Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৮

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৮

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৮
অরাত্রিকা রহমান

সকাল~৯.৩০
রায়ান মিরা চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছায়। রায়ান মিরাকে সাবধানে বাইক থেকে নামিয়ে বাইকটা গ্যারেজে পার্ক করে মিরা হাত ধরে একটু সাপোর্ট দিয়ে একসাথে পাশাপাশি হেঁটে বাড়িতে প্রবেশ করলো। ড্রয়িং রুমে রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরী সোফায় বসে আছেন। রুদ্র আর রিমি ও দাঁড়িয়ে। দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ গর্মা গর্মি পরিবেশ। রায়ান আর মিরা ড্রয়িং রুমের মাঝে বরাবর আসতেই রায়হান চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন-
“রায়ান…তোরা কোথা থেকে এলি?”

রায়ান মিরার একে অপরের সাথে চোখাচোখি করলো। রায়ান শান্ত গলায় উত্তর দিল-
“মিরাকে আমাদের নতুন বাড়িটা দেখানো হয় নি কখনো। কালই কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে আর আজ তো আমাদের অ্যানিভার্সারি তোমরা তো জানোই। তাই রাতে নিয়ে গেছিলাম ওকে ওই বাড়িতে। কেন কি হয়েছে?”
রায়হান চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেলেন। রামিলা চৌধুরী রায়ানের দিকে শকুনের মতো কঠোর ও শক্ত নজর নিক্ষেপ করে বললেন-
“তোর বউ তুই কোথায় নিয়ে যাবি তাতে আমাদের মাথা ব্যাথা নেই। কিভাবে নিয়ে গেছিস তাই বল। গাড়ি তো পার্কিং এ ছিল।”
রায়ান লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল-
“গাড়ি তো নিয়ে যাই নি আম্মু। বাইকে করে গেছি।”
রামিলা চৌধুরী সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
“গাড়ির বদলে বাইক নিয়ে গেছিস তাও ঠিক আছে কিন্তু বাইক টা কে চালিয়েছে?

মিরা চোখ বড় বড় করে নিয়ে রায়ানের দিকে তাকালো। মিরা রায়ানের হাত শক্ত করে চেপে ধরে সত্যি টা না বলতে বলল। হাজার হোক শশুর শাশুড়ি – বউমা বাইক রাইড করে জানলে কি ভাববে কে জানে। রায়ান এবার মিথ্যা বলবে না সত্যি বলবে তাও ভেবে পাচ্ছে না। মিরা আরও ভয় পাচ্ছে বাইক রাইডিং এর কথা চাচা চাচি জানলে আর রক্ষা থাকবে না। মিরা এক পাশে রুদ্র আর রিমিকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের চোখে চোখ মেলানোর চেষ্টা করলো। রিমি মুখই তুলছে না আর রুদ্র তো না ই। অনেকক্ষণ পরে মিরা রিমির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে রিমি মিরাকে ইশারা করে বলল সবাই সব জেনে গেছে। মিরা হতাশায় পরে গেল সাথে সাথে। রামিলা চৌধুরী মিরা কে ধমক দিয়ে বললেন-

“মিরা..আমি সামনে। তোর নজর কই?”
মিরা তৎক্ষণাৎ সোজা রামিলা চৌধুরীর দিকে তাকায় আর তখনি মাথা নিচু করে নেয়। রায়ান ও নিজের থেকে কিছু বলছে না। সে আশা করছে মিরা কিছু বলবে। সে নিজের থেকে কিছু বলে পরিস্থিতি আর খারাপ করতে চায় না। রামিলা চৌধুরী দুজনকেই চুপ থাকতে দেখে চেঁচিয়ে বললেন-
“তোদের জন্য আজকে আমি এক রাক্ষুসে মহিলার সাথে ঝগড়া করেছি..ভাবা যায়?‌ সন্তান দের কর্মের জন্য এখন এই বয়সে চুলোচুলি করতে হলো আমাকে। আমি চৌধুরী বাড়ির কর্ত্রী।”
রায়ান মিরা কিছু বোঝার আগেই এই সব কথায় তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। কিসের ঝগড়া! কিসের চুলোচুলি! রায়ান মায়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আরে চেঁচাচ্ছো কেন? কি হয়েছে?”
রামিলা চৌধুরী আরো উত্তেজিত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করলেন-
“ওই বজ্জাত মহিলা কেন আমার বউমাকে নিয়ে কথা বলবে। আমার বউমার বাইক চালায় না ট্রাক্টর চালায় ওই মহিলার কি?”
রায়ান কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। মিরা কোনো মতো নিজের ব্যাথা সামলে নিয়ে রামিলা চৌধুরীর কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল-

“মামণি, ও আমার লক্ষ্মী মামণি, রাগ করে না। আমি মাঝে মাঝে রাইডিং করি।”
রামিলা চৌধুরী মিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
“আমার বউমা বাইক চালায় এটা আমি অন্য কারো কাছ থেকে কেন জানবো। ওই মহিলা আমাকে জ্ঞান কেন দেবে আমার ছেলের বউকে নিয়ে?”
মিরা আসলে বুঝতেও পারছে না রামিলা চৌধুরী তার হয়ে লড়ছে না তার সাথে লড়ছে। ছেলেরবউ কথাটা কানে যেতেই রায়ানও খুব সিরিয়াস হয়ে গেল। সেও রেগে ফায়ার হয়ে গায়ের কোর্ট খুলে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“আমার বউয়ের নামে কে কি বলেছে? কোন মহিলা..? কি বলেছে? ওই রুদ্র কথা বলিস না কেন? কি হয়েছে কি এখানে।”
রামিলা চৌধুরী একদম তেজ দেখিয়ে বললেন –
“ও কি বলবে, ও মহিলার অস্তিত্ব রেখেছি নাকি আমি? তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে? হাহ্, কি সাহস। মার বাড়ির বউদের নিয়ে কথা বলে।”

রায়ান মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের মাথায় হাত দিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো- কে কি বলেছে একটু বলো তো আম্মু। মিরা রামিলা চৌধুরীকে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল-
“আগে পানি খাও। পরে আস্তে ধীরে হল কি হয়েছে? আমি বাইক চালাই বলে কেউ মন্দ বলেছে? আমি কি ক্ষমা চাইবো কারো কাছে তাহলে মিটবে?”
উপস্থিত সবাই একসাথে বলে উঠল -“নাআআ..!”
মিরা ঘাবড়ে গেল। রিমি এগিয়ে এসে বলল-
“আরে ওই পাশের বিল্ডিং এর কিছু কুচুটে আন্টির দল আছে। মামণি আজ সকালে যখন বাইরে হাঁটতে গেছিল তখন উনারা শুনিয়ে শুনিয়ে কিছু কথা বলছিল।-
রায়ান-“কি বলছিল?”

রিমি চুপ করে গেল। রামিলা চৌধুরী নিজের থেকে বলা শুরু করলেন-
“আমার বাড়ির বউরা নাকি ভালো না..বড়জন বরকে বাইকের পিছনে বসিয়ে মাঝ রাতে টইটই করে। ছোটজনের পরিবারের ঠিক ঠিকানা নেই। এসব বলেছে ভাব একবার।”
মিরা রিমির ব্যাপারে বলা কথা গুলো শুনে সাথে সাথে তেতে উঠলো-
“কিহ্, রিমিকে উনারা চেনে নাকি? এমন কথা কিভাবে বলল?”
রিমি মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“না জানলেই কি ভুল তো বলে নি ঠিকই তো বলেছে।”
এবার রিমি বাদে উপস্থিত সবাই একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো-“চুপ..,!”
রিমিও ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে গেল। রুদ্র এগিয়ে এসে বলল-
“রিমি অন্যের কথায় তুমি নিজেও যদি সম্মতি দাও তাহলে আমরা কারা। আমরা কি তোমার পরিবার না?”
রিমি রুদ্রর দিকে শুধু তাকিয়ে রইল। রায়ান নিজের শার্টের হাতা গটাতে গটাতে জিজ্ঞেস করলো-
“কই ওই কুচুটে আন্টি গুলো? আমার বউ আমাকে বাইকের পিছনে নিয়ে টইটই করবে নাকি বিছনায় নিয়ে নাচানাচি করবে তাদের কি? উনাদের বর নেই? পারলে নিজেরাও করুক।”
মিরা রায়ানের কথায় মাথায় হাত দিয়ে বলল-

“কি সব বলছেন। চুপ করুন তো।”
রামিলা চৌধুরী ছেলের দিকে নিয়ে বললেন-
“কেন চুপ করবে আমার ছেলে? ঠিকই তো বলেছে। পারলে ওরাও করুক। তোদের নিয়ে কথা কেন বলবে।”
রায়ান মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে জিজ্ঞেস করল-
“তোমাকে কি ওরা আর কিছু বলেছে আম্মু?”
রামিলা চৌধুরী পুরোই ব্যাডি ভাব নিয়ে বললেন-
“তোর কি মনে হয়, আমি ছেড়ে দিয়েছি? আমি তোর মা, একদম ধুয়ে দিয়েছি। মুখের উপর বলেছি- তোমাদের যোগ্যতা আমার বউমাদের নিয়ে পিএনপিসি করার পর্যন্তই। সাথে দু চারটা চুল ও ছিঁড়ে দিয়েছি।”
মিরা শাশুড়ির মুখে এইসব শুনে জিহ্বায় কামড় দিল। আর রায়ান মায়ের কাছে গর্ব করে মায়ের সাথে হাই ফাইভ দিয়ে মায়ের দুই গালে হাত রেখে মাথায় চুমু খেয়ে গর্বিত কণ্ঠে বলে উঠলো-
“That’s my mom..so proud of you..”
রায়হান চৌধুরী ও ভাব নিয়ে বললেন-

“বউ টা কার দেখতে হবে না।”
রুদ্র মাঝ থেকে বলল-
“আর বল না যত্তসব ফাউল। আমি মানহানির মামলা করে দিয়েছি।”
মিরা আর রিমি একে অপরকে দেখে যাচ্ছে। ডিএনএ টেস্টের কোনো প্রয়োজন ও নেই। দুজনে একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলল বাকিরা হাসছে। মিরা রামিলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“উফ্, মামণি হার্টবিট বাড়িয়ে দিয়েছ একবারে। আমি ভেবেছি কি না কি ভেবেছ তুমি আমার রাইডার হওয়ার কথা জানতে পেরে।”
রামিলা চৌধুরী উৎসুক নজরে মিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
“মিরা আমার তো বিশ্বাস ই হচ্ছে না, তুই কি সত্যিই বাইক চালাতে পারিস? কবে শিখলি তোর বয়স ও তো কম।”
মিরা মুচকি হেঁসে বলল-

“ওই একটু আধটু আর কি। ছোট বেলায় শিখেছিলাম।”
রায়ান মায়ের উদ্দেশ্যে একটু তথ্য বারিয়ে দিল-
“হ্যাঁ, ওই একটু আধটু তেই তোমার রেসার ছেলেকে সে রেসের ময়দানে টেক্কা দেয়।”
রামিলা চৌধুরী মিরার হাত ধরে বললেন-
“মিরা, আমাকেও শিখিয়ে দিবি? আমার খুব শখ বাইক চালানোর।”
রায়হান চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে রামিলা চৌধুরীর হাত ধরে উঠিয়ে নিয়ে বললেন –
“কোনো দরকার নেই। তোমার ছেলের সাহস আছে রাইডার বউ সামলানোর। আমার নেই। শেষ বয়সে তোমার চিন্তায় মরতে চাই না আমি.., চলো।”
রামিলা চৌধুরী মুখ বেজার করে নিলেন। রায়হান চৌধুরী তাকে ভালো মতো বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন। রায়ান রুদ্র মিরা রিমি তাদের দেখে হেসে উঠলো।

সকালে সোরায়াকে ঘরে না দেখে মিরা যখন সোরায়াকে কল করে তখন সে জানতে পারলো মাহিরের পরিবারের সাথে আজ সোরায়া দেখা হয়েছে। সোরায়া ভিডিও কলে সবার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিল। রায়ানের বউ হিসেবে মিরাকে সীমা খান এবং মাহিদ খান দুজনেই পছন্দ করেছেন। এরপর বড় দের কথা হলো সীমা খান রামিলা চৌধুরীকে রোকেয়া বেগমের সাথে এই নিয়ে কথা বলতে বললেন। সবকিছু মিটে গেলে দুপুরে মাহির সোরায়াকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বের হয়। সীমা খান এবং মাহিদ খান মোটেও সোরায়া কে ছাড়তে চাইছিলেন না কিন্তু কিছু করার নেই। ওনারা সোরায়াকে বাড়ির বাইরে বিদায় দিতে আসেন। সোরায়া সালাম করে বিদায় নিলে সীমা খান সোরায়ার গালে হাত রেখে বললেন-

“খোদা করুন খুব তাড়াতাড়ি যেন এই খান বাড়ি আলো করে স্থায়ী ভাবে তোকে এই ঘরে তুলতে পারি আমার ছেলের বউয়ের রূপে তো অবশ্যই তবে বউমা রূপি মেয়েকে।”
মাহির বাইক বের করেছিল বলে মাহিদ খান উল্টো গাড়ির চাবি এনে মাহির কে দিয়ে বললেন-
“বাইকের মতো এত রিস্কি পরিবহনে আমার মেয়ে উঠবে না। গাড়িতে করে দিয়ে আয়। সাবধানে দিয়ে আসবি।”
মাহির বাধ্য হয়ে বাইক রেখে গাড়ির চাবি নিয়ে বের হলো সোরায়াকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে। রাস্তায় সোরায়া মাহিরের এক বাহু জড়িয়ে বসেছিল। মাহির সোরায়াকে এমন চিপকে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে আমার জানের?”
সোরায়া সামনের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল-
“আজ অনেকদিন পর মনে হলো আম্মু আব্বু কে দেখলাম। আমার নিজের আম্মু আব্বু কে মনে নেই ছবি দেখলে একটু আবছা আবছা মনে পড়ে। কিন্তু আমি সিওর তারা থাকলে ঠিক আপনার আম্মু আব্বুর মতোনই থাকতেন। আমাকে এতোটাই আদর করতেন।”

মাহিরের আসলে এই কথায় কি বলা উচিত সে বুঝে উঠলো না। সোরায়ার মাথায় একটা ছোট চুমু দিয়ে বলল-
“ওনারা আমাদের দুজনের আম্মু আব্বু। আর এই আমি টাও তোমার।”
সোরায়া মাহিরের মুখে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল-
“জানেন ছোট বেলায় আপু কখনো আমাকে আম্মু আব্বুর কবরের কাছে নিয়ে যেত না। ভাবতো আমি কষ্ট পাবো, কাঁদবো। তখন আমার মনে হতো আমার কপালটা কতই না খারাপ। আপুও তার ওই ছোট বয়সে আমার জন্য চিন্তা করে নিজের শৈশব কাটিয়েছে। আমি না ভাগ্য খারাপ হওয়া বুঝতাম না। তখন আপুকে বলতাম- I hate my forehead.”
সোরায়া কথাটা বলেই হেঁসে উঠলো। মাহির সোরায়ার কথাগুলো মন দিয়ে শোনে গাড়িটা এক সাইডে করে দাঁড়া করালো। সোরায়া হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারলো না।

-“কি হলো? গাড়ি দাঁড়া করালেন যে।”
-“দেখি কোন কপালটাকে খারাপ বলছো? আবার হেইট ও করো।”
মাহির সোরায়ার কপালে থেকে ছোট ছোট চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে সোরায়ার কপালে দৃঢ় একটা চুমু এঁকে দিল। সোরায়া মাহিরের কাজে মুচকি হেসে আরো আদরের লোভে বলল-
“I hate my eyes..!”
মাহির সোরায়ার উদ্দেশ্যে বুঝতে পেরে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সোরায়ার দুই চোখে আলতো করে চুমু দিল। আর কিছু বলার আগে ঠোঁট ব্যতীত বাকি সম্পূর্ণ মুখে এলোমেলো ছোট ছোট চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল। সোরায়া মনে মনে শয়তানি করে বলল-
“I hate my lips too..!”
মাহির সোরায়ার গোলাপি ফোলা ফোলা ঠোঁট গুলোর দিকে তাকালো। তার যে খুব ইচ্ছে করছিল নিজেকে আটকানোর এমন না তবে সীমা লঙ্ঘন করার ইচ্ছা ও নেই। সবুর করতেই সমস্যা কই! মাহির সোরায়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে সোরায়াকে বুঝিয়ে বলল-

“উহু, জান বাচ্চা। এটা বিয়ের পর।”
সোরায়া টলমল চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহির নিজের দুই আঙ্গুলে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে সোরায়ার ঠোঁটের উপর রেখে বলল-
“I love you lips.. it’s just that I can prove it now.. but I will later..”
সোরায়া ও মাহিরের আঙুল চুমু দিল। মাহির আবদার করে বলল-
“একবার জড়িয়ে ধরি?”
সোরায়ার মাহির কে নিজের থেকেই জড়িয়ে ধরলো। মাহির সোরায়ার ঘাড়ে ছোট চুমু দিয়ে বলল-
“খুব তাড়াতাড়ি বউ করতে হবে তোমাকে, এভাবে আর টেকা যাচ্ছে না।”
সোরায়া মাহিরের কথায় একগাল হাসলো। এরপর দুজনে আবার আগের মতো কথা বলতে বলতে বাড়িতে ফিরলো।

দীর্ঘ ২মাস কেটে গেছে। বিয়ের পর মিরা আর রিমির প্রথম রোজা আর ঈদ শ্বশুড় বাড়িতে বেশ আনন্দ কেটেছে। ঈদে ঢাকা থেকে সবাই চট্টগ্রামে গিয়ে সোরায়া আর মাহিরের বিয়ের কথা হয়েছে। ঈদের পর পরই দুজনের এ্যানগেজনেন্ট হয়ে গেছে। টিচার-স্টুডেট এর পর গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড এর সম্পর্কে এসে তারা এখন একে অন্যের বাগদত্তা। বিয়েটা সোরায়ার বোর্ডে পরীক্ষার পর পরই ঠিক করা হয়েছে। আর মোটে ৪ মাসের মতো বাকি। সবকিছু মিলিয়ে তিনটে পরিবারই এখন সুখে আছে।

বাড়ির ছেলেরা বরাবরের মতোই ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। রায়ান তো এখন কাজের চাপে শ্বাস টুকু ও নেয় যখন মিরাকে জড়িয়ে ধরে। মিরাও কিছু বলে না। ছেলেটাকে এতো ক্লান্ত দেখে তারও মায়া লাগে। সব সময় চেষ্টা করে পাশে থাকার। রায়ানের অবস্থা ও তাই। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও বউকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেওয়া বাড়ি নিয়ে আসা, খাবার খেয়েছি কি খবর নেওয়া এসবে তার কখনো ভুল হয় না। একটা কথা চিরন্তন সত্য- “একজন ব্যক্তি আর প্রিয় মানুষের কাছে কখনো ব্যস্ত থাকে না, সবসময়ই ফ্রি। সময় কেউ নিজ ইচ্ছায় না দিলে তা পাওয়া দুষ্কর।”
রায়ানের আমেরিকার ব্রেঞ্চে কাজ এমন ভাবে জমেছে যে তার সেখানে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। এপ্রিল এর ২৬ তারিখ রায়ানের ফ্লাইট কথাটা সে একবার বলেছিল আর ঘাটেনি। মিরাও এই নিয়ে কিছু বলে নি রায়ান কে। সে ভেবে ছিল রায়ান যাবে না তাকে ছেঁড়ে তাই পাত্তা দেই নি।

এপ্রিল-২৫ তারিখ~
সকাল সকাল মিরা রিমির সাথে ওয়াশ রুমের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। মিরার মুখে একটা তীব্র চিন্তার ছাপ রিমির ও এক অবস্থা। ওয়াশ রুমের বাইরে রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে। রিমি অকারণে টেনশন করছে দেখে মিরা রিমির কাঁধে হাত রেখে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল-
“আরে বাবা একটু স্থির হ। এমন কি হয়েছে? এতো ছটফট করছিস কেন?”

-“আরে ধুর, কিভাবে স্থির হবো? এটার রেজাল্ট পজিটিভ আসলে কি হবে? আর নেগেটিভ আসলেই বা কি হবে?”
মিরা রিমির অবস্থা দেখে বুঝতে পারছিল রিমি কতটা চিন্তিত। আসলে, রিমির পিরিয়ড ডেট মিস যাওয়ার পর রুদ্র কে বলে ঘরে তারা একটা প্রেগন্যান্সি টেস্ট নেয়। সেটায় রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে। আবার পরে যখন নিশ্চিত হতে আবার টেস্ট নিয়েছে তখন নেগেটিভ এসেছে। দুজনের মধ্যে কেউ ই এতো বড় হয়েও কি করবে ভেবে না পেয়ে মিরাকে জানিয়েছে। প্রথমে খবরটা মিরা কানে যেতেই মিরা চিৎকার দিয়ে উঠতে নেয়, রিমি পরের টেস্টে যে নেগেটিভ এসেছে সেটা জানায় মিরাকে। এখন দুজন ওয়াশ রুমে এই জন্যই দাঁড়িয়ে আছে আবার টেস্ট করছে বলে। রিমি ঠিক বুঝতে পারছে না যদি সে প্রেগন্যান্ট হয়ে তাতে কেমন রিয়েক্ট করবে বা নেগেটিভ হলেই বা কি করবে।
কিছুক্ষণ পর টেস্ট এর রেজাল্ট নেগেটিভ দেখালে রিমি হতাশ মুখে ওয়াশ রুম থেকে বের হলো। মিরা রিমিকে আর রুদ্র কে বুঝিয়ে বলল একবার ব্লাড টেস্ট করিয়ে সিওর হয়ে নিতে। মিরা রুদ্র আর রিমিকে একা ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। রুদ্র রিমিকে জড়িয়ে ধরে স্বান্তনা দিয়ে বলল-

“আরে তুমি মন খারাপ করছো কেন? আমরা তো ট্রায় করি নি বেবির জন্য। এ্যাকসিডেন্ট ছিল। তুমি চাইলে আমরা সত্যি ট্রায় করবো।”
রিমি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। সে নিজেকে ভাগ্য বতী মনে করে যে রুদ্রর মতো একজন তার জীবন সঙ্গী যে সব সময় তার পাশে থাকে।

মিরা ঘরে গিয়ে রায়ানের কাছে গেল। রায়ান মিরা কে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হলো? মনমরা কেন? রিমির কি হয়েছে ঠিক আছে তো?”
-“হুম..!”
রায়ান মিরাকে খেয়ার করে জিজ্ঞেস করলো-
“ঠিক আছে তো মুখ ভার কেন পাখি। কি হয়েছিল? এত সকালে ডাকলো তোমাকে।”
মিরা রায়ানের কানে কথাটা দেওয়ার জন্যই প্রেগন্যান্সির বিষয়টা তুলল। আর টেস্ট রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছে এটাও বলল। রায়ান সব শুনে একবার মিরার দিকে তাকিয়ে দেখল। রোজার থেকে মিরা বাচ্চা বাচ্চা করে তার মাথা খাচ্ছে। কিন্তু রায়ান তার কথায় পাত্তা দেয় না। কিছু না কিছু বুঝিয়ে মানিয়ে নেয়। রিমি কথা শুনে ও রায়ান একই কথা বলল-
“রিমিকে মন খারাপ করতে না করো। কেরিয়ার আর নিজের লাইফে ফোকাস করুক। পরে যা হবার হবে।”
এই বলে মিরার কপালে চুমু দিয়ে অফিসের কাজে বেরিয়ে গেল। আর ঠিক ফিরবে রাতে।

সারা দিন গেছে মিরা আজ রায়ানের কল রিসিভ করেনি। কথা বলেনি। রায়ান বাড়িতে এসেই মিরাকে রান্না ঘরে রুটি বানাতে দেখলো। আজ একটু তাড়াতাড়ি ই ফিরেছে। রায়ান ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে এমনি নিজে নিজে জোরে চেঁচিয়ে বলল-
“আমার কাল সকাল ১২টার ফ্লাইট। রান্না ঘরের কাজ ছেড়ে বরের দিকে একটু নজর দিলে ভালো হয়।”
রায়ান মিরাকে কথা গুলো শুনিয়ে শুনিয়ে বলে উপরে চলে গেল। কিন্তু মিরা আর উপরে যায় নি। রায়ান এসেছে ৮টায় আর এখন বাজে ১১টা। সবাই খেতে বসেছে রায়ান উপর থেকে আর নামে নি। মিরা একটু পর পর উপরে তাকিয়ে দেখছে রায়ান নামছে কিনা কিন্তু রায়ান আর নামে নি। হঠাৎ করেই তখন মিরার নাম্বারে মেসেজ এলো রায়ানের। মিরা মেসেজটা পেয়েই সোজা দৌড়ে গেল ছাদে।

-“রায়ান…কোথায় আপনি? নিচে কত কাজ পরে আছে। ছাদে ডাকলেন কেন হঠাৎ?”
হাতের কাজ গুলো কোনো মতো গুছিয়ে রেখে মিরা দৌড়ে ছাদে আসছে রায়ানের বলাতে। কিন্তু ছাদে এসে কাউকেই তার চোখে পড়ছে না। গোটা ছাদ অন্ধকার হয়ে আছে। শুধু আকাশের চাঁদের আলোতে আবছা আবছা আলোকিত দেখাচ্ছে। এমন সময় ছাদ আলোতে ঝলমল করে। মিরা ছাদের লাইট গুলো জ্বালাতে যাবে তখনি আবছা আলোর মাঝে জ্বলে উঠলো একটা ছোট্ট অগ্নিশিখা। দেশলাইয়ের কাঠির জ্বালার শব্দে মিরা চমকে পিছনে ফিরল। কেউ একজন একটা মোমবাতি জ্বালাচ্ছে। মিরা ভালো করে খেয়াল করলো। সেই কেউ একজন মোমবাতি টা নিজের সামনে আনতেই মিরা অবাক চোখে তাকিয়ে অস্পষ্ট গলায় আওড়ালো-

“রায়ান..আপনি.. মোমবাতি কেন? লাইট গুলো কি জ্বলছে না?”
রায়ান ধীর পায়ে মিরা দিকে এগিয়ে এলো। মোমবাতি টা মিরার সামনাসামনি ধরে মুগ্ধতার তীব্র রেশ সমেত মিরাকে দেখলো। রায়ানের চাহুনি মিরার সর্বাঙ্গে অজান্তেই শিহরণ জাগালো। বলতে চেয়েও কিছু বলতে পারছে না এমন এক অবস্থা। রায়ান মুচকি হেঁসে জবাব দিল-
“মোমবাতির আলোয় তোমাকে মারাত্মক লাগে হৃদপাখি। আমার ভেতরটা গলে যায় ঠিক এই মোমের মতো।”
মিরার দেহ নিজ স্থানেই জমে গেল বোধহয়। চোখের পলক পড়ছে বার বার। সামনের মানুষ টার চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা টুকু তার হচ্ছে না। রায়ানের কথা শুনে সে আর ছাদের লাইট জ্বালাতে গেল না। রিমির প্রেগন্যান্সির একটা সম্ভাবনা রয়েছে শুনে মিরার মাঝে মা হওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছের দেখা দিয়েছে যা রায়ান ভালোই বুঝতে পারছিল। রায়ান বাচ্চার বিষয়টা সব সময় মিরার বয়স কম বলে এড়িয়ে গেছে, মিরাও কিছু বলতে পারতো না সেই কথার উপর। কিন্তু আজ রিমির প্রেগন্যান্ট হওয়ার কথাটা শুনে মিরার মনে হচ্ছে রিমি মা হতে পারলে সে কেন পারবে না! দুজনের বয়সই তো একই, তবে?

সারাদিনে মিরা রায়ানের সাথে কোনো কথা বলে নি। রায়ান কাল আমেরিকায় চলে যাবে কয়েক মাসের জন্য তাতেও মিরার কোনো হেল দোল দেখা যায় নি। এই এক বাচ্চার কথাই মাথায় ঘুরছে তার। রায়ান মিরাকে ছেঁড়ে আমেরিকা যেতে বাধ্য তার জরুরি কাজের জন্য আর মিরাকে নিয়ে যাবে এমন সুযোগ ও নেই- পাসপোর্ট, ভিসা হতে সময় লাগবে। রায়ান যাওয়ার আগে তার আদরের বউ পাখির মুখে উদাসীনতা দেখতে চায় নি তাই ঠিক করে ছিল যাওয়ার আগে একটা ডিনার ডেটে নিয়ে যাবে মিরাকে। কিন্তু সকাল থেকে মিরার মন মেজাজ দেখে ডিনারে বাইরে নিয়ে যেতে চাইলেও যে মিরা যাবে না এটা সে ভালো করেই বুঝেছে। তাই আর বাইরে নয় বাড়ির ছাদেই ছোট্ট একটা ক্যান্ডেল লাইট ডিনার ডেটের আয়োজন করেছে বউয়ের জন্য।
রায়ান মিরার সামনে হাত পেতে অনুমতি চাইলো-

“May I Mrs?”
মিরা রায়ানের হাতের দিকে এক নজর তাকিয়ে দ্বিধায় নিজের হাত রায়ানের হাতে দিল। রায়ান মিরা হাতটা খুব যত্নের সাথে ধরে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে তাকে সামনে নিয়ে গেল। মিরা কয়েক পা সামনে এগোতেই দেখলো ছাদের ঠিক মাঝবরাবর এটা টেবিলের সেটাপ। ছাদে চারটা স্টেন্ড রাখা যেগুলো সুন্দর করে সাদা ঝলমলে কাপড় ফুল পাতা আর ফ্রেইরি লাইট দিয়ে সাজানো। টেবিলে মোমবাতি স্টেন্ডে মোমবাতি রাখা। ছাদের ফ্লোরে সাদা ও লাল রংয়ের বেলুন পড়ে আছে। মিরা নিচে তাকিয়ে বেলুন গুলো দেখতেই রায়ান মুখে একটু হাসি এনে বলল-
“আসলে, আমি কখনো এসব করি নি.. জানিনা কেমন হয়েছে। ভালো খারাপ, সব ক্রেডিট চ্যাট জিপিটির। আর এই বেলুনের আইডিয়া টা তোমার থেকে চুরি করে নিয়েছি।”
মিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কেবল দাঁড়িয়ে রায়ানের কথাগুলো শুনলো। চারপাশটা আবার একটু দেখে সে নিজের নীরবতা ভেঙে বলল-

“এ…এই সব কিসের জন্য? আজ কি কিছু আছে?”
মিরার জানা নেই আজকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিন কিনা। রায়ান মিরার প্রশ্নের সহজ উত্তর দিল-“উঁহু..!”
মিরা আরও কিছু বলবে..তার আগেই রায়ান মিরা ঠোঁটে আঙুল রেখে তাঁকে থামিয়ে নিয়ে মিরার দিকে ঝুঁকে এসে বলল-
“উমমহু..Not a word.. Just do as I say..”
মিরার চোখে থেকে যেন আশ্চর্যতা সরতেই চাইছে না। রায়ান মিরাকে একটা ব্যাগ এনে তার হাতে দিয়ে বলল-
“Go and change into this..Be quick..আমি বাকি সব ঠিক ঠাকই করে ততক্ষণে।”
মিরা রায়ানের দেওয়া ব্যাপার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে যাবে তখনি রায়ান মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ থাকার ইশারা করে তার কথা মতো চেঞ্জ করে আস্তে বলল। মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই চেঞ্জ করতে গেল ছাদ ঘরে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিরা জামাটা পড়ে বাইরে এলো। রায়ান টেবিলে খাবার গুলো সাজিয়ে মোমবাতি গুলো জানাচ্ছে। মিরা গিয়ে রায়ানের সামনে দাঁড়ালে রায়ান নিজের মনযোগ সরে অজান্তেই তার প্রিয়সীর দিকে চলে এসেছে। রায়ান মিরাকে পা থেকে মাথা অব্দি পলকহীন চোখে দেখলো। মিরার পড়নে সেই প্রথম বৃষ্টির দিনে পড়া সাদা রংয়ের জামাটা যেটাতে রায়ান প্রথম মিয়াকে দেখেছিল বৃষ্টির মাঝে নাচতে। রায়ান সাথে সাথে নিজের চোখে হাত দিয়ে চোখ কচলে মিরাকে চরকির মতো ঘরে একবার দেখলো। মুখে অদ্ভুত এক গম্ভীরতা। মিরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রায়ানের এ্যাক্সপ্রেশন দেখছে। রায়ান চারপাশটা নাটকীয় ভাবে দেখে মিরার কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করল-
“বেইবি, আমি কি মরে গেছি?”

মিরা সাথে সাথে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“মানে..? না, আজব মরবেন কেন? কি আবোলতাবোল বকছেন?”
রায়ান পাশের চেয়ারটাতে ধপ করে বসে গিয়ে টেবিলে কনুই রেখে হাতের তালুতে গাল ঠেকিয়ে মিরার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল-
“যদি মরে না থাকি, আমার সামনে জান্নাতের হুর দাঁড়িয়ে কেন?”
মিরা রায়ানের কথায় না চাইতেও জোরে হেসে উঠলো। লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে গেছে মেয়েটার‌। মিরা রায়ানের কাঁধে মৃদু জোরে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“ইসসস, how cheesy..! এতো বাড়িয়ে না বললেও হতো। এটা তো আমার পুরোন একটা ড্রেস। কোথায় পেলেন এটা? আমার খুব শখের একটা জামা।”
রায়ান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আনমনে বলল-

“আমারও… খুব শখের..!”
মিরা অস্পষ্ট কথা শুনতে পেল না-“হুম..? কিছু বললেন.?”
রায়ান মিরা বাঁধা চুল গুলোর দিকে নজর দিয়ে চোখ গুলো ছোট ছোট করে নিয়ে বলল-
“চুল গুলো বাধা কেন? খোলো না!”
মিরা রায়ানের কথায় চুলের কাটা টা খুলে তার চুলের গুচ্ছ মেলে দিল। ছাদের ঠান্ডা হাওয়ায় মিরার খোলা চুলে ঢেউ খেলে গেল। রায়ান নিজের বুকের বা পাশে হাত গিয়ে বলে উঠলো-
“তোমার চুল গুলো বাঁধন ছাড়া হওয়ার সাথে সাথে চাঁদ তারা সবাই লজ্জায় পড়ে গেল।”
মিরা আবেশে এক গাল হেঁসে বলল-
“হুম, আপনার বউ ওদের থেকে বেশি সুন্দর যে তাই। হিংসে হিংসে..!”
রায়ান বুঝলো মিরা তাকে ইচ্ছে করে খোঁচা মেরে কথা টা বলল। সেও মিরার সাথে হেঁসে নিল এক দফা। ঠিক পরক্ষনেই নিজের হাত টা সামনে রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“My dear Mrs.. would you like to dance with me?”
মিরা মুচকি হেঁসে নিজের হাত রায়ানের হাতে দিতে গিয়েও মাঝ পথে থেমে গিয়ে ভাব নিয়ে বলল-
“Wait wait, sorry I can’t dance without music..”
রায়ান নিজের থেকে এবার মিরা হাতটা ধরে নিয়ে মিরাকে টেনে নিজের কাছে নিল। নিজের একহাত মিরার কোমরে এবং অন্য হাতে মিরার হাত নিজের কাঁধে রাখল। তারপর দুজনের একজোড়া হাত এক করে মিরার কানে কানে বলল-

“You have your own music system baby.. that can give you live experience.. wanna check the quality?”
মিরা অবাক চোখে রায়ানের চোখের দিকে তাকালো। ছেলেটার চোখে মুগ্ধতা ছাড়া কিচ্ছু ধরা পড়ছে না তার কাছে। মিরা মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়াতেই রায়ান মিরার হাত হওয়ায় ঘুরিয়ে নিজের খালি গলায় গাইতে শুরু করলো-
“Haan maine Suni hai..Pariyon ki Kahani..
Waisa hi Noor tera..chehara hai tera ruhani..
(হাতের মাঝে আঙুল রেখে কোমরের ভাঁজ নিজের আয়ত্তে করে মিরাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে)
Aa tujhko Main apni..
aaja mari bahoon mein chupa loon..
haan apni ishh zameen ko..
Kardu maine aasmaani..”

মিরা একবারও পলক না ফেলে শুধু রায়ানের কন্ঠ শুনছে। প্রতিটা লাইন তার মনে দাগ কাটছে যেন তার জন্যই বলছে সামনের মানুষ টা। দুজনের কেউ নিজেদের থেকে চোখ সরায়নি এক বারের জন্যেও। রায়ানের কাছে পুরো দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে নিজের শরীরের মেয়েটা। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দুটো শরীর কি সুন্দর করে তাল মিলিয়ে নেচে যাচ্ছে দ্বিধাহীন চিত্তে। সব শেষের দিকে রায়ান মিরাকে হুট করেই কোলে তুলে নেয় সাথে মিরাও মুক্ত পাখির ন্যায় নিজের দুহাত মেলে দেয়। রায়ান খুব যত্ন নিয়ে মিরাকে কোলে করে ঘুরিয়ে শেষ লাইন গুলো গাইলো-

“Toota Jo kabhi Tara sajna ve..
Tujhe rab se maanga..
rab se Jo maanga, mileya ve..
Tu melega to Jane na Dunga meine…”
Ha….ha…ha..ha..ha…”
মিরা রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে দুজনের কপাল একসাথে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ বাঁধাহীন হেঁসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“ভালোবাসি…!”
নিজের স্বীকারোক্তি তে নিজেই লজ্জায় রায়ানকে জাপ্টে ধরে মুখ লুকালো। রায়ান সুন্তুষ্ট মনে মিরার হওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল গুলো গুছিয়ে দিয়ে মিরা মুখ নিজের মুখের সম্মুখে এনে মিরার কপালে আদরের ছোঁয়া দিয়ে বলল-
“ভালোবাসি ২, আমার বউ পাখি।”

সময় টা খুব সুন্দর অতিবাহিত হলো। দুজনে মিলে রায়ানের তৈরি করা খাবার খেলো। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে দুজনে ভাবলো আজ রাতটা তারা ছাদে থাকবে। নিজেদের কুয়ালিটি টাইম টুকু বলতে আজকের রাত টুকুই। কাল রায়ান আমেরিকার জন্য রওনা দেবে। মিরার মন খারাপের ভীরেও সে অনবরত হেঁসে যাচ্ছে শুধু রায়ানের জন্য। মিরা রায়ানের সব এফর্ট দেখেও বুঝতে পারছিল- রায়ান চায় না তাকে রেখে দূরে যেতে। যতটুকু সময় বাকি আছে সুন্দর কিছু মূহূর্ত নিজের সাথে নিয়ে যেতে চাইছে। রায়ানের মনটাও খারাপ, সে নিজে মাঝে মাঝে নিজেকে ঠিক দেখাতে ইচ্ছে করে মজা করে কথা বলছে যেন মিরা হাসে আর কারোর মন খারাপ না হয়। তাকে মন খারাপ করতে দেখলে মিরার যতটা মন খারাপ ছিল তার থেকে বেশি মন খারাপ হবে বলে ভাবছে সে। বিয়ের পর বউকে ছাড়া এক রাত থাকে নি যে ছেলে, সে কিনা বউ রেখে দেশের বাইরে যাবে। মিরা রায়ানের ঘুমের জন্য চিন্তিত- কাজের ধান্দায় পড়লে কিচ্ছু মাথায় থাকে না রায়ানের, আর রাতের ঘুম? সেটা তো সম্পূর্ণ টাই মিরার কাছে। তাকে জড়িয়ে না ধরলে যে ছেলেটা ঘুমায়না তাঁর ওই দিন গুলো কেমন যাবে! এই দিকে রায়ানকে ছাড়া মিরা একা একা এখানে কিভাবে থাকবে ঠিক মতো খাবে কিনা, পড়াশোনার ক্ষতি হবে কিনা, শরীর ঠিক থাকবে কিনা- এই সবকিছুই রায়ানের মাথায় চড়ে আছে। সব মিলিয়ে এখন দুজন দুজনকে সর্বোচ্চ খুশি করতে চাইছে। নিজেদের একে অপরের জন্য টেনশন টা সাইডে রেখে।

খোলা আকাশের নিচে চাদর বিছিয়ে দুজন। রায়ান বালিশে হেলান দিয়ে বসে দুহাত বাড়িয়ে মিরাকে ডাকলো-
“Come baby..কোলে আসো।”
মিরা রায়ানের হাতে হাত দিয়ে গিয়ে রায়ান কোলে বসলো তার গলা জড়িয়ে। রায়ান মিরার খোলা চুলে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“মন কি এখনো খারাপ?”
-“উহু..!”
রায়ান মিরার গালে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে আদর করে কিছু কথা বলল-

“এখন আমার কথা মন দিয়ে শোন, কাল আমি যাওয়ার পর থেকে আমার ফেরার দিন অব্দি একদম আমার বউয়ের অযত্ন করবে না তুমি। ঠিক মতো খাবে, আমার আমার জন্য ঘুমাতে পারো না , পড়তে পাড় না, তাই আমার অবর্তমানে এগুলোও করতে পারবে। এসে যেন দেখে যতটুকু রেখে যাচ্ছি তার থেকে ডাবল হয়ে গেছ। ঠিক আছে?”
মিরা ছোট ছোট চোখ করে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ানের চলে যাওয়ার কথা শুনে একটু মন মরা হয়ে রায়ানকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বেজার মুখে বলল-
“ঠিক আছে। সব কথা শুনবো। আমার কথাও মন দিয়ে শুনে নিন এখন, কাল যাওয়ার পর থেকে ফিরে আসার দিন পর্যন্ত আমার হাবির উপর কোনো প্রকার কাজের চাপ দেবেন না আপনি। যেমন যাচ্ছে তেমন ফিরেত চাই আমার তাকে। সময় মতো খাওয়া, ঘুমানো সব যেন ঠিক থাকে। ঠিক আছে?”
রায়ান মিরার মাথা হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“ঠিক আছে। কিন্তু আমি আমার বাটার বলস গুলো ছাড়া কিভাবে ঘুমাবো হৃদপাখি। আমার যে ওদের উপর মাথা না রাখলে ঘুম আসে না। I am missing them already..”
রায়ান কথাটা বলেই মিরাকে সোজা করে তার বক্ষযুগলের মাঝে মুখ গুঁজে দিল, আর আদর করে চুমু খেতে শুরু করলো সেখানে। রায়ানের স্পর্শে মিরার সুরসুরি লাগছিল বলে মিরা রায়ানের চুলে হাত রেখে খিলখিলিয়ে হেসে বলল-

“আহ্, কি করছেন? সুরসুরি লাগছে ছাড়ুন।”
রায়ান বিরক্তি নিয়ে নিজের মাথা উঠিয়ে বাচ্চা দের মতো মুখ করে বলল-
“তোমার কি একটুও খালি খালি লাগবে না আমাকে ছাড়া?”
মিরা একদম ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল-
“একদম না। আমি তো আরো শান্তি পাবো। আপনাকে কত বলেছি এই বাজে অভ্যাস টা ছেড়ে দিন। আপনি তো আমার কথাই শোনেন নি। কিছু বললেই শুধু এক কথা- আমার বউ আমি যা ইচ্ছে তা করবো। একদম ঠিক হয়েছে এখন থাকবেন একা একা।”
দুজনের কথার মাঝেও বোঝা যায় একে অপরের প্রতি তারা কি পরিমাণ আসক্ত হয়ে পরেছে। দুজনেই জানে একে অপরের অবর্তমানে কেউই ভালো থাকবে না তাও এক অন্যের খুশির জন্যই তা ব্যক্ত করছে না। দুজনে মিলে কথাই বলছিল এমন সময় হঠাৎ মিরার ভেতরের মেয়ে আত্মা জেগে উঠলো আর সেই ধারাবাহিকতায় সে রায়ান কে হাঁসি মুখে জিজ্ঞেস করলো-

“হাবি… আপনি এতো বছর বিদেশে ছিলেন, আগে কখনো প্রেম করেছেন? আমার সাথে দেখা হওয়ার আগে।”
রায়ান একটু বাঁকা চোখে মিরার দিকে তাকালো আর মনে মনে ভেবে নিল খুব সুন্দর একটা সুযোগ পেয়েছে মিরাকে জ্বালানোর। মুখে একটা শয়তানি হাসি টেনে একটু চিন্তা করে দেখার ভাব নিয়ে বলল-
“উমম্, প্রেম করি নি। তবে প্রেমে পড়ে ছিলাম একবার। জীবনের প্রথমবার কাউকে এক দেখায় ভালো লেগেছিল।”
মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা সাথে সাথে চুপসে গেল। সাথে কৌতুহলও বাড়লো। মিরা নিজের থেকেই জিজ্ঞেস করলো-
“কবে? কখন? কোথায়? কাকে দেখে? কিভাবেএএএ?”
রায়ান মিরার প্রশ্নের ঝড় দেখেই হেঁসে উঠলো মনে মনে- তার ইচ্ছে অনুযায়ী আগুন তো লেগেছে তার বউয়ের মনে। রায়ান খুব সিরিয়াস ভাব নিয়ে বলল-

“আরে না বাদ দাও। তুমি রাগ করবে বললে।”
মিরা নিজেও জানে তার রাগ হবে শুনলে তবুও জোর করলো-
“আরে, করবো না রাগ। আপনি বলুন। আমি জানতে চাই।”
রায়ান আর পিছু হটলো না। সে তো চাইছিলই এটা। রায়ান খুব উৎসুক হয়ে মিরাকে বলতে শুরু করলো সব কিছু-
“আচ্ছা, এতো করে যেহেতু বলছ তাহলে বলি।”
দুজনেই গম্ভীর হয়ে গেল। খুব সিরিয়াস পরিবেশ দুজনের মাঝে। রায়ান নিজের স্বীকারোক্তি দিতে শুরু করলো-
“তো হয়েছিল কি..আমি যেদিন দেশে ফিরে ছিলাম সেদিন বছরের প্রথম বৃষ্টি হয়েছিল, and guess what, দেশে পা রাখতেই এক সুন্দরী রমনীকে বৃষ্টি তে নাচতে দেখলাম আমি। উফফফ্, I swear I have never seen anything that beautiful..মনে হচ্ছিল মরে যাওয়ার আগে তৃপ্তির সাথে চোখ জুড়িয়ে নিচ্ছি। ওহ, মজার ব্যাপার ওই দিন ওই মেয়েটাও এমন সাদা ড্রেস পড়ে ছিল। এক টুকরো শান্তি নাচছিল বৃষ্টি তে সেদিন। এক নজরে আমার দিল এসে গেছিল ওই রেইনড্রপের উপর।”

রায়ান নিজের আন্দাজে অতিরঞ্জিত না করে শুধু প্রথম দিনে তার মনে মিরার জন্য যা অনুভব হয়েছিল তাই বলল। রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে দেখল মিরা চোখ দুটো ছলছল করছে যেন পলক ফেললেই অশ্রু কণা গুলো গড়িয়ে পরবে। রায়ান মনে মনে ভাবলো- সে হয়তো একটু বেশি বেশি করে ফেলেছে। রায়ান একটু ভয় পেয়ে মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে আগের সব কথা ধামাচাপা দিতে বলল-
“প্রথম দেখে জাস্ট ওমনি মনে হয়েছিল বেইবি। আসলে তেমন কিছু না।”
মিরা রায়ানের সামনে কাঁদবে না বলে চোখের পানি লুকিয়ে নিল। কিন্তু রায়ানের সংস্পর্শে তার আর থাকতে ইচ্ছে করছিল না বলে রায়ানের কোল থেকে উঠে যেতে চেয়ে বলল-

“খুব সুন্দরী ছিল তাই না? আপনার বর্ণনা শুনেই অনুমান করা যায়। এক কাজ করুন একটা কবিতা লিখে ফেলুন ওই মেয়ের উপর।”
রায়ান মিরাকে পুনরায় নিজের কোলে টেনে নিয়ে বসালো। আরো শক্ত করে মিরাকে জড়িয়ে ধরে তার চোখে চোখ রেখে খুব দৃঢ়তার সাথে বলল-
“লিখে কি আর তাকে বর্ণনা করা যায়? অনুভবের এক ফোঁটা চাহুনিই তো কয়েক রচনার উপসংহার।”
মিরা এবার সত্যিই কেঁদে ফেলল। প্রিয় মানুষের মুখে অন্য কারোর জন্য আর একটা শব্দ তার সহ্য হচ্ছে না। মিরা রায়ানের বুকে জোরে ঘুষি দিয়ে বলল-
“চুপ চুপ, একদম চুপ। আর কিচ্ছু বলবেন না ওই শাকচুন্নী কে নিয়ে। কে ওই শালী? ওর মাথায় হেলমেট দিয়ে মারব আমি।”
রায়ান মিরার কথা শুনে শব্দ করে হেঁসে উঠলো। বেচারির চোখ থেকে ঝড়তে থাকা অশ্রু কণা গুলো মুছে দিয়ে বলল-

“ছিঃ, সোনা। এমন বলতে হয় না। নিজের মাথা ফাটানোর সময় খুব স্টুপিড লাগবে তোমাকে। আর আমার বউয়ের মাথা ফেটে গেলে তো আমি শেষ।”
মিরা হয়তো রায়ানের কথা ঠিক মতো খেয়াল করলো না। সে রায়ানের বুকে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে করতেই বলল-
“কেমন ভালোবাসেন আপনি আমাকে? বিবাহিত হয়েও রাস্তায় যায় তার প্রেমে কিভাবে পড়েন আপনি? অসভ্য লোক।”
রায়ান মিরার অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার হাত ধরে নিজের কপালের সাথে মিরার কপালে ঠেকিয়ে মিরাকে শান্ত করতে বলল-
“ওই, শান্ত হও।”
মিরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। রায়ান মিরার ছোট্ট মুখটা নিজের হাতের মাঝে নিয়ে মিরার চোখে চোখ রেখে বলল-

“রায়ান চৌধুরী যার তার প্রেমে পড়ে নি। সে যার..তারই প্রেমে পড়েছে।”
মিরা কান্নার ফাঁকে নাক টানতে টানতে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“মানে..!?”
রায়ান মিরার চুলের আঙ্গুল ঢুকিয়ে তার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-
“ওই সুন্দরী শাকচুন্নী টা আপনিই মেডাম। রাস্তায় বেপরোয়া হয়ে নাচতে থাকা আমার রেইনড্রপ। তোমার কি মনে নেই? সেদিন সম্ভবত ঢাবির রেজাল্ট দিয়েছিল। এই জামাটাই পড়েছিলে তুমি। খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল এই ড্রেস এ তোমাকে তাই এটা পড়তে বললাম আজ।”
মিরা নিজের কাঁদো কাঁদো মুখে নিজে না বোঝার মুখ নিয়ে রায়ানের কথা শুনছে। খুব চেষ্টা করে সে মনে করলো ওই দিন টার কথা। সেদিন তারও মনে হয়েছিল তাকে কেউ দেখছে যার জন্য সে দ্রুত বাড়িতে ফিরে যায়। মিরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না সেই রায়ানের প্রথম প্রেম। রায়ান মিরার চোখ মুছে দিয়ে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-

“এক বৃষ্টির দিনে আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম মেডাম। অতঃপর…!”
মিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“অতঃপর…?! কি..?”
-“অতঃপর..আপনি ব্যতীত অন্য কাউকে দেখার রুচি আসেনি আমার।”
মিরা হতভম্ব। এমন ভাবে কেউ কিভাবে কথা বলে? কিভাবে বলে? তার মাথায় আসে না।
-“তারপর..!?”
-“আর তারপর অনুভব হলো..!”
মিরা অবাক চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো-“অনুভব…?! কিসের..!”
-“তারপর অনুভব হলো, এই জীবনে আপনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছি। আর বাকি জীবনেও তাই থাকতে চাই।”
রায়ানের এই কথাটা মিরার কাঁদো কাঁদো মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল-

“আমার হৃদয় দূর্বল করার মতো অনেক কিছুই আছে আপনার কাছে; অথচ আমি প্রতিবার আপনার কথায় এসে থেমে যাই। থেমে যাই বললেও ভুল হবে- গোলে যাই আমি।”
রায়ান মিরার ঘাড়ে একটা ছোট্ট ভেজা চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“যদি আমি না আসতাম তোমার জীবনে তুমি অন্য কাউকে খুঁজতে তাই না?”
মিরাও কম যায় না। রায়ানের কথার মতো সেও ঘুরিয়ে বলল-
“যদি খুঁজে দেখতাম, কেউ না কেউ ঠিক মিলে যেত। কিন্তু আপনার মতো করে আমাকে কে চাইতো? চাহিদার নজরে দেখার অনেক মানুষ আছে কিন্তু ভালোবাসার নজরে দেখার জন্য আপনার এই একজোড়া চোখ কার হতো? এই সন্দেহে মাঝে আর চেষ্টাও করা হয়নি আমার।”
রায়ান মিরার নাক টেনে বলল-
“কত বড় হয়ে গেছে আমার পিচ্চি বউ টা। তোমাকে ছেড়ে থাকা ১০টা বছর আমার জীবনের একমাত্র আফসোস।”
মিরা রায়ানের কথায় মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-

“আমার মতো একটা অনাথ মেয়ের অপ্রাপ্তির এই জীবনে আপনিই একমাত্র প্রাপ্তি। আফসোস এর কোনো জায়গা নেই।”
রায়ান মিরার মুখ নিজের ঠোঁটের ছোঁয়ায় আলতো আদরের পরশ এঁকে দিতে থাকলে মিরা রায়ানের হাত নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে রায়ানের কাছে একটা ছোট্ট আবদার রাখলো-
“Rayan, I want a baby..”
রায়ান মিরার আবদারে আর কত না করবে সে নিজেও জানে না। এখন তো তার আর ইচ্ছেও করে না মিরার কথায় অসম্মতি দিতে। মিরা রায়ানের গালে হাত রেখে নিজের চোখে চোখ রাখতে বাধ্য করল। রায়ান কিছু বলছে না দেখে সে নিজের থেকেই জিজ্ঞেস করলো-
“আচ্ছা, আপনি কি চান না আমাদের ছোট্ট একটা কিউট বেবি হোক? বাই চান্স আপনার কি মনে হয় আমি ভালো মা হতে পারবো না?”
রায়ান সাথে সাথে মিরা কথার প্রতিক্রিয়ায় বলেন উঠলো-
“কি সব বলছো হৃদপাখি? You can’t even imagine how badly I want our baby..তুমি ভালো মা হবে না মানে? উল্টো আমার টেনশন হয় তুমি একটু বেশিই ভালো মা হবে আর নিজের কথা ভুলে যাবে। নিজের যত্নের কথাও ভুলে যাবে। আমি চাই না তুমি নিজের কেরিয়ার নিজের আনন্দ, খুশি আমার চাওয়ার জন্য বা আমাদের বেবির জন্য সেক্রিফাইস করো।”

-“তো কি হয়েছে? আপনি আছেন তো আমার যত্ন করার জন্য। আপনি পাশে থাকলে আমি সব পারবো- আমার কেরিয়ার, আনন্দ, খুশি সব থাকবে।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর হার মেনে নিয়ে নিজের মাথা নিচু করে নিলে মিরা রায়ানের দুই গালে হাত রেখে তার মাথা উঁচু করে ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হলো? আচ্ছা ঠিক আছে, শুরুতে আপনি আমাকে প্রপোজ করে ছিলেন। আজ আমি আপনাকে প্রপোজাল দিচ্ছি- Mr. Rayan chowdhury, will you be the father of my baby..?”
রায়ান সাথে সাথে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-
“No, not baby.. I want babies…”
মিরা এই আবেগ ঘন মূহুর্তেও আর নিজের হাঁসি ধরে রাখতে পারলো না। রায়ান অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“হাসছো কেন? আমি সিরিয়াস। আমার বাবার দুই সন্তান। আমাকে এই রেকর্ড ব্রেক করতে হবে। বেবি চাইলে ভেবে বলো অনেক গুলো নিতে হবে। রাজি?”

মিরা নিজের হাসি থামিয়ে রাখতে পারছে না। ছেলে বাবার বাচ্চা জন্ম দেওয়ার রেকর্ড ব্রেক করতে চায়। কি চিন্তা ধারা। মিরা হাসতে হাসতেই মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়ালো।
মিরা হ্যাঁ বলার মূহুর্তে রায়ানের চোখের চমক ছিল দেখার মতো। রায়ান সেকেন্ডের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে মিরাকে পাঁজাকোলা করে তুলে সোজা ছাদে ঘরে নিয়ে গেল। মিরা রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হলো হঠাৎ। ঘরে নিয়ে এলেন? রায়ান মিরাকে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিতে দিতে বলল-
“প্রেগন্যান্সি অনেক লং প্রসেস বেইবি।‌ আমাদের এখনই শুরু করতে হবে। একদম সময় নেই আর।”
মিরা হতভম্ব। রায়ান নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বিছানায় এসে মিরাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে বলল-

“We are going to have a really long night today.. get ready..আজকে থামতে বলবে না একদম।”
মিরা রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। রায়ান আজ প্রথম মিরার চোখে ভয় বা লজ্জা কোনো কিছু দেখছে না। মিরা এতো করে একটার বাচ্চার শখ করবে সে ভাবে নি। রায়ান মিরার ঠোঁট ছোঁয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে থমকে গেল। মিরা নিজের বন্ধ চোখ খুলে রায়ানের দিকে অবাক চোখে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হলো? থেমে গেলেন যে?”
রায়ান কিছু না বলে মিরার উপর থেকে উঠে গিয়ে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কি যেন করতে লাগলো। মিরা বিরক্ত হয়ে উঠে বসে রায়ানের উপর চেঁচিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলো-
“আরে কি অদ্ভুত। এখন ফোন নিয়ে পরলেন কেন আপনি?”
রায়ান ফোনের দিকেই চোখ রেখে বলল-

“একটা কথা ভাবছি। সেটাই দেখার চেষ্টা করছি।”
-“কি ভাবছেন?”
রায়ান খুব সিরিয়াসলি মিরার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো-
“এমন কি করা যায় যাতে সুন্দর বেবি গার্ল স্পার্ম গুলোই তোমার কাছে যাবে।”
মিরা রায়ানের কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। পরে আর নিজের ধৈর্য ধরে রাখতে পারলো না। রায়ানের গলা পেঁচিয়ে ধরে নিজের উপর টেনে নিয়ে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৭

“First, get done with me.. we don’t have time hubby…”
মিরা আজ নিজের থেকে রায়ানকে প্রথমে কাছে টানলো। আর রায়ানও তাতে গা ভাসিয়ে দিল অনায়াসে। রায়ান অবাক হলো আজ মিরা একবারও তাকে থামতে বলে নি ছটফট করেনি। বউ বাচ্চার জন্য এতো পাগল জানলে এই শুভ কাজটা হয়তো সে আগেই করতো। তবে মধুময় রাতের সাথে সেই আফসোস টাও বিলিন হয়ে গেল তার।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৯