Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩২

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩২

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩২
রুপা

শেহনাজ সরকার জুনিয়রের কাছ থেকে ফাইল নিয়ে এসে দেখলেন, পুষ্প বা ড্রাইভার রহিম মিয়া—দু’জনের কেউই নেই। শেহনাজ সরকারের বুক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। তবুও ভাবলেন, ড্রাইভার হয়তো তাকে নিয়ে আশেপাশে কোথাও গেছে। তিনি ফাইল গাড়িতে রেখে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। এর মাঝে ড্রাইভার হাতে কিছু খাবার নিয়ে ফিরে এলেন। শেহনাজ সরকার ওনাকে আসতে দেখে অস্থির হয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—

– “কাকা, পুষ্প কোথায়?”
রহিম মিয়া অবাক হলেন। পুষ্প দিদিভাই কোথায় মানে? উনি তো তাকে গাড়িতে বসতে বলে খাবার আনতে গিয়েছিলেন। তিনিও এবার একইভাবে বললেন—
– “কী বলছেন আম্মাজান? পুষ্প দিদিভাই কোথায় মানে? তাকে তো গাড়িতে বসতে বলে তার জন্য খাবার আনতে গিয়েছিলাম আমি!”
রহিম মিয়ার কথা শুনে শেহনাজ সরকারের বুক অজানা আশঙ্কায় কাঁপতে শুরু করল। তিনি এবার রহিম মিয়াকে আশেপাশে খুঁজতে বললেন আর নিজেও এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন। আশেপাশে প্রায় আধা ঘণ্টা খোঁজার পরেও পুষ্পর দেখা পাওয়া গেল না। শেহনাজ সরকার এবার চিন্তায় ঘামতে শুরু করলেন। কোথায় ওনার পুষ্প? সে কিছুই চেনে না, না বলে একা কোথাও যাওয়ার মেয়েও নয়।
শেহনাজ সরকার বাড়িতে কল করে বিষয়টি জানাতে সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমজাদ সরকার আর আহমেদ সরকার দুজনেই অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে কোর্টে চলে এলেন। সবাই মিলে খুঁজেও পুষ্পকে না পেয়ে শেষে থানায় গেলেন মিসিং কমপ্লেন করার জন্য। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার আগে মিসিং কেস করা সম্ভব নয়—এটি নিয়ম। এই কথা শুনতেই যেন শান্ত হয়ে চেয়ারে বসে থাকা বাঘিনী গর্জে উঠলেন শেহনাজ সরকার। দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর এক চড় মেরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন—

– “চব্বিশ ঘণ্টা মাই ফুট! আমার মেয়ের কিছু হলে আপনার থানা আর থানার নিয়ম—কোনোটাই আস্ত রাখব না আমি! যেকোনো মূল্যে আমার মেয়েকে চাই, অ্যাট এনি কস্ট। যত পুলিশ লাগে লাগান, কিন্তু আমার মেয়েকে আমার চাই।”
পুলিশ কর্মকর্তারা রীতিমতো ভয়ে সব ফোর্স লাগিয়ে দিলেন পুষ্পকে খোঁজার কাজে। কারণ সবাই চিনে শেহনাজ সরকার কে? ঢাকার নাম করা বেস্ট ক্রিমিনাল লয়ার যেমন কথা ঠিক তেমনই কাজ। বড় বড় ক্রিমিনাল ও শেহনাজ সরকারের নাম শুনে থমকে যায়। আমজাদ সরকার আর আহমেদ সরকার দুজনে পুলিশের সাথে শান্তভাবে কথা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এবার শেহনাজ সরকার তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন—

– “আমজাদ, যত লোক লাগে লাগাও, যত টাকা দিতে হয় দাও। সূর্য ডোবার আগে আমার মেয়েকে সশরীরে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। ওর গায়ে যেন একটা ফুলের টোকাও না লাগে।”
আমজাদ সরকার একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তিনি জানেন এই মুহূর্তে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও, স্ত্রীর মনে কী ঝড় বইছে। পুষ্পকে নিজের আত্মার অংশের মতো আগলে রাখেন তিনি, সেই পুষ্প নিখোঁজ হয়েছে তিন ঘণ্টা ধরে। নিজেকে বাইরে থেকে শক্ত দেখালেও ভেতরে তিনি ভেঙে পড়েছেন। আমজাদ সরকার স্ত্রীর দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন—
– “শেহনাজ, শান্ত হও। আমরা পেয়ে যাব পুষ্পমাকে, কিছু হবে না।”
আমজাদ সরকারের কথার বিপরীতে শেহনাজ সরকারের অদ্ভুত শান্ত মুখ—শুধু শান্ত কণ্ঠে ভেসে এল—
– “কিছু না হলেই ভালো। নাহলে সব ধ্বংস হবে।”

আমজাদ সরকার আর কিছু বললেন না। তিনি জানেন, কোনো কথায় স্ত্রীর ভেতরের ঝড় থামানো যাবে না; সেটা থামানোর একটাই উপায়—পুষ্পকে খুঁজে বের করা। তিনি নিজেও পরিচিত লোকদের কল করে পুষ্পকে খোঁজার কাজে লাগিয়ে দিলেন। নামকরা ‘সরকার বিল্ডার্স’-এর মালিক তিনি, সমাজে প্রচুর নাম-যশ-খ্যাতি অর্জন করেছেন। যেমন টাকা আছে, তেমন বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মানুষের সাথে পরিচয়ও আছে। তাই লোকবলের অভাব নেই; এক কলেই পুরো শহর তল্লাশি শুরু করে দিলেন তিনি।
এদিকে শেহনাজ সরকার শান্ত মাথায় ভেবে পুলিশ ফোর্স নিয়ে আবারও কোর্টে গেলেন, কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কিনা তা দেখার জন্য। কিন্তু ভাগ্য খারাপ হওয়ায় কোর্টের বাইরে সিসিটিভি ফুটেজ থাকলেও, পুষ্প যেদিকে ছিল সেদিকে কোনো ক্যামেরা নেই—তাই কিছুই পাওয়া গেল না। শেহনাজ সরকার বুঝতে পারছেন না পুষ্প কোথায়? পুষ্প নিজে কোথাও যাওয়ার মেয়ে নয়, ওনাকে না বলে তো আরো নয়। তার মানে কেউ নিয়ে গেছে, কিন্তু কে নিয়ে গেছে? ব্যবসায়িক কোনো শত্রু? কিন্তু কে সেই শত্রু?

প্রায় ছয় ঘণ্টা হয়ে গেছে, পুষ্প এখনো নিখোঁজ। সরকার বাড়িতে অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ। ড্রয়িংরুমের সোফায় চিন্তিত মুখে বসে আছেন জেনিফার সরকার, সিমরান ও রেশমা। আর মিনারা বেগম ও নিশি সোফার এক কোণে বসে আছে; তাদের দুজনের মুখে চিন্তার কোনো ছাপ নেই, বরং অদ্ভুত শান্ত এক ভাব। দেখে মনে হয় তারা যেন ভীষণ খুশি, যা পরিস্থিতির কারণে সবার সামনে প্রকাশ করতে পারছে না।
এমন সময় সদর দরজা দিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলেন শেহনাজ সরকার এবং আহনাফ। শেহনাজ সরকারের মুখ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর। তিনি সোজা এগিয়ে এসে নিশির সামনে দাঁড়ালেন। নিশির কাঁধ ধরে এক টানে সোফা থেকে তুলে নিজের সামনে দাঁড় করালেন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
– “ঠাসস!”

ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো ড্রয়িংরুম যেন কেঁপে উঠল জোরালো চড়ের আওয়াজে। নিশির মুখ ঘুরে গেল চড়ের তীব্রতায়। নিজের গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে তাকাতেই আবারও ঠাসস করে চড় দিলেন আরেক গালে। চড়ের শব্দে পুরো ড্রয়িংরুম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আহনাফ ছাড়া বাকি সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শেহনাজ সরকারের দিকে। কেউ বুঝতে পারছে না শেহনাজ সরকার কেন নিশিকে মারছেন। নিশির চোখ দিয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এদিকে আদরের নাতনিকে এভাবে মার খেতে দেখে মিনারা বেগম এগিয়ে এসে গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন—
– “একি শেহনাজ! তুমি আমার নাতনিকে কেন এভাবে মারছ?”
মিনারা বেগমের কথার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না শেহনাজ সরকার। তিনি নিশিকে আবারও এক ঝটকায় নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে আরেকটা চড় মারলেন। চড়ের তীব্রতায় এবার নিশি ফ্লোরে গিয়ে পড়ল এবং ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। নিশির কান্না দেখেও শেহনাজ সরকারের মাঝে কোনো সহানুভূতি প্রকাশ পেল না। উনি এবার দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলেন—

– “ভালোয় ভালোয় বলো, আমার পুষ্প কোথায়? নাহলে তোমার কী অবস্থা করব, তা ভাবতেও পারবে না!”
শেহনাজ সরকারের কথা শুনে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না; নিশি কীভাবে জানবে পুষ্প কোথায়? মিনারা বেগম এবার নাতনিকে ফ্লোর থেকে তুলে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে তিরিক্ষি গলায় বললেন—
– “পাগল হয়েছ নাকি শেহনাজ? আমার নাতনি কীভাবে জানবে ওই মেয়ে কোথায়? কে জানে কোথায় গিয়ে নষ্টাতি করছে…”
– “মুখ সামলে কথা বলুন! আমার পুষ্পকে নিয়ে আপনার মুখ থেকে একটা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বের হলে ভুলে যাব আপনি আমার গুরুজন কিংবা রেশমার শাশুড়ি।”
মিনারা বেগমের কথা শেষ হওয়ার আগেই গর্জে উঠলেন শেহনাজ সরকার। ওনার গর্জনে পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠছে। মিনারা বেগম নিজেও ভড়কে গিয়ে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলেন। এ কাকে দেখছেন তারা? সবসময় শান্ত-গম্ভীর হয়ে থাকা নারীর এই কোন নতুন অগ্নিরূপ! এদিকে নিশি ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। শেহনাজ সরকার মিনারা বেগমের বুক থেকে আবারও নিশিকে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে রাগী গলায় জিজ্ঞেস করলেন—

– “সত্যি করে বলো, পুষ্প কোথায়? যত তাড়াতাড়ি বলবে, ততই তোমার মঙ্গল। মেয়ে, তুমি শেহনাজ সরকারকে তার আসল রূপ দেখাতে বাধ্য করো না, সেটা সহ্য করতে পারবে না। তাই আমি আমার আসল রূপ দেখানোর আগেই বলো, আমার পুষ্প কোথায়?”
নিশি এবার সত্যি সত্যি ভয় পেতে লাগল। সে পরিচিত নয় শেহনাজ সরকারের এই রুপের সাথে। সে কম্পিত কণ্ঠে বলল—
– “আমি জানি না আন্টি, পুষ্প কোথায়!”
– “জানো না মানে? জানো না মানে কী? লোক কেন লাগিয়েছ পুষ্পর পেছনে? কী করেছ তুমি আমার পুষ্পর সাথে?”
পুলিশ অফিসাররা পুষ্পর কলেজের বাইরে ট্রাফিক রোডের সিসিটিভি ফুটেজ যতটুকু দেখা গেছে, সেখানে একটি লোককে পুষ্প যেখানে যায় আশেপাশে সবসময় দেখা গেছে। জুম করে চেহারা দেখে, গাড়ির নাম্বার ট্রাক করে লোকটিকে খুঁজে বের করে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রথমে জিজ্ঞেস করলে সে মুখ খুলছিল না, কিন্তু যেইমাত্র পুলিশ ‘থার্ড ডিগ্রি’ টর্চার শুরু করার জন্য মারধর করতে শুরু করল, সহ্য করতে না পেরে সে সব বলে দিল। একটি মেয়ে তাকে পুষ্পর ওপর নজর রাখতে বলেছিল। মেয়েটার ছবি আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে সে না বলে, কিন্তু নাম্বার আছে বলে। সেই নাম্বারটি দেখেই আহনাফ জানায় ওটা নিশির নাম্বার। নিশির নাম শুনেই শেহনাজ সরকার আর কারো কোনো কথা না শুনে থানা থেকে বেরিয়ে আসেন। আমজাদ সরকার থানাতেই থেকে যান। শেহনাজ সরকারের পেছনে আহনাফ চলে আসেন। শেহনাজ সরকারের কথা শুনে বাড়ির সবাই চমকে নিশির দিকে তাকাল, আবার শেহনাজ সরকারের দিকে তাকাল। শেহনাজ সরকার রাগে কাঁপছেন রীতিমতো। তিনি নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে গম্ভীর-শান্ত কণ্ঠে বললেন—

– “শেষবার বলছি, পুষ্প কোথায় বলো! নাহলে তুমি বুঝতেও পারছ না তোমার অবস্থা আমি কী করব!”
নিশি এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল—
– “সত্যি বলছি আন্টি, আমি জানি না পুষ্প কোথায়! আমি ওই লোকটাকে শুধু পুষ্পকে নজরে রাখতে বলেছিলাম, যাতে ওর কোনো দোষ বের করে আর্যর চোখে ওকে খারাপ করতে পারি।”
– “পুষ্পকে আর্যর চোখে খারাপ করে তোর কী লাভ, নিশি?”
এবার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন রেশমা। নিশি চিৎকার করে উঠল—
– “কারণ আমি ভালোবাসি আর্যকে! সেই প্যারিসে থাকাকালীন সময় থেকে ওকে আমি ভালোবাসি। বিডিতে এসেছি শুধু ওকে মনের কথা জানিয়ে বিয়ে করব বলে। আর এসে শুনি, কোথাকার কোন থার্ড-ক্লাস, আনকালচারড মেয়ের সাথে নাকি আর্যর বিয়ে হয়ে গেছে! এতই সহজ? ভালোবাসলাম আমি, আর বউ হবে অন্য কেউ? তাই ওকে আর্যর চোখে খারাপ করে আর্যর জীবন থেকে, এই বাড়ি থেকে তাড়াতে চেয়েছিলাম আমি।”

নিশির কথা শুনে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। একটা মেয়ে কতটা নিচু মানসিকতার হলে এরকম জঘন্য ষড়যন্ত্র করতে পারে, তা কেউ ভাবতে পারছিল না। বিবাহিত জেনেও স্ত্রীকে স্বামীর কাছে খারাপ বানিয়ে নিজে সেই পুরুষকে পেতে চাইছে! ছিঃ। শেহনাজ সরকার এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
– “কোনো থার্ড-ক্লাস মেয়ে নয় পুষ্প; ও সরকার বাড়ির সম্মান, ওর নাম শুভ্রতা সরকার পুষ্প। নূরের যায়গায় সরকার সারনেইম যোগ হয়েছে। পুষ্প সরকার বাড়ির নূর। আর তুমি ভাবলে কী করে যে, ওকে আর্যর কাছে খারাপ প্রমাণ করে আলাদা করতে পারবে? এই বাড়ি থেকে তাড়াতে পারবে, এতই সহজ? ওর সম্পর্ক আর্যর আগে আমার সাথে। ওকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর সাহস স্বয়ং সরকার বাড়ির কর্তারও নেই।”
শেহনাজ সরকারের কথা বলার মাঝেই আহনাফ এসে জানাল, পুষ্পকে নিশির লাগানো লোক নিয়ে যায়নি। কথাটা শুনে শেহনাজ সরকার আরো চিন্তায় পড়ে গেলেন—তাহলে পুষ্পকে কে নিয়ে গেছে? তিনি নিশির কাছ থেকে ফোনটি নিয়ে নিলেন। তারপর নিশিকে নজরে রাখতে বলে ওপরে নিজের রুমে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবারও নিচে নেমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে নিশিকে বললেন—
– “তোমার ব্যবস্থা পরে করব। আল্লাহর কাছে দোয়া করো যেন পুষ্পকে সহি-সালামতে পেয়ে যাই; নাহলে একজন তোমাকে পৃথিবীর বুকে জাহান্নাম দর্শন করাবে।”

আর্য সাইট ভিজিট করে আজকেও হোটেল রুমে ফিরল। শাওয়ার নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনে সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। বরাবরের মতোই ক্যাজোয়াল পোষাকেও বেশ সুদর্শন লাগছে। রোজকার মতো নিকোটিনের ধোঁয়া ওড়াতে ব্যস্ত আর্য। আজকে ওর মন-মস্তিষ্ক ভীষণ অশান্ত, কোথাও স্থির হতে পারছে না। বারবার মেয়েটার কথা মনে পড়ছে। মেয়েটা ঠিক আছে তো? ওর ড্রাইভার বলেছিল, পুষ্প কলেজ থেকে শেহনাজ সরকারের সাথে চলে গেছে; তারপর থেকে আর কথা হয়নি।
আর্য প্যারিস আসার পর থেকে বাড়ির সব খবর নিয়েছে তার ড্রাইভারের কাছ থেকে। প্রতিদিন শেহনাজ সরকারের গাড়ির পেছনে আর্যর ড্রাইভার থাকত। পুষ্পর কলেজ যাওয়া থেকে শুরু করে শেহনাজ সরকারের সাথে গাড়িতে উঠা পর্যন্ত নজরে রাখত এবং আর্যকে ফোনে জানাত। ড্রাইভার সর্বশেষ খবর দিয়েছে, পুষ্প কলেজ ছুটি হয়ে শেহনাজ সরকারের সাথে বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চলে গেছে। কিন্তু আর্যর মন কেন যেন আজ বেশি ছটফট করছে! কেন মনে হচ্ছে মেয়েটা ঠিক নেই?

আর্য অস্থির হয়ে সিগারেটের শেষ অংশটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেলল। তারপর রুমে গিয়ে ল্যাপটপের সাথে বড় স্ক্রিন কানেক্ট করল। একটি অ্যালবামে ঢুকতেই সাথে সাথে ওপেন হলো সাদা-আকাশী কলেজ ড্রেস পরা, হিজাব পরিহিত এক ষোড়শী কন্যার অসংখ্য ছবি। অন্ধকার রুম মুহূর্তে আলোকিত হয়ে উঠল। পুরো ফাইলে নয় হাজারের বেশি ছবি আছে! বেশির ভাগ ছবি কলেজ ড্রেস পরা, আর কয়েকটা ছবি আর্যর বারান্দায় খরগোশদের কোলে নিয়ে গাজর খাওয়ানোর সময়কার। প্যারিস আসার পর থেকে তার ‘ফ্লাওয়ার’ কী করছে, তা ভেবেই মন অশান্ত হয়ে পড়ছিল। তাই সে ফটোগ্রাফার হায়ার করেছিল ছবি তুলে তাকে পাঠানোর জন্য। সকালে কলেজে যাওয়ার সময়, ছুটির সময় এবং সন্ধ্যায় বারান্দায় খরগোশদের সাথে সময় কাটানোর মুহূর্তগুলো—এই তিন সময়ের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নয় হাজারের বেশি ছবি তোলা হয়েছে। সব লোকচক্ষুর অন্তরালে। আর সেই ছবিগুলোই আর্যর কাছে এসেছে। এখন সেগুলো দেখে দেখে আর্যকে আরও চারটি দিন কাটাতে হবে। কখন নিজের চোখে দেখতে পারবে তার ফ্লাওয়ারকে?

আর্য গত দুই দিনের মতো পুষ্পর ওড়নার ঘ্রাণ নিতে নিতে রুমে রাখা সোফাটি টেনে নিয়ে এল বড় স্ক্রিনের সামনে। তাতে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে পড়ল সে। এক হাতে সাদা ওড়নাটা জড়ানো, অন্য হাত সোফার হাতলে রেখে মাথাটা পেছনে এলিয়ে দিল। পুরো রুমের একটা ওয়াল জুড়ে বড় স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে পুষ্পর বড় ছবি। বারান্দায় বসে আছে সে; পরনে পেস্টেল গ্রিন কালারের গোল জামা, জামার ঘের মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। কোলে খরগোশ দুটো নিয়ে গাজর খাওয়াচ্ছে একমনে। গত দুই দিন এই ছবি দেখে দেখে রাত কাটিয়েছে আর্য। ওড়নার ঘ্রাণ নিয়ে একটু ঘুমালেও আবার ঘুম ভেঙে যেত, তখন এই ছবি দেখে রাত পার করেছে সে। বড় স্ক্রিনে গোলগাল মায়াবী ওই মুখটা দেখলে তার মনে অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করতো।

কিন্তু আজ ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করছে তাকে; তীব্র অশান্তির ঝড় বইছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে শেষবার আসার সময় দেখে আসা সেই ঘুমন্ত শান্ত মুখটা। মনে হচ্ছে তার ফ্লাওয়ার ভালো নেই। যদিও আর্য এসবে বিশ্বাসী নয়, তবুও বারবার অজানা কারণে কাঁপছে তার মন। আর্য এবার চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে আওড়াল—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩১

– “আই হ্যাভ অলওয়েজ বিন কাম, আই হ্যাভ নেভার বিন দিস রেস্টলেস বিফোর। জাস্ট দ্য থট অফ হোয়েদার দ্যাট গার্ল ইজ ওকে ইজ মেকিং মি দিস রেস্টলেস। আই হ্যাভ চেঞ্জড, দ্যাট টিমিড গার্ল হ্যাজ চেঞ্জড মি।”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here