অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২২ (২)
ফাহিমা ইসলাম
দিবাকল যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এক অদৃশ্য অন্তরালে আশ্রয় নিয়েছে। প্রকৃত বৃষ্টিকন্যা সেজেছে, নিজেকে ভিজিয়ে তুলেছে এক অতুলনীয় সাজে। কয়েকদিন ধরেই রৌদ্রময় আবহাওয়া যেনো নুইয়ে পরে, বর্ষার কোলে ঢলে পরেছে। স্নিগ্ধ দমকা হওয়ায় মুখরিত পরিবেশ। সামনের আয়নায়র সামনে দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে ব্যস্ত তূর্ণা। তার ক্ষীণ দেহখানা ঢেকে আছে এক বিশাল সাদা এপ্রোন, যেটা রৌদ্রিকের। এপ্রোনটা তার শরীরে যেন পোশাক নয়, বরং এক অচেনা ভালো লাগা । হাতার প্রান্তগুলো আঙুলের অনেক নিচে নেমে এসেছে, কাঁধের গঠন বেমানানভাবে ঝুলে পড়েছে। প্রায় পায়ের হাঁটুর নিচ অব্দি গড়িয়েছে এপ্রোণটা। তবুও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তূর্ণা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন সে কোনো মহার্ঘ অলংকারে
সজ্জিত।
“আমি ডাক্তার।’”
তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত গর্ব মিশে আছে, সে নিজের গালে আলতো চাপ দেয়, তারপর হঠাৎ করে ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলে।
“না, আমি ডাক্তার না, আমি বরের ডাক্তার।”
শব্দগুলো উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তার চোখে এক ঝলক উজ্জ্বলতা খেলে গেলো,লজ্জায় লাল আণা ছড়িয়ে পরলো গাল জুড়ে। এই পরিচয়টাই তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তূর্ণার লজ্জার মাঝেই অস্পষ্ট, মিষ্টি আধো স্বর কর্ণকুহরে এসে বারি খেলো তূর্ণা।
“মা…!”
দরজার কোণ থেকে উঁকি দেয় এক ক্ষুদ্র অবয়ব রোদেলা। রোদেলার হালকা কোকড়ালো চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধা। তার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে আছে।
“তুনি… তুনি ক্যানো পাপার জামা পইছো?”
তূর্ণা ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্তি ভেসে ওঠে, কয়েকদিন ধরে তার নজর পরেছে এই এপ্রোণের উপর। এই কয়েকদিন সাহস জুগিয়ে আজকে নিয়ে গায়ে জড়িয়েছে এটা। তূর্ণা তাড়াতাড়ি করে রোদেলাকে বিছানার উপরে বসিয়ে দেশ তারপর হঠাৎ করে সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে রোদেলার সামনে।
“শ্শ্… চুপ…”
সে আঙুল ঠোঁটে চেপে ধরে ফিসফিস করে-
“আমি এখন ডাক্তার… রোগী কথা বলে না…”
রোদেলা ভুরু কুঁচকে ফেলে, ছোট্ট মাথাটা কাত করে কিছুক্ষণ ভাবে, তারপর গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে-
“আমি রোগী না… আমি তো পুতুল।”
বলেই দারুন প্রাণভরা হাসি দেয় রোদেলা। তূর্ণার চোখদুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে রোদেলার গাল আলতো করে চেপে ধরে আদুরে গলায় বলে-
“হ্যাঁ… আমার পুতুল,আমার নরম পুতুল।”
তূর্ণার কথা শুনে রোদেলা মৃদু হেসে তূর্ণার এপ্রোনের কোণা ধরে টান দেয়-
“ডাতাল মা… আমায় ইনজেকসান দিবা?”
তূর্ণা হঠাৎ চমকে ওঠে, মাথা নেড়ে জোরে জোরে না বলতে থাকে-
“না! না! ইনজেকশন ব্যথা দেয়,আমার পুতুল কাঁদবে!”
তার কণ্ঠে আতঙ্কের সুর, যেন ব্যথাটা সে নিজেই অনুভব করছে। রোদেলা এবার ঠোঁট গোল করে,মাথা কাত করে অভিমানী স্বরে বলে-
“আমি কাঁতবো না… আমি ব্রেব গার্ল…”
তূর্ণা থমকে যায়। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকে রোদেলার দিকে, তারপর ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়।
“না তুমি ব্রেভ না তুমি নরম, খুব নরম। ব্যথা পাবে, ওইসব পঁচা জিনিস দিতে নেই।”
রোদেলা মানলো তূর্ণার কথা, রোদেলা তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে তূর্ণার ললাটের উপর আচঁড়ে পরা বেবি হেয়ারগুলো সুন্দর করে কানে গুজিয়ে দিলো। এতে করে তূর্ণার খুশি হলো, আদর করে দিলো রোদেলাকে। তূর্ণার আজ-কাল খুব ইচ্ছে করে রৌদ্রিকের কাছে কাছে থাকতে। মানুষটাকে যখনই কাছে পায় একদম পিছু ছাড়ে না। যতক্ষণ বাড়িতে রৌদ্রিক উপস্থিত থাকে, ততক্ষণ সে রোদেলাকে নিয়ে রুম থেকে বেরই হয়। তার ইচ্ছে করে সর্বদা রৌদ্রিকের আশেপাশে থাকতে, রৌদ্রিকেট সান্নিধ্যে সে আলাদা এক সুখ পায়।
“ তুনি অনেত তুন্দল মা!”
বলেই মিষ্টি স্বরে হেসে ফেলে রোদেলা। রোদেলার কথা শুনে না চাইতেও তূর্ণার লজ্জা লাগলো, সঙ্গে ভীষণ রকমে ভালো লাগা ছেয়ে গেলো। রোদেলাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে, আদর করতে করতে বলে-
“ না আমার পুতুল বেশি সুন্দর। একদম ফুলের মত।”
“ ই না! না! না, মা বেতি তুন্দল।”
রোদেলা কিছু সময় পর তূর্ণার পরণের সাদা এপ্রোণের দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে-
“ আনিও পরবো মা।”
রোদেলার কথা শুনে তূর্ণার উঠে আলমারি থেকে আর একটা এপ্রোণ নামালো। সেটা এনে রোদেলা গায়ে পরিয়ে দিয়ে তূর্ণা ভালো ভাবে রোদেলাকে খেয়াল করে, হাসিতে ফেটে পরে। তূর্ণার হাসির কলকলধ্বনিতে সারা কক্ষ মুখরিত হয়ে উঠলো। রৌদ্রিকের এপ্রোণটা তূর্ণারই হাঁটুর নিচ অব্দি ছুঁইয়ে যাচ্ছে, সেখানের রোদেলা তো তার থেকে আরও ছোট। যা দরুদ রোদেলার গা থেকে এপ্রোণটা একপ্রকার খুলে আসতে চাইছে। মনে হচ্ছে বিশাল বড় কাপড়ের মাঝে রোদেলাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তূর্ণাকে হাসতে দেখে রোদেলা গাল ফুলালো, তারপর অভিমানী স্বরে বলে-
“ মা হাতো কেনো?”
তূর্ণা কোনো রকমে হাসি থামিয়ে রোদেলাকে জড়িয়ে বলে-
“ তূর্ণার খুব সরি পুতুল। তোমার গায়ে তো এটা হচ্ছেই না, বর তো ইয়া বড়। তাই তোমার গায়ে লাগছেই না এটা।”
তূর্ণার কথা শুনে রোদেলা ঠোঁট উল্টিয়ে মন খারাপ করে বলে-
“ আনি কি ডাতাল হবো না?”
“ হবে তো সোনা। অনেক বড় ডাক্তার হবে তুমিও বরের মত।”
দরজার প্রান্তে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রৌদ্রিক নিঃশব্দে, অথচ তার নীরবতার ভেতরেই যেন বহমান ছিল অগণিত অনুচ্চারিত শব্দের ঢেউ। দৃষ্টির নিবিড় স্থিরতায় সে অবলোকন করছিল সামনে উদ্ভাসিত এক অদ্ভুত দৃশ্য। যেখানে বাস্তবতার কঠোর কাঠামো ভেঙে গিয়ে জন্ম নিয়েছে এক নির্মল, শিশুসুলভ বিভ্রম। তার গম্ভীর চাহনির অন্তরালে এক অচেনা কোমলতা সঞ্চারিত হয়েছে। ঠোঁটের রেখা অটল, মুখাবয়ব অনড়,কিন্তু চোখের গভীরে অদৃশ্য এক তরঙ্গ খেলে যাচ্ছিল, যা শুধুমাত্র সে নিজেই অনুভব করতে সক্ষম। রাত চারটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছি হসপিটালে, এই দুপুরে ফিরে এসেছে। আর আসা মাত্রই তূর্ণা আর রোদেলার কার্যকলাপ পরিলক্ষণ করছিল এত সময় ধরে।
রৌদ্রিক অত্যন্ত ধীরে সে দরজার ফ্রেম থেকে সরে এল, কিন্তু পদক্ষেপের শব্দকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করল যেন এই মুহূর্তের উপর কোনো প্রকার আঘাত না হানে।
“ আনি ইনজেকসান দিবো কিন্তু।”
রোদেলার কণ্ঠ আবার ভেসে এলো। রৌদ্রিকের দৃষ্টি এবার স্থির হলো নিজের কন্যার উপর। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, বরং এক গভীর, নিশ্চুপ স্নেহের উপস্থিতি। এই মেয়েটা তার সমস্ত বিশৃঙ্খল জীবনের একমাত্র সুসংগঠিত সত্য। সে কয়েক পা এগিয়ে এলো। রোদেলাকে রৌদ্রিককে দেখা মাত্রই মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল-
“পাপা!”
সে দৌড়ে এসে রৌদ্রিকের পায়ে জড়িয়ে ধরল। রৌদ্রিক স্বভাবসিদ্ধ স্থিরতায় নিচু হয়ে তাকে তুলে নিল বুকে, তূর্ণা চমকে পিছন ফিরতেই রৌদ্রিকের উপস্থিত দেখে কিছুটা মিইয়ে যায়। হাত কচলাতে শুরু করেছে আপনাআপনি! ভয়ে ঘনঘন আঁখি পল্লন ওঠানামা করছে দ্রুতশ গতিতে।
“তুমি কাঁদবে না তো?”
রৌদ্রিক মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল। রোদেলা গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল-
“আমি ব্রেব গার্ল!”
এক মুহূর্তের জন্য রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে প্রায় অদৃশ্য এক হাসির রেখা ফুটে উঠল। তারপর দৃষ্টি সরল তূর্ণার দিকে। তূর্ণা তখনো এপ্রোনে মোড়া, দুহাত বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে যেন ধরা পড়েছে এক অদ্ভুত দ্বিধা।ভয়, অপরাধবোধ, আর কোথাও এক শিশুসুলভ প্রত্যাশা। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে । তার দৃষ্টি নেই কঠোর ,নেই প্রশ্নবিদ্ধ, শান্ত দৃষ্টিতে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে। তূর্ণা হঠাৎ করে কেঁপে উঠল, দুহাত দিয়ে এপ্রোন আঁকড়ে ধরল আরও শক্ত করে-
“আমি… আমি নষ্ট করি নি…”
কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে আতঙ্কের ছায়া। রৌদ্রিকে হাসি পেলো বটে, তবে সে হাসলো না। বরং সে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। রোদেলাকে এক হাতে ধরে রেখেই অন্য হাত বাড়িয়ে এপ্রোনের ভাঁজ ঠিক করে দিল অত্যন্ত যত্নে, যেন কোনো মূল্যবান বস্তু স্পর্শ করছে।
“আমি তো বলিনি তুমি নষ্ট করেছো।”
নিচু, প্রশান্ত স্বরে বলে ওঠে রৌদ্রিকর। তূর্ণা স্থির হয়ে গেল। তার দৃষ্টি রৌদ্রিকের চোখে আবদ্ধ হয়ে রইল। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল, তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল-
“তবে এটা তোমার মাপে না, তোমাকে এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
এই সরল বাক্যের ভেতর লুকিয়ে ছিল অদ্ভুত এক কোমল রসিকতা, যা তূর্ণার বিভ্রান্ত মনেও ধীরে ধীরে গলে গেল। রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠল-
“মা ছোট!”
তূর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে নিজের হাত দুটো ছেড়ে দিল। এপ্রোনটা আলগা হয়ে ঝুলে পড়ল শরীরে।
“আমি… ছোট না।”
সে আস্তে করে বলল, কিন্তু কণ্ঠে আর আগের আতঙ্ক নেই বরং এক শিশুসুলভ অভিমান জমে আছে। রৌদ্রিকের পাশে দাঁড়ালে সে কোনো রকমে রৌদ্রিকের বুক অব্দি ঠাঁই পায়। তূর্ণা নিজ থেকে হালকা পা উঁচু করলো, যাতে আর একটু লম্বা লাগে। সেটা দেখে রৌদ্রিক এবার রোদেলাকে বিছানায় নামিয়ে দিল, তারপর দুই পা এগিয়ে এসে তূর্ণার সামনে দাঁড়াল। এক মুহূর্তের জন্য দুজনের মাঝে নিঃশব্দতা নেমে এসেছে। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে অধর জোড়া হালকা বাকিয়ে হাসলো বোধহয়। হুট করেই হালকা ঝুঁকে তার মুখাবয়ব তূর্ণার অতি নিকটে আনলো। তারপর তূর্ণার ভরকিত পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ছোট না খালি স্বামীর বুক বরাবরই হয়েছে এতেই চলবে। আর লম্বা হতে হবে না, এত লম্বা বউ আমার আবার দরকার নেই। তোমার মত হলেই হবে।”
রৌদ্রিকের এমন কথা শুনে না চাইতেও তূর্ণার গাল গরম হয়ে এলো। দৃষ্টি নত করে ফেললো মুহুর্তেই, হাত কচলানোর গতি বেড়ে গিয়েছে। রৌদ্রিক ঠিক হয়ে দাঁড়ালো। তূর্ণার আঁড়চোখে চাইলো রৌদ্রিকের দিকে। রৌদ্রিক কেমন নির্দ্বিধায় তাকিয়ে আছে তার দিকে যেনো কিছুই হয়নি। তূর্ণা আর দাঁড়ালো না ছুটে চলে গেলো অন্যদিকে, রোদেলা কি বুঝলো কে জানে। সে খিলখিল করে হেসে উঠে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ মা লত্তা পায়, লত্তা পায়।”
রৌদ্রিক আবারও মেয়েকে কোলে নিলো। আস্তে করে তার ললাটে চুমু এঁকে দিয়ে বলে-
“ তাই বুঝি? লজ্জা পাচ্ছে সে?”
“ হ্যাঁ, মা’ল গাল লাল হয়ে গেতে একদম।”
রৌদ্রিকের মেয়ের কথায় আর কিছু বললো না। কিছু সময় রোদেলার সঙ্গে সেইভাবেই কাটালো।
ঘাসে ঢাকা নরম মাটির বুকে বিকেলের শেষ মৃদুনআলোটা ধীরে ধীরে গলে পড়ছিল। এক অদ্ভুত সোনালি-ধূসর বিষণ্নতায় চারপাশকে মুড়ে রেখে। বাগানে একদিকে রৌদ্রিক বসে আছে অচঞ্চল, অটল পাথরের মতো। দৃষ্টি স্থির তার বইয়ের ভাঁজে, অথচ মন অস্থিরতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। দুপুরেট পর আর বাড়ির বাহিরে বের হয়নি সে, বিকেল হতেই তূর্ণা আর রোদেলার জোরাজুরিতে বাগানে এসেছে। রৌদ্রিক নিজের মত করে, ঘাসের উপর আধশোয়া হয়ে বই পরতে ব্যস্ত। অন্যদিকে তূর্ণা, রিনি, রোদেলা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ করেই, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, তূর্ণা এসে পড়লো তার খুব কাছে। এতটাই কাছে, যে তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের ত্বকে স্পর্শ রেখে যাচ্ছিল। নরম ঘাসের উপর আধশোয়া অবস্থায় রৌদ্রিকের বুকের ওপর ঝুঁকে পড়লো সে,ঠিক যেন কোনো শিশুসুলভ আকুলতা তাকে টেনে এনেছে এখানে। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় রৌদ্রিক থমকে গেছে।
তূর্ণার কেশরাশি এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে রৌদ্রিকের কাঁধে। চোখদুটো অদ্ভুত উজ্জ্বল, নিষ্পাপ । তূর্ণা মৃদু হেসে, কৌতূহলী শিশুর মতো তার গাল স্পর্শ করলো আঙুলের ডগা দ্বারা।
“আপনি এত সুন্দর কেনো বর?”
নিষ্পাপ, নির্লজ্জ সরলতায় মিশানো শব্দগুলো রৌদ্রিকের কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল সবকিছু। তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু টানটান হয়ে উঠলো, যেন অদৃশ্য কোনো বজ্রপাত আঘাত হেনেছে তার ভেতরে। তার অতি নিকটে আসা অপরূপা অষ্টাদশী রয়েছে, যেকিনা তার ঢেউ খেলানো কাজলদিঘী চক্ষু মেলে তার দিকে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে আছে। রৌদ্রিক তার সামনে থাকা অষ্টাদশীর উপর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইল এই বিপজ্জনক নৈকট্য থেকে,কিন্তু পারলো না। কারণ তার বুকের ঠিক উপরেই মাথা রেখে বসে আছে তূর্ণা স্বচ্ছ মায়াবী এক প্রাণ। তার ভেতরে তখন শুরু হলো এক প্রচণ্ড ঝড়।
“এটা ভুল, সম্পূর্ণ ভুল! এই অনুভূতি থাকা উচিত নয়। তবু কেনো এই অনুভূতির আগমন?”
নিজের মধ্যে বাক্যগুলো আওড়ালো তবে জবাব মিললো না নিজের কাছেই। নিজেকে বোঝাতে লাগলো আবারও সে। কিন্তু তার হৃদস্পন্দন যেন সেই যুক্তিকে উপহাস করছে বার বার। তূর্ণার আঙুল এখনও তার গালের ওপর, অযত্নে আঁকিবুঁকি কাটছে। তার চোখদুটো নিবদ্ধ রৌদ্রিকের চোখে এমন এক দৃষ্টিতে, যেখানে একরাশ মুগ্ধতা, ভালোবাসা,ভালো লাগা মিশে আছে। কই আগেও কতবার এমন বহু দৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত রৌদ্রিক, সেই দৃষ্টি গুলো খুব সহজেই সে উপেক্ষা করে চলে এসেছে। তবে এই দৃষ্টি উপেক্ষা করা কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না তার দ্বারা। রৌদ্রিক ধীরে চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্তের জন্য। কারণ সে খুব করে অনুভব করতে পারছে, তার কঠোর, শুষ্ক অন্তরের কোথাও যেন হালকা করে একটা ফাটল ধরেছে। একটা নরম, উষ্ণ স্রোত সেখানে প্রবেশ করতে চাইছে যার নাম সে জানে না, কিংবা জানতে চায় না। রৌদ্রিক নিজেকে ঠিক রেখে শান্ত স্বরে বলে-
“তূর্ণা… সরো।”
কিন্তু সেই কণ্ঠে লুকিয়ে ছিল না কোনো রাগ, না কোনো কঠোরতা। বরং ছিল এক অদ্ভুত কম্পন, যা সে নিজেই চিনতে পারলো না। তূর্ণা একটু কাত হয়ে তাকালো, যেন বুঝতেই পারছে না সে কেন সরে যাবে। তার ঠোঁটে আবার সেই শিশুসুলভ হাসি-
“না… ভালো লাগছে।”
এই সরল স্বীকারোক্তি যেন রৌদ্রিকের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে দিলো এক নিমেষে। সে আর কিছু বললো না। কারণ সে জানে, এই মেয়েটা বোঝে না সমাজ, বোঝে না নিয়ম, বোঝে না সম্পর্কের জটিলতা। রৌদ্রিক অন্যদিকে তাকাতেই দেখতে পেলো রিনি হেসে রোদেলাকে নিয়ে ভিতরে চলে গেছে, এই মুহুর্তে এইখানে শুধু সে আর তূর্ণাই উপস্থিত। হঠাৎ তূর্ণা এতটা সাহসী হলো কিভাবে? এই মেয়ে একা একা এত সাহস নিয়ে তার এত সান্নিধ্যে আসবে নিশ্চয়ই। জানা আছে তার, রৌদ্রিক তূর্ণার মুখ পানে চেয়ে বলে-
“ ভয় লাগছে না তোমার? যদি রেগে মা*র দেই তখন কি করবে?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা হেসে দিলো। লজ্জায় তার কান আবারও গরম হয়ে এলো, দৃষ্টি লুকানোর চেষ্টা করে বলে-
“ আপনি রেগে গেলে আপনাকে আরও সুন্দর লাগে বর। আমি জানি তো তূর্ণার বর তূর্ণাকে মা-রবে না। তাই ভয় পাবো কেনো?”
তূর্ণার এমন কথা শুনে রৌদ্রিক তার ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে আনলো।
“ বাবাহ! এত কথা শিখে গেছো। কে বলেছে মা-রবো না? যদি মে-রে দেই তখন কিন্তু কাঁদতে হবে।”
শান্ত স্বরে হুমকি দিয়ে বললো রৌদ্রিক। তূর্ণা হালকা মুখ বাঁকাল, তারপর দৃষ্টি পাকিয়ে বলে-
“ ইসস! বললেই হলো বুঝি। তূর্ণা এখন বড় মেয়ে, বরের বউ হয়ে গেছি। তাই তূর্ণা আর কাঁদে না হুম!”
“ তাই বুঝি? খুব বড় হয়ে গেছো? তাহলে একটু মা-রি দেখি তূর্ণা কতটা বড় হয়ে গেছে।”
“ ইইয় না বর! এটা ঠিক না কিন্তু।”
“ এটা ঠিক নয় অথচ তুমি এইভাবে কাছে এসে আমার শ্বাসরোধ করছে সেটা ঠিক। ভেরি ব্যাড তূর্ণা, আমি কষ্ট পেলাম খুব।”
রৌদ্রিকের এমন কথা শুনে তূর্ণা তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে বসলো। বিচলিত হয়ে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আমি কি খুব বেশি কষ্ট দিয়েছি বর? বিশ্বাস করুন রিনি বললো আপনার কাছে এইভাবে আসলো, আপনি আদর করবে। তাই তো তূর্ণা এইভাবে এলাম। খুব সরি বর!”
অপরাধবোধ নুইয়ে পরলো তূর্ণা। রৌদ্রিক এবার উঠে বসলো, সে জানতো এই মেয়ে একা এত বড় কাজ করবে না। রৌদ্রিক হালকা ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলে-
“ আদর যাচ্ছো? আদর দিয়ে কি হয়?”
“ ইয়ে মা আপনি সেটাও জানে না বর? আদর দিলে পুতুল আসবে আমার কাছে। আদর মানে তো চুমু। চুমু খেলে পুতুল আমার পেটে এসে পরবে আবারও।”
তূর্ণার এমন যুক্তি দেখে রৌদ্রিক ঠোঁট কামড়িয়ে হাসি আটকালো।।তূর্ণা কপালে হালকা টোকা দিয়ে বলে-
“ এতটুকুনি মেয়ে অথচ আমার রোদকে পেটে নিতে চাও? তোমার পেটে আঁটবে ও?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা গাল ফোলালো। মুখ বাঁকিয়ে বলে-
“ কেনো আটবে না? বাবু আবার হলে তো এতুটুকু হয়ে বের হয়, লাগলে ইয়া বড় পেট বানাবো।”
রৌদ্রিক আর লাগলো না তূর্ণার যুক্তির সঙ্গে। চারিদিকে শীতল হাওয়া বইছে, হয়তো রাত নামতেই বৃষ্টি হবে। আকাশ কেমন মেঘলা হয়ে আছে, বাতাসের সঙ্গে ছোট ছোট পানির ফোঁটা স্পর্শ করছে গোটা ধরণী।
“ ভিতরে চল, বৃষ্টি আসবে।”
রাতের আকাশ জুারে বৃষ্টি নেমেছে, তবে তা কোনো কোমল স্নিগ্ধতার বাহক নয়; বরং প্রতিটি ফোঁটা যেন আঘাতের মতো এসে আচঁড়ে পড়ছে, কিছুকে মুছে দিতে, অথবা নতুন করে কোনো কাহিনি লিখে দিতে।
রাত পনে দশটা বাজে, বাড়ির দারোয়ান বৃষ্টি হওয়ার ফলে গেট লাগিয়ে ভিতরে বসে ছিল। কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা চোখে পরতে বেশ অবাক হয় সে। গার্ড প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। তারপর আবারও ভালো করে দেখতেই থমকে গেলো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শ্রাবণ। সম্পূর্ণ ভেজা, চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে, শার্ট শরীরে লেপ্টে আছে। আর তার একহাতে শক্ত করে ধরা একটি মেয়ে। মেয়েটিও ভিজে একাকার। লাল বেনারসী শাড়ি জলে ভারী হয়ে গেছে, বৃষ্টির পানি গাল বেয়ে নেমে এসেছে, চোখদুটো লাল হয়ে আছে।
“গেট খুলে দাও।”
শ্রাবণের কণ্ঠস্বর নিচরে বলে। গার্ড তাড়াতাড়ি করে
গেট খুলে যেতেই সে এক মুহূর্ত দেরি করলো না। মেয়েটির হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে সোজা ভেতরে প্রবেশ করলো। ড্রইংরুমে পা রাখতেই সবার উপস্থিতি দেখতে পায় শ্রাবণ, যানতো এইসব সবাই এখানে থাকবে। শ্রাবণের বাবার হুট করেই নজর দরজায় যেতেই চমকে উঠলেন তিনি, শ্রাবণ বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে একটা মেয়ের হাত ধরে আছে।
“ শ্রাবণ!”
ওনার কথা শুনে বাকিরাও দরজার দিকে তাকাতেই একই ভাবে তারাও বিস্মিত হয়। শ্রাবণ আর তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটার পোশাক বলছে তারা হয়তো পালিয়ে এসেছে, তাও বিয়ের আসর থেকে। শ্রাবণের বাবা ছেলের দিকে এগিয়ে এসে বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন-
“এসব কি?”
শ্রাবণ কিছু না বলে ভেজা জুতোর শব্দ তুলে মেঝের উপর এগিয়ে গেলো, তারপর সবার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে একটু সামনে টেনে আনলো।
“ও ইরা। আমার ওয়াইফ! চার মাস আগে আমার সাথে ওর বিয়ে হয়েছে।”
শব্দগুলো পড়তেই যেন ঘরের বাতাস ঘন হয়ে উঠলো। রোমানা সিকদার সবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, ছেলের এমন কথায় অবাক হয়ে গেলেন তিনি। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না, বাকিদেরও একই অবস্থা।
রোমানা সিকদার ছেলের কাছে এগিয়ে এলেন, তারপর একনজর ইরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে
“ কি বলছিস এইসব? তুই বিয়ে করেছিস? এই মেয়ে কে? ”
“ওর আজ বিয়ে ছিল। তাই আমি আমার জিনিস নিয়ে এসেছি।”
ইরা মাথা নিচু করে আছে, শরীরটা তার ভীষণ রকমে দূর্বল। তারউপর পুরো রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজে এসেছে, ঠান্ডায় তার সারা শরীর কেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। শ্রাবণ ইরার অবস্থা হয়তো বুঝতে পারলো। তাই সবার দিকে তাকিয়ে বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২২
“ আপাতত রুমে যাচ্ছি, ফ্রেশ হয়ে তোমাদের সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ছোট মা, তুমি একটু ইরাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাও। ওর শরীরটা ভালো নেই, তুমি একটু ওকে দেখ।”
রুমা সিকদার এতক্ষণ সবার মত বিস্মিত হয়ে ছিলেন। শ্রাবণের কথায় এগিয়ে এসে ইরাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলো। ইরা চুপচাপ রুমা সিকদারের সঙ্গে গেলো, তার শরীর কেমন ঢুলচ্ছে।
