অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৮
সুমি চৌধুরী
এক লহমায় পুরো হলরুমে যেন এক জীবন্ত বোমা ব্লাস্ট হলো সোহান চৌধুরীর এই আকস্মিক ঘোষণায়! শুভ্রার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল, সে চোখের পলকে একদম পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। তূর্য হা হয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছে তার নিজের বিয়ের আলাপ উঠেছে, তাও আবার কার সাথে? শুভ্রার সাথে! যাকে সে আজীবন নিজের বোনের নজর ছাড়া অন্য কোনো চোখে দেখার কথা ভাবতেও পারেনি!
তবে সবার থেকে বেশি নিথর ও অসাড় হয়ে গেছে ঈশান। শুভ্রার বিয়ের কথা শোনা মাত্রই তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল, পুরো গলাটা এক নিমেষে ধরে আসলো। তার শরীর থেকে নড়াচড়া করার মতো সমস্ত শক্তি যেন কেউ এক টানে কেড়ে নিয়েছে।
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে গভীর চোখে সবার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করল। তারপর সোহান চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
“তূর্য অনেক ভালো ছেলে সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি, আব্বু। কিন্তু একটা বিয়ে সফল হতে গেলে দুজনেরই সমান সম্মতি থাকতে হবে। এখন যদি তূর্য আর শুভ্রা ওরা দুজনেই এই বিয়েতে রাজি থাকে, তাহলে আমার বিন্দুমাত্র কোনো আপত্তি নেই। আমি চোখ বন্ধ করে তূর্যের হাতে আমার বোনকে তুলে দিতে পারব।”
শুভ্রর এমন সটান ঘোষণায় হুট করেই সবার মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গেল। তূর্যের বাবা তখন সোফায় সোজা হয়ে বসে তূর্যকে ডাকলেন,
“তূর্য, এদিকে আয় তো বাবা।”
তূর্য মরা মানুষের মতো ধীরপায়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসলো। তূর্যের বাবা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তূর্য, আমি শুভ্রার সাথে তোর বিয়ে দিতে চাই। শুভ্রাকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে মেনে নিতে তোর কোনো আপত্তি আছে?”
তূর্য মাথায় হাত দিয়েও ভেবে পাচ্ছে না সে এখন কী বলবে! বাবার মুখের ওপর ‘না’ বলার মতো সাহস বা ধৃষ্টতা কোনোটিই তার নেই। সে এক চরম অসহায়ত্ব নিয়ে এক পলক পাখির দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখ দুটো ততক্ষণে পানিতে স্পষ্ট টলমল করছে, এই বুঝি সবার সামনেই হু হু করে কেঁদে দেবে সে! পাখির সেই করুণ মুখটা দেখে তূর্য দ্রুত নিজের চোখ নামিয়ে নিল। তারপর চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে, বুকের ভেতর এক দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস চেপে ধরে ভাঙা গলায় বলল,
“না বাবা… আমার কোনো আপত্তি নেই।”
তূর্যের মুখ থেকে হ্যাঁ-সূচক জবাব শুনতেই হলরুমের থমথমে ভাব কেটে গিয়ে সবার মুখে আনন্দের হাসি ফুটল। তূর্যের বাবা অত্যন্ত গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে বললেন,
“আমার ছেলে তো! ওকে আমি খুব ভালো করে চিনি। ও আবার শুভ্রার মতো লক্ষ্মী মেয়েকে বিয়ে করতে আপত্তি জানাবে, তা কি কখনো হয়?”
বাবার কথা শুনে বাকি সবাই হো হো করে হেসে উঠল। সোহান চৌধুরী তখন হাতের ইশারায় শুভ্রাকে নিজের কাছে ডাকলেন। কিন্তু শুভ্রা যেন ততক্ষণে নড়ার শক্তিটুকুই ভুলে গেছে! তার পুরো শরীরটা অবশ হয়ে আসছে, চোখের সামনে চারপাশের সবকিছু দুলছে—মনে হচ্ছে এক তীব্র ভূমিকম্প হচ্ছে তার মনের ভেতর! অনেক কষ্টে, নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে নিজেকে সামলিয়ে সে কাঁপতে কাঁপতে এসে সোহান চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল।
সোহান চৌধুরী তার সেই ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তোকে তো আর নতুন করে কিছু বলার নেই শুভ্রা, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা তোর সামনেই নিলাম। এখন বল, তোর কি তূর্যকে বিয়ে করতে কোনো আপত্তি আছে?”
শুভ্রার মনে হলো এই মুহূর্তে কেউ যেন তাকে বলল’এখন তোকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে, এতে কি তোর কোনো আপত্তি আছে?’ বুক ফেটে কান্না আসতে চাইল তার, কিন্তু সবার সামনে নিজেকে সামলাতে নিজের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরে রাখল সে। নিজের ভেতরের এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আর ছটফটানি মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল শুভ্রা। এখন কী বলবে সে? কীভাবে সবার সামনে চিৎকার করে বলবে যে সে এই বিয়েটা করতে পারবে না! কারণ কারণ সে যে অন্য একজনকে নিজের মনের মণিকোঠায় বসিয়ে রেখেছে।
সে ঈশানকে প্রচণ্ড ভালোবেসে ফেলেছে! হ্যাঁ, শুভ্রা যাকে নিজের অজান্তে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে, সেই মানুষটি আর কেউ নয় সে স্বয়ং ঈশান। শুধু ভালোবাসাই নয়, এই গম্ভীর ও শান্ত পুরুষটির প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে গেছে শুভ্রা নামক মেয়েটি। ঈশান ছাড়া আর অন্য কোনো পুরুষের প্রতি তার কখনো কোনো আলাদা ফিলিংস কাজ করেইনি। ঈশানকে চোখের সামনে দেখলে বুকের ভেতরের হার্টবিট যেভাবে অবাধ্য হয়ে বেড়ে যায়, সেই তীব্র ও মধুর অনুভূতি আর কোনো পুরুষকে দেখলে তার মনে জাগে না। জীবনের প্রতিটা ভয়, ভালো লাগা, তীব্র অভিমান কিংবা আবদার তার সবকিছুই তো জড়িয়ে আছে কেবল ঈশানের সাথে।
তাহলে মনের গভীরে আগলে রাখা ওই পুরুষটিকে ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া কি আদেও সম্ভব? পৃথিবীর আর দশটা মেয়ের পক্ষে হয়তো পরিস্থিতি মেনে নিয়ে সম্ভব হলেও হতে পারে, কিন্তু শুভ্রার বেলায় তার মন পরিষ্কার বলে দিচ্ছে এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। ঈশানকে না পেলে নির্ঘাত মরেই যাবে সে!
কিন্তু এখন সে কী করবে? সবার সামনে চিৎকার করে কি বলে দেবে যে সে ঈশানকে ভালোবাসে? কিন্তু এই চরম সত্যি কথাটা সে মুখ ফুটে কীভাবে বলবে! ঈশান যে হিন্দু! তাদের সমাজ আর ধর্মের দেয়ালটা যে বড্ড বেশি উঁচু। তার বাবা মরে গেলেও কখনো একজন ভিন্ন ধর্মের ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবেন না। কোনো পরিবার বা মানুষই চায় না নিজের ধর্মকে অসম্মান করে সন্তানকে অন্য ধর্মে ঠেলে দেওয়ার জন্য। তাহলে কি তার আর ঈশানের মিলন আদৌ কোনোদিন সম্ভব? এই কট্টর পরিবার আর সমাজ কি কোনোদিন মেনে নেবে তাদের এই সম্পর্ককে?
ভাবতেই চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল শুভ্রার। চোখের কোণে জমা হওয়া নোনা জলটুকু টলমল করে উঠল, তবুও ভেতরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করে অনেক কষ্টে সে কান্না আটকে রাখল। শুভ্রাকে এভাবে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে সোহান চৌধুরী পুনরায় কিছুটা কড়া গলায় বললেন,
“কী হলো শুভ্রা? কথা বলছিস না কেন?”
শুভ্রা আর সহ্য করতে পারল না। সে এবার মাথা তুলে ঝাপসা চোখে সরাসরি ঈশানের দিকে তাকাল। ঈশান তখন মাথা নিচু করে শক্ত পাথরের মতো ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে, তার শূন্য দৃষ্টি ফ্লোরের একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির। এই মুহূর্তে তার মনের ভেতর কী ভয়ানক ঝড় আর ভাঙচুর চলছে, তা একমাত্র ওপরওয়ালা ছাড়া আর কেউ জানে না। ঈশানের এই নিস্পৃহতা দেখে শুভ্রা নিজের শেষ আশাটুকুও হারিয়ে ফেলল। সে আলতো করে চোখ জোড়া বন্ধ করল এবং এক বুক কষ্ট চেপে ধরে কাঁপানো গলায় বলল,
“না… আ-আ-মার কোনো আপত্তি নেই।”
সবার মুখে এক নিমেষে খুশির জোয়ার বয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই একসাথে তৃপ্তির সুরে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে উঠল। অবশেষে দীর্ঘ আলোচনা আর দুই পরিবারের সম্মতিতে তূর্য আর শুভ্রার বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করা হলো। ঠিক হলো, এই আসন্ন বিয়ের মৌসুমেই তাদের চার হাত এক করে দেওয়া হবে। শুভ্র আর রিদির বিয়ের ঠিক দুদিন পরই ধুমধাম করে হবে তূর্য আর শুভ্রার বিয়ে।
শুভ্রা এতক্ষণ কোনোমতে নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে ধরে রেখেছিল, কিন্তু এই চূড়ান্ত ঘোষণার পর সে আর এক সেকেন্ডও পারল না। তার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। নিজের দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকে, শাড়ির কুচিটা এক হাতে শক্ত করে ধরে সে একপ্রকার দৌড়েই সিঁড়ির দিকে চলে গেল। পাছে সবার সামনে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে, সেই ভয়ে সে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। তার মনে হচ্ছে, আর একটা মুহূর্তও যদি সে ওই হলরুমে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেখানেই বুক ফাটানো চিৎকার করে কেঁদে দেবে।
হুট করে শুভ্রার এভাবে চলে যাওয়ার দিকে সবাই এক পলক তাকাল। ঈশানও তার অবশ হয়ে যাওয়া ঘাড়টা ঘুরিয়ে শূন্য চোখে সিঁড়ির দিকে তাকাল। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল সে কোনো এক ভয়ানক, নিকষ কালো দুঃস্বপ্ন দেখছে আর একটু পরেই হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে, কেটে যাবে এই ঘোর। কিন্তু না, পরক্ষণেই নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাকে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্টে গ্রাস করে নিল। এটা কোনো কাল্পনিক গল্প বা নাটক নয়, একদম নির্মম বাস্তব!
আর সেই বাস্তবতার নির্মম আঘাতে প্রতিটা সেকেন্ডে তার বুকের ভেতরটা যেন শত শত তিরের ফলায় ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল।
শুভ্রার এই আকস্মিক দৌড়ে চলে যাওয়াটাকে বাকি সবাই একদম অন্য চোখে দেখল। বড়রা সহ মেহমানরা সবাই মৃদু হেসে উঠলেন। তারা ভাবলেন, নতুন বিয়ের কথা শুনে লজ্জায় হয়তো মেয়েটা এভাবে মাথা নিচু করে পালিয়ে গেছে। সাধারণত বিয়ের কথা উঠলে সব বাঙালি মেয়েই যেমন লাজুক আচরণ করে, শুভ্রাও সেটাই করেছে এই ভেবে সবাই আবার নিজেদের খোশগল্প আর বিয়ের আলোচনায় মেতে উঠল।
এদিকে পাখির পক্ষেও এই দৃশ্য আর সহ্য করা সম্ভব হলো না। সেও চোখভর্তি পানি নিয়ে এক প্রকার দৌড়েই নিজের রুমের দিকে চলে গেল। পাখি এভাবে চলে যাওয়ার সময় তূর্য এক পলক তার দিকে তাকাল। পাখির সেই ভেঙে পড়া অবয়বটার দিকে তাকিয়ে তূর্য নিজের বুকের গভীর থেকে এক দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ফেলল, যার মধ্যে লুকিয়ে রইল একরাশ অব্যক্ত কষ্ট আর এক বুক অসহায়ত্ব।
জানালার ওলটপালট পর্দা গলে আসা সকালের হালকা সোনালী রোদটা সোজা এসে পড়ল রিদির মুখের ওপর। সেই চেনা আলোটার ছোঁয়ায় রিদি খুব ধীরে ধীরে নিজের চোখের পাতা মেলল। কিন্তু চোখ খোলামাত্রই এক তীব্র অবসাদ আর নিস্তেজ ক্লান্তি তার পুরো শরীর জুড়ে ভর করল।বিছানায় সামান্য এপাশ-ওপাশ করতে যেতেই রিদি টের পেল তার শরীরের প্রতিটা হাড়, প্রতিটা জোড় যেন একদম আলগা হয়ে গেছে। পুরো শরীরটা এক অদ্ভুত ভারী অনুভূতিতে অবশ হয়ে বিছানার সাথে লেপ্টে আছে। কোমর আর তলপেটে একটা চিনচিনে, মৃদু ব্যথা প্রতিটা মুহূর্তে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। একটা গভীর ও তীব্র ধকলের পর শরীর যেভাবে ভেঙে আসে, রিদির এখন ঠিক তেমনটাই লাগছে। সামান্য একটু নড়াচড়া করতে গেলেই তার গায়ের প্রতিটা পেশি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে।এক অদ্ভুত আবেশ আর একই সাথে এই তীব্র শারীরিক ক্লান্তির মিশ্রণ তাকে বিছানা থেকে উঠতে দিচ্ছে না। শরীর এতটুকুই নিস্তেজ আর দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, কম্বলটা সরিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো বিন্দুমাত্র শক্তিও সে নিজের ভেতরে খুঁজে পাচ্ছে না।
হুট করে তার কাল রাতের সমস্ত কথা মনে পড়ে গেল। মনে হওয়া মাত্রই মুহূর্তে তীব্র লজ্জায় লাল হয়ে সে কম্বলের তলে গিয়ে মুখ লুকাল। এক অদ্ভুত, অনাস্বাদিত লজ্জায় তার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করতে লাগল। কাল রাতে যে কী হয়ে গেল দুজনের মধ্যে, তা বোধহয় কেউ টের পেল না। হুট করেই শুভ্র তার এত কাছে চলে আসলো, আর সেও কোনো বাধা দিতে পারল না! তার এই নীরব সম্মতিই শুভ্র নামক পুরুষটাকে আস্ত একটা পাগল বানিয়ে ছেড়েছে সে।ঠিক তখনই দরজায় সজোরে কড়া নাড়লেন রাবেয়া এহসান। ওপাশ থেকে ডাক দিলেন,
“রিদি, মা আমার, ওঠ! আটটা বেজে গেছে। মেহেদি লাগানোর মেয়েগুলো চলে এসেছে, তাড়াতাড়ি ওঠ।”
মায়ের গলার আওয়াজে আচমকা হুশ ফিরে পেল রিদি। আজ তো তার বিয়ে! আর সে কিনা এত বড় একটা কথা ভুলে বিছানায় অলসভাবে পড়ে আছে! মনে মনে ভাবল, সব দোষ ওই শুভ্রের! লোকটা কাছে আসলেই রিদি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। সে বিছানায় শুয়ে শুয়েই রাগে মুখ ফুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“অসভ্য পুরুষ একটা! শরীরটা একদম ব্যথা করে দিয়েছে। আর কোনোদিন কাছে আসতে দেবো না।”
বেলা দুপুর দুইটা। রিদিদের বাড়ি এখন আত্মীয়-স্বজনে একদম গমগম করছে। চারদিকে শুধু মানুষের হইচই, রান্নাবান্নার রাজকীয় আয়োজন আর অনবরত দামি দামি গাড়ির আসা-যাওয়ার শব্দ। বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে, আর ওদিকে সাউন্ড বক্সে তারস্বরে গান বাজছে যার তীব্র আওয়াজে মনে হচ্ছে যেন পুরো মাটিকাঁপানো এক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।
নিচে যখন এই এলাহী কাণ্ড, তখন ওপরের শান্ত রুমে রিদিকে কনের সাজে সাজানো হচ্ছে। পার্লার থেকে নামী দুজন রূপটানশিল্পী এসেছেন তাকে সাজানোর জন্য। আয়নার সামনে রিদি চুপচাপ বসে আছে আর তার ওপর চলছে নিখুঁত কারিগরি।
তাকে পরানো হয়েছে একটি গাঢ় লাল-খয়েরী রঙের ভারী ও জমকালো সিল্কের লেহেঙ্গা। পুরো লেহেঙ্গা জুড়ে খাঁটি জারদৌসি আর মখমলের ওপর সোনালী সুতোর চমৎকার কারুকাজ করা, যা আলো পড়তেই রাজকীয় আভায় চকচক করে উঠছে। কুচি করে পরা লেহেঙ্গার ঘেরটা পুরো মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে আছে। রিদির ফর্সা গলার ওপর শোভা পাচ্ছে কুন্দনের ভারী সীতাহার ও চোকার, কানে তার সাথে ম্যাচিং করা বড় ঝুমকো, আর কপালে জড়ানো একটি চমৎকার টিকলি। দুই হাত ভরে পরানো হয়েছে লাল আর সোনালী কাঁচের রেশমি চুড়ি, যার সাথে ঝুলছে মায়াবী কলিরে।
পার্লারের মেয়েরা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে রিদির মুখে হালকা কিন্তু নিখুঁত ব্লাশ-অন এবং চোখে ডার্ক স্মোকি মেকআপ করে দিয়েছে। ঠোঁটে লেহেঙ্গার সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন-লাল রঙের লিপস্টিক দেওয়াতে তার মায়াবী রূপ যেন আরও ঠিকরে বেরোচ্ছে। সবশেষে, তার মাথার ওপর আলতো করে বসিয়ে দেওয়া হলো একটি বিশাল, হালকা ওড়নার ওয়ান-লেয়ার ঘোমটা। ওড়নার চারপাশের চওড়া পাড়টা তার মুখের অবয়বকে এক অদ্ভুত কনে-নজর এনে দিয়েছে। ঘোমটার পাতলা নেটের আড়াল থেকে রিদির ওই লাজুক, নিষ্পাপ মুখটা দেখতে একদম স্বর্গের পরীর মতো লাগছে।
শুভ্রা, মিহি আর পাখি আগেই রিদিদের বাড়িতে চলে এসেছে। পাখি মিহি দুজনে বাহিরে আত্মীয়দের সাথে সময় কাটাচ্ছে। আর শুভ্রা চুপচাপ রিদির ঠিক পাশেই বসে আছে।
শুভ্রার পরছে আজ ডার্ক খয়েরী আর মেরুন শেডের একটি মডার্ন লং গাউন। যার সামনের দিকটা বুক থেকে শুরু করে একদম নিচ পর্যন্ত চেরা ফ্রন্ট-ওপেন স্টাইলের, যা থেকে ভেতরের রাজকীয় সুতোর কাজ করা ঘেরওয়ালা স্কার্টটি মায়াবীভাবে উঁকি দিচ্ছে। গাউনের পুরো বুক জুড়ে, গলার চারপাশে এবং হাতার কবজিতে গোল্ডেন জারদৌসি সুতোর নিখুঁত ও ভারী কারুকাজ। হালকা নেটের ওড়নাটি সে এক কাঁধে ভাঁজ করে ঝুলিয়ে রেখেছে, যার জমিনে ছোট ছোট চুমকির কাজ চকচক করছে।
গলার ওপর মানানসই একটি গোল্ডেন নেকলেস এবং দুই হাতে হালকা সোনালী চুড়ি। মাঝখানে নিখুঁত সিঁথি কেটে সিল্কি সোজা চুলগুলো দুই কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে ও পিঠে খোলা ছেড়ে দেওয়া। পোশাকের এই আভিজাত্যপূর্ণ ও মডার্ন স্টাইল শুভ্রার পুরো অবয়বে এক রাজকীয় লুক এনে দিয়েছে।
দেখতে একদম খয়েরী পরীর মতো লাগছে শুভ্রাকে। কিন্তু এত সুন্দর একটি সাজের পরও তার মায়াবী মুখে হাসির কোনো লেশমাত্র নেই। চারপাশের আনন্দের কোলাহল, মানুষের হইচই আর উৎসবের পরিবেশ সবকিছুই তার কাছে প্রচণ্ড বিরক্তিকর লাগছে। আর মাত্র দুদিন বাদে তার নিজের বিয়ে, অথচ তার মনে হচ্ছে দুদিন পর তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে।
ভাবতেই বুক ঠেলে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল তার, কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সে কোনো রকমে কান্নাটা আটকে ফেলল। শুভ্রা মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে আর কোনোদিন ঈশানের সাথে দুষ্টুমি করবে না, নিজে থেকে যেচে একটা কথাও বলবে না। মানুষটা হয়তো তার ওপর এমনিতেই প্রচণ্ড বিরক্ত হয়, তাই অযথা আর কাউকে বিরক্ত করতে চায় না সে। এদিকে রিদি এখনো জানে না যে শুভ্রার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে; সকাল থেকে বিয়ের হাজারো ব্যস্ততার কারণে কেউ তাকে এই খবরটা বলার সময়টুকু পর্যন্ত পায়নি।
ঠিক দুপুর তিনটার সময় চৌধুরী বাড়ির গাড়ির সাড়ি সাড়ি লাইন এসে রিদিদের বাড়ির নান্দনিকভাবে সাজানো বড় গেটের সামনে থামল। মোট আটটি বিলাসবহুল গাড়ি একদম তাজা ফুল দিয়ে রাজকীয়ভাবে সাজানো হয়েছে। আর বাকি গুলো সাদা সিদে ভাবেই এসেছে। সবার সামনে এগিয়ে এসে থামল শুভ্রের নিজের প্রিয় ব্ল্যাক মার্সিডিজ প্রাইভেট কার।
গাড়িটির বনেট জুড়ে তাজা লাল ও সাদা গোলাপ আর রজনীগন্ধার এক বিশাল ও ঘন চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার একপাশ মায়াবী লতার মতো নেমে এসেছে বাম পাশের হেডলাইটের দিকে। উইন্ডশিল্ডের নিচে কাঁচের কোণ ঘেঁষে বসানো হয়েছে হালকা গোলাপি ও সাদা নেটের টিস্যু কাপড়ের বড় বড় চমৎকার বো (Bow) এবং রিবন, যা হালকা বাতাসে আলতো করে কাঁপছে। গাড়ির চারপাশের দরজার হাতলগুলোতে রজনীগন্ধার ছোট ছোট ঝালর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর পেছনের ব্যাকডালা জুড়ে রয়েছে লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি করা একটি সুন্দর হৃদপিণ্ডের অবয়ব। চকচকে কালো রঙের গাড়ির ওপর লাল-সাদা ফুলের এই রাজকীয় কম্বিনেশন দূর থেকেও সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
বরের গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে প্রথমে নিচে নামল ঈশান। তার পরপরই পেছনের দরজা দিয়ে নামল রিফাত, আর সবশেষে বেশ গাম্ভীর্য নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন সোহান চৌধুরী।গাড়ির পিছনের সিটে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে শুভ্র। তার পরনে আজ খাঁটি সিল্কের তৈরি একটি অত্যন্ত দামি সোনালী রঙের শেরওয়ানি। শেরওয়ানির কলার থেকে শুরু করে পুরো বুক জুড়ে সুক্ষ্ম সুতো আর জড়ির নিখুঁত কাজ করা। তার গলার দুপাশ দিয়ে ঝুলে আছে মখমলের একটি রাজকীয় উত্তরীয়, যা শেরওয়ানির আভিজাত্যকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলেছে। বাঁ হাতের কবজিতে চকচক করছে একটি দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়ি।গাড়ি এসে থামলেও শুভ্র এখনো নিচে নামেনি। সে গাড়ির ভেতরে আরাম করে বসেই তার শেরওয়ানির পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোন স্ক্রিনের আলো তার মুখে পড়তেই সে আলতো হেসে রিদির হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করল।
“চলে এসেছ রোহিণীশ, রেডি তো তুই আমার হওয়ার জন্য? মনে রাখিস, আজ যদি তোকে নিজের করে নিয়ে যাই, ফেরার সব রাস্তা তোর জন্য ফরএভার বন্ধ হয়ে যাবে।”
পাশে বসা তূর্য শুভ্রের মিটিমিটি হাসির দিকে তাকিয়ে খোঁচা মেরে বলল,
“কিরে শালা! এখন কি গাড়ি থেকে নামবি, নাকি এভাবেই ভেতরে বসে থাকবি?”
ঠিক তখনই আশপাশের সব মানুষ হইচই করে দৌড়ে গাড়ির সামনে এসে ভিড় জমাল বর দেখার জন্য। রাবেয়া এহসান তাড়াহুড়ো করে একটা রুপোর ট্রেতে মিষ্টি, শরবত আর একটা চকচকে হীরের আংটি সাজিয়ে নিলেন। বাঙালিদের নিয়ম অনুযায়ী বরকে মিষ্টি খাইয়ে, কিছু উপহার দিয়ে গাড়ি থেকে নামাতে হয়। তাই রাবেয়া এহসান দ্রুত এগিয়ে এসে শুভ্রের পাশের গাড়ির দরজাটা খুললেন। শুভ্র তখনো নিজের মতো গভীর মনোযোগে ফোন চাপছে। রাবেয়া এহসান কাঁটাচামচ দিয়ে এক পিস রসালো মিষ্টি তুলে শুভ্রের মুখের সামনে ধরে স্নেহের সুরে বললেন,
“শুভ্র বাবা, হা কর।”
মিষ্টির কড়া ঘ্রাণে শুভ্রের নাক কুঁচকে গেল। সে সামনে তাকিয়ে চামচের ডগায় মিষ্টিটা দেখেই মুহূর্তে মুখটা দূরে সরিয়ে নিল। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির সুরে বলল,
“হোয়াট আর ইউ ডুইং ফুপি? মিষ্টি কেন? সরাও প্লিজ এটা এখান থেকে।”
রাবেয়া এহসান মিষ্টিটা শুভ্রের মুখের আরও কাছে নিয়ে আবারো স্নেহের সুরে বললেন,
“একটু খা বাবা, নিয়ম তো! একটুখানি খেতে হয়।”
শুভ্র নাক সিঁটকে আরও খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে বিরক্তির সুরে বলল,
“নো ফুপি! সরাও এটা এখান থেকে। আমি খাব না।”
পাশ থেকে তূর্য এবার শুভ্রকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,
“আরে শালা, একটু খা না! খেতে হয়, নিয়ম এইটা।”
শুভ্র তূর্যের দিকে একদম বাঁকা চোখে তাকাল। তার ডার্ক চোখের মনিতে বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“এতই যখন রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনের দরদ, তাহলে তুই খেয়ে নে!”
শুভ্রের মুখ থেকে এই চ্যালেঞ্জিং কথাটা শুনেই তূর্য জেদের বশে রাবেয়া এহসানের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। সে বলল,
“আন্টি, আমাকে দেন! এই শালার বদলে আমিই খেয়ে দিচ্ছি।”
রাবেয়া এহসান আর কী করবেন, হেসে ফেলে তূর্যকেই মিষ্টিটা খাইয়ে দিলেন। বরযাত্রী আর গেটের সামনে থাকা অন্য সব মানুষ তাদের এই কাণ্ড দেখে হো হো করে হেসে উঠল। তূর্য বেশ তৃপ্তি নিয়ে মিষ্টি চিবুতে চিবুতে শুভ্রকে খেপানোর জন্য বলল,
“তাহলে বউটাও আমায় দিয়ে দে, নিয়ম যেহেত মানিস না। কারন কবুল বলাও তো একটা নিয়ম, পরে দেখা গেল কাজি কবুল বলতে গেলে তুই মুখ ফিরিয়ে বলবি আমি কবুল বলবো না।”
কথাটা শোনা মাত্রই শুভ্র এক জোড়া জ্বলন্ত ও রাগী চোখে তূর্যের দিকে তাকাল। শুভ্রের ওই মারকুটে চাউনি দেখেই তূর্য আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না, হাসতে হাসতে সাথে সাথে গাড়ি থেকে নেমে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেল। রাবেয়া এহসান এবার আলতো হেসে শুভ্রের ডান হাতের অনামিকায় দামী হীরের আংটিটা পরিয়ে দিলেন। আংটি পরানো শেষ হতেই শুভ্র খুব ধীরস্থির পায়ে, রাজকীয় ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নিচে নেমে আসাল।
অন্য দিকে, রিদি ফোনে শুভ্রের পাঠানো সেই রোমান্টিক মেসেজটা দেখছিল। মেসেজটা পড়ার পর তার মনের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হলো। সে নিজের অজান্তেই শুভ্রার হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে সোজা ছাদে চলে এসেছে।রিদি ছাদের রেলিং ধরে নিচে ঝুঁকে গেটের কাছে শুভ্রদের গাড়ি আসা এবং মিষ্টি খাওয়ানোর সব কাণ্ড সাগ্রহে দেখছে। শুভ্রাও তার পাশে এসে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তবে নিচে মজার কান্ডে নয় শুভ্রার চোখ দুটো সম্পূর্ণ নিজের অজান্তেই নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানের ওপর গিয়ে স্থির হয়ে আছে।
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৬৭
ঈশান এখন দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে রিফাতের সাথে বেশ মনোযোগ দিয়ে কী যেন একটা কথা বলছে। তার পরনে একটা চমৎকার অ্যাশ রঙের শার্ট আর সাথে ধবধবে সাদা জিন্স প্যান্ট। শার্টের হাতা দুটো নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে কনুই পর্যন্ত গোটানো, যার ফলে তার সুগঠিত হাত দুটো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মাথার চুলগুলো খুব সুন্দর করে জেল দিয়ে গুছিয়ে ব্যাকব্রাশ করা, আর বাম হাতের কবজিতে শোভা পাচ্ছে একটি দামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি। দূর থেকে হালকা রোদের মধ্যে রোদেলা দুপুরে ঈশানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হচ্ছে, কোনো নামী দামী সিনেমার নায়ক শ্যুটিংয়ের মাঝে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা পলকহীন চোখে সেই নায়কের দিকেই তাকিয়ে রইল, যার বুকে জড়িয়ে যাওয়ার অধিকারটুকুও তার আর মাত্র দুদিন পর চিরতরে হারিয়ে যাবে।
