিনে একবার তাকান, একবার দৃষ্টি ফেরান জানালার বাইরের অন্ধকারে। প্রতিবার নিজের সঙ্গে নিজেই একটা প্রশ্ন করেন — “ইনায়া কোথায়?”
তার চোখের কোণে ঘুম নেই, ঠোঁট ফেটে গেছে বারবার জিভ বুলানোর চাপে। মাঝে মাঝে ফোনে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন সংক্ষেপে, কখনো গলা জড়িয়ে আসছে উদ্বেগে যখন তিনি বারংবার মারিয়াকে জিজ্ঞেস করছেন— “মারিয়া, ইনায়া ঠিক আছে তো?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ইনায়া তার বোন নয়, তার সন্তানের মতো। একজন বাবা-মা হারা বোনের অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং একমাত্র ভরসা ছিলেন তিনিই। মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে যেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— “ইনায়ার গায়ে আঁচড়ও লাগতে দেবেন না!”
আজ সেই প্রতিজ্ঞা যেন বুকের ওপর পাথরের মতো ভার হয়ে চেপে বসেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে…
নীরবতা চিরে ভেসে এলো এক অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর।
—“ভাইয়া…”
মুহূর্তেই তানভীর যেন নিজের শ্বাস ফিরে পেলেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখেন—দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রাণপ্রিয় বোন ইনায়া। চোখ ছলছলে, মুখটা অনিশ্চয়তায় ভরা, কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল এমন এক আর্তি, যা শত ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে। তানভীর ছুটে গিয়ে ইনায়ার মাথায় হাত রাখলেন, যেন নিশ্চিত হতে চাইলেন,সে সত্যিই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কিনা। বারো ঘন্টা কোনো খোঁজ না পেয়ে মনটা তোলপাড় হয়ে গেছিল তার। প্রিয় বোনটিকে চোখের সামনে না দেখে ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল সে।
গলা রুদ্ধ হয়ে আসছে, তবুও বললেন,
— “তুই ঠিক আছিস তো, বোন? কোথায় ছিলি এতক্ষণ? আমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম!”
ইনায়া কিছু বলতে যাচ্ছিল,ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক রুক্ষ, আত্মবিশ্বাসে ভরা পুরুষকণ্ঠ,
— “আপনার বোন আমার সঙ্গে ছিল, ব্রাদার-ইন-ল?”
তানভীর মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখলেন,দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে সেই অপরিণত, উদ্ধত ছেলেটা, এরিক অ্যাসফোর্ড। মুহুর্তেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তাঁর ভ্রু জোরা কুঁচকে উঠল। কণ্ঠে রাগ ঝরে পড়ল ;সে এরিকের থেকে মুখ ফিরিয়ে ইনায়ার দিকে দৃষ্টি মেলে বলল,
—“এই বেয়াদব ছেলেটা এখানে কী করছে?”
এরিক মিস্টার তানভীরের কথায় বিরক্ত হয়ে একরকম ঠোঁট বাঁকিয়ে “চ্” উচ্চারণ করে বলল,
—“ওকে কেন জিজ্ঞেস করছেন, ব্রাদার-ইন-ল? যা জানার, আমাকে জিজ্ঞেস করুন। After all, I’m her husband!”
এক সেকেন্ড… শুধু এক সেকেন্ডের জন্য যেন পৃথিবী থেমে গেল। শব্দহীন হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে লাগল সেই একটি বাক্য— “I’m her husband.”
তানভীরসহ পুরো বাড়ি স্তব্ধ। মিস্টার তানভীরসহ সবাই কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে।এরিক একবার সবার মুখের দিকে নজর বুলিয়ে, কোনো কিছু তোয়াক্কা না করেই স্পষ্ট গলায় বলে উঠল,
— “হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন আপনারা। আমরা কিছুক্ষণ আগেই বিয়ে করেছি। বিয়ে করেছি আমি, আপনার বোনকে!”
এরিকের কথায় তানভীরের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তিনি গর্জে এরিকের উদ্দেশ্য বলে উঠলেন,
—“ বিয়ে করেছো মানে? তুমি কি মুসলিম হয়েছো?”
এরিক হালকা মুচকি হেসে জবাব দিল,
—“নাহ্, সেটা হতে চেয়েছিলাম… আপনার বোনের জন্যই। কিন্তু শালী, সব কিছুতেই শুধুই জ্ঞান দেয়। তাই হয়ে ওঠেনি।”
এরিকের মুখে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ শুনে তানভীরের সহ্যশক্তির বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি তীব্র কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— “তুমি কি বিয়ে মানে বুঝো? এটাকে ছেলে খেলা মনে হয় তোমার? যে কাগজে সই করলাম আর বিয়ে হয়ে গেল? এই বিয়ের কি বৈধতা আছে? ধর্ম, সংস্কার, মূল্যবোধ—এর কোনো মানে নেই তোমার কাছে?”
এরিকের ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল, সে এটাই আশা করেছিল মিস্টার তানভীরের কাছ থেকে। সে কোনো রকম তর্কে না জড়িয়ে সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
— “আপনার ধর্মে হয়তো বৈধতা নেই কিন্তু আমার আইনে সম্পূর্ন বৈধতা আছে। আপনার বোন এখন থেকে মিসেস এরিক অ্যাসফোর্ড। তাই বলছি, আমার বউয়ের থেকে আমাকে দূরে রাখার চেষ্টা করলে, ফল ভালো হবে না।”
এরিকের এই রকম আচরণে মিস্টার তানভীর রেগে গিয়ে বললেন,
—”তুমি কি আমাকে থ্রেট দিচ্ছো?”
এরিক বাঁকা হেসে মিস্টার তানভীরের কথায় সম্মতি জানিয়ে ভ্রু নাড়িয়ে বলে ওঠে,
—” কোনো সন্দেহ আছে?”
মিস্টার তানভীর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না, মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে এ কী ঘটে গেল! চারপাশটা হঠাৎ করে থমকে গেছে। সময় থেমে গেছে যেন, আর তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সেই থেমে যাওয়া মুহূর্তের কেন্দ্রে। ধপধপ করতে থাকা বুক নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে চোখ ঘোরালেন ইনায়ার দিকে। গলা তার নিজের অজান্তেই ভারী হয়ে উঠেছে। গম্ভীর, দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন ইনায়াকে,
—“এই ছেলে যা বলছে, তা কী সত্যি, ইনায়া? তুই কি… তুই কি এই ছেলেটাকে বিয়ে করেছিস?”
ইনায়া পাথরের মূর্তির মতো ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে । ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পাতায় জমানো এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে নিচে নামে। ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে তাকানোর সাহসটা হারিয়ে ফেলেছে সে। চারপাশে কেউ নেই যে তাকে বোঝে। কেউ বিশ্বাস করবে না তার কথা। বুকের গভীর থেকে একটা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
—“হে আল্লাহ… এ কোন পরিস্থিতিতে ফেললে তুমি আমাকে!” — ভেতরে ভেতরে কেঁদে ওঠে সে।
ইনায়ার এই নীরবতা মিস্টার তানভীরের সহ্য হলো না। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বোন, অথচ একটা শব্দও উচ্চারণ করছে না।এই নিরবতা যেন তাকে ভিতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এই একফোঁটা চুপ থাকাতেই গুমরে উঠছে শতশত প্রশ্নের উত্তরহীনতা।
তিনি খুব কষ্ট পেলেন। হৃদয়ের ভেতরটা কেঁপে উঠল গভীর অভিমানে। এ কি সেই ইনায়া, যে ছিল তার গর্ব, তার অহংকার? যাকে নিয়ে বারবার নিজেকে ধন্য মনে করতেন? আজ সে-ই কি না এমন ভুল পথে পা বাড়াল? তার এতদিনের, আদর্শ, পারিবারিক শিক্ষা—সবই কি তবে ব্যর্থ হলো এক মুহূর্তে?
মনে হলো, ইনায়া তার পারিবারিক মূল্যবোধ, সংস্কার আর বিশ্বাস সব কিছু বিসর্জন দিয়ে বসেছে এক বিধর্মী ছেলেটার ভালোবাসার কাছে। ভালোবাসার মোহে সে ভুলে গেছে কে সে, কী তার পরিচয়।
আজ মিস্টার তানভীরের কাছে নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে। নিজের আদর্শ, নিজের বিশ্বাস সব কিছু যেন তুচ্ছ হয়ে গেছে ইনায়ার এই সিদ্ধান্তের কাছে। একচল্লিশ বছরের দৃঢ় মূল্যবোধ যেন চোখের সামনেই হেরে গেল আজ।নিজেকে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারলেন না তিনি, তাইতো জীবনে প্রথমবার… বোনের দিকে হাত তুলতে যান তিনি।ঠিক তখনি এরিক, দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁসতে ফুঁসতে মিস্টার তানভীরের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলে উঠল,
—”Don’t you dare, Mr. Tanvir! বউ লাগে আমার;আমার বউয়ের গায়ে যদি একটুও ফুলের টোকাও পড়ে, আই সোয়ার…সম্পর্কের সব সীমানা আমি ভুলে যাব!”
মিস্টার তানভীর হতভম্ব হয়ে নিজের হাতটা টান দিয়ে ছাড়িয়ে নেন। পরক্ষণেই তাঁর ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে, নিজের সমস্ত স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখেন।তিনি ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,
—“এই মর্যাদা দিলে তুমি আমার শিক্ষার? একজন বিধর্মী ছেলেকে বিয়ে করেছো! আমি কখনো ভাবিনি তোমার জন্য আমার মাথা এভাবে নিচু হবে…”
এরিক মিস্টার তানভীরের কথায় বিরক্ত হয়ে পড়ে। চোখ সরু করে খানিক তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
“এত ড্রামা করার কী আছে?”
তার ভাবটা এমন, যেন—“বিয়ে হয়ে গেছে তো হয়ে গেছে, আর কী!”
এরিক এইসব পারিবারিক বিষয়ে বেশি মাথা ঘামায় না। সে ইনায়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে ইনায়ার থুতনি ধরে মুখটা আলতো করে তুলে ধরলো তারপর নিজের শক্তপোক্ত পুরুষালী হাত দিয়ে ইনায়ার সমস্ত চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো,
—”একদম কাঁদবে না, তুমি আমার সামনে। কাঁদলে তোমায় খুব বাজে দেখায়। ”
ব্যাস এইটুকু বলেই পিছন ফিরে মিস্টার তানভীরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
— “আপনার বোন এখন আমার জীবনসঙ্গী। ওকে আপনার কাছে আমানত হিসাবে রেখে গেলাম। যদি কোন রকম চালাকি করেন,আই সোয়ার তাহলে এরিক অ্যাসফোর্ড কী করতে পারে, কল্পনাও করতে পারবেন না।”
কথাটি বলেই এরিক নিজের হাতে পড়ে থাকা হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল—
—”সরি বেইবি ,এখন যেতে হবে, বিয়ের খবরটা ছড়িয়ে গেছে, আমার বাপ এতক্ষনে হুঙ্কার দেওয়া শুরু করে দিয়েছে । ওনাকে একটু ঠান্ডা করতে যাচ্ছি। যদি আমি না যাই, তবে হয়তো পুরো শহরেই আগুন লাগবে!”
এরিক সবার সামনে ইনায়াকে কপালে কিস্ করতে নিলে, ইনায়া ভয়ে পিছু হটে কিন্তু এতে কাজ হয় না। এরিক একপ্রকার জোর করে ইনায়ার বাহু ধরে টেনে সবার সামনেই তার কপালে একটা গাঢ় চুমু খায়। কিন্তু ইনায়া কিছুই বলতে পারে না শুধু নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। এরপর এরিক নিজের মুখটা ইনায়ার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে,
—”আজকে তোমাকে ছেড়ে দিলাম বেবিগার্ল কিন্তু বাসর তো আমাদের হবেই। সেদিন আর তোমাকে ছাড় দেব না আমি।” এই বলে এরিক আবারও নির্লজ্জের মতো সবার সামনেই ইনায়ার গালে আরও একটা চুমু খায় এতে আশেপাশের সবাই লজ্জায় তাদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। আর এদিকে ইনায়ার তো বেহাল দশা। না পারছে এরিককে কিছু বলতে না পারছে নিজেকে সামলাতে। কিছু বলবেই বা কি করে? এরিক তো এখন তার কাগজ কলমের স্বামী।
—“Love you,my dear wifey.” এক চোখ টিপ মেরে কথাটি বললো এরিক। যাওয়ার আগে সবার দিকে এক পলক চাইলো তারপর সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে আদিল। মনটা তার অস্থিরতায় ছটফট করছে। ঠিক এই ভয়টাই তো সে পাচ্ছিল।বিয়ের গুঞ্জন এক কান, দুই কান করে শেষমেশ জুলির কানেও পৌঁছে গেছে।
মেয়েটা সিদ্ধান্তহীনতায় এত বড় ভুল করে বসবে—এটা আদিল কল্পনাও করেনি।
নিজেকে তার অপরাধীর মতোই মনে হচ্ছে এখন।
ভাবনার ভেতর ডুবে থাকা আদিল হঠাৎই খেয়াল করলো,অপারেশন থিয়েটারের আলো নিভে গেছে।
সে তড়িঘড়ি সামনে তাকাতেই কয়েকজন ডাক্তার বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
আদিল কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
—”ডাক্তার, জুলির কী অবস্থা?”
ডাক্তার আদিলকে এতটা উদ্বিগ্ন দেখে ভেবেই নিলেন, সে হয়তো জুলির পরিবারের কেউ।
একটা আশ্বাসের হাসি দিয়ে বললেন,
—”ভয়ের কিছু নেই। ক্ষতটা খুব একটা গভীর না। তবে… খেয়াল রাখতে হবে, রোগী মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছে মনে হচ্ছে। ডিপ্রেশনের লক্ষণ স্পষ্ট।”
ডাক্তারের কথাগুলো এবার মন দিয়ে শুনলো আদিল।
তার ভেতরটা হু হু করে উঠলো,জুলিকে একবার চোখের দেখা দেখবে বলে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত।ডাক্তার তার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন,
—”আপনি চাইলে এখন পেশেন্টের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।”
এই কথাটারই তো অপেক্ষায় ছিল আদিল। অনুমতি পেয়ে সঙ্গেসঙ্গে সে কেবিনের দিকে ছুটে গেল।
কেবিনের দরজা খুলতেই চোখে পড়লো,নিস্তেজ জুলির নিথর দেহটা।
মেয়েটা কেমন নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে।
আদিল ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে জুলির পাশের চেয়ারে বসে পড়লো।তারপর আলতো করে জুলির আঙুলের ভাঁজে নিজের হাতটা রাখলো।শক্তপোক্ত স্পর্শ পেতেই জুলি ধীরে চোখ মেলল।
আদিলকে দেখে সে নিজের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল, আর মুখটা ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে।
আদিল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।
সে মৃদু কণ্ঠে বলল,
—”কী হয়েছে জুলি?”
জুলি তির্যক গলায়, রাগে-ক্ষোভে অভিমানে জবাব দিলো,
—”তুমি এখানে এসেছো কেন? আজ তো তোমার ফুলসজ্জা! যাও, তোমার নববধূর কাছে যাও। নিজের বিয়ে ফেলে একটা পরনারীর কাছে আসতে লজ্জা করলো না তোমার?”
আদিলের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে বুঝে গেছে,এই অভিমান, এই তীব্র রাগ—সবই ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
সে স্থির কণ্ঠে বললো,
—”ম্যাডাম কি আমার উপর অভিমান করেছেন?”
জুলি মুখ ফেরাল না।
আদিল বুঝলো, এবার তাকে একটু বাচ্চাদের মতো করে রাগ ভাঙাতে হবে।সে মজা করে বললো,
—”ম্যাডাম কী জানে, কেউ একজন তার জন্য এখনো বিয়ে না করেই এখানটায় বসে আছে?”
জুলি এবার ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো,
—”বিয়ে করোনি মানে?”
আদিল একটু খুশি হলো, মেয়েটা অবশেষে কথা বলছে!সে জুলির হাত ধরে ঠাট্টার সুরে বললো,
—”আপনার বন্ধু বিয়েটা আর করতে দিল কই!বিয়ে হওয়ার আগেই, সে তো আমার হবু বউকে নিয়ে ভেগে গেল!”
জুলি হতবাক হয়ে বলে উঠলো,
—”কী বলছো! এরিক ইনায়াকে নিয়ে ভেগেছে?”
আদিল এক ভুরু তুলে জুলির দিক তাকিয়ে হেসে বললো,
—”শুধু ভেগেছে বললে, কম বলা হবে ম্যাডাম, আপনার বন্ধু তো তার থেকেও দু ‘কদম এগিয়ে রয়েছে, ডাইরেক্ট বিয়ে করে ফেলেছে!”
আদিলের মুখে এরিকের এমন কীর্তির কথা শুনে বিষম খেয়ে যায় জুলি। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে আদিলের দিকে।
—”তুমি কী বলছো এসব! এরিক আর ইনায়া… তারা তো…”
আদিল এবার একটু নরম সুরে বললো,
—”আপনি জানেন না, আপনার বন্ধু কতটা উগ্র।আপনার কী মনে হয় জুলি, এরিক কোনদিনও এই বিয়ে হতে দিতো? দরকার পরলে, বিয়ের পিঁড়িতে আমাকে মেরে ইনায়াকে তুলে নিয়ে যেত! এই জন্য বলে আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।”
জুলির চোখে জল চলে এলো। সে ফিসফিস করে বললো,
—”সবাই নিজের ভালোবাসাকে জিতে নিচ্ছে, আর আমি…”
আদিল এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। তার কণ্ঠ গম্ভীর কিন্তু ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
—”আর আপনি আমাকে ঠেলে দিয়েছেন এক অন্ধকারে। অথচ একবারও জিজ্ঞেস করেন নি আমি কী চাই? শুধু পরিস্থিতির চাপ, লোকের কথা, সমাজের নিয়ম ধরে আপনি আমাকে ছেড়ে দিলেন জুলি।”
জুলি কেঁপে উঠলো। গলা ধরে আসে তার।
—”আমি ভয় পেয়েছিলাম আদিল… ভয় পেয়েছিলাম যদি আমি তোমার জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াই… যদি আমার কারণে তোমার পরিবারে সমস্যা হয়, সমাজে প্রশ্ন ওঠে…”
আদিল একটু এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখে।
—”আপনি কখনও বুঝতে চাননি জুলি, আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি। আমি তো শুধু আপনাকে চাইছিলাম। ”
“আমি যদি বিয়ে করতাম, সেটাও হতো আপনার জন্যই ভুল সিদ্ধান্ত। নিজেকে আমি কোনদিন ক্ষমা করতে পারতাম না।”
জুলি এবার এক ফোঁটা চোখের জল মুছে নিয়ে ধীরে ধীরে বললো,
—”তুমি জানো না আদিল, তোমার বিয়ের খবরে আমি কতটা ভেঙে পড়েছিলাম। নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম… তাই আজ এখানে…”
আদিল হঠাৎ চুপ করে যায়। তার চোখে জল টলমল করছে।
—”জুলি, আমি হারিয়ে যেতে দেইনি আমাদের ভালোবাসাটাকে।দেখুন, আমি আপনার সাথে আছি। কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবো না, আই প্রমিস!”
ডাক্তার বলছিলো, আপনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন। আমি জানি, সেই বিষণ্নতার কারণ আমি। কিন্তু এবার থেকে… আমি থাকতে চাই আপনার পাশে। শুধুই আপনার হয়ে।”
জুলি ধীরে ধীরে আদিলের হাত ধরে।
—”তুমি কি সত্যি এখনো আমায় ভালোবাসো?”
আদিল হেসে মাথা নাড়লো।
—”ভালোবাসা কি সময়ের গায়ে নির্ভর করে? এটা তো হৃদয়ের লিখন। আপনি যতবার ফিরবেন, আমি ততবারই অপেক্ষায় থাকবো। কিন্তু এবার আমি চাচ্ছি—আপনি থাকেন। চিরকাল,আমার পাশে।”
জুলির চোখ ভিজে যায় ভালোবাসায়। সে আদিলের দিকে তাকিয়ে বলে,
—”আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই আদিল… এখন শুধু তোমার কাছেই ফিরতে চাই।”
আদিল আলতো করে জুলির মাথায় হাত রাখে।
কেবিনের জানালা দিয়ে হালকা রোদ এসে পড়ে জুলির মুখে। যেন অন্ধকার কাটিয়ে আলো ফিরছে তাদের জীবনে।
আদিল হেসে বললো,
—”এইবার তাহলে আমি বলবো,ম্যাডাম অভিমান করে ভুল করেছেন।”
জুলি হেসে জবাব দিল,
—”এবার তাহলে আমরা নতুন করে শুরু করি;তুমি আর আমি মিলে, একসাথে।”
মিস্টার রিচার্ড উদভ্রান্তের মতো পুরো হলরুম জুড়ে পায়চারি করছেন। তাঁর মুখভঙ্গি দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে, রাগ তাঁর প্রতিটি শিরা-উপশিরায় ফুঁসে উঠছে। মিসেস অ্যানজেলা স্বামীর এই উত্তেজিত চেহারা দেখে ধীরে বলে উঠলেন,
— “দয়া করে একটু শান্ত হও রিচার্ড।”
তাঁর কণ্ঠে অনুরোধ থাকলেও মিস্টার রিচার্ড যেন আরও বিদ্ধ হয়ে উঠলেন তাতে। বিরক্তি ফুটে উঠলো তার চোখেমুখে।
— “নিজের ছেলের এতোবড় অপকর্ম দেখেও, তুমি আমাকে চুপ থাকতে বলছো, অ্যানজেলা?
তুমি জানো আজকের হট নিউজ কী? বিখ্যাত বিজনেস টাইকুন রিচার্ড অ্যাসফোর্ডের ছেলে এরিক অ্যাসফোর্ড একজন সাধারণ মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছে! আমার ছেলে হয়ে, মিডিলক্লাস পরিবারের এক সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করে বসেছে! লজ্জায় মাথা তুলতে পারছি না। মানুষজন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে,রীতিমতো !”
মিস্টার রিচার্ডের চিৎকার-চেঁচামেচিতে পুরো হলরুম থরথর করে কেঁপে উঠলো। ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠস্বর,
— “কি এমন হয়েছে যে আপনি এভাবে চেঁচামেচি করছেন?”
পরিচিত সেই পুরুষালি কণ্ঠ শুনে মিস্টার রিচার্ড ঘুরে দাঁড়ালেন। দাঁতে দাঁত চেপে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
— “কী করেছো তুমি জানো না, নিজের কুকৃর্তির কথা কী এখন আমার মুখ থেকে শুনতে চাইছো?”
এরিক তার বাবার কথার কোনো তোয়াক্কা না করে ধীরে লেদার জ্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেললো সোফার উপর। সামনে রাখা গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি পান করে গম্ভীর স্বরে বলল,
— “না, একদমই না মিস্টার রিচার্ড! আমি খুব ভালোভাবেই জানি আমি কি করেছি।
And trust me dad, এতে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই।
You know what? I live by my own rules, not yours. You call it madness, I call it freedom. And I don’t care what this world—or you—think about it.”
(আমি আমার নিজের নিয়মে চলি ড্যাড, আপনার নয়। আপনি যেটাকে পাগলামি ভাবেন, আমি সেটাকেই বলি স্বাধীনতা। এই দুনিয়া আর আপনি আমার সম্পর্কে কী ভাবলেন, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।)
এরিকের ঠান্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারিত হওয়া কথাগুলো , রিচার্ডের অন্তরে জ্বলতে থাকা আগুনে ঘী ঢেলে দিলো।
— “তুমি বারংবার আমার অবাধ্য হচ্ছো এরিক! কোথাকার এক কূলহীন, পরিচয়হীন, রাস্তার মেয়ের জন্য নিজের বাবার সঙ্গে এমন আচরণ করছো?”
এরিক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবার মুখ থেকে ইনায়া সম্পর্কিত এমন অবমাননাকর কথা শুনে তার চোখ দুটো রাগে আর ঘৃণায় জ্বলে উঠলো। মুখের পেশিগুলো কঠিন হয়ে গেল, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। সে গভীর শ্বাস নিয়ে , নিজেকে শান্ত রাখার শেষ চেষ্টা করলো কিন্তু তার সেই প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ হলো,সে নিচু স্বরে, কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃঢ়তারসহিত বলল,
Shut up, Mr. Richard! I don’t want to hear another disgusting word from your mouth! Who are you calling a street woman? I married her—she’s my wife. And I will not tolerate a single insult against her. I may be short-tempered, I may be reckless, but I’m not a coward. I know how to protect the one I love. If needed, I’ll burn this entire world to ashes, but as long as I’m alive, I won’t let anyone point a finger at my wife not even my own family!”
(“চুপ করুন,মিস্টার রিচার্ড ! আর একটাও বাজে শব্দ শুনতে চাই না আমি, আপনার মুখ থেকে ! রাস্তার মেয়ে আপনি কাকে বলছেন?বিয়ে করেছি তাকে, বউ লাগে আমার। তার নামে একটুকুও অপমান আমি সহ্য করব না।”
আমি রাগী হতে পারি, ছন্নছাড়া হতে পারি, কিন্তু কাপুরুষ নই।আমি যাকে ভালোবাসি, তাকে আগলে রাখতেও জানি।প্রয়োজন হলে এই জগৎটা আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবো,তবুও আমি বেঁচে থাকতে, কাউকে আমার বউয়ের দিকে আঙুল তুলতে দেব না,নিজের পরিবারকেও না!”)
এরিকের হুমকিস্বরূপ কথাগুলো বারংবার মিস্টার রিচার্ডের কানে বজ্রের মতো আঘাত হানছিল। তিনি কিছুতেই বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না,কোন অজানা, অখ্যাত এক মেয়ের জন্য তার নিজের ছেলে, তার সাথে এমন আচরণ করতে পারে! ইনায়ার প্রতি ক্ষোভ যেন ক্ষণে ক্ষণে দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল তার মনে। নির্মম, নিস্পৃহ দৃষ্টিতে এরিকের দিকে তাকিয়ে তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
—“একটা সামান্য মেয়ের জন্য তুমি নিজের বাবাকে হুমকি দিচ্ছো, এরিক?এতটা অধঃপতন হয়েছে তোমার।
তিনি নিজের ওয়াইফের দিকে ফিরে হাতের আঙুলের সাহায্যে এরিককে ইশারা করে বললেন,
দেখো অ্যানজেলা, একবার তাকিয়ে দেখো তোমার ছেলেটাকে! একটা সামান্য মেয়ের মোহে পড়ে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বসেছে। নিজের বাবার সঙ্গে তর্ক করছে, মুখের ওপর কথা বলছে!”
মিস্টার রিচার্ডের উচ্চারিত হওয়া প্রতিটি বাক্যে ইনায়ার প্রতি ছিল অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যে। যা বিষাক্ত সাপের ন্যায় বিঁধছিল এরিকের হৃদয়ে। ক্রমে তার মুখের রেখায় স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া। চোখদুটো জ্বলে উঠল আগুনের মতো, যেন আর এক মুহূর্তও এইসব সহ্য করা সম্ভব নয়।
হঠাৎই সে প্রচণ্ড এক ঘুষি মারল সামনে থাকা কাঁচের টেবিলটায়। বিকট শব্দে চিড় ধরল কাচে—এক মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল লাল রঙের র*ক্ত। এরিকের হাত বেয়ে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে যেন ব্যথা ভুলে গিয়েছে ক্রোধে।
উত্তপ্ত গলায় সে চিৎকার করে উঠল,
— “ও সামান্য মেয়ে নয়, মিস্টার রিচার্ড!”
মিসেস অ্যানজেলা দৌড়ে এসে ছেলের রক্তা*ক্ত হাতটা ধরে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
— “এরিক! এটা কী করলে! তোমার হাত…!”
মিসেস অ্যানজেলার কথায় এরিকের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না, সে শুধু ক্রধান্বিত হয়ে তাকিয়ে ছিল মিস্টার রিচার্ডের দিকে।অ্যানজেলা দ্বিতীয়বারের মতো স্বামীর উদ্দেশ্য বলে উঠলেন,
—কী শুরু করলে, তোমরা বাব-ছেলে মিলে?
“রিচার্ড, তুমি কি রাগে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছো?” অ্যানজেলা বিস্ময়ে বলে উঠলেন।
“তুমি জানো না, ছেলেটা সদ্য কোমা থেকে ফিরেছে!”
তিনি এরিকের রক্তা*ক্ত হাতটা টেনে ধরে বললেন,
—“এরিক, কী করছো? শান্ত হয়ে বসো, ব্যান্ডেজ করতে হবে।”
কিন্তু এরিক যেন কিছুই শুনল না। সে অ্যানজেলার হাত থেকে নিজের কাটা হাতটা ছাড়িয়ে নিলো, তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। উঠে যাওয়ার সময় নিচু, গম্ভীর কণ্ঠে শুধু বলল,
Make him understand, Mom—stay away from me and my love. If anyone blocks my way, I won’t keep quiet.”
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৪
(“নিজের হ্যাসবেন্ডকে একটু বোঝাও মম, আমার থেকে আর আমার ভালোবাসার থেকে দূরে থাকতে। আমার ভালোবাসার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে আমি কিন্তু চুপ করে থাকবো না।”)
এরিকের কথার তীব্রতা শুনে মিস্টার রিচার্ড তেলে -বেগুনে জ্বলে উঠলেন, তিনি এরিককে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—নিজের বাপকে, থ্রেট দিচ্ছো তুমি বেয়াদব, ছেলে!
পিছন থেকে অ্যানজেলা মিস্টার রিচার্ডকে থামিয়ে বলে উঠলো,
— শান্ত হও রিচার্ড। এরিকের এই রকম আচারণের পিছনে তুমি নিজেই দায়ী, ভুলে গেলে রিচার্ড! ”
