Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৯

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৯

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৯
ফাহিমা ইসলাম

ততিক্রান্ত হয়েছে স্বর্ণালি একটি মাস।
চারিদিকে নতুন বসন্তের সূচনায় নতুন করে সেজে উঠেছে প্রকৃতি। ঝড়ে যাওয়া ঢালে জায়গা করে নিয়েছে, নতুন সবুজ পাতারা। প্রানবন্ত চমৎকার সকালে বাড়ির সকল মেয়েরা রান্নায় ব্যস্ত। দুপুরের দিকে ইরার পরিবাররা আসবে। বিয়ের পরে ইরার বাবা-মা সেভাবে কেউ-ই কুটুম বাড়িতে বেরাতে আসেনি, মেয়ের উপর অভিমান করে। তবে এতদিনের মান-অভিমানের পর্ব সমাপ্তি টেনে তারা আসচ্ছেন।৷ তূর্ণার বাবার বাড়ির সঙ্গে এই বাড়ির কেউ-ই বিশেষ যোগাযোগ রাখেনি। না রাখার বেশ কারণ রয়েছে, তূর্ণা আর রৌদ্রিকের বিয়েটা এক আকস্মিকভাবে ভাবে হয়েছে। তারউপর তূর্ণার সঙ্গে করা নিষ্ঠুর আচরণের কথা কম-বেশি সবাই জানে। বিশেষ করে রৌদ্রিক সেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছে। তূর্ণারও সেই বাড়ির প্রতি বিশেষ কোনো টান নেই, না থাকারই কথা। একটা বাড়ি যেখান থেকে একটা মানুষ জন্মের পর থেকে আঘাতই পেয়ে এসেছে। সেই বাড়ির জন্য কিসের মায়া? মায়া থাকার জায়গা জি আদৌও রয়েছে সেই বাড়ির কেউ? দাদি নামক মানুষটাও নেই, যার জন্য তূর্ণা সেই বাড়িতে যাবে। তার মন-মস্তিষ্ক এখন তার সংসার আর এই গোটা পরিবার নিয়ে। এখানে আসার পর জীবনে কতগুলো মানুষের সঙ্গ পেয়েছে সে। মা নামক মানুষের ভালোবাসা কেমন হয় সেটাও পেয়েছে এই বাড়ি থেকে। তাই তার পিছুটান বলতে কিছু নেই।

তূর্ণা তার সংসার জীবন নিয়ে স্বর্ণালি মুহুর্ত পার করছে প্রতিনিয়তই! আগে যেখানে তার দিনের সূচনাই ছিলো অশ্রু দিয়ে; সেখানে সে তার দিবা শুরু হয় নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে। ইরার আর শ্রাবণের সংসার আর-পাঁচটা দম্পতিদের মতই চলছে।
“ তোমরা দু’জন উপরের দিয়ে গোসল সেড়ে নাও। বাকিটা আমরা দেখে নিতে পারবো।”
রুমা সিকদার কাজ করতে করতে ইরা আর তূর্ণাকে উপরে যেতে বলে। সকাল থেকে দুইজনই রান্নার কাজটা সেরেছে, ইরার মন আজকে বেশ ফুরফুরে! এই প্রথমবার তার সহ পরিবার আসচ্ছে, তাই তার আনন্দের পরিমাণটা বেশি।
ইরা আর তূর্ণা কথা বাড়ালো না, উপরে চলে গেলো। দু’জনই ঘেমে একাকার! ইরা তার কক্ষে প্রবেশ মাত্রই শ্রাবণকে খালি গায়ে উবুর হয়ে শুইয়ে থাকতে দেখতে পায়। কালকেই খুলনা থেকে এসেছে দুই সপ্তাহ পর। ব্যবসার কাজ নিয়ে এমন ছোটায় লেগে থাকে শ্রাবণের। ইরা আর শ্রাবণের ঘুম ভাঙালো না, নিঃশব্দে জামা-কাপড় নিয়ে গোসলের জন্য চলে গেলো।

তূর্ণার কক্ষে ঢোকা মাত্রই রোদেলা আর রৌদ্রিককে বই হাতে নিয়ে দেখতে পেলো। রৌদ্রিক রোদেলাকে ছোট ছোট কবিতা থেকে শুরু করে সংখ্যাগুলো শেখায়। তূর্ণাকে দেখে রোদেলা লাফিয়ে পাপার কোল থেকে নেমে পরে, দৌড়ে তূর্ণার কাছে গিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে প্রাণবন্ত ভাবে বলে ওঠে-
“ জানো মা, আনি আতকে আল একটা রাইম শিখেছি। দারাও তুমায় বলি।”
” টুইংকেল, টুইংকেল, লিটল স্টার
হাউ আই ওয়ান্ডার হুয়াট ইউ আর”
রোদেলা খুশি মনে তার আদুরে হালকা অস্পষ্ট স্বরে পুরো কবিতাটা তূর্ণাকে শোনায়। রোদেলার কবিতা শেষ হতেই তূর্ণা রোদেলাকে আদর করে দিলো।
“ বাহ! আমার পুতুল তো খুব ভালো কবিতা পারে। তোমার পাপা তো পঁচা,তাই আমাকে ইয়া বড় বড় পড়া ধরিয়ে দেয়।”

“ তুনি তো পড়াচুর! হি হি পড়াচুর মা!”
বলেই হেসে ফেলে রোদেলা। তূর্ণা রোদেলার দিকে তাকিয়ে মেকি রাগ দেখি বলে-
“ কি পঁচা মেয়ে! পাপার মত হয়ে গেছো একদম।”
“ আনি তো পাপার মেয়ে, তাই পাপাল মত।”
হুট করে রৌদ্রিক তাদের দু’জনের অতি নিকটবর্তী এসে দাঁড়ালো। তূর্ণার ভাবলো এই বুঝি আবারি বকা খাবে, কারণ তার পড়া হয়নি কালকের। তাই পিছাতে নিলেই; তার আগেই রৌদ্রিকের হাতটা তূর্ণার ললাটে মুক্তাদানার মত লেপ্টে থাকা স্বেদবিন্দু গুলো হাতে থাকা টিস্যু দ্বারা অতি যত্নসহকারে মুছে দেয়। তারপর অতি শান্ত স্বরে আদেশ দিয়ে বলে-
“ ফ্রেশ হয়ে আসো, আর একা হাতে এত কাজ করার দরকার নেই। বাড়িতে অনেক হেল্পিং হ্যান্ড আছে।”
“ ওমা এটা কেমন কথা, ইরাপুর পরিবার আসচ্ছে আর আমি ওদের একটু আদর-যত্ন করবো না?”
“ তো কর আদর-যত্ন কিন্তু সেটা আমায়। অন্যদের আদর-যত্ন করার জন্য আরও মানুষ আছে।”
রৌদ্রিকের স্বাভাবিক কণ্ঠে বলা এমন কথা শুনে তূর্ণা লজ্জা পেলো বেশ! তবে রৌদ্রিকের মাঝে এ নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। সে সবসময়ের মতোই স্বাভাবিক।
“ ভুলে যাবেন না, আমি কিন্তু বাড়ির বড় বউ। তাই দায়িত্বও বেশি।”
“ সবার দায়িত্ব কে নিতে বলেছে তোমায়? তুমি আমার বউ নাকি সবার বউ?”
“ আপনার সঙ্গে আর পারবো না।”
“ যাও ফ্রেশ হয়ে আসো।”

পরন্ত বিকেল
চারিদিকে ঢলে পরা রক্তিম সূর্যের আলোয় মুখরিত হয়ে আছে। পক্ষীরাজরা নিজ গন্তব্যে আবারও ফিরে যাচ্ছে। সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে এখন নিয়ে সবাই সবার কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছে। বিকেলের দিকেই ইরার পরিবার আবারও তাদের বাড়িতে ফিরে গিয়েছে, এতে ইরার মন একটু খারাপ হলেও। এখন তূর্ণা, রিনি আর সে মিলে খোলা ছাদের দোলনায় বসে আছে। চারিদিকে বসে চলে নির্মল হাওয়া সারা অঙ্গে শীতলতায় ভড়িয়ে দিচ্ছে। রিনির মুখ ননস্টপ চলতেই আছে, হুট করেই রিনি তূর্ণা আর ইরার মুখপানে চেয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে ওঠে-
“ ভাবি তো আমার ভাইগুলোকে বলনা বিয়ে দিতে।”
রিনির কথায় তূর্ণা আর ইরা একে-অপরকের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো। রৌদ্রিক যেমন শান্ত,গম্ভীর স্বভাবের রিনি ঠিক তার বিপরীত। মেয়েটা বড্ড চঞ্চল, শান্ত শব্দটা তার মধ্যে নেই বললেই চলে। ইরা রিনির কান চে’পে ধরে বলে-

“ আজ-কাল দেখি প্রেমের হাওয়া লেগেছে ননদিনীর ভালোই। কি ব্যাপার হুম?”
“ আবার কার সাথে কথা বলতে বলতে লজ্জাও পায় জানো।”
তূর্ণা আর ইরার কথায় লজ্জা পায় রিনি। লজ্জামাখা,লাজুক মুখশ্রীখানা সন্ধ্যামালতির মত নুইয়ে পরেছে। সেটা দেখে ইরা আর তূর্ণা পাশ থেকে কাঁধ দ্বারা ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে-
“ কি ব্যাপার ননদীনি লক্ষ্মণ তো ঠিক ঠিকছে না। হুম,হুম! বল,বল কার প্রেমে পরলে।”
“ ধুররর ভাবি! কি যে বলো না। বিয়ের বয়স হচ্ছে দেখছো না নাকি। আমার কি বিয়ে করতে হবে না,নাকি।”
তূর্ণা রিনির দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বলে-
“ তাহলে কালকে এতগুলো চকলেট কে দিলো তোমায়? আমি কিন্তু সব দেখেছি রিনি হুম।”
রিনির ধরা পরে গেলো হয়তো। তারপরও নিজেকে সামলে নিলো, তারপর ইরা আর তূর্ণা দুইজনের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ কি ভেবেছো তোমরাই খালি জামাই দেখিয়ে দেখিয়ে ঘুরবে। আমার কি ইচ্ছে করেনা বুঝি, কোথায় ননদকে বাড়ি থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করবে।”
কিছুখন রিনি চুপ থেকে মুখ বাঁকিয়ে বলে-
“ আমাকে তো আর ফুফু বানাতে পারলে না এখন অব্দি। তাই আমিই বিয়ে করে তোমাদের মামি বানানোর ব্যবস্থা করতে চাচ্ছি।”

” রিনি তুমি না বড্ড লাগামহীন। দেখিও তোমার জামাই হবে নিরামিষ।”
রিনি নিজের চুলগুলো হাওয়া উড়িয়ে বলে ওঠে-
“ নিরামিষ থেকে আমিষ তৈরি করবো লাগলে। তাও তোমাদের মত জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে রবো না। তোমাদেরও তো ইচ্ছে করে মামি ডাক শোনার তাই না! আমার ভাইগুলো তো আছেই মামা ডাক শোনার জন্য। ইসসস ওদের কষ্টটা অনুভব করতে পারছি! আমার ভাইগুলো!”
ইরা আর তূর্ণা হেসে ফেললো রিনির কথা বলার ধরন দেখে।
“ হয়েছে নিচে চলো, খিদে পেয়েছে চল কিছু খাই।”
“ হুম, চল খিদেই পেটে বাঘ দৌড়াচ্ছে আল্লাহ!”
” ইঁদুর দৌড়াতে শুনেছি কিন্তু বাঘ কবে থেকে আবার দৌঁড়ানো শুরু করবো?‘
ইরার প্রশ্ন শুনে রিনি উঠতে উঠতে চুলগুলো গুলো হাত দ্বারা হাওয়ায় উড়িয়ে বলে-
“ সবার পেটে ইঁদুর দৌড়ালে, বাঘ কার পেটে দৌড়াবে? ওইটা নাহয় আমার পেটেই দৌড়াক।”
তূর্ণা আর ইরা আবারও হেসে দিলো, এই মেয়ের সঙ্গে থাকলে একদন্ত না হেসে থাকা যায় না।

রাত্রি নেমেছে রোজকার নিয়ম অনুযায়ী। সপরিবারে সবাই খেতে বসেছে, ইরা আর তূর্ণা শ্বাশুড়িদের হাতে হাতে এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। মাছের বাটি হাতে নিতেই ইরার সারা গা কেমন গুলিয়ে এলো! ভাবলো হয়তো এমনি, কিন্তু পরক্ষণেই সারা গা কেঁপে উঠলো। সহ্য না করতে পেরে কোনো মত বাটি রেখে বেসিনের দিকে ছুটে দিয়ে গলগল করে ব’মি করে দিলো। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় সকলেই বিচলিত হয়ে পরলো, রুমা সিকদার দ্রুত এগিয়ে গেলেন। ইরার শরীরটা কয়েকদিন ধরেই দূর্বল, বাবা-মা আসার খুশিতে সারাদিন শরীরের উপর দিয়ে ধকল গেছে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৮

“ কি হয়েছে ইরা? শরীর খারাপ লাগছে?”
ইরা কিছু বলতে পারলো না, মুহুর্তেই দূর্বল শরীরটা নেতিয়ে মাটিতে পরার আগেই শ্রাবণ দ্রুত ধরে ফেললো। মুহুর্তেই সবাই বিচলিত হয়ে পরলো। শ্রাবণ দেরি না ইরাকে কোলে তুলে নিয়ে উপরে কক্ষে নিয়ে গেলো।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৯ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here