আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯
অরাত্রিকা রহমান
ভোর~৬টা
বসন্তের কোমল সকাল। ঘড়ির কাঁটা তখন সবে ৬টা ছুঁই ছুঁই। পূর্ব আকাশে ওঠা সূর্যের নরম সোনালি আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ছাদঘরের চারপাশে। হালকা বাতাসে বসন্তের মৃদু উষ্ণতা, সব মিলিয়ে চারপাশে এক শান্ত, তৃপ্তির আবহাওয়া। ছাদঘরটা যেন আজ একটু অন্যরকম লাগছে। গত রাতের গভীর অনুভূতির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে দেয়ালের প্রতিটি ইট, প্রতিটি কোণ। জানালার সাদা পর্দা দক্ষিণের হালকা বাতাসে দুলছে, বিছানার চাদরটা এখনও বেশ এলোমেলো—আর এলোমেলো চাদরের ভাজেই আছে গত রাতের আবেগের উষ্ণতা। দূরে কোথাও পাখিরা ডাকছে। শহরের শব্দ এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। এই নিস্তব্ধতার ভেতরেই একটা অদ্ভুত প্রশান্তি লুকিয়ে আছে—যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া কোনো পূর্ণতার অনুভূতি।
প্রতি সকালে মতো মিরা ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সাড়াটা রাত বরের দেওয়া আদরে মুড়ে ছিল মেয়েটা। মুখের ভেতর ছড়িয়ে আছে ক্লান্তি অথচ তৃপ্ত এক প্রশান্তি। গত রাতের দীর্ঘ আবেগ যেন এখনো তার শরীর-মনকে ঘুমের ভেতর আটকে রেখেছে। রায়ানের মুখেও একই ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
রায়ান অনেকক্ষণ আগেই জেগে উঠেছে। তবু সে নড়েনি। মাথাটা এখনও রাখা মিরার উন্মুক্ত বুকের কাছে—যেন ওখানেই তার সমস্ত শান্তি। সেই উষ্ণতার ভেতর এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা আছে, যেটা সে ছেড়ে উঠতে চাইছে না কিছুতেই। মিরার ক্লান্ত শরীরটা নিস্তব্ধ, নিঃশ্বাসের ধীর ওঠানামায় তার বুক আলতো দুলছে। সেই দৃশ্যটাই আধো আধো চোখ খুলে রায়ান দেখছে। তার চোখে এক ধরনের তৃপ্তি আর মোহ।
মিরার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রায়ান মাঝে মাঝে আলতো করে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কপালের পাশে আঙুল ছুঁইয়ে রাখছে। কখনো আবার নিঃশব্দে তাকে আরও কাছে টেনে নিচ্ছে। যেন এই প্রশান্তিটুকু যতটা সম্ভব নিজের মধ্যে ভরে নিতে চায়—মনে হয়, আজই হয়তো শেষ সুযোগ।
মিরা মাঝেমধ্যে ঘুমের ভেতর একটু ছটফট করে ওঠছে। ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে, শরীরটা একটু এপাশ-ওপাশ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু রায়ান যেন সেদিকে তেমন মন দিচ্ছে না। সে নিজের সেই ছোট্ট পৃথিবীতে ডুবে আছে—যেখানে আছে শুধু এই নরম সকাল, আর মিরার উষ্ণ উপস্থিতি।
গত রাত থেকে একটুও বদলায়নি আরেকটা বিষয়। রায়ানের হাতটা এখনও আলগোছে রাখা আছে মিরার বুকে। রায়ানের একটা হাত জড়িয়ে আছে মিরার বক্ষযুগলের উপর দিয়ে আর অন্য হাত উন্মুক্ত কোমরে। গত রাত থেকে বুকের উপরের হাতটা আর সরেনি। মাঝে মাঝে সে অচেতনভাবেই হাতটা একটু শক্ত করে মুঠো করে নিচ্ছে—যেন নিশ্চিত হতে চায়, এই উষ্ণতা সত্যি তারই। মিরার বুকের সেই নরম আশ্রয়ে মাথা গুঁজে রাখলে রায়ানের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায়। যেন এই জায়গাটার প্রতিই তার এক ধরনের শিশুসুলভ দুর্বলতা আছে। রায়ানের কাছে তার জন্য একজোড়া শান্তি এইগুলো।
মিরার ক্লান্ত শরীরটা নিশ্চুপ, মুখে ছড়িয়ে আছে শান্ত এক অবসাদ। মাঝরাতে কয়েকবার ঘুমের মধ্যেই মিরা সেই হাত সরাতে চেয়েছিল—অস্বস্তি আর ক্লান্তির আধো ঘুমে। কিন্তু রায়ানের অবচেতন আঁকড়ে ধরা শক্তির কাছে সে পেরে উঠে নি। ঘুমের ভেতর সে একটু ছটফট করে ওঠছে রায়ানের হাতের বিচরণের দরুন—সম্ভবত অস্বস্তিতে। কিন্তু প্রতিবারই সরানোর সাথে সাথে রায়ানের হাত আবার ফিরে এসেছে ঠিক আগের জায়গায়—আরও একটু দৃঢ় ছোঁয়ায়। শেষমেশ মিরা আর চেষ্টা করেনি। ঘুমের ভেতরেই যেন নীরবে মেনে নিয়েছে এই জেদী পাগলামিটাকে।
হঠাৎ বুকে অতিরিক্ত চাপ অনুভব হতেই মিরা মৃদু আর্তনাদ করে চোখ দুটো মিটি মিটিমিটি খুললো। মিরা চোখ খুলতেই চোখের সামনে রায়ানের মুখটা আবছা দেখতে পেল। রায়ান তখনও স্থির নজরে মিরার দিকেই তাকিয়ে আছে। মিরাও চোখ খুলে রায়ানের চোখে চোখ রাখলো। এখন দুজনই কেবল তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে। মিরা নীরবতা ধরে রাখতে না পেরে প্রশ্ন করে বসলো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে-
“এভাবে কি দেখছেন? আমার চেহারায় কি কিছু লেগে আছে?”
রায়ান মিরার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলল-
“নিজের বউকে দেখার একটা আনন্দ আছে। এইটার কোনো ব্যাখ্যা নেই। খুব বেশি জানার ইচ্ছা থাকলে আমার চোখে দেখ।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নিল, দেখাদেখি নিয়ে আর কথা বলল না। হঠাৎ করেই খেয়াল করলো তার শরীরে কোনো আবরণ নেই আর রায়ানের হাত টা এখনো তার বুকের ভাঁজে। মিরা বিষয়টা চোখে পরতেই রায়ানের হাতটা সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে গলা অব্দি কম্ফোরটার তুলে নিজেকে ঢেকে নিয়ে চোখ গরম করে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“সাড়াটা রাত গেছে এভাবে। একটা সেকেন্ডের জন্য আপনার হাত টা সরাতে পারি নি। আপনার ক্লান্তি আসে না?”
মিরা হাত সরিয়ে দেওয়াতে রায়ান বেশ বিরক্ত হলো, যেন কোনো বাচ্চার হাত থেকে তার খেলনা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। ছেলে টা প্রতি উত্তরে সোজাসাপ্টা ভাষায় বলল-
“না, কোনো ক্লান্তি আসে না। উল্টো সব ক্লান্তি চলে যায়। ওগুলো আমার শান্তি। বুঝেছ। ধরতে দাও আমাকে।”
রায়ান কথাটা বলেই মিরার শরীর থেকে কম্ফোরটার টা টান দিতে গেলে মিরা শক্ত করে খামচে ধরে সেটা। একটু কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল-
“আর ভালো লাগছে না। ব্যাথা করছে। ওগুলো তো আমার শরীরেরই অংশ। কোনো খেলনা তো না।”
রায়ান কিছু বুঝতে চাইলো না। উল্টো দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কথাটাই কাজে লাগিয়ে মিরাকে ম্লান কণ্ঠে বলল-
“চলেই তো যাবো। এমন করছো কেন? আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার এর পর কেউ জ্বালাবে না।”
মিরার মুখটাও এই কথায় তৎক্ষণাৎ মলিন হয়ে গেল। সত্যিই আর কয়েক ঘণ্টাই আছে তাদের একসাথে থাকার। মিরার মুখটা সাথে সাথে শুকিয়ে গেল বলে রায়ান ও নিজের মুখের কথাটা নিয়ে আফসোস করলো। তার আজ চলে যাওয়ার কথাটা তোলা উচিত হয়নি। মিরার চোখটা চিকচিক করছে অশ্রু জলের ভীরে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার নিজে বিছানায় শুয়ে মিরাকে টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল-
“সরি হৃদপাখি, আমার ওইভাবে বলা ঠিক হয়নি।”
মিরা কিচ্ছু বলল না। সে নিজের থেকেই নিজের গায়ের কম্ফোরটার টা সরিয়ে রায়ানের হাত নিয়ে কাঙ্ক্ষিত স্থানে প্রতিস্থাপন করে দিল। আর সেই সাথে নিজের চোখ টা বন্ধ করে নিল। রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে। রায়ান মিরার কাজ দেখে হতবাক। যাওয়ার কথা শুনে মিরা এতো টা ইমোশনাল হবে তা তো সে ভাবে নি। রায়ান নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। নরম সাদা জায়গাটা সম্পূর্ণ লাল হয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন কেউ চেপে ধরে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। আর অগণিত কামড়ের দাগ তো আছেই। রায়ানের মনে হলো সত্যিই খুব ব্যাথা পাচ্ছে হয়তো মিরা তার আদরে। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“উঠো, ঘরে যাই চলো। শাওয়ার নিতে হবে।”
মিরা রায়ান কে জড়িয়ে ধরে শুয়েই রইল। রায়ান কে ছাড়তে চাইছে না সে। রায়ান নিজের থেকে উঠে গেল আর মিরাকে কোলে তুলে নিল। মিয়া চুপ করে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে সেখানেই নিজের মুখ গুঁজে রাখলো।
রায়ান মিরাকে এই ভাবেই তাদের ঘরের ওয়াশ রুমে নিয়ে গেল। অতঃপর খুব যত্ন নিয়ে মিরাকে গোসল করিয়ে নিজেও গোসল করে নিল।
ফ্রেশ হয়ে রায়ান মিরাকে নিয়ে আরো কিছু টা সময় শুয়েছিল। সম্পূর্ণ টা সময় মিরা রায়ানের সাথে ইচ্ছে করে লেপ্টে ছিল যেন রায়ান নিজের থেকেই যাওয়ার ব্যাপারটা ক্যান্সেল করে দেয়। কিন্তু এমন কিছুই হয় নি। একপর্যায়ে মিরা যখন ঘুমিয়ে যায় তখন রায়ান মিরার পাশে থেকে উঠে গিয়ে নিজের সব কিছু গুছিয়ে নিল। আমেরিকায় সবকিছুই আছে তাই ব্যবসার কাগজ পত্র ছাড়া কিছুই তার নেওয়ার প্রয়োজন নেই। রায়ান প্রয়োজনীয় ফাইল গুলোই গুছিয়ে তুলে, ফার্মাল গ্রেসাপে রেডি হয়ে নিলো।
সকাল ১০টা~
হঠাৎ নিজের পাশটা খালি খালি লাগাতে মিরা ঘুমের মাঝেই বিছানার পাশে হাতরিয়ে রায়ানের উপস্থিতি না বুঝতে পেরে চেঁচিয়ে চমকে উঠে বসে-
“রায়ান…!”
রায়ান তখন আয়নার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। মিরা হঠাৎ চিৎকার করাতে সে সাথে সাথে সেই দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে মিরার কাছে গেল। মিরা রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান মিরার নরম গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে পাখি? কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছ?”
মিরা কোনো উত্তর না দিয়ে রায়ানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“আপনি উঠে গেছেন কেন আমার পাশ থেকে? আমি যখন উঠে যাই তখন তো খুব বোকা দেন।”
রায়ান মিরাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল-
“ফ্লাইট ১২টায়। একটু ডিলে করলেও ১২.৩০টায় সময় গড়াবে। আমাকে তো রেডি হতে হতো তাই না?”
মিরার মন মানছে না রায়ান কে যেতে দিতে। নিজের মনে এখন নিজের সাথেই যুদ্ধ করছে কি করবে সে! মিরা রায়ানের দিকে চোখ তুলে একটু বাচ্চাদের মতো করে বলল-
“এসব কি পরেছেন? খুলুন। একটুও ভালো লাগছে না।”
রায়ান নিজের দিকে চোখ নিচু করে দেখে বলল-
“ভালো লাগছে না? আমাদের ফার্স্ট নাইটের পর যখন তোমার গায়ে এটা পড়িয়েছিলাম তখন থেকে এই শার্টটা আমার খুব প্রিয় হয়ে গেছে। যদিও আমার শার্ট গুলো আমার থেকে তোমার গায়ে বেশি মানায়।”
মিরা রায়ানের শার্টের বোতামগুলো খোলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে বলল-
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। এগুলো আমাকেই মানায়। আপনি পড়বেন না। খুলে ফেলুন। কোথাও যেতে হবে না।”
মিরা রায়ানের শার্টটা খুলতে নিলে রায়ান মিরার দিকে স্থির নজরে তাকিয়ে থেকে বলল-
“সকাল সকাল কেন আমাকে উস্কানি দিচ্ছো? এখন আমি ধরলেই তো সমস্যা।”
-“আপনাকে ধরতে বলেছেন কে?”
মিরা শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে নিচের টা খুলতে সেখানে হাত দিতেই রায়ান মিরাকে আবারো জড়িয়ে ধরে বলল-
“আমার লক্ষ্মী বউ, এমন করে না। আমাকে তো যেতে হবে। তুমি এমন করলে আমি কিভাবে শান্ত থাকবো? এমনি তেই ভেতরটা পুরে যাচ্ছে তোমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা মাথায় আসতেই।”
মিরার চোখ জোড়া ঝাঁপসা হয়ে আসছে রায়ান যতবারই চলে যাওয়ার কথা বলছে। মিরা কে এতো চুপচাপ রায়ান কখনো দেখ নি। তাই বিষয়টা তারও ভালো লাগছে না। রায়ান মিরার ছোট্ট মুখটা নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে মিরার কপালে, চোখে, গালে, নাকে, ঠোঁটে সব জায়গায় ছোট ছোট আদরের পরশ দিয়ে বলল-
“আপাতত এতো টুকু আদরে কাজ চালাও। ভালো করে রেস্ট নাও কিছু দিন। আর নিজেকে তৈরি করে নিও। কয়েক মাসের আদর একসাথে নিতে হবে আমি ফিরলে। আমি তখন কোনো বাহানা শুনবো না।”
মিরা রায়ানের বুকে হাত রেখে তাঁকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত গলায় বলল-
“একটা মানুষ এতো কিভাবে বেহায়া হয় আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না।”
-“একটা ছেলে একটা নির্দিষ্ট মেয়ের জন্য বেহায়া হয়।, পাগল হয়, নির্লজ্জ হয়। আমার জন্য সেই নির্দিষ্ট কেউটা তুমি। বুঝেছ?”
মিরা শুধু হা হয়ে শুনেই গেল। সে অবাক। রায়ান মিরার বড় বড় চোখ গুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজেই দূর্বল হয়ে গেল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরা কে খুব সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করল-
“আচ্ছা, চোখে কি তুমি তামাক চাষ করো? দেখলেই নেশা ধরে যায় কেন?”
মিরা হতবাক রায়ানের প্রশ্নে। এই কথার কি কোনো জবাব হয়? রায়ান মিরাকে আঁকড়ে ধরে হঠাৎই বিছানায় শুয়ে দিয়ে মিরার গলায় মুখ গুঁজে মিরা উপরে শুয়ে পড়লো। মিরা আচমকা এমন কিছু হওয়াতে একটু সক্ড। রায়ান মিরার কানে কানে বলল-
“বেইবি, আমার কেমন যেন মাতাল মাতাল লাগছে। আমি হয়তো এখন কিছু আরেকটা করে ফেলবো।”
মিরা কৌতুহল নিয়েই রায়ান কে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আচ্ছা আপনার কি একটুও লজ্জা আসে না এসব কথা মুখে আনার সময়?”
রায়ান মিরার গলায় মুখ গুজে রেখেই বলল-
“লজ্জার সাথে আমার অলরেডি কথা হয়েছে, সে বলছে- সে আর আসবে না।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। এমন ঘোড়েল মানুষের সাথে সে কখনোই তর্কে জিততে পারবে না তাই কথা বাড়িয়েও লাভ নেই। এরপর মিরা নিজের থেকে রায়ান কে উঠিয়ে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে দাড়া করিয়ে শার্টের বোতাম গুলো লাগিয়ে দিয়ে, কোর্টটাও নিজের হাতে পড়িয়ে দিল। রায়ানের চুল গুলো ও আঁচড়ে দিয়ে নিজে এক সাইডে সরে গিয়ে বলল-
“হুম, ডান। এবার আয়নায় নিজেকে দেখুন তো।”
রায়ান মুচকি হেঁসে আয়নার দিকে তাকিয়ে কোর্ট টা একটু ঠিকঠাক করে নিজেকে দেখতে শুরু করলে মিরা পাশ থেকে বলল-
“You look so perfect hubby…”
রায়ান ভাবুক হয়ে একটু আয়নায় দেখে মাথা না সূচক নাড়িয়ে মিরার দিকে তাকালো। সে মিরার হাত ধরে টেনে নিজের সামনে দাঁড়া করিয়ে মিরাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আয়নার মধ্যে দিয়ে মিরার চোখে চোখ রেখে বলল-
“Now I am looking perfect…তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ হৃদপাখি।”
মিরা সন্তুষ্ট মনে মিষ্টি হেঁসে রায়ানের দিকে ফিরলেন রায়ান মিরার নাকে নিজের নাক ঘষলো। মিরা খিলখিল করে হেঁসে উঠে রায়ানের নাক খেয়াল করে বলল-
“আপনার নাক টা আমার নাকের থেকে সুন্দর।”
-“আমার সবকিছু টুকরোয় টুকরোয় সুন্দর।”
সে মিরার থুতনি ধরে মিরার মুখটা ঘুরিয়ে দেখে বলল-
“একবার নিজেকে দেখ..ভাইসাব, Top to bottom, overall beautiful. Just smooth like butter..”
মিরা হঠাৎ খুব গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলো-
“আপনি বিদেশে গিয়ে আমাকে ভুলে যাবেন না তো?”
রায়ান মিরা মাথা আঙুলের টোকা দিয়ে বলল-
“মিসেস মিরায়া রায়ান চৌধুরী, একটা কথা ভালো করে মাথায় গেঁথে নিন। আপনাকে আমি ততদিন মনে রাখবো, ঠিক যতদিন আমার দেহ ছেড়ে রুহ চলে না যায়।”
মিরা রায়ানের উত্তরে মুখ বেজার করে নিল। উত্তর টা ভালো লাগেনি তা নয় বরং মৃত্যুর কথা তার সহ্য হয় না।
-“এসব অলক্ষুনে কথা বলবেন না তো। আমি তো এমনি বলেছিলাম। যদি কখনো আপনার মন থেকে বের হয়ে যাই আমি?”
রায়ান একই সুরে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলল-
“আমার মন থেকে কেউ তোমাকে বের করে দিতে পারে, এই অধিকার টুকুতো আমি নিজেকেও দিই নি।”
মিরা রায়ানের কথায় না চাইতেও মুচকি হেঁসে উঠলো কিন্তু তবুও কথা ঘুরিয়ে বলল-
“আচ্ছা, তা না হয় মানলাম। কিন্তু দ্বিতীয় কাউ যদি আপনার মনে আসে। তখন?”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনায়েসেই অনর্গল বলে গেল-
“সৌভাগ্য বশত আমার মন এতো বড় না। যেই মনে তোমাকে ঠাঁই দিয়েছি সেখানে দ্বিতীয় কারো জন্য জায়গা অবশিষ্ট নেই।”
মিরা দাঁত বের করে গর্বের হাসি হেসে রায়ানের বুকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে বলল-
“How can a man be this good with his words..!”
রায়ান এক গাল হেসে মিরার কপালে চুমু দিয়ে বলল-
“A man in love, always sounds like this Mrs..All credit is yours..”
মিরা রায়ানের বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে বিষ্ময়ে বলল-
“এতো কিভাবে ভালোবাসেন কে জানে!”
রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মিরার কপালে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল-
“আমার তো একটাই তুমি আছো, ভালো না বেসে কোথায় যাবো? তুমি যাবে আরেকজন আসবে বিষয় টা এমন না। তুমি থাকবে বাকি সবাই দেখবে বিষয়টা এমন।”
মিরা ছলছল চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষ টাকে যত দেখে মনে হয় নতুন করে তার প্রেমে পড়ছে। এমন কথার ধারা জারি থাকলে হয়তো স্বর্গ সুখ ও কম পড়ে যাবে।
মুখের কথার সত্যি অনেক ক্ষমতা- শুধু কয়েকটা বুলির মাধ্যমেই কষ্টের শীর্ষ চূড়ায় ও সুখের সাগরে উপনিত হওয়া সম্ভব। মিরা রায়ানের হাত ধরে টেনে তাকে বিছানায় বসিয়ে বললো-
“এখানে বসুন। আমি আসছি।”
রায়ান কে বসিয়ে দিয়ে মিরা চট করে আলমারি খুলে নিজের ইনার থেকে একটা কালো স্ট্রেপ খুলে আনলো। রায়ান শুধু মিরার গতি বিধি দেখছে। মিরা রায়ানের পাশে বসে দাঁত বের করে হেঁসে বলল-
“হাত টা আগে করুন।”
রায়ান নিজের হাত আগে করলো মিরার কথা মতো। মিরা ঠোঁটে একটা তৃপ্তির হাঁসি নিয়ে রায়ানের হাতে তার ইনার স্ট্রেপটা পেঁচিয়ে পড়িয়ে দিতে দিতে বলল-
“বর ভালো হলেই কি! আশে পাশের নজর এতো খারাপ! এই যে এখন আমার চিহ্ন দিয়ে দিলাম কেউ সাহস করবে না নজর দেওয়ার। আর শুনুন, কারো চোখে না পড়লেও নিজ উদ্যোগে দেখিয়ে দেবেন এটা। কালো রং টা বেছে পড়ালাম যেন নজর না লাগে।”
মিরার কর্ম কান্ডে রায়ানের যেমন হাঁসি পাচ্ছে ঠিক ততটাই গর্ব হচ্ছে। বউয়ের জেলাসি তো গর্বের বিষয়ই! মিরার পড়ানো শেষ হলে রায়ান নিজের হাতটা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখে মিরাকে খেপাতে বলল-
“তাই বলে বউয়ের ইনার স্ট্রেপ হাতে জড়িয়ে ঘুরবে রায়ান চৌধুরী? যার হাতে কিনা ব্রেন্ডের ঘড়ি ছাড়া কখনো কিছু ওঠে নি!”
মিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“হ্যাঁ ঘুরবেন। প্রথম কথা, আমার এতো টাকা নেই। দ্বিতীয় কথা, ঘড়ি তে কি আপনার বউ আছে বোঝা যাবে? না যাবে না। কিন্তু এইটাতে বোঝা যাবে। আপনার পছন্দ না হলে দিন খুলে দিচ্ছি।”
মিরা নাটক করে রায়ানের হাত থেকে আবার স্ট্রেপটা খুলতে উদ্যত হলে রায়ান নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলে-
“আরে কি আজব! খুলবে মানে? এটা এখন আমার। এটা ফেরত পাবার আশা ছেঁড়ে দাও তুমি।”
রায়ান নিজের হাতের স্ট্রেপটার উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“এটা আমার কালেকশনের সব থেকে প্রিমিয়াম ব্রেন্ডের জিনিস- বউ ব্রেন্ড।”
মিরা রায়ানের কথায় আবারো হেঁসে উঠলো। দুজনে একসাথে নিচে নামলো। সকালের খাওয়া দাওয়া কমপ্লিট হলে রায়ান মা বাবা বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো বাড়ি থেকে। মিরা রায়ানের সাথে গেল রায়ান কে ছাড়তে। রায়ান শেষ বারের মতো তার বউ পাখিকে মন ভরে দেখল। ইচ্ছে মতো কয়েকটা চুমু একে দিল মিরার মলিন মুখটাতে। তাকে আবার সব বুঝিয়ে দিল কি কি করবে আর কি কি করবে না তার অনুপুস্থিতিতে। মিরাও রায়ানেকে অনেক দিক নির্দেশনা দিল যেন রায়ানও ঠিক থাকে।
গাড়িতে উঠের শেষ সময় অব্দি রায়ান মিরার হাত ধরে ছিল। মিরাও আস্টেপিস্টে ধরে রেখেছিল রায়ানের বাহু। কিন্তু সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দুজনকেই ছাড়তে হলো। মিরার চোখে অশ্রু কণা গুলো চিকচিক করছে একটা পলক পড়লেই হয়তো গড়িয়ে পরবে। কিন্তু মিরা রায়ানের সামনে কাঁদতে চায়নি। রায়ান ও সেটা বুঝতে পারছিল তাই আর বেশি দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসলো। রায়ান গাড়িতে উঠে জানালা দিয়ে মিরার হাত ধরে শেষ অব্দি মিরাকে আশ্বাস দিয়ে বলল-
“আমার লক্ষ্মী সোনা, আমি যাওয়ার পর একদম কাঁদবে না। আম্মুর কাছ থেকে সব খবর নিব আমি। ভুলেও যদি জানতে পারি ওই চোখের পানি গুলো পড়েছে ফিরে এসে নিজের মতো করে খুব কাদাবো আমি, বলে দিলাম। নিজের যত্ন নিবা। সাথে বাড়ির সবারও, বাড়ির বড় বউ বলে কথা। আমি তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফিরে আসবো।”
মিরা এবার আর ধরে রাখতে পারছে না নিজের আবেগ গুলো। ভেতর ভেতর যেন মেয়েটার বুকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। মিরার ঠোঁট কান্নায় ভেঙে আসছে দেখে রায়ান মিরাকে দুষ্টুমি করে বলল-
“উফফফ্, এমন ঠোঁট ভেঙে কান্না না করে বরকে একটা চুমুও তো দিতে পারো।”
মিরা কাঁদবে কি! এমন কথায় কান্না করার দ্বার প্রান্তে এসে ফিক করে হেসে দিল। রায়ান মিরাকে দেখে নিজেও হেঁসে উঠে বলল-
“That’s my girl..!
মিরা গাড়ির জানালে দিয়েই রায়ানের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“অসভ্য লোক একটা, কেন কাঁদবো আপনার জন্য আমি? একটুও কাঁদবো না। চুমুও দিবো না।”
রায়ান মিরা হাত টা নিয়ে মিরার হাতের একটা দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল-
“ঠিক আছে। আমার জন্য কাঁদতেও হবে না, চুমুও দিতে হবে না। আমার জন্য শুধু নিজেকে ঠিক সুরক্ষিত রেখ। তাতেই আমার লাখ শুকরিয়া। এতো টুকু তো পারবেই নাকি?”
মিরা হঠাৎ রায়ানের শার্টের কলার টা খামচে ধরে রায়ান মুখটা কাছে টেনে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল রায়ানের ঠোঁটে। রায়ান একটু অবাক হলেও সেকেন্ডের ব্যবধানে সেও মিরাকে ঠোঁট জোড়া নিজের মধ্যে আপন করে নিল। অতঃপর একটা মধুর প্রণয়ের মূহুর্তে মিরা রায়ান কে বিদায় দিল। ড্রাইভার এসে গাড়ি স্টার্ট দিল। সাময়িক সময়ের জন্য একজোড়া লাভ বার্ডস আলাদা হলো কিন্তু দুজনের কারো মন আর এখন বিষন্ন নেই। হাসি মুখে বিদায় জানালো দুজন দুজনকে।
রায়ান এয়ার পোর্টের জন্য বেরিয়েছে ৩০ মিনিটের বেশি হয়ে গেছে। এতোটা সময় মিরা রামিলা চৌধুরী, হোরায়রা, আর রিমির সাথেই বসেছিল। একটু গল্প করছিল এতক্ষন একসাথে যেন মনটা ভালো থাকে। মিরার যে রায়ানের কথা মনে পারছিল না এমন না। বাড়িতে বসে বসেই রায়ানের সাথে এতটা সময় মেসেজে কথা বলছিল। কোনো কারণ ছাড়া এমনি এমনি। তবে মনে হচ্ছিল না এমনি এমনি।
রায়ান মিরাকে জানায় সে এয়ার পোর্টে পৌঁছে গেছে। মিরা একটু স্বস্তি নিয়ে নিজের ঘরে গেল। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই সে খেয়াল করলো রায়ান নিজের প্রয়োজনীয় ফাইল নেওয়ার সময় অনেক ফাইল আর ডকুমেন্টস এলোমেলো করে রেখেছে। মিরা চোখ দুটো কুঁচকে নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“কয়েকটা ফাইল নেওয়ার জন্য কত গুলো ফাইল এলোমেলো করেছে। এখন সব আমাকে গোছাতে হবে।”
ঘরে কেউ নেই বলে মিরা একটু নাটক করে চেঁচিয়ে বউদের চিরন্তন সত্য ডায়লগ টা বলল-
“নিজে খালি সব এলোমেলো করবে আর আমি খালি গোছানো তাই না? আমার কি আর কাজ নাই? এই জন্য বিয়ে করে আনসে নাকি আমাকে? বান্দীয়ালি খাটতে?”
মিরা একা একা কথা গুলো বলে একাই খালি ঘরে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো মুখে হাত রেখে। তার পর সোজা গিয়ে এলো মেলো ফাইল আর ডকুমেন্টস গুলো গোছাতে শুরু করলো।
সব কিছু গুছিয়ে তোলার এক পর্যায়ে মিরার চোখে করলো একটা বড় খাম পরে আছে ফ্লোরে। মিরা সেটা হাতে তুলে দেখলো খামটায় উপর বড় বড় করে লিখা “সিটি হাসপাতাল” এর নাম। মিরার মনে হলো রায়হান চৌধুরী বা রামিলা চৌধুরীর কোনো রিপোর্ট এর খাম হয়তো সেটা। মিরা খামের নিচের দিকে প্যাসেন্টের নাম খেয়াল করলো। খামে প্যাসেন্টের জায়গায় লিখা- রিভান চৌধুরী রায়ান। মিরা একটু অবাক হলো। রায়ান অসুস্থ ছিল বা কোনো চেকাপ ছিল তার এমন কিছু তো মিরা কখনো শুনেনি। জানতো ও না এই ব্যাপারে। মিরা ডেট টা খেয়াল করে দেখলো- ডেট টা ২০২৫ এর অক্টোবরের মাঝা মাঝি সময়ের। একটু ভাবতেই মিরার মনে পড়লো আগের বছরের অক্টোবর মাসটা তো তারা একসাথে থাকেই নি।
এমনকি ওই সময়টা তো কে কোথায় আছে, কিভাবে আছে, এতো টুকুও দুজনের কেউ জানতো না। মিরার মুখটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। মনের মাঝে একটা অদ্ভুত ভয় জমা হয়েছে সাথে কৌতুহল ও। সে হাজার জানতে চেয়ে ও রায়ানের কাছে ওই একটা মাসের হিসেব পায় নি। রায়ান প্রতিবার কথা এড়িয়ে গেছে। মিরার হাত কাঁপছে হঠাৎ করেই। একটু ভয়ে ভয়েই মিরা খামের ভেতর থেকে কাগজ পত্রগুলো বের করলো। কাগজ গুলোর মধ্যে- হসপিটালের এক মাসের বিল রিসিট, রায়ানের নামে করা প্রেসক্রিপশন, সিটিসস্কেন এর রিপোর্ট, ব্লাড টেস্ট আরো অনেক টেস্টের রিপোর্ট একসাথে পিন আপ করা ছিল। সাথে দীর্ঘ এক মাস পরের ডিসচার্জ এর ডকুমেন্টস ও ছিল। মিরা হাসপাতালে ভর্তির তারিখ আর ডিসচার্জের তারিখ টা দেখলো। ভর্তির তারিখটা ছিল ঠিক বাইক রেসের পরেরদিনের আর ডিসচার্জের তারিখ তার আর আসিফের ম্যানেজমেন্টের দিনের যেদিন রায়ান তাকে চট্টগ্রামে নিতে গেছিল।
অস্পষ্ট সবকিছুই কেমন যেন মিলে যাচ্ছে নিজে নিজে। মিরা বুঝতে পারলো রায়ান ওই গোটা একটা মাস হসপিটালে ছিল যার জন্যই সে তাকে নিয়ে আসতে পারে নি। কিন্তু কি হয়েছিল সেই রাতে!? সে তো রায়ান কে একদম সুস্থ দেখেছিল সেদিন। তাহলে তার চলে যাওয়ার পর এমন কি হয়েছিল রায়ানের সাথে? মিরার পা দুটো হঠাৎ জোড়িয়ে এলো। ধপ করে ফ্লোরে বসে গিয়ে মিরা নিজের মাথার চুল খামচে ধরে নিজের নিজে বলল-
“না না, এটা কিভাবে হয়! আমার ভুল হচ্ছে। রায়ানের কিভাবে কিছু হতে পারে! না না, এইসব মিথ্যে।”
মিরা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আর না তার হিসেব মিলছে। হিসেবে যা মাথায় আসছে সেটা তার পক্ষে মানা সম্ভব না। মিরার মনে করেন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মিরার মাথায় তখন একজনের কথাই মাথায় এলো-
“মামণি, হ্যাঁ মামণি কে গিয়ে জিজ্ঞেস করি। মামণি আমাকে মিথ্যে বলবে না।”
মিরা কাগজ গুলো কোনো মতো নিজের হাত তুলে নিয়ে দৌড়ে নিচে নামতে নামতে রামিলা চৌধুরীকে ডাকলো-
“মামণি…মামণি..!”
-“কি হয়েছে…!”
মিরার সম্পূর্ণ শরীর রীতিমতো কাঁপছে। রামিলা চৌধুরী মিরা ডাকে তাড়াহুড়ো করে মিরার কাছে এসে চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন-
“কি হয়েছে? এমন কাঁপছিস কেন? ভয় পেয়েছিল কিছু তে?”
মিরা কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রামিলা চৌধুরীকে নিজের হাতের কাগজ গুলোৎদেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“মামণি, এগুলো কি? রায়ানের কি হয়েছিল যখন আমি ছিলাম না? উনি কেন আমাকে আনতে যান নি? কি হয়েছিল? এসব কি?”
রামিলা চৌধুরী মিরার হাতের থেকে হসপিটালের সব কাগজ গুলো নিয়ে নিলেন। তিনি এখন পরিস্থিতি কিভাবে সামলাবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। মিরার চেঁচামেচি যে রায়হান চৌধুরী সহ বাড়ির বাকিরাও নিচে নেমে এলো। মিরা রামিলা চৌধুরীকে চুপ থাকতে দেখে রায়হান চৌধুরীকে প্রশ্ন করলো-
“বাবা, তুমি অন্তত আমাকে সত্যি বলো। কি হয়েছিল? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না বিষয়টা এমন নয়। আমি শুধু সবটা সত্যি জানতে চাই।”
রায়হান চৌধুরী ও কিছু বললেন না। রুদ্র মিরাকে এতটা হাইপার হয়ে দেখে রিমিকে বলল-
“রিমি, মিরাকে শান্ত হতে বলো। শান্ত মাথায় কথা বলি আমরা।”
রিমি রুদ্রর কথায় সম্মতি দিয়ে মিরার কাছে গিয়ে মিরাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল-
“মিরা, জান আমার, একটু শান্ত হ। সবাই বসে কথা বললে সব জানতে পারবি। একটু শান্ত হ।”
মিরা রিমির কথায় অবাক হয়ে বলল-
“তুই ও জানতি? আমায় বল। এসবের মানে কি?”
রুদ্র পিছন থেকে মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“মিরা..একটু শান্ত হয়ে বোস। পানি খা। আমি সবটা বুঝিয়ে বলছি তোকে।”
মিরার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। মিরা রুদ্র আর রিমির উপর চেঁচিয়ে উঠলো-
“পারবো না শান্ত হতে। এক্ষুনি বলতে হবে মানে এক্ষুনি বলতে হবে। I said, noww….”
রামিলা চৌধুরী মিরার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মিরাকে বললেন-
“আমার জন্য। তুই এসবের কিছুই জানিস না আমার জন্য। আমি জানতে দেই নি তোকে কিচ্ছু।”
মিরা কয়েক পা পিছিয়ে গেল। একটু আগে নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না আর এখন নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছে না। মিরা তবু নিজেকে শক্ত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“মামণি, যা হওয়ার হয়েছে। I don’t care.. তোমার পায়ে পরি আমাকে সবটা খুলে বলো প্লিজ। আমার দমবন্ধ লাগছে। মামণি প্লিজ।”
রামিলা চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে রায়ানের অ্যাকসিডেন্টের ঘটনাটা খুলে বললেন। এমনকি তার মিরাকে রায়ানের পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে মিরাকে সব কিছু থেকে আলাদা করে দেওয়ার কথাও তিনি স্বীকার করলেন। মিরার মন টা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে সবকিছু শুনে। রামিলা চৌধুরী মিরার দুই হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে মিনতি করে বললেন-
“আমার জন্য তোদের মাঝে এতো বড় ভুলবোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল। আমাকে মাফ করে দিস মা। আমি মা হয়ে ছেলের ওই অবস্থা সহ্য করতে পারি নি।”
মিরা অঝড়ে কাঁদতে লাগলো। সে নিজেই নিজেকে দায়ী করছে রায়ানের পরিস্থিতির জন্য। মিরা ভাঙা গলায় কাঁদতে কাঁদতেই রামিলা চৌধুরীকে বলল-
“তু..তুমি তো ভুল কিছু করো নি মামণি। আমিই দায়ী সব কিছুর জন্য। উনি আমার জন্যই এতো কিছুর মধ্যে দিয়ে গেছেন। যদি আমি জেদ না করতাম, যদি আমি বাড়ি ছেড়ে না যেতাম উনি আমাকে নিয়ে যেতেন না ওই রাতে। আর না এসব কিছুই হতো। উনার সাথে। আমি দায়ী সব কিছুর জন্য।”
মিরা বল হারিয়ে ঠাস করে ফ্লোরে বসে পড়লো। সোরায়া আর রিমি দৌড়ে গিয়ে মিরাকে আগলে ধরে মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো –
“মিরা, নিজেকে কষ্ট দিস না। রায়ান ভাইয়া তোকে এসব বলেন নি তুই কষ্ট পাবি বলেই।”
-“আপু শান্ত হও। যাই হয়েছে সব অতীত। ভাইয়া এখন ঠিক আছে।”
মিরা মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলতে থাকলো-
“আমার জন্য কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে উনাকে। কতো লেগেছিল হয়তো উনার। আমি কেন উনাকে ছেঁড়ে গেছিল? সব আমার দোষ। আমি থাকলে ওই একটা মাস আমরা সুখে সংসার করতাম। উনাকে হসপিটালে থাকতেই হতো না।”
রামিলা চৌধুরী মিরার সামনে বসে মিরাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন-
“মিরা মা আমার কথা শোন। তোর কোনো দোষ নেই। দৈখ রায়ান এখন নেই। তুই এমন করলে আমার চ
ছেলেটার কি হবে বল? ও তোকে ছাড়া চোখ থাকতেও অন্ধ। ওর কথা চিন্তা করে কষ্ট পাস না। রায়ান তোর কষ্ট সহ্য করতে পারে না বলেই তোকে কখনো এসব বলে নি।”
মিরা রামিলা চৌধুরীর হাত ধরে বলল-
“আমি রায়ান কে ছাড়া বাঁচতে পারবো না মামণি। তুমি আমাকে তোমার ছেলেকে এনে দাও। যেতে হবে না আমেরিকা। করার নেই কাজের আমার। কিচ্ছু লাগবে না। আমাকে তুমি তোমার ছেলেকে এনে দাও মামণি। আমার শ্বাস আঁটকে যাচ্ছে। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে উনাকে।”
রামিলা চৌধুরী মিরা পাগল প্রায় চেহারার দিকে তাকিয়ে মিরা চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল-
“রায়ানের ফ্লাইটের সময় হয়ে এসেছে। এখন কিভাবে?”
রামিলা চৌধুরী আর বাড়ির সবাই মিরাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো- যে যা হওয়ার হয়েছে এতে মিরার কোনো দোষ ছিল না। সম্পূর্ণ ভাগ্যের দ্বায়। মিরা চোখের পানি মুছে নিজে নিজে বলল-
“আমাকে যেতে হবে। এখুনি। আমি আসছি।”
বাড়ির সবাই মিরাকে আটকানোর চেষ্টা করলো কিন্তু মিরার মাথায় এখন শুধু রায়ান চলছে। মিরা উপর থেকে রায়ানের বাইকের চাবিটা আর নিজের ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। রুদ্র মিরারসাথে যেতে চাইলেও মিরা রুদ্র কে আসতে না করে। সে নিজে রায়ানের সাথে এই নিয়ে কথা বলবে বলে। তাদের দুজনের ব্যপার তারা নিজেরা ঠিক করবে। সে ওইদিন রায়ান কে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাইবে রায়ান কে নিজের কাছে ধরে রাখবে আর কখনো ছাড়বে না- এই আশায়
ফ্লাইটের ডিলে হওয়াতে রায়ান এখনো এয়ার পোর্টের ভেতরে বোর্ডিং এ বসে আছে। ফোনের ইমেইল গুলোই ঘাটছে। তখনি হঠাৎ তার পাশে একটা মেয়ে এসে বসলো। রায়ান সেই দিকে নজর দিল না। মেয়েটা কিছুক্ষণ রায়ান কে পর্যবেক্ষণ করে যখন দেখলো রায়ানের সাথে আর কেউ নেই নিজের থেকেই ভাব নিয়ে হেঁসে রায়ানের সাথে কথা বলল-
“Hey handsome, may I have your number..?”
রায়ান প্রথমে সেটা খেয়াল করলো না। মেয়েটা একই কথা দ্বিতীয় বার বললে রায়ান তার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“Come again please..I didn’t hear you.!”
-“I Said, you are really handsome.. may I have your number?”
রায়ান মুচকি হেঁসে মেয়েটাকে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের ঠোঁটের স্লিভস টা একটু উঠিয়ে ওই মেয়েটাকে নিজের
হাতে মিরার ইনার স্ট্রেপটা দেখিয়ে বলল-
“Sorry miss, This handsome is taken..By a very jealous woman..”
মেয়েটা একটু লজ্জিত হয়ে রায়ান পাশের সিটে থেকে সরে গিয়ে অন্য সিটে বসলো। রায়ান আবার নিজের কাজে মন দিলো। তখনি তার ফোনটা বেজে উঠলো। রায়ান ফোনটা খেয়াল করতেই দেখলো মিরা কল করেছে। রায়ান মুখে একটা মিষ্টি হাসি নিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরে বলল-
“Hi my Mrs.. missing me already?”
অপর পাশ থেকে মিরা কাঁদতে কাঁদতে ব্যস্ত গলায় বলল-
“রায়ান, আমার জন্য কিছু টা সময় অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।”
রায়ান মিরার কথা স্পষ্ট শুনতে পেল না। এয়ার পোর্টে নেটওয়ার্কের সমস্যা নাকি মিরা দিক থেকে সে বুঝতে পারলো না। রায়ান ফোনটা মুখের সামনে এনে বলল-
“হৃদপাখি, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কি বলছো?”
-“আমি আসছি। অপেক্ষা করুন একটু আমার জন্য।”
তখনি প্যাসেঞ্জারস দের ফ্লাইট জয়েন করার জন্য মাইকিং করা হলো। রায়ান ব্যস্ত কণ্ঠে মিরাকে বলল-
“হৃদপাখি, আমি তোমার কথা কিছু শুনতে পারছি না। পৌঁছে কল করবো কেমন? এখন ফ্লাইটের টাইম হয়ে গেছে। যেতে হবে।”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৮
এরপর আর কোন দিক থেকে কথা এলো না। কল টা কেঁটে গেল। মিরা বাইকটা আরো স্পিডে রাইড করা শুরু করলো। রায়ান ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলো-
“কি বলতে চাইলো শুনতেই পেলাম না। এখন তো সময় ও নেই। পৌঁছেই কল করতে হবে।”
এই বলে রায়ান ফ্লাইটে উঠার উদ্দেশ্যে পা বড়ায়..
