অবেলার প্রণয়ভেলা ঈদ স্পেশাল
ফাহিমা ইসলাম
রজনীর অন্তিম প্রহর ভেদ করে ধীরে ধীরেনউন্মোচিত হয়েছে ঈদের প্রভাত। পূর্বাকাশে সূর্যের নবজাত আভা যেন সোনালি মখমলের পরত বিছিয়ে দিয়েছে ধরণীর বুকে। বাতাসে মিশে আছে সেমাইয়ের মিষ্টি সুবাস, দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসছে তাকবিরের ধ্বনি। আজকের সকালটা অন্যরকম,অস্বাভাবিক রকম সুন্দর, অদ্ভুত রকম পরিপূর্ণ। তূর্ণা জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঈদের সূচনা হতে চলেছে আজ। সারাবাড়িতে ঈদের আমেজে মেতে আছে, সবাই নানা কাজে ব্যস্ত। বাড়ির বাহিরের কুরবানির গরু রয়েছে, তবে তূর্ণার সাহস হয়নি সেটা দেখতে যাওয়ার। সো ভীষণ ভয় পায় এইসবে, রোদেলা গরু আনার পর কয়েকবার দেখাও শেষ! এমনি গরুর পিঠেও উঠেছে মেয়েটা। ছেলেরা সবাই সকাল হতেই গোসল সেড়ে ঈদের নামাজের চলে গিয়েছে, বাড়ির সব মেয়েটা বাড়িতেই নামাজটা সেড়ে নিয়েছে।
সবাই গল্পে মশহুল, একপাশে দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণা। লাল টুকটুকে শাড়িতে তাকে মনে হচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার নিচে ফুটে থাকা কোনো রক্তিম পুষ্প। তার পাশেই লাল ফ্রক পরে টলমল পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে রোদেলা। মেয়েটা বড্ড খুশি ঈদ বলে, সারারাত জেগে থাকার বায়না সবার সঙ্গে। চাঁদরাতে সবাই মিলে ছাদে ছোটখাটো মেহেন্দি অনুষ্ঠান করেছে। বুঝ হওয়ার পর এটাই রোদেলা সবচেয়ে ভালো ঈদ বলে কথা। ছোট্ট দু’হাত ভড়ে মেহেন্দি দিয়েছে, বার বার সেটা সবাইকে দেখাচ্ছে। হাতে থাকা ছোট্ট ঘুঙ্গুর যুক্ত চুড়ি গুলো রিনরিন করে বেজে উঠচ্ছে। এরমধ্যেই ঈদের নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরলো সব পুরুষেরা। রোদেলা ছোট্ট পায়ে দৌড়ে গেলো তার তিন দাদার কাছে, গিয়েই বড় করে সালাম দিলো-
“ আততালামু আলাইতুম দাদু। আনায় তালামি দাউউ।”
রোদেলার কান্ড দেখে হেসে দিলো সবাই, রাশেদুল সিকদার নাতনিকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা দাদুর গলা জড়িয়ে আদুরে ভঙ্গিতে মাথা নাড়াচ্ছে।
“ দিদিভাইয়ের এখন সালামই চাই বুঝি? এত বড়ো হয়ে হয়ে গেছে আমার রোদ পাখি বুঝি?”
” হুম,অনেত বলো হয়েতি দাদু। তালামি দাও তো, আল দেখো তোমলা আমাল হাতে মেহেতি।”
বলেই নিজের মেহেদী রাঙা হাতটা তার তিনটা দাদুকে দেখাতে লাগলো। সবাই একে একে রোদেলাকে আদর দিয়ে, হাতে একহাজার করে নোট ধরিয়ে দিলো।
“ প্রতিবছর সালামিটার পরিমাণ বাড়বে দিদিভাই।”
রোদেলা তো সালামি পেয়ে বেজায় খুশি। সবাই ঘুরে ঘুরে তার সালামি দেখাচ্ছে। রোদেলার আনন্দ দেখে সবাই হেসে উঠলো, রোদেলা দৌড়ে এবার রৌদ্রিকের কাছে চলে গেলো। রৌদ্রিক হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়, রোদেলা পাপার বুকে মাথা দিয়ে বলে-
“ পাপা গলু যাবো, গলু যাবো!”
রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল-
“চলো, তোমাদের কাউকে দেখাই।”
তূর্ণার ভ্রু কুঁচকে গেল। কিন্তু কিছু বলার আগেই রোদেলা কোল থেকে তূর্ণার শাড়ির আঁচল আগলে নিলো নিজের হাতে। তারপর দু’জনকে নিয়ে এগিয়ে গেল বাগানের ফাঁকা জায়গাটায়। সেখানে বাঁধা ছিল বিশাল এক গরু। গরুটাকে দেখেই তূর্ণা থমকে দাঁড়ালো।
”এত… এত বড়!”
রৌদ্রিকের ঠোঁটে হাসি ফুটলো।
”ভয় পাচ্ছো?”
“না… মানে… একটু।”
রোদেলা হাততালি দিয়ে উঠলো।
“গললু! বলো গলললু!”
তার অস্পষ্ট উচ্চারণে দু’জনেই হেসে ফেললো। ।রৌদ্রিকে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে আজ অস্বাভাবিক সুদর্শন লাগছে। সকালের কোমল রৌদ্র এসে পড়েছে তার কাঁধে, যেন আলোরাই তাকে ঘিরে রেখেছে আপন মুগ্ধতায়। রৌদ্রিক তূর্ণার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিলো। তারপর ধীরে ধীরে গরুটার কাছে নিয়ে গেল।
”কিছু করবে না। দেখো, কী শান্ত ও।”
তূর্ণা অস্বস্তি নিয়ে মাথা নাড়লো। তবু তার সাহস হলো না, তাই রৌদ্রিকের পিছনে লুকিয়ে পরলো, রৌদ্রিকের পিঠ খামচে ধরে উঁকি দিলো গরুর দিকে। একবার কোরবানিতে রূপা তাকে ধাক্কা দিয়ে গরুর উপর ফেলে দিয়েছিলো। তখন গরুটা রেগে তাকে সিং দিয়ে আঘাত করেছিল, তারপর থেকে সে গরুর কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। তবুও এবার সাহস সঞ্চয় করে হাত বাড়াল। গরুর মাথায় আঙুল ছোঁয়াতেই প্রাণীটা ধীরেসুস্থে চোখ পিটপিট করলো। মুহূর্তেই তূর্ণার ভয় খানিকটা উবে গেল। রোদেলা এবার বাবার কোল থেকে ঝুঁকে গরুর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৭
“গলু.. আমি আদো কলবো!”
”আদর করবে? করো।”
রৌদ্রিক তার ছোট্ট হাতটা ধরে গরুর গায়ে ছুঁইয়ে দিলো। খিলখিল করে হেসে উঠলো রোদেলা। এই হাসি, তূর্ণার মুগ্ধ দৃষ্টি আর রৌদ্রিকের প্রশান্ত মুখাবয়বের দিকের, সবকিছু মিলিয়ে সময় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইলো। তূর্ণা চুপচাপ তাকিয়ে রইলো নিজের ছোট্ট পরিবারটার দিকে। এই মানুষ দু’টি, যে তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। ঈদের এই সোনালি সকাল। হঠাৎ করেই মনে হলো, সুখ আসলে খুব জটিল কিছু নয়। কখনো কখনো প্রিয় দুইটা হাতের উষ্ণতা আর এক টুকরো পরিবারের হাসিতেই সম্পূর্ণ হয়ে যায় একটা পৃথিবী। আর আজ, আজ সত্যিই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঈদ। এমন ঈদ সে কোনোদিন পেয়েছে জীবনে? কই তার স্মৃতির পাতায় এমন কোনো দৃশ্যই ভাসলো না, যেখানে সে এতটা সুখী রয়েছিল।
