Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৯

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৯

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৯
রুপা

হঠাৎ নিশির এমন প্রশ্নে চমকে ওঠে পুষ্প, কিন্তু সে তা মুখে প্রকাশ করে না। এটা মূলত শেহনাজ সরকারের শিখিয়ে দেওয়া একটা বড় পাঠ—সামনে থেকে কেউ তোকে যতই শকিং নিউজ দিক বা চমকে যাওয়ার মতো কিছু বলুক না কেন, তুই ভেতরে চমকে গেলেও সেটা সামনের মানুষটার সামনে কোনোভাবেই প্রকাশ করবি না। পুষ্প অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “নিশি আপু, তুমি হঠাৎ এই প্রশ্ন করছ কেন?”
প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পেয়ে উল্টো পাল্টা প্রশ্ন শুনে বেজায় বিরক্ত হলো নিশি। সে কিছুটা চড়া গলায় বলল—
– “কেন বিয়ে করেছ আর্যকে? ছেড়ে দাও আর্যকে! এর বিনিময়ে তুমি যা চাইবে, তাই পাবে!”
নিশির এমন লোভনীয় আর অহংকারী কথা শুনে ভেতরে ভেতরে কিছুটা থমকাল পুষ্প, তবে বাহ্যিকভাবে তার মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের আভাস প্রকাশ পেল না। সে উল্টো ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে বলল—

– “সম্ভব নয় আপু, ওনাকে আমি ছাড়তে পারব না!”
– “কেন ছাড়তে পারবে না? আর্য তো এই বিয়ে মানে না! তোমাকেও সে বউ হিসেবে মানে না! তাহলে কোন অধিকারে…”
কথাগুলো শুনে পুষ্পর মনটা ক্ষুণ্ণ হলো কিছুটা, তবে নিজের ভেতরের সেই কষ্টটুকু আড়াল করে মুখের হাসি আরও চওড়া করে বলল—
– “উনি আমাকে বউ হিসেবে মানেন না, এটা তোমাকে কে বলেছে নিশি আপু?”
পুষ্পর এমন পাল্টা প্রশ্নে এবার বেশ ভালোভাবেই থতমত খেয়ে গেল নিশি। আসলেই তাকে সরাসরি কেউ বলেনি; সে শুধু সিমরান আর শিফাকে আড়ালে বলাবলি করতে শুনেছে যে আর্য এই বিয়েটা করতে চায়নি এবং সে পুষ্পকে বউ হিসেবে দুই চোখে সহ্য করতে পারে না। তবে নিজের এই থতমত ভাবটা কাটানোর চেষ্টা করে নিশি। সে এবার কুৎসিতভাবে হেসে বলল—
– “কে আবার বলবে? আর্য নিজেই বলেছে সে এই বিয়ে মানে না! তোমাকে সে মোটেও বউ হিসেবে দেখে না!”

পুষ্পর কাছে অবশ্য এই বিষয়টি নতুন নয়। আর্য তাকে বউ হিসেবে মানে না—সেটা বিয়ের পর থেকে আর্য নিজে মুখে হাজার বারের ওপরে বলেছে এবং বুঝিয়েছে। কিন্তু পুষ্প যতটুকু তার ‘সরকার সাহেব’কে চিনেছে, এই মানুষটা নিজের ব্যক্তিগত কথা অন্য কারো কাছে গিয়ে বলা মোটেও পছন্দ করেন না। তার ওপর নিশি আপু আসার পর থেকে সে লক্ষ্য করেছে, আর্য এই নিশি আপুকে একদমই সহ্য করতে পারে না। পুষ্প নিজের মনের ভেতরের ঝড় বাইরে প্রকাশ না করে অত্যন্ত শান্তভাবে হেসে উত্তর দিল—
– “নিশি আপু, অন্য কেউ এই কথা বললে আমি হয়তো বিশ্বাস করে নিতাম; কিন্তু উনি নিজে এই কথা তোমাকে বলেছে—এটা বিশ্বাস করা আমার পক্ষে একদম অসম্ভব!”
– “তুমি কি বলতে চাইছ আমি মিথ্যে বলছি?” নিশি চোখ রাঙিয়ে বলল।
– “তুমি মিথ্যে বলছ—এ কথা আমি একবারও বলিনি আপু। তবে তুমি যদি মিথ্যে না বলে থাকো, তাহলে নিশ্চয়ই সেটা সত্য প্রমাণ করতে চাইবে না।”

নিশি আর কিছু বলতে পারল না। সে ভেতরে ভেতরে রাগে একদম ফুঁসতে লাগল। এই একরত্তি একটা গেঁয়ো মেয়ে তার মুখের ওপর এত সুন্দর করে যুক্তি দিয়ে জবাব দিচ্ছে, তা সে ভাবতেও পারেনি! নিশি রাগে রি রি করে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই বাড়ির কাজের মেয়েটা বারান্দায় এসে পুষ্পকে বলল যে নিচে শেহনাজ সরকার তাকে ডাকছেন। পুষ্প কাজের মেয়েটিকে এক মিনিট অপেক্ষা করতে বলল। তারপর নিজের মাথার ভেজা তোয়ালেটা খুলে বিছানায় রেখে, আয়নার সামনে গিয়ে ওড়নাটা খুব সুন্দর করে মাথায় জড়িয়ে নিল। ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার আগে সে নিশির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
– “নিশি আপু, চলো নিচে যাই। সবাইকে খেতে ডাকছেন ফুফুমণি!”

নিশি চরম রাগে আর অপমানে পুষ্পর আগে আগে হনহন করে নিচে চলে গেল। সে আসলে ওপরে এসেছিল পুষ্পকে ভয় দেখিয়ে দুর্বল করতে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।
ওদিকে, কাজের মেয়েটি এতক্ষণ ধরে আড়ালে দাঁড়িয়ে পুষ্প আর নিশির মধ্যকার সব কথোপকথন মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল। সে নিচে নেমেই রান্নাঘরে শেহনাজ সরকারের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে সব কথা হুবহু বলে দিল। কাজের মেয়ের মুখে পুষ্পর এই সাহসী রূপের কথা শুনে শেহনাজ সরকারের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির ও গর্বের হাসি ফুটে উঠল। ওনার দেওয়া শিক্ষা তাহলে একদম বিফলে যায়নি! ওনার পুষ্প এখন অন্যায় আর অপমানের বিরুদ্ধে উচিত জবাব দিতে শিখছে; ঠিক যেভাবে উনি শেখাতে চেয়েছিলেন, পুষ্প ঠিক সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলছে। ওনাকে এভাবেই আস্তে আস্তে পুষ্পকে ভেতরের দিক থেকে শক্ত করে তৈরি করতে হবে, নিজের অধিকারের জন্য লড়তে শেখাতে হবে। দশজনের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে মেপে মেপে মন্দ কথার উচিত জবাব দেওয়ার মতো যোগ্য করেই পুষ্পকে তৈরি করতে হবে!

আর্য অফিস থেকে বেশ ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরল রাত সাড়ে দশটায়। তাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আজ শরীরের ওপর দিয়ে বেশ বড়সড় একটা ধকল গেছে। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে প্রতিদিনের মতো আড্ডা দিচ্ছে সবাই। আর্য সেদিকে তাকানোর কোনো প্রয়োজন মনে করল না; সে কেবল একপলক চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই মুখের দেখা না পেয়ে সে সোজা ওপরে চলে গেল।
রুমে এসে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল, কিন্তু রুমেও পুষ্পকে না দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। বারান্দায় গিয়ে দেখল সেখানেও নেই। আর্যর এবার রাগ যেন একদম চড়ে বসল। অফিসে এমনিতেই সকালে সময়মতো মিটিং না হওয়ায় ডিল ক্যানসেল হয়ে গেছে, যার ফলে কোম্পানির প্রায় নয় কোটি টাকার মতো বড় ক্ষতি হয়েছে। এমনিতেই মেজাজ চড়ে আছে চরম খিটখিটে হয়ে, তার ওপর এখন পুষ্পকে রুমে না দেখে অজানা কারণে রাগটা যেন তিরতির করে আরও বাড়তে লাগল। কেন এই রাগ বাড়ছে, আর্য নিজেও তা ঠিক বুঝতে পারছে না। সে চরম বিরক্তি নিয়ে আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ঘণ্টাখানেক পর মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল সে; পরনে তার কালো ওভারসাইজড টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার, ফর্সা গায়ের রঙে বেশ মানিয়েছে পোশাকটা।

এখনও পুষ্পকে রুমে না আসতে দেখে আর্যর মেজাজ আবারও খারাপ হতে থাকে। কিন্তু আর্য নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে ল্যাপটপটা নিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ল। যে নতুন প্রজেক্টটা সে রেডি করেছে, সেটাকে আরও একটু ইমপ্রুভমেন্ট করবে। আগামীকাল আরও একজন নতুন ক্লায়েন্ট আসবে এই প্রজেক্টটা দেখার জন্য। অলরেডি ইমেইল পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সবকিছু দেখে ওনাদের বেশ পছন্দও হয়েছে; আগামীকাল সব কিছু সামনাসামনি দেখে ফাইনাল করে ডিল সাইন করবেন।
আর্যর কাজ শেষ হতে হতে রাত বারোটা বেজে যায়। এর মধ্যে কাজের মেয়ে এসে আর্যকে রাতে খাবার খেতে ডেকে গেছে, কিন্তু আর্য হাতের কাজ ফেলে রেখে খেতে যায়নি। কাজ শেষ করে আর্য ল্যাপটপটা একপাশে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে গেল। নিচে এখন কেউ নেই, পুরো ড্রয়িং রুম একদম ফাঁকা। সেটা দেখে আর্যর ভ্রু কুঁচকে যায়—মেয়েটা গেল কোথায়? রাতে খাবার খেয়ে সবাই যে যার রুমে ঘুমাতে চলে গেছে, তাহলে মেয়েটা কোথায়? ডাইনিং টেবিলে আর্যর খাবার বেড়ে ঢেকে রেখে দিয়েছেন শেহনাজ সরকার। আমজাদ সরকারের হঠাৎ মাথা ব্যথা শুরু হওয়ায় তিনি আগেই রুমে চলে গেছেন। আর্য টেবিলে রাখা খাবারের দিকে তাকাল ঠিকই, কিন্তু ওটা ছুঁয়েও দেখল না।

আর্যর অবচেতন মনটা যেন পড়ে আছে সেই পুষ্পর কাছে। মেয়েটা কোথায়? রুমে যায়নি কেন? আর্য আবারও রুমে ফিরে গেল এবং এদিক-ওদিক অনবরত পায়চারি করতে লাগল। সে এবার বিরক্ত হয়ে খাটে শুয়ে পড়ল, কিন্তু আর্যর মন কিছুতেই স্থির হলো না; ঘুম যেন আজ তার সাথে পুরোপুরি বেইমানি করছে। আর্যর চোখ বারবার গিয়ে স্থির হচ্ছে ঘরের সেই খালি সোফাটায়—মেয়েটা কোথায়? আসছে না কেন রুমে? সে কি এখন খুঁজতে বের হবে যে ও কোথায় বা কার রুমে আছে? কে জানে! আর্যর এভাবে বিছানায় ছটফট করতে করতে ঘড়ির কাঁটা গিয়ে পৌঁছাল রাত একটার দ্বারে।
আর্য এবার নিজের ওপর বেজায় ক্ষিপ্ত হলো। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠল—
– “ইউ স্টুপিড! কাছে থেকেও জ্বালিয়ে মারো, এখন দূরে গিয়েও জ্বালাচ্ছো! একবার সামনে পাই… চাপড়ে সোজা করে ফেলব!”
নিজের মনে এভাবে গজগজ করতে করতে এবার একটা বালিশ টেনে নিয়ে নিজের মুখের ওপর চেপে ধরে ঘুমানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল। এভাবেই বিছানায় ছটফট করতে করতে একসময় ক্লান্তিতে আর্য ঘুমিয়ে পড়ে।

অন্যদিকে পুষ্প পিরিয়ডের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সন্ধ্যায় সে বুঝতে পারে তার মান্থলি প্রবলেম শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু সবার বেলায় মান্থলি রেগুলার হলেও পুষ্পর বেলায় বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা তার জীবনের মাত্র ফোর্থ পিরিয়ড। তার পিরিয়ড হয় একদম ইরেগুলার; ফার্স্ট পিরিয়ড হওয়ার দীর্ঘ সাত মাস পর দ্বিতীয় পিরিয়ড হয়েছিল, তারপর আবার চার মাস, ছয় মাস পরে হয়। আর এখন আবার হয়েছে পুরো পাঁচ মাস পরে, যার কারণে তার পিরিয়ডের ব্যথার তীব্রতাও অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে বড্ড বেশি হয়।
কাউকে এই কষ্টের কথা বলারও সুযোগ পায়নি সে, তার ওপর তো মনের ভেতর আছে তীব্র লজ্জা আর সংকোচ। এই অবস্থায় সে আর্যর সামনে যাবেই বা কী করে? যদি আর্য কোনো সমস্যা হয় এই ভয়ে। তাই সে সেই সন্ধ্যাবেলা থেকেই সিমরানের রুমে আশ্রয় নিয়েছে। সিমরান বিষয়টা জানতে পেরে প্রয়োজনীয় সবকিছু এনে দিয়ে তাকে রেস্ট নিতে বলে; এমনকি রাতের খাবারটাও সিমরানের রুমেই খেয়েছে পুষ্প। কিন্তু এখন রাত যত বাড়ছে, পুষ্পর পেটের ব্যথা যেন তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হচ্ছে। অবশ্য পুষ্পর প্রতি পিরিয়ডেই এরকম অসহ্য ব্যথা হয়, যা সে সবসময় নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে গুমরে গুমরে সহ্য করেছে। এই কঠিন ব্যথার সময়ও তার চাচি তাকে কোনোদিন একটা ব্যথার ওষুধ এনে দেয়নি; উল্টো এই পিরিয়ডের তীব্র ব্যথা নিয়েই তাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করাত।

পুষ্প এবার তীব্র ব্যথায় অবশ হয়ে গোঙাতে লাগল। সে কোনোমতে বিছানা থেকে উঠে সিমরানের রুম থেকে বের হয়ে এল। তার এখন ভীষণ কান্না পাচ্ছে। মেয়েদের এই কঠিন সময়টাতে নাকি তারা সবসময় তাদের মাকে পাশে পায়—স্কুলে থাকতে বান্ধবীরা বলত; কিন্তু তার বেলায় আল্লাহ যেন বড্ড বেশি নিষ্ঠুর! তার চোখ দিয়ে অনবরত নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। পুষ্প আস্তে আস্তে গুটিগুটি পায়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল; উদ্দেশ্য নিচের রান্নাঘরের দিকে যাওয়া। তাকে স্কুলের একটা বান্ধবী বলেছিল, এই সময়ে পেটে গরম পানির সেঁক দিলে নাকি ব্যথা কিছুটা কমে। মেয়েদের এসব নিয়ম তো তাদের মা শিখিয়ে দেয়, অথচ তাকে এই বিষয়ে ভালো করে বলে দেওয়ার মতো আজ দুনিয়ায় কেউ নেই! নিজে থেকে যে কারও কাছ থেকে জেনে নেবে, লজ্জাবতী পুষ্পর পক্ষে তাও সম্ভব নয়; যদিও এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক নিয়ম।
পুষ্প নিজের এই চরম কষ্টের মুহূর্তে নিজের গর্ভধারিণী মায়ের অভাব আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এভাবে কাঁদতে কাঁদতে পুষ্প আনমনে হাঁটতে গিয়ে করিডোরের আবছা অন্ধকারে হঠাৎ শক্ত মতন কারো সাথে ধাক্কা খেল!

বিছানায় ছটফট করতে করতে একসময় আর্য ঘুমিয়ে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ করেই আবারও তার ঘুমটা ভেঙে যায়। চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরে এক তীব্র অস্থিরতা, মনের কোণে উঁকি দেয় চরম অশান্তি। আবারও চোখ যায় ঘরের সেই খালি সোফাটার দিকে—মেয়েটা এখনও রুমে আসেনি কেন? আর্যর নিজের ভেতরে কেমন যেন একটা মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে, যার কোনো আগা-মাথা সে নিজেই বুঝতে পারছে না। একদিকে মেয়েটার ওপর তীব্র রাগ উঠছে, আবার অন্যদিকে নিজের ওপরও রাগ হচ্ছে—কেন সে একটা সামান্য মেয়ের জন্য এতটা অস্থির হচ্ছে? তবুও সেই রাগের মেঘ ফুঁড়ে ‘মেয়েটা কোথায় আছে, কেন আসছে না’—এই ভাবনাটাই বারবার মনের ভেতর উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। এত এত মিশ্র অনুভূতি নিয়ে খাটের ওপর আর শুয়ে থাকতে পারল না আর্য। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত এখন দুটো বাজে। আর্য খাট থেকে নেমে আবারও রুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে গেল।

মেয়েটা এই গভীর রাতে কোথায় থাকতে পারে—এসব ভাবতে ভাবতে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ করেই কারো সাথে শক্ত একটা ধাক্কা লাগে তার। আর্য চোখ নামিয়ে সামনে দেখতে পায় পুষ্পকে। মেয়েটা আকারে বেশ ছোটখাটো, আর্যর ঠিক বুক বরাবর তার মাথা। নিচু হয়ে থাকায় তার মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, তবে এই আবছা অন্ধকারেও আর্যর নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না।
পুষ্প দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। সে চোখ তুলে তাকাতেই সামনে আর্যকে দেখতে পেল, যে তার দিকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আর্যর সেই চাহনি সহ্য করতে না পেরে পুষ্প তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে নিল। আর্য তাকে এত রাতে বাইরে দেখে ধমকে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল পুষ্পর মুখের ওপর। মেয়েটার মুখ দেখে স্পষ্ট মনে হচ্ছে সে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে; পুরো ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে, চোখের পাপড়িগুলো এখনও নোনা জলে ভেজা এবং একটার সাথে আরেকটা লেপ্টে আছে। মায়াবী চোখ দুটোতে এখনও জল টলমল করছে। ওদিকে পুষ্পর পেটের ভেতরের মোচড় দিয়ে ওঠা ব্যথাটা আরও তীব্র হচ্ছে, যার কারণে পুষ্পর মুখে ব্যথার একটা নীল চাপ ফুটে ওঠে। তবে আর্য সামনে থাকায় সে মুখ ফুটে কোনো শব্দ করে না, দাঁতে দাঁত চেপে কষ্টটা সহ্য করার চেষ্টা করে।

এদিকে পুষ্প কাঁদছে—বিষয়টি বুঝতে পেরেই আর্যর মনের ভেতরের রাগের বদলে সেখানে হানা দেয় এক তীব্র অশান্তি আর অস্থিরতা। কী হয়েছে? মেয়েটা এভাবে কাঁদছে কেন? আবার কি ওই মহিলা (মিনারা বেগম) কোনো কিছু বলেছে? নাকি নিশি কোনো আজেবাজে কথা শুনিয়েছে? আর্য আর নিজেকে সামলাতে পারল না; সে দুহাতে পুষ্পর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে অত্যন্ত অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
– “কী হয়েছে, কাঁদছিলে কেন? কেউ কিছু বলেছে? ওই মহিলা আবার তোমার বাবা-মা নিয়ে কোনো কথা শুনিয়েছেন? নাকি নিশি কিছু বলেছে?”
পুষ্প কী বলবে তা ভেবে পাচ্ছে না। মনের ভেতর তীব্র লজ্জা আর সংকোচ এসে দলা পাকাচ্ছে। পিরিয়ডের মতো একটা ব্যক্তিগত কষ্টের কথা সে এই গম্ভীর মানুষটাকে মুখে বলবে কী করে? এদিকে পুষ্পকে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে আর্যর ভেতরের অস্থিরতা আরও বহুগুণ বেড়ে গেল—
– “কী হয়েছে, বলছ না কেন? কেউ বকেছে তোমাকে? আমাকে বলো, আমি তাকে পানিশমেন্ট দেব! কেন কাঁদছ তুমি?”

পুষ্প কেবল চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার পেটের ভেতরের ব্যথাটা ক্রমান্বয়ে এত বাড়ছে যে তা এখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। এদিকে আর্যর যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে; মেয়েটা কেন কাঁদছে, এতক্ষণ কোথায় ছিল, আর এত রাতে ঘরের বাইরেই বা কী করছে? আর্য এবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কিছুটা ধমকের সুরে বলে উঠল—
– “স্টুপিড! বলছ না কেন কী হয়েছে? কেন কাঁদছ?”

পুষ্পর এমনিতেই পেটের তীব্র ব্যথায় শরীর অবশ হয়ে আসছে, তার ওপর আবার যুক্ত হয়েছে পিরিয়ডের হরমোনাল মুড সুইং। সেখানে আর্যর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ধমক খেয়ে সে আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না; ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। পুষ্পর সেই কান্নার আওয়াজটা কানে আসতেই আর্যর হৃদপিণ্ডে যেন কেউ ধারালো নখ দিয়ে সজোরে খামচে ধরল! তার বুকের ভেতর যেন অশান্তির এক দাহ্য আগুন জ্বলে উঠল। হঠাৎ করেই আর্য আর কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে, কিছু না ভেবেই পুষ্পকে টেনে নিল নিজের চওড়া বক্ষস্থলে! একহাতে শক্ত করে পুষ্পর কোমর জড়িয়ে ধরে অন্য হাতটা তার মাথায় আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগল। যে করেই হোক, এই মেয়েটার কান্না তাকে থামাতে হবে। কেন তার সাথে এমন হচ্ছে সে জানে না, তবে এই মেয়েটার চোখের পানি সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না; পুষ্পর চোখের এক-একটি ফোঁটা যেন ধারালো তীরের মতো এসে বিঁধছে তার নিজের বুকে! আর্য পরম মমতায় পুষ্পর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজের কণ্ঠস্বর একদম নরম করে বলল—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৮

– “হুঁশশশ… কাঁদে না! কী হয়েছে বলো, আমি সব ঠিক করে দেব। কেউ বকেছে তোমাকে? আমাকে বলো, আমি তাকে পানিশ করব তো! তুমি না বললে আমি বুঝব কী করে কেন কাঁদছ?”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here