আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭২
অরাত্রিকা রহমান
“আমার বউ কেমন আছে ডক্টর? How is she?”
ডাক্তার ধীর পায়ে রায়ানের দিকে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে নিশ্চিন্ত গলায় বললেন-
“She is fine Mr. Chowdhury.. চিন্তা করার মতো কিছু নেই। জাস্ট অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে সেন্সলেস হয়ে গেছেন। এক ব্যাগ রক্ত লেগেছে। শরীরে বেশ কয়েকটা আঘাত প্রাপ্ত স্থান ছিল। সম্ভবত বাইক এ্যাকসিডেন্টের দরুন। তবে মাথায় তেমন কোনো গুরুতর আঘাত নেই তাই এখন তিনি সম্পূর্ণ শঙ্কা মুক্ত।”
রায়ান একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুহাতে নিজের মুখটা ঢেকে নিজে আনমনে আওড়ালো-
“শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।”
রামিলা চৌধুরী এগিয়ে এসে রায়ানের পিঠে হাত রেখে দৃঢ় চিত্তে বললেন-
“দেখেছিস? বলে ছিলাম না মিরার কিচ্ছু হবে না। শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিলিশ তুই। আমার মেয়ে টা ভীষণ শক্ত।”
রায়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল-
“তোমার মেয়ে না আমার বউ বলো…!”
রামিলা চৌধুরী ছেলের কথায় হেসে উঠলেন ছেলের কথায়। তিনি রায়ানের মাথায় হালকা করে গাট্টা মেরে বললেন-বড়
“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোরই বউ। আমার শখ নেই তোর বউকে নেওয়ার।”
-“এমন শখ না থাকলেই ভালো।”
রায়ান ডাক্তার ও নার্সদের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠা হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ডক্টর আমি কি ওর সাথে একটু দেখা করতে পারি?”
ডাক্তার সাহেব নিজের জবাবে রায়ান কে বুঝিয়ে বললেন-
“Sorry, Mr. Chowdhury..আইসিইউয়ের ভেতরে দেখা করার নিয়ম নেই। ওনাকে কেবিনে ট্রান্সফার করা হলে দেখা করতে পারবেন। প্যাসেন্ট এখন ঘুমিয়ে আছেন। ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। খেয়াল রাখবেন উনার যেন কোনো সমস্যা না হয়। এই মানসিক ট্রমা কম করতে এখন উনার রেস্টের ভীষণ প্রয়োজন। Be careful..”
রায়ান উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল-
“Sure doctor, I will be careful..”
তখনি ভেতর থেকে একজন মহিলা ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। এবং সরাসরি নার্সের দিকে তাকিয়ে নার্সের উদ্দেশ্যে বললেন-
“সিস্টার, প্যাসেন্টের জ্ঞান ফিরলে আমাকে জানাবেন। There is an emergency…I have to go.. আর ব্লাড টেস্ট এর রিপোর্ট টা সন্ধ্যায় দিলে আমার কাছে পৌঁছে দিবেন।”
নার্স ডাক্তার সাহেবার আদেশে বিনয়ের সাথে মাথা নাড়ালেন। মহিলা ডাক্তার টি আর সেখানে দাঁড়ালেন না। রায়ান একটু অবাক চোখে সেদিকে চেয়ে থাকলো। ভিতরে মিরা ছাড়া তো আর কোনো রোগী নেই।আর সে মিরার জন্য মহিলা ডাক্তারেরই দাবি জানিয়েছিল। রায়ান কৌতুহলে উপস্থিত ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো-
“ব্লাড টেস্ট..? উনি কি বললেন এই মাত্র? হঠাৎ ব্লাড টেস্ট কেন ডক্টর? কোনো সমস্যা?”
-“না না, nothing to worry about..জাস্ট এমনি চেকাপের জন্য হয়তো। আপনি মহিলা ডক্টর প্রেফার করেছিলেন তাই ইমার্জেন্সি একজন সিনিয়র গাইনি বিভাগের ডক্টর কে আনা হয়ে ছিল। উনি প্যাসেন্টকে ডিল করেছেন। উনার রেফারেন্সেই ব্লাড টেস্ট করতে দেওয়া হয়েছে। হয়তো প্যাসেন্ট ইন্টার্নালি সুস্থ আছেন কিনা সেটা নিশ্চিত হতে। আপনি এই নিয়ে ভাববেন না।”
রায়ান ডাক্তার সাহেবের কথায় খানিকটা স্বস্তি পেল। ডাক্তার সাহেব রায়ান কে প্রেসক্রিপশন ও টা বুঝিয়ে দিয়ে বললেন-
“মিস্টার চৌধুরী, প্যাস্টের জ্ঞান কখন ফিরবে ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে যখনই জ্ঞান ফিরবে তখনি নার্স কে জানাবেন। যেহেতু ম্যাডামই বিল করেছেন জ্ঞান ফেরার পরের চেকাপও তিনি করবেন।”
রায়ান রেস্ক্রিপশন টা নিয়ে ডাক্তারের কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো। ডাক্তার সাহেব যাওয়ার আগে নার্সকে আদেশ মূলক কন্ঠে বললেন-
“সিস্টার, প্যাসেন্ট কে কেবিনে সিফ্ট করার ব্যবস্থা করুন। আর সবসময় প্রয়োজনে আশে পাশেই থাকবেন।”
নার্স মাথা নাড়িয়ে ডাক্তারের কথা মেনে নিলেন। ডাক্তার সাহেব চলে গেলে মিরাকে এক দেড় ঘন্টার মধ্যেই আইসিইউ থেকে কেবিনে ট্রান্সফার করা হয়। মিরাকে অচেতন অবস্থায় কেবিনে শিফ্ট করার পর রায়ান তখনি এক মূহুর্তে বিলম্ব না করে মিরার সাথে দেখা করতে যায়।
কেবিনের দরজাটা ধীরে ধীরে ঠেলে ভেতরে ঢুকল রায়ান। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু স্যালাইন প্রবাহের হালকা টিপ… টিপ… শব্দটা যেন ঘরের ভারী পরিবেশটাকে আরও গভীর করে তুলেছে। রায়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কয়েক সেকেন্ড থমকে রইল। পা যেন আর এগোতে চাইছে না, সাহসই হচ্ছে না তার হৃদয়ের হৃদপাখিকে ওই অবস্থায় দেখার। কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল মিরার ওপর না চাইতেও। সেই এক মুখ, এক মায়াবী আভা, কিন্তু আজ কতটা ভাঙা, কতটা নিস্তেজ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। রায়ানের বুকের ভেতরটা সাথে সাথে মোচড় দিয়ে উঠল। ধীরে ধীরে নিজের পা বাড়াল ছেলেটা। প্রতিটা পদক্ষেপ যেন অস্বাভাবিক ভারী লাগছে। মিরার বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার তাকাল- খুঁটিয়ে, নিঃশব্দে মিরাকে দেখলো। মেয়েটার হাত…
সেখানে ক্যানুলা ঢোকানো, স্যালাইনের নল ধীরে ধীরে ওর শরীরে বয়ে যাচ্ছে। হাতের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট ব্যান্ডেজ- যেখানে সেলাই করা হয়েছে। পা দুটোতেও একই অবস্থা…কোথাও শুকনো রক্তের দাগ, কোথাও নতুন করে বেঁধে দেওয়া গজ। কপালের সম্পূর্ণ জায়গা জুড়ে মাথায় পেঁচানো সাদা ব্যান্ডেজ— যার উপর নিচের শুকনো রক্তের ছাপ স্পষ্ট। রায়ান হঠাৎ নিজের বুকের বা পাশটা চেপে ধরলো এক হাতে, যেন ব্যান্ডেজের প্রতিটা পাক তার বুকের ভেতরটা আরও শক্ত করে চেপে ধরছে। মিরার চোখ দুটো বন্ধ, তবুও কেমন যেন ভেজা ভেজা। চোখের পাতার কোণে জমে থাকা অশ্রু এখনও শুকায়নি। প্রিয়তমার এমন অবস্থা সহ্য করা রায়ানের চোখ জোড়ার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠল। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত জ্বালা ছড়িয়ে পড়ছে—অসহ্য, দমবন্ধ করা একটা অনুভূতি। মনে হলো কেউ যেন ভেতরটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। রায়ান মিরার পাশে বসে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মিরার আঙুলগুলো নিজের মুঠোয় নিল। তার হাতও কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে এক অন্যরকম চিন্তায়। তবুও ফিসফিস করে আলতো গলায় মিরাকে আদুরে ডাকে সম্বোধন করল—
“হৃদপাখি…!”
কোনো সাড়া নেই। শুধু সেই একই মৃদু শব্দ—টিপ… টিপ…রায়ান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে আবার তাকাল মিরার দিকে। এবার তার চোখে স্পষ্ট—স্বস্তি আর যন্ত্রণা একসাথে মিশে আছে।
সে ধীরে ধীরে মিরার কপালের পাশ দিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ব্যান্ডেজের কাছে এসে থেমে গেল তার আঙুল। গোছানো চুল গুলোর ভাজে হাত গলিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত কণ্ঠে বলল-
“খুব মজা লাগছে তাই না? যেখানে তোমার বিষন্নতা আমাকে অস্থির করে তুলে, তোমার কথার ধরনের সামান্য পরিবর্তনে আমার অস্থির লাগে, সেখানে আজ আমি তোমার নীরবতা সহ্য করছি! জানো, ডক্টর বলেছেন, তুমি ঠিক আছো। আমি বিশ্বাস করেছি। আম্মু বলেছে আমার বউটা নাকি খুব শক্ত, তার কিচ্ছু হবে না। আমি বিশ্বাস করেছি। একটু পাগলামি করি নি। আমাকে ভুল প্রমাণ করো না পাখি।”
-“কি হলো? কিছু বলছো না কেন? কথা বলবে না আমার সাথে? কি ভেবেছো? কথা না বলে এমন চুপ থাকলে আমি চলে যাবো এখান থেকে?”
মিরার মলিন মুখটা একই ভাবে স্থির। শুধু নিঃশ্বাস পড়ছে। রায়ান হেঁয়ালি করে নিজে নিজে কথা বলা অব্যাহত রাখলো-
“সবকিছু তোমার ইচ্ছায় তো আর হবে না। মৃত্যু ব্যতীত কারো সাধ্য নেই , আমার থেকে তোমাকে আলাদা করবে। এমন কি তুমিও না। বুঝেছ?”
মিরার দিকে থেকে এখনো কোনো জবাব নেই। রায়ান নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে অনবরত কিন্তু তাতে করে খুব একটা সুবিধে হয়ে উঠলো না। উল্টো তার গলার স্বর কেমন জড়িয়ে জড়িয়ে আসছে। রায়ান মিরার কপালের সাথে নিজের কপালে ঠেকিয়ে মিরাকে মিনতির সুরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“লক্ষ্মী বউ আমার, এমন কোরো না প্লিজ। আমি মোটেও শক্ত মনের মানুষ নই। তোমার অনুপস্থিতি সামলানোর মতো ক্ষমতা আমার নেই। তুমি না থাকলে যে আমি আর আমি থাকি না। একবার চোখ খুলে দেখি কি অবস্থা করেছ আমার। তোমারও মায়া হবে আমাকে দেখে।”
“তুমি আবার চোখ খুলবে… তাই না?” —কথাগুলো প্রায় ভেঙে পড়ল তার ঠোঁট থেকে। তারপর কপালটা মিরার কপালে থেকে সরিয়ে আবার বসে পড়লো পাশে। মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে মিরার হাতের ওপর ঠেকিয়ে দিল।
এই প্রথমবার…রায়ান এতটা অসহায় অনুভব করল নিজেকে। তবুও তার মুঠোটা শক্ত হয়ে রইল—যেন এই একটুকু ছোঁয়াতেই সে মিরাকে ধরে রাখতে চাইছে, যেন ছেঁড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে মানুষ টা।
তখনি রামিলা চৌধুরী একটু শুকনো খাবার নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করলেন। নিজের মেয়ের মতো আদর করা পুত্রবধূ আর নিজের ছেলেকে এমন ভাবে দেখে তার মাতৃ মনের অবস্থাও বেশ শোচনীয়। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার পরিস্থিতি টুকু নেই তার। বাড়িতে সবাই টেনশন করছিল মিরাকে নিয়ে তাই তিনি বাড়িতে কল করে সবাইকে মিরা সুস্থ আছে এখন এই খবর টুকু পৌঁছে দেন। রুদ্র মাহির এখন রায়হান চৌধুরীর সাথে থানায় গেছিল। সকল যুক্তি আর প্রমাণ রায়ানের পক্ষে ছিল আর কথা আগালে পুলিশের চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে তাই কেসটা সম্পূর্ণ হেল্প ডিফেন্সে বিবেচনা করা হয়। তবে আইনি সকল নীতি অনুসরণ করতে হবে তার জন্য। থানার কাজ শেষ করে তারাও বাড়িতে ফিরে গেছে বাড়িতে রিমি আর সোরায়া একা ছিল বলে। মিরার খবর জেনে সোরায়া এক মূহুর্তের জন্যও কান্না থামায় নি। রিমি যথেষ্ট বুঝানোর চেষ্টা করেও বুঝাতে ব্যর্থ হলে সোরায়া একপর্যায়ে কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে গেছিল। আর এখন মিরার সুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে বাড়ির সবাই নিশ্চিত। রায়ান এখনো অব্দি একটা দানা বা পানি মুখে দেয়নি বলে রামিলা চৌধুরী রায়ানের জন্য শুকনো খাবার নিয়ে এসেছেন। রাতে হয়ে এসেছে, হসপিটালে প্যাসেন্টের সাথে একজনই থাকতে পারবে। আর তিনি হাজার বললেও যে রায়ান মিরাকে রেখে বাড়িতে যাবে না তা রামিলা চৌধুরী জানেন তাই আর কিছু বলেনও নি।
রামিলা চৌধুরী রায়ানের কাছে এগিয়ে গিয়ে রায়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। রায়ান হকচকিয়ে উঠলো-
“হৃদপাখি..!” বলে।
রামিলা চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্বান্তনা দিতে বললেন-
“এমন করে নিজেকে কেন কষ্ট দিচ্ছিস? তোকে এমন দেখলে কি মিরার ভালো লাগবে?”
রায়ান অসহায়ের মতো একবার মিরার লীগকে আর পরের বার মায়ের চোখের দিকে তাকালো। নিজের চোখ দুটো মুছে নিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ শান্ত দেখিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল-
“আম্মু, রাত হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি ফিরে যাও। আমি ড্রাইভার কে বলে দিচ্ছি।”
রামিলা চৌধুরী আর কথা না বাড়িয়ে রায়ানে হাতে খাবার গুলো দিয়ে বললেন-
“আমি ড্রাইভার কে ডেকেছি। তোর ডাকতে হবে না। সারাটা দিন গেল এভাবে, না বললে হয়তো গোটা রাত ও কাটিয়ে দিবি কিছু না খেয়ে। মিরা এমনিতেই অসুস্থ নিজের মাথা ফাটিয়ে বসে আছিস। আবার বউয়ের পাশ ছাড়তেও নারাজ। অন্তত কিছু খেয়ে নে। মিরা জন্য হলেও তোর সুস্থ থাকাটা জরুরি।”
রায়ান খাবার গুলো নিয়ে রাখলো। মায়ের সাথে আর এই নিয়ে তর্কে গেল না। রামিলা চৌধুরী রায়ানের চুপ থাকা দেখেই বুঝতে পারলো রায়ান খাবার গুলো খাবে না। জেদি ছেলের সাথে পেরে উঠার সাধ্য ও ওনার নেই। অগত্যা হার মেনে নিয়ে মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মিরার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে বললেন-
“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা মা। আমি আমার ছেলের এই অবস্থা দেখতে পারছি না আর। তুই ছাড়া এই ছন্নছাড়া ছেলেটাকে কে সামলাবে বল! তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে আয়। আমরা সবাই তোর অপেক্ষায় থাকবো।”
অবশেষে রায়ান রামিলা চৌধুরীকে কে বিদায় দিয়ে এসে খাবারের প্যাকেট থেকে শুধু পানির বোতলটা বের করে একটু পানি খেল। বাকি সব ওইভাবেই পড়ে রইল। শেষ রাতটা নির্ঘুম কাটলো রায়ানের কিন্তু মাথার ব্যাথা বাড়তেই ছেলেটা মিরার পাশে বসে থেকেই মিরার হাতের উপর হাত রেখে তার উপর নিজের মাথাটা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। ক্লান্ত শরীর টা চেয়ারের উপরেই পড়ে রইলো কিন্তু মিরার সংস্পর্শে থেকে তার ওভাবেই শান্তি অনুভব হচ্ছিল।
শেষ রাতটা কেটে গিয়ে মাঝরাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে চারপাশে। কেবিনের আলোটা মৃদু করে জ্বলছে—না পুরো অন্ধকার, না পুরো আলো। ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ—মিরার চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল।
একটু… আবার থেমে গেল। তারপর আবার—ধীরে, খুব কষ্ট করে মিটিমিটি চোখ খুললো মেয়েটা। ঝাপসা… সবকিছু ঝাপসা লাগছে চোখের সামনে। ছাদের সাদা রঙ, পাশের স্ট্যান্ড, আলো—সব যেন মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ভাসছে মনে হচ্ছে তার। মিরা নিঃশ্বাস নিতে গেল—আর তখনই বুকের ভেতর তীব্র একটা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল তৎক্ষণাৎ। শরীর কেঁপে উঠল তার। নিজে নিজে হাত নাড়ানোর চেষ্টা করতেই শরীরটা যেন প্রতিবাদ করে উঠল। ব্যথা…মনে হলো পুরো শরীরটা কেউ যেন শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। হাতটা সামান্য নড়াতেই টান লাগল ক্যানুলার জায়গায় জ্বালা করে উঠল। মিরা ব্যাথার কষ্টে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। খুব আস্তে করে মাথা ঘোরাতে গেল, কিন্তু তাতেই মাথার ভেতর যেন ঝনঝন করে উঠল। ব্যান্ডেজের নিচে ধুকপুক করা যন্ত্রণা তাকে আবার থামিয়ে দিল। একটা ক্ষীণ গোঙানির মতো শব্দ বের হলো ওর ঠোঁট থেকে- “আহহ্..!”
আর তখনই ওর অনুভব হলো তার অন্য হাতটা বেশ ভারী সামান্য নাড়াচাড়াও করা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো কিছুর নিচে চাপা পড়ে আছে হাত টা। মিরা হালকা মাথা ঘুরিয়ে খেয়াল করতেই দেখলো রায়ান কে।
তার হাতের ওপর মাথা রেখে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে ছেলেটা। চোখ বন্ধ, মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চুলগুলো এলোমেলো, দাড়ির হালকা রেখা—মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরেই এভাবেই আছে। রায়ানের শুকানো মুখটা অবলোকন করেই মিরার মাথায় একসাথে আজকের সকল ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। মিরার বুকটা তৎক্ষণাৎ কেঁপে উঠল। অজানা এক ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এলো। এখন তারা দুজন কোথায়! কিভাবে বেঁচে গেল কি হয়েছিল কিচ্ছু মনে পড়ছে না তার। মনে করার চেষ্টা করলেও যেন মাথা সায় দিচ্ছে না। মিরার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। মন টা ব্যাকুল হয়ে উঠলো রায়ানের সাথে কথা বলতে। কিন্তু সে রায়ানের ক্লান্ত ঘুমে আচ্ছন্ন মুখটা দেখে থেমে গেল।
চোখের সামনের দৃশ্য টুকু একটু স্পষ্ট হতেই মিরা খেয়াল করলো রায়ানের মাথায় ব্যান্ডেজ করা। সেটা দেখেই ও আবার হাতটা নাড়াতে চাইল—খুব সামান্য… শুধু একটু ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু পারল না। ব্যথাটা আবার তীব্র হয়ে উঠল। চোখের কোণে জল জমে উঠল তার। ব্যথার জন্য… না কি রায়ানকে এভাবে দেখে—সে নিজেও বুঝতে পারল না। তবুও ওর আঙুলগুলো খুব আস্তে একটু নড়ল। মৃদু… খুবই মৃদু একটা নড়াচড়া। রায়ানের আঙুলের ফাঁকে আটকে থাকা নিজের হাতটাকে একটু শক্ত করে ধরার চেষ্টা করল মিরা— আঙুল ভাঁজ করতেই আঙ্গুলের রগ গুলোতে টান লাগলো হয়তো। মিরা সাথে সাথে আড়তনাদ করে উঠলো-
“আউউউ্..! আ.. মাআআ..”
রায়ান মিরার সেই আড়তনাদে হকচকিয়ে উঠে গেল ঘুম থেকে-
“কি..কে..এসেছে?”
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো না যে মিরার জ্ঞান ফিরেছে। সে আঁতকা ঘুম থেকে উঠে নিজের চোখ ডলতে শুরু করলে মিরাও অবাক হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে অল্প আওয়াজে বলল-
“আ.. আপনার বউ..”
রায়ান মিরার রুক্ষ গলা শুনতেই চোখ তুলে মিরার দিকে তাকালো। সে দেখলো মিরার চোখ জোড়া ড্যাপ ড্যাপ করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড নিল সে পুরোটা বিষয় প্রসেস করতে। মিরা রায়ানের এমন নীরব প্রতিক্রিয়া দেখে হেঁয়ালি করে রায়ান কে প্রশ্ন করলো-
“আপনি কি চাইছিলেন আমি সেন্সলেস থাকি? তাহলে আবার সেন্সলেস হয়ে যাই!”
মিরার এমন কথায় যেন রায়ানের হুশ ফিরল। সে কি থেকে কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে মিরার দিকে ঝুঁকে গিয়ে মিরার দুই গালে হাত রেখে শাশিয়ে বলল-
“এই না না, একদম না। খুন করে ফেলবো একদম চোখ বন্ধ করলে। চোখ খুলে রাখো। এবার চোখ বন্ধ করলে আমি মরেই যাব।”
মিরার রায়ানের ধমকিতে হাসি পেল। কিন্তু সে না হেঁসে মৃদু ভাঙা গলায় উল্টো রায়ান কে বলল-
“খুলে রেখে লাভ কি? দেখে তো মনে হচ্ছে না আপনি খুশি হয়েছেন আমাকে সুস্থ দেখে।
রায়ান চুপ করে গেল। রায়ান ঠিক কতটা পুড়েছে এতোটা সময় তা মিরা রায়ানের চোখ মুখ দেখেই বুঝতে পারছে আর রায়ান ও জানে মিরা তাকে ঠিকই বুঝতে পারছে। মুখে বলা কথা শুধুই বলার জন্য বলা। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরা কে শুয়া অবস্থা তেই জড়িয়ে ধরলো। একে অপরের সংস্পর্শে এসে দুজনেই আবেশে নিজেদের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। রায়ান মিরার গলায় মুখে গুঁজে দিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল যেন সেই এক নিঃশ্বাসে তার কষ্টের সর্বস্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মিরা রায়ান কে চেয়েও জড়িয়ে ধরতে পারছে না হাতের নড়াচড়ায় এখনো বেশ জোড়তা রয়েছে বলে। রায়ান মিরার গলা থেকে মুখে উঠিয়ে নিয়ে মিরার কপালে একটু গাঢ় চুমু এঁকে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল-
“Give me a minute baby.. I should call the doctor first..”
রায়ান মিরার থেকে উঠে সোজা দাড়িয়ে পিছন ফিরে দরজার দিকে পা বাড়াতেই মিরা হাত বাড়িয়ে রায়ানের হাত ধরে নিল। রায়ান থমকে গিয়ে মিরার দিকে ফিরে তাকালে মিরা নরম গলায় বলল-
“যাবেন না, আমার সাথে থাকুন প্লীজ। আমার ভয় করছে।”
প্রিয়তমার মুখে এইসময় এমন কথা শুনলে কোনো পুরুষ আর তাকে ছেঁড়ে কোথাও যেতে পারবে কি না, সেটা যথেষ্ট প্রশ্ন বিদ্ধকর বিষয়। রায়ান মিরার মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে তার পাশে বসলো। মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“কিসের ভয়? আমি আছি না?! আমি থাকতে আমার পাখির কিচ্ছু হবে না। আমি এখানেই আছি, কোত্থাও যাবো না।”
মিরার চোখ এখনো রায়ানের কপালের ব্যান্ডেজে আটকে আছে। সে নিজের কাঁপা কাঁপা হাত উঠিয়ে রায়ানের কপালের আঘাত প্রাপ্ত স্থানে ছুঁয়ে দেখল। নিজের হঠকারিতার পরিণামে অনুতপ্ত হয়ে বলল-
“সরি…!”
রায়ান মিরার হাত নিজের হাতের মাঝে আঁকড়ে ধরে নিজের মুখের কাছে এনে তার হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“তুমি একজনের শখের নারী। তোমার বোঝা উচিত, তুমি তাকে ধ্বংস করে দিলেও, সে ধ্বংসকে বাচ্চামি বলে উড়িয়ে দিয়ে বলবে- কিচ্ছু হয়নি পাখি।”
মিরার চোখে অশ্রু আমারা ভীর করলো। মেয়েটা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“আমাকে সত্যিটা কেন বলেন নি?”
রায়ান বুঝলো মিরা কি নিয়ে কথা বলছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“শেষ রক্ষা আর হলো কই? কি হাল করেছ নিজের, দেখছো? কিভাবে সত্যি টা বলতাম? সেদিনের ঘটনায় তোমার কোনো হাত ছিল না কিন্তু বললে ঠিক এখনকার মতোই নিজেকে দোষী ভাবতে। যা হওয়ার তা হয়েছে। তার ভোগান্তি তো দুজনকেই পোহাতে হয়েছে। বলেই বা কি হতো!”
-“আমিই তো দোষী। সেদিন যদি আমি ঝামেলায় না জড়াতাম, আপনি কখনোই এমন ষড়যন্ত্রের শিকার হতেন না।”
রায়ান মিরাকে ভারী কণ্ঠে তার কথায় মিরাকে স্বাধীনতার পাখা দিয়ে বলল-
“বেশ করেছ। আমার বউয়ের দিকে যে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করবে তার আর এই পৃথিবী দেখার প্রয়োজন নেই। যদি বিন্দু মাত্র আন্দাজ থাকতো রায়া তুমিই, সেদিন ওই বাংলোর সাথে সাথে ওই হারামজাদা গুলোকে ও জেন্ত জ্বালিয়ে দিতাম। তাতে করে যদি মৃত্যুদণ্ড ও হতো আমার কোনো আফসোস থাকতো না। ন্যায়ের জন্য লড়তে দ্বিতীয় বার ভাববে না। You can do whatever you want..I am always with you.. Remember that..”
মিরা রায়ানের কথায় এক গাল হেঁসে বলল-
“এতো তোল্লাই দিয়ে কি আমাকে ক্রিমিনাল বানাতে চাইছেন? ভুলে যাবেন না, আমি চৌধুরী বাড়ির বড় বউ। আমার একটা দায়িত্ব আছে। আওয়াড়া গিড়ি করা আমাকে মানায় না।”
রায়ান মুখে একটা আলগা ভাব নিয়ে বলল-
“ওরে বাপ রে, কি নীতিবান বউ আমার!”
মিরা রায়ানের কথায় একটু জোরে হেঁসে উঠতেই তার শরীর নড়ে উঠলো আর তার সাথে ব্যাথাও অনুভব হলো শরীরে। মিরা কপাল কুঁচকে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথাটা গিলে নেওয়ার চেষ্টা করলে রায়ান সেটা খেয়াল করে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? ব্যাথা করছে? আমি ডক্টর কে ডাকছি। তুমি আর কথা বলো না।”
মিরা সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে রায়ানের কথায় অসম্মতি দিয়ে বলল-
“ঠিক আছি তো। বসুন আপনি।”
রায়ান ধমকের সুরে বলল-
“বেশি বুঝো কেন এতো? শরীর ব্যথা করছে এটা ডক্টর কে জানাতে তো হবে, তাই না? বসে থাকলে কিভাবে হবে?”
রায়ান মিরার কোনো কথা শুনলো না। কয়েক মিনিটের জন্য কেবিনের বাইরে গিয়ে নার্স কে জানালো মিরার জ্ঞান ফিরেছে। নার্স নিজের থেকেই গেলেন নাইট শিফ্টের সেই ডাক্তার সাহেবা কে ডাকতে। রায়ান পুনরায় কেবিনে ঢুকতেই খেয়াল করলো মিরা নিজের দুহাত উঁচু করে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে। এক পর্যায়ে যখন শক্ত খাটিয়ে উঠে বসতে চাইলো রায়ান দ্রুত এগিয়ে এসে মিরাকে সাহায্য করে বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বলল-
“কি হয়েছে তোমার? এতো অধৈর্য হয়ে আছো কেন পাখি? কিছু লাগবে?”
মিরা রায়ানের হাত আঁকড়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“আচ্ছা, আমাকে সত্যি করে বলুন না আমার কি হয়েছে? আমার শরীরে এতো ব্যাথা কেন? আমাকে কি ওরা ছুঁয়ে.”
মিরার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই রায়ান মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল-
“কিসব আবল তাবল বকছো! চুপ। শরীর ব্যাথা করছে বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হাতে পায়ে আঘাত পেয়েছ তাই। আমার বুকে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ ছুঁতে পারবে না। কক্ষনো না। মাথায় ঢুকেছে?”
মিরার শরীর কাঁপছে সেসব কথা মনে পড়তেই। মিরা ভয়ার্ত গলায় কান্না ভরা স্বরে বলল-
“আমি কলঙ্কিত হলে আপনার জন্য অপবিত্র হয়ে যেতাম তাই না?”
রায়ান বুঝে উঠতে পারলো না মিরাকে কিভাবে শান্ত করবে এখন। রায়ান মিরার চোখের পানি মুছে দিয়ে তার দুগালে আদর করে চুমু খেয়ে বলল-
“কে বলেছে? তোমার পবিত্রতা আমার ভালোবাসায়। আমার ভালোবাসা সত্যি হলে পৃথিবীর কোনো কলঙ্কের শক্তি নেই যা তোমাকে আমার জন্য অপবিত্র করবে। তুমি আমার কাছে ফুলের চেয়েও বেশি নিষ্পাপ ও পবিত্র। আমার প্রাণ থাকতে আমার ফুলের উপর কেউ দাগ লাগাতে পারবে না। নিজের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি তোমাকে রক্ষা করে যাবো আমি। শুধু আমার উপর ভরসা রাখবে।”
মিরা বাচ্চার মতো রায়ানের বুকের মাঝে লুকিয়ে গেল, যেন পৃথিবীর সব থেকে সুরক্ষিত জায়গা তার জন্য এটাই। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“এরপর কখনো যদি আমাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হয়। তবে আমাকে দূরে ঠেলে দিও না, আরো কাছে টেনে নিও। তোমার থেকে পাওয়া দূরত্ব আমাকে বড্ড অশান্তি দেয়।”
মিরা অশ্রু সিক্ত চোখে রায়ানের বুক থেকে মুখ তুলি রায়ানের দিকে তাকিয়ে হেঁয়ালি করে বলল-
“বিয়ে করেছেন আবার শান্তিতে থাকতেও চান?! বউ বলে ডেকেছেন আবার জ্বালাও কমাতে চান?!
আপনি খুব নাদান বিয়াত্তা মিস্টার, খাল কেটেছেন আবার কুমির থেকেও বাঁচতে চান।”
রায়ান মিরার কথায় না চাইতেও হেঁসে উঠলো হাজারো দুঃখের ভীর ঠেলে। মিরার চুলের মাঝে হাত গলিয়ে চুল গুলো আমার ঝাঁকিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে বলল-
“হুম, মজা নিচ্ছ তো…নাও নাও। পরে বুঝাবো খাল কেটে কুমির কেন এনেছি আর সেই কুমিরের জ্বালা অশান্তি কেন সহ্য করি।”
মিরা মুখ ফুলিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে রায়ান কে জিজ্ঞেস করল-
“আমি কুমির..?!”
রায়ান হঠাৎ অতর্কিত ভাবে মিরার ঠোঁট জোড়ায় চুমু খেয়ে বলল-
“আমার বউ কুমির হক বা কেঁচো তাতে আপনার কি? আমার বউ গুনবতী, রুপবতী সব মিলিয়ে আমি জিতছি
তাকে বউ করে জীবনে এনে।”
মিরা অপলক রায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে ক্যানুলা লাগানো হাতটা রায়ান গালে রাখলো। রায়ান মিরার হাতের উপর আলতো করে হাত রেখে মিরার হাতটা ঠোঁটের কাছে নামিয়ে এনে হাতে অনেক গুলো চুমু খেলো আস্তে আস্তে যেন মিরার ব্যাথা না লাগে। মিরা মুচকি হেঁসে বলল-
“আপনার বউ ভাগ্যবতী। জিতেছে তো সে।”
-“তাই? তুমি ভাগ্যবতী?”
-“হুম…! অবশ্যই..!”
-“ভাগ্যবতী হওয়া কাকে বলে ?”
-“ভাগ্যবতী হওয়া কাকে বলে জানিনা তবে আমি চাই আমাদের যদি কখনো মেয়ে সন্তান হয় সে যেন তার বাবার মতো একজন জীবন সঙ্গী পায়।”
রায়ান সন্তুষ্ট মনে হেঁসে মিরার চুলের ঘাড়ের ভাঁজে হাত দিয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। কপালে একটা আদরের পরশ এঁকে দিয়ে মিরাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে বলল-
“অনেক কথা বলেছো। এখন একটু রেস্ট নাও। আমি এখানেই আছি, তোমার সাথে, সব সময়।”
মিরা রায়ানের হাতটা নিজের হাতের মাঝে নিয়ে বলল-
“আপনার মতো করে এতো ভালো আমাকে আর কেউ বাসে নি, আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা দীর্ঘ হোক। যত্নে রাখবেন আমায়।”
রায়ান মুচকি হেঁসে মিরার হাতটা নিয়ে চুমু দিয়ে বলল-“আজীবন..! নিশ্চিত থাকুন বউ পাখি।”
তখনি দরজায় শব্দ হলো। রায়ান ভেতর থেকে অনুমতী দিলে বাইরে থেকে কেবিনে একজন ডক্টর এবং একজন নার্স প্রবেশ করলেন।
-“Hello Mrs. Chowdhury.. এখন কেমন লাগছে শরীর?”
রায়ান মিরার কাছে থেকে একটু সরে দাঁড়ালো। মিরা হালকা হেঁসে জবাব দিল-
“এখন অনেকটা ঠিক লাগছে। শরীরে একটু ব্যাথা আছে শুধু।”
ডক্টর মিরার কাছে গিয়ে মিরার চেকাপ করে নিলেন। রায়ান তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। মাঝে মাঝেই ডক্টর কে মিরার কন্ডিশন নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল। রায়ান ডক্টর কে জিজ্ঞেস করলো-
“ডক্টর, এখন ওর কন্ডিশন কেমন? আমরা ওকে বাড়িতে কবে নিয়ে যেতে পারবো?”
-“She is fine Mr. Chowdhury..চাইলে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন উনার কোনো অসুবিধা না হয়। Just look after her than..”
-“Sure doctor, I will…”
অতঃপর ডাক্তার সাহেবা নার্সকে ইশারা করায় নার্স কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন। রায়ান একটু অবাক হলেও কিছু বলল না। নার্স কেবিন ত্যাগ করার পর ডাক্তার সাহেবা রায়ানের উদ্দেশ্যে বললেন-
“মিস্টার চৌধুরী, আপনি প্লীজ আপনার মিসেসের সাথে বসুন। আমার আপনাদের দুজনের উদ্দেশ্যেই কিছু বলার আছে। রায়ান মিরা ডাক্তার সাহেবার কথায় একে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। রায়ান গিয়ে মিরার ঠিক পাশে বসলো। ডাক্তার সাহেবা চেয়ারটা টেনে রায়ান আর মিরার সামনে বসলেন। রায়ান মিরা দুজনেই বেশ ঘাবড়ে আছে ওনাকে দেখে। ঠিক কি হতে পারে তারা কিছু বুঝতে পারছে না। ডাক্তার সাহেবা মিরার রিপোর্ট ফাইলটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টেপাল্টে পুনরায় সবকিছু দেখে নিচ্ছিলেন। তখনি রায়ান নিজ উদ্যোগে প্রশ্ন করলো-
“Is there any problem doctor..?”
ডাক্তার সাহেবা রায়ানের প্রশ্নের জবাব দিতে সোজা তাকিয়ে মৃদু হেঁসে হাতে থাকা মিরার রিপোর্ট ফাইলটা এক সাইডে রেখে বললেন-
“No, nothing wrong..আমি শুধু আমার কনফিউশন টা ক্লিয়ার করতে রিপোর্ট টা আরেকবার দেখছিলাম।”
-“what confusion doctor?”
ডাক্তার সাহেবা একঠু সিরিয়াস হয়েই রায়ান ও মিরা দুজনের উদ্দেশ্যে বললেন-
“Mr. And Mrs chowdhury, I think you guys are expecting…”
রায়ান মিরা ডাক্তারের কথা শুনে অবাক হয়ে একে অপরের চোখাচোখি করলো। তারা যা ভাবছে ডাক্তার কি ঠিক সেটাই বুঝালেও কিনা সেটাই বুঝতে পারছে না দুজন। রায়ান চট জলদি পাল্টা প্রশ্ন করলো ডাক্তারকে-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭১
“I am so sorry to ask that, but doctor.. can you explain what are we expecting?”
ডাক্তার সাহেবা মুচকি হেঁসে বললেন-
“Expecting a cute Little baby..রিপোর্ট অনুযায়ী আমার ধারণা সঠিক। She is pregnant Mr. chowdhury.. It’s been 1 and a half month.. Congratulations to both of you..”

Nxt prt plzzz