প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৬
সাইদা মুন
খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে ফারাহ। বিছানার চাদরটা দু’হাতে শক্ত করে খামচে ধরে মাথা নিচু করে আছে সে। চোখ বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে, থামার নাম নেই। কান্নার ঝাঁকুনিতে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে তার শরীরটা। বুকের ভেতর জমে থাকা বেদনা যেন অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পেয়েছে।
তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন। মুখে কঠোরতা, চোখেমুখে দাউদাউ করে জ্বলছে রাগ। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ফারাহর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে, যেন সান্ত্বনা দিচ্ছে, কিন্তু কণ্ঠের ভেতরটা ছিল কঠিন, তীক্ষ্ণ।
—তোর এই অবস্থা যে করেছে, আমি তো ওই মেয়েকে একদমই ছাড়ব না।
কথাটা শুনে ফারাহ মুখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল অপার অসহায়তা, শিশুর মতো ভাঙাচোরা আকুতি। চোখের জল আরও বেগে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। কাঁপা কাঁপা ঠোঁট, ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল,
—সে যখন আমারই হবে না, তাহলে কেন এত কষ্ট হচ্ছে তার জন্য? আল্লাহ যদি ভাগ্য থেকেই তাকে মুছে দেন, তাহলে মন থেকেও কেন তুলে দিচ্ছেন না? কেন আমার ভাগ্যটা এত নিষ্ঠুর?
তার কথার শেষটুকু মিয়িয়ে গেল কান্নার চাপে। বুক ভেঙে আসা ফোঁপানিতে ঘরটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। সামনের মানুষটি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ক্রোধে ফেটে পড়া কণ্ঠে বলল,
—তোর ভাগ্য একদম খারাপ না। ওই মেয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসে সব ধেই ধেই করে পেয়ে যাবে? কখনই না। আমি আছি তোর পাশে, জাহান্নাম বানাই দিব ওই মেয়ের জীবন। তুই ছাড় দিবি না, এত দিনের স্বপ্ন এভাবে ব্যস্তে দিবি? তোর জিনিস তুই ছিনিয়ে নিবি। পারবি না বল? বল ফারাহ..!
কথাগুলো যেন আগুনে ঘী ঢালল। তার কান্না ধীরে ধীরে থেমে এল। বুকের ভেতর জমে থাকা হতাশার জায়গায় অন্যরকম এক অনুভূতি জন্ম নিতে লাগল, দ্বিধা, ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা সব মিলেমিশে। অস্পষ্ট স্বরে সে প্রশ্ন করল,
—তালহা আমার?
সঙ্গে সঙ্গে জোরের সাথে উত্তর এল,
—হ্যাঁ, তোর। শুধু তোরই। নিজের অধিকার নিজেরই বুঝে নিতে হয়। ওই মেয়ে নিজের রূপের বশে কাছে টেনেছে। তুই কম কিসে? নিজের ভালোবাসার জন্য লড়তে হয়, বুঝলি? ছিনিয়ে নে তোর অধিকার। আর যদি তোর পথের সামনে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে সরিয়ে ফেল। সরাতে না পারলে একদম জায়গা থেকে উপড়ে ফেল।
কথাগুলো শুনতে শুনতে ফারাহর মুখের কোমলতা বদলে যেতে লাগল। অশ্রুসজল মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কঠিন এক রেখা। মনে জমতে লাগল অদম্য ক্ষোভ। চোখের জল হাতের পিঠ দিয়ে মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে। সামনের ব্যক্তির চোখে চোখ রেখে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,
—কিন্তু এটা করা ঠিক হবে তো?
প্রশ্নটা যেন মোটেও পছন্দ হল না তার। ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত গলায় বলল,
—এই তুই কি সত্যিই তালহাকে চাস? নাকি শুধু মুখে মুখে ভালোবাসার নাটক করছিস?
ফারাহ হকচকিয়ে উঠল। দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
—না না সত্যি চাই। খুব চাই।
—তাহলে ঠিক ভুলের হিসাব কিসের? তোর জিনিস তুই নিজের করে নিবি। পারবি না?
ফারাহ এবার দৃঢ়ভাবে মাথা ঝাঁকাল,
—পারব, অবশ্যই পারব।
এই উত্তরটা শুনতেই সামনের ব্যক্তির ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক হাসি। যেন বহুদিনের পরিকল্পনা বাস্তব হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে। ফারাহর মনে তখনও কোথাও একটা দ্বন্দ্ব চলছে। উচিত আর অনুচিতের পাল্লা দুলছে তার ভেতরে। বিবেক বারবার তাকে থামাতে চাইছে, কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে আরেকটা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলছে, যদি এভাবেই নিজের ভালোবাসা ফিরে পাওয়া যায়, তাহলে তাতে দোষটা কোথায়? সামনের মানুষটি একটু ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে শুধাল,
—তাহলে শুরুতেই একটা ছোটখাটো ঝড় তোলা যাক। তারপর ধীরে ধীরে বড় ঝড় উঠবে। এমন ঝড় যা সবকিছু ভেঙেচুরে দেবে।
কথা শেষ করেই সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে ছিল অসহ্যকর একটা শব্দ। ফারাহ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার আচরণ গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। নিঃশব্দে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। অজান্তেই যেন সে পা বাড়াল এক অন্ধকার পথে, যার শেষ কোথায়, তা সে নিজেও জানে না। ক্রুদের আগুনে ঠিক কি কি জগন্য কাজ সে করে বসবে তাও সে জানে না।
মাথায় কাপড় টেনে, মোবাইল হাতে হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল রিতু। মোবাইল বারবার বেজে চলেছে। বিরক্তিতে চোখ-মুখ কোচকে আছে। হাটার গতি আরও বারিয়ে দিল। বাড়ির গলি পেরিয়ে চার রাস্তার মুড়ে যেতেই দেখা মেলল বাইকে হেলান দিয়ে ফরমাল গেটাপে দাঁড়ানো এক যুবককে। কালো কোটটা খুলে রেখেছে বাইকের উপর। রোদ উঠেছে বেশ, সেই তাপেই ঘেমেছে ছেলেটা। বারবার বাম হাত দিয়ে কপালে এসে পড়া দুই-তিনটা চুল পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। রোদের তাপে চেহারাটা হালকা লাল বর্ন ধারণ করেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে চেহারায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মোবাইলে মনোযোগী হয়ে বার বার কল করছে কাউকে। কল যে রিতুকেই করছে তা তার হাতে থাকা ফোনের ভাইব্রেশনই বলছে।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে রিতু ধপধপ পায়ে এগিয়ে গেল এবং তার সামনে দাঁড়াল,
—সমস্যা কি?
মেয়েলি ঝাঝালো কণ্ঠস্বর শুনে রায়হান দ্রুত মাথা তুলে তাকাল। রিতুর চেহারাটা চোখে পড়তেই সে নিষ্পলক হয়ে রইল। আজ কতদিন পর দেখল। চেহারায় এখনো সেই একই জিদ্দি ভাবটা আছে। কয়েকপলক চেয়ে থেকে হালকা হেসে ফেলল। তার হাসি দেখে যেন রিতুর গা জ্বলে উঠল। ঝাড়ি মেরে বলল,
—এই সমস্যা কি হাসছ কেন আজব?
রায়হান দুহাত বুকে গুঁজে ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
—রাগ এখনো কমেনি?
রিতু পাল্টা জবাব দিল,
—রাগ কমানোর কোনো রাস্তা করেছো?
—না, করিনি।
—তো অহেতুক প্রশ্ন করছ কেন?
—তবে আমি তো অন্য রাস্তা করে দিয়েছি।
রিতু কপাল কুঁচকালো,
—কিসের রাস্তা?
রায়হান তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—বেটার পার্টনার খুঁজে পাওয়ার রাস্তা। শুনলাম একবার তো ছেলেপক্ষও দেখতে এসেছে। পছন্দ হয়নি?
রিতু তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল। সেকেন্ডে উত্তর দিল,
—পরিবার ভালো লাগেনি।
রায়হান শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—ছেলে ভালো লেগেছিল?
রিতু সোজাসাপটা বলল,
—আহামরি না।
রায়হানের মিয়িয়ে যাওয়া মুখে হাসি ফুটে উঠল। পকেটে দু’হাত গুজে ভাব নিয়ে বলল,
—যেহেতু ভালো ছেলে এখনো খুঁজে পাওনি , তাই তোমার বোঝা উচিত তোমার লাইফে আই এম দ্য ওয়ান এন্ড অনলি বেস্ট অপশন।
রিতু সঙ্গে সঙ্গে রাগী স্বরে বলল,
—কখনো না…
রায়হান ঠোঁট কামড়ে হাসল। জানে, এই মেয়ে জীবনেও সোজাভাবে কিছু শিকার করবে না। গরম লাগছে খুব। শার্টের উপরের বোতাম খুলতে হাত বাড়াতেই হঠাৎ বাধা পেল। রিতু ডান হাত বাড়িয়ে রায়হানের হাতটা থামিয়ে দিয়েছে। কড়া চোখে চেয়ে দাঁত কিরমিরিয়ে বলল,
—মেয়েদের নিজের বডি দেখাতে খুব ভাল্লাগে?
রায়হানের হাসি আরও গভীর হলো। বোতামটা ছেড়ে আকড়ে ধরল রিতুর হাত। সঙ্গে সঙ্গে মুখের সামনে এনে হাতের তালুতে চুমু খেল। রিতু হঠাৎ যেন একটু কেঁপে উঠল। রায়হান পরপর বলল,
—এখনও জেলাসি একই আছে দেখছি। আমি তো ভেবেছিলাম মন থেকে সত্যিই আউট করে দিয়েছ।
রিতু এক টানে নিজের হাত নিয়ে আসল। ক্ষীপ্ত নয়নে তাকিয়ে আছে। রাগে হিসহিস করতে করতে বলল,
—রাস্তার মাঝে এসব কি ধরনের অসভ্যতামি? আশেপাশের মানুষ দেখছ না?
রায়হান ভ্রু কুঁচকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
—আমি আমার বউকে যা খুশি করব, তাতে মানুষের কি?
“বউ” শব্দটা শুনতেই রিতু যেন থমকে গেল। আচমকাই বুকের ভেতর ঝড় উঠল। নিজের শক্ত খোলস যেন ধরে রাখা দায় হয়ে উঠল। চোখ-মুখে তীব্র অভিমান ফুটে উঠল। এতদিনের জমে থাকা রাগ অভিমানকে চেপে ধরে রাখতে পারল না আর। চেচিয়ে উঠল,
—শাট আপ! আমি তোমার কিছু না। লজ্জা করছে না এমন বিহেভ করতে? কোথায় গেল তোমার ইগো? এসব দিবানিশি স্বপ্ন দেখা বাদ দাও। আমি এমন ছেলেকে কখনো আমার লাইফ পার্টনার হিসেবে এলাউ করব না। যার কাছে আমার থেকে তার ইগো বড়, তার সাথে তো কখনোই না। ভুলেও না।
রিতুর ক্ষোভ ক্রমে বেড়ে উঠছে, প্রতিটি কথা জমে থাকা অভিযোগ গুলো যেন বলছে। আর রায়হান সে চুপচাপ, সমস্ত অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনছে। প্রেয়সীর মনের ভেতরের অবস্থা ঠাহর করতে শুনছে সব। রিতু একেরপর এক বলেই যাচ্ছে আর সেও বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে নেড়ে নিজের নামের বিচার শুনছে। রাস্তার ধার দিয়ে যাচ্ছিল এক মহিলা, হাতে ময়লা থলি। হঠাৎ রিতুদের সামনে এসে বলে উঠল,
—আফা, কিছু দেন, সাহায্য করেন। ঘরে বাচ্চাটা একা।
কথার মাঝে বাধা পেয়ে রায়হানের রাগ যেন মহিলার দিকে চলে গেল। কটমটে চোখে তাকাল সেদিকে। স্বাভাবিক একজন মহিলা। তার মার বয়সী হবে। হাতে ভিক্ষার থালা দেখে ঝেরে উঠল,
—চার হাত-পা আছে, কাজ করে খেতে পারেন না? মানুষের কাছে হাত পেতে খেতে হবে কেন? অন্ধ? প্রতিবন্ধি? দুনিয়া সহজ পেয়ে গেছেন তাই না? দোয়ারে দোয়ারে হাত পাতলেই টাকা পেয়ে যাবে? এভাবে হাত পাতার চেয়ে নিজের রোজগারে সসম্মানে দুই টাকা খেয়ে দেখেন..
এরকম নানা কথা শুনিয়ে দিল রিতু। মহিলাটি ক্ষীপ্ত হয়ে উঠল। রায়হান থামাল রিতুকে,
—আহ রিতু, স্টপ! এভাবে বলে না।
মহিলা আর দাড়াল না। এত তিক্ত কথা হজম করার না। অন্যদিকে চলে যেতে লাগল। যাওয়ার আগে মুখ মুচড়ে বলল,
—দিবেন না হেইডা কন। জ্ঞেয়ান দিতে আইছে।
এতে যেন রিতুর রাগ আরও লাগল কিছু বলতেই যাচ্ছিল, তবে রায়হান ইশারায় চুপ করতে বলল দেখে থামল। জুড়ে জুড়ে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করতে চেষ্টা করল। তবে অশান্তি লাগছে। রায়হান কেন চুপ করালো। কড়া চোখে তাকাল রায়হানের দিকে।
—কেন চুপ করালে? কেন চুপ করব আমি? একটাও অযুক্তিক কথা বলেছি? মহিলা একদম সুস্থ, তাহলে কেন ভিক্ষা করে খাবে?
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শান্ত কন্ঠে বলল,
—তুমি একটাও খারাপ কথা বলোনি। তবে তোমার বলার ধরনটা খারাপ ছিল।
রিতু রেগে উঠল,
—আবার আমার দোষ ধরছ?
রায়হান সোজা হয়ে দাঁড়াল। রিতুর কিছুটা সামনে এসে এক হাত আলতো করে ধরল। ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
—জান, এখন অন্তত ভুল বোঝা বন্ধ করো। আমি তোমাকে ভালো কথা বলছি। দোষ ধরছি না, ট্রাই টো আন্ডারস্ট্যান্ড মি..
বলতে বলতেই পকেট থেকে একশো টাকা বের করে রিতুর হাতে ধরিয়ে দিল। পাশ ফিরে ওই মহিলাকে ডাকল। মহিলাটি রাস্তার অন্য পাশেই এক লোকের কাছে হাত পাতছিল। মহিলা দাড়াতেই রিতুকে ঠেলে বলল,
—যাও, এবার গিয়ে টাকাটা উনাকে দাও। তারপর নরম গলায়, হাসিমুখে, একটু আগে যেই কথাগুলো বলেছ, সেগুলো আবার বলবে। তারপর দেখ..
রিতুর কপাল কুচকাল,
—আমি পারব না।
রায়হান জোর করে পাঠাল রিতুকে। বাধ্য হয়ে এগোল সে। মহিলার সামনে এসে একশো টাকার নোটটা বাড়িয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে মহিলার মুখে ফুটে উঠল উজ্জ্বল এক হাসি। যা দেখে রিতু কিছুটা চমকে উঠল। সামান্য কটা টাকায় এত অমায়িক হাসি? হাসিটা দেখে কেমন যেন একটা ভালো লাগা অনুভব করল রিতু। পেছনে ফিরে একবার তাকাতেই রায়হান ইশারা করল। সেও ধীরে কন্ঠে বলল,
—আপনি তো কাজও করতে পারেন। এসব না করে।
মহিলাটি এবার অসহায় চোখে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির আচল দিয়ে ঢেকে রাখা হাতটা বের করল। এবং দেখা গেল বাম হাতের অবস্থা। রিতু কিছুটা ঘাবড়ে উঠল। কনুইয়ের জয়েন্ট কিছুটা ছুটে আছে। মিনে হচ্ছে আলাদা হয়ে যাবে এক টানেই। হয়তো কোনো এক্সিডেন্টে এমন হয়েছে। মহিলাটি মুঁচকি হেসে বলল,
—মা, তোমার কথা একটাও ভুল না। আমার হাত-পা আছে, কাজ করে খেতেই পারি। সসম্মানে খেতে চাওয়ার ইচ্ছা সকলেরই থাকে। কিন্তু কি করব কউ? এই হাতের অবস্থা দেখলে কেউ কাজে নেয় না। দুই পেট চালাতে ভিক্ষা ছাড়া উপায় নাই।
বলেই মহিলা মন ভরে রিতুর জন্য দোয়া দিয়ে চলে গেল। রিতু ঠায় দাঁড়িয়ে রইল জায়গায়, কেমন যেব গিল্টি ফিল করছে। পেছন থেকে রায়হানের কণ্ঠ শুনে সে ফিরল।
—এবার কি রাগ লাগছে ওই মহিলার কাজে?
রিতু ধীরে মাথা নেড়ে “না” বোঝাল। রায়হান ভ্রু নাচিয়ে বলল,
—এবার বুঝলে তো আমার কথার মানে? এখন কি মনে হচ্ছে আমি তোমার দোষ ধরছিলাম?
রিতু কিছু বলল না। স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে রইল। রায়হান রিতুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে রাস্তা পার হয়ে বাইকের সামনে এল। কোমল কণ্ঠে বলল,
—আমরা মানুষের উপর দেখে সহজেই বিচার করে বসি। যা মোটেও উচিত নয়। কোনো মানুষের অবস্থান বা কাজকে ছোট করে দেখা ঠিক না। সকলেই নিজের পরিস্থিতির শিকার। দুনিয়াতে কেউ নিজ ইচ্ছায় গরিব হয় না। সকলের জীবনেই আপস এন্ড ডাউন আসে। কেউ পরিস্থিতি সামলে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়, আবার কেউ কেউ পায় না। তারা বাধ্য হয় এমন পথ বেছে নেয়ার। পেট তো চালাতে হবে।
রিতু মাথা নেড়ে সায় দিল। কথাগুলো সে বুঝেছে। মহিলাটির হাসিটা বারবার যেন ধাক্কা দিচ্ছে তাকে। খারাপ লাগছে, না বুঝে কড়া কথা শুনিয়ে ফেলেছে। নিজের ভাবনায় চমকাল রিতু। আজ প্রথমবার নিজের কোনো কাজ নিজের চোখে ভালো লাগল না। জিদ কাজ করল না নিজের ভুলকে সঠিক করার। অবাক সে। হয়তো রায়হান তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলেছে। এক চিলতে হাসি দিয়ে রায়হান বলল,
—মানুষকে বোঝার চেষ্টা করবে রিতু। তবে দেখবে, নিজেও খুশি থাকবে, অন্যরাও খুশি থাকবে। সবসময় যে তুমিই রাইট হবে, ব্যাপারটা এমন না। কিছু ক্ষেত্রে তোমার ভাবনাও ভুল হতে পারে, অপর ব্যক্তি সঠিক হতে পারে। এখন নিশ্চয় রাগ করবে? ইগোতে লাগছে আমার কথাগুলো। কিন্তু নরম মনে ইগো সাইডে রেখে একটু ভেবে দেখো, আমি কি খারাপ কিছু বলছি?
রিতু নিশ্চুপ। চোখে মুখে অপরাধবোধ নেমে এসেছে। এবারও শুধু মাথা নেড়ে “না” বোঝাল। রায়হান আবারও বলল,
—এই যে, মাত্র যেভাবে আমার কথাগুলো শুনলে, বুঝলে। এতদিন যদি ঠিক একইভাবে বুঝে আসতে, আজ আমাদের মাঝে এত দূরত্বের তৈরি হতো না। আমাদের মাঝে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হত না। এতদিনে হয়তো আমি আমার ঘরের বউ করে নিয়ে আসতে পারতাম তোমাকে। এত ওয়েটও করতে হতো না আমার।
রিতু এবার অভিমানী কণ্ঠে বলে উঠল,
—তোমাকে আমি বিয়ে করব না।
রায়হান জিজ্ঞেস করল,
—কেন?
রিতু সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমার একজন জেন্টালম্যান লাগবে। আমার বাবার মতো, আমার ভাইয়ার মতো। তারা যেমন বুক ফুলিয়ে তাদের বউকে সকলের সামনে নিজের বলে দাবি করতে পারে, আগলে রাখতে পারে, ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমারও এমন কাউকেই লাগবে। আমার থেকে ইগো বড় হবে এমন কাউকে আমি চাই না। আমার সঙ্গে রাগ করে আমার থেকে দূরে সরে যাবে এমন কাউকে চাই না।
রায়হান তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—আমি জানি না তোমার বাবা বা ভাই কিভাবে তাদের বউকে সম্মান করে ভালোবাসে। আমি জানতেও চাই না। তুমি একবার শুধু আমার ঘরে, আমার স্ত্রী হয়ে আসো। আমি আমার মতো বেস্ট হাসব্যান্ড হয়ে দেখাব। আমাকে কি আর একবার সুযোগ দেওয়া যায় না? জাস্ট আমাকে একটু বুঝতে হবে আর কিছু লাগবে না।
রিতু মাথা নিচু করে ফেলল সে। এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল চোখ বেয়ে, রায়হান সঙ্গে সঙ্গে মুখখানা আগলে নিল, চোখের পানি মুছে দিল। মেয়েটার চোখের অসহায় চাহনি, নিরবতা সে ভালো করেই পড়তে জানে। খুঁজে পেল নিজের উত্তর। তাকে ছেড়ে খুশি মনে বাইকে রাখা ব্যাগটা হাতে নিল। ব্যাগ থেকে একটি মাঝারি সাইজের ফুলের তোড়া বের করে রিতুর হাতে ধরিয়ে দিল। রিতু কিছু বলল না, শুধু ধরে রাখল।
—তোমাকে আমার ঝাসির রানী হিসেবে বেশি মানায়। এমন নরম স্বভাবে মানায় না।
রিতু রাগী চোখে তাকাতেই রায়হান হেসে ফেলল,
—এবার ঠিক আছে। তবে একটা জিনিস মিসিং।
রিতু কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—কি?
রায়হান মানিব্যাগ বের করতে করতে বলল,
—ওয়েট।
রিতু তাকিয়ে রায়হানের মানিব্যাগের দিকে। পকেটে এখনো তার সেই পুরনো ছবিটি আছে। রায়হান কি তবে তা খুলে ফেলেনি? সে তো ভেবেছিল, হয়তো অনেক আগেই এসব ফেলে দিয়েছে। আরও চমকালও তার ছবি রাখা অংশের উপর একটি কালো টিপ দেখে। এটা যে তারই টিপ, যা সে একবার দেখা করতে গিয়ে খুলে রেখেছিল এখানে। তা এখনো আছে? এত যত্ন করে তার জিনিসগুলো রেখেছে এই ছেলে? ছলছলে চোখে তাকাল রায়হানের মুখপানে। যদি এতই ভালোবাসা এখনো আছে, তবে এতদিন কেন আগলে রাখল না? রাগ ভাঙাতে আসল না?
রায়হান টিপটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে রিতুর কপালে সযত্নে পড়িয়ে দিল। রিতু পানিতে টইটম্বুর চোখে চেয়ে আছে তার দিকে। রায়হান শীতল হেসে আচমকাই গভীরভাবে ঠোঁট ছোয়াল সেই টিপের উপর, তারপর আবার সরে দাঁড়াল। রিতু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। রায়হান আশেপাশে তাকাল, রাস্তার ধারে শুয়ে থাকা একটা কুকুর ছাড়া আর তেমন কেউ নেই। দেখে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—ইস কুত্তে কে আলাওয়া ঔর কিসি নে নাহি দেখা।
রিতু ফিক করে হেসে ফেলল। আলতো করে চাপড় মারল রায়হানের বাহুতে।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। বাড়ির কর্তারা অফিস থেকে চলে এসেছেন প্রায় আধা ঘন্টা। কারোরই মন ভালো নেই, আজকের ডিলটা হাতছাড়া হয়ে গেছে। আসার পর কেউ তেমন কথাও বলেনি। নিজের ঘরে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছেন।
ড্রয়িংরুমে বাকিরা উপস্থিত, তালহার নানা-নানু দাদি সহ সকল ভাই-বোনেরা। নাস্তা চলছে, সঙ্গে টুকটাক আলাপ-আলোচনা। তবে মেহরীনের মন অন্যত্র। মনটা কেমন যেন আনচান আনচান করছে। তালহা কেন আসছে না, তা নিয়ে চিন্তা করছে। নিশ্চয়ই তারও মন খারাপ। অস্বস্তি নিয়ে বসে আছে, বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে।
সময় তখন সাতটা চল্লিশ। হঠাৎ কলিং বেল বাজতেই মেহরীন দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যেন এই মুহূর্তের জন্যই সে অপেক্ষা করছিল। মনের মনে ধীরে ধীরে দোয়া পড়তে লাগল, খুব করে চাইল তালহার হাসিমুখটা দেখতে।
দরজা খুলতেই চোখে পড়ল ক্লান্ত তালহাকে। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে, তবে মেহরীনের দিকে তাকাতেই আলতো হাসি দিল। হাসিটা ছিল জোরপূর্বক, ঠিক বুঝতে পারল মেহরীন। একপাশে সরে দাঁড়াতেই তালহা ভেতরে ঢুকল। জুতো খুলতে শুরু করলে মেহরীন তখন দরজা লাগাল। মোজা খুলে রেখে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোল সে। পিছু পিছু মেহরীন ও গেল।
সকলের দৃষ্টি এখন তার দিকে। দাদিদের সঙ্গে টুকটাক আলাপের মাঝে ফারাহ উঠে গেল। ফ্রিজ থেকে তালহার জন্য বানানো ঠান্ডা শরবত বের করে আনল সে। মুঁচকি হেসে তালহাকে এগিয়ে দিল। তালহা বসল না, দাঁড়িয়েই একটানে শরবতটা খেয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। পথে মেহরীনকে ডেকে বলল,
—মেহরীন, একটু রুমে আসো তো।
বলেই সে উপরে চলে গেল। ফারাহ রাগে হাতের গ্লাসটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। কটমট চোখে চেয়ে আছে মেহরীনের দিকে। এদিকে মেহরীন দ্বিধাবোধে দাঁড়িয়ে আছে। যাবে কি যাবে না এই ভাবছে। সকলের সামনে এভাবে ডাকায় লজ্জা লাগছে কিছুটা। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দাদি বললেন,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৫
—কি গো নাত বউ! আমার নাতি ডেকেছে, শুনোনি? যাও, যেতে হবে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ দরকার..
বলেই হাসলেন। দাদির হাসিতে তাল মেলাল বাকিরাও। অনেকেই মিটিমিটি হেসে উঠল। লজ্জায় মেহরীন দ্রুত পায়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। ফারাহকে ক্রস করে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে আচমকাই এক পা বাড়িয়ে দিল সে। মেহরীন লক্ষ্য না করে পা বাড়াতেই হোচট খেয়ে পড়তেই যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ তার দু’বাহু শক্ত করে ধরল।
—ঠিক আছো? লাগেনি তো?
মেহরীন মাথা তুলে তাকাতেই হতভম্ব। এই মানুষটাকে সে আশা করেনি…
