অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৮ (২)
ফাহিমা ইসলাম
মধ্যাহ্নের সূর্য এখন নগরীর কংক্রিট-অরণ্যের ওপর নির্দয় দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। স্কুলের শেষ ঘণ্টাধ্বনি বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতেই ছোট ছোট পদচারণার ঢেউ একসঙ্গে ফটকের দিকে ধাবিত হচ্ছে। রঙিন ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে, কেউ উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠছে, কেউ পরীক্ষার নম্বর নিয়ে একে অপরকে গর্বভরে শুনিয়ে যাচ্ছে। কোথাও অভিভাবকের মুখে তৃপ্তির হাসি, কোথাও শিশুর কোলাহলে ভরে উঠছে চারপাশ।এই বহুস্বরিক উচ্ছ্বাসের মাঝখানে স্কুলের প্রধান ফটকের পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্রিক। কয়েকদিন আগেই পরীক্ষা হয়েছে আজকে সবার রেজাল্ট দিবে।
সকালেই সে তূর্ণাকে বলে এসেছে আজ রোদেলাকে সে নিজেই নিয়ে ফিরবে। প্রথমবারের মতো পরীক্ষা দিয়েছে তাই রৌদ্রিকের কাছে এইসব সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার অপেক্ষমাণ দৃষ্টি বারবার বিদ্যালয়ের করিডোরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ভিড়ের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে রোদেলা। আজ তার পদক্ষেপে কোনো চঞ্চলতা নেই। সাধারণত রৌদ্রিকে দেখামাত্র যে মেয়েটি পাখির ছানার মতো দৌড়ে এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আজ সে মাথা নিচু করে ধীর পায়ে হাঁটছে। ছোট্ট আঙুল দুটি ব্যাগের ফিতা শক্ত করে চেপে ধরেছে। চোখদুটো অস্বাভাবিক নিস্তেজ। রৌদ্রিকের অভিজ্ঞ দৃষ্টি এক নিমিষেই বুঝে নেয় তার ছোট্ট রোদ আজ মেঘে ঢাকা। রোদেলা এগিয়ে এলো রৌদ্রিকের কাছে। রৌদ্রিক মেয়ের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে এলো, রোদেলার দৃষ্টি মাটিতে মিশে আছে। রৌদ্রিক শুধু হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত মেলে দেয় মেয়ের সামনে। সেই পরিচিত আশ্রয় চোখে পড়তেই রোদেলার এতক্ষণে আটকে রাখা সমস্ত অভিমান বাঁধভাঙা জলের মতো উপচে পড়লো। সে বাবার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ক্ষুদ্র কাঁধ দুটি কেঁপে ওঠে। অস্পষ্ট কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলতে থাকে-
“পাপা… আমি… আমি… খারাপ কয়েছি।”
রৌদ্রিক নীরবে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে গেলো। কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
কোনো প্রশ্ন নেই। কেবল অপেক্ষা করলো যতক্ষণ না তার ছোট্ট মানুষটি বুকের ভেতরের সব কষ্ট উজাড় করে দেয়। হেঁচকি তুলতে তুলতে রোদেলা ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে-
” আ..আমি সবাল কম পেয়েতি পাপা! ও..ওরা কেউ আমাল সাথে খেলবে না! আমি ভাল না বলে!”
শেষ কথাটুকু বলেই সে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। রৌদ্রিক চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে রাখে।তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দীর্ঘশ্বাস জন্ম নেয়। পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর। এতটুকু বয়সেই মানুষকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করতে শেখায়। কিছুক্ষণ পর সে দুই হাত দিয়ে রোদেলার ভেজা গাল মুছে দেয়।চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত স্বরে বলে-
“আমার দিকে তাকাও তো, রোদ।”
রোদেলা কাঁদতে কাঁদতেই মুখ তোলে।
রৌদ্রিক মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে-
“বল তো, আকাশে সূর্য যদি একদিন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যায়, তাহলে কি সে সূর্য থাকা বন্ধ করে দেয়?”
রোদেলা মাথা নেড়ে ধীরে বলে
“না…”
“তাহলে আজ কয়েকটা নম্বর কম এসেছে বলে তুমি ভালো মেয়ে থাকা বন্ধ করে দিলে?”
রোদেলা এবারও ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।রৌদ্রিক তার ছোট্ট নাকটা আলতো চেপে ধরে।
“তাহলে কাঁদছো কেনো? নম্বর মানুষকে বড় করে না। মানুষ বড় হয় শেখার সাহস দিয়ে। আজ তুমি যতটুকু পারোনি, কাল তার চেয়ে একটু বেশি পারবে। আজ কম পেয়েছো কাল আর একটু চেষ্টা করে আরও একটু বেশি পাবে। পাপা কিছু বলেছি? তাহলে কেনো কাঁদছো?”
সে মেয়ের ছোট্ট হাত নিজের বড় হাতের মুঠোয় নিয়ে আরও বলে-
“আর একটা কথা মনে রাখবে। যারা শুধু তোমার ভালো ফলের দিনে পাশে থাকে, তারা তোমার সঙ্গী হতে পারে; কিন্তু যারা তোমার খারাপ দিনেও হাত ছাড়ে না, তারাই তোমার আপন মানুষ।”
রোদেলা একদৃষ্টে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ধীরে ধীরে তার কান্না থেমে আসে।রৌদ্রিক হঠাৎ গম্ভীর মুখে চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে-
“একটা খুব বড় সমস্যা হয়েছে।”
রোদেলা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে।
“কি… পাপা?”
“আমার রাজকন্যার হাসিটা কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন পুরো শহর ঘুরে সেই হাসি উদ্ধার করতে হবে। যাবে আমার সঙ্গে?”
কয়েক সেকেন্ড আগেও কান্নায় ভেজা মুখে অতি ক্ষীণ একটি হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
“যাবো তো…!”
রৌদ্রিক বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলে-
“এই তো! তদন্ত শুরু চল।”
বলেই রৌদ্রিক এক হাতে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। গাড়িতে রোদেলার ব্যাগটা দিয়ে ড্রাইভারকে বাড়িতে চলে যেতে বলে। রৌদ্রিক রুমাল দিয়ে মেয়ের ঘাম মুছে দিলো। রাস্তা দিয়ে রোদেলাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো, রোদেলার মনটা এখনো খারাপ। ক্লাসে সবার চেয়ে কম মার্ক পেয়েছে, তার টিচার বলেছে সে পরের বার ভালো করবে; এখন মন খারাপ করার দরকার নেই। তবুও তার পাশে বসা তার সব বন্ধু গুলো কেমন জানি তাকে নিয়ে মজা করছে। সে পঁচা দেখে তার ভালো নাম্বার আসেনি, তাই কেউই তার সঙ্গে পুরো ক্লাস কথা বলেনি। রোদেলা সারা ক্লাস একাই মাথা নিচু করে বসেছিলো, কাঁদেও নি। কিন্তু বাবাকে দেখে তার ছোট্ট মন আর মানতে পারেনি কেঁদে ফেলেছে। রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়ে শহরের এদিক-ওদিক ঘুরছে। রোদেলাকে আজকে কিছু খাওয়াতে আটকাচ্ছে না৷ যা খেতে চাইছে সেটা নিয়ে দিচ্ছে। ঘুরে ঘুরে রোদেলা তার প্রিয় ড্রইং খাতা সহ আরও আঁকার জিনিস কিনলো। হাত হাতে কতগুলো বেলুন যেগুলো একটু আগেই রৌদ্রিক কিনে দিয়েছে তাকে৷ যেতে যেতে হঠাৎ করেই রোদেলার চোখ যায় একটা দোকানের উপর। দোকানটা মূলত খেলনার, রোদেলা সেদিকে হাত বাড়িয়ে বলে-
“ পাপা টয় নিবো।”
রৌদ্রিক রোদেলার কথা মতো টয়ের দোকানে ঢুকে যায়। রোদেলা ভিতরে ঢোকা মাত্রই এতো এতো খেলনা দেখে তার মনটা বাক-বাকুম হয়ে গেলো।
“ পাপা, রোদ্দুর আর রোদেশী জন্ন নিবো এইতা-ওইতা।”
বলেই রোদেলা বড় একটা পুতুলের উপর হাত রাখলো। বিশাল একটা টয়, রোদেলার থেকে দুইগুণ বড়।
“ এতো বড় তো রোদেশী নিতেই পারবে না আর না তুমি অন্যটা দেখো। যেটা তুমিও ধরতে পারবে রোদেশীও।”
রৌদ্রিকের কথা মতো রোদেলা আর একটা দেখলো, তারপর পছন্দ মতো সে অনেক গুলো খেলা কিনলো। তাদের শপিং শেষে তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে, রোদেলা রিক্সায় খুব বেশি উঠেনি৷ উঠেনি বলেই চলে, তাই রিক্সায় ওঠার পর তার মনটাও আরও ফুরফুরে হয়ে উঠেছে।
সূর্য এখন মধ্যগগনে, চারিদিকে গরম ছুটেছে। বাহিরে কোনো প্রকার বাতাস নেই, গাছের পাতা অব্দি নড়ছে না এই গরমে। ঠিক এই সময়েই সিকদার বাড়ির প্রধান ফটক অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করে রৌদ্রিক ও রোদেলা। রৌদ্রিক মুখশ্রী বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত,কিন্তু রোদেলার ক্ষুদ্র মুখশ্রীজুড়ে যেন ভোরের সমস্ত আলো এসে আশ্রয় নিয়েছে। বাবার প্রশস্ত হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে এতক্ষণ পৃথিবী দেখার উচ্ছ্বাস এখনও তার চোখে-মুখে লেগে রয়েছে। বাড়িতে প্রবেশ করতেই সে আর এক মুহূর্তও স্থির থাকলো না। ছোট্ট পা দুটো টুপটাপ শব্দ তুলে সোজা ছুটে যায় তূর্ণার দিকে। রৌদ্রিক পিছন থেকে আস্তে উঠতে বললেও সে কোনো কথা শুনলো না।
তূর্ণা এখন জানালার ধারে বসে রোদেশীর ছোট্ট জামাগুলো গুছিয়ে রাখছে। আচমকা রোদেলার উচ্ছ্বসিত ডাক কানে আসতেই মুখ তুলে তাকায়।
পরক্ষণেই রোদেলা দৌড়ে এসে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
” জানো কি করেতি? পাপা আর আমি এত্তো এত্তো ঘুরেতি।”
আধোফোটা শব্দগুলো আনন্দে জড়িয়ে একাকার হয়ে আছে। সদ্যস্নাতা করে আসার কারণে তার চুল থেকে পানি পরছে। তূর্ণা মৃদু হেসে রোদেলাকে কোলে তুলে নেয়। এলোমেলো চুলে আঙুল চালিয়ে কপালে স্নেহমাখা চুম্বন এঁকে দিয়ে নরম স্বরে বলে-
“তাই নাকি? আমার পুতুলটা কোথায় কোথায় ঘুরে এলো?”
রোদেলা তখন দুই হাত নাড়িয়ে নিজের মতো করে গল্প বুনতে শুরু করে।
” পাক গিয়েতি, রাতায় হেটেতি, এতগুলা কতনকেন্তি খেয়েছি। বেলুন কিনেছি, আর জানো টয়ও কিনেছি।”
তূর্ণা গভীর মনোযোগে প্রতিটা কথা শুনছে। মাঝেমধ্যে বিস্ময়ের ভান করে চোখ বড় বড় করে বলে-
“সত্যি! তারপর কি করেছো?”
রোদেলা আরও উৎসাহিত হয়ে গেলো সে হাত নেড়ে, কখনো মুখভঙ্গি করে, কখনো বাবার হাঁটার ভঙ্গি নকল করে সবকিছু খুলে বলে।তার উচ্ছ্বাসে তূর্ণার সমগ্রি অপার্থিব দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তূর্ণা কথার মাঝেই রোদেলা জুতা সহ সবকিছু খুলে দিলো পাশে থাকা, রোদেলার একটা পাতলা জামা নিয়ে সেটা করিয়ে দিলো। রোদেলা বলতে বতলে রৌদ্রিক কেনা জিনিসগুলো নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। রোদেলার এখন কোনোদিকে মনোযোগ নেই, সে গল্প করায় ব্যস্ত।
অন্যদিকে রৌদ্রিক জিনিসগুলো রেখে তার দৃষ্টি গেল বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকা রোদ্দুর আর রোদেশীর দিকে। তারাও যেন দূর থেকেই বাবার উপস্থিতি অনুভব করে ফেলেছে। তাই
রোদ্দুর সবার আগে ছোট্ট দুই পা ছুড়ে দিয়ে উচ্ছ্বাসে কেঁপে ওঠল।
“আআ… গুঁ… উঁ… দ্দা…”
তারপর গোলগাল হাত দুটো বাতাসে নাড়তে নাড়তে বাবার দিকেই বাড়িয়ে দেয়।
রোদেশীও যেন পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। সে উপুড় হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বাবাকে দেখেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
“আবু… আ… গু…”
অস্পষ্ট ধ্বনিগুলো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নির্মল আনন্দের মতো।রৌদ্রিকের সমগ্র অবসাদ যেন নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়। সে প্রথমে রোদেশীকে কোলে তুলে নেয়। বাবার বুকে উঠতেই ছোট্ট মেয়েটা আনন্দে দুই হাত দিয়ে তার শার্ট খামচে ধরলো। কখনো দাড়িভরা থুতনিতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কখনো আঙুল মুখে পুরে আবার বের করে হাসতে থাকে।রৌদ্রিক আলতো করে তার নরম গালে নাক ছুঁইয়ে দিতেই রোদেশী শরীর দুলিয়ে হেসে ওঠে।
“হিঁ… আআ… গুঁ…”
ওপাশে রোদ্দুর যেন এই আদর সহ্য করতে পারলো না। সে বিছানার ওপর থেকেই দুই হাত বাড়িয়ে অস্থির হয়ে ওঠে। গোল গোল চোখে স্পষ্ট অভিমান ফুটে ওঠে, যেন নীরব অভিযোগ করে বলছে-
‘বাবা শুধু ওকেই আদর করছে কেন?’
রৌদ্রিক মৃদু হেসে রোদেশীকে এক হাতে আগলে রেখেই অন্য হাতে রোদ্দুরকে তুলে নেয় নিজের বুকে।
দুই সন্তানকে দুই বাহুতে ধারণ করে সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে থাকলো।
রোদ্দুর সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়। ছোট্ট আঙুল দিয়ে বাবার কলার আঁকড়ে ধরে নিশ্চিন্তে হেলে পড়ছে।রোদেশী আবার সুযোগ বুঝে বাবার নাক চেপে ধরে।রৌদ্রিক ইচ্ছে করেই মুখ বিকৃত করে বলে ওঠে-
—”আহা! আমার নাকটা কে শেষ করে দিলে?”
সঙ্গে সঙ্গে দুই শিশুই অকারণ উচ্ছ্বাসে শরীর দুলিয়ে হাসতে শুরু করে।
“আআ…!”
“গুঁ… উঁ…!”
সেই ভাষাহীন হাসির ধ্বনি যেন সকালের সূর্যালোকের চেয়েও নির্মল। রোদেলা উঠে এলো, তূর্ণাও এগিয়ে এলো। রোদেলার এখন কারো দিকে ধ্যান নেই, সে খেলনাগুলো তূর্ণাকে খুলে খুলে দেখাতে শুরু করেছে। রৌদ্রিক কিছুখন রোদ্দুর আর রোদেশীকে আদর করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য চলে গেলো। এতোক্ষণ এই অবস্থায় থাকা ভালো নয়, ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা আছে সমস্যা হতে পারে। তূর্ণা রোদেলাকে তাড়া দিয়ে বলে-
” হয়েছে এবার থামো, যাও পাপার সঙ্গে ফ্রেশ হয়ে নাও। বাহিরে থেকে এসেছো, তারপর আবার সব দেখবো।”
রোদেলাও ভদ্রবাচ্চার মতো মাথা দুলিয়ে রৌদ্রিকের পিছে চলে গেলো। বেশকিছু সময় পর রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়েই বের হলো। তূর্ণা এতোক্ষণ থাকা জামাগুলো গুছিয়ে রেখে দিয়েছে৷ রোদেলা এবার এসে রোদ্দুর আর রোদেশীর সামনে কাত হয়ে শুয়ে পরলো। রোদ্দুর রোদেলাকে দেখা মাত্রই আনন্দে পা দোলাতে শুরু করে দিয়েছে, বড়ো বড়ো চোখ মেলে বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। রোদেশীও একই ভঙ্গিতে বোনের দিকে মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রোদেলা দুইজনকে পর পর দুইটা চুমু দিয়ে বলে-
” জানো কি এনেতি আমি? এত্তোগুলা টয়, আমরা মিলে খেলবো কেমন?”
রোদেলার কথা শুনে রোদ্দুর আনন্দে হাত ছোড়া শুরু করলো। হাত বাড়িয়ে বোনকে ধরার জন্য।
” আইইইই..আআআআ!”
রোদেলা শুয়ে থাকা রোদ্দুরকে কোনো রকমে টেনে নিজের কোলের উপর বসালো। সে ঠিক মতো নিতে পারে না, তবুও মাঝে মাঝে বড়দের সাহায্যে ওদের কোলে নেয়। কোলে নিয়েই রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে বলে-
” বড়ো হচ্চো না কেনু? আমার মতে বড়ে হউ বুঝলে?”
রোদ্দুর বুঝলো না কিছুই খালি হেসে উঠলো আপন মনে, এইদিকে রোদেশী চোখ-মুখ কুঁচকিয়ে ফেলেছে। পা দু’টো ছোটাছুটি করলো, কেদে দিবে বলে। রোদেলা অসহায় হলো, সে তো একাই দু’জনকে নিতে পারবে না রৌদ্রিকে মতো। তূর্ণাও নেই, সে গেছে খাবার আনতে। রৌদ্রিক বারান্দায় ছিলো, সে দেখে এগিয়ে এলো। রোদেশী কেঁদে ফেলবে ফেলবে প্রায়, তার আগেই রৌদ্রিক তাকে তুলে নিলো। রোদেশী অশ্রুসজল মায়াময় নেত্রদ্বয় পিতার পানে তাক করলো। তাকে না দেওয়ায় অভিযোগ জানাচ্ছে সে। রৌদ্রিক মেয়ের ঘাড়ে উঠিয়ে নিলো, তারপর রোদেলা আর রোদ্দুরের পানে চেয়ে রোদেশীর উদ্দেশ্যে বলে-
“ তোমার বিগ সিস্টার এখনো নিজেই ছোট তাই পাপার মতো একসঙ্গে নিতে পারবে না বুঝলে। তাই কাঁদতে হয় না।”
রোদেলা সেটা দেখে রৌদ্রিকে বলে-
“ না আমি পারবো তো দাও ওকেও!”
“ না রোদ পারবে না, আগে রোদ্দুরকে নাও তারপর আবার রোদেশীকে নিও তাহলেই হয়ে যাবে।”
রোদেশী ঘাড়ে চলে রৌদ্রিকের চুলগুলো তার ছোট ছোট মুঠো হাতে আঁকড়ে ধরছে। সেইগুলো মুখে দিয়ে অদ্ভুত আনন্দময় শব্দ বের করছে।
“ আবা, আবা..আইইইই!”
রোদেলাও রোদ্দুরের সঙ্গে খেলছে, কিছুখন পর সেখানে তূর্ণা খাবার আনলো। তূর্ণা আগের থেকেও এখন বেশি বুঝদার হয়ে উঠেছে। তাই তাকে কিছুই বলা লাগে না, নিজেই করে সব।
“ বাপ-বেটির হলে খেয়ে নিন। ওদের রাখুন, আজকে আপনার ছোটাও ঘুমানোর নাম নেই। এমনি তার ঘুম যেনো শেষ হয় না”
রোদেশী মায়ের কথায় বিরোধিতা জানিয়ে জোরে শব্দ করে বলে-
“ আইইইই! আইইই!”
” দেখেছেন আবার কথাও বলে।”
” না ঘুমালে জোর করবে না, এমনি ঘুম আসলে ঘুমাবে। এটা হলো আমার ঘুম কুমারী।”
রাত এখন ধীরে ধীরে আপন গাম্ভীর্যের চাদর মেলে সমগ্র প্রকৃতিকে নিস্তব্ধতার অলিখিত অনুশাসনে আবদ্ধ করে রেখেছে। এমন সময় বাড়ির প্রধান ফটকের বাইরে এসে থামে রৌদ্রিকের গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলে নেমেই রৌদ্রিক এক মুহূর্তের জন্য ক্লান্ত শরীরটাকে সোজা করে দাঁড় করায়। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা তার দেহে অবসাদের গাঢ় রেখাপাত করলেও, নিজ কক্ষে যাওয়ার পর তিনটি নিষ্পাপ মুখ আর তূর্ণার স্নিগ্ধ দৃষ্টির স্পর্শমাত্রেই সেই ক্লান্তি যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো নিমিষেই। এক হাতে কয়েকটি শপিং ব্যাগ, অন্য হাতে ছোট্ট একটি বক্স নিয়ে সে ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করে। রৌদ্রিকে দেখেই রোদেশী আধো আধো স্বরে অস্পষ্ট কিছু বুলিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দেয় বাবার দিকে। সেই নিষ্পাপ আহ্বান অগ্রাহ্য করার সাধ্য রৌদ্রিকের কোনোদিনই নেই। সমস্ত ব্যাগ একপাশে নামিয়ে প্রথমেই সে মেয়েটিকে কোলে তুলে নেয়। গোলাপি গালের উপর আলতো চুম্বন এঁকে মৃদুস্বরে বলে-
“আমার ছোট্ট রাজকন্যা সারাদিন কি কি করেছে?”
রোদেশী উত্তর দিতে পারে না। কেবল খিলখিলিয়ে হেসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। রোদেলাও রৌদ্রিকে কাছক ছুটে এসেছে৷ রৌদ্রিক অন্যহাতে একপাশে রোদেলাও তুলে নিলো। কিছুখন রোদেলার চোখ গেলো ব্যাগুলোর উপর সে কোল থেকে নেমে অধীর কৌতূহলে শপিং ব্যাগগুলোর চারপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে।
“কাকা.. এগুলোতে কী আছে?”
” আছে আছে, রোদ্দুর ঘুমিয়ে পরেছে আজ এতো তাড়াতাড়ি?”
বিছানায়া থাকা রোদ্দুরের দিকে তাকালো। তূর্ণা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছে। তার অধরে অকারণই এক প্রশান্ত হাসি প্রস্ফুটিত হয়েছে। রৌদ্রিক রোদেশীকে বিছানায় বসিয়ে, তার আনা বক্সটা নিয়ে বসলো। তূর্ণাও এগিয়ে এসেছে, রোদেলা তো উচ্ছ্বসিত চোখে তাকিয়ে আছে। রৌদ্রিক বক্স খোলা মাত্রই সেখান থেকে মখমলি আবরণের ভেতর পাশাপাশি শুয়ে আছে তিন জোড়া চুড়ি দেখা গেলো। একই রকম, একই নকশা, একই কারুকাজ শুধু আকারে তিনটি ভিন্ন। সবচেয়ে ক্ষুদ্র জোড়াটি রোদেশীর নরম কব্জির জন্য। মাঝারি মাপেরটি রোদেলার ছোট্ট হাতে মানানসই।
আর সবচেয়ে বড় জোড়াটি তূর্ণার জন্য। মুহূর্তেই বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায় রোদেলার চোখ।
“মা! দেখো না আমরা সেম সেম!”
রোদেশীও কিছু না বুঝেই চুড়ি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। তার চোখ চকচক করছে, তার জানা নেই এইটা কি কিন্তু তার খুবই খুশি লাগছে উপহার পেয়ে। তূর্ণার মনে পরলো রৌদ্রিক আগেও তাকে আর রোদেলা একই রকম চুড়ি থেকে শুরু করে অনেক জিনিসই কিনে দিয়েছিলো। আজকে শুধু দু’জনের জায়গায় তিনজন হয়েছে। রৌদ্রিক পাশে থাকা তূর্ণার হাতটা টেনে ;রৌদ্রিক নিজ হাতে প্রথমে তূর্ণার কব্জিতে চুড়িগুলো পরিয়ে দেয়। তারপর সযত্নে রোদেলার হাতে। শেষে অত্যন্ত সতর্কতায় রোদেশীর ক্ষুদ্র, তুলোর মতো কোমল কব্জিতেও ছোট্ট চুড়িগুলো পরিয়ে দেয়।তিনজনের হাতে একই রকমের চুড়ি গুলো বেশ নজর কাড়ছে। রৌদ্রিক মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সেদিকে।
” বাহ তিনজনকেই তো একদম পরী পরী লাগছে।”
” থাংকু পাপা।”
বলেই রোদেলা রৌদ্রিকের গালে চুমু দিয়ে দেয়। এইদিকে রোদেশী কিছুই বুঝলো না, সে হাতে থাকা চুড়িগুলো নিয়ে আপন মনে খেলছে।
” এইগুলোই কিনছিলেন তখন?”
” হুম।”
” আপনিও না, রোদ আর রোদেশীর জন্য আনলেই হতো। আমার কতগুলো চুড়ি হয়ে গেছে জানেন।”
” লাগলে আরও হবে সমস্যা কই? তোমার কাজ শুধু পরার, কেনার কাজ আমার বুঝলে?”
তূর্ণা খানিকটা হাসলো, রৌদ্রিক এবার তার পাশে থাকা প্যাকেটটা খুললো। খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আকাশি রঙের নরম উলের ছোট্ট একটি হুডি, সঙ্গে জোড়া ক্ষুদ্র মোজা, আর কাঠের তৈরি রঙিন ঝুনঝুনি যার প্রতিটি নড়াচড়ায় মৃদু সুরেলা শব্দ ঝরে পড়ছে।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৮
” এইগুলো রোদ্দুরের, ও উঠলে ওর ভাগের টাও দিতে হবে তো।”
রোদেলা আর রোদেশী দুইজনই নিজেদের হাতে থাকা চুড়ি নিয়ে খেলতে ব্যস্ত৷ ছোট্ট রোদেলা খানিক পর পরই চুড়ি ঘুরিয়ে হেসে উঠছে খিলখিলিয়ে৷ নতুন খেলসর বস্তু পেয়ে সে।
