অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৫
রুপা
রাত বাজে এগারোটা। সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ড্রয়িং রুমের সোফায় গল্প করছেন। সেখানে উপস্থিত নেই শেহনাজ সরকার। তিনি এখন প্লেটে খাবার বাড়ছেন পুষ্পর জন্য। তিনি খাবারের ট্রে টেবিলে রেখে কিচেনে গিয়ে বাকি খাবার ফ্রিজে রেখে দিতে লাগলেন। এর মধ্যেই সেখানে এসে হাজির হয় আর্য। মাকে খাবার ফ্রিজে রাখতে দেখে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল, কারণ সে জানে তার মা পুষ্পকে না খাইয়ে খাবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখবেন না। আর্য টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে দেখে আর কিছু না বলে খাবারের ট্রে নিয়ে ওপরে চলে যায়!
এদিকে ড্রয়িং রুমে বসা সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আর্যর যাওয়ার দিকে। সবার চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে! আর্য খাবার নিয়ে ওপরে যাচ্ছে—কারো বুঝতে অসুবিধা হলো না খাবারগুলো পুষ্পর জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কারণ আর্য খাবার টেবিলে ছিল, শুধু পুষ্পই ছিল না। আহনাফ অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলে উঠল—
– “আল্লাহ! আমি কি এখন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি? খোদা, এ তুমি কী দেখালে? এ তোমার কেমন লীলা? দ্য গ্রেট ঘাড়ত্যাড়া বউ না মানা আব্রাহাম আর্য সরকার বউয়ের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে রুমে! এই কেউ আমাকে একটু চিমটি কাটো; আমি সত্যি দেখছি নাকি স্বপ্ন দেখছি বুঝতে পারছি না!”
আহনাফের কথা শুনে পাশে বসা শিফা সত্যি সত্যি আহনাফের কাঁধে চিমটি কাটে। সাথে সাথে আহনাফ চিৎকার করে উঠল—
– “আরে! কোন জংলি বিল্লি এত জোরে চিমটি কাটে?”
শিফা দায়সারাভাবে বলল—
– “আহনাফ ভাই, আমি কেটেছি। ভাবলাম চিমটি যখন কাটছি, একটু জোরে কাটি যাতে তোমার স্বপ্ন সত্যি সত্যি ভেঙে যায়। কারণ তোমার ঘুম তো সহজে ভাঙে না, কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থাকো।”
– “একদম আমার ঘুম নিয়ে বাজে কথা বলবি না, জংলি কোথাকার! লাইফে কোনো প্যারা নাই, জাস্ট ছিল তাই ঘুমটা একটু বেশি ভালো হয় আমার। যা আবার কারোর ভাগ্যেও জোটে না—শান্তির ঘুম!”
– “শান্তির ঘুম না! ফাও এক নম্বরের অলস কামচোর! কোনো কাজ-কর্ম নাই, বেলা অবধি ঘুমিয়ে থাকো!”
– “এই শিফার বাচ্চা, একদম আমার কাজে যাবি না!”
– “কী হচ্ছেটা কী?” আমজাদ সরকারের ধমকে দুজন চুপ হয়ে গেল একদম ভালো বাচ্চার মতো। এদিকে রেশমা মেয়ের দিকে চোখ পাকিয়ে কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। রেশমা চোখ নামিয়ে নিল। এদিকে নিশি আর্যর পরিবর্তন দেখে মনে মনে এক কুটিল বুদ্ধি করতে শুরু করে দিল।
এদিকে শেহনাজ সরকার এসে টেবিলে খাবারের ট্রে না দেখে তিনি অবাক হলেন। খাবারের ট্রে কোথায়? তিনি কাজের মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন আর্য নিয়ে গেছে। কথাটা শুনে মনে মনে বেশ প্রসন্ন হলেন তিনি। যাক, আর্য মেয়েটার খেয়াল রাখতে শুরু করেছে! তিনি এবার সবার সাথে ড্রয়িং রুমে বসলেন। কিন্তু শেহনাজ সরকার আসতেই মিনারা বেগম উঠে চলে গেলেন, নিশিও চলে যায়। শেহনাজ সরকার বিষয়টি দেখেও না দেখার মতো করে থাকলেন, সবার গল্প শুনতে লাগলেন আর মাঝে মাঝে ‘হু-হা’ উত্তর দিতে লাগলেন।
দরজার মৃদু আওয়াজ শুনে পুষ্প চোখ তুলে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, আর্য খাবারের প্লেট নিয়ে রুমে প্রবেশ করেছে। আর্য পা দিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে খাটের ওপর খাবারের ট্রে-টা রেখে পুষ্পর দিকে তাকায়। কাঁদতে কাঁদতে মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। নাকের ডগা একটু বেশি লাল হয়ে গেছে, চোখের কোণে এখনো কিছুটা ভিজে, পাপড়িগুলো লেপ্টে আছে—অদ্ভুত সৌন্দর্য ভিড় করেছে রমণীর মুখজুড়ে। আর্য নিজেকেই বুঝতে পারছে না, একটা মেয়েকে তার কাছে এত বেশি সুন্দর কবে থেকে লাগতে শুরু করল?
কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে না তাকানো আর্যর মনে হচ্ছে, তার না দেখা সৌন্দর্য সব এই মেয়ের মাঝেই আছে। খাবারের ট্রে সামনে রেখে আর্যকে চুপ করে থাকতে দেখে পুষ্প চোখ তুলে তাকায়। সাথে সাথে চোখাচোখি হয় দুজনের; আর্য অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে। পুষ্প বেশিক্ষণ তাকাতে পারল না সেই দৃষ্টিতে, তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে নিল। আর্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে—পুষ্পর তড়িঘড়ি করে চোখ নামাতে দেখে—তবে সেই হাসি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা মুশকিল। আর্য এবার পুষ্পকে বলল—
– “তোমার শরীর এমনিতেই উইক তাহলে ডিনার করোনি কেন?”
পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারল না। তার তো মন খারাপ ছিল, কিছুই ভালো লাগছিল না। পেটে যেন খিদেই পায়নি; শুধু আর্যর রাতের সেই হিংস্র আচরণের কথা মনে পড়ছিল আর কষ্ট হচ্ছিল, কান্না পাচ্ছিল, তাই তো খেতে যায়নি। কিন্তু অদ্ভুত হলেও এখন আর তার আগের মতো কষ্ট হচ্ছে না, মন খারাপ লাগছে না। এটা কেন হলো বুঝতে পারছে না পুষ্প—লোকটা, মানে আর্য যখন পুষ্পর আশেপাশে থাকে, তখন তার মন খারাপও গায়েব হয়ে যায় কীভাবে? পুষ্পর ভাবনার মাঝেই আর্য বলে উঠল—
– “কী হলো? বলছ না কেন?”
– “তখন খিদে পায়নি, তাই।”
– “এখন খিদে পেয়েছে?”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প চোখ তুলে তাকায়। দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল—
– “না।”
– “খিদে না পেলেও খেতে হবে। তোমার শরীর উইক, তাই বেশি বেশি খাবার প্রয়োজন তোমার শরীরের!”
পুষ্প কিছু বলে না। আর্য ট্রে থেকে ভাতের প্লেট নিয়ে, সেখানে বাটি থেকে ডাল, ইলিশ মাছ ভাজি আর চিকেনের তরকারি দিয়ে প্লেটটা পুষ্পর সামনে দিয়ে খেয়ে নিতে বলে। পুষ্পর সত্যি খিদে নেই, কিন্তু আর্যকে না করার মতো সাহস নেই তার। সে অগত্যা উঠে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এল। চিকেন দিয়ে ভাত মাখিয়ে খেতে লাগল। আর্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পুষ্পর খাওয়ার দিকে। একটা মেয়েকে খাওয়ার সময়ও এমন কিউট লাগতে পারে, সেটা আর্য মনে হয় আজই দেখল। প্রতিদিন টেবিলে খাওয়ার সময় আর্য পুষ্পর দিকে সেভাবে তাকাত না, নিজের মতো খেয়ে চলে আসত; আজ মনে হচ্ছে ভালো করে তাকানো উচিত ছিল। ভাত মুখে নিলে মুখ ফুলে উঠছে খরগোশের মতো, চিবোচ্ছে! আর্য হঠাৎ মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—
– “মাই কিউট র্যাবিট!”
আর্য খেয়াল করে, পুষ্প ইলিশ মাছ ভাজা ছুঁয়েও দেখেনি। সেটা দেখে আর্য ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
– “ইলিশ মাছ খাচ্ছ না কেন? ইলিশ মাছ খাও না তুমি?”
পুষ্প কী বলবে ভেবে পেল না। সে ইলিশ মাছ খায়, তবে কাঁটা বেছে খেতে পারে না। চাচা-চাচীর ঘরে কোনোদিন মাছ দিয়ে ভাত খেতে পারেনি। তাকে ভাত দিত চাচাতো বোনের এটো ভাত, নাহলে শুধু ঝোলের তরকারি—অনেক সময় সেটাও জুটত না, শুধু কাঁচা মরিচ-পেঁয়াজ দিয়ে ভাত খেয়েছে খিদের চোটে। তাই সে কোনোদিন মাছের কাঁটা বেছে খেতে শেখেনি। সরকার বাড়িতে আসার পর মাছ খেলে সেটা শেহনাজ সরকার বেছে খাওয়ায়, কিন্তু এখন সে খাবে কীভাবে? পুষ্প চোখ তুলে দেখল আর্য তার দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। পুষ্প মিনমিন করে বলল—
– “আমি কাঁটা বেছে মাছ খেতে পারি না!”
আর্য শুনে অবাক হয়—এই মেয়ে কাঁটা বেছে খেতে পারে না? এমনিতেই মেয়েটা ছোট, কিন্তু মাছ বেছে খাওয়ার মতো তো বড় হয়েছে! সে এবার প্রশ্ন করল—
– “তো তুমি মাছ কীভাবে খাও?”
– “ফুফুমণি কাঁটা বেছে দেয়।”
আর্য অবাক না হয়ে পারে না। তার মা এই মেয়েকে এত বেশি আদর করে কেন? তাকে পাঁচ বছর হওয়ার আগে থেকে নিজের হাতে খাওয়া শিখিয়েছেন, আস্তে আস্তে নিজের কাজ নিজেকে করতে শিখিয়েছেন। মা সবসময় বলতেন, একজন আদর্শ মানুষ সবসময় নিজের কাজ নিজে করে, অন্যের ওপর ডিপেন্ড করে না। আর্যও বাধ্য ছেলের মতো সব শিখে নিয়েছে; এতে অবশ্য তার ভালোই হয়েছে—প্যারিসে গিয়ে অন্যের ওপর ডিফেন্ড করতে হয়নি, নিজে নিজে সব করতে পেরেছে। আর্য বুঝতে পারে না, সবসময় নীতি শেখানো তার মা, এই মেয়েকে শেখানোর বদলে উল্টো নিজে সব করে দিয়ে এত প্যাম্পার কেন করেন? আর্যর ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল পুষ্পর কথায়—
– “আর খাবো না!”
কথাটা বলে ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকাল সে। আর্যকে কিছু বলতে ভয় করে, একটু কিছু হলেই যদি ধমক দেয়, আবারো চোয়াল চেপে ধরে যদি আবার রেগে যায়! তাই সে আর্যকে মনে হয় সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।
তবে পুষ্পকে অবাক করে দিয়ে আর্য কিছু না বলে ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে আসে। পুষ্পকেও হাত ধুয়ে আসতে বলে; পুষ্প বাধ্য মেয়ের মতো হাত ধুয়ে আসে। আর্য নিজে ইলিশ মাছের কাঁটা বেছে এক লোকমা ভাত মাখিয়ে পুষ্পর মুখের সামনে ধরে। পুষ্প অবাক হয়—যে লোক তার ছোঁয়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না, সেই লোক তাকে কাঁটা বেছে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে! ব্যাপারটা পুষ্পর হজম হচ্ছে না। কিন্তু তার সত্যি খেতে ইচ্ছে করছে না, সে মিনমিন করে বলল—
– “আমার পেট ভরে গেছে, আর খেতে পারব না!”
– “তোমার ওটা মানুষের পেট নাকি চড়ুই পাখির পেট? প্লেটে যে ভাত এনেছি, সব তো থেকে গেছে!”
পুষ্প চুপ করে রইল, সত্যি তার পেট ভরে গেছে। আর্য কণ্ঠ কিছুটা গম্ভীর করে বলল—
– “চুপচাপ মুখ খোল।”
পুষ্প অগত্যা মুখ হা করে। আর্য এক লোকমা মুখে দেওয়ার সময় পুষ্পর ঠোঁট আর্যর হাতে স্পর্শ করে। এতে আর্যর এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়—যেন কারেন্টের শক খাওয়ার মতো! কেন হচ্ছে? আর্য নিজেকে সামলে নিয়ে মাছের কাঁটা বেছে পুষ্পকে ভাত খাইয়ে দিতে লাগল। পুষ্প তিন লোকমা খেয়ে এবার সত্যি আর খেতে পারছে না। আর্য পুষ্পর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, সে আসলেই আর খেতে পারছে না; কী অসহায় মুখ করে আছে! আর্য আর জোর করল না। প্লেটে বেশির ভাগ ভাত থেকে গেছে; আর্য কিছু না ভেবে নিজেই তা খেয়ে নিল। সারাদিন তার পেটে কিছু পড়েনি। এদিকে পুষ্প যেন আজকে একের পর এক চমক পাচ্ছে—আর্যকে নিজের এঁটো ভাত খেতে দেখে সে অবাক না হয়ে পারছে না।
যে লোক নিজের পাতে অন্য কারোর হাত দেওয়া খাবার খায় না, সে লোক তার এঁটো ভাত খাচ্ছে! এই তো একদিন আগে খাবার টেবিলে আর্যর প্লেটে নিশি একটা চিংড়ি মাছ তুলে দিয়েছিল; ব্যাস, সে কারণে প্লেটটা কাজের মেয়েকে দিয়ে বলেছিল গেটের বাইরে থাকা কুকুরদের খাইয়ে দিতে, নিজে আরেকটা প্লেট নিয়ে খেয়েছিল। সেদিন নিশির মুখ অপমানে, রাগে, হিংসায় জ্বলে উঠেছিল। কে জানে, আর্যর করা সেই অপমান, পুষ্পর প্রতি হিংসা, আর আর্যকে নিজের করে পাওয়ার জুনুন পুষ্প আর আর্যর জীবনে কী বিপদ বয়ে আনে!
আর্য খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে এসে প্লেট নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় নিচে রেখে আসার জন্য। এদিকে আর্য চলে যাওয়ার সাথে সাথে পুষ্প খাট থেকে উঠে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘণ্টাখানেক পর আর্য এসে দেখে পুষ্প ঘুমিয়ে পড়েছে। আর্য কিছু না ভেবে খাটে শুয়ে পড়ে, কিন্তু চোখে ঘুম ধরা দেয় না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে আরও ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে যায়, তবুও আর্যর চোখে ঘুম নেই। সে এবার উঠে সোফায় ঘুমিয়ে থাকা পুষ্পর কাছে যায়। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে পুষ্প; কী নিষ্পাপ, গোলগাল, মায়াবী অদ্ভুত সুন্দর মুখটা! আর্য কিছু একটা ভেবে পুষ্পকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। পুষ্প ঘুমের মধ্যেই আর্যর গলা জড়িয়ে ধরে; এতে আর্যর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। পুষ্পকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কম্বলটা জড়িয়ে দিল। নিজেও পাশে শুয়ে পড়ে পুষ্পর দিকে মুখ করে। পুষ্পর মুখের দিকে তাকিয়ে আর্য নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল—
– “মাই লিটেল ফ্লাওয়ার, অনলি মাই ফ্লাওয়ার। ফ্লাওয়ারের আশেপাশে প্রজাপতি, ভ্রমর ঘুরে বেড়ায়—বাট আমার ফ্লাওয়ারের আশেপাশে কোনো প্রজাপতি, ভ্রমর আসবে না। আমি আসতে দেব না। যে আসবে, তার জীবনের আয়ু ফুরিয়ে আসবে; এই আর্য ফুরাবে!”
সকালে উঠে নিজেকে খাটে আবিষ্কার করে চমকে ওঠে পুষ্প। তাড়াহুড়ো করে খাট থেকে নেমে যায় সে। তার মনে পড়ে যায়, একদিন আর্যর মাথাব্যথা করায় তাকে মাথায় তেল মালিশ দিতে গিয়ে সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছিল; তখন আর্য ঘুম থেকে উঠে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। কথাগুলো মনে পড়তেই পুষ্প রুমের চারপাশে তাকিয়ে দেখে আর্য কোথাও নেই। কিন্তু সে এত দেরি পর্যন্ত উঠল কী করে? সে তো ফজরের আজানের সাথে সাথেই উঠে যায়! দেয়ালঘড়িতে তাকিয়ে দেখল সকাল সাড়ে সাতটা বাজে।
সে আর কিছু না ভেবে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কলেজের ড্রেস, ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সব কিছু সিমরানের রুমে নিয়ে গিয়েছিল পুষ্প, তাই সে সেদিকেই গেল। পুষ্প চলে যাওয়ার পর আর্য রুমে আসে। পুষ্পকে না দেখে আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে—এই মেয়ে আবার পালিয়েছে! কিন্তু আর্য পালাতে দিলে তো! সে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে এবং অফিসের জন্য রেডি হয়ে নিল। অ্যাশ কালারের চেক চেক প্যান্ট, সাদা শার্ট, আর তার সাথে প্যান্টের মতো অ্যাশ কালারের চেক চেক স্যুট। পুরো রেডি হয়ে পারফিউম স্প্রে করে লোফার জুতো পরে নিল। রুম থেকে বেরোতে বেরোতে ভাবতে লাগল, ওই মেয়ে আজও কলেজের জন্য তার রুমে রেডি হয়নি। কোথায় গেল? কলেজের একটা জিনিসও তো তার রুমে নেই!
আর্য করিডোরে হেঁটে সিঁড়ির কাছে দাঁড়াতেই দেখল, পুষ্প কলেজের জন্য রেডি হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে আসছে। সিঁড়ির সামনে আর্যকে দেখে আবারো জড়োসড়ো হয়ে গেল সে, মুখে ফুটে উঠল ভীতি। পুষ্প জানে না সে বিছানায় কীভাবে এসেছে; এখন যদি বিছানায় শোয়ার কারণে আর্য রেগে যায়! এদিকে পুষ্পকে তাকে দেখে ভয় পেতে দেখে আর্য নিজেই এগিয়ে গেল পুষ্পর দিকে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “কলেজ থেকে এসে তোমার সব জিনিস আমার রুমে শিফট করবে।”
পুষ্প কিছু না বলে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে নিচে নেমে যেতে চাইলে আর্য আবারো বলল—
– “আমার কথা শেষ হয়নি, কোথাও যাবে না!”
পুষ্প দাঁড়িয়ে পড়ল। আর্য আবারো বলল—
– “এখন নাস্তা করে চুপচাপ আমার গাড়িতে গিয়ে বসবে। আম্মুকে বলবে তুমি আমার সাথে যাবে। গট ইট?”
পুষ্প আবারও মাথা নেড়ে সায় জানায়। আর্য এবার গম্ভীর গলায় বলল—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৪
– “স্টুপিড গার্ল, মুখ দিয়ে বলো।”
– “ফুফুমণিকে বলবো, আমি আপনার সাথে যাব!”
আর্য সন্তুষ্ট হয়ে নিচে নামতে বলল। পুষ্প নিচে নামল, আর্য তার পেছন পেছন নামল। এতক্ষণ সবকিছু দূর থেকে দেখেছে নিশি। সে শয়তানি ও কুটিল হেসে মনে মনে বলল—
– “আর্য, ওই মেয়ের সাথে যত কিছু করার করে নাও এখন। আজকের পর থেকে ওই মেয়েকে তুমি দুই চোখে সহ্য করতে পারবে না।”
