Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭০

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭০

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭০
অরাত্রিকা রহমান

এই বলে রায়ান ফ্লাইটে উঠার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়..ঠিক পরের মূহুর্তেই রায়ান কয়েক কদম এগিয়েই থেমে গেল। যেন হঠাৎ করে পায়ের নিচে ব্রেক লেগে গেছে, মনটা পিছু টানছে একটা অদ্ভুত চিন্তায়, বুকের ভেতরটা অকারণে ধুকপুক করছে—কোনো অজানা অস্বস্তিতে। মিরার অস্পষ্ট কথা গুলো কানে বাজছে বারবার। মাথায় প্রশ্ন ঘুরছে – মিরা তাকে কি বলতে চাইলো? কিছু হয়েছে কিনা তাও তো জানা নেই।”
সে দ্রুত নিজের ফোনটা বের করে আবার ডায়াল করলো মিরার ফোন নম্বরে। একবার…দু’বার…তারপরই পরিচিত, নির্লিপ্ত একটা কণ্ঠ—

“The number you are trying to reach is currently switched off…”
রায়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল, কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো তার। ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো অজান্তেই। রায়ান আবার কল করলো। একই উত্তর। চারপাশে তখন এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা—লোকজন ছুটছে, ঘোষণা ভেসে আসছে স্পিকারে। কিন্তু তার কাছে সবকিছু যেন খুব ঝাপসা লাগছে। মন কে স্থির করতে পারছে না। রায়ান শুধু ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন আবার কল দিলে এবার মিরা ধরবে। আরেকবার চেষ্টা করলো- তবে না, অপর পাশে একই কথা। মিরার ফোন বন্ধ।
রায়ান ফোন কানে থেকে নামিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। হাতটা অজান্তেই চুলের মধ্যে চলে গেল। মাথার ভেতর শুধু চলছে—”কি বলতে চাইছিল মিরা? এমন কী জরুরি ছিল?”
রায়ান কপালে হাত রেখে একটু চেপে মনে মনে বিড়বিড় করলো-

“এই বউ নিয়ে কি এক অসহ্য যন্ত্রণায় আছি আমি! এমনি ছেঁড়ে যেতে জান চলে যাচ্ছে আমার। তার উপর এখন মহারানির ফোন বন্ধ। একটু আগেই তো কল করলো আর এখন ফোন বন্ধ দেখায় কিভাবে?”
তার চোখ একবার গেটের দিকে গেল। বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে। সময় আর বেশি নেই। এখন না গেলে ফ্লাইট মিস করবে সে।
-“উফফফ্, এইসব ভাল্লাগে? মনে হচ্ছে ছুটে চলে যাই। সবকিছু ঠিক আছে, এই টুকু ওর কণ্ঠে না শুনে যেতেও ইচ্ছে করছে না। কি যে করি এখন? আমার এত সাধের মনোয়া পাখি কি করে কে জানে!”
দ্বিধায় পড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো রায়ান ওভাবেই আর নিজের মনে নিজের সাথেই লড়াই করছে কি করবে এখন। চলে যাবে, না আরেকবার চেষ্টা করবে? বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভেবে, শেষমেশ ফোনটা ধীরে পকেটে ঢুকিয়ে নিল রায়ান। কিন্তু মুখের অস্থিরতা লুকানোর কোনো সুযোগ নেই। পা বাড়াল গেটের দিকে, তবুও মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা উদ্বিগ্নতা তাকে আঁকড়ে ধরে রইল।

হাইওয়ের লম্বা ফাঁকা রাস্তাটা যেন আজ অন্যরকম লাগছে। বাতাস ছিন্ন করে এগিয়ে যাচ্ছে একটা বাইক। স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশি স্পিডে। হেলমেটের ভেতর মিরার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—
রায়ানের কাছে পৌঁছাতে হবে। যেভাবেই হোক।
স্পিডোমিটারের কাঁটা সীমা ছুঁই ছুঁই করছে, তবুও থামার কোনো প্রয়াস নেই তার। চারপাশের গাড়িগুলো একে একে পিছনে পড়ে যাচ্ছে, রাস্তার লাইটপোস্টগুলো চোখের সামনে দিয়ে ঝাপসা হয়ে সরে যাচ্ছে।
এক মুহূর্তের জন্য তার ফোনটা হালকা কম্পন দিয়ে নিভে গেল—ব্যাটারি শেষ। মিরা একবারও তাকালো না সেদিকে। এখন কোনো কিছুরই গুরুত্ব নেই, শুধু সামনে এগোনো ছাড়া। ঠোঁট কামড়ে আরও একটু গতি বাড়ালো সে।
“হে খোদা, আমাকে আর একটু ধৈর্য দাও। রায়ান প্লিজ আপনার হৃদপাখির জন্য একটু অপেক্ষা করুন। আমাকে ছেড়ে যাবে না প্লিজ। থেকে যান আমার কাছে।”

মিরা নিজের মনেই ফিসফিস করলো। সে খুব করে চাইছে রায়ান কে একবার দেখবে এখন। চোখ জোড়ায় অশ্রু কণা গুলো ছলছল করছে মেয়েটার। বুকে প্রচণ্ড এক অদৃশ্য চাপ অনুভব হচ্ছে যেন নিশ্বাসটা গলায় এসে আটকে গেছে তার। মিরা বারবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে চোখের পলক ফেলে নিজেকে সামলে নিচ্ছে। মিরা মনোযোগ বাড়িয়ে সোজা রাস্তায় তাকালো। এয়ারপোর্ট আর খুব বেশি দূরে নয়।

একই সময় ঠিক সেই একই রাস্তায়, কিছুটা পেছনে—
রাস্তাটার ধারে কয়েকটা বাইক দাঁড় করিয়ে হালকা বিশৃঙ্খল একটা পরিবেশ তৈরি করেছে জ্যাক আর তার বন্ধুরা। জ্যাক হসপিটাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আজই প্রথম বাইক নিয়ে বেরিয়েছে বন্ধু দের নিয়ে
কারণ, তার বাইকে বসা বাড়ন ছিল বেশ কয়েক মাসের জন্য। স্বাভাবিক জীবন যাপনের অনুমতি পেতেই জ্যাকের মাথায় বাইকের প্রতি আসক্তি চাড়া দিয়ে উঠলো। আর তার প্রেক্ষিতেই আদনান ও আর অন্য টিম মেম্বার দের নিয়ে রাইডিং এ বের হয়েছে। তীব্র নেশার ধোঁয়ায় আর চাপা হাসাহাসির মধ্যে হঠাৎ করেই বাতাস কেটে একটা বাইক তীব্র গতিতে তাদের পাশ দিয়ে ছুটে গেল।
আদনান এক ঝলক দেখেই চোখ কুঁচকে সামান্য প্রশ্ন সূচক গলায় বললে উঠলো—
“রাইডার কুইন… রায়া না ওটা?”

রায়া নামটা কানে যেতেই জ্যাকের চোখে মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠলো। মিরার জন্যই যে সে তার পুরুষত্ব হারিয়েছে তা সে কখনো ভোলে নে বরং হসপিটালের বেডে শুয়ে প্রতি নিয়ত কেবল পরিকল্পনা করে গেছে তার সুস্থতা নিশ্চিত হলেই মিরা আর রায়ানের থেকে কিভাবে প্রতিশোধ নেবে সে। জ্যাক উৎকণ্ঠা হয়ে হাতের সিগারেটে সুখটান দিয়ে রাস্তায় দেখে কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“কই? কই দেখলি ওই শালিরে?”
আদনান প্রতি উত্তরে বলল-
“এইমাত্র গেল। সেই স্পিডে…এমন বাইক রাইডিং রায়ার দ্বারাই সম্ভব। আমি কখনো ভুলবো না ওর রাইডিং স্টাইল। আমার ভুল হওয়ার কথা না। ওইটা রায়াই ছিল।”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা কাটলে, জ্যাকের ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই—শুধু জমে থাকা বিদ্বেষ আর ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। একেবারে যেন মেঘনা চাইতেই জল। সে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চেপে নিভিয়ে দিল। তারপর হেলমেটটা তুলে মাথায় পরতে পরতে নিচু গলায় বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল—
“তোরা বাইক স্টার্ট দে। আজকে পুরোনো সব হিসেবের হালখাতা হবে। পাখি শিকারের এই সুবর্ণ সুযোগ কি আর হাত ছাড়া করা যায়!”
সেকেন্ডের মধ্যে কয়েকটা ইঞ্জিনের গর্জন শুনা গেল। বাইক স্টার্ট হতেই বাইকের গর্জন যেন চারপাশ কাঁপিয়ে দিল। এক সেকেন্ড দেরি না করে ফুল থ্রটল দিল জ্যাক। পিছন থেকে একে একে চারটা বাইক তার সাথে লাইন ধরে ছুটেলো।

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জ্যাক ও তার টিম প্রায় মিরার বাইকের গতির সমান পর্যায়ে এসে গেছে।
সামনে—
মিরা কিছুটা দূরে হালকা বিকট শব্দ শুনতে পেল। প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু বিকট শব্দটা দ্রুত বাড়তে লাগলো।
মিরা প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো সাধারণ কোনো গাড়ির শব্দ। হাইওয়েতে এমন তো হয়ই। কিন্তু শব্দটা থামলো না—বরং দ্রুত, অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে লাগলো।
একটা… দুইটা… না—একাধিক ইঞ্জিনের গর্জন। তার কপাল হালকা কুঁচকে গেল। স্বভাবগত সতর্কতায় এক ঝলক রিয়ার ভিউ মিররে তাকাতেই শরীরটা কেঁপে উঠলো তার। সাথে সাথে বাইকের ব্যালেন্স টা সামলে নিল। দূরে পাঁচটা বাইক তার পিছন ধেয়ে আসছে মনে হলো তার।
বাইক গুলো কাছাকাছি এলে মিরা বাইক গুলো খেয়াল করে দেখতে শুরু করলো। রাইডিং কমিউনিটির প্রায় সবাই নিজেদের বাইকে নিজের নাম খচিত করে রাখে। স্বাভাবিক ভাবে জ্যাক ও আদনানের বাইকেও তাদের নাম লিখে রাখা আছে। মিরা তাদের নাম গুলো পড়তেই একটু ভয়ে নিজের মধ্যে শিটিয়ে গেলো। তার বুঝতে আর দেরি হলো না যে—এটা কাকতালীয় না।
মিরার আঙুলগুলো হ্যান্ডেলের উপর শক্ত হয়ে চেপে বসলো। গ্লাভসের ভেতরেও তার হাতের চাপ বোঝা যাচ্ছে। শ্বাসটা যেন হঠাৎ আটকে গেল, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠলো তৎক্ষণাৎ। মিরা দ্রুত নিজের বাইকের গতির বাড়িয়ে দিল-

“Oh god, not now…at least..আমি এখন এসবের মুডেই নেই।”
মিরার ঠোঁট নড়লো খুব আস্তে। কিন্তু সেই থেমে থাকা শ্বাসের পরেই চোখদুটো বদলে গেল। দ্বিধা মুছে গিয়ে জায়গা নিলো তীক্ষ্ণ, স্থির এক মনোযোগ। সে গিয়ার নামিয়ে এক ঝটকায় থ্রটল ঘুরিয়ে দিল। ইঞ্জিনের গর্জন আরও তীব্র হয়ে উঠলো। বাইকটা যেন সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বাতাস এখন আর শুধু ছুঁয়ে যাচ্ছে না—ধাক্কা দিচ্ছে, শরীর কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। মিরা নিজেকে সাহস দিয়ে বলল-
“Come on রায়া। আজকের মতো সামলে নে। You can’t lose today..there is no fucking way…!”
পিছনে—
জ্যাক মিরার স্পিড বাড়ানোটা লক্ষ্য করে একটা শায়তানি হাসি হাসলো। বাইকের উপর শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে, যেন পুরো শরীর দিয়ে গতি টেনে নিচ্ছে। তার চোখ স্থির, এক বিন্দুতেও নড়ছে না। সামনে ছুটে চলা সেই একটা বাইক, সেই একটা টার্গেট। ঠোঁটের কোণে সেই একই বাঁকা হাসি, কিন্তু চোখে ঠান্ডা, হিসেবি আগুন। জ্যাক ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বিড়বিড় করলো-
“পালিয়ে কোথায় যাবি শালি…আজকে তোর ওই ডানা কাটবে জ্যাক। দেখি তোর কোন রায়ান তোকে বাঁচায় আজকে।”
জ্যাকের থ্রটল আরও ঘুরলো। পিছনের চারটা বাইক একসাথে গর্জে উঠলো, দূরত্বটা গিলে ফেলতে শুরু করলো তারা।

সামনে—
মিরা আবার একবার মিররে তাকালো। এবার বাইক গুলো খুব কাছাকাছি তার। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে সামান্য ভয়ে, কিন্তু হাত কাঁপছে না। মিরার নার্ভ বরাবর খুব স্ট্রং। সে নিজের উপর জোড় খাটিয়ে নিজেকে স্থির ধরে রাখলো বাইকের উপর। সে দ্রুত চোখ মিররের থেকে সরিয়ে সামনে তাকালো। রাস্তা সোজা, কিন্তু সামনে দূরে একটা হালকা বাঁক। সেই বাঁকটা পার হলেই এয়ারপোর্টের প্রবেশমুখ। গন্তব্য এত কাছে, অথচ এত দূর মনে হচ্ছে।
-“আর একটু…” দাঁত চেপে বললো মিরা।
সে শরীরটা আরও নিচু করলো, বাইকের সাথে একদম মিশে গেল যেন। স্পিডোমিটারের কাঁটা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম, কিন্তু তার চোখে এখন কোনো হিসেব নেই।

পিছনের শব্দ হঠাৎ করেই আরও জোরে শোনা গেল। জ্যাক মিরার হটকারীতার সুযোগ নিয়ে তাকে ফাঁদে ফেলতে আদনান কে ইশারায় মিরাকে ডান দিক থেকে চাপ দিতে বলল- আর সে মিরাকে বাম দিক থেকে আটকানোর চেষ্টা করবে। জ্যাকের কথা মতো আদনান নিজের বাইকটা এক টানে মিরার ডান পাশে নিয়ে যায়।
ডান দিক থেকে একটা বাইক পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে, মিরা সেটা টের পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডেল হালকা ঘুরিয়ে লেন বদলালো। খুব হিসেব করে, খুব দ্রুত।
বাইকটা তার এক হাত দূর দিয়ে বেরিয়ে গেল, বাতাসের ধাক্কায় মিরার বাইকটা এক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠলো। কিন্তু সে সামলে নিলো। কিন্তু তখনি জ্যাক হঠাৎ বাম দিক থেকে বাইক টান দিয়ে সোজা আঘাত করলো মিরার বাইকের সামনের চাকায়। নিজের বাইক হলে হয়তো মিরা তবু ও এই ধাক্কা সামলে নিতো কিন্তু রায়ানের বাইকে তার তেমন লাগাম নেই আর দুটো বাইকে আকাশ পাতাল তফাৎ। বাইকটা অতিরিক্ত স্পিডে থাকায় আর মিরার পক্ষে তা ধরে রাখা সম্ভব হলো না।

মূহুর্তের মধ্যে সব কেমন মিরার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেল। হাইওয়ের মাঝখানে একটা চূর্ণ বিচূর্ণ বাইক আর একটা রক্তাক্ত মেয়ে দেহ পড়ে আছে। তাড়াহুড়ো তে হেলমেট ছাড়া কোনো সেফটি ই মিরা নেয় নি। হেলমেট পড়ার জন্য মাথায় তেমন আঘাত না লাগলেও হাত পায়ের অবস্থা করুণ। শরীরের বিভিন্ন কাঁটা জায়গা থেকে গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু দেহের যন্ত্রণা বোঝার অনুভূতিটুকু মিরার নেই। সজ্ঞানে থাকার শেষ কিছু সেকেন্ড মিরা নিজের চোখ জোড়া মিটিমিটি খুললো। আকাশ বরাবর একটা বিমান উড়ে চলে গেল তার চোখের সামনে। মিরার চোখের সামনে রায়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ভেসে উঠলো আর কানে বাজলো তার বলা শেষ কথা গুলো-
“আমার জন্য শুধু নিজেকে সুরক্ষিত রেখ। তাতেই আমার লাখ শুকরিয়া। এতো টুকু তো পারবেই নাকি?”
মিরার চোখের কার্ণিশ বেয়ে দুফোঁটা অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়লো। নিজের চোখ বন্ধ করার আগে অনুতপ্ত মনে মিরা বিড়বিড় করলো-

“স..সরি..রায়ান!”
জ্যাক বাইক থেকে নেমে মিরার রক্তাক্ত দেহের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আদনান কে বলল-
“দেখ তো শালি মরে গেছে কিনা!”
আদনান মিরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার নাকের কাছে হাত রেখে বলল-
“এই শালি এতো সহজে মরবে না। শ্বাস তো চলছে। একটু ধীরে। কি করবো এখন? লোক জড়ো হয়ে যাবে এখনি।”
জ্যাক আদনান কে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“আমাদের সেই পোড়া বাংলোতে নিয়ে চল একে। এই সব কিছুর শুরু যেখানে, শেষ ও সেখানেই হবে।”
এরপর লোক জন জোড়ো হতে শুরু করলে জ্যাক আর আদনান মিরাকে তাদের সাথের একজন রাইডার দাবি করে তাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার নাম করে নিয়ে যায় তাদের পোড়া বাংলোতে। যা রায়ান নিজের হাতে জ্বালিয়েছিল।

দুপুর ১.৩০ মিনিট~
-“হৃদপাখি…! হৃদপাখি…!”
একটা মিষ্টি ডাক শোনা গেল চৌধুরী বাড়িতে। রায়ানের গলায় এই ডাক কারোর জন্যই নতুন নয়। রামিলা চৌধুরী রায়হান চৌধুরী রুদ্র রিমি সোরায়া সবাই ড্রয়িং রুমে চিন্তিত অবস্থায় বসেছিল। রায়ানের কণ্ঠ শুনে সবার মতি ফিরল। রায়ান হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলে রায়ান কে দেখে রামিলা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন-
“রায়ান!”
রায়ান সবাইকে একসাথে ড্রয়িং রুমে দেখে মুখে একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলল-

“Surprise.. I am back..!”
রামিলা চৌধুরী দ্রুত পায়ে রায়ানের কাছে গিয়ে রায়ান কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। রায়হান চৌধুরী ও রুদ্র একে অপরকে দেখে যাচ্ছে বিস্ময়ে- রায়ান এখন বাড়িতে! তাহলে মিরা কোথায়? রায়ান মাকে এতোটা আবেগ প্রবন হতে দেখে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“কি হয়েছে আম্মু? কাঁদছ কেন? আমি তো ভাবলাম আমি না গেলে তোমরা খুশি হবে। তুমি খুশি হও নি যে আমি যাই নি?”
রামিলা চৌধুরী কোনো উত্তর দিলেন না। রায়ান একে একে সবার চেহারা খেয়াল করলো। কারো মুখেই ঠিক হাঁসি নেই যেটা সে আশা করছিল। তবে ওই দিকে আর পাত্তা দিল না। রায়হান চৌধুরী রায়ান কে প্রশ্ন করলেন-

“তুই কি ফ্লাইট মিস করেছিস? কাজ থাকা স্বত্বেও কেন গেলি না?”
রায়ান একটু ভেবে বলতে নিল-“ফ্লাইট মিস করবো কেন! এমনি যাই নি। আসলে, তোমাদের কথা খুব..!
পুরোটা না বলে আবার একটু লাজুক হেঁসে বলল-
“থাক আর মিথ্যা না বলি। আমার পক্ষে মিরাকে ছাড়া থাকা সম্ভব না। এয়ার পোর্টেই শ্বাস আসছিল না ওকে ছাড়া। প্লেনে উঠলে হয়তো মরেই যেতাম। আমি আমার বউকে বিধবা করতে চাইনা তাই আর যাই নি। মন বলল থেকে যেতে আমি থেকে গেলাম।”
বাড়ির সবাই রায়ানের কথায় অবাক। এখন সকলের মনে একটাই প্রশ্ন তাহলে এতোটা সময় ধরে মিরা কোথায় আছে? রায়ান চারদিকে নজর ঘুরিয়ে রামিলা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলো-
“আম্মু, মিরা কোথায়? আমি যাওয়ার পর কাঁদে নি তো? মন খারাপ করে ঘরের দরজা লাগিয়ে বসে আছে তাই না? তখন কল করলো, কিন্তু কিচ্ছু শুনতে পেলাম না নেট প্রবলেম এর জন্য। আর এর পর থেকে মেডামের ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। হয়তো রাগ করেছে। তোমরা কিন্তু ওকে বলো না আমি এসেছি। একটা সারপ্রাইজ প্লেন করে রাতে ওর সামনে যাবো। সবার মনে থাকবে তো কথা টা?”

কেউ কোনো কথার জবাব দিচ্ছে না। কিন্তু সোরায়ার মিরাকে নিয়ে টেনশন হচ্ছে। সে রায়ানের থেকে আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে চায় নি। কেউ কিছু বলছে না দেখে সোরায়া রায়ানের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“ভাইয়া, তুমি বাড়িতে চলে এলে তাহলে আপু কোথায়? আপু তো তোমাকে ফিরিয়ে আনতেই গেল। এখনো ফেরে নি।”
রায়ান আশ্চর্য গলায় প্রশ্ন করলো-
“মানে..? আমাকে ফিরিয়ে আনতে গেল এই কথার মানে কি?”
সোরায়া কাঁদতে কাঁদতে রায়ান কে সবটা খুলে বলল। মিরা তার অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা জানতে পেরে বাড়িতে কি পাগলামি করেছে আর তখনই বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেছে রায়ানের কাছে। সবটা শোনার পর রায়ানের চোখ দুটো আগুনের ন্যায় জ্বলতে শুরু করেছে। নিজের গায়ের কোর্ট টা খুলে মেঝেতে আছাড় মেরে চেঁচিয়ে উঠলো সকালের উপর-

“Are you guys kidding me…? ওমন ভলনারেবল অবস্থায় মিরা বাইরে গেল কি করে? তোমরা কি করছিলে?”
রামিলা চৌধুরী রায়ানকে বোঝাতে চাইলেন-
“মিরা সব কিছুর জন্য নিজেকে দোষী ভাবছিল। ওই মূহুর্তে ও তোকে কাছে পেলে শান্ত হবে তাই আমরা..!”
রায়ান রামিলা চৌধুরী কে কথা সম্পূর্ণ না করতে দিয়েই আবার চেঁচিয়ে উঠলো-
“Come on.. আম্মু, তুমি অন্তত এমন কথা বলো না। মিরা এমন কিছুই ভাববে জেনেই আমি ওকে কখনো সত্যি টা বলি নি। আর এটা তোমরা সবাই ভালো করে জানো। এতো কিছুর পরেও এমন ভুল তোমাদের কিভাবে হয়? ওকে ওই অবস্থায় বাইরে যাওয়ার অনুমতি কে দিয়েছে? তাও আবার বাইক নিয়ে। যদি সামলাতে না পারে নিজেকে ভেবে দেখেছ কি হবে?”
রামিলা চৌধুরী রায়ানের একটা প্রশ্নের ও উত্তর দিতে পারলেন না। রায়ান সোজা প্রশ্ন করলো-
“কখন বেরিয়েছে ও?”

সোরায়া উত্তর করলো-“দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে ভাইয়া।”
সময় শুনে রায়ানের মাথা যেন আরো বিগড়ে গেল। রায়ান সোরায়ার উপরেই চেঁচিয়ে উঠলো-
“দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে অথচ আমার কাছে একটা কল অব্দি যায় নি। আমাকে একবার কেউ জানানোর প্রয়োজন বোধ করলি না এতো কিছু হয়ে গেছে কয়েক মিনিটের মধ্যে। কি করছিলি এতক্ষণ?”
সোরায়া রায়ানের কথা কেঁপে উঠলো‌। চোখ ছলছল করছে। রুদ্র রায়ান শান্ত করতে রায়ানের কাছে আসতে চাইলে রায়ান রুদ্র কে থামিয়ে দিয়ে বলল-
“ওখানেই থেমে যা, একদম আমার ধারে কাছে আসবি না?”
রুদ্র রায়ান কোনো কথা না শুনে এগিয়ে যেতেই রায়ান রুদ্র কলার চেপে ধরে বলল-
“কেমন ভাই তুই? আমার অবর্তমানে নিজের বোনটাকে সামলাতে পারলি না কেন? You idiot…তোর বোন কি বাচ্চা যে যা আবদার করবে তাই করতে দিবি? বাইক নিয়ে কিভাবে বেরোলো ও? তুই কোথায় ছিলি? ওর সাথে গেলি না কেন?”

রামিলা চৌধুরী রায়ানের এমন রূপ দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে গেছেন। রুদ্র মাথা নিচু করে রায়ানের কথা শুনছে তার এখন আফসোস হচ্ছে কেন সে মিরার সাথে গেল না বা কেন মিরাকে আটকালো না। রায়ান মিরার জন্য অতিরিক্ত টেনশনে রুদ্র কে হুমকির সুরে বলল-
“আমি জানি না কিভাবে আর কোথা থেকে আনবি। তোর বোনকে আমার চাই। আমার বউ কে আমার কাছে এনে দিবি তুই। অক্ষত চাই আমি ওকে।”
রামিলা চৌধুরী রায়ানের থেকে রুদ্র কে ছাড়াতে চেষ্টা করতে করতে রায়ান কে বললেন-
“রায়ান, শান্ত হ। কি করছিস এসব? পাগল হয়ে গেছিস নাকি?”
রায়ান সজোরে চেঁচিয়ে উঠলো তার মায়ের উপর-

“হ্যাঁ হয়ে গেছি পাগল। আর এখন যদি আমার বউকে আমি অক্ষত না পাই আমার পাগলামির চূড়ান্ত সীমা দেখবে তোমরা। তোমার বউমার জন্য আমি একটু শান্তিতে নিঃশ্বাসও নিতে পারবো না। একটু চোখের আড়াল হতেই এত কিছু করে ফেলেছে সে। যবে থেকে জীবনে এসেছে মনে হয় ওকে ছাড়া আমার রাত দিন হয় না। আমি কি এভাবে ওর পিছনে লেগে থাকবো? নিজের পরোয়া কেন করে না ও? আরে একটা এ্যাকসিডেন্ট ই তো হয়েছিল মরে তো যাই নি! আর তোমরা এতো টুকু ওকে বোঝাতে পারলে না কেন?”
রামিলা চৌধুরী রায়ানের চোখে রাগের পেছনের অসহায়ত্ব আর ছেলের তার বউয়ের উপর নির্ভরশীলতা দেখতে পেলেন। নিজের সর্বস্ব হারিয়ে গেলেও কেউ এমন করে কিনা সন্দেহ। রায়ান রুদ্রকে ছেঁড়ে দিয়ে নিজের শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে লম্বা হাতা মুড়ে নিল। শরীরের রক্ত যেন ভেতরে টগবগ করছে। রায়ান সবার মাঝেই নিজেকে দোষী করে বলে উঠল-

“Actually, ভুলটা আমার। আমার ওকে একা ফেলে কোথাও যাওয়াই উচিত না। একটু চোখের আড়াল করতেই ডানা গজিয়ে যায় ওর। আজকে ওকে পেলে যে আমি কি করবো ওকে..!”
আজ দ্বিতীয় বারের মতো সবাই রায়ান কে ছন্নছাড়া দেখছে। রায়ান নিজের চুল হাতের মুঠোয় চেপে ধরলে রায়হান চৌধুরী রায়ানকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“রায়ান, মিরাকে নিয়ে আমরা সবাই টেনশন করছি। তুই..!”
রায়ান রায়হান চৌধুরীকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল-
“Yeah right, tension.. তোমার বউমা আমাকে টেনশন দিয়েই মেরে ফেলবে। ওই সব অ্যাকসিডেন্টে রায়ান চৌধুরীর কিছু না হলেও তার বউয়ের দ্বারা তাকে খুন করাও সম্ভব।‌ ওর কি? ওর তো কিছু না। বউ তো আমার, আর আত্মাও জ্বলছে আমার, পুড়ছিও আমি।”

রায়হান চৌধুরী রায়ানের চোখে মিরাকে হারিয়ে ফেলার স্পষ্ট ভয় দেখতে পাচ্ছেন যেটা রায়ানের মাঝে তিনি কখনো দেখুন নি ছোট থেকে আজ এখন অব্দি। তিনি রায়ান কে এতোটা হাইপার হতে দেখে নিজের থেকে রায়ান কে বুকে জড়িয়ে ধরে সাহস যুগিয়ে বললেন-
“অনেক হয়েছে। চুপ কর। মাথা ঠান্ডা করে ভাব কি করা যায়। মিরা বাচ্চা মেয়ে না যে হারিয়ে যাবে। আশেপাশেই কোথাও আছে। ও কোথায় যেতে পারে কিছু জানিস?”
রায়ান অদ্ভুত হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে বাবাকে বলল-
“ও কেন আমাকে বোঝে না আব্বু? আমি ওকে ছাড়া অসম্পূণ। I just can’t afford to lose her.. তুমি আমাকে আমার হৃদপাখি এনে দাও। আমার আর কিচ্ছু চাই না। আমি আর কখনো ওকে ছেঁড়ে কোথাও যাবো না। কখনো না। ও আমাকে কেন এভাবে জ্বালায়?”

রায়হান চৌধুরী ছেলের এমন ভারাক্রান্ত কণ্ঠ শুনে রামিলা চৌধুরীর দিকে তাকালেন। রামিলা চৌধুরী নিজেও ভয়ে পেয়ে আছেন এই ছেলেকে নিয়ে। রায়হান চৌধুরী রায়ানের পিঠে রাব করে শান্ত গলায় বললেন-
“রায়ান, আমি তোকে ছোটবেলায় একটা কথা বলে ছিলাম মনে আছে? Never lose hope until it’s over my son..মিরা তোকে কতটা বোঝে..কতটা ভালোবাসে সেটা আমরা সবাই আজ দেখেছি। মেয়েটা তোকে সুস্থ দেখেও কেবল অতীতের কথা চিন্তা করে তোকে এক নজর দেখার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিল। সেই পাগলামির তো কোনো বাধ হয় না। পৃথিবীর অন্যতম সেরা মুহূর্ত হলো- যখন দুজন মানুষ একে অপরকে একই ভাবে চায় আর একই ভাবে ভালোবাসে। তোরা ভাগ্যবান। মিরার কিচ্ছু হবে না। তুই আল্লাহর উপর ভরসা রাখ।”
রিমি রায়ান কে একগ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল-
“রায়ান ভাইয়া, আপনার কি এমন কোনো জায়গার কথা জানা আছে যেখানে মিরা যেতে পারে? বা ও কোথায় আছে জানা যাবে এমন কোনো উপায় আছে?”

রায়ান পানি খেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিমির কথাটা চিন্তা করতেই তার মাথায় এলো মিরার হাতের ব্রেসলেট টার কথা। (ব্রেসলেট টা একবার হারিয়েছে যেহেতু আবারও হারাতে পারে এই ভেবে রায়ান ওই ব্রেসলেটে একটা ট্র্যাকিং ডিভাইস সেট করতে দিয়েছিল। যেটার কাজ শেষ হওয়ার পর রায়ান মিরাকে তার জন্মদিনের দিন পড়িয়েছিল।)
মিরার লোকেশন জানতে চাইলে ওই ট্র্যাকিং ডিভাইস টা ফলো করলেই পাওয়া যাবে। এটা রায়ানের মাথা থেকে একদম বেরই হয়ে গেছিল কিছুক্ষণের জন্য। রায়ান দ্রুত নিজের ফোনটা বের করে ওই ট্র্যাকিং ডিভাইসের সাথে নিজের ফোনটা কানেক্ট করে রাখা অ্যাপে লগইন করলো।

-“oh shiit….!”
মিরার লোকেশনটা দেখাতেই রায়ানের শিরদাঁড়া শিরশির করে উঠলো‌। মনে অজানা এক ভয় বাসা বাঁধলো। সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“আমি আসছি।”
রামিলা চৌধুরী রায়ানের হাত ধরে ফেলে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন –
“মিরাকে পাওয়া যাচ্ছে না এর মধ্যে তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
রায়ান মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলল-
“আমার উপর ভরসা রাখ আম্মু। আমার হাতে সময় নেই। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি মিরাকে নিয়েই বাড়ি ফিরব। তোমার ছেলের ভালোবাসার জেদের আছে আজ সবকিছু হারবে।”
রায়ান বাড়ির বাইরে পা রাখলে রুদ্র রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“ভাইয়া আমি আসবো তোমার সাথে?”
রায়ান রুদ্র কে লোকেশন টা শেয়ার করে দিয়ে মাহির আর পুলিশ কে নিয়ে লোকেশনে পৌঁছাতে বলল। রায়ান গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার পরই রুদ্র বের হয় থানার উদ্দেশ্যে এবং মাহির কে কল করে সেখানেই আসতে বলে।

পোড়া বাংলোটার চারপাশে এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা। যেন বহুদিন ধরে এখানে কেউ আসে না, কেউ থাকে না—শুধু ফেলে যাওয়া সময়ের দাগগুলো দেয়াল জুড়ে জমে আছে।
দেয়ালের প্লাস্টার প্রায় উঠে গেছে, কোথাও কোথাও ইট বেরিয়ে আছে কালচে হয়ে। আগুনে পোড়ার দাগ এখনো স্পষ্ট—ছাদের একাংশ ভেঙে পড়ে আছে, কাঠের বিমগুলো অর্ধেক ঝলসে গিয়ে বেঁকে আছে অদ্ভুতভাবে। বাতাসে একটা পুরনো পোড়া গন্ধ মিশে আছে, সাথে স্যাঁতসেঁতে ধুলো আর অবহেলার ভার।
ভাঙা জানালাগুলো দিয়ে ঢুকে পড়া হালকা আলো মেঝের উপর ছায়ার অদ্ভুত নকশা তৈরি করেছে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাচ, পোড়া কাঠের টুকরো, আর ধুলোর স্তর। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানেই একটা পিলারের সাথে বাঁধা মিরা। তার শরীরটা কাত হয়ে আছে, মাথা এক পাশে হেলে পড়েছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। শ্বাস চলছে—ধীরে, ভারী।

হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা, দড়িটা এতটাই টানটান যে কব্জির চারপাশে লালচে দাগ পড়ে গেছে। তার পোশাক জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, ধুলায় মাখা। কিছু ক্ষত থেকে এখনো ধীরে ধীরে রক্ত বেরিয়ে আসছে, মাটিতে পড়ে ছোট ছোট দাগ তৈরি করছে। আবার কোথাও রক্ত শুকিয়ে গাঢ় বাদামি হয়ে গিয়ে ত্বকের সাথে লেগে আছে। তার বুকটা আস্তে আস্তে ওঠানামা করছে—প্রতিটা শ্বাস যেন কষ্ট করে টেনে নিতে হচ্ছে। এক ফোঁটা রক্ত কপাল বেয়ে নেমে গালে এসে থেমে আছে। চারপাশে নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেও একটা চাপা ভয় লুকিয়ে আছে—যেন এই ভাঙা দেয়ালগুলোই সবকিছু দেখছে, কিন্তু কিছু বলছে না। দূরে কোথাও দরজার কড়া হালকা শব্দে নড়ে উঠলো। আর সেই শব্দে, অচেতনতার ভেতর থেকেও মিরার আঙুলগুলো অল্প করে নড়ে উঠলো—একটা ক্ষীণ, অদৃশ্য লড়াই এখনো বাকি আছে।
দরজা খুলে জ্যাক আর আদনান ভেতরে প্রবেশ করল প্রথমে আর ঠিক পরেই সাথে তাদের আরো কিছু সাঙ্গোপাঙ্গরা পিছন পিছন এলো। জ্যাকের কথায় একটা ছেলে বোতল থেকে পানি নিয়ে মিরার মুখে ছিটিয়ে দিল রুক্ষতার সাথে। অনেকটা সময় অচেতন থাকার পর পানির ছোঁয়ায় মিরার অষাঢ় দেহটা নড়ে উঠলো। শুকনো গলায় একটু কেশে উঠলো মেয়েটা। মিরার এমন অবস্থা দেখতেই জ্যাকের ঠোঁটের কোণে খেলে গেল একটা বিশ্রী হাঁসি। জ্যাক আদনান কে বলল-

“শালি এমন হেলে আছে কেন? সোজা করে বসা। এমনি দেখে মজা পাচ্ছি না। ঘাড় ব্যথা করছে আমার।”
আদনান নির্দয়ভাবে মিরার হাতের আঘাত প্রাপ্ত রক্তাক্ত জায়গায় চেপে ধরে টেনে তুলে পিলার টার সাথে বসালো। মিরা সাথে সাথে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলো-
“আআআহ্, মাআআ। আআহহহ্।”
জ্যাক মিরার চিৎকার টা শুনে শব্দ করে হেঁসে মিরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মিরার থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করে বলল-
“কি রে, শালি? কেমন লাগছে?”
মিরার কানে যেন কিছুই যাচ্ছে না। ব্যাথাতুর কন্ঠে মেয়েটা কাতর হয়ে চোখ দুটো বন্ধ রেখেই বিড়বিড় করলো-
“পা…পানি..!”
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য মিরার গলাটাও শুকিয়ে এসেছে। মিরা পানি চাইছে শুনে জ্যাক বাকা হেঁসে বোতল ভর্তি পানি এনে মিরার মুখের সামনে ধরলো। কিন্তু তার মুখে দিল না বরং মিরার সামনে তা মাটিতে ঢেলে দিল।

-“পানি খাবি ..? নে খা…মাটি থেকে চেটে খাঁ..!”
মিরা চোখ বন্ধ করে শুধু নেতিয়ে আছে। জ্যাক সম্পূর্ণ নেশায় ডুবে আছে সাথে তার সঙ্গীরাও। জ্যাক মিরার চুলের মুঠি খামচে ধরে নিজের দিকে টেনে নোংরা ভাষায় বলল-
“এইখানেই আমাকে রিজেক্ট করেছিলিস মনে আছে? তোর ভাগ্য ভালো ছিল তোকে জ্যাক এক রাতের অফার দিয়েছিল ওই রিজেকশনের মাসুল তোর সারা জীবনে যত গুলো রাত আছে সব গুলো জাহান্নামের যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে দিতে হবে তোকে।”
মিরা চুলের টানে আর্তনাদ করে উঠলো। জ্যাক মিরার চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে মিরার রক্তাক্ত মুখে পানি ঢেলে দিল। হঠাৎ অতিরিক্ত পানির স্রোতে হাঁপিয়ে উঠলো মিরার নিঃশ্বাস। তার নিশ্বাস এখন খুবই ক্ষীণ। পানি সম্পূর্ণ বরফ ঠান্ডা ছিল বলে তার জীর্ণ দেহ টা বার বার কেঁপে উঠছে আর রক্তের স্রোত এখন পানির সাথে মেঝেতে ছড়িয়ে পরেছে। চোখের পাতা নিভু নিভু। শরীরের সহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মেয়েটার আত্মা এখনো ঠিক তার সাথে কি হয়েছে বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে হয়তো এটাই তার জীবনের শেষ দিন আর সে শেষ বারের মতো তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের মুখ টুকু দেখতে পেল না। সকল যন্ত্রণার কাছে রায়ান কে একনজর না দেখতে পারার আফসোস টুকু বেশি প্রভাব ফেলছে তার মনে। এখনো মাথায় শুধু রায়ানের চেহারা আঁকছে।
জ্যাক একটা সিগারেট ধরিয়ে সেটা টানতে টানতে আদনান কে বলল-
“আদনান, সবাইকে আজ আমার তরফ থেকে ট্রিট। তবে খাবারের না..(শায়তানি হাঁসি হেঁসে) মেয়ে শরীরের। সবাই মিলে এই শালির এমন অবস্থা কর যেন আমার সাথে একটা রাত কাটানোর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় আফসোস হয় এর।”

আদনান জ্যাকের কথায় সম্মতি দিয়ে ভাব নিয়ে মিরা কে উদ্দেশ্য করে বলল-
“তাহলে শুরু করা যাক?”
আদনান মিরার দিকে এগিয়ে গেল। মিরা ছটফট করার শক্তি টুকু ও শরীরে পাচ্ছে না। এখন তার চিকিৎসার দরকার খুব জরুরী ভিত্তিতে। মেয়েটা নিজের রক্তে মাখা পা দুটো মুড়ে একদম শিটিয়ে গেলো। যতটুকু শক্তি আছে তা কাজে লাগিয়ে কয়েকবার শুধু মাথা টা না সূচক নাড়লো অসম্মতি জানাতে। কিন্তু সে জানে এতে কিছু হবে না। এক সৃষ্টি কর্তা ছাড়া তাকে সাহায্য করার ক্ষমতা কারো নেই এখন। এতোটা অসহায় তার কখনো মনে হয়নি নিজেকে। শুধু চোখের পানি টুকু ফেলে মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো নিজের আত্মরক্ষার জন্য। আদনান মিরার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে মিরার ভেজা চুল গুলো সরিয়ে দিল। মিরা ঘৃণায় নিজের মাথা ছিটকে সরিয়ে নিল। আদনান এক গাল হেসে বলল-
“কি গো সুন্দরী, আজকে হাত পা কিছু চলছে না বুঝি? একটু মেরে দেখা তো। ওর নরম হাতের মারও খেতে ভালোই লাগবে।”

জ্যাক আর বাকিরাও এই কথায় হেঁসে উঠলো। মিরা আশা হতো হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো-
“ও আল্লাহ , তুমি আমাকে আমার স্বামীর হক রক্ষা করার ক্ষমতা দাও। কিছু একটা করো। তোমার বান্দা কে তুমি রক্ষা করো। ও আল্লাহ..আমার সহায় হও তুমি। আমি বাঁচতে চাই। আমার রায়ানের জন্য বাঁচতে চাই। আমার ভালোবাসার জন্য বাঁচতে চাই।”
চোখের বারি ধারার কোনো শৃঙ্খলতা নেই। বয়েই চলেছে। আদনান মিরার মুখের দিকে হাত বাড়ালে মিরা আদনানের মুখে থুথু ছুঁড়ে দেয় ঘেন্নায়। এতে করে আদনানের পৌরুষ আত্মায় বেশ আঘাত লাগলো। নিজের মুখের থেকে মিরার থুথু মুছে মিরাকে ভয় দেখিয়ে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯ (২)

“বড্ড ভুল করে ফেললি। এখন তোকে মরণ যন্ত্রণা কাকে বলে তা হারে হারে টের পাওয়াবো।”
আদনান মিরার কাদের দিকে হাত বাড়াতেই মিরার মনে হলো আজ হয়তো আর শেষ রক্ষা হবে না। সে পারবে না রায়ানের জন্য নিজেকে রক্ষা করতে। চোখ বন্ধ করে শেষ অশ্রু কণা বিসর্জন দিল মেয়েটা। অসহায়ের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭১