Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭ (৩)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭ (৩)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭ (৩)
অরাত্রিকা রহমান

রাত ২টা~
মাহির ফ্রেশ হয়ে এলে সোরায়া আর সে একসঙ্গে নামাজ সৃষ্টি কর্তার কাছে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখের জন্য দোয়া ও শুকরিয়া আদায় করেছে। এখন প্রায় ১০ মিনিট যাবত জায়নামাজের উপরেই বসে আছে দুজনে। সোরায়া এমন চুপচাপ থাকতে তেমন অভ্যস্ত নয় বরাবরই খুব চঞ্চল। অথচ এখন চুপচাপ হয়েই বসে আছে। সোরায়া একনজর মাহিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মাহির ও সেটা খেয়াল করে সোরায়ার দিকে তাকালে সোরায়া একটু ইতস্তত বোধ করে চোখ নামিয়ে নিল। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থেকেই সোরায়ার কোলে জায়গা করে নিজের মাথা সোরায়ার কোলে রেখে শুয়ে পড়লো। সোরায়া হতভম্ব হয়ে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির সোরায়ার দিকে চোখ টিপে ইশারা করে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল-

“কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার জানবাচ্চা টু আমার বাচ্চাবউ।”
সোরায়ার দ্বিধা অনেকটা কেটে গেল সাথে সাথে। এতক্ষণ ধরে সে চুপচাপ ছিল শুধু মাহিরের তরফ থেকে একটু ফ্রি সিগন্যালের আশায়। মাহিরের কথার ধাচ ধরে সেও একই ভাবে উৎসাহিত কণ্ঠে বলল-
“কন্গ্রেচুলেশনস ওন কমপ্লিটিং দ্যা জার্নি ফ্রম আমার স্যার টু আমার স্বামী জান।”
মাহির সোরায়ার মুখেও একই কথা শুনে মৃদু হেসে সোরায়ার নাকটা টেনে দিল। সোরায়া মাহিরের হাত সরিয়ে দিয়ে মাহির কে ঠেলে নিজের কোলে থেকেও উঠিয়ে দিল। মাহির প্রশ্ন করলো-
“কি হলো বউজান? কোনো সমস্যা?”
-“সমস্যা তো অবশ্যই। আপনি দেরি করে এলেন বলে আমি আগে আগেই শাওয়ার নিয়ে নিয়েছি। আপনি আমার ঘোমটাও তুলেন নি। এটা কোনো বাসর রাত হলো?”

সোরায়া মুখ ফুলিয়ে নালিশ করলো মাহিরের কাছে। সোরায়া নিজের থেকেই কিছু একটা ভেবে বলল-
“অতীত তো আর পাল্টানো সম্ভব নয়। আমি বরং শাড়ির আঁচল দিয়ে আবার ঘোমটা দিই আপনি তুলবেন কেমন?”
মাহির মুচকি হেসে সোরায়ার বাচ্চামিতে সায় দিল। সোরায়া শাড়ির আঁচল দিয়ে লম্বা করে একটা ঘোমটা টেনে দিল নিজের মুখের উপর। দুজনের একজনের মুখ থেকেও হাসি সরছে না। সোরায়া ঠিকঠাক হয়ে বসলে মাহিরের তার ঘোমটা উঠালো। সোরায়া মায়াবী ভঙ্গিতে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির নিজের বুকের বা পাশে হাত রেখে ঠাস করে ফ্লোরে পড়ে যেতে যেতে বলল-
“হায়য়, মাশাআল্লাহ, মারহাবা।”
সোরায়া মাহিরের প্রতিক্রিয়া দেখে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। মাহির সোরায়ার খুশি দেখে ফ্লোর থেকে উঠে সোরায়ার দুগালে হাত রেখে মেয়েটার মুখ কাছে নিয়ে তার কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলল-
“কি মিষ্টি আমার বাচ্চা বউটা..!”

দুজনেই বাঁধাহীন হেঁসে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই মাহিরের খেয়াল হলো আজ সোরায়া তার বড্ড কাছে। মাহিরের হাসি বেগ কমলো। তার নজর পড়লো সোরায়ার গোলাপ রাঙা ঠোঁটে। কি অসম্ভব চমৎকার লাগছে তার ঠোঁটের কোণে প্রাণবন্ত হাসির রেখা। মাহিরের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা সোরায়ার নজর এড়ালো না। ধীরে ধীরে মেয়েটার হাসির গতিও কমে এলো। মাহির সোরায়ার মুখের উপর আসা এক রাশ ছোট্ট চুলের গুচ্ছ আলতো হাতে গুছিয়ে তার কানের কাছে গুঁজে দিল। ঘরটা হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে উঠলো। সোরায়া নিজের অস্বস্তি কমাতে বানোয়াট উৎসাহ নিয়ে মাহিরের দিকে হাত পেতে বলল-
“আমার গিফট কোথায়? তাড়াতাড়ি দিন।”
মাহিরের মনোযোগ ছিন্ন হলো। সে অবাক হলো-
“তোমার গিফট..?”
প্রশ্নাত্মক ভঙ্গিতে মাহির এ কথা বলতেই সোরায়া ভ্রু কুঁচকে সোজা টানটান হয়ে বসে নিজের কোমরে হাত বেঁধে বলল-

“বাহ রে, নতুন বউয়ের মুখ দেখলেন, কিছু দিতে হবে না বুঝি? কখনো মুভি বা সিরিজ দেখেন নি? বাসর রাতে বউয়ের মুখ দেখে কিছু দিতে হয় তো। আপনি আমার জন্য কিছু আনেন নি?”
মাহির অবুঝ মুখ করে নিজের মাথা নাসূচক ডানে বামে নাড়লো। সোরায়া সঙ্গে সঙ্গে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল। সে মনখারাপ করে মুখটা নিচু করে বসে রইল। কিন্তু কোনো প্রকার বায়না বা জেদ করে মাহির কে বাজে অনুভব করানোর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না তার। তাই মুখটা নিচু রেখেই বুঝদার ভাব নিয়ে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
“সমস্যা নেই। আমার একটুও খারাপ লাগছে না। আমি আশাও করছিলাম না কিছু। বিশ্বাস করুন। আপনি মন খারাপ করবেন না প্লিজ।”
মাহির ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজের হাঁসি নিবারণের চেষ্টা করে ঘাড় কাত করে সোরায়ার মলিন মুখটার দেখলো একবার। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার চিবুকে আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে তার মুখটা উঁচু করে জিজ্ঞেস করলো-

“আমাকে মনে খারাপ করতে না করে, নিজে মন খারাপ করে এই মিষ্টি মুখটাকে বাংলার পাঁচ করে রাখলে আমার পক্ষে কি খুশি মনে থাকা সম্ভব?”
সোরায়া মাহিরের হাত নিজের কোমল স্পর্শে সরিয়ে দিয়ে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিল-
“কেন সম্ভব না? অবশ্যই সম্ভব। তা নাহলে আপনার ঠিক মনে থাকতো যে আপনার বউকে আপনার কিছু দিতে হবে। আপনি একবার আমার কথা ভাবুন তো, কাল যখন জুঁই আমাকে জিজ্ঞেস করবে আপনি আমাকে বাসর রাতে কি দিয়েছেন আমি কিচ্ছু দেখাতে পারবো না। আমার মানসম্মান কি কিছু থাকবে?”
মাহির সোরায়ার অভিমানী কণ্ঠে করা এমন অভিযোগ শুনে নিজের অজান্তেই হেঁসে ফেলল। মাহির কে তার এমন গুরুত্বপূর্ণ কথায় হাসতে দেখে সোরায়া বেশ বিরক্ত হলো। সে ছোট ছোট চোখ করতেই মাহির নিজের হাসি লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলো।
-“ধুর..আমি আপনার সাথে বাসর করবো না। হাসতে থাকুন আপনি। আমি ছোট বলে আমার একটা কথার গুরুত্ব নেই।”

রাগ দেখিয়ে সোরায়া উঠে গেল। মাহিরও হকচকিয়ে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে সোরায়ার হাত টেনে এক ঝটকায় তাকে টেনে নিলো নিজের বুকে। হাতের বাঁধন মেয়েটার হাতের কব্জি ছেঁড়ে স্থির হলো তার ধনুকের ন্যয় বাঁকা কোমরে। আকস্মিকতায় সোরায়া দুচোখের পাতা বন্ধ করে মাহিরের পাঞ্জাবি খামচে ধরলো। সোরায়া এখন মাহিরের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শুনছে- এক অদ্ভুত সুর যা অজান্তেই এক মোহে মুড়ে নিচ্ছে। মাহির নিজের পাজামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা লম্বা লাল রংয়ের সুসজ্জিত গয়নার বক্স বের করে সোরায়ার চোখের সামনে ধরে থেকে মেয়েটার কানের কাছে ঝুঁকে বলল-
“তোমার স্বামী জান থাকতে তোমার মানসম্মান কখনো কমবে না বউজান। সে কখনো এমনটা হতে দেবে না। নিশ্চিন্তে থাকো‌‌।”
সোরায়ার ধ্যান ভাঙলো। সে তৎক্ষণাৎ নিজের চোখ খুলে তাকাতেই দেখলো তার কাঙ্ক্ষিত গিফট বক্স। সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁটের কোণে ধরা পড়লো সূক্ষ্ম হাসির রেখা। সোরায়া হাত উঠিয়ে গয়নার বাক্স টা নেচে গেলে মাহির তা সরিয়ে নিল-

“আরে, তাড়া কিসের? আজ তো আমার ও বাসর, তাই না? তাহলে আমরা গিফট কোথায়?”
সোরায়া একটু অবাক হলো-
“বরকেও গিফট দিতে হয় বাসর রাতে? কই আগে শুনিনি তো! আচ্ছা সমস্যা নেই, ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং আছে। কি চাই আপনার বলুন।”
মাহির সহজ সরল ভাষায় বলল-
“এইযে একটু আগে আমার সাথে বাসর করবে না বললে এটা হবে না। আমার সাথে বাসর করতে হবে।”
সোরায়া মাহিরের হাত থেকে গয়নার বাক্স টা ছিনিয়ে নিয়ে তুচ্ছার্থে হেঁসে বলল-
“কি অদ্ভুত কথা! সেই কখন থেকেই তো আপনার সাথেই বাসর করছি। উঠে গেলেই হলো নাকি। ঘরেই তো আছি।”
কথাটা বলে সে ওভাবেই নিজের হাতে গয়নার বাক্স টা খুললো। ভেতরে একটা চকচকে সোনার চেইন আর চেইনের সাথে লাগানো একটা ছোট্ট লকেট হার্ট শেপের। সোরায়ার ঠোঁট প্রশস্ত হলো খুশিতে। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত মুখটা দেখে নিজেও বেশ খুশি হলো।

-“অনুমতি দিলে.. পড়িয়ে দিতে পারি?”
মাহিরের এই ছোট্ট প্রশ্নে সোরায়া দ্রুত তার মাথা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিল। সোরায়া আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহির সোরায়ার হাত থেকে প্যান্ডেন্টটা নিয়ে তার পিছনে বিয়ে দাঁড়ালো। মাহির সোরায়ার ঘাড়ের কাছে ছড়িয়ে থাকা একগুচ্ছ চুল আলতো হাতে সরিয়ে প্যান্ডেন্টটা পড়িয়ে দিল।
সোরায়া মাথা সামান্য কাত করে আয়নার দিকে তাকাল। গলায় নতুন পড়া প্যান্ডেন্টটা ঠিকঠাক বসেছে কিনা দেখার চেষ্টা করছে সে। মাহিরও তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আয়নায় মিলতেই অকারণেই হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল দুজনের মুখে। সোরায়া আঙুল দিয়ে প্যান্ডেন্টটা ছুঁয়ে দেখল। শাড়ির আঁচলের আড়ালে থাকায় নকশাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তাই সে আলতো করে আঁচলটা একটু সরিয়ে লকেটটার দিকে মনোযোগ দিল। ছোট্ট হার্ট-আকৃতির প্যান্ডেন্টটা আলোয় ঝিকমিক করে উঠতেই তার চোখে আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল।
মাহির চুপচাপ সেই দৃশ্য দেখে যাচ্ছে শান্ত মুখে কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা নিজের সীমা ছাড়াচ্ছে। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রকম ধুকপুক করছে। কী বলবে, কীভাবে বলবে, কিছুই যেন গুছিয়ে উঠতে পারছে না বেচারা। সোরায়া প্যান্ডেন্টটা হাতে আঁকড়ে ধরে মুগ্ধ গলায় বলল, “কতো প্রিটি লাগছে তাই না?”
মাহির শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তার গলায় কথা আটকে যাচ্ছে। উত্তেজনার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের দায়িত্ববোধ আর নার্ভাসনেস। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা নিখুঁত হওয়া উচিত, অথচ নিজের অস্থির হৃদস্পন্দনই যেন তাকে বারবার বিচলিত করে দিচ্ছে। আয়নায় সোরায়ার হাসিমুখ দেখে সে গভীর একটা শ্বাস নিল, নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টায়। মাহির সোরায়াকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার উন্মুক্ত ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলো। সোরায়ার মেয়ে দেহ কেঁপে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে-

“সস.. স্যার..!”
-“মাহির…তোমার মাহির..!”
মাহিরের এমন উৎকণ্ঠিত আওয়াজ সোরায়ার মনে তুফান সৃষ্টি করলো। সোরায়া আয়নায় মাহির কে ধীরে ধীরে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখছে। সোরায়া ভাঙ্গা বচনে আওড়ালো-
“মা..মাহির..!”
মাহিরের হৃদয়ের সকল শিকল হয়তো সেই মূহূর্তে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। মাহির আরো দৃঢ়তার সাথে সোরায়া কে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তার কাঁধে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভারী নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল-
“জান, আমার ভীষণ অশান্ত লাগছে। তোমাকে একটু ছুঁই? প্লিজ..!”
এমন আবদারে জবাবে কি বলতে হয় তা সোরায়ার জানা নেই। এমন একটা সময় তার সকল জ্ঞান তার সঙ্গ ছাড়লো। সবকিছু এতো নতুন অনুভূতি যা মানিয়ে নিতে তার হিমশিম খেতে হচ্ছে। সোরায়া নিজের চোখে পাতা বন্ধ রেখে মাহিরের উদ্দেশ্যে কাপা কাঁপা গলায় বলল-

“নিজেকে সামলান প্লিজ..!”
মাহির সোরায়াকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার কণ্ঠদেশে অসহায়ের মতো ঠাঁই নিল-
“আমি নিজেকে অনেক সামলে রাখছি, জান… বিশ্বাস করো, যদি তা না রাখতাম, তাহলে আমরা এখনো এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতাম না।”

সোরায়া মাহিরের আওয়াজে এতটা অপারোকতা কখনো অনুভব করে নি। সে সামান্য সরে এসে মাফিরের চোখের দিকে তাকালো। ছেলেটার অশান্ত মনে সাক্ষ্য দিচ্ছে চোখ দুটো বরাবরের মতো। তবে আজ সে নিজেও সেই চোখ জোড়ার স্নিগ্ধতায় বশীভূত হচ্ছে। মনের সকল দ্বিধা দ্বন্দ্বে দেওয়াল গুলো ঠাস ঠাস শব্দ করে ভেঙে পড়ছে বুকের মধ্যিখানে। মাহির সোরায়ার সম্মতির অপেক্ষায় অপেক্ষমান। বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না সে যার বহিঃপ্রকাশে সোরায়ার নিজে থেকে আত্মসমর্পণ করবে। মাহির কোমল স্পর্শে সোরায়ার উদর নিজের আয়ত্তে নিল। সোরায়া অজান্তেই নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। মাহির হঠাৎ সোরায়ার ওষ্ঠযুগলে অতর্কিত হামলা করলো। সোরায়ার শরীর নিজের সাথে বেইমানি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে হয়তো। মাহিরের আচমকা আচরণে সোরায়া হতভম্ব হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর অস্থিরতা আর বিস্ময় একসাথে ঢেউ তুলল। শাড়ির আঁচল টা কখন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো তা কারোরই মনোযোগ ধারণ করতে পারলো না। সোরায়ার ছটফটানি বাড়লো। মাহির নিজের থেকে কিছু টা দূরে সরে এলো তার থেকে। দুজনের শ্বাস প্রশ্বাস অসম্ভব পর্যায়ে ভারী। সোরায়া নিজেকে মাহিরের সামনে এতোটা অগোছালো দেখে লজ্জায় কেঁদে ফেলল। মাহির নিজের চোখের সামনে সোরায়া কে এতোটা ভেঙে পড়তে দেখে তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল। সোরায়ার কান্নার গতি বাড়লে মাহির চিন্তিত গলায় বারবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-

“সুস, কিচ্ছু হয় নি। চুপ করো জান। আচ্ছা আমি কিছু করবো না। খোদার কসম। প্লিজ আমাকে ভয় পেও না, তোমার অস্বস্তি হয় এমন কোনো কাজ আমি করব না। আমি কথা দিচ্ছি, জান প্লিজ। চুপ করো।”
-“আই.. লাভ ইউ..!”
সোরায়ার কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে একথা টুকুই মাহিরের অস্থিরতা শান্ত করলো। মাহির বুঝলো এখন তার প্রিয়সী তার কাছে কেবল ভালোবাসার নিরাপত্তা টুকু চাইছে। মাহির সোরায়ার মাথায় ছোট্ট করে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে আশ্বাস ভরা গলায় বলল-
“আই লাভ ইউ মোর দ্যান মাই সেল্ফ। আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনিথিং জান।”
সোরায়া নিজের পায়ে পাতায় ভর করে নিজের উচ্চতা বৃদ্ধি করে মাহিরের গালে ছোট্ট একটা চুমু দিল। মাহির নিজেকে শান্ত রাখল। সোরায়া অশ্রু সিক্ত চোখে গাল ফুলিয়ে মাহির কে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার কি স্বামীর আদর পাওয়া হবে না?”
মাহিরের হৃদয়ে সদ্য তৈরি করা ধৈর্যের প্রাচীর পুনরায় ভাঙা পড়লো। মাহির এবার বিরক্তি নিয়ে সোরায়ার চোখে চোখ রেখে বলল-

“যে পথে পা বাড়াতে বলছো, সেই পথে পা বাড়ালে মাঝপথে থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই সোরা। ভেবে বলো..!”
সোরায়া মাথা নিচু করে করে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“এক জিনিস কত বার ভাববো। ভয় দেখালে তো ভয় করবেই।”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সঙ্গে সঙ্গে সোরায়া কে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করে সোরায়া মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরলো। সোরায়া তখনই খে আর করলো তার আঁচল ফ্লোরে লুটুপুটি খাচ্ছে। যা এতোক্ষণ যাবত সে খেয়ালই করে নি। লজ্জায় তার মুখটা টমেটোর রূপ ধারণ করলো। মাহির সোরায়া কে কোলে নিয়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হলে সোরায়া মিনমিনিয়ে বলল-
“আঁচল টা ঠিক করতে দিন না। কি করুন হাল হচ্ছে আঁচল টার ফ্লোরে ঘেঁষতে ঘেঁষতে।”
মাহির সোরায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ঠোঁটে ছোট্ট করে একবার চুমু খেয়ে বলল-

“আঁচলে প্রতি এতো মায়া দেখিয়ে লাভ নেই। এবার পুরো শাড়ির করুন অবস্থা হবে। সেটা দেখার জন্য প্রস্তুতি নাও।”
সোরায়ার গলা শুকিয়ে এলো। মেয়েটা নিজের শাড়ির আঁচল টা কোনো মতো টেনে ঠিক ঠাকই করে নিল তার বুকের উপর। গাল বেয়ে পড়া অশ্রু কণা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে শুকনো ঢোক গিললো সে। মাহির সোরায়ার কাছ থেকে উঠে একটানে নিজের পাঞ্জাবি খুলে ফেলল। কাঙ্ক্ষিত পুরুষ কে এমন এক দৃশ্যে দেখা এক অদ্ভুত সুন্দরতম মূহুর্ত। মাহির ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে কেবল লাল ডিম লাইট অন রাখলো‌। সোরায়ার হৃদস্পন্দন থেমে গেলো এক মূহুর্তের জন্য। মাহির পুনরায় তাঁর কাছে ঝুঁকে এলে সোরায়া তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে নিল। প্রনয়সমরাঙ্গনে সোরায়া ভয়ার্ত কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে-
“আআ..আমার ঘুম পাচ্ছে..!”

এই কথার প্রতি উত্তরে মাহির পুনরায় সোরায়ার ওষ্ঠযুগল নিজের দখলে নিল। তার এলোমেলো আঁচল সরাতে সরাতে কয়েক সেকেন্ডের বিরতির মাঝে কানে কানে ফিসফিস করলো-
“আজ রাতে ঘুমের কোনো অধিকার নেই তোমার উপর। আজকের মতো ঘুমের আশা ছেড়ে দাও। স্বামীর আদরে ঘুমের কোনো স্থান নেই। আর রাতের বেলার ঘুম এখন থেকে মাথায়ও আনবে না। এতে তোমারই সুবিধা হবে।”
সোরায়া আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। মাহিরের মনে কোনো রকমের দ্বিধা দেখতে পাচ্ছে না এখন সোরায়া। তার মাথা আসছে না‌, নিজের থেকে আবদার করে এবার কোন মুখে তা অস্বীকার করবে সে। তবুও শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় নিজের শেষ লাজ টুকু ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলো সে। তবে এই উন্মাদ প্রেমিকের কাছে আজ কার এই স্ত্রী কায়া অসম্ভব রকমের দূর্বল। মাহির সোরায়ার কম্পিত চোখের পাতায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে তার বিপরীতের কোমল দেহ নিজের বক্ষ পৃষ্ঠে মিশিয়ে নিয়ে অধৈর্য স্বরে বলল-

“হাত সরাও জান।”
আদুরে কণ্ঠের কেবল এই তিনটি শব্দে সোরায়ার প্রতিরোধের সমাপ্তি ঘটলো। সকল দ্বিধারা গলে গেল। এতদিন বুকের গভীরে যত না-বলা অনুভূতি জমে ছিল, সেগুলো যেন একে একে মুক্তি খুঁজে পেল। সে ধীরে চোখ বুজল। চারপাশের পৃথিবী যেন দূরে সরে গেল, রয়ে গেল শুধু দুটো হৃদয়ের নীরব সংলাপ। জানালার বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছিল। চাঁদের ম্লান আলো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক স্বপ্নিল আবহ তৈরি করেছিল। সেই আলো-ছায়ার মাঝে সোরায়ার মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির এক অপার্থিব আভা। মুহূর্তটা উচ্ছ্বাসের নয়, বরং গভীর বিশ্বাসের। এমন এক অনুভূতি, যেখানে শব্দের প্রয়োজন হয় না; চোখের ভাষাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সত্য স্বীকারোক্তি।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭ (২)

সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। দুজনের হৃদস্পন্দন, দুজনের নীরবতা আর দুজনের অদৃশ্য বন্ধন মিলে রচনা করছিল এক অনন্য অধ্যায়—যার সৌন্দর্য ছিল আবেগে, শ্রদ্ধায় এবং নিঃশব্দ। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠার আগে মাহির সোরায়ার ছোট্ট ক্লান্ত দেহের বিপরীতে কেবল শান্তি ও তৃপ্তি তে নিমজ্জিত।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here