Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৬

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৬

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৬
সুমি চৌধুরী

মুহূর্তের মধ্যে ঈশানের রাগ চড়চড় করে বেড়ে গেল। যখন-তখন সবার সামনে এমন ফাজলামি করার মানে কী? সে ঝটকা দিয়ে শুভ্রার হাত ছেড়ে দিল, তারপর চরম বিরক্তিতে তার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“সবার সামনে অমন ফাজলামি করার মানে কী, শুভ্রা? হোয়াট ইজ দিস ননসেন্স! এখন সবাই আমাদের নিয়ে কী ভাবছে? শুভ্রা, তুমি এখনো ছোট নও যে তোমার মাথায় মিনিমাম কমনসেন্স থাকবে না!”
ঈশানের এমন আচমকা ধমকে ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল শুভ্রা। চারপাশের মানুষের সামনে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগল তার। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,

“সরি ঈশান ভাইয়া। আই অ্যাম রিয়েলি সরি।”
ঈশান তার কথায় একটুও শান্ত হলো না, বরং আরও রেগে গিয়ে বলল,
“রাখো তোমার সরি! জাস্ট শাট আপ! তুমি যেখানে-সেখানে গিয়ে আমার সাথে ফাজলামি করো। আমাকে কি তোমার জোকার মনে হয়? যে যা ইচ্ছে তাই করবে আমার সাথে!”
শুভ্রা এবার আর পাল্টা কিছু বলার সাহস পেল না। কিন্তু ঈশানের এই রুঢ় কথাগুলো তীরের মতো এসে তার বুকে বিঁধল। সে তো জাস্ট একটু দুষ্টুমিই করেছিল, বেশি কিছু তো করেনি! এতে সবার সামনে এইভাবে অপমান করে কথা বলার কী আছে? প্রচণ্ড একটা অভিমান দলা পাকিয়ে এলো তার গলায়। ঈশান পুনরায় ধমকের সুরে বলল,
“তোমাকে আমি সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, শুভ্রা নেক্সট টাইম আমার সাথে এমন দুষ্টুমি একদম করবে না। দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্নিং! মনে থাকবে?”

শুভ্রা তার চোখের কোণে জমে ওঠা জলটুকু আড়াল করার জন্য ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। সে কোনোমতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। ঈশান তার মুখ থেকে জবাব শোনার জন্য আবার জোর দিয়ে বলল,
“আই সেড, মনে থাকবে?”
শুভ্রা হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে বসা গলাতেই কোনোমতে বলল,
“হুম মনে থাকবে। এবার সত্যি বলছি ঈশান ভাইয়া, আর দুষ্টুমি করব না আপনার সাথে, আর কোনোদিন ফাজলামি করব না। আজকের জন্য আমাকে মাফ করে দিন।”
বলেই শুভ্রা চোখের জল আড়াল করতে এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। ঈশান তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—একটু কি বেশিই বলে ফেলল সে মেয়েটাকে? এতটা রুঢ় না হলেও তো চলত! কিন্তু পরক্ষণেই সেই নরম ভাবটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজেকে শক্ত করে বলল,
“ধুর! যা করেছে ও, তার জন্য এই বকাটুকু ওর প্রাপ্য ছিল। বেশি মাথায় তুললে পরে আর সামলানো যাবে না।”

রাত বারোটা। গায়েহলুদের অনুষ্ঠান প্রায় শেষ পর্যায়ে। নাচ-গান শেষ করে আমুদে মানুষগুলো এখন ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ছে। রিদিকে হলুদ মাখাতে মাখাতে একদম ভূত বানিয়ে ছেড়েছে সবাই।
অন্য দিকে, রিদিদের বাড়ির সামনে ছটফট করতে করতে পাইচারি করছে শুভ্র। তখন রিদিকে ভিডিও কলে দেখার পর থেকে সে নিজেকে আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছিল না। মনের ভেতর এমন এক ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছে যে, এখন যদি সে রিদির কাছে না যেতে পারে, তবে ছটফট করতে করতে তার দমই আটকে যাবে!
কিন্তু এত দূর ছুটে এসেও কোনো লাভ হচ্ছে না। রাস্তা দিয়ে একের পর এক মানুষ অনবরত আসা-যাওয়া করছে। পরিচিত কেউ দেখে ফেলার ভয়ে শুভ্র মুখে মাস্ক পরে, কানে ফোন চেপে ধরে একা একাই কথা বলার অভিনয় করছে। দূর থেকে কেউ তাকালেই সে এমন ভাব করছে যেন খুব জরুরি কোনো ব্যবসায়িক আলাপ চলছে। কারণ এই মাঝরাতে কনের বাড়ির সামনে এভাবে চোরের মতো ধরা পড়ে গেলে লজ্জায় আর কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না সে।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ পাইচারি করার পর সে বুঝতে পারল, তাকে অন্য কিছু একটা করতে হবে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে কোনো কাজ হবে না, কারণ সারারাতেও মানুষের আনাগোনা একটুও কমবে বলে মনে হচ্ছে না। কোনো উপায় না দেখে সে পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত রিফাতের নাম্বারে একটা মেসেজ পাঠাল,

“কোথায় তুই?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপাশ থেকে রিফাতের রিপ্লাই ভেসে উঠল স্ক্রিনে,
“হি হি! তোর বউয়ের সাথে সেলফি তুলছি! কী যে মিষ্টি লাগছে রে ওকে দেখতে!”
মেসেজটা দেখেই শুভ্রর বুকের ভেতর ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে দ্রুত টাইপ করে পাঠাল,
“ফাজলামি বন্ধ কর। সোজা বাড়ির মেইন গেটের দিকে আয়।”
ওপাশ থেকে রিফাত বেশ অবাক হয়ে রিপ্লাই দিল,
“কেন রে? গেটে কী আছে? হঠাৎ গেটে ডাকছিস কেন?”
পরক্ষণেই রিফাতের মাথায় বুদ্ধিটা খেলল। শুভ্রর পাগলামির ইতিহাস তার জানা। সে চমকে উঠে আবার মেসেজ পাঠাল,

“এক মিনিট! কোনোভাবে তুই এখানে এসে পড়লি না তো? সত্যি করে বল, তুই কি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস?”
শুভ্র মেসেজ পাঠাল,
“হ্যাঁ,এখন বেশি কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি গেটের বাইরে আয়।”
মেসেজটা দেখেই রিফাত হাসিতে ফেটে পড়ল। একগাদা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে শুভ্রকে খ্যাপানোর জন্য লিখল,
“ছ্যাহ ছ্যাহ শা’লা! আর একটা মাত্র রাত বউয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারলি না? তুই এতটা কন্ট্রোললেস? তোর এই রূপ তো আমার জানা ছিল না রে!”
রিফাতের এমন ঠাট্টা দেখে শুভ্রর মেজাজ একদম সপ্তম আকাশে চড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চরম ক্ষোভ নিয়ে মেসেজ করল,
“বেশি ফাজলামি করলে একটা থাপ্পড় দিয়ে চিবুকের সবকটা দাঁত ফেলে দেব! তোকে যা বলছি ভালোয় ভালোয় দুই মিনিটের মধ্যে গেটের সামনে আয় বলছি।”

অন্য দিকে, বাড়ির সামনে রাস্তায় তখন অন্য রকম এক আমেজ। হলুদ মাখা রিদিকে মাঝখানে বসিয়ে দুই পাশে মিহি আর পাখি মিলে একের পর এক ছবি তুলছে। শুভ্রার মনটা ভালো নেই, ঈশানের বকা খেয়ে তার ভেতরটা এখনো ভারী হয়ে আছে, তাই সে ছবি তুলতে একদমই চাইছে না। কিন্তু পাখি আর মিহি নাছোড়বান্দা! তারা জোর করে টেনেহিঁচড়ে শুভ্রাকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন স্টাইলিশ পোজে দাঁড় করাচ্ছে। ওদের এই সুন্দর মুহূর্তগুলো ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে ফ্রেমবন্দি করছে তূর্য। আর তার ঠিক পাশেই পকেটে হাত গুটিয়ে চুপচাপ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঈশান।
বেশ কয়েকটা চমৎকার ছবি তোলার পর, রিফাত গুটি গুটি পায়ে তূর্যের কাছে এগিয়ে এলো। সে তূর্যের কাঁধে হাত দিয়ে শুভ্রর গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পুরো ঘটনাটা ফিসফিস করে বলল। কথা শুনামাত্রই তূর্য নিজের হাসির বেগ আর চেপে রাখতে পারল না। সে হাতের দামি ক্যামেরাটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল, কোনোমতে সেটা সামলে নিয়ে উঠোন কাঁপিয়ে হোহো করে হেসে উঠল।তূর্যের এই আকস্মিক আর অদ্ভুত হাসি দেখে পাখি পুরো অবাক হয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী গলায় বলল,

“কী ব্যাপার, আপনি হঠাৎ এইভাবে হাসছেন কেন? কোনো জোকস মনে পড়েছে নাকি?”
তূর্য নিজের হাসি থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে রিদির দিকে তাকাল। তারপর বেশ মজা নিয়ে বলল,
“রিদি, ভাত খাইছো? শরীর-টোরীর ঠিক আছে তো তোমার?”
গায়েহলুদের এই জমজমাট আসরে তূর্যের মুখে হঠাৎ এমন অদ্ভুত আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে রিদি পুরোপুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে গাল থেকে হলুদ মাখা টিস্যুটা দিয়ে মুছতে মুছতে অবাক হয়ে বলল,
“কেন? কী হয়েছে ভাইয়া? হঠাৎ এই প্রশ্ন করছেন কেন?”
পাশ থেকে রিফাত আর কোনো লুকোছাপা না রেখে মুচকি হেসে বলল,

“কারণ এখন তোমাকে খুব বড় একটা বাঘ সামলাতে হবে। আর সেটা পরে নয়, এই মুহূর্তে, এখনই!”
রিদি বড় বড় চোখ করে রিফাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের এই রহস্যময় কথার মাথা-মুণ্ডু সে কিছুই বুঝতে পারছে না। এদিকে তূর্য আর দেরি না করে ঈশানের একদম কানে কানে গিয়ে শুভ্রর পাগলামির কথাটা বলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে ঈশানের মুখের সেই গম্ভীর ভাবটা কেটে গেল এবং সেও মুচকি হেসে ফেলল। তার গম্ভীর বস যে নিজের হবু বউয়ের জন্য মাঝরাতে মাস্ক পরে চোরের মতো গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, এটা সত্যি তার ধারণার বাইরে ছিল।তূর্য নিজের হাসি কোনোমতে চেপে রেখে ঈশানের হাতে ক্যামেরাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ঈশান, তুমি ছবিগুলো একটু তুলে দাও। আমি আর রিফাত গেট থেকে একটু ঘুরে আসছি। বাঘটাকে তো খাঁচায় পুরতে হবে!”

এই বলে তূর্য আর রিফাত হাসাহাসি করতে করতে একে অপরের গলা ধরাধরি করে গেটের দিকে চলে গেল। ঈশান ওদের রেখে যাওয়া ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিল এবং বাকিদের ছবি তুলে দিতে লাগল। নিখুঁত অ্যাঙ্গেল আর চমৎকার লাইটিং সেন্স দিয়ে তূর্যের থেকেও সুন্দর করে একটার পর একটা ছবি ক্লিক করতে লাগল ঈশান। সবাই বেশ আনন্দ করে এক এক করে নিজেদের সিঙ্গেল ছবি তুলতে লাগল।সবশেষে যখন শুভ্রার ছবি তোলার পালা এলো, তখন সে মুখটা একটু গোমড়া করে মলিন গলায় বলল,
“আমি তুলব না, তোরাই তোল। আমার ভালো লাগছে না।”
কিন্তু পাখি আর মিহিরা কোনো কথাই শুনল না। তারা তুমুল জোরাজোরি শুরু করে দিল এবং এক প্রকার বাধ্য হয়েই শুভ্রা ক্যামেরার সামনে নিজের পোজ দেয়। ঈশান খুব সাবধানে ফ্রেমিং ঠিক করার জন্য মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল, তারপর ক্যামেরাটা চোখের সামনে ধরে শুভ্রার ওপর ফোকাস করে ছবিটা তুলে ফেলল।
ছবিটা তোলার পর ক্যামেরার ডিজিটাল স্ক্রিনে শুভ্রার সেই পোজটা ভেসে উঠতেই এক মুহূর্তের জন্য ঈশানের হৃৎস্পন্দন যেন থমকে গেল! শুভ্রা তার চোখ দুটো হালকা বন্ধ করে, মুখটা এক সাইড করে এক অদ্ভুত মায়াবী পোজ দিয়ে রেখেছে। ঈশান নিজেও জানে না সে কতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো ক্যামেরার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্রার সেই নিষ্পাপ আর অভিমানী মুখটা যেন তাকে এক নিমেষে এক অন্য দুনিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল। শেষমেশ ঈশানের ঘোর ভাঙল পাখির ডাকে।

“কী হলো ভাইয়া? ছবি কি তোলা হয়নি? আপনি তো দেখছি একদম স্ট্যাচুর মতোই বসে আছেন!”
পাখির কথায় ঈশান চমকে উঠে নিজের গভীর ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, হয়েছে।”
তারপর সে শুভ্রার আরও কয়েকটা সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিল, যদিও এবার তার নিজের মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল।এরই মধ্যে হঠাৎ ঈশানের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। ঈশান পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল রিফাত একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। মেসেজে রিফাত তাকে এখনই জরুরি ভিত্তিতে গেটের কাছে যেতে বলছে। ঈশান আর দেরি না করে পাখির হাতে ক্যামেরাটা বুঝিয়ে দিল, তারপর ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কৌতূহল নিয়ে গেটের দিকে চলে আসলো।গেটের কাছে আসতেই ঈশান দেখল শুভ্র রাগে কোমরে হাত দিয়ে ফুঁসছে, আর তূর্য ও রিফাত চরম মজা পেয়ে মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। ঈশানকে দেখা মাত্রই তূর্য আর নিজের হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলল,

“এই ঈশান! তোমার বসকে দয়া করে ভেতরে নিয়ে যাও। শালা কখন থেকে এখানে এসে ঘুরঘুর করছে, অথচ ভয়ে ভেতরেই ঢুকতে পারছে না!”
শুভ্র চোখ দুটো বড় বড় করে দাঁত কিড়মিড় করে তূর্যের দিকে তাকাল। তার এই করুণ দশা দেখে ঈশানও নিজের ভেতরের হাসিটা কোনোমতে চেপে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বিনীত সুরে বলল,
“চলেন বস, আপনাকে ভেতরে নিয়ে যাই।”
শুভ্র রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সবার উদ্দেশ্যে দাঁতে দাঁত চেপে চরম ক্ষোভ নিয়ে বলল,
“ফা**ক ইউ অল!”

শুভ্রর মুখ থেকে এমন গালি শুনে তূর্য আর রিফাত এবার হল্লা করে হোহো করে হেসে দিল। তাদের সাথে সাথে ঈশানও আর নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না, সে-ও একপাশে মুখ ফিরিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল। বন্ধুদের এমন পাত্তা না দেওয়ার ভাব দেখে শুভ্রর মাথাটা একদম গরম হয়ে গেল। সে রাগে হনহন করে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় তূর্য আর রিফাত দুজনেরই গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এখনই ফাঁসি দিয়ে দেবে! তারপর তাদের দুজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে চরম আক্রোশে ফিসফিস করে বলল,
“শালা, আমি এখানে নিজের বউকে দেখার জন্য জা’নো’য়া’রের মতো ছটফট করছি, আর তোরা ফ্রেন্ড হয়ে আমার এই অবস্থা নিয়ে তামাশা করছিস? তোদের আমি সাফ জানিয়ে দিচ্ছি এই মুহূর্তে যদি তোরা আমাকে কোনোভাবে রিদির কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করে না দিস, তবে কসম খোদার, তোদের দুই শালার প্যান্ট খুলে আমি এই মেইন গেটের ওপর পতাকা বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখব।”

তূর্য শুভ্রর সেই ফাঁসির মতো শক্ত হাতের বাঁধন থেকে কোনোমতে ছাড়া পাওয়ার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে ছটফট করতে লাগল। দম আটকে যাওয়ার ভান করে সে বিষম খেতে খেতে বলল,
“উফফ! শালা, ছাড় বলছি! তোর শ্বশুরের কি কাপড়ের এতই আকাল পড়েছে যে আমাদের প্যান্ট খুলে তোকে মেইন গেটে দেশের পতাকা টানাতে হবে?।”
ওদের এই কাণ্ড দেখে ঈশান এবার আর হাসির বেগ ধরে রাখতে পারল না। সে পেট চেপে ধরে হাসতে হাসতে রিফাত আর তূর্যের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে তূর্য ভাই, আপনারা শুধু প্যান্টের চিন্তা করছেন কেন? বিয়ের বাড়ির রান্নাবান্নার ব্যাপার তো! বাবুর্চিদের যখন বড় বড় ডেগ আর রান্নার গরম আইটেম চুলা থেকে নামাতে কাপড়ের অভাব পড়বে, তখন কাপড় খুঁজতে আর দূরে যাওয়া লাগবে না। আপনাদের প্যান্টের সাথে সাথে ওই আন্ডারওয়্যারগুলো দিয়েই না হয় বাবুর্চিরা গরম পাতিল নামিয়ে নেবে! এক ঢিলে দুই পাখি, কি বলেন বস।”
ঈশানের মুখ থেকে এই কথা শুনে তূর্য আর রিফাত যেন একদম হাঁ বনে গেল। তারা হাঁ করে ঈশানের দিকে তাকিয়ে রইল, মুখ গুছিয়ে পাল্টা কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই শুভ্র এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে দুজনকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে বলল,

“দেখ, আমার এখন ফাজলামি করতে ভালো লাগছে না। তোরা আগে আমাকে একটা কাজের আইডিয়া দে, কীভাবে আমি এখন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ভেতরে যাব।”
রিফাত শুভ্রর হাতের চিপে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া নিজের দামি পাঞ্জাবির কলারটা কোনোমতে টেনেটুনে ঠিক করতে করতে বিরক্ত হয়ে বলল,
“শালা, আর একটা মাত্র রাত তুই কন্ট্রোল করতে পারিস না? আজকের এই রাতটাই তো শুধু মাঝখানে! কাল রাতে তো একদম বাসর ঘরেই ওকে পেয়ে যাবি, তখন সারারাত দেখিস। এখন এই মাঝরাতে চোরের মতো ভেতরে যাওয়ার কী দরকার!”
শুভ্র এবার আর এক বিন্দুও হালকা মেজাজে নেই। সে একদম গম্ভীর হয়ে নিজের প্যান্টের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে তূর্য আর রিফাতের দিকে সোজা তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন এক চরম হুমকি। সে ঠাণ্ডা কিন্তু থমথমে গলায় বলল,

“আমি এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনব। এর মধ্যে যদি তোরা আমাকে ভেতরে যাওয়ার কোনো জেনুইন আইডিয়া না দিস, তাহলে কিন্তু আমি যা বলেছি ঠিক তাই করব। তোদের দুজনের সাধের প্যান্ট থাকবে ওই বিয়ের মেইন গেটের সাথে ঝুলানো, আর আন্ডারওয়্যারগুলো চলে যাবে বাবুর্চিদের গরম পাতিল নামানোর কাজে। এবার তোরা ভেবে দেখ কী করবি। এক… দুই…”
শুভ্র তিন বলার আগেই তূর্য একপ্রকার আঁতকে উঠে লাফিয়ে বলল,
“থাম ভাই থাম! আর গুনতে হবে না। একটা বুদ্ধি পাইছি, তোকে পেছনের দিক দিয়ে ভেতরে যেতে হবে।”
ঈশান একটু অবাক হয়ে পেছনের রাস্তার কথা চিন্তা করে বলল,
“পেছনে তো বিশাল বড় দেয়াল, ওদিক দিয়ে কীভাবে যাবে?”
রিফাত পাঞ্জাবিটা সামলে নিয়ে বলল,
“তা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই । কারণ সামনের দিকে এখনো অনেক মানুষ গিজগিজ করছে। শুভ্র এখন মেইন গেট দিয়ে ঢুকতে গেলেই কেউ না কেউ চিনে ফেলবে।”
শুভ্র আর এক মুহূর্তও কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে সরাসরি হুকুমের সুরে বলল,
“চল আমার সাথে।”

যেই কথা সেই কাজ। চারজনে মিলে চোরের মতো চুপিচুপি রিদিদের বাড়ির একদম পেছনে চলে আসলো। সেখানে এসে দাঁড়াতেই দেখল এক বিশাল উঁচু দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। রিদির কাছে পৌঁছাতে হলে এই দেয়াল টপকাতে হবে শুভ্রকে। শুভ্র আর কোনো দ্বিধা না করে শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত ভালো করে গোটাতে লাগল। তার এই রণপ্রস্তুতি আর দেয়াল টপকানোর মারমুখী ভাব দেখে রিফাত বিড়বিড় করে উঠল।
“ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
বলেই রিফাত আবার তুকতাক করে কপালে হাত দিয়ে বলল,
“ভাই, তুই কি আজকে মেয়েটাকে একদম মেরেই ফেলবি? যেভাবে শার্টের হাতা গুটিয়ে নিজেকে তৈরি করছিস, দেখে তো আমারই বুক কাঁপছে!”
তূর্য তখন পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত কাউকে একটা মেসেজ টাইপ করতে করতে বলল,

“রিদিকে এখনই অসুস্থ হওয়ার জন্য তৈরি হতে বলো। বেশি দেরি করলে আর চলবে ন।”
শুভ্র অবশ্য তখন কারোর কোনো কথাই কানে তুলছিল না। তার পুরো ধ্যান-জ্ঞান তখন ওই দেয়ালের ওপারে। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে জোরসে একটা লাফ দিল এবং দেয়ালের ওপরের অংশটা ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু দেয়ালটা বেশ উঁচুই ছিল, যার কারণে তার হাত ফস্কে বারবার নিচে পড়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই দেয়ালের কার্নিশ নাগাল না পেয়ে সে চরম রাগে আর বিরক্তিতে নিজের মনেই বিড়বিড় করে কুৎসিত একটা গালি দিয়ে উঠল,
“বা’ল! এই শা’উ’য়্যা দেয়ালটা এত উঁচু করে দিয়েছে কেন?”
অনেক চেষ্টা করেও দেয়ালের মাথাটা কোনোমতেই ছুঁতে না পেরে শুভ্রর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। সে হাপাতে হাপাতে চরম বিরক্ত হয়ে ঈশানদের দিকে তাকাল।তাদের এভাবে হাত গুটিয়ে তামাশা দেখতে দেখে মাথাটা আর ঠিক রইল না। সে ফুঁসে উঠে বলল,

“হা করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার সার্কাস না দেখে আমাকে একটু সাহায্য কর!”
শুভ্রর এমন অসহায় আর ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে তূর্য, রিফাত আর ঈশান এগিয়ে এলো। তূর্য বলল,
“আইচ্ছা খাড়া, তোরে আমরা আজকে শূন্যে ভাসাইয়া দিতাছি।”
যেই কথা সেই কাজ। ঈশান আর তূর্য দুই পাশ থেকে শুভ্রর দুই পা শক্ত করে ধরল, আর রিফাত পেছন থেকে শুভ্রর কোমর ধরে ধাক্কা দিতে লাগল। তিনজন মিলে পুরো গায়ের জোর খাটিয়ে শুভ্রকে আস্তে আস্তে দেয়ালের ওপরের দিকে তুলতে শুরু করল। শুভ্র তখন দুই হাত বাড়িয়ে দেয়ালের কার্নিশটা ছোঁয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু শুভ্র যখন একদম মাঝপথে, তখনই ঘটল বিপত্তি। রিফাত শুভ্রর কোমর ঠেলতে ঠেলতে হঠাৎ তূর্যের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ওরে বাবারে! দোস্ত, এই শালা শুভ্রর যে রাক্ষুসে ওজন রে! এর যে ভারী শরীর, বাসর রাতে রিদি বেচারির ওপর এই জলহস্তীটা পড়লে তো মেয়েটা একদম চ্যাপ্টা হয়ে আলুভর্তা হয়ে যাবে! বিয়ের পরের দিন সকালে তো রিদিকে সোজা অর্থোপেডিক হসপিটালে নিয়ে প্লাস্টার করা লাগবে!”
কথাটা শোনামাত্রই তূর্যের মুখের ভেতরের হাসিটা বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে গেল। সে হোহো করে হেসে উঠল। আর তূর্যকে ওভাবে হাসতে দেখে রিফাত নিজেও নিজের হাসি ধরে রাখতে পারল না, সে-ও খিলখিল করে হাসতে লাগল। ওদের এই কাণ্ড দেখে ঈশানও আর নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারল না, তারও হাসির চোট কানের কাছে চলে গেল।

হাসির চোটে তিনজনেরই হাত-পায়ের সমস্ত শক্তি যেন এক মুহূর্তে ফুরিয়ে এলো! তাদের শরীর কাঁপতে লাগল এবং তারা শুভ্রকে ওপরের দিকে ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। শুভ্র বুঝতে পারল যে এই তিন হারামজাদা এখন তাকে মাঝপথেই ছেড়ে দেবে এবং সে নিচে পড়ে কোমরটা ভাঙবে।
শুভ্র একদম শেষ মুহূর্তে নিজের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে বাতাসে একটা ঝাঁকুনি দিল। তিনজনে যখন হাসতে হাসতে তাকে প্রায় ছেড়েই দিয়েছে, ঠিক তখনই শুভ্র চিতাবাঘের মতো একটা লাফ দিয়ে দেয়ালের একদম কর্নারটা শক্ত করে ধরে ফেলল!
অন্য দিকে, শুভ্রকে ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথেই তূর্য, রিফাত আর ঈশান হাসির চোটে ভারসাম্য হারিয়ে একজন আরেকজনের ওপর ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তারা তিনজন মাটিতে শুয়ে হাসতে হাসতে একদম গড়াগড়ি খেতে লাগল। রিফাত হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে বলল,

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৫

“ওরে আল্লাহ রে, আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে গেল রে!”
শুভ্র দেয়ালের ওপরে ঝুলে থেকে নিচে তাকাল। বন্ধুদের এই হাল দেখে সে এক চরম হিংস্র দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“তোদের আমি পরে দেখে নেব!”
তারপর সে নিজের দুই হাতের জোরে শরীরটাকে টেনে দেয়ালের ওপরে তুলল এবং রিদিদের বাড়ির ভেতরের দিকে টপকাতে শুরু করল।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here