Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৭

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৭

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৭
রুপা

আজ শুক্রবার, সবার ছুটির দিন। সরকার বাড়িতে ছোটখাটো আয়োজন চলছে। শেহনাজ সরকার আর জেনিফার সরকার সকাল থেকে সবার পছন্দের রান্না করতে ব্যস্ত, হরেক পদের রান্না হয়েছে। পুষ্প কাজে সাহায্য করতে চাইলেও শেহনাজ সরকারের কড়া চোখের চাহনিতে হাত লাগাতে পারছে না; তবুও সে শেহনাজ সরকারের আঁচল ধরে ঘুরঘুর করছে। শেহনাজ সরকার আড়চোখে পুষ্পর হাবভাব লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন—
– “কী চাই?”
– “ফুফুমণি, আমি তোমাকে সাহায্য করি?” কথাটা বলে সে শেহনাজ সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেহনাজ সরকার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই ফুলের মতো মেয়েটাকে দিয়ে কাজ করানোর কথা ভাবতেও পারেন না তিনি। আদুরে, বাচ্চা বাচ্চা মুখটা দেখলেই শুধু বুকে আগলে রাখার ইচ্ছে হয়। তিনি পুষ্পর দিকে তাকিয়ে বললেন—

– “তোর কাজ করতেই হবে?”
– “তো আমি কী করব? ভালো লাগছে না তো একা একা! তুমি আমাকে কাজ দাও, আমি কাজ করি তোমার সাথে। আমি বরং সবজি কেটে দিই!”
– “কোনো প্রয়োজন নেই, হাত কেটে যাবে। তুই বরং মটরশুঁটিগুলো ছিলে দে, যা!”
পুষ্প শেহনাজ সরকারের কথামতো মটরশুঁটিগুলো নিয়ে রান্নাঘরের একপাশে বসে ছিলতে থাকে। তা দেখে বাড়ির কাজের মেয়ে দুটো হেসে তার সাথে ছিলতে চাইলে শেহনাজ সরকার বারণ করে তাদের অন্য কাজ করতে বললেন। এখন এগুলো তাড়াতাড়ি ছিলে শেষ করলে পুষ্প আবার অন্য কাজ করতে চাইবে, তার চেয়ে এগুলো নিয়ে ঘণ্টা পার হোক, ততক্ষণে রান্নার কাজ শেষ হয়ে যাবে।
শেহনাজ সরকার পুষ্পকে একটা সুন্দর জীবন দিতে চান, সেটা যেভাবে হোক। নাম পুষ্প হলেও তিনি পুষ্পকে কাঁটার মতো তৈরি করতে চান, যাতে কেউ পুষ্পকে ছুঁতে গেলে কাঁটার আঘাত পায়। উনি সেভাবেই তাকে তৈরি করবেন। কয়েকদিনে পুষ্প শেহনাজ সরকারের সাথে আরও মিশে গেছে। প্রতিদিন কলেজ থেকে নিয়ে আসা আর দিয়ে আসার সময়টাতে পুষ্প সারাদিন কী কী করেছে সব বলে, আর শেহনাজ সরকার সব শুনে ভালো-মন্দ বুঝিয়ে দেন। এখন পুষ্পর আইডল বলতে গেলে শেহনাজ সরকারই। বাড়ির সবার সাথেও সে কম-বেশি কথা বলে, যেটা শেহনাজ সরকারই করিয়েছেন। তিনি পুষ্পকে সবার সাথে স্বাভাবিক আর ফ্রি হতে বলেছেন, যাতে সুবিধা-অসুবিধা হলে সে তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারের বাকি সদস্যদের জানাতে পারে।

কিন্তু বাড়ির সবার সাথে সম্পর্কের উন্নতি হলেও, যার ভিত্তিতে এই বাড়ির সবার সাথে তার সম্পর্ক জড়িয়ে আছে—তার সাথেই সম্পর্ক আরও অবনতি হচ্ছে। অবশ্য শুরু থেকেই যখন উন্নতি হয়নি, সেখানে অবনতি আর কী হবে! আর্য একদম রাত করে বাড়ি ফেরে, যাতে পুষ্পকে এড়িয়ে যেতে পারে। এখন এক বাড়িতে থেকেও তাদের দেখা না হয় বললেই চলে! পুষ্প সকালে উঠে নামাজ পড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলে আর্য উঠে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়। এখনো পুষ্প আর্যর সব জিনিস গুছিয়ে রাখে, কিন্তু আর্য সেসব ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্য শার্ট পরে নেয়। পুষ্পর এনে দেওয়া কফি মুখেও তোলে না, রেডি হয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে যায়। পুষ্প কলেজের জন্য রেডি হতে এসে ঠান্ডা কফি আর ছুড়ে ফেলা কাপড়গুলো দেখলে তার ভেতরটা নিঃশব্দে ভেঙে যায়, তবুও সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখায় সে। আজকে শুক্রবার ছুটির দিন হলেও আর্য সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে, কোথায় গেছে কেউ জানে না।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে; কিন্তু সিমরান, আহনাফ আর পুষ্প তিনজন ঘুরতে যাচ্ছে। পুষ্প যেতে না চাইলেও সিমরান অনেক বোঝানোর পরে সে রাজি হয়েছে। অবশ্য বাড়ির বড়রাও অনুমতি দিয়েছেন; পুষ্প ঘোরাঘুরি করলে তার ভেতরের নার্ভাসনেসটা কিছুটা হলেও কেটে যাবে—এই আশায়। শেহনাজ সরকার অনুমতি দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আহনাফকে সাবধান করেছেন সিমরান আর পুষ্পর খেয়াল রাখতে।
আহনাফ দুজনের জন্য নিচে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করছে। ফোন টিপতে টিপতে হঠাৎ আহনাফের চোখ যায় সিঁড়ির দিকে, চোখ যেন ওখানেই আটকে যায়! পুষ্প আর সিমরান হাত ধরে নামছে। সিমরান হেসে হেসে কী যেন বলছে আর পুষ্প তা মন দিয়ে শুনছে। পুষ্পর পরনে হালকা আকাশি কালারের মধ্যে সাদা ছোট ছোট টিউলিপ প্রিন্টের গাউন, ম্যাচিং করে গোল করে হিজাব পরা, পায়ে স্নিকার্স; তাকে একদম বাচ্চা বাচ্চা লাগছে। সিমরানের পরনে পুষ্পর ড্রেসের সাথে মিলিয়ে আকাশি কালারের থ্রি-পিস, সে-ও হিজাব পরেছে; তাকেও বেশ সুন্দর লাগছে। আহনাফ দুজনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল— “মাশাআল্লাহ!” সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—

– “এতক্ষণ লাগে রেডি হতে? তাড়াতাড়ি আয়। আর দেরি করলে কিন্তু আমি নিয়ে যাব না!”
আহনাফের কথা শুনে সিমরান মনে মনে ভেংচি কাটল, পুষ্প কিছু বলল না। তিনজনে মিলে বেরিয়ে গেল। আহনাফ দুজনকে নিয়ে গেল দিয়াবাড়ি। সেখানে তিনজন অনেকক্ষণ ঘুরে ফুচকা, ঝালমুড়ি আর আইসক্রিম খেল, তারপর নৌকায় চড়ে লেকে ঘুরে বেড়াল।
মাগরিবের আজানের আগে আগে সিমরান আর পুষ্পকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে আহনাফ। এই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে আর্য, আর তার পাশে বসে আছে তার বন্ধু ইভান। হঠাৎ আর্যর চোখ যায় দরজার দিকে। চক্ষুযুগল পুষ্পর দিকে স্থির হতেই আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল! পুষ্প, সিমরান আর আহনাফ তিনজন হেসে হেসে কথা বলতে বলতে ভেতরে ঢুকছে। তিনজন এখনো আর্যদের খেয়াল করেনি।
হঠাৎ আর্যকে দেখেই পুষ্পর হাসি মিলিয়ে গেল, ভীত হলো রমণীর দৃষ্টি। সেটা দেখে আর্যর রাগ যেন সপ্তমে চড়ল! এতক্ষণ হেসে হেসে কথা বলছিল, আর তাকে দেখেই হাসি মিলিয়ে গেল কেন? সে কি যম? তাকে দেখে এত ভয় পেতে হবে কেন? নিজের রাগ সামলাতে সে হাত শক্ত মুঠো করে নিল।
এদিকে আর্যকে চুপ করে থাকতে দেখে ইভান আর্যকে ডাকে, কিন্তু আর্যর কোনো সাড়া নেই। ইভান আর্যর দিকে তাকিয়ে দেখল আর্যর চেহারায় রাগের ছাপ স্পষ্ট। ইভান আর্যর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই থমকে গেল! তার মুখ দিয়ে আপনা-আপনি বেরিয়ে এল— “মায়াবিনী!”
আহনাফ ইভানকে দেখা মাত্রই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল—

– “একী! ইভান ভাই, কী মনে করে হঠাৎ আজ আমাদের বাড়িতে?”
আহনাফের ডাকে ইভানের ঘোর কাটল। সে সিমরান আর পুষ্পর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আহনাফের দিকে তাকিয়ে বলল—
– “কেন, আসতে পারি না?”
– “আরে ভাই, আসতে পারবে না কেন! বলতে চাইছি তেমন একটা তো আসো না, আজ কী মনে করে আসলে?”
– “এমনি, সবার সাথে দেখা করতে আসলাম!”
আহনাফ গিয়ে ইভানের পাশে বসে টুকটাক গল্প করতে লাগল; কিন্তু ইভানের দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিমরান আর পুষ্পর দিকে। সিমরানও ঠিক চিনতে পারল না ইভানকে, কিন্তু অদ্ভুত এক ঘোর লাগা দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে ইভানের দিকে; মনে হচ্ছে খুব বড়সড় একটা ক্রাশ খেল ইভানের ওপর!
ওদিকে পুষ্প বেশ অস্বস্তি আর ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দেবে! তার ওপর অচেনা আরেকটা লোকও আছে। পুষ্প এবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিমরানের হাত টেনে বলল—

– “আপু, উপরে যাবে না?”
পুষ্পর ডাকে যেন সিমরানের ঘোর কাটল। সে তাড়াহুড়ো করে বলল—
– “হ্যাঁ হ্যাঁ, চল উপরে যাই।” মনে মনে বিড়বিড় করে বলল— ‘ছি ছি! আমি এতক্ষণ লোকটার দিকে কীভাবে তাকিয়ে ছিলাম নির্লজ্জের মতো! লোকটা কী ভাববে কে জানে!’
তাদের চলে যাওয়ার দিকে নিবদ্ধ রইল দুই জোড়া চোখ। দুজন ওপরে যেতেই ইভান আর্যকে জিজ্ঞেস করল—
– “আর্য, মেয়েটা কে? আগে তো দেখিনি?”
আর্য বুঝতে পারে ইভান পুষ্পর কথাই বলছে; কারণ সিমরানকে ইভান চেনে, সিমরান ইভানকে না চিনলেও। তবে এই মুহূর্তে পুষ্পকে নিয়ে কথা বলার কোনো ইচ্ছে নেই আর্যর। ওই স্টুপিড মেয়েটা সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলে, আর তাকে দেখেই হাসি গায়েব হয়ে যায়! মনে মনে ভাবতে ভাবতে তার রাগ যেন আরও বাড়ল। সে কিছু না বলে চুপ করে থাকল।
সেটা দেখে আহনাফের খুব রাগ হলো বড় ভাইয়ের ওপর। নিজের স্ত্রীর পরিচয় দিতে পারছে না! তার ভাই আসলেই কি এটা? যে আর্য ভাই মেয়েদের সম্মান করত, সে আজ নিজের স্ত্রীকে সম্মান করে না, বউ বলে পরিচয় দেয় না! আর্যকে চুপ থাকতে দেখে ইভান আবার জিজ্ঞেস করল—

– “কী হলো, বলছিস না কেন?”
আর্য এবার রেগে বলল—
– “কেউ না!”
সেটা শুনে ইভান কিছু বুঝতে পারল না। এদিকে আহনাফের বিষয়টা একদম ভালো লাগেনি। আর্য গটগট পায়ে ওপরে চলে গেল। আর্য চলে যেতেই ইভান আহনাফের দিকে তাকিয়ে বলল—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৬

– “কেউ না?”
আহনাফ ইভানের কৌতূহল বুঝতে পেরে বলল—
– “বড় মায়ের ভাইয়ের মেয়ে!”
তারপর দুজনে গল্প জুড়ে বসল। ইভান সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল—
– “মায়াবিনী, ফাইনালি তোমার চোখ পড়ল আমার ওপর!”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here