Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭১

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭১

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭১
অরাত্রিকা রহমান

আদনান মিরার কাদের দিকে হাত বাড়াতেই মিরার মনে হলো আজ হয়তো আর শেষ রক্ষা হবে না। সে পারবে না রায়ানের জন্য নিজেকে রক্ষা করতে। চোখ বন্ধ করে শেষ অশ্রু কণা বিসর্জন দিল মেয়েটা। মনে শুধু একটা মিরাক্কেল হওয়ার আশায় সৃষ্টি কর্তাকে স্মরণ করলো। এক মূহুর্ত রায়ানের কথা মনে করে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“আমাকে ক্ষমা করবেন রায়ান। আমি আমাকে হেফাজতে রাখতে পারলাম না। আপনার হৃদপাখি নিজেকে রক্ষা করতে অক্ষম।”

ঘরের ভারী, দমবন্ধ করা পরিবেশটা যেন নিজেই নিজের শ্বাস রুদ্ধ করে অপেক্ষা করছিল, কিছু একটা ঘটার।
ঠিক তখনই একটা বিকট, কাঁপন ধরানো শব্দে পোড়া, আধ ভাঙা দরজাটা যেন ভেতরের সব আতঙ্ক ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে গেল। কাঠের চৌচির হওয়া অংশগুলো বাতাসে ছিটকে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। ধুলোর ঘন স্তর মুহূর্তেই পুরো ঘরটাকে গ্রাস করলো। চারপাশটা আবছা হয়ে এলো। চোখের সামনে সবকিছু অদৃশ্য, শুধু শোনা যাচ্ছে ভারী, অস্থির পদশব্দ।
প্রতিটা পদক্ষেপ যেন মাটির বুকে আঘাত করছে, আর সেই শব্দে ঘরের ভেতর দাঁড়ানো প্রতিটা মানুষ অজান্তেই নিঃশ্বাস আটকে ফেলছে। গভীর পদক্ষেপের শব্দ গুলো মিরার কানে পৌঁছালো। আদনানের হাত আর এগোলো না থেমে গেল সাথে সাথে। মিরার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মনে একটা সূক্ষ্ম আশা উদয় হলো, ঠিক মোমবাতির সময় সীমা ফুরানোর শেষ সময়ে মাঝের সুতাতে জ্বালাতে থাকা অগ্নি শিখার ন্যায়। জ্যাক, আদনান আর বাকিরা একসাথে তাকালো ভাঙ্গা দরজার দিকে। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট নয়… শুধু একটা অন্ধকার
ছায়া। আদনান অজানা ছায়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল-
“কোন শালা এলি রে?”

হাতের বাঁধায় গুলোর আবরন একটু একটু করে সরে যেতে লাগলো।‌ আর সেই অস্পষ্ট ছায়ার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো এক অবয়ব—উঁচু, স্থির, অটল। যেন ঝড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাচীন বৃক্ষ, বা
ধ্বংসের ভেতর জন্ম নেওয়া এক প্রতিশোধের প্রতিমূর্তি।
তার মুখটা স্পষ্ট হতেই—ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ করেই ঠান্ডা হয়ে গেল। রায়ানের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে জ্যাকের চোখে অতীতের তিক্ততা ছেয়ে গেল। মিরা ওভাবেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। কে এলো তার রক্ষক হয়ে সে জানে না। শুধু মনে মনে সেই মানুষটার শুকরিয়া আদায় করে যাচ্ছে।
রায়ানের চোখ দুটো রক্তাভ, কিন্তু তাতে শুধু রাগ নেই, আছে এক অমানবিক স্থিরতা… এমন এক নীরব ক্রোধ, যা বিস্ফোরণের আগের ভয়ংকর নিস্তব্ধতার মতো।

তার দৃষ্টি কারো উপর আটকে নেই, অথচ সবার বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রায়ানের বুক উঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে, যেন বহুক্ষণ ধরে পাগলের মতো কিছু একটা খুঁজে বেড়িয়েছে। চোখের অস্থিরতার মাঝে আবার লুকিয়ে আছে এক অসহায় যন্ত্রণা। রায়ানের মাথায় তখনো অব্দি মিরার নিরাপত্তা ছাড়া কিছুই ছিল না। সে শুধু তার হৃদপাখিকে সুরক্ষিত দেখতে চাইছিল একনজর। চারপাশের পরিবেশ উপেক্ষা করে রায়ানের চোখ জোড়া মিরার উদ্দেশ্যে ছটফট করছে। ঠিক তখনি মিরা শুকনো গলায় কেশে উঠলো। রায়ানের দৃষ্টি সেই আওয়াজের অনুসরনে গিয়ে থামলো মাটিতে বাঁধা, রক্তাক্ত, ভেঙে পড়া মিরার ওপর। এক মুহূর্তের জন্য রায়ানের চোখ স্থির হয়ে গেল। সময় যেন থেমে গেল তার জন্য। কিছু ঘণ্টা আগেও দেখা সেই যত্নের শখের নারীকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দেখেছিল এখন সেই মানুষটা তার সামনে এমন অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। রায়ান অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো এই দৃশ্যটা দেখে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, মুঠো বন্ধ হয়ে গেল এমনভাবে যেন হাড়গুলো ভেঙে যাবে এখনই। চোখের কোণে অদ্ভুত এক ঝিলিক—রাগের, ব্যথার… আর অবশেষে তাকে খুঁজে পাওয়ার এক তীব্র স্বস্তির। গভীর, কাঁপা কণ্ঠে প্রায় ফিসফিস করে উঠলো—

“হৃ..হৃদপাখি…!”
এই এক শব্দেই যেন হাজারটা অনুভূতি মিশে আছে।
মিরার কানে রায়ানের কম্পিত কণ্ঠের ডাকে ধীরে ধীরে চোখ খুললো। বুকে এক অদ্ভুত শান্ত বাতাস বইছে তার, শরীরের ব্যাথা গুলো মূহুর্তে বিদায় নিল যেন। রায়ান শুকনো ঢোক গিলে নিজের মনকে একটু শান্ত করে নিয়ে দ্রুত পায়ে মিরার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। তখনি জ্যাক বাকিদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠে বলল-
“ওই ওরে আটকা। আমার বাপে যা করতে পারে নি আজকে আমি তা করবো। দুইটার একটাও যেন না বাঁচে।”
জ্যাকের চিৎকারটা শেষ হতে না হতেই চারদিক যেন হঠাৎ করে নড়ে উঠলো। দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাকের দলের সবাই এক এক করে রায়ানের উপর হামলে পড়লো।কেউ গালি দিতে দিতে ছুটে এলো, কেউ সরাসরি ধাক্কা মেরে ধরার চেষ্টা করলো রায়ানকে থামাতে। রায়ান শুধু একবার চোখ তুলে মিরার মুমূর্ষু চেহারাটাই দিকে তাকালো। ওই এক ঝলকই যথেষ্ট ছিল রায়ানের জন্য – যারা তার বউয়ের এমন অবস্থা করেছে তাদের প্রতি মনুষ্যত্বের রেশ টুকুও বিসর্জন দেওয়ার জন্য। রায়ান দৃঢ় চিত্তে মিরার থাকে নিজের পা বাড়ালে জ্যাকের দলবলের লোক একে একে রায়ানের উপর আঘাত হানে।

প্রথম লোকটা সামনে এসে সোজা রায়ানের বুকের দিকে ঘুষি চালাল। রায়ান তাকে আটকানোর প্রয়াস চালালো না। হয়তো ইচ্ছে করেই নিজের উপর আঘাত টা নিল মিরার এমন অবস্থার জন্য নিজেকে দোষী ভেবে।আঘাতটা লাগার সঙ্গে সঙ্গে রায়ায় এক পা পিছিয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস আটকালো এক সেকেন্ড এর জন্য।কিন্তু রায়ান পরবর্তী এক সেকেন্ডের জন্য ও দাঁড়ালো না। লোকটা আবারো প্রহার করার চেষ্টা করলে রায়ান তার হাত ধরে মূহুর্তের মধ্যে বাঁকিয়ে পিছনে চেপে মুচড়ে ধরলো। একটা বিকট শব্দ হলো শরীরের হাড় ভাঙার। তখনি আরেকজন পাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত চেপে ধরলো। এবার রায়ান থামতে বাধ্য হলো। দু’সেকেন্ডের মতো ধস্তাধস্তি চললো—তারপর হঠাৎ করেই সে শরীর ঘুরিয়ে লোকটার গ্রিপটা ভেঙে দিল। খুব নিখুঁত কিছু না—কিন্তু জোরে। তারপর কাছ থেকে এক ঘুষি মারলো নাক বরাবর।

লোকটা টলতে টলতে সরে গেল। পেছন থেকে কেউ একটা লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। প্রথম কয়েকটা আঘাত শরীরে নেওয়ার পর রায়ান ঘরে গেল লোকটার মুখমুখি হয়ে। লোকটা সেই লাঠি টা রায়ানের বাহুতে মারলে লাঠিটা ভাঙলো। শব্দটা স্পষ্ট শোনা গেল। মিরা তার আশে পাশে কি হচ্ছে তা দেখতে পারছে না স্পষ্ট। আধো আধো চোখ খুলে শুধু একটা দৃঢ় শরীরকে লড়তে দেখছে। বোঝার অবকাশ নেই লোকটা যে রায়ানই। সে খুব ক্ষীণ আভায় ঠোঁট প্রসারিত করলো আরো একবার তার রায়ানকে সে দেখতে পাবে বলে। কিন্তু চোখের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো রায়ান কে এই অবস্থায় দেখে। ছলছল ঘোলাটে চোখেও মেয়েটা বুঝতে পারছিল রায়ান ঠিক কতটা অস্থির হয়ে আছে তার কাছে আসার জন্য। মিরা কয়েকবার হাত পা নাড়লো কিন্তু এতে করে খুব লাভ হলো না। উল্টো ছেঁড়া কাটা স্থান গুলো জ্বলে উঠলো। ব্যাথা আরো তীব্র হলো। মুখ দিয়ে মৃদু আড়তনাদ বেরিয়ে এলো-

“আআ..হ..!”
রায়ানের কাঁধ ঝাঁকিয়ে উঠলো মিরার ব্যাথা তুর কণ্ঠে, রায়ান সামনের লোকটার গলা পেঁচিয়ে ধরে মিরার উদ্দেশ্যে উদ্বিগ্ন গলায় বলল-
“Don’t move.. stay like that..আমি আছি। কিচ্ছু হবে না তোমার। তোমার বর তোমার কিচ্ছু হতে দেবে না। আমার উপর আস্থা রাখো।”
রায়ানের কথায় মিরা স্থির হয়ে গেল। রায়ান ওই লোকের বুকে লাঠি মেরে দৌড়ে মিরার কাছে যেতে চাইলে জ্যাক পিছন থেকে রায়ানের মাথায় আঘাত করলো। রায়ানের চারপাশটা হঠাৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে এলো। পুরো ব্লেঙ্ক। রায়ান তাল সামলাতে না পেরে হাটুর ভরে বসে পড়লো। মিরা রায়ান কে দেখে ছটফট করে ডুকড়ে কেঁদে উঠলো। জ্যাক হেঁটে রায়ানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজেও রায়ানের মুখ বরাবর ঝুকলো। একবার রায়ান আর ঠিক পিছনে মিরার দিকে তাকিয়ে আদনান কে উদ্দেশ্য করে বলল-

“আহারে, লাভ বার্ডস। ওই… ওই শালিরে এই দিকে ঘুরা তো। এমনে মজা হচ্ছে না। একে অপরের দেখুক একটু। একটু তড়পাক দেখে।”
আদনান ও বাঁকা হেঁসে জ্যাকের আদেশ অনুযায়ী মিরার আঘাত পাওয়া বাহু ধরে মিরাকে তুললো। মিরা ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলে রায়ান নিজের মাথা চেপে ধরে সূক্ষ্ম আওয়াজে বলল-
“Le.. leave her…!”
জ্যাক বিকট অট্টহাসি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে মিরার কাছে গেল। মিরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। আদনান হুট করে মিরার বাহু ছেড়ে দিতেই মিরা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো‌।
-“ওহহ..সসস..মাআআআ..!”
রায়ান উদ্বিগ্ন গলায় মিরাকে বলল-

“মি..মিরা… একটু ধৈর্য ধরো। আমি আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রায়ান নিজের মাথা থেকে হাত সরিয়ে চোখের সামনে আনতেই দেখলো সম্পূর্ণ হাত রক্তে রঙিন হয়ে উঠেছে। মিরা ছলছল চোখে তাকিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো-
“আআ..আপনি..ঠি..ঠিক আআ..আছেন তো?”
রায়ান চোখ জোড়া একটু বন্ধ করে আবার খুললো। মাথা টা ঝিমিয়ে গেছে মনে হচ্ছে তার। একটু মাথাটা ঝাঁকিয়ে রায়ান মিরা প্রশ্নের স্বাভাবিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলো-
“আমি একদম ঠিক আছি। নিজেকে শক্ত রাখো কেমন? আর অল্প একটু সময়। সব ঠিক হয়ে যাবে আমি চলে এসেছি তো।”

মিরা রায়ানের চোখে মুখে ব্যথার ভাব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কিন্তু ছেলেটা এখনো মিরা কে সেটা বুঝতে দিতে নারাজ। মিরা ওই সময়টায় বুঝতে পারলো রায়ান ঠিক কেন তাকে সত্যি টা বলে নি। তার ভালোর কথা চিন্তা করেই অথচ আজ কি থেকে কি হয়ে গেল।
জ্যাক মিরার সামনে গিয়ে এক হাঁটু গেড়ে বসে মিরার চুলের মুঠি ধরে মিরার মুখ তুলে ধরলো। মিরাকে ওমন যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে রায়ান উঠে দাড়াতে চেষ্টা করলো কিন্তু তখনো সে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে অক্ষম। জ্যাক রায়ানের সেই বৃথা চেষ্টা দেখে বাঁকা হাসলো। তার পরই মিরার চোয়াল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মেয়েটার মলিন মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-

“শালা তুই কি এমন তপস্যা করেছিলিস যে এমন বউ পেলি? সুন্দরী বউ পাও আর জন্য তপস্যা করার সময় নেই তাই তোর বউটা কে নিয়ে নিলাম কেমন? I hope you won’t mind that..!”
রায়ানের চোখে আগুন জ্বলে উঠলো কথা টা শুনাল সাথে সাথে। মিরার চুল এখনো জ্যাকের হাতের মুঠোয় তাই মেয়েটার মাথায় টান লাগছে। রায়ান জ্যাক কে হুমকির সুরে বলল-
“You mother fu**.. just leave her… Don’t you dare to touch my wife..”
জ্যাক অট্টহাসি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে রায়ান কে ব্যঙ্গ করে বলল-
“শালা তোর একমাস হসপিটালে পড়ে থেকেও শিক্ষা হয়নি আবার আমাকে এখন ছিঃ অবস্থায় হুমকি দিচ্ছিস।”
মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-

“কপাল করে জামাই পাইছোস রে। Feel lucky.. কিন্তু এখন কপাল তো ভালো রাখা যাবে না। যা আমার বাপের দ্বারা হয় নি তা আমি ঠিকই করে দেখাবো। তুই ওই দিন আমার হাতে মরবি দেখেই বেঁচে গেছিলিস।”
রায়ানের একটু সময় লাগলো জ্যাকের সব কথা দুয়ে দুয়ে চার করতে। সেদিনের গাড়ির ব্রেক ফেইল করা মোটেও ন্যাচারাল ছিল না সে বুঝতে পেরেছিল। আর আজ সব পরিষ্কার হয়ে গেল ঠিক কি কারণে ঘটেছিল সেদিনের দূর্ঘটনা। রায়ান জ্যাকের কথা তুচ্ছ জ্ঞ্যান করে হেঁসে উড়িয়ে দিয়ে বলল-

“তোর বাপের দ্বারা যেমন রায়ান চৌধুরীর একটা বাল বাঁকা করার ক্ষমতা হয়ন তোর ও হবে না।”
জ্যাক রায়ানের কাছে এলে রায়ান হঠাৎ করে খুব দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে জ্যাক এর পা বরাবর এক লাথি মারলো। জ্যাক নিচে পড়ে যেতেই জ্যাকের হাতের লোহার রড টা রায়ান নিজের হাতে তুলে নিল। আর তখনই তা দিয়ে প্রহার করতে শুরু করলো জ্যাকের উপর একের পর এক। আদনান কিছু টা ভয় পেয়ে ঘাবড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু বাঁচতে হলে জ্যাকের হয়েই লড়তে হবে তাই সে আরেকটা লোহার রড তুলে নিয়ে রায়ানকে পিছন থেকে আঘাত করতে উদ্যত হলে মিরা সাটে খেয়াল করে। রায়ানের সাহায্যে সে তৎক্ষণাৎ বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের বাঁধা পা আদনানের পথের সামনে রাখে। আর আদনানও তা খেয়াল না করে এগোতেই জমিনে ছিটকে পড়লো। পোড়া ইটের উপর তার মাথাটা বাড়ি খাওয়ার সাথে সাথে সে জ্ঞান হারালো। ভারী শরীর বাঁধা দেওয়ার চেষ্টায় মিরার ছেঁড়া কাঁটা পায়ে আরো আঘাত লাগলো। তখন রায়ান হন্নে হয়ে জ্যাক কে মেরে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে রায়ান লোহার রড টা ফেলে দিয়ে জ্যাকের শার্টের কলার ধরে তার উপর বসে ঘুষি দিতে দিতে বলল-

“সেই দিন আমার না, তোর ভাগ্য ভালো ছিল যে তুই আমার বউয়ের দিকে তোর এই নোংরা নজর দেওয়ার পর ও বেঁচে গেছিস। কিন্তু আজ…আমার বউয়ের শরীর থেকে রক্ত ঝড়েছে তোর জন্য। ওর ওই প্রত্যেক টা রক্ত ফোটার দাম নেব তোর থেকে আমি।”
রায়ান জ্যাকের মুখে একের পর এক ঘুষি মেরে চলেছে। তার নিজের মাথা কেটে রক্ত পড়ছে‌, মারতে মারতে হাত কেটে গেছে সেই দিকে কোনো পাত্তা নেই তার। মিরার শরীর এখন ঝিমিয়ে আসছে। শরীর থেকে অনেকটা রক্ত ঝড়ে গেছে মেয়েটার। নিজের চোখ দুটো খুলে রেখেছে যেন শুধু রায়ান কে একবার ঠিক করে দেখার আশায়। কিন্তু এখন আর শরীর মানছে না তার কথা। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে তার। মিরার বসা দেহ ধস শব্দ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। মিরা ভাঙা গলায় আবছা রায়ানের নাম ধরে ডাকলো-

“রাআআ..য়াননন..!”
রায়ান জ্যাককে মারতে গেয়ে হঠাৎ থেমে গেল সেই ডাকে। সে মিরার মুমূর্ষু চেহারাটার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মাথায় মিরাকে হসপিটালে নেওয়াটা বেশ জরুরি ঠেকল। সে দ্রুত জ্যাকের উপর থেকে সরে গিয়ে মিরার কাছে গেল। পা মুড়ে বসে মিরার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে মিরার মাথায় হাত রেখে বলল-
“কি হয়েছে পাখি? কষ্ট হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমাকে বলো।”
মিরা আধো আধো চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে শুধু নরম ভাঙা কণ্ঠে বলল-
“আআ..আপনার মা..মাথা কেটে গেছে। খুব লাগছে তাই না? হসপিটালে চলুন প্লিজ। র.. রক্ত পড়ছে খুব।”
মিরার মুখে এই সময়েও শুধু নিজের জন্য উদ্বিগ্নতা দেখছে রায়ান। রায়ান মিলায় দেহে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলো- রক্তের ছোপ ছোপ দাগের জন্য তার কাঙ্ক্ষিত মেয়ে দেহটা এতটা মর্মান্তিক লাগছে যে তার চোখ সাথে সাথে সাথে ছলছল করে উঠলো। রায়ানের মাথায় কাঁটা জায়গায় চিনচিন ব্যাথা শুরু হলে রায়ান তা চুপচাপ সহ্য করে নিয়ে মিরায মনে আস্থা জুগিয়ে বলে-

“I am alright baby.. কিচ্ছু হয়নি আমার। একটুও লাগছে না। বিশ্বাস করো। তুমি চোখ খুলে রাখা হ্যাঁ? আর কিছুক্ষণ। শুধু হসপিটালে পৌঁছানোর সময় টুকু। Just keep your eyes open for me…”
মিরা মাথা নাসূচক নেড়ে বিড়বিড় করলো-
“পা..পারছি না।”
রায়ান জেদ ধরে মিরাকে একই কথা বলল-
“পারবে..আমি জানি তুমি পারবে। You are my strong girl right?”
মিরার ধীরে ধীরে চোখের পাতা বন্ধ করে নিল। তার পক্ষে আর চোখ খুলে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। রায়ান তখনি মিরার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে চিন্তিত কণ্ঠে মিরাকে জাগাতে বলল-
“এই..হৃদপাখি..এমন করে না লক্ষ্মী। চোখ খোলো। দেখ..আমার খুব ভয় করছে। আমাকে ভয় দেখিয় না। Open your eyes for my sake..”

ওই সময়ের রুদ্র আর মাহির পুলিশ নিয়ে ওই পোড়া বাংলোতে পৌঁছাল। সবাই দৌড়ে ভিতরে ঢুকে- রুদ্র আর মাহির সোজা রায়ান আর মিরার সামনে গিয়ে থামলো আর পুলিশের লোক জন ফ্লোরে পড়ে কাতরাতে থাকা জ্যাক ও তার পুরো দল কে তুলে এক এক করে দাঁড়িয়ে তুলতে লাগলেন। রায়ান রুদ্র আর মাহির কে দেখে আর নিজের মধ্যে কার আবেগ গুলো জমা রাখতে পারলো না। সাথে সাথে ভেঙে পরলো-
“রুদ্র, আমার হৃদপাখি আমার সাথে কথা বলছে না। তখন থেকে চুপচাপ পড়ে আছে এভাবে। তুই তোর বোনকে বল আমার সাথে কথা বলতে। প্লিজ। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে রাগে। ওকে চোখ খুলতে বল প্লিজ।”

রুদ্র রায়ান মাথার দিকে খেয়াল করে দেখলো বেশ অনেকটা অংশ কাঁটা। কিন্তু মিরার জন্য এখন যে চিন্তায় আছে সে তা কোনো ভাবে সামাল দেওয়ার মতো না। রুদ্র মাহির মিরার অচেতন দেহের দিকে একনজর তাকালো পরেরবার তাকানোর সাহস আর হলো না। রুদ্র রায়ানের কাছে বসে রায়ানের কাঁধে হাতে রেখে বলল-
“মিরার কিচ্ছু হবে না ভাইয়া। সব ঠিক হয়ে যাবে। চলো এখান থেকে। তোমাদের দুজনেরই হসপিটালে যেতে হবে।”
মিরা সম্পূর্ণ অজ্ঞান হয়ে গেছে দেখে রায়ানের মনে হলো আর এক মূহুর্তের দেরি করাও ঠিক হবে না তাদের জন্য। রায়ান ধুলো মাখা হাতে নিজের মুখটা একটু মুছে নিয়ে রুদ্রর কথায় সম্মতি দিয়ে রুদ্র কে বলল-

“হুম আর সময় নষ্ট করা যাবে না। তুই গিয়ে গাড়ি ঘোরা। আমি মিরাকে নিয়ে আসছি।”
রুদ্র উঠে দৌড়ে গেল গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে। রায়ান নিজের মাথায় হাত রেখে একটা ধাতস্থ হয়ে মিরাকে কোলে তুলে নিল। মাহির অবাক চোখে রায়ান কে দেখে যাচ্ছে। হঠাৎ করে মিরাকে কোলে করে দাঁড়াতেই তার মাথা ঘুরে গেল। তার পা টলমল করে উঠলো। মাহির রায়ানের পিঠে হাত রেখে তার ব্যালেন্স ঠিক করে রায়ানকে জিজ্ঞেস করলো-
“তুই কি পারবি? মাথায় চক্কর লাগলে ভাবিকে না হয় আমি ক্যারি করি?!”
রায়ান দৃঢ় মনে মাহির কে বলল-

“আমার বউ শুধু আমার দায়িত্ব। শুধুই আমার।”
রায়ান মিরাকে আরো নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে মিরা কে বলল-
“আর একটু কিছুক্ষণ শ্বাস ধরে রাখ আমার জন্য প্লিজ। Just breath for me..”
রায়ান বাইরের দিকে পা বাড়ালো। রুদ্র ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। মাহির পিছনের দরজা খুলে জায়গা করে দিলে রায়ান মিরাকে পিছনের সিটে শুইয়ে দেয়। একপাশের দরজা লাগিয়ে অন্য দিকে যাওয়ার সময় সে দেখলো। পুলিশ জ্যাকের ধরে নিজে দের গাড়িতে উঠাচ্ছে। তার রক্ত তখনি সাথে সাথে টগবগ করে উঠলো। জ্যাক রাগের সাথে রায়ানের চোখের দিকে তাকালো। সে নিজের হার মানতে পারছে না কোনো ভাবেই। রায়ান জ্যাকের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-

“তোকে নিজের হাত খুন করতে পারলে আমার আত্মা শান্তি পেত। আজও তোর ভাগ্য টা ভালো ছিল।”
জ্যাক রায়ানের কথায় তুচ্ছার্থে হেঁসে উঠলো। রায়ান আর সময় ব্যয় না করে গাড়ির দিকে ফিরে যেতে নিলে জ্যাক কৌশলে দ্রুত পুলিশের হাত থেকে একটা বন্দুক কেড়ে নিয়ে রায়ানের দিকে তাক করে ট্রিগার চাপার জন্য উদ্যত হলে রায়ান সেটা গাড়ির জানালায় দেখতে পায়। রায়ান আলোর গতিতে নিজের জায়গায় পরিবর্তন করে করে এবং জ্যাকের বুক বরাবর গুলী করে বেশ কয়েকটা। জ্যাকের নিথর দেহ সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মাহির রায়ানের কাছে দৌড়ে এসে উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এটা কি করলি? গান কোথা থেকে এলো তোর কাছে?”

রায়ান বাঁকা হেঁসে পুলিশের দিকে ছড়িয়ে গিয়ে তার হাতের বন্দুক টা পুলিশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
“দুঃখিত, আপনাদের জিনিস আপনাদের না বলে জিজ্ঞেস করে নেওয়ার জন্য।”
আসলে রায়ান জ্যাককে উস্কে দিতে ইচ্ছে করে তখন তার সাথে কথা বলেছে আর তখনি এক পুলিশ কর্মীর পকেট থেকে তার বন্দুক হাতিয়ে নিয়ে ছিল তার বউয়ের ওই অবস্থার প্রতিশোধ নিতে। রায়ানের হাত থেকে বন্দুক টা পুলিশের লোক রুমাল দিয়ে পেঁচিয়ে নিয়ে রায়হানকে দৃঢ় কণ্ঠে বলল-
“মি. চৌধুরী, আপনি আমাদের সামনে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। আপনি যা করেছেন তা আইনগত অপরাধ। আপনাকে আমার সাথে থানায় যেতে হবে।”
রায়ান শান্ত আর স্থির কণ্ঠে বলল-

“আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। Whatever I did is pure self defense.. আপনাদের সামনে আমাকে কেউ খুন করতে উদ্যত হলো আপনারা কিছু করতে পারলেন না। আপনাদের কি মনে হয় আমি গুলি খাওয়ার জন্য বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকবো? আমি নিজের আত্মরক্ষা করেছি। আর এই সম্পূর্ণ ঘটনা আপনাদের সামনে ঘটেছে। আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি না আমি। আইনের আরো কিছু ধারা থাকলে সেটা আইনি নোটিশ পাওয়ার পর আমার উপর তা প্রয়োগ করবেন। I am in a hurry.. Excuse me please..”
রায়ানের জবাবে পুলিশ অফিসার রা শুধু একে অপরের মুখ দেখলেন তাদের কারোরই কিছু বলার নেই রায়ানের যুক্তির সামনে। অন ডিউটি যে থেকেও যেখানে তাদের সামনে অপরাধি তাদেরই অস্ত্র ব্যবহার করে খুন করতে উদ্যত হয় এমন দৃশ্য আদালতে উপস্থাপন হলে চাকরি থাকবে কিনা সন্দেহ। আর এই দিকে থেকে এগোলেও রায়ান আত্মরক্ষার যুক্তিতে নির্দোষ প্রমাণিত হবে। নিজেদের চাকরি হারানোর ভয়েই তারা তৎক্ষণাৎ কিছু বলার সাহস পেল না। কিন্তু রায়ান যা করেছে সে নিজেও জানতো এটা নিয়ে জল ঘোলা হয়ে নিশ্চিত। কিন্তু তার চোখে কোনো আফসোস এর রেশ মাত্র ছিল না।
মাহির রায়ান কে তাড়া দিয়ে বলল-

“রায়ান পরে দেখে নেওয়া যাবে এসব। ভাবিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া টা এখন বেশি জরুরি। চল এখান থেকে।”
রায়ান দ্রুত গিয়ে গাড়িতে বসলো। মিরার মাথা নিজের কোলে রেখে গোটা রাস্তা শুরু মিরার সাথে বকবক করলো যেন মিরা একটু সাহস পায়। আদতেও তার কোনো কথা মিরার কানে পৌঁছাচ্ছে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। হসপিটালে পৌঁছানোর সাথে সাথে ডক্টরা মিরার পাল্স থেকে করে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করার কথা বলেন। রায়ান ইমার্জেন্সি মিরাকে আইসিইউতে ভর্তি করে। মিরাকে যখন আইসিইউ এর ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল রায়ান শুধু একবার মিরার হাতটা নিজের দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বলল-
“ও পাখি..তুমি আমার পাখি না বলো? আজ জেদ করো না কেমন? সুস্থ হয়ে আমার কাছে ফিরে এসো। আমি একদম কলিজার ভেতর লুকিয়ে রাখবো তোমাকে। কিচ্ছু হতে দেবে না তোমার। শেষ বারের মতো আমার কাছে ফিরে এসো আর কক্ষনো তোমাকে ছেঁড়ে যাবো না। কক্ষনো না। প্লিজ এবারের মতো আমার কথাটা রাখো।”
এরপর মিরাকে ভিতরে নিয়ে চলে গেল ওয়ার্ড বয় এবং নার্সরা। রায়ান শুধু অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আইসিইউয়ের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার সাদা শার্টটা মিরা রক্তে মিশে আছে। ছেলেটা হঠাৎ যেন শক্তি হীন হয়ে পড়লো। ফ্লোরে বসে পড়লো দুই হাটুর উপর ভর করে।

রায়ান তখনও আইসিইউয়ের দরজার পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা। মাহির এক প্রকার জোর করেই মাথায় কাঁটা স্থানের উপর ব্যান্ডেজ করিয়েছে তাকে। রায়ান এক সেকেন্ডের জন্য ও মিরার কাছ থেকে সরতে চায় নি। মাহফিলের জোড়াজুড়ি তে সে হার মেনে নিয়েই মূলত চিকিৎসা নিয়েছিল। রুদ্র বাড়িতে জানানোর পর রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরী ছুটে আসেন হসপিটালে। রামিলা চৌধুরী আইসিইউ এর সামনে এসে ছেলেকে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে যান। তিনি দৌড়ে রায়ানের কাছে গিয়ে রায়ানের মাথায় ব্যান্ডেজে হাত রেখে চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“মাথায় লাগলো কি করে? ঠিক আছিস তুই? রায়ান..! কথার উত্তর দে..মাথায় লাগলো কি করে? মিরা কেমন আছে? ডক্টর কি বলেছে?”

রায়ান নিজের এক অন্য জগতে ছিল। মায়ের কণ্ঠে কিছু টা ঘোর কাটলো মিরার নামে। রায়ান চোখ তুলে রামিলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়েই রইল। তার মুখে কোনো জবাব নেই। এতটা নিঃস্ব লাগছে তার নিজেকে। রামিলা চৌধুরী ছেলের এমন পাগল প্রায় অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। রায়ান মাকে কাছে পেয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অসহায় কণ্ঠে বলল-
“ওওও আম্মু, আমার বউটাকে ঠিক করে দাও না। ওকে আমার সাথে কথা বলতে বলো প্লিজ। আমি ওর চুপ থাকা নিতে পারছি না আর। ও আমার সাথে একটা কথাও বলে নি। আমি এতো বার ডেকেছিল একবার ও সাড়া দেয় নি। তুমি জানো আমি নিজে ওর রক্তাক্ত শরীর টা নিয়ে এসেছি এখানে? কেন এমন হলো? আমি কেন ওকে সুরক্ষিত রাখতে পারলাম না?”
রামিলা চৌধুরীর চোখে পানি চলে এলো সঙ্গে সঙ্গে। রায়ানের মিরার প্রতি আসক্তি টা এই পর্যায়ে চলে গেছে তা তিনি ভাবতেও পারেন নি। রামিলা চৌধুরী ছেলের সামনে নিজেকে আর দূর্বল করার ভুল করলেন না। তিনি চোখের পানি মুছে রায়ানের পিঠে হাত রাখলেন। রায়ান কে একটু বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে রায়ানের দুই গালে হাত রেখে বললেন-

“এমন করে ভেঙে পড়লে কি চলবে! একটু শান্ত হ। কিচ্ছু হবে না। মিরা ঠিক হয়ে যাবে। ডক্টর রা দেখছেন তো। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। মিরা আমাদের শক্ত মেয়ে। কিচ্ছু হবে না ওর।”
রায়ান মায়ের কাছে আরো বাচ্চার মতো হয়ে গেল। কোনো লোক লজ্জার শেষ নেই ছেলেটা বউয়ের জন্য এভাবে কেঁদে যাচ্ছে-

“আমি ওর কাছে এলে এতো অসহায় কেন হয়ে যাই আম্মু? ওকে আমি এভাবে আর দেখতে পারছি না। ওকে ঠিক হয়ে যেতে বলো আমার জন্য। আমার দমবন্ধ লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ আমার আত্মা নিয়ে নিচ্ছে। I need her to breath..I want her to live..ওকে বলো আমার সাথে বেইমানি করার ফল মোটেও ভালো হবে না।”
রামিলা চৌধুরী রায়ান কে বুকে জড়িয়ে নিলেন। বেশ কিছুক্ষণ তার সাথেই থাকলেও ওভাবে বসে। রায়ান বারবার শুধু মিরার কথাই বলে যাচ্ছে আর একটু পর পর আইসিইউয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা মিরার সাথে কথা বলছে। রামিলা চৌধুরী শুধু সেখানে ছেলের পাগলামি দেখছেন। হসপিটালের সব কাজ এখন রুদ্র আর মাহির দেখছে। আর রায়হান চৌধুরী থানায় চলে গেছেন সব খোঁজ খবর নিতে।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭০

বেশ কয়েক ঘন্টার পর দুইজন ডক্টর আইসিইউ থেকে বেরিয়ে এলে রায়ান দ্রুত দৌড়ে তাদের কাছে যায়। পিছনে দরজার ফাঁকা দিয়ে মিরাকে একনজর দেখার উদ্দেশ্যে উঁকি দেয় কিন্তু সে ব্যর্থ। রায়ান সব বাদ দিয়ে শুধু একটা প্রশ্ন করলো –
“আমার বউ কেমন আছে ডক্টর? How is she?”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭২

2 COMMENTS

Comments are closed.