প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৭
সাইদা মুন
মেহরীন লক্ষ্য না করে পা বাড়াতেই হোচট খেয়ে পড়তেই যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ তার দু’বাহু শক্ত করে ধরল। হুমড়ি খেয়ে পড়ার হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেল সে। ভয়ের ধাক্কায় বুক থেকে এক তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে এলো। তাকে ধরে রাখা মানুষটার দিকে তাকাতেই যেন বড়সড় একটা ঝাঁকুনি খেল মেহরীন। রিতু! রিতুই তাকে ধরে রেখেছে। আশ্চর্য হয়ে গেল সে। মেহরীন নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই রিতু ধীরে তাকে ছেড়ে দিল। তারপর কপাল কুঁচকে একবার ফারাহর দিকে তাকাল। দৃষ্টিটা খানিক তীক্ষ্ণ ছিল। তবে সে কিছুই বলল না। চোখ সরিয়ে মেহরীনকে শুধু শান্ত গলায় বলল,
—দেখেশুনে চলাফেরা করবে।
বলেই পাশ কাটিয়ে চলে গেল রিতু। মেহরীন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিতুর কাছ থেকে ঝাড়ি ছাড়া এমন স্বাভাবিক কথা, হয়তো এই প্রথম শুনল সে। ব্যাপারটা তার কাছে কেমন যেন অদ্ভুত লাগল। যেন পরিচিত কোনো মানুষ হঠাৎ একেবারে অন্য রূপে সামনে এসেছে। মনে মনে প্রশ্ন জাগল রিতু কি ঠিক আছে? একটা ঝারি তো দেওয়ার কথা ছিলই। ভাবনার জট কাটল তাহিয়ার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে।
—কিরে, তোর লাগেনি তো?
মেহরীনের ভাবনা কাটল তড়িঘড়ি মাথা নেড়ে বলল,
—না না, ঠিক আছি।
বলেই সামনে এগোতে শুরু করল। কিন্তু তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু তখনও রিতুই। রিতুর এই স্বাভাবিক আচরণটা তার কাছে ঠিক হজম হলো না। নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতেই সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়েও থেমে দাঁড়াল মেহরীন। মুহূর্তখানেক ভেবে আবার ঘুরে রান্নাঘরের দিকে এগোল। তালহার মুখটা দেখেই আন্দাজ করেছিল, তার মাথা ব্যথা করছে। এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। এই ভেবে কফি বানাতে লাগল।
মিনিট পাচেঁক পর কফির কাপ হাতে ঘরে ঢুকতেই দেখল তালহা এক হাত কপালে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। শার্টটাও খোলা হয়নি এখনো। হয়তো ঘরে ঢুকেই শুয়ে পড়েছে। মেহরীন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নরম গলায় ডাকল,
—আপনার কফিটা।
মেহরীনের কণ্ঠ কানে যেতেই তালহা চোখ মেলল। তাকে দেখে ঠোঁটে মলিন এক হাসি ফুটে উঠল। মাথার নিচের বালিশটা একটু সরিয়ে খাটের গায়ে ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল সে। মেহরীন কফির কাপটা এগিয়ে দিতেই তালহার কপাল প্রথমে একটু কুঁচকে উঠলেও পরক্ষণেই ঠোঁটে প্রশান্তির এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল। এক চুমুক কফি খেয়েই বলল,
—এটার খুব প্রয়োজন ছিল।
মেহরীন মুচকি হেসে বলল,
—বুঝেছিলাম, তাই একেবারে নিয়েই আসলাম।
তালহা কফি খেতে খেতে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
—আমাকে অনেক বুঝে যাচ্ছেন দেখছি।
মেহরীন দরজার দিকে এগোতে এগোতে হালকা হাসল। বলল,
—একটু একটু চেষ্টা করছি, সব আর বুঝলাম কই।
বলেই দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে ফিরে এসে তালহার গা ঘেঁষে বসে পড়ল। তালহা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—বাহ! এটাও আমার বলার আগেই করে ফেলেছেন।
মেহরীন শুধু মুঁচকি হাসল। তারপর দু’হাতে আলতো করে তালহার কপাল টিপতে শুরু করল। তালহার কফিটা শেষ হতেই মেহরীন নিজে থেকেই কাপটা নিয়ে নিল। তা বেডসাইড ড্রয়ারের ওপর রেখে দিল। তালহা যেন একের পর এক বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তার পিচ্চি বউ কেমন যেন বড় বড় আচরণ করছে। যেন গিন্নি হিয়ে উঠেছে। তবে এটা দেখে ভালোই লাগছে। তার স্ত্রী ধীরে ধীরে তাকে বুঝতে শুরু করেছে। তার কী লাগবে, কী না লাগবে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
সে উপুড় হয়ে মেহরীনের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। দু’হাতে জড়িয়ে ধরল তার কোমর। পরক্ষণেই মুখ গুঁজে দিল মেহরীনের নরম, মেদযুক্ত কোমরে। মেহরীন একটু কেঁপে উঠতেই তালহা সেখানে নাক ঘষল। এতে যেন আরও কেঁপে উঠল মেহরীন।
তালহা আদুরে কণ্ঠে বলল,
—একটু চুল টেনে দেবেন, ম্যাডাম?
এমন আবদার কি চাইলেও ফেলে দেওয়া যায়? মেহরীন কোনো কথা বলল না। শুধু ধীরে ধীরে দু’হাতে তার চুলে আঙুল চালিয়ে আলতো টানতে লাগল। তালহা আরাম করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। এভাবেই কিছুক্ষণ কেটে গেল। দুজনেই চুপচাপ। তবে মেহরীনের কেমন যেন মনে হচ্ছে তালহার সঙ্গে কথা বলা উচিত তার। লোকটার মন মেজাজ খারাপ। একটু যদি ভালো করতে পারে মন্দ কি। তাই হঠাৎ নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করল,
—আপনার মন খারাপ?
তালহা আধো ঘুমঘুম স্বরে বলল,
—একটু।
মেহরীন আশ্বাস দিয়ে বলল,
—চিন্তা করবেন না। আল্লাহ হয়তো আরও ভালো কোনো প্রজেক্ট আপনাদের ভাগ্যে রেখেছেন। জীবনে একবার দু’বার তো আমাদের হারতেই হয়।
তালহা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—হুম।
মেহরীন এবার নিজের গল্প শুরু করল,
—জানেন, ক্লাস এইটে থাকতে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় আমি তিনটাতে ফেল করেছিলাম। তখন তো একদম মন ভেঙে গিয়েছিল। তার ওপর চাচির নানান কথা, ঠাট্টা, সব মিলিয়ে নিজেকে খুব ছোট লাগত। একসময় তো ডিপ্রেশনেও চলে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল আমার দ্বারা আর কিছুই হবে না।
একটু থেমে সে দৃঢ় গলায় বলল,
—কিন্তু দাদি আমাকে ভীষণ সাহস দিয়েছিল। বলেছিল, জীবনের পথে কত বাধা আসবে। সেই বাধা পেরোতে পারলেই গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। তখন আমি আমার ব্যর্থতাটাকে বাধা হিসেবেই মেনে নিয়েছিলাম। আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলাম। তারপর বোর্ড পরীক্ষায় আমাদের স্কুলে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট আমিই করেছিলাম।
হালকা হেসে সে বলল,
—তাই বলছি, চিন্তা করবেন না। একবার হেরেছেন তো কী হয়েছে? আল্লাহ নিশ্চয়ই আরও ভালো কিছু রেখেছেন আপনার জন্য।
বউয়ের কথা মন দিয়ে শুনছে তালহা। মাঝে মাঝে হুঁ হা করছে। দিনভর জমে থাকা ক্লান্তি আর মনখারাপ যেন ধীরে ধীরে এখানেই মিলিয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি ছড়িয়ে পড়ল তার। এই ভেবে ভালো লাগছে, যে মেয়েটা তার খারাপ লাগা বুঝতে পেরেছে। তাকে সাহস দিচ্ছে। তাকে হালকা করার চেষ্টা করছে। সে তো মায়ের পর এমন একটা জায়গাই খুঁজছিল, যেখানে ভালো থাকার কোনো অভিনয় করতে হবে না। এমন একটা মানুষই তো চেয়েছিল, যে মুখের দিকে তাকিয়েই তার না বলা কথাগুলো বুঝে ফেলতে চাইবে। পারুক আর না পারুক চেষ্টা অন্তত করবে। অবশেষে সে যেন সেই মানুষটাকেই খুঁজে পেয়েছে। নিজেকে বোঝার মানুষ। তার অশান্ত মনকে শান্ত করার মানুষ। তালহা নিঃশব্দে মেহরীনের কোমরটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন এই উষ্ণ আশ্রয়টা কোনোভাবেই হারাতে চায় না। এই মেয়েটাকে এত আদুরে লাগে ইচ্ছে করে ভালোবাসা দিয়ে ভাসিয়ে ফেলতে। দিনকে দিন যেন সে ড্রাগস এর মতো কাজ করছে। এভাবেই অনেকটা সময় কেটে গেল।
মেহরীন গল্প বলে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে থেমে গেলে তালহা জিজ্ঞেস করছে,
—তারপর কী হলো?
তখন আবার শুরু করছে সে। ভীষণ উপভোগ করছে দুজনেই এই মুহুর্ত। হঠাৎ কথার মাঝেই তালহা জামার উপর দিয়েই শব্দ করে টুক করে এক চুমু খেয়ে বসল মেহরীনের পেটে। তারপর ফিসফিস করে বলল,
—ভালোবাসি, ম্যাডাম।
মেহরীনের ঠোঁট আচমকাই থেমে গেল। যেন সময়ের মধ্যে জমে গেল সে। তালহার চুল শক্ত করে মুঠো করে ধরে রইল। তালহা আবারও বলল,
—ভালোবাসি।
এইবার মেহরীনের গালজুড়ে লজ্জা এসে ভিড় করল। বুকের ভেতর উষ্ণ এক অনুভূতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। সযত্নে তালহার মাথাটা আগলে নিয়ে নরম গলায় বলল,
—আমিও।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল,
—আমিও কি?
মেহরীন লাজুক হাসি হেসে বলল,
—আমিও ভালোবাসি।
তালহা মাথা তুলে ধীরে ধীরে চোখ রাখল মেহরীনের চোখে। তার দৃষ্টিতে দুষ্টুমি খেলছে। নরম সুরে বলল,
—ভালোবাসা দেখছি না তো।
মেহরীন কপাল কুঁচকালো। তবে মুহূর্তের মধ্যেই তালহার আবদারটা বুঝে গেল সে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। দু’হাতে তালহার দু’গাল আগলে ধরে কপালে শব্দ করে একটা চুমু খেল। কিন্তু তালহা তাতে সন্তুষ্ট নয়। চোখভ্রু কুঁচকে বলল,
—একটা? ভালোবাসার ক্ষেত্রে এত কিপটামি।
মেহরীন এবার ফিক করে হেসে ফেলল। তালহা কেমন আবদারের চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গাম্ভীর্যে ভরপুর মানুষটার এই শিশুসুলভ, আদুরে রূপটা দেখতে তার ভীষণ ভালো লাগে। এই মানুষটা সবার সামনে যতটা কঠিন, তার কাছে ঠিক ততটাই নরম আর স্বাভাবিক হয়ে আসে। সে আর দেরি করল না। নিজে থেকেই তালহার মুখমণ্ডল জুড়ে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল। কপাল, গাল, চোখের কোণা, যেখানে পৌঁছায় তার ঠোঁট, সেখানেই রেখে যাচ্ছে নরম স্পর্শের ছাপ। যেন ইচ্ছে করেই কোনো জায়গা ফাঁকা রাখল না। ঠোঁটের সেই নরম ছোঁয়া থামতেই তালহা আবার মেহরীনের কোলে মাথা গুজে শুয়ে পড়ল।
ফিসফিস করে বলল,
—জোয়ান বয়সেই ডায়বেটিসের রোগী বানিয়ে ফেলার প্ল্যান করেছেন, ম্যাডাম?
মেহরীন তার চুলের ফাঁকে আবার হাত গুঁজে দিয়ে আলতো করে চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল,
—এই ডায়বেটিসের কোনো ক্ষতিকর সাইড ইফেক্ট নেই।
—তবে বলছেন আপনি আমার ডায়বেটিস?
মেহরীন এবার একরকম অধিকারী ভঙ্গিতেই বলল,
—শুধু ডায়বেটিস কেন? আপনার সব হতে চাই আমি। আপনার সব জায়গায় যেন শুধু মেহরীন, মেহরীন থাকে।
তালহা মৃদু হেসে মেহরীনের পেটে নাক ঘষে বলল,
—তা তো কবেই হয়ে গেছে।
মেহরীন হঠাৎ নড়ে চড়ে উঠে কপট রাগে তালহার চুল মুঠো করে ধরল,
—আরে! কাতুকুতু লাগে তো..
এই কথায় যেন তালহার দুষ্টুমিই বেড়ে গেল। সে আরও বেশি করে নাক ঘষতে লাগল। মেহরীন খিলখিল করে হাসছে, আবার তালহাকে থামানোর চেষ্টাও করছে। কিন্তু তালহার থামার কোনো নামগন্ধ নেই। মেয়েটার সঙ্গে বাচ্চামোতে মেতে থাকতে ভালো লাগছে। তার সামনে শক্ত খোলসে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে হয় না। দু’জনের এই খুনসুটি হঠাৎ থেমে গেল দরজায় করাঘাতের শব্দে।
বাইরে থেকে তাহিয়ার গলা ভেসে এলো,
—এই ভাইয়া! নিচে আসো তো। ডেলিভারি ম্যান এসেছে। তোমার কী পার্সেল যেন, তুমি ছাড়া আর কাউকে দেবে না বলছে।
তালহা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। তারপর গলা উঁচু করে বলল,
—বল, আসছি!
মেহরীন কপাল কুঁচকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,
—কিসের পার্সেল?
তালহা খাট থেকে নেমে শার্টটা খুলতে খুলতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
—নিচে চল, দেখতে পাবে।
বলতে বলতেই সেকেন্ডের মধ্যে একটা টি-শার্ট গায়ে চড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মেহরীনও কৌতূহলে ভরা চোখ নিয়ে তার পিছু পিছু ছুটল।
ড্রয়িংরুমে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে। সবাই সোফায় বসে আছে গম্ভীর মুখে, যেন প্রত্যেকের চোখেই একটাই প্রশ্ন ভাসছে। তালহা সাইন করে খামটা নিয়ে ফিরে এলো সবার মাঝে। এসে মেহরীনের পাশের সোফায় বসে পড়ল। হেচকা টানে মেহরীনকে পাশে বসিয়ে দিল। ঘরে উপস্থিত সবার চোখেই তখন কৌতূহলের ছায়া, খামের ভেতরে কী আছে?
তালহা ধীরে ধীরে খাম খুলে কিছু কাগজ আর কয়েকটা ছবি বের করল। তারপর সেগুলো মেহরীনের হাতে দিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
—এটা তোমার বাবা?
কথাটা শুনতেই যেন পরিবেশটা টানটান উত্তেজনায় ভরে উঠল। কাঁপা হাতে ছবিগুলো হাতে নিয়েই মেহরীন একবার তাকাল। পরক্ষণেই ধীরে মাথা নাড়ল,
—হুম।
তালহা এবার ছবিগুলো আর কাগজপত্র নিয়ে এগিয়ে দিল তার নানার দিকে,
—দেখো তো নানাভাই ইনিই কি তোমার ছোট মেয়ের জামাই?
তালহার নানা গম্ভীর মুখে কাগজগুলো হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ ধরে উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর ছবিগুলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। বুক থেকে ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মুখে নেমে এলো শোকের ছায়া। ধীরে, ভারী কণ্ঠে বললেন,
—হ্যাঁ, এটাই সেই ছেলে।
এই কথাটা যেন ঘরের ভেতরের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলল। তিতলি বেগম আর তার ভাইয়েরা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। সঙ্গে রাফারা তাহিয়ারা সকলেই যেন অধীর আগ্রহী এই নিয়ে। মুহূর্তেই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল। তাহলে সত্যিই মেহরীন তাদের ছোট বোনের মেয়ে। আরিফ আহমেদ এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে ছিলেন। এবার ধীরে ধীরে উঠে এগিয়ে এলেন মেহরীনের কাছে। তার চোখ ভিজে উঠছে। মেহরীনের মাথায় হাত রাখলেন।
চুলে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে ভাঙা গলায় বললেন,
—তুই, আমাদের ছুটকির মেয়ে বুঝি?
মেহরীন নিঃশব্দে মাথা নাড়তেই তিনি হালকা হেসে উঠলেন৷ তবে সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে স্মৃতির বেদনা বেশি ছিল। একটু থেমে স্মৃতির গভীরে ডুবে দিলেন,
—জানিস, তোর মা যখন তোর বয়সি ছিল, কী যে চঞ্চল ছিল সে। তাকে ঘরে বেঁধে রাখা যেন অসম্ভব ছিল। এত দুরন্ত, এত আহ্লাদি ছিল যে আমরা তাকে মুখে তুলে তুলে খাইয়ে দিতাম। অনেক আগলে রাখতাম। আমরা তো চিন্তায় থাকতাম, এই মেয়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কী করে থাকবে। কে এত যত্ন করবে তাকে? বাপের বাড়ির সুখ কি শশুর বাড়ি গিয়েও মিলবে? তখনই ঠিক করেছিলাম, যে ছেলে তাকে রানীর মতো করে রাখবে, তার হাতেই দেব বোন। যেমন বড় আপাকে দিয়েছিলাম।
তারপর কণ্ঠটা আরও ভারী হয়ে এলো,
—অথচ দেখ, সেই দস্যি মেয়েটাই কিনা ভালোবেসে নিজের পছন্দে আমাদের কথা না ভেবে ছোট্ট একটা গ্রামে এত কষ্ট করে সংসার করেছে। কত কষ্টই না করেছে সে। তার তো আরও বাঁচার কথা ছিল, বল মা ছিল না?
মেহরীনের চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। আসলেই তার মা যদি সঠিক চিকিৎসা পেত তাহলে হয়তো আরও অনেকদন বাচঁত। তার বাবার যদি অর্থ সম্পদ ভালো থাকত তাহলে তার মাও অনেক সুখে থাকত। আরিফ আহমেদ ভাঙা কণ্ঠে আবার বললেন,
—তার তো মেয়ের বিয়ে দিয়ে নাতি-নাতনি দেখে তারপর বিদায় হওয়ার কথা ছিল।
তুহিন আহমেদ এসে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন। ভাইকে আস্বস্ত করার চেষ্টায়। ভাইয়ের মনের অবস্থা বুঝছেন তিনি। তাকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। একবার ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন আরিফ সাহেব। তারপর মেহরীনের দিকে স্নেহমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—যা হয়েছে, হয়ে গেছে। বোন নেই কিন্তু বোনের সন্তান তো আছে। আমি জানি, আমাদের তালহা অনেক ভালো ছেলে। তার বাবা যেমন আমার বোনটাকে মাথায় করে রেখেছিল, তেমনি সেও আমার বোনের মেয়েটাকে রাখবে। তাও বলছি মা, কোনোদিন যদি মনে হয় তুই নিজের প্রাপ্য অধিকার পাচ্ছিস না, কষ্ট হচ্ছে, তাহলে সরাসরি মামার কাছে চলে আসবি। কেমন? মামার ঘরের দরজা তোর জন্য সবসময় খোলা থাকবে। আল্লাহ তোকে অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখুক, অনেক সুখে রাখুক।
তার কণ্ঠের মমতা আর আশ্বাস ছিল। বলতে বলতেই তিনি মেহরীনের মাথার চুলে স্নেহভরা একটি চুমু এঁকে দিলেন। মেহরীনের চোখ বেয়ে খুশির পানি ঝরছে। এমন একটা হাতই তো মাথার উপর চেয়েছিল।
পাশ থেকে বিল্লাল সাহেব প্রতিবাদ করে উঠলেন,
—শুনুন বেয়াই, মেহরীন আমাদেরও মেয়ে এ বাড়ির দরজা কখনো বন্ধ হবে না তার জন্য।
আরিফ সাহেব হাসলেন অল্প। তুহিন সাহেব কিছু বললেন না, চুপচাপ তিনি। তবে তার স্ত্রী এগিয়ে এসে মেহরীনকে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছেন। নানির আদর মামা মামির ভাই-বোন সকলের আদরই যেন এখন আছে মেহরীনের জীবনে। কে বলবে একসময় সে কতটা নিঃস্ব ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের পরিবেশটা বদলে গেল। সবাই যেন আবার মেতে উঠল মেহরীনকে ঘিরে। ধীরে ধীরে তার জীবন কি রঙিন হয়ে উঠছে। আল্লাহ যেন একটা রঙ ও বাদ রাখছেন না তার জীবন থেকে।
উপস্থিত সকলেই খুশি। তবে একজন নেই সেখানে, তালহার নানা। তিনি নিঃশব্দে উঠে চলে গেছেন। তাহসান এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। কোনো কথা বলছে না। তবে মেহরীনের মুখের হাসি দেখে তার ঠোঁটেও মৃদু হাসি ফুটে উঠেছে। আর তালহা, সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহরীনের দিকে। নিজের আপন মানুষগুলো পেয়ে মেয়েটা যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছে। আর সেই আনন্দটাই তাকে ভীষণ সুখ দিচ্ছে। মেয়েটা খুশি থাকলেই, সে খুশি।
—তোর নানার সাথে একটু কথা বলে আয়, মেহরীন। আব্বার মনটা খারাপ।
তিতলি বেগমের কথা শুনতেই মেহরীন ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর পা বাড়াল সেই ঘরের দিকে, যেখানে তার নানা আছেন। দরজার সামনে এসে আলতো করে টোকা দিতেই ভেতর থেকে অনুমতি এল। মেহরীন ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরে প্রবেশ করতেই তার চোখে পড়ল, আলি সাহেব চোখ মুছছেন। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। মেহরীন নীরবে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে বসে পড়ল। বুকের ভেতর কেমন যেন জড়তা জমে আছে। দ্বিধাভরা কণ্ঠে ডাকল,
—না..নাভাই।
আলি সাহেব আলতো হেসে বললেন,
—নানা ডাকতে ভয় করছে বুঝি? আমি তো তোরই নানা। সুন্দর করে একটু ডাক তো শুনি।
এতেই যেন সাহস পেয়ে গেল মেহরীন। আর দেরি করল না। স্পষ্ট, কোমল কণ্ঠে ডেকে উঠল,
—নানাভাই, নানাভাই, নানাভাই।
একটানা বলতেই পরক্ষণেই দু’জনেই হেসে ফেলল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলি সাহেব বললেন,
—যদি তালহার সঙ্গে তোর এই সম্পর্ক না থাকত, তাহলে আমি তোকে আজীবন আমার কাছেই রেখে দিতাম। মেয়েটাকে ঠিকমতো দেখে রাখতে পারিনি, তার সুখটাও দেখতে পারিনি। তবে তোকে কখনো ফেলে দেব না। তোর নানার বাড়ি, তোর মায়ের বাড়ি, আজীবন তোর জন্য খোলা থাকবে। যখন ইচ্ছে করবে, আমাকে মনে করবি, আমি নিজেই তোকে নিতে চলে আসব।
এরপর শুরু হলো নানা-নাতনির দীর্ঘ আলাপ। আলি সাহেব যেন স্মৃতির অ্যালবাম খুলে বসেছেন। মেহরীনের মায়ের ছোটবেলার কত শত গল্প, দুষ্টুমি, হাসি, অভিমান, আদর, সব একে একে বলতে লাগলেন। মাঝে মাঝে বলতে বলতে তার চোখ ভিজে উঠছে। আবার কখনো হেসে উঠছেন। কখনো আবার মেয়ের সেই কাজে কপট রাগী ভাব দেখা দিচ্ছে চেহারায়। মেহরীন চুপচাপ শুনছে।
মা-বাবা বুঝি এমনই হয়, সন্তানের ছোট থেকে বড় হওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত হৃদয়ে জমিয়ে রাখে। একটা সন্তানকে বড় করে তোলা সহজ কথা নয়, সন্তানের বড় হওয়ার সাথে সাথে কতশত স্মৃতিও জড়ো হয়। সেই সন্তানের মৃত্যুর খবর সহ্য করা কি এত সহজ। এভাবেই প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেল নানা-নাতনির কথায় কথায়।
এরই মাঝে একবার তালহা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আলি সাহেব সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছে, এখন সে যাবে না। তালহা যেতেই দুজনেই তালহাকে নিয়ে হাসাহাসিতে মেতে উঠল। ছেলেটা যে বউপাগল হয়ে উঠবে, এটা যেন কারও কল্পনাতেও ছিল না। তবে আলি সাহেব একটা ব্যাপারে শান্তি পাচ্ছেন, তালহা ঠিক তার বাবার মতোই হয়েছে।
ছেলেটার বিয়ের আগে যেমন তার বিয়ের প্রতি অনীহা ছিল, এখন দেখছেন বিয়ের পর স্ত্রীর প্রতি তার আগ্রহ যেন হাজার গুণ বেড়ে গেছে। তিনি নাতনিকে এরকম বিভিন্ন কথা বলছেন, মেহরীন ও এসব শুনে কখনো লজ্জায় লাল-নীল হচ্ছে। কখনো অনেক খুশি হচ্ছে।
অবশেষে কথার ইতি টেনে মেহরীন যখন নানার ঘর থেকে বের হলো, তখন দরজার সামনে মুখোমুখি হয়ে গেল ফারাহর মায়ের সঙ্গে। হঠাৎ সামনে পড়ে যাওয়ায় মেহরীন একটু ইতস্তত করে বলল,
—ম..মামি, কিছু লাগবে আপনার?
সোফিয়া বেগম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে ঠিক রাগ ছিল নাকি স্বাভাবিক, মেহরীন বুঝতে পারল না। তবে একটা বিষয় সে স্পষ্টই জানে, এই মানুষটা তাকে খুব একটা পছন্দ করেন না।
ঠান্ডা গলায় তিনি বললেন,
—না, প্রয়োজন পড়লে নিজের কাজ নিজেই করে নিতে পারব।
মেহরীন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে চায় উনার সঙ্গে একটু স্বাভাবিক হতে। হয়তো মেয়ের বিষয়টার জন্য তিনি তাকে দায়ী করছেন। কিন্তু তার তো কোনো দোষ নেই। তার এই ভুলভ্রান্তি দূর করতে হবে। এত বছর পর সে আপন মানুষ পেয়েছে, এখন কি আবার সেই আপনজনদের মাঝেও দূরত্ব থাকবে? এটা সে একদমই চায় না।
সোফিয়া বেগম এগিয়ে যেতে নিতেই মেহরীন তাড়াহুড়ো করে ডেকে উঠল,
—মামি।
তিনি থেমে ফিরে তাকালেন। শান্ত চোখে বললেন,
—হুম, কিছু বলবে?
মেহরীন একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে বলল,
—রেগে আছেন আমার ওপর?
সোফিয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সোজাসাপটা বললেন,
—নিজেও বলতে পারছি না। ছেলে-মেয়ের দিক দেখলে রাগ লাগছে। আবার পরিবারের দিক থেকে দেখলে ভালোও লাগছে।
মেহরীন তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গিয়ে তার এক হাত ধরে ফেলল। নিচু গলায় বলতে লাগল,
—বিশ্বাস করুন, ফারাহ আপুকে কষ্ট দিতে চাইনি আমি। না তাহসান স্যারকে। তাদের কষ্ট পাওয়ার পেছনে আমার একটুও হাত নেই। আমি তো জানতামই না, ফারাহ আপুর সঙ্গে উনার বিয়ের কথা। আবার তাহসান স্যার আমাকে পছন্দ করে, এটাও জানতাম না।
তার কণ্ঠ কাঁপছে ঢুক গিলে বলল,
—তিনি তো আগে কখনো আমাকে বলেননি এ বিষয়ে। জানলে আমি আগেই উনাকে সাবধান করে দিতাম। বলুন তো মামি, শুধু শুধু কেন আমি তাদের কষ্ট দিতে যাব? এতে আমার কী লাভ?
মেয়েটা এক টানা কথাগুলো বলে থামল। সোফিয়া বেগম চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটার নিষ্পাপ মুখটা যেন অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় ভরা। মায়ের মতোই মায়াবী চেহারা। রাগ করতে গেলেও পারা যায় না। উল্টো আদর করতে ইচ্ছে করে। উনাকে চুপ দেখে মেহরীন আরও অসহায় কণ্ঠে বলল,
—বিশ্বাস করুন মামি, তারা তো আমারও ভাই-বোন । আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। আল্লাহ হয়তো ভাগ্যই এমন লিখে রেখেছেন। আমার কী করার ছিল বলুন? এতে আমার একটুও হাত নেই। আমার সঙ্গে রাগ করে, আমাকে ভুল বুঝে এভাবে দূরে সরিয়ে দেবেন না। এতদিন কেউ ছিল না, তা এক দুঃখ ছিল। এখন আপনজন পেয়েও যদি দূরত্ব থাকে, তাহলে আরও বেশি খারাপ লাগবে।
এবার গলাটা নরম করে আবদার করে বসল,
—তাহিয়াদের যেভাবে আদর করেন, স্নেহ করেন, আমিও আপনার কাছ থেকে তেমন আদর চাই, প্লিজজজ।
সোফিয়া বেগমের চোখ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি অবাক। ভাবেননি মেয়েটা এত সহজে মিশে যাবে কারো সাথে। এভাবে এসে নিজের অধিকার চেয়ে বসবে। এত সরল, এত ভালোবাসার কাঙাল একটা মেয়ে। তাকে যদি একটু স্নেহ না দেওয়া হয়, তাহলে যেন পাপই হবে। অবশেষে আর নিজেকে আটকাতে পারলেন না। মেহরীনকে স্নেহের সঙ্গে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
—আমার তোর ওপর রাগ নেই মা। আমার ছেলে-মেয়ে দুটো যে মানসিক চাপে আছে, সেটা তোর ইচ্ছেকৃত না হলেও তোর কারণেই হয়েছে। মানছি, হয়তো তারা যা চেয়েছে তা তাদের ভাগ্য ছিল না। তবে মা হয়ে সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। তাদের এমন ভেঙে পড়া মানতে পারছি না। মা হলে বুঝবি, সন্তানের মুখের হাসি মায়ের জন্য কত বড় প্রাপ্তি, আর তাদের কষ্ট কত বড় দুঃখ।
মেহরীনও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
—আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি মামি। একটু ধৈর্য রাখুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক তখনই সেখানে এসে হাজির হলেন তাহেরা বেগম। কপাল কুঁচকে রাগী স্বরে বললেন,
—বাহ! এক মামির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছ, আরেকজনের আদরের দরকার নেই বুঝি?
মেহরীন ফিক করে হেসে ফেলল।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৬
অন্যদিকে,
রিতু দাঁড়িয়ে আছে ফারাহর সামনে। ফারাহ রাগে ফুঁসছে। চোখ দুটো যেন আগুনের মতো জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—আমি ওই মেয়েটাকে জাস্ট সহ্য করতে পারি না…
