অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৬
ফাহিমা ইসলাম
“ রৌদ্র আমি আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা করবো। যদি না কর তাহলে অন্য ব্যবস্থা করবো আমি।”
প্রীয়তির এই কথায় রৌদ্রিকের ভেতরে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না। বরং তার ফর্সা মুখশ্রী ধীরে ধীরে লালচে আভা ধারণ করল। চোখেমুখে নেমে এলো এক অদ্ভুত কঠোরতা। গুরুগম্ভীর, শীতল কণ্ঠে হুশিয়ারির স্বরে সে বলে উঠল-
“ কল মি রৌদ্রিক, নট রৌদ্র। এন্ড যা করার করে নাও, ভুলে যেও না ডিভোর্সের সময়ই ঠিক হয়ে গেছে। রোদেলার কাস্টেডি ওর পাঁচ বছর হলে আমার নিকটই আসবে। এটা তুমি তোমার স্বইচ্ছায় দিয়েছো।”
কথাগুলো যেন শিকলের মতো জড়িয়ে ধরল প্রীয়তিকে। চারদিক থেকে বাঁধা পড়ে গেল সে।
দুই মাসের সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে রেখে এসেছিল তারপর আর একবারও দেখেনি রোদেলাকে।
এখন কত বড় হয়েছে? কেমন দেখতে হয়েছে? হাসলে কেমন লাগে? কিছুই জানে না সে। তবুও দমে গেল না প্রীয়তি। গলা শুকিয়ে এসেছে তার, তবুও এক ঢোক লালা গিলে আবারও শক্ত কণ্ঠে বলল-
“ তো কি হয়েছে? কোর্ট থেকে এটাও বলেছেন মা চাইলে তার সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। আর এতে তুমি বা অন্যকেউ বাঁধা দিতে পারে না একদমই।”
রৌদ্রিকের ঠোঁটে ভেসে উঠল তাচ্ছিল্যের এক শীতল রেখা।
“ মা,সন্তান? রেয়ালি, জানো এইসবের মানে কি? মূল্য জানো এইসব সম্পর্কের তুমি? লিসেন তুমি সব রূপে বেস্ট হলেও আমার সন্তানের মা হওয়ার যোগ্যতা রাখো না। তাই এইসব আলগা দরদ নিজের কাছে রাখো। এবার আসতে পারো তুমি, দরজাটা ওইদিকে।”
ভীষণ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথাগুলো শেষ করল রৌদ্রিক। প্রীয়তি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এত অপমান, এর আগে কখনো সহ্য করতে হয়নি তাকে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল রৌদ্রিক কেমন মানুষ, সেটা তার অজানা নয়। তবুও আজকের এই নিষ্ঠুর ব্যবহার সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। কই, আগে তো এমন ছিল না সে! তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে বহু বছর হলো। মুখোমুখি হওয়াটাও খুব কমই হয়েছে তাদের। তবুও তূর্ণার সঙ্গে রৌদ্রিককে দেখার পর থেকে, না চাইতেও তার অন্তস্তলে জন্ম নিয়েছে এক অদ্ভুত ঈর্ষা… এক নিঃশব্দ জ্বালাপোড়া। রৌদ্রিকের মতো জীবনসঙ্গী এমন স্বপ্ন তো প্রায় সব মেয়েই দেখে। ছেলেটা সব দিক থেকেই নিখুঁত। তার ত্রুটিগুলোও তার ব্যক্তিত্বের কাছে ম্লান হয়ে যায়। প্রীয়তি চলে যেতেই সামির তাকাল রৌদ্রিকের দিকে। এখনো রাগে লাল হয়ে আছে তার ফর্সা মুখশ্রী।
“ প্রীয়তি আবার কবে থেকে রোদেলার জন্য এত দরদী হলো?”
রৌদ্রিক সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল-
“ আই ডোন্ট নো!”
গম্ভীরতা ভাঙল না তার কণ্ঠে। সামির আবার বলল-
“ তুই বিয়ে করেছিস ও সেটা বিশ্বাস করতে পারছে না। তার উপর তূর্ণার মত মেয়েকে বিয়ে করেছিস এটা মেনে নেওয়াও ওর কাছে দূষকর হয়ে গেছে।”
রৌদ্রিক কোনো উত্তর দিল না। এসব বিষয় সে কখনোই মাথায় নেয় না। তার জীবনে যে মানুষ একবার চলে যায় সে তার দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকানোয় না।সেখানে আবার প্রীয়তির সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা কথাবার্তা তা ভাবনাতেও আসে না। আর রইল রোদেলা, যে মানুষ তার জন্য আগে কখনো ভাবেনি তার হঠাৎ এই মায়া, এই টান রৌদ্রিকের কাছে তা নিছক অভিনয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
সন্ধ্যা একটি রুদ্ধশ্বাস অন্তর্বর্তীকাল, আলোর ক্ষীয়মাণ কণাগুলো ধীরে ধীরে বিলীন হতে হতে যেন অস্তিত্বের প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়, আর চারপাশে জন্ম নেয় এক অনির্ণেয় বিষণ্নতার আবরণ। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা রঙিন খেলনাগুলোর মাঝে বসে আছে রোদেলা। আর তার পাশে তূর্ণা, যার চোখে শিশুসুলভ সরলতা থাকলেও মনটা আটকে আছে এক অচেনা গোলকধাঁধায়। তবুও, তাদের দু’জনের মধ্যে অদ্ভুত এক বন্ধন, সম্পর্ক সবসময় যে রক্তের বন্ধন দিয়েই গড়ে ওঠে এমনটা নয়। কিছু সম্পর্ক থাকে যেগুলো নামহীন সম্পর্ক। এইগুলোর কোনো নাম নেই আছে শুধু একআকাশ ভালোবাসার হাতছানি। রোদেলা তার ছোট্ট হাত দিয়ে তূর্ণার আঙুল আঁকড়ে ধরে হাসছে, আর তূর্ণা সেই হাসির প্রতিধ্বনি অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের মতো করে অদ্ভুত শব্দ করছে। এই শব্দগুলো অর্থহীন হলেও অনুভূতিগুলো নিখাদ, অকৃত্রিম। খেলার ছলে হঠাৎ রোদেলা পাশের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। উপরের থাকা কিছু একটা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তূর্ণা সামনে থাকা খাতায় রংপেন্সিল দিয়ে আঁকাআঁকি করছে। যার কারণে রোদেলা কি করছে সেটা সে জানে না। রোদেলা টেবিলে থাকা বলটাকে নিতে চাচ্ছে, তবে তার ছোট্ট হাত সেখান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না একদমই। রোদেলা আর একটু উঁচু হতেই তার ছোট্ট পা হোঁচট খেয়ে কার্পেটের কিনারায়। মুহূর্তের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে গিয়ে সে সজোরে মেঝেতে পড়ে গেল। নরম দেহটা মেঝেতে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠল করুণ কান্না।
হঠাৎ এমন হওয়ায় তূর্ণা চট করে সেদিকে তাকালো। প্রথমে সে কিছু বুঝে উঠতে পারল না। কিছু সময় পেরোতেই হঠাৎ করেই সে রোদেলার দিকে এগিয়ে এসে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকে তুলতে গেল।কিন্তু তার অপ্রস্তুত, অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্পর্শে রোদেলার কান্না আরও বেড়ে গেল। তূর্ণা বুঝতে পারলো কি হয়েছে রোদেলার তাই আবারও রোদেলার দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে-
“ কি হয়েছে পুতুল? কাঁদো কেনো তুমি?”
রোদেলা জবাব দিলো না শুধু কান্না করে গেলো। তূর্ণা অসহায় ভাবে ক্রন্দনরত রোদেলাকে দেখছে। মুহুর্তের মধ্যেই ছোট্ট মুখখানি কেমন লালচে হয়ে গেছে কান্নার দাপটে। জবা সিকদার এইদিকেই আসচ্ছিলেন রোদেলাকে খাওয়ার জন্য। কান্নার শব্দ শুনে তড়িঘড়ি করে দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই জবা সিকদার চোখের সামনে দৃশ্যটা পড়তেই তার দৃষ্টি কঠোর হয়ে উঠল। রোদেলা মেঝেতে কাঁদছে, আর তূর্ণা তার ওপর ঝুঁকে অগোছালো, অসংলগ্ন অবস্থায়। এক মুহূর্তও দেরি করল না সে তাড়াতাড়ি এইদিকে এগিয়ে এসে রোদেলাকে নিজের কাছে টেনে নিলো। তারপর ক্রোধের ভরা নয়নে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করে-
“ কি করেছো ওর সাথে?”
তূর্ণা চমকে উঠল। তার চোখে ভয় আর অজ্ঞতার মিশ্র প্রতিফলন। জবা সিকদারকে এমন রাগতে দেখে, সে শুঁকনো ঢোক গিলে নিলো। জবা সিকদার তূর্ণাকে চুপ থাকতে দেখে আরও রেগে গেলো, সে এবার আরি শক্ত গলায় গর্জে উঠে বলে-
“তুমি আবার কী করছো বল! ও এখানে পরে আছে কেনো?”
তূর্ণা কিছু বলতে চাইল ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। তার চোখে জল জমতে শুরু করল, অথচ সে বুঝতে পারছে না তার অপরাধটা কোথায়? রোদেলার কান্না তখনও থামেনি। জবা সিকদার আরও কিন্তু কঠিন বাক্য উচ্চারণ করতে চাইলো, কিন্তু কিছু একটা মাথায় আসতে আর কিছু বললো না। রোদেলাকে কোলে নিয়ে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে ওঠে-
“ ওর থেকে দূরে থাকবে, যেদিন সুস্থ হবে সেদিন নাহয় ওকে নিজের কাছে নিও।”
বলেই তিনি রোদেলাকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। এইদিকে তূর্ণা স্তব্ধ হয়ে ঠায় সেখানে বসে রইলো। কি থেকে কি হয়ে গেলো সে বুঝলো না। তবে এতটুকু বুঝলো পঁচা শ্বাশুড়ি ভাবছে সে পুতুকে ব্যথা দিয়েছে। সঙ্গে তার পুতুলের কাছে যেতেও বারণ করে দিয়েছে। তূর্ণা কেঁদে দিলো এবার, সে তো কিছু করেনি। পঁচা শ্বাশুড়ি তাকে ভুল বুঝলো। এখন থেকে কি সে আর তার পুতুলকে কাছে পাবে না? ভাবতেই তূর্ণা ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে দিলো, সবাই কেনো তার সঙ্গে এমন করে? যাকেই সে একটু ভালোবাসে তারাই তার থেকে দূরে চলে যায়।
দরজার কপাটে ধাতব শব্দ তুলে ঘরে প্রবেশ করল রৌদ্রিক। ক্লান্তি তার দেহভঙ্গিতে স্পষ্ট, কিন্তু চোখদুটো তীক্ষ্ণ যেন প্রতিটি অস্বাভাবিকতার আভাস সে মুহূর্তেই ধরতে পারে। ভেতরে পা রাখতেই জবা সিকদারের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা আর ক্ষোভের মিশ্র বিস্ফোরণের সঙ্গে জানায় রোদেলা আঘাত পেয়েছে। কথাটা যেন বিদ্যুৎ চমকের মতো আঘাত করল রৌদ্রিকের চেতনাকে। ঘুমন্ত মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ভালো করে দেখলো। ব্যথা পাওয়ার জায়গাটা অনেকটা ফুলে গেছে। রৌদ্রিক উপরের উপরের শান্ত থাকলেও ভিতরে তার মনটা আনচান আনচান করছে।
“কীভাবে হলো?”
জবা সিকদারের মুখ গম্ভীরে সবকিছু জানালো। তার মতে তূর্ণার জন্যই নাকি এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সবকিছু শুনে এক মুহূর্তের জন্যও প্রতিক্রিয়া দেখাল না রৌদ্রিক। কিছু বললো না, জবা সিকদারের সঙ্গে কিছুস সময় কথা বলে, রোদেলাকে বুকে জড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। সে কোনোদিন একপাক্ষিক কথা বিশ্বাস করে না, এমনটা নয় যে সে তার মাকে অবিশ্বাস করছে, কারণটা মানুষ সবসময় চোখে যা দেখে সেটা সত্য নাও হতে পারে। সবকিছুরই দু’টো দিকে থাকে।আর তূর্ণাকে এই পর্যন্ত যতটুকু দেখেছে তূর্ণা যে আঘাত করার মত মেয়ে নয় সেটাও সে জানে। তূর্ণা রৌদ্রিক আর রোদেলাকে দেখে অশ্রুসিক্ত নয়নে সেদিকে তাকায়।
রুমের প্রবেশ মাত্রই রৌদ্রিক শান্ত চোখে তূর্ণার খোঁজ চালালো, আর পেয়েও গেলো। মেঝের কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তূর্ণা। তার ক্ষীণ দেহটা কাঁপছে, ভেজা চোখদুটো থেকে নিরবধি ঝরছে অশ্রু, ঠোঁট কাঁপছে অসংলগ্ন শব্দে। রৌদ্রিক থেমে গেল। তার গম্ভীর মুখাবয়বে এক ঝলক নরম ছায়া খেলে গেল। রৌদ্রিক রোদেলাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, ধীরে সে এগিয়ে গেলো তূর্ণার দিকে, হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তূর্ণার সামনে।
“তূর্ণা…”
কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত কোমলতা, যা সে খুব কমই প্রকাশ করে। তূর্ণা মাথা তুলল। শিশুসুলভ ভাঙা স্বরে বলতে শুরু করল-
“আমি, আমি কিছু করিনি বর। আমি পুতুলকে ধরতে গেছিলাম শুধু। আর কিছু করিনি,পঁচা শ্বাশুড়ি বললো আমাকে দূরে থাকতে পুতুলের থেকে। ”
প্রতিটি শব্দে ছিল আতঙ্ক, অপরাধবোধ আর এক নিখাদ ভালোবাসার আর্তি। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে, অত্যন্ত যত্নসহকারে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে-
“আমি জানি তুমি কিছু করনি। এবার ওঠ, কি অবস্থা করেছো নিজের। বলেছিনা সব কথায় কাঁদতে না, তুমি কিছু না করলে কাঁদছো কেনো? সবসময় কাঁদতে হয় না। কেনো সব সময় নিজের কান্নাকে নিজের দূর্বলতা বানাও তূর্ণা?”
তূর্ণা কিছু বললো না, এতক্ষণ ধরে সে রৌদ্রিকের আসারই অপেক্ষা করছিল। তূর্ণা নাক টেনে ভেজা গলায় বলে-
“ আপনিও কি বকবেন আমায় বর? আমি বুঝিনি পুতুল পরে যাবে। আমি তো রং দিয়ে আঁকছিলাম, তখনই পুতুল কান্না শুরু করলো।”
“ আচ্ছা ঠিক আছে যা হয়েছে সেটা আর ভাবতে হবে না। তোমার পুতুল তোমার সঙ্গেই থাকবে চিন্তা করনা।”
তূর্ণা হাত দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ আমি পুতুলের কাছে যাই? একটু ব্যথা দিবো না সত্যি, প্রমিজ বর!”
“ যাও কেউ কিছু বলবে না।”
তূর্ণা আর দেরি করলো না, উঠে সোজা রোদেলার কাছে চলে গেলো। ঘুমন্ত রোদেলার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় তারপর আস্তে করে রোদেলার ব্যথা পাওয়ায় জায়গায় আদর দিতে থাকে।
ব্যস্ত নগরী রোজকার নিয়মে সূর্য ওঠার পর থেকেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। চারিদিকে যেদিকেই নজর যায়, দেখতে পাওয়া যায় সকলেই নিজ কর্মে ব্যস্ত। কেউ বাইক নিয়ে ছুটে চলেছে, আবার কেউ রিক্সায় চড়ে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। আবার কেউ লোকাল বাসে আবার কেউ নিজস্ব প্রাইভেট কার নিয়ে ছুটে চলেছে। রেস্টুরেন্টের একসাইডে গম্ভীর মুখে বসে আছে রৌদ্রিক; সঙ্গে তার হসপিটালের বাকি মানুষরাও আছে। এখানে মেইলি কিছু কাজের জন্য আসা, সবাই এখানে এসেছে। রৌদ্রিক নিজের মত গম্ভীর ভাবে ফোনে মগ্ন সে। হুট করেই রৌদ্রিকের একজন কলিগ জিজ্ঞেস করে বসে-
“ ডঃ রৌদ্রিক, আপনার তো নতুন বিয়ে হয়েছে। হানিমুনে যাননি? না মানে বিয়ের দিনেও সার্জারীর জন্য এসেছিলেন।”
রৌদ্রিক ফোন থেকে মনোযোগ সরিয়ে সামনে বসা মাহিনের দিকে তাকালো। কিছুখন নিরব থেকে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ হুম, দরকার না হলে ছুটি কাটানোর মানে হয় না। আর জানেন তো মিস্টার চৌধুরী আমার পুরোনো পেশেন্ট। আর সেদিনই ছিল ওনার সার্জারী।”
“ তারপরও কাজের মাঝে নিজেকে একটু সময় দিতেই পারেন। হসপিটালে আপনিই সবচেয়ে ছুটি কম নেন, বলতে গেলে নেনই না। নতুন বিয়ে করেছে, এই সময়টা বউকে সময় দিন বেশি বেশি।”
রৌদ্রিক কিছু বললো না, আবারও নিজের মধ্যে ঢুবে গেলো। এইদিকে, রূপা তার বন্ধুদের সঙ্গে মাত্রই রেস্টুরেন্টের ঢুকেছে। অনেকদিন পর সবার সঙ্গে দেখা করছে, দুপুর টাইম হওয়ায় সবাই লাঞ্চের জন্য এখানে সবাই এসেছে। বেশ অনেকগুলো মানুষ হওয়ায় বড় টেবিলে গিয়ে সবাই মিলে বসে আছে।
“ তোরা বস আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসি।”
কথাটুকু বলেই রূপা ওয়াশরুমে চলে যায়। বেশকিছু সময় পর রূপা বাহিরে বের হতেই দূরের টেবিলের একসাইডে বসে থাকা রৌদ্রিকের উপর নজর যায়। রূপা প্রথমে চিনতে পারলো, কিন্তু তার বার বার মনে হচ্ছে সে চেনে এই লোককে। কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করতেই রূপার মনে পরে এটা রৌদ্রিক। সামনাসামনি দেখা না করলেও ছবিতে রৌদ্রিকে সে দেখেছে। রূপা রৌদ্রিক দেখে অবাকই হয়েছে, রৌদ্রিকে ছবিতে যতটুকু সুন্দর লাগে দেখতে সামনাসামনি তারচেয়েও বেশি সুন্দর। রূপা রৌদ্রিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাচ্ছিল, রৌদ্রিকের সঙ্গে যোগাযোগ করাট কোনো রাস্তাও তার কাছে ছিল না। রূপা নিজেকে আবারও একবার দেখে নিলো, এটাই সুযোগ রৌদ্রিকের সঙ্গে কথা বলার। রূপার বুক দুরুদুরু কাঁপছে! কয়েকবার ভাবলো যাবে না, কারণ সেখানে আরও অনেক মানুষ আছে। কিন্তু এখন না কথা বললে পরে আর সুযোগ পাবে না। রূপা রৌদ্রিকের টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে নিলে পিছন থেকে মিম ডেকে ওঠে-
“ কিরে আবার কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“ তোরা অর্ডার দে, আমি একজনের সঙ্গে কথা বলে আসচ্ছি।”
বলেই সেইদিকে চলে যায়। হুট করেই রৌদ্রিকের টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই সকলের দৃষ্টি গেলো রূপার, শুধু রৌদ্রিক ছাড়া। সে তার মত ফোনে মগ্ন, সেখানে উপস্থিত সকলেই রূপার দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ বুঝতে পারছে না রূপা কেনো এসেছে। সবার এইভাবে তাকানো দেখে রূপা অনেকটাই অসস্থিতে পড়ে যায়। তারপরও নিজেকে কোনো রকমে সামলিয়ে, শুঁকনো ঢোক গিলে নিলো। সেখানের মধ্যে একজন রূপার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ আপনি কাউকে কি খুঁজচ্ছেন?”
রূপা ঢোক গিলে৷ হালকা স্বরে বলে-
“ ডক্টর রৌদ্রিকের সঙ্গে কিছু কথা ছিলো।’’
এতক্ষণে রৌদ্রিক মাথা তুলে তাকালো, তাও নিজের নাম অপরিচিত কারো মুখে শুনে। রৌদ্রিক ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে এলো রূপাকে দেখে, চিনলো না সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটাকে। রূপা আবারও শুঁকনো ঢোক গিলে কোনো রকমে রৌদ্রিকের উদ্দেশ্যে বলে-
“ আপনার সঙ্গে কিছু কথা আছে। প্লিজ কিছু সময়ের জন্য আসবেন। এখানেই এই পাশের টেবিলে।”
সবাই এবার একবার রৌদ্রিক আর রূপার দিকে তাকাচ্ছে। সবার মাঝেই চাপা উত্তেজনা বিদ্যমান। রৌদ্রিক কিছু বলার আগেই হসপিটালের ডোনার বলে-
“ রৌদ্রিক তোমার পরিচিত কেউ হলে যাও কথা বলে আসো। আমরা এখানেই আছি, যাও সমস্যা নেই।”
রৌদ্রিক রূপাকে চেনে না, ভেবেছিল না করবে। পরমুহূর্তে ডোনারের কথা শুনে একনজর রূপার দিকে তাকালো, রূপা ইশারা দ্বারা অনুরোধ করছে আসার জন্য। রৌদ্রিক রাজি হলো, রৌদ্রিক রাজি হতেই রূপা খুশি হয়ে গেলো। রূপা আর রৌদ্রিক পাশের একটা খালি টেবিলে বসে পরলো। রূপা হাত কচলাতে কচলাতে বলে ওঠে-
“ আমি রূপা, আপনার সঙ্গেই আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।”
রপার কথা শুনে রৌদ্রিক বুঝতে পারলো এটা রূপা। তবে তার মুখে অভিব্যক্তির পরিবর্তন এলো না, বরং আগের থেকেও গম্ভীর হয়ে এলো। রূপা ঢোক গিলে আবারও বলে ওঠে-
“ আসলে কিভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা। আমি যেটা করেছি সেটা জন্য আমি লজ্জিত! বলাটা ঠিক হচ্ছে না, আমার জন্য আপনাকে আমার পাগল বোনকে বিয়ে করতে হলো। আমি সত্যি…
রূপা তার বাক্যটা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই রৌদ্রিক তার গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলে ওঠে-
“ মাইন্ড ইউর ওয়ার্ড মিস ওর মিসেস। আপনার বোন হোক কিংবা না হোক, সেটা আমার জানার বিষয় না। বাট সি ইজ মাই ওয়াইফ সো তাকে রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলুন।”
রূপা একটু হকচকিয়ে গেলো রৌদ্রিকের এমন কথায়। ভেবেছিল লোকটা তার এমন কথায় হয়তো তার পক্ষই নিবো, কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রামণ করে দিলো রৌদ্রিক।
“ আ’ম সরি, আসলে আমি ওইভাবে বলতে চাইনি। আসলে আমার জন্য আপনার জীবনট এমন হয়ে গেলো, তারজন্য আমি খুবই লজ্জিত! আর আমার এমনট করা উচিত হয়নি। আপনাকে এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো, বাবা এমনট করবে আমি জানতাম না।”
রৌদ্রিক হয়তো বিরক্ত হলো। তারপরও ধৈর্য সহকারে সবটা শুনলো, রূপা কিছু সময় থেমে বড় একটা নিশ্বাস টেনে নিলো। সেটা এখন যা বলবে, তারজন্য রৌদ্রিক কেমন প্রতিক্রিয়া করবে সেটা তার জানা নেই। তারপরও সাহস যুগিয়ে বলা শুরু করে-
“ আপনার সঙ্গে যা হয়েছে সেটা একদমই ঠিক হয়নি। আর আমি যা করেছি সেটা একদমই ঠিক হয়নি, আসলে আমার তখন মাথা কাজ করছিলনা। তাই কি থেকে কি করে বসেছি নিজেও জানি না। যদি আপনি আমায় আর একট সুযোগ দিতেন নতুন করে সবকিছু শুরু করার।”
রৌদ্রিকের এতক্ষণ নিজের মধ্যে থাকা বিরক্ত ভাবটা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলো না। কিন্তু রূপার শেষের কথাটুকু শুনে মুখশ্রী কঠোর হয়ে এলো। ভদ্রতার বজায় রেখে রাগ মিশ্রিত স্বরে বলে-
“ লিসেন মিস ওর মিসেস, এই রৌদ্রিক তার জীবনে একবার ফেলে আসা জিনিসকে দ্বিতীয়বার কুড়িয়ে নিজের কাছে ফিরে আনে না। আপনি হলেন সেই জিনিস, আপনার সঙ্গে আমার তেমন কোনো পরিচিত নেই। যদি ভাগ্যক্রমে আজ আপনি আমার স্ত্রী হতেন তখন বিষয়টা অন্যরকম হতো। আপনি এই মুহুর্তে আমার স্ত্রীকে নিয়ে কথা বলছেন। আর বিয়েটা যেভাবেই হোক আমি তাকে মেনে নিয়েছি, তাই তাকে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। যদি কোনোদিন চায় সে আমার সঙ্গে থাকতে চায় না, তখন সেটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার হবে। আর আপনি কিসের ভিত্তিতে সুযোগ চাচ্ছেন? আপনার সঙ্গে শুরু থেকেই আমার কিছুই ছিল না, তাহলে সেখানে সুযোগ দাওয়ার প্রশ্ন আসে কোথা থেকে? আর আপনি যেটা বলতে চাচ্ছেন সেটা সম্ভব নয়। আর আমি আমার ওয়াইফকে ছাড়বো নাকি ছাড়বো না সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি তাকে তার সব অবস্থায় মেনে নিয়েছি, সে যদি এখন পঙ্গুও হয় তাহলেও সে আমারই থাকবে। যে জিনিস একবার আমার নামের নিলাম হয়ে যায়, সেটা আমার অনুমতি ব্যতীত মুক্তি পায় না। আসচ্ছি, ভালো থাকবেন আর দ্বিতীয়বার আমার সামনে আসার দুঃসাহস করবেন না।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৫
বলেই রৌদ্রিক সেখান থেকে উঠে চলে যায়। রূপা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো, সে সত্যি ই বিশ্বাস করতে পারছে না রৌদ্রিক তূর্ণাকে মেনে নিয়েছে। নিজের প্রতি বড্ড রাগ লাগলো রূপার, এমন একটা মানুষকে ফেলে সে একটা ঠকবাজের হাত ধরে পালিয়েছিল। যদি সেদিন ওমন ভুলটা না করলো তাহলে আজকে এই মানুষটা তার হতো। রৌদ্রিক যদি তূর্ণার মত মেয়েকে নিয়ে এতটা পজেসিভ হয়, তাহলে তাকে তো আরও বেশি ভালোবাসতো। কিন্তু হারিয়ে ফেলার পর আফসোস করে লাভ কি? কথায় আছে, মানুষ হারিয়ে ফেললে সেটার মূল্য বুঝতে পারে। এরজন্যই বলে দাঁত থাকতে দাঁতে মূল্য দিতে হয়।
