Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯ (২)
অরাত্রিকা রহমান

রহমান বাড়ি~
একটা সাদা বড় চারচাকা গাড়ি থামলো রহমান বাড়ির সামনে। গাড়ির উপস্থিতিতে রোকেয়া বেগম এবং শফিক রহমান উভয়ই ছুটে এলেন বাড়ির বাইরে। মিরা সোরায়া আর রিমি একসাথে গাড়ি থেকে নামলো। মিরা আর সোরা দুজনেই চাচা চাচিকে অনেক দিন পর দেখে দৌড়ে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরলো। রোকেয়া বেগমের চোখে তখনও অশ্রু কণা ছলছল করছে। মিরা রোকেয়া বেগমের চোখে পানি দেখে নিজেও কাঁদো কাঁদো মুখে বলল-
“আরে চাচি, কাঁদছো কেন? কত দিন পর এলাম। আমাকে দেখে বুঝি ভালো লাগছে না?”
রোকেয়া বেগম মিরার গালে হাত রেখে মমতাময় গলায় বললেন-
“তোদের ছাড়া এক একটা দিন যে তোর চাচার আর আমার কত লম্বা কাটে মা, কিভাবে বোঝাবো বল। তোরা এলি মনে হলো আমার মরা বাড়িটা এখন জীবিত হয়ে উঠলো।”

সোরা শফিক রহমান কে জড়িয়ে ধরে আছে। শফিক রহমান বরাবরই সোরার প্রতি একটু বেশি দূর্বল, হয়তো সোরা ছোট বলেই। অথচ কয়েকদিনের মধ্যেই সোরার বিয়ের পাকা কথা হবে চিন্তা করেও তিনি বেশ অবাক। তিনি সোরার মুখের দিকে তাকিয়ে কেবল চিন্তা করেন- সময় সত্যি খুব দ্রুত অতিবাহিত হয়। রুদ্র মিরা, সোরা আর রিমিকে চট্টগ্রাম পৌঁছে দিতে এসেছিল। তাকে আবারও ফিরে যেতে হবে। রোকেয়া বেগম এবং শফিক রহমান আগের কখনো রিমিকে দেখেন নি। রুদ্রর স্ত্রী হিসেবে রুদ্র রিমিকে পরিচয় দিলে রোকেয়া বেগম ভীষণ আদরে রিমিকে আপন করে নেন। রিমিরও সময় লাগলো না সবার সাথে মিশে যেতে। নিজেদের সাথে স্বাভাবিক কুশল বিনিময় করার সময়ই রহমান বাড়ির সামনে একজন রাইডার এসে নিজের বাইক থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-

“আচ্ছা, শফিক রহমানের বাড়িটা কোন দিকে বলতে পারেন?”
সবাক বিষ্ময়ে শফিক রহমানের দিকে তাকালে শফিক রহমান নিজেই উত্তর করেন-
“জি, বলুন। আমিই শফিক রহমান।”
রাইডার টি বাইক থেকে নেমে নিজের হাতে একটা পার্সেল নিয়ে বললেন-
“আপনার নামে একটা পার্সেল ছিল।”
শফিক রহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন-
“আমার তো কোনো পার্সেল আসার কথা ছিল না‌ আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।”
রাইডার টি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলল-

“না না, আমার ভুল হচ্ছে না। পার্সেল টা তো আপনার নামেই। রিভান চৌধুরী রায়ান নামে কেউ একজন পাঠিয়েছেন।”
রায়ানের নামে সবার মুখেই আশ্চর্যতা ধরা পরলো। মিরা এগিয়ে গিয়ে রাইডার টির থেকে পার্সেল টা রিসিভ করে উনাকে বিদায় দিল। বাড়ির ভেতরে গিয়ে মিরা শফিক রহমান কে পার্সেল টা আনবক্স করতে বললে শফিক রহমান পার্সেল টা খুলে দেখলেন ভিতরে একটা বড় ওভার লোডেড চকলেট কেক। বাড়ির জামাই সব ছেড়ে চকলেট কেক পাঠিয়েছে বিষয়টা সবাইকেই অবাক করলো। কেক এর উপর থেকে প্লাস্টিক পেপার টা সরাতেই বড় বড় করে লিখা একটা উক্তি সবার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো-

“আমার বউকে ফেরত দিন।”
মিরা নিজের কপালে হাত রেখে তার চাচা চাচির চেহারা দেখলো। রোকেয়া বেগম মিরাকে জিজ্ঞেস করলেন-
“এসব কি মিরা? তুই কি রায়ানের সাথে ঝগড়া করে এসেছিস?”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যা বলতেই রোকেয়া বেগম গম্ভীর গলায় আবার জিজ্ঞেস করলেন-
“ঝগড়া কেন করেছিস আবার?”
-“কি করবো? আমাকে আসতে দিতে রাজিই হচ্ছিলেন না উনি। তাই ঝগড়া করছি। দুটো দিন বেশি থাকলে কি এমন হবে? না, উনি আমাকে দূরে থাকতেই দেবেন না। বেশ করেছি ঝগড়া করেছি। দেখছো না, নিজে আসেনি আমাকে দিতে, রুদ্র ভাইয়াকে পাঠিয়েছে। এখন আবার কিনা কি পাগলামো করছে।”
শফিক রহমান একটু গম্ভীর মুখে মিরাকে জিজ্ঞেস করলেন-
“মিরা, রায়ান কি সব সময় তোর উপর এমন রাগ দেখায়?”
মিরা চাচার কথায় মুচকি হাসলো। আসলে বাবার মাথায় হয়তো মেয়ের ভালো থাকার চেয়ে বেশি আর কিছুই আসে না। মিরা শফিক রহমানের কাছে গিয়ে ওই কেক টা নিয়ে নিল। আর রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল-
“আরে ধুর..রাগ না ছাই। ওনার রাগ আমার সামনে ৫ সেকেন্ডও টেকে না। কেক পাঠিয়েছে তাও বেছে – যেটা আমার পছন্দের। কি লিখেছে না লিখেছে ভুলে যাও তো, পাত্তা দিও না। ওনার সারাদিনই বউ লাগে। কেকটা খেয়ে চুপচাপ বসে থাকবো ইফতার এর পর।”

রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলেন-
“হায় খোদা, আমার মেয়ের কপাল টাও এমন হলো? বিয়ের পর আমিও শান্তিতে একটু বাপের বাড়ি থাকতে পারি নি। এই সব বেডা মানুষের সমস্যা কি?”
শফিক রহমান রোকেয়া বেগমের অস্পষ্ট কথা গুলো শুনে বললেন –
“বেডা মানুষের কষ্ট যদি বেডি মানুষ বুঝতো তাহলে তো বাপের বাড়ি যেতেই চাইতো না।”
রোকেয়া বেগম মুখ কালো করে নিয়ে বলল-
“তাহলে তোমার মেয়ে কি ভুল কিছু করেছে এমন টা বলতে চাইছো?”
-“না, আমার মেয়ে ভুল কেন করবে? একদম ঠিক করেছে। বাপের বাড়িতে আসতে ইচ্ছে হলে আসবে না কেন? আমার মেয়ের সাহস দেখে আমার গর্ব হয়।”
-“তাহলে আমাকে কখনো যেতে দিতে না কেন আমার বাপের বাড়িতে?”
শফিক রহমান শান্ত গলায় দৃঢ়তা দেখিয়ে বললেন –
“কি আজব, তুমি আমার বউ। বাপের বাড়ি কেন যাবা? বাড়ির বাড়িতে পাঠানোর জন্য বিয়ে করেছিলাম নাকি?”
রোকেয়া বেগম রেগে গেলেন শফিক রহমানের কথায়। তিনিও দেমাক দেখিয়ে বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেলেন-

“বাদজাত বেডা মানুষ। বউয়ের বেলায় যা ভুল মেয়ের বেলায় তা ঠিক!”
রোকেয়া বেগম রাগ করে চলে গেলেন দেখে শফিক রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর সাথে বাইরে চলে এলেন রুদ্র কে বিদায় দিতে। রুদ্রকে কাজের জন্য আবার ঢাকা ফিরে যেতে হবে। শফিক রহমান রুদ্র কে বিদায় দিয়ে বাড়িতে ঢুকলে রিমি দৌড়ে বাড়ির বাইরে এলো। রুদ্র গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠবে তখনই রিমি রুদ্র কে ডেকে উঠলো-
“রুদ্র..!”
রুদ্র পিছন ফিরে রিমির দিকে চাইল। রিমি হাঁপিয়ে উঠেছে দৌড়াতে গিয়ে। রুদ্র রিমিকে সাথে সাথে বুকে জড়িয়ে নিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে সোনা? দৌড়াচ্ছো কেন এভাবে? যদি পড়ে যেতে?”
রিমি রুদ্রর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো নিজের প্রশ্ন সামনে রাখলো-
“আপনি চলে যাচ্ছেন? থেকে গেলে হয় না?”
রুদ্র পাল্টা প্রশ্ন করলো-

“কেন? তোমার ভালো লাগছে না খালামণির বাসায়?”
-“তা না, বিয়ের পর আপনাকে ছাড়া কোথাও থাকি নি তো তাই কেমন কেমন লাগছে।”
রুদ্র মিষ্টি হেঁসে রিমির ছোট্ট মুখটা নিজের হাতের আচলায় পুরে নিয়ে বলল-
“আমার পাগলি বউটা আজ হঠাৎ করে খুব আহ্লাদ করছে কেন? না এখন নিজের ঘরে আছি আর না উপায় আছে আমার কিছু করার। রোজা যে রেখেছি..আমার রোজাটা কি হালকা করার ধান্দায় আছো?”
রিমি রুদ্রর এমন ঠোঁট কাটা কথায় লজ্জা পেয়ে রুদ্রর বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“চুপ করুন অসভ্য। আমি কি কিছু করতে বলেছি আপনাকে?”
-“কেন? সমস্যা কোথায়? বলো না কিছু করতে।”
রুদ্র রিমির কোমর দুই হাত জড়িয়ে নিজের কাছে টানল। রিমি হকচকিয়ে বাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে রুদ্রর বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল-
“ছাড়ুন ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেলবে।”
রুদ্র রিমির গালে চুমু দিয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে ভারী কণ্ঠে বলল-
“একটা চুমু খাই?”

রিমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিয়ে সাথে সাথে আবার খুলে ফেলল। রুদ্র কে একটু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে রুদ্র গালে হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলল-
“উহু, পরে। এখন রোজা আছেন মনে নেই নাকি। সংযম করুন।”
রুদ্র অধৈর্য হয়ে বলল-“আরে একটু চুমু খেলে কিছু হয় না।”
রুদ্র পুনরায় এগিয়ে গেলে রিমি আবার রুদ্র কে থামি দিয়ে গাড়ির দিকে ইশারা করে বলল-
“ইফতার এর পর আসুন জনাব। তখন কথা হবে।”
রুদ্র উপায় না পেয়ে হার মেনে নিল। রিমির কপালে একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে গাড়িতে উঠে গেল। রিমি মুচকি হেঁসে রুদ্র কে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে উড়ু উড়ু মনে পা নাচিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। এই সম্পূর্ণ দৃশ্য টুকু মিরা উপরের নিজের ঘরের বারান্দা থেকে খুব মন দিয়ে দেখলো‌। তার কাছে এই কাজটা মোটেও লজ্জা জনক লাগলো না। এগুলো চৌধুরী বাড়ির নিত্য দিনের ঘটনা, আসতে যেতে চোখে পরে। উল্টো মিরার হঠাৎ করেই মনটা ভাল হয়ে এলো, বড্ড রায়ানের কথা মনে পড়লো। তৎক্ষণাৎ মাথায় এলো- যদি রুদ্রর এই অবস্থা হয় তাহলে রায়ান ঠিক কতটা পাগল হয়ে আছে এখন তার জন্য!

আসার পর থেকে রায়ান একবারও তাকে কল করলো না, গাড়িতেও কল করলো না। কি করছে এখন লোকটা? মিরা উদাস মুখে ঘরের ভিতরে গিয়ে নিজের পুরোনো খাটে ঠাস করে শুয়ে পড়লো। ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের ফোনের ওয়াল পেপারে তার আর রায়ানের ছবিটা দেখে হালকা মুচকি হেঁসে নিজেই সব মান অভিমান ভুলে রায়ানকে কল করলো। খুব উৎসাহিত মনে মিরা রায়ানের নাম্বারে কল ডায়াল করলো। কিন্তু ফোনটা রিসিভ হলো না। মিরার মুখের হাঁসি টা মিলিয়ে গেল। পুনরায় কল করলেও রায়ান আর ফোনটা ধরলো না। মিরা পরে আর কল করলো না। তাঁরও তো একটা আত্মসম্মান আছে তাই না!

গোটা দিন পাড় হয়ে গেছে। মিরা সারাটা দিন যখনি সময় পেয়েছে নজরটা তার ফোনেই ছিল। রায়ান ফোন করতে পারে হয়তো এমন কিছু চিন্তা করে। সবাই মিরাকে উদাসীন দেখে তার কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলেও মিরা কিছু খুলে বলেনি। কিন্তু রোকেয়া বেগম মেয়ের মনের অবস্থা একটু হলেও ঠাওর করতে পারছিলেন। কিন্তু মিরা যেহেতু কাউকে কিছু বলতে চাইছিল না তাই তিনিও সেই নিয়ে কথা তুলেন নি।
ইফতারের সময়টা সবাই একসাথে বসে ইফতার করেছে মিরা তখনও মুখ ভার করে ছিল। তেমন কিছু খায় ও নি। এর মাঝে রুদ্র রিমিকে কল করে খোঁজ নিয়েছেন সে ইফতার করেছে কিনা, আবার মাহির ও কল করে বাড়ির সবার সাথে কথা বলেছে- আজ বাদে কালই এনগেজমেন্টট। বাড়ির নতুন জামাই হিসেবেও তো তার একটা কর্তব্য আছে। মিরা আশা করছিল রায়ান ও কল করবে তার সব কাজ শেষ হয়ে গেলে। ইফতারের সময় আবার নিজের থেকেই কল করতে চেয়েছিল মিরা কিন্তু মনের দোটানায় আর করতে পারেনি। রাতের তারাবীহ নামায আদায় করে সবাই ডিনার করলো কিন্তু মিরা কিছু মুখে দিল না। রোকেয়া বেগম খুব করে জোড় করলেন কিন্তু তবুও মিরাকে খেতে বাধ্য করতে পারলেন না। মিরার জেদ ঠিক তার বাবার মতো এর এখন খানিকটা সঙ্গে দোষে রায়ানের থেকে পেয়েছে।

রাত~২টা
বেশ অনেকটা সময় এপাশ ওপাশ করার পর মিরার দু চোখে ঘুম নেমে এসেছে। বিয়ের পর রায়ান কে ছাড়া এই প্রথম ঘুমাচ্ছে সে নয়তো কখনো আলাদা থাকতে চাইলেও রায়ান কোনো না কোনো উপায়ে মিরার সাথেই থাকে। হয় জেদ ধরে নিজের বেহায়ার মতো মিরার কাছে চলে যাবে নয়তো নিজে জেদ দেখিয়ে মিরাকে কোলে করে নিজের কাছে এনে নেবে। কয়েকমাস আগে এই রুমে জেন্ত লাশের মতো জীবন যাপন করে একা একা ঘুমাতে খানিকটা ভয় ও পাচ্ছিল মিরা।
হঠাৎ করে একটা শব্দ ভেসে এলো মিরার কানে। মনে ভয় আর মাথায় এক গাদা চিন্তা নিয়ে ঘুমিয়েছিল বলে ওই অল্প শব্দেও মেয়েটার কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল। মিরা হুট করে বিছানায় উঠে বসে নিজের খোলা চুলে খোঁপা বেঁধে বিছানা থেকে নেমে নিজেই প্রশ্ন করলো-
“কে ওখানে?”
তার কণ্ঠ টা খুবই ধীর বোঝা যাচ্ছে ভয়ে আড়ষ্ট সে। শব্দটা আবার হলো- মনে হলো ভারী কিছু খুব অসাবধানতায় জমিন স্পর্শ করলো। শব্দটা বারান্দায় শুনা গেল বলে মিরাও শুকনো ঢোক গলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে।

-“বা..বারান্দায় কেউ আছেন?”
মিরার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। ভয়ে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে মেয়েটার। মিরা অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“আমি জিজ্ঞেস করছি কে আছে ওখানে?”
মিরা কোনো প্রকার সাড়া শব্দ না পেয়ে মনে একটু সাহস যুগিয়ে বারান্দায় এগিয়ে গেল। চারপাশটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। নিজের ভেতরের ভয়টাকে জোর করে চাপা দিয়ে মিরা ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
সাদা পর্দার আড়ালে একটা লম্বা ছায়া নড়ে উঠতেই মিরার গলা দিয়ে প্রায় চিৎকার বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা কণ্ঠ—
“শিট! বউটা আজকে আমাকে গণপিটুনি খাওয়াবে মনে হয়…”
বলেই মুহূর্তের মধ্যে ছায়াটা সামনে এসে দাঁড়াল। মিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে বারান্দার দেয়ালে চেপে ধরল। আর কোনো শব্দ বেরোতে না দেওয়ার জন্য তার ঠোঁটের উপর নিজের ঠোঁট চেপে দিল। সেকেন্ডের ব্যবধানে এমন ঘটনায় মিরা হতভম্ব। বড় বড় চোখে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট জোড়া রায়ানের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। তার ঠোঁট থেকে অস্পষ্ট প্রতিবাদের শব্দ বেরোলো—

“উমম্…!”
রায়ান চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলল, কিন্তু মিরা তার দিকে তাকাচ্ছেই না। উল্টো আরও ছটফট করছে। বাধ্য হয়ে রায়ান চুমুটাকে আরও গভীর করল—একটু থামাতে, একটু শান্ত করতে। মিরার শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার শরীরের টান কিছুটা ঢিলে পড়তেই রায়ান দু’হাতে তাকে আগলে নিল। রায়ানের ঠোঁট ও অবাধ্য হলো। রায়ান চেয়েও আর মিরা ঠোঁট ছাড়লো না।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই, অপরিচিত ভেবে মিরা হঠাৎ হাঁটু তুলে রায়ানের দুই উরুর মাঝ বরাবর সজোরে আঘাত করল।
-“আহ্—!”
ব্যথায় কাতর একটা শব্দ বেরিয়ে এল রায়ানের মুখ থেকে। চুমুটা ভেঙে গেল। রায়ান মিরার ঠোঁট ছেঁড়ে দিতেই মিরা এবার সত্যিই চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু রায়ান দ্রুত তাকে আটকে দিল। এক হাতে মিরার মুখ চেপে ধরে, আরেক হাতে নিজের ব্যথা সামলাতে সামলাতে কাতর গলায় বলল—
“আল্লাহর দোহাই বউ আমার…চুপ… দূরে থেকেও জান নিয়ে নেয়, কাছে এসেছি, তাতেও জান কবজ করে নিচ্ছে! চুপ কর… মাফ চাই…”

পরিচিত কণ্ঠটা কানে যেতেই মিরা থমকে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও লাগল না রায়ানকে চিনতে তার। নিজের শ্বাসই যেন ঠিকমতো নিতে পারছে না সে। ধীরে ধীরে রায়ানের হাতটা মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে অশান্ত, কাঁপা গলায় বলল—
“আ… আপনি কি পাগল? এই সময়ে বারান্দা দিয়ে আমার ঘরে এসেছেন কেন? তাও আমাকে এভাবে—! না জানিয়ে এমন করলে আমি তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য কিছু করবই, তাই না?”
রায়ান অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টি দেখে মিরা হালকা জিভ কামড়ে নিল। তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে একটু থেমে, কণ্ঠটা নরম করে জিজ্ঞেস করল—
“বেশি লেগেছে…?”
রায়ান এক হাত দিয়ে পেটের নিচের দিকে আলতো করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
“তোমার কাছে আসা মানেই রিস্ক নেওয়া, এটা আমার আগেই বুঝা উচিত ছিল আমার…নতুন তো নয়, এর আগেও দেখেছি একই কাজ করতে।

তার গলায় ব্যথার সাথে মিশে হালকা অভিমানও ছিল। মিরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। হে বুঝতে পারলো রায়ান রেসের রাতের কথা বলছে যখন সে জ্যাক কে আঘাত করেছিল। বেচারি নিজেও বুঝতে পারছে, ভয়ে যা করেছে সেটা ইচ্ছে করে না, কিন্তু আঘাতটা বেশ জোরেই লেগেছে। মিরা ধীরে ধীরে একটু কাছে এগিয়ে এলো। কণ্ঠ আগের মতো কঠিনতা নেই, বরং নরম—
“আমি তো ভেবেছি… কেউ অচেনা… এভাবে আচমকা ধরলে… আমি কী করতাম বলুন?”
রায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তারপর হালকা ঝুঁকে মিরার চোখের সমান হয়ে বলল—
“অচেনা মানুষকে সবাই এমনই ‘স্বাগত’ জানাও নাকি?”
কথার শেষে ঠোঁটের কোণে ব্যথা মিশ্রিত এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড দুজনেই চুপ।
চেহারায় কষ্টের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখে সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিকটা এখনও জ্বলজ্বল করছে। মিরা সারাক্ষণ বাচ্চা বাচ্চা করে রায়ানের মাথা খায় বলে রায়ান মিরাকে পরিস্থিতির গম্ভীরতা বুঝতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো-

“পাখি আমার বাচ্চা গুলো মনে হয় আজ অক্কা পেল। তোমাকে মা হওয়ার সুখ আমার পক্ষে দেওয়া আর সম্ভব হবে না বোধহয়।”
মিরা বাচ্চার কথা উঠতেই খুব সিরিয়াস হয়ে গেল-
“একদম ফালতু কথা বলবেন না। মা হওয়ার সুখ দিতে পারবেন না মানে কি? বেডা মানুষ তো তাই বেশি বুঝেন একটু।”
মিরা রায়ান কে ঝারি দিয়ে রায়ান কে দ্রুত ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। হঠাৎ মিরা ধীরে হাত বাড়িয়ে রায়ানের হাতটা সরিয়ে দিল, যেখানে সে চেপে ধরে ছিল। খুব সাবধানে, যেন আবার ব্যথা না লাগে—
“দেখতে দিন… বেশি লেগেছে কিনা…”
তার স্পর্শে রায়ান একটু থমকে গেল। আগের দুষ্টুমি বা রাগ—সবকিছু মিলিয়ে যেন মুহূর্তটা নরম হয়ে এল। সে সাথে সাথে মিরার হাত ধরে ফেলে বলল-
“ওই..দেখতে দিব মানে কি? পাগল হয়ে গেছে নাকি? কোথায় হাত দিচ্ছো?”
মিরা রায়ানের কথায় পাত্তা দিল না। ওই ভাবেই তেড়া জবাব দিল-
“আমি দেখবো আমার বাচ্চা দের কি হয়েছে।”

রায়ান আটকানোর পরও মিরা রায়ানের বাঁধা না মেনে নিজের হাত অগ্রসর করলে রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার হাত দুটো চেপে ধরে তাকে বিছানায় ফেলে মিরার উপরে উঠে অস্থির গলায় বলল-
“ওই কি সমস্যা হ্যাঁ? উস্কানি দিচ্ছ কেন? আমি আমার বউয়ের বাপের বিছানায় তাকে সারা রাত কাদাতে চাই না। শুধু শুধু আমাকে আমার পিছনে লেগো না মিরা। আমি মোটেও ভালো মানুষ না তুমি ভালো করেই জানো।”
মিরা রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রায়ানের মনে চলতে থাকা অবাধ্য ঝড়ের বেগ বুঝতে পারলো। একটু আমতা আমতা করেই বলল-

“এ..এতো রাতে কেন এসেছেন আপনি? সারাদিন তো আমার কথা মনে পড়ে নি?”
রায়ান আরো মিরার মুখের কাছে ঝুঁকে গিয়ে বলল-
“ভুললে তো মনে পড়বে। সারাটা দিন মাথায় চরকির মতো ঘুরেছ। পা ব্যাথা করে না তোমার? একটা কাজ করে শান্তি পাই নি আমি। বালের শশুর বাড়ি কোনো কাজেরই না। এখান থেকে নিয়ে গেছি কেন তোমাকে? আবার এখানে থাকতে পাঠাতে? আমি তোমাকে ছাড়া কতটা ছন্নছাড়া তুমি জানো না?”
মিরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এমন পাগল হয়ে আছেন কেন? শান্ত হন। হাত ছাড়ুন লাগছে আমার।”
রায়ান এক নাগাড়ে বলে গেল-
“পড়ার জন্য একটা শার্ট পাচ্ছিলাম না, রুমাল হারিয়ে গেছে, ওয়ালেট নিতে ভুলে গেছি, শার্টের উপরের বোতাম লাগাতে ভুলে গেছি, টাই টাও ভালো করে বাঁধা হয়নি আজ। কতটা ইনফার্মাল লেগেছে আমাকে আজ অফিসে তোমার আইডিয়া আছে? সাল থেকে একটা চুমু খাইনি তোমাকে, মনে কোনো প্রফুল্ল তা নেই। আর তুমি পড়ে আছে শান্ত হওয়া নিয়ে।”

মিরার নিজের চোখের সামনে যেন রায়ানের সব ভোগান্তি কল্পনা করতে পারলো। রায়ান মিয়াকে চুপ দেখে মিরার চোয়ালে হাত রেখে নিজের মুখোমুখি করে বলল-
“এতো দূর এসেছি কি বউকে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবো বলে? Eyes on me, heartbird..”
মিরা আর কিছু না বলে নিচে থেকেই রায়ান কে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“I missed you..”
রায়ান ওমনি মোমের মতো গলে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার কপালে চুমু দিয়ে বিড়বিড় করলো-
“হাহ্! এই শেষ হয়ে গেল সব রাগ। কিভাবে পারে আমাকে শান্ত করতে এই বাচ্চা মেয়েটা?!”
মিরা মুখ উঁচিয়ে রায়ানের গালে চুমু দিল। রায়ান একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-
“ওখানে তো আর ব্যাথা দাও নি। যেখানে ব্যাথা দিয়েছ সেখানে দিলে যদি একটু কাজের কাজ কিছু হয় আর কি।”
মিরা প্রথম বুঝতে না পারলেও পরে রায়ানের কথার মানে বুঝতে পেরে জোরে মারলো রায়ানের কাঁধে আর বলল-
“চুপ অসভ্য। বেশ করেছি ব্যাথা দিয়েছি। আমাকে ভীষণ জ্বালায় ওটা।”
রায়ানের তেমন কোনো যায় এলো না। সে ভ্রু নাচিয়ে মিরার গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে আদুরে গলায় আবদার করলো-
“Baby…. Can you get on your knees for me today? কথা দিচ্ছি আর কখনো এই আবদার করবো না I swear..!”

মিরা অশান্ত গলায় বলল-
“আপনার আবদার সম্পর্কে আমার ভালোই ধারণা আছে। চুপ করুন। আমি লজ্জায় শেষ হয়ে যাবো।”
রায়ান ও অস্থিরতা নিয়ে বলল- “তাহলে লজ্জা টুকু দাও।”
মিরা রায়ানের স্পর্শে শিহরণে কেঁপে উঠলো। এমন ঠোঁট কাটা কথায় মেয়েটার শ্বাস আঁটকে আসছে। রায়ান মিরার গলা থেকে মুখ তুলে মিরার চোখে মুখে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে তার ঠোঁট দুটো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। তারপর সে বরাবরের মতো রায়ানের সাম্রাজ্যের রানী। মাঝ পথে মিরা নিজের চিৎকারে আর সামাল দিতে পারছিল না বলে রায়ানের কাছে আর্জি জানালো-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯

“রায়ান..প্লিজ একটু গতি সামলান। আহহ্..! কেউ শুনতে পাবে।আমি চিৎকার ধরে রাখতে পারছি না। উফফফ্..!”
রায়ান নিজের মাঝে নেই তখন। সেও আর নিজের উপর সামাল রাখতে পারছে না বলে মিরাকে চূড়ান্ত বাণী দিল-
“Not possible.. bite the pillow”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭০