অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪০
রুপা
এমন একটা সুন্দর মুহূর্তে বউয়ের মুখের কথা শুনে মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল! সে যতই চেষ্টা করছে বউকে কাছে রেখে বউয়ের মন থেকে তার প্রতি ভয় কমাবে, ততই বউ তার থেকে দূরে যেতে চাইছে। তার বউ কেন তার থেকে দূরে থাকবে? দূরেই যদি থাকার ছিল, বিয়ে করেছে কেন? সে যদি শুরু থেকে বিয়েটা মেনে নিত, সব ঠিক থাকলে এত দিনে তো তাদের মাঝে কত কিছু হয়ে যেত! নাহ্, সে আর একদম এসব সহ্য করবে না। তার বউ মানে শুধুই তার বউ; তার বউয়ের ভাগ সে তার মাকেও দেবে না—এক পার্সেন্টও না! এই মুহূর্তে আর্যর মাথায় আগুন জ্বলছে, রাগে ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে বারান্দা থেকে ফেলে দিতে; কিন্তু না, তার রাগ করলে চলবে না। তার ফ্লাওয়ারের ছোট, একদম নাজুক, নরম শরীর এত ব্যথা সহ্য করতে পারবে না, কেঁদে দেবে! আর তার ফ্লাওয়ারের কান্নারত মুখ তার সবচেয়ে অপ্রিয়—বরং প্রিয়র মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপ্রিয়!
ওই কান্নারত, লাল হয়ে যাওয়া মুখ অদ্ভুত সম্মোহনী সুন্দর; তার মতো শক্তপোক্ত পুরুষটাকেও তা সম্মোহিত করে নেয়। সেদিন প্রথম রাতে ওই অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো কী অদ্ভুতভাবেই না তাকে সম্মোহিত করে নিচ্ছিল! সেদিন রাতে যদি সে বাড়ি থেকে না চলে যেত, তাহলে সে নিশ্চিত, সেই রাতেই এই মেয়ে তাকে সম্মোহিত করে ফেলত অঘটন ঘটে যেত। অবশ্য সেটা এখনো করে নিয়েছে—হয়তো একটু দেরিতে বুঝতে পেরেছে সে, কিন্তু করে নিয়েছে। এখন তার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সেটা সে বুঝে গেছে। এই মেয়ে তার সাথে থেকে তাকে যেদিকে ইশারা করবে, সেদিকেই সে চলছে; তাকে চলতে হয় না, আপনাআপনি সে চলে! সে সব করতে পারবে, বিনিময়ে শুধু এই মেয়েকে তার লাগবে—দিনশেষে ভালো থাকার জন্য তার এই মেয়েকে লাগবে। তার জন্য যা করতে হয় সে করবে, কাউকে মারতেও সে দুবার ভাববে না।
আর্যর ভাবনার মাঝেই পুষ্প এবার আর্যর গলা থেকে মুখ তুলতে চাইল, কিন্তু এবার আর্য নিজেই পুষ্পকে কোল থেকে নামাতে চাইল না। তাই তো রমণীকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরেছে, যেন বুকের খাঁচায় বন্দী করে নিতে চাইছে! আর্য এতটাই শক্ত করে চেপে ধরল যে পুষ্প হাঁসফাঁস করে উঠল, নিজেকে আর্যর বাঁধন থেকে ছাড়াতে চাইল, কোল থেকে নামার জন্য মোচড়ানো শুরু করল; তবুও আর্যর হাতের বাঁধন একটুও নড়বড়ে হলো না। আর্যর চেপে ধরায় রমণীর নাজুক দেহ আর তা নিতে পারল না, মোচড়ানো বন্ধ করে নেতিয়ে পড়ল। পুষ্পকে হার মানতে দেখে আর্যর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অদ্ভুত জয়ের হাসি। সে পুষ্পর কানের কাছে নিজের মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
– “আমার থেকে যতবার দূরত্ব বাড়াতে চাইবে, ঠিক ততবার এভাবেই হার মানতে হবে তোমাকে, মাই লিটল ফ্লাওয়ার! আমি বেঁচে থাকতে কোনো দিন তুমি আমার থেকে দূরত্ব বাড়াতে পারবে না। আমি দেবো না! তোমাকে আমার কাছে থাকতে হবে—এতটা কাছে থাকতে হবে, ঠিক যতটা কাছে থাকলে আমার মনে হবে তুমি আর আমি এক।”
রমণী শুনল তার সরকার সাহেবের পুরো কথা? কিছু বুঝল কী? হয়তো বুঝল, আবার হয়তো না। খুশি হয়েছে কী? হয়তো হ্যাঁ, নয়তো কী! কথাটা শুনে কি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতো না? বরং আর্যর কাঁধে থাকা হাত দুটো আবার গলা জড়িয়ে নিল! পুষ্পর নীরবতা আর্যর পছন্দ হচ্ছে না, তবুও সে কিছু বলছে না। কারণ, তার করা কাজের জন্যই এখন তার ফ্লাওয়ার তাকে ভয় পায়; এখন সে এমন কিছুই করবে না যাতে সেই ভয় আরও দ্বিগুণ বেড়ে যায়। কথা না বলে যাবে কোথায়? কিছু প্রয়োজন হলে তার কাছেই তো আসতে হবে, সে ছাড়া তো আর কোনো অপশন রাখেনি সে! এই বাড়িতে থেকে যদি বউকে স্বামীভক্ত না করেছে, তবে সেও তার ফ্লাওয়ারের সরকার সাহেব না!
আর্য পুষ্পকে কোলে নেওয়া অবস্থাতেই রুমে ফিরে গেল। পুষ্পকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ফ্রেশ হতে বলে নিজে রুম থেকে বেরিয়ে গেল; তাকে অনেক কাজ করতে হবে! প্রথমে বউয়ের জন্য নাস্তা বানাতে হবে, বউকে নজরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে! বউ তার কারণে-অকারণে কেন কেঁদে উঠল, সেটা তো জানতে হবে!
ঢাকা সিটি হাসপাতালের করিডোরে পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছে। করিডোরে চিন্তিত মুখে বসে আছে শেহনাজ সরকার, আমজাদ সরকার, রেশমা, তার স্বামী রেহাব আর স্নিগ্ধ। নিশিকে হাসপাতালে আনা হয়েছে আরও দুই ঘণ্টা আগে; কে এনেছে, কেউ জানে না। শুধু একটা অজ্ঞাত ফোন কল গেছে রেশমার ফোনে—নিশিকে হাসপাতালে আনা হয়েছে, এক্সিডেন্ট করেছে! কথাটা শুনে কাঁদতে কাঁদতে ভাই-ভাবীকে বলে ওনারা রেশমার স্বামী আর স্নিগ্ধকে খবর দিয়ে রেশমাকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তার কিছুক্ষণ পরে স্নিগ্ধ আর রেহাব চলে আসেন।
অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার এখনো বের হননি। মাথার আঘাতটা গভীর হয়েছে, প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় অপারেশন করতে হচ্ছে। রক্তের প্রয়োজন পড়েছিল, যেটা দিয়েছে অবশ্যই স্নিগ্ধ—একমাত্র বোন হওয়ায় প্রচুর ভালোবাসে, বোন দূরে থাকলেও ভালোবাসার কমতি নেই। মা মারা যাওয়ার আগে বোনকে আগলে রাখার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন তার কাঁধে, আজ নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে ভাই হিসেবে! সে তার বোনকে আগলে রাখতে পারেনি—মাথা নিচু করে হাসপাতালের একটা চেয়ারে বসে আছে স্নিগ্ধ। হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে মাথা তুলে তাকাল, দেখল রেশমা, যিনি নিজেও কান্নারত ভেজা চোখে তাকিয়ে আছেন।
স্নিগ্ধ ভেতরে দুর্বল হলেও বাইরে তা প্রকাশ করল না। ধরা গলায় বলল—
– “ছোট মা, কাঁদছো কেন? চিন্তা করো না, বোন ঠিক হয়ে যাবে।”
কথাটা বলার সময় স্নিগ্ধর গলাটা বুজে আসছে, সে ঢোক গিলে বহু কষ্টে কথাটা বলল। রেশমা বেগম স্নিগ্ধর পাশের চেয়ারটাতেই বসে এক সাইড থেকে জড়িয়ে ধরে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলেন। রেশমা জানেন, ছেলেটা নিজের কষ্ট কোনোদিন কাউকে বুঝতে দেয় না; বোনের জন্য তারও কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু তা প্রকাশ না করে উল্টো তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে! নিজের পেটের সন্তান না হলেও শিফা, নিশি আর স্নিগ্ধ—তিনজনকে আলাদা চোখে দেখেননি কোনোদিন উনি। বছরখানেক আগে বড় জা মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানের দায়িত্ব তো ওনার কাঁধেই দিয়ে গিয়েছিলেন!
এর মধ্যে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। ডাক্তারকে দেখেই সবাই এগিয়ে গেল নিশির খবর নিতে। ডাক্তার জানালেন, এখন ঝুঁকি কমে গেছে, অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান ফিরে এলে বাকিটা বলতে পারবেন। সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাল আর দোয়া করতে লাগল যেন তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরে আসে।
সিমরান নিজের রুমের বারান্দায় আনমনা হয়ে বসে আছে। দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে অজানা কারণে, আজকে সে কলেজে যায়নি। ইদানীং সিমরান বেশ মনমরা হয়ে থাকে, অবশ্য কারণও আছে; কারণ, সে জীবনে প্রথম প্রেমে পড়েছে! অথচ যার প্রেমে পড়েছে, সেই প্রণয় পুরুষের কোনো খোঁজ নেই। কিছুদিন আগেও সবকিছু ঠিক ছিল—ইভান দুই-তিন দিন পরপর সরকার বাড়িতে আসত, তখন সিমরান ইভানকে দূর থেকে দেখত, সব কাজ ফেলে একমনে তাকিয়ে থাকত ইভানের আড়ালে।
কিন্তু সেদিন ইভানের মা-বাবা আসার পরে ইভান গেছিল আর সরকার বাড়িতে আসেনি। এতে সিমরানের যে কী রকম দমবন্ধ করা অস্থির অনুভূতি হয়েছে, তা কি কেউ জানে? অবশ্য না, কারণ সিমরান কাউকে জানতে দেয়নি! সেদিনের পর সিমরান অনেকভাবে চেষ্টা করেছে ইভানের সাথে যোগাযোগ করার; ফেসবুক আইডিতে কম করে হলেও হাজারের ওপরে মেসেজ পাঠিয়েছে, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো রেসপন্স আসেনি। এতে সিমরানের মন বেশ ক্ষুণ্ন হয়ে আছে—কেন সে মেসেজের রিপ্লাই দেয় না? আজকাল রমণীর মন অকারণেই খারাপ হয়ে থাকে, কলেজ-বাড়ি ঘোরাফেরা—সবকিছু বিরক্ত লাগে। দুই চোখ দূর-দূরান্তে খোঁজে সেই পুরুষটিকে, যাকে দেখে হঠাৎ তার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছিল। সেই প্রণয় পুরুষের এক ঝলক দেখার তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে তার আঁখিযোগল।
রমণী মনমরা হয়ে আকাশ পানে চাইলো। ওই আকাশ যেমন ধরাছোঁয়ার বাইরে, তার মনে হচ্ছে তার প্রণয় পুরুষও ঠিক তেমনই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে! কথাটা ভাবতেই কী রকম হাসি পেল রমণীর। সে হঠাৎ উদাস সুরে গুঞ্জণ করে উঠল—
– “ঝলসে যাবো জানি..
মানছে না মন খানি..
আমি মনে হয় বামন হয়ে..
চাঁদে হাত বাড়াই..”
গোসল করে ওয়াশরুমের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে পুষ্প। বাইরে বেরোতে পারছে না, কারণ তার পরনে শুধু একটা সাদা তোয়ালে ছাড়া আর কিছুই নেই! কিছুক্ষণ আগে আর্য পুষ্পকে বলেছিল ফ্রেশ হয়ে নিতে। পুষ্প আর্যর কাছ থেকে বাঁচতে তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়; পানির টেপ চালু করতে গিয়ে ভুলে ঝরনা চালু করে ফেলে, মুহূর্তেই কাকভেজা ভিজে যায়! তাই সে একেবারে গোসল করে নেয়, কিন্তু এখানে রমণীর কোনো কাপড় নেই—সেকথা খেয়ালই ছিল না তার। এখন গোসল শেষে কাপড় না পেয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াশরুমের দরজা ধরে। ওদিকে বাইরে আর্য সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে বউকে নাস্তা করিয়ে শপিংয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
এতক্ষণ ধরে পুষ্প বের না হতে দেখে আর্য এবার অধৈর্য হয়ে ওয়াশরুমের দরজায় টোকা দিয়ে ডাকল—
– “ফ্লাওয়ার?”
আর্যর ডাক শুনে পুষ্প আরও জড়সড় হয়ে যায়—সে বেরোবে কী করে এই অবস্থায়?
– “ফ্লাওয়ার, কী হয়েছে? আসছো না কেন?”
রমণী কোনো উত্তর দিল না। আর্য আরও অনেকবার ডাকার পর দরজার ওপাশ থেকে পুষ্প মিনমিন করে বলল—
– “এখানে কোনো কাপড় নেই, আমি কী পরব?”
রমণীর কথা শুনে আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই একটা কথা বলতে এত হেজিটেট করার কী ছিল! এই মেয়েকে আরও তিন বছর পর বিয়ে দেওয়া উচিত ছিল—পরক্ষণেই সে ভাবল, না না, ঠিক আছে! তিন বছর পরে যদি বিয়ে দিত, তাহলে নিশ্চয়ই তার ফ্লাওয়ার এরকম ইনোসেন্ট, কিউট ও তার বুকে ঝড় তোলার মতো হতো না! তখন তো ম্যাচিউর হয়ে যেত, তার সাথে কথা বলার সময় গলার স্বর কাঁপত না, চোখের দৃষ্টিতেও কম্পন থাকত না। এই যে এখন যেরকম তার সাথে কথা বলার সময় গলার স্বর হালকা কাঁপে, চোখের কাঁপা দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘুরে—সেটা তো থাকত না! সবচেয়ে বড় কথা, তিন বছর পরে নিশ্চয়ই তার সাথে বিয়ে হতো না, ফ্লাওয়ারও নিশ্চয়ই তাকে বিয়ে করত না! আর্যর আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝেই শোনা গেল পুষ্পর গলা—
– “সরকার সাহেব?”
– “হুম!”
– “আমার কাপড় কোথায়?”
– “তোমার কাপড় তো তোমার পরনেই ছিল, ফ্লাওয়ার!”
– “কিন্তু ওগুলো তো ভিজে গেছে, এখন আমি কী পরব?”
– “তুমি শাওয়ার কেন নিলে, ফ্লাওয়ার? শপিং থেকে আসার পরে শাওয়ার নিতে!”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প এবার কী বলবে বুঝতে পারল না—সে কি ইচ্ছে করে গোসল করেছে নাকি? সে তো ভুলে ভিজে গেছে, তাই গোসল করে নিয়েছে; তার ওপর এখানে যে তার কাপড় নেই, সেটা তো সে ভুলেই গেছিল! এখন তার ঠান্ডা লাগছে।
– “আচ্ছা, তুমি একটু ওয়েট করো, আমি দেখছি পরার মতো কিছু পাই কি না!”
আর্য আলমারি খুলে দেখল, সব তার নিজের কাপড়! তার কাপড় তো তার ফ্লাওয়ারের গায়ে হবে না, কিন্তু এখন কী করবে? হঠাৎ তার চোখ যায় নিজের থ্রি-কোয়ার্টার baggy প্যান্টের দিকে। সে আর কিছু না ভেবে সেখান থেকে একটা প্যান্ট আর একটা টি-শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় টোকা দিয়ে কাপড় নিতে বলল। পুষ্প দরজা একটু ফাঁকা করে হাত বাড়িয়ে দিল। আর্য পুষ্পর হাতে কাপড়গুলো দিয়ে যেই না ফিরতে যাবে, অমনি দরজার ফাঁক দিয়ে তার চোখ গিয়ে আটকায় ওয়াশরুমের আয়নায়—যেখানে তোয়ালে পেঁচানো পুষ্পর পেছনের দিকের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে! আর্য সেটা দেখে ঢোক গিলল। সাথে সাথে তার গলার আকর্ষণীয় উঁচু জায়গাটা ওঠানামা করল। হঠাৎ আর্যর গলা শুকিয়ে গেল, ভীষণ তৃষ্ণা পেল! সে তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে সেখান থেকে সরে দাঁড়াল। কী মারাত্মক এই মেয়ে! এমনিতেই কি পাগল কম করেছে, যে এখন শ্বাস নেওয়াও মুশকিল করে দিচ্ছে?
আর্য জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল তোয়ালে পরিহিত অর্ধনগ্ন রমণী! নগ্ন পা, কাঁধের নিচে ওই কুচকুচে কালো তিল—মনে পড়তেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠল অন্যরকম এক অনুভূতি। এই অনুভূতি সে নিজের ভেতর প্রথম টের পাচ্ছে, শরীরের প্রতিটা কোষে যেন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে!
– “আর্য, কন্ট্রোল! শান্ত হ, তোর ফ্লাওয়ার এখনো অনেক ছোট! সহ্য করতে পারবে না, কেঁদে দেবে।”
আর্য রুমজুড়ে পায়চারি করতে লাগল। অস্থির হয়ে ঢকঢক করে গ্লাসের পানি শেষ করল। অস্বাভাবিক সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে চাইলো বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। এর মধ্যেই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে আর্য সেদিকে তাকাল। সাথে সাথে তার চোখ আটকে গেল পুষ্পর ওপর! ভেজা চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে ছড়িয়ে আছে, চুলের ডগা দিয়ে টপটপ করে পানি চুইয়ে চুইয়ে মেঝেতে পড়ছে। আর্যর থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টও বেশ বড় হয়েছে, টি-শার্ট তো আরও বড়—ঢিলেঢালা, যেন আরও দুটো পুষ্প ঢুকতে পারবে! টি-শার্টটা তার হাঁটু ছুঁয়েছে। গলায় সাদা তোয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে সে, দুই হাতে ধরে রেখেছে কোমর।
সেটা দেখে আর্যর ঠোঁটে হাসি দেখা গেল। এত কিউট হতে কে বলেছিল তার ফ্লাওয়ারকে? তার ওভারসাইজ টি-শার্ট ও ওভারসাইজ পেন্টেও কী রকম ইনোসেন্ট কিউট লাগছে! মুখে লেপ্টে আছে কয়েক গুচ্ছ ভেজা চুল, নিজের দিকে কী রকম ঠোঁট উল্টে তাকাচ্ছে—যেন বেশ অস্বস্তি হচ্ছে! যেই না পুষ্প চোখ তুলে তাকাল, সাথে সাথে আর্যর ঠোঁটের হাসি গায়েব হয়ে গেল। দুজনের চোখাচোখি হলো রমনী বেশিক্ষণ তাকাতে পারলো না ওই প্রগাঢ় চাহনির দিকে চোখ নামিয়ে নিল। আর্য এগিয়ে এসে একদম রমণীর সামনে দাঁড়াল। আর্যকে নিজের সামনে দাঁড়াতে দেখে রমণী পিছিয়ে যেতে চাইল, তবে আর্য তা হতে দিল না। শক্ত হাতে দুই কাঁধ চেপে ধরে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে গম্ভীর গলায় বলল—
– “সবসময় পালাই পালাই কেন করো? আমি কাছে আসলে দূরে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠো কেন?”
পুষ্প চুপ করে রইল, কী উত্তর দেবে এর? উত্তর তো রমণীর জানা নেই! আর্য আলতো হাতে রমণীর মুখে লেপ্টে থাকা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। ভেজা চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে তা মুছে দেওয়ার জন্য এক টানে পুষ্পর গলা থেকে তোয়ালেটা নিয়ে নিল। সাথে সাথে দুই হাত আড়াআড়িভাবে বুকের সাথে জড়িয়ে নেয় পুষ্প! সেটা দেখে আর্য অদ্ভুতভাবে বলল—
– “আমার জিনিস আমার থেকে ঢাকছো? উমম নট ব্যাড!”
কথাটা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল রমণীর গাল দুটো, হাঁসফাঁস করে উঠল সে। সেটা অবশ্য চোখ এড়াল না আর্যর; তবে আর্যর বেশ ভালোই লাগছে তার ফ্লাওয়ারের লজ্জা-রাঙানো গাল দুটো—ঠিক যেন লাল চেরি ফল! ইচ্ছে তো করছে এক কামড় দিতে, কিন্তু বউ তার একটু বেশিই ছোট; কিছু করলে যদি কেঁদে কেঁদে শাশুড়ির কাছে যাওয়ার বায়না ধরে!
এদিকে পুষ্প লজ্জা লুকানোর জন্য আর্যর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। এত মোচড়ামোচড়ি আর্যর পছন্দ হলো না—বউ তার লজ্জা পাচ্ছে, পাক, সমস্যা নেই! লজ্জা পেয়ে তার বুকে এসে মুখ লুকাক, বারণ কে করেছে? কিন্তু লজ্জা পেয়ে দূরে কেন সরবে? আর্য এক টানে পুষ্পকে নিজের বুকে আছড়ে ফেলল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৯
– “লজ্জা নাকি মেয়েদের সৌন্দর্য বাড়ায়, তবে আমার সেই সৌন্দর্যের প্রয়োজন নেই! যেই লজ্জা তোমাকে আমার থেকে দূরে সরানোর মাধ্যম হবে, প্রয়োজন নেই সেই লজ্জার। লজ্জা পেয়ে যদি আমার বুকে আসতে পারো, তবেই সেই লজ্জা তোমার জন্য মানানসই।”
