Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩ (৩)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩ (৩)

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩ (৩)
মাইশা জান্নাত নূরা

এয়ারপোর্ট থেকে বাংলো বাড়ির মেিন গেইট পেরিয়ে ভিতরে এসে গাড়িটা থামালো সারফারাজ। পুরো পথজুড়ে সারফারাজ এক হাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে ছোট্ট নির্বাণকে।
এয়ারপোর্টের ভিতরে থাকাকালীন সময়েই সেই যে নির্বাণকে কোলে নিয়েছিলো সারফারাজ তারপর আর ওর কোয়ারটেকার সোফিয়াকে দেয় নি। গাড়ি ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো দেড় বছরের শিশু নির্বাণ। মাথাটা হেলান দিয়ে রেখেছে সারফারাজের বুকের ওপর। মাঝেমধ্যে গাড়ির হালকা ঝাঁকুনিতে একটু নড়েচড়ে উঠলেও আবার শান্ত হয়ে গিয়েছিলো সে। সোফিয়া অবশ্য কয়েকবার বলেছিলো….
—“স্যার, আমি নেই এখন নির্বাণকে! আপনি ড্রাইভিং করছেন তো।”
কিন্তু সারফারাজ মাথা নেড়ে না করে দিয়ে বলেছিলো….
—“না, থাক। ঘুম ভেঙে যাবে ওর।”

শিশু নির্বাণকে নিজের বুক থেকে সড়াতে সারফারাজের যেনো একটুও মন চাইছিলো না। তাই পুরো পথটাই সে ধীর গতিতে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে গাড়ি চালিয়েছে। সারফারাজের বুকের ভিতরে শান্তিরা মেলা জমিয়েছে আজ। যার ব্যাখ্যা সে নিজেও দিতে পারবে না হয়তো।
সারফারাজ গাড়ি পার্ক করে নির্বাণকে বুকের সঙ্গে আগের মতোই ধরে রাখা অবস্থায় গাড়ি থেকে নামলো সে। নির্বাণ কি নিশ্চিন্তেই না ঘুমাচ্ছে এখনও! সোফিয়াও পিছন সিট থেকে নেমে দাঁড়ালো। কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে রইলো সে সারফারাজ আর নির্বাণের দিকে। সোফিয়ার মনে হচ্ছিলো….
“সারফারাজ আর নির্বাণের আজই যেনো প্রথম দেখা নয়। যেনো বহুদিন ধরেই ওরা একে-অপরের পরিচিত। অদৃশ্য এলটা সম্পর্ক আছে ওদের মধ্যে। কারণ, যেই ছেলে নিজের মা আর সোফিয়া ছাড়া আর কারও কোলে দুই মিনিটও থাকে না সেই নির্বাণই কিনা এতোক্ষণ ধরে সারফারাজের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে! ব্যপারটা আশ্চর্য করে দেওয়ার মতোই।”
সোফিয়ার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। তখনই সারফারাজ ধীর গলায় বললো….
—“ভিতরে চলুন।”
সোফিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর ওরা তিন জনে বাংলো বাড়ির ভেতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলো।

বাংলো বাড়ির ড্রয়িংরুমে নীরা সোফার ওপর দু’পা তুলে জড়োসড়ো হয়ে বসে সামনে টি-টেবিলের ওপর ছোট্ট স্ট্যান্ডে নিজের ফোনটা রেখে খুব মন দিয়ে কোরিয়ান সিরিজ “Queen of Tears” এর তৃতীয় পর্ব দেখছে।
সিরিজের মাঝে নীরা এমনভাবে ডুবে গিয়েছে যে সিন অনুযায়ী মাঝেমধ্যে চোখের আকৃতি বড় করে ফেলছে তো কখনও ঠোঁট কামড়ে হাসি নিয়ন্ত্রণ করছে।
এদিকে রান্নাঘরে পিহু আর অনু মিলে সবার জন্য রাতের খাবার তৈরি করছে। পিহু প্রথমে অনুকে বারবার বলেছিলো….
—“তোমাকে কিছু করতে হবে না, অনু। তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও। সবে তো জ্বরটা কমেছে তোমার।”
কিন্তু অনু কিছুতেই রাজি হয় নি ঘরে যাওয়ার কথায়।
কারণ শুয়ে-বসে থাকতে থাকতে সে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলো।তাই প্রায় জোর করেই বলেছিলো….

—“দয়া করে আমাকেও একটু কাজ করতে দিন ভাবী। না হলে আমার সময়টা ভালো কাটবে না।”
অনুর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আর না করতে পারে নি পিহু।তাই পিহু অনুর হাতে টুকটাক কিছু কাজ ধরিয়ে দিয়েছে।রাতের জন্য আজ একটু আলাদা ধর্মী খাবারের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিহু। কয়েক রকম ভর্তা আর ক্ষুদ বিরান রাঁধবে সে। অনুর কাছে অবশ্য এই খাবার নতুন কিছু নয়। কারণ ছোটবেলা থেকেই অনু মাঝেমধ্যেই এই খাবার খেয়ে এসেছে। তবে এই বাড়ির অন্য সদস্যদের কাছে হয়তো খাবারটা একেবারেই অচেনা কিছু হবে।
মূলত চাল ভাঙার সময় চালের সাথে ছোট ছোট কিছু দানা থাকে সেগুলো কুলোতো ঝেড়ে আলাদা করা হয়। এরপর সেগুলোর নাম দেওয়া ক্ষুদ। সেই ক্ষুদের সঙ্গে পরিমাণ মতো লবণ, সামান্য হলুদ, কাঁচা মরিচ, ধনিয়া-জিরার গুঁড়া, কাঁচা জিরা বাটা আর সরিষার তেল বা সয়াবিন তেল মিশিয়ে ভালো করে মাখানো হয়। তারপর পর্যাপ্ত পানি দিয়ে ধিম আঁচে জ্বাল দেওয়া হয় যতক্ষণ না দানাগুলো ফুটে যায় পাশাপাশি পানিটুকুও সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। এভাবেই তৈরি হয় ক্ষুদ বিরান।

ক্ষুদ বিরান এর আসল স্বাদ পাওয়া যায় বিভিন্ন ভর্তার সঙ্গেই। তাই পিহু আয়োজন করেছে… রসুন, পেঁয়াজ আর শুকনো মরিচ ভেজে একসঙ্গে বাটা ভর্তার, শুঁটকি ভর্তাট, ডাল ভর্তার, শিম ভর্তা আর গড়াই মাছের ভর্তার। অনু পিহুর নির্দেশ অনুযায়ী টুকটাক কাজ করছে। কখনও পেঁয়াজ কুচি করে দিচ্ছে তো কখনও জিড়া বেটে দিচ্ছে। পুরো রান্নাঘর জুড়ে এইমূহূর্তে ভাজা শুকনো মরিচ, রসুনের হালকা ঝাঁঝালো গন্ধ, শুটকির গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে।
সেই সময় ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে আসলো তেজ আর নির্ঝর।
দু’জনেই একত্রে আরাম করতে বসলো সোফায়। সন্ধ্যা সাতটার পর ইলমাকে কফিশপ থেকে আনতে যেতে হবে তেজকে। এখন ঘড়িতে মাত্র সাড়ে পাঁচটা বাজে। হাতে অনেক সময় থাকায় আপাতত ইলমার কাছে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই তেজের।
তেজ নীরাকে বললো….

—”কিরে ভে*বলি ওমন ভাবে বসে কি দেখছিস?”
নীরা নাক উঁচিয়ে নিজের ঠোঁটের উপর শাহাদত আঙুলটা রেখে ইশারায় তেজকে চুপ করতে বললো। কারণ এই মূহূর্তে সিরিজের টান টান উত্তেজনা মূলক পরিস্থিতি চলছে তাই নীরা ওর আশেপাশে বাড়তি কোনো সাউন্ড চাচ্ছে না।
তখনই নির্ঝর উঠে নীরার ফোনটা স্ট্যন্ড থেকে সরিয়ে নিজের কাছে নিলো। নীরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললো….
—”ছোট ভাইয়া, এ তুমি কি করলে? কতো সুন্দর একটা সিন চলছিলো আর তুমি ফোনটা নিয়ে আমার দেখার আমেজটাই নষ্ট করে দিলে।”
নির্ঝর বললো…..

—”বেশ করেছি নিয়েছি। বাচ্চা একটা মেয়ে তুই কোথায় থালা-বাটি-কাঁদা-মাটি নিয়ে খেলা করবি তা না এডাল্ট সিরিজ দেখিস! ষ্যাহ ষ্যাহ।”
তেজও নির্ঝরের কথার তালে তাল মিলিয়ে বললো….
—”বাংলায় একটা প্রবাদ আছে জানিস না, ‘অতি সকালে পাকিলে বাল দুঃখ তা জীবনে থাকিবে চিরকাল।’ আমরা তোর বড় ভাই হয়ে তোর জীবনে সেই প্রবাদটা ফলতে দিতে পারি না।”
নীরা গাল ফুলিয়ে এক প্রকার ফোঁ*স ফোঁ*স করতে করতে বললো….
—”পিছনে লাগছো তো আবারও আমার! বড় ভাইয়াকে আসতে দাও তারপর তোমাদের কি হাল করি দেখবা।”
তেজ বললো….
—”মিথ্যে বলবি কেনো ভাইয়ার কাছে তুই আমাদের নামে?”
—”মিথ্যা? মিথ্যা বলতে যাবো কেনো? যা বলার অবশ্যই শতভাগ সত্যই বলবো।”
—”তাহলে বললি যে আমরা তোর পিছনে লেগেছি! এটা সত্য হলো কিভাবে?”
—”সত্যই তো, লাগছোই তো পিছনে?”
—”আমরা জলজ্যান্ত দু’টো হ্যন্ডসাম পুরুষ তোর থেকে মিনিমাম ২হাত দূরত্ব বজায় রেখে একেবারে সামনা-সামনি বসে আছি। পিছনে কখন লাগলাম!”
তেজের যুক্তি শুনে নীরার মুখ হা হয়ে গেলো। পরপরই নির্ঝর আর তেজ দু’জন মিলে হাই ফাইভ করলো হেসে। পরক্ষণেই নির্ঝর হাসি থামিয়ে বললো….
—”মুখ বন্ধ কর নয়তো দেখবি কোথায় থেকে কোন না তেলাপোকা উড়ে এসে ঢুকে পড়বে তোর মুখের ভিতর।”
নীরা সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিয়ে বিরবিরিয়ে বললো….
—”হ*নু*মানের দল কোথাকার।”

সেই সময় সারফারাজ ওর বুকে জড়িয়ে রাখা ঘুমন্ত নির্বাণকে ও সোফিয়াকে নিয়ে বাংলো বাড়ির মূল দরজা পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। তখুনি সেদিকে চোখ পড়লো নীরার। প্রথমে নীরার ভ্রু কিন্ঞ্চিত কুন্ঞ্চিত হলেও পরপরই ও কিছুটা থমকে গেলো। এক মুহূর্তের জন্য নীরা যেনো নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গিয়েছিলো। পরপরই হালকা কাপান্বিত স্বরে নীরা ‘নির্বাণ’ বলে উঠে দ্রুত পায়ে সারফারাজের দিকে এগিয়ে এলো।
নীরার এমন রিয়াকশনে তেজ আর নির্ঝর একসঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে মূল দরজার দিকে তাকালো। ওদের নজরেও পড়লো সারফারাজ সহ ওর কোলে থাকা ছোট একজন বাচ্চা আর একজন মর্ডান পোশাক পরিহিত অতি ফর্সা নারী। নীরার দু’চোখে অশ্রুরা চিকচিক করছে। নিজের সন্তানকে এতোদিন পর চোখে সামনে দেখে মীরার বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে উঠছে যেনো।
সারফারাজ মৃদু হেসে নির্বাণকে ওর মা নীরার দিকে এগিয়ে দিলো। নীরা নির্বাণকে কোলে নিতেই ছেলেটার ঘুম একটু ভেঙে গেলো। তেজ আর নির্ঝর বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। নির্বাণ ওর ছোট্ট গোল গোল চোখ দু’টো মেলে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে নিজের মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর হঠাৎই নির্বাণের ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক টুকরো হাসির রেখা। নির্বাণ ওর ছোট্ট হাত দু’টো এগিয়ে নীরার মুখটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আধো আধো কন্ঠে বললো…..

—“মা…মা….!”
তখুনি নীরার বুক যেন ভরে উঠলো আনন্দে। নীরা প্রায় পাগলের মতো একের পর এক চুমু দিতে লাগলো নির্বাণের গোলগাল গালে, কপালে। অতঃপর নীরা আদুরে স্বরে বললো….
—“আমার বাবু, আমার সোনা, আমার নির্বাণ…!”
নির্বাণও খুশিতে হাত-পা নাড়ছে। বারবার নিজের ছোট ছোট আঙুল দিয়ে মায়ের এমন ভাবে মুখটা টিপে টিপে দেখছে যেনো নিশ্চিত হতে চাইছে সত্যিই ওর মা সামনে দাঁড়িয়ে আছে কি না!
এমন দৃশ্য দেখে তেজ আর নির্ঝর দু’জনেই আর স্থির থাকতে পারলো না। দু’জনেই প্রায় একসাথে এগিয়ে এলো।
তেজ নীরার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো…
—“এই দে দে, আমার ভাগ্নেকে আগে আমাকে দে। আমি ওর মেজো মামা হই।”
তখুনি নির্ঝরও সঙ্গে সঙ্গে তেজের বাম হাতের উপরিঅংশে নিজের ডান হাত দ্বারা প্রেসার দিয়ে ওকে হালকা সরিয়ে বললো…

—“তেজ ভাই, সরো তো তুমি! আগে আমি নেবো আমার ভাগ্নেকে।”
তেজ ভ্রু কুঁচকে বললো…
—“আমি তোর বড় নিজ্ঝরিয়া। বড়দের কথার উপর যে কথা বলতে হয় না তা জানিস না?”
নির্ঝর গম্ভীর মুখ করে বললো…
—“আমি তো তোমার ছোট ভাই, তেজ ভাই। তাই আমার প্রতি তোমারও দয়া-মায়া থাকা উচিত। আমাকে আগে নিতে দাও আমার ভাগিনাকে।”
দু’জন প্রায় ঠেলাঠেলি শুরু করে দিলো মূহূর্তের মধ্যেই। নীরা ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে হাসছে। আর নীরার কোলে থেকেই নির্বাণ এমনটা দেখে হাত-পা নাড়িয়ে হাসছে। যেনো ভিষণ মজার কোনো সিন চলছে ওর সামনে।
এদিকে এইসব কাণ্ড ওদের সবার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে অবাক চোখে দেখছিলো অনু। রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকা পিহু ড্রয়িংরুমের ওপাশ থেকে হালকা-পাতলা শব্দ শুনতে পেয়ে এগিয়ে এলো। অনুর কাছে আসতে আসতে বললো…..
—”কে এসেছে? কিসের এতো আওয়াজ হচ্ছে ওখানে?”
অনু হাত উঠিয়ে সামনের দিকে ইশারা করলো। পিহু সেদিকে তাকাতেই পুরো দৃশ্য দেখতে পেলো। সারফারাজ গম্ভীর গলায় নীরাকে বললো….

—“এদের কাউকে এখন দিবি না তুই আমার ভাগ্নেকে, নীরা।”
তেজ নির্ঝর থেমে গিয়ে তাকালো সারফারাজের দিকে। একই স্বরে সারফারাজ আবারও বললো…..
—“দু’টোতে মিলে যে কাঁ*ম*ড়া-কাঁ*মড়ি অবস্থা তৈরি করেছে তাতে আমার ভাগ্নেকে এইমূহূর্তে ওদের দেওয়া মানে ওরা ওকে আলু ভর্তা বানিয়ে ছাড়বে।”
তেজ আর নির্ঝর একসাথে প্রায় মিনতির স্বরে বললো….
—“বড় ভাইয়া প্লিজ! এমনটা করো না। আমরা আর এমন করছি না। শান্ত থাকবো।”
তেজ নীরার দিকে তাকিয়ে বললো….
—“একবার দে না রে ওকে কোলে নিতে! কথা দিচ্ছি গুণে গুণে ১০ টা চুমু খেয়েই দিয়ে দিবো আবার। ওর গুলুমুলু গালে চুমু খাওয়ার জন্য আমার ঠোঁট কেমন হাঁস-ফাঁস করছে। বোঝ একটু….!”
সারফারাজ এবার কড়া গলায় ধমক দিলো তেজকে….
—“চুপ!”
তারপর নীরাকে বললো….

—“নীরা, বাবুকে নিয়ে রুমে যা তুই। লম্বা জার্নি হয়েছে ওর। এবার বিশ্রাম দরকার।”
নীরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। নির্বাণকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করলো সে। পরক্ষণেই সারফারাজ পিহুর দিকে তাকিয়ে বললো….
—“বউ, সোফিয়াকে গেস্টরুমে নিয়ে যাও।”
পিহু হাসিমুখে মাথা নেড়ে বললো….
—“আসুন, সোফিয়া।”
সোফিয়াকে নিয়ে পিহু গেস্টরুমের দিকে চলে গেলো।সারফারাজও আর দাঁড়ালো না। নিজের রুমে ফ্রেশ হওয়ার জন্য চলে গেলো। ড্রয়িংরুমে এখন দাঁড়িয়ে আছে শুধু তেজ, নির্ঝর আর অনু। ড্রয়িংরুম ফাঁকা হয়েছে বুঝে তেজ হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে নির্ঝরের পশ্চাৎদেশে কষিয়ে একটা লা*থি মারলো। সঙ্গে সঙ্গে নির্ঝর “আআআউউচ” বলে দু’হাতে নিজের পশ্চাৎদেশ চেপে ধরে একপ্রকার লাফিয়ে উঠলো। তেজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো….

—“শা*লা! তোর জন্য আমি নিতে পারলাম না বাবুকে!”
নির্ঝর খানিক প্রতিবাদী স্বরে বললো…
—”তুমিই তো মানলে না আমার কথা, তেজ ভাই! এখন আমার একার উপর সব দোষ বর্তাচ্ছো কেনো?”
—“চুপ শা*লা অধৈর্যের গোডাউন। ইচ্ছে করছে প্যন্ট খুলে জায়গা মতো বিচুটি পাতা ঢেলে দেই।”
নির্ঝর কয়েক কদম পিছিয়ে দুষ্ট হাসি হেসে বললো….
—”নিজের জায়গা মতো ঢালার কথা বললে নাকি তেজ ভাই? এনে দিবো বিচুটি পাতা!”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে নির্ঝরকে তাড়া করলো “তবে রে শালা শুয়া* বলে”। নির্ঝরও ছুটে একেবারে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো। ওদের দুই ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে অনু ঠোঁট চেপে নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো।

ইলমা দাঁতে দাঁত পিষে ধীর স্বরে ওর সামনে বসা পুরুষটিকে বললো….
—” কেনো এসেছো এখানে? মানা করছিলাম না আমার আশেপাশেও যেনো না আসা হয় সেই বিষয়ে?”
পুরুষ হালকা হেসে বললো….
—”দেখতে ইচ্ছে করছিলো খুব। তুমি তো জানোই খুব ভালো করে আমার মনটা বদ্দ অবাধ্য। নিজের মানাই শুনে না আর অন্য কারোরটা শুনবে কি করে!”
ইলমার রাগে যেনো শরীর তিরতির করে কাঁপছে পুরুষটির এমন গা জ্ব*লানো কথায়। ইলমা বললো…
—”এক্ষুণি চলে যাবে তুমি এখান থেকে। নয়তো ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।”
পুরুষটি চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো….
—”এক কাপ স্ট্রং ব্লাক কফি বানিয়ে এনে দাও নিজহাতে। খেয়েই চলে যাবো। প্রমীসসসস।”
ইলমা ছোট্ট করে ‘বেশ’ বলে কফি বানানোর উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলো রিসিপশনের দিকে। শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের চেহারার ধরণ সে স্বাভাবিক করলো কিছুটা। রিসিপশনের সামনে এসে দাঁড়াতেই নাহিদ কাজ করতে করতে বললো….

—”অর্ডার নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলাম আপনাকে নাকি কাস্টোমারের সাথে ঘন্টা ধরে বসে গল্প করার জন্য মিস.ইলমা!”
ইলমার এবার ইচ্ছা করছে ২জনের চুল টেনে টেনে ছিঁ*ড়তে। এক এই নাহিদা আপার আরেক ঐখানে বসা ঐ পুরুষটার। তবুও ইলমা নিজেকে সংযত করে বললো….
—”উনিই অর্ডার দিতে সময় নিচ্ছিলেন। কি কি অপশন আছে কফির আমাদের এখানে তা এক এক করে শুনলেন তাই।”
—”কি অর্ডার করলেন উনি?”
—”স্ট্রং ফ্লেভারের ব্লাক কফি।”
—”ঠিক আছে। আপনি সিন এ জমা কাপ গুলো পরিষ্কার করুন আমি কফিটা বানাচ্ছি।”
—”উনি আমার হাতে বানানো কফি খাওয়ার আবেদন করেছেন।”
নাহিদ শান্ত চোখে তাকালো ইলমার দিকে এমন কথা শুনে। পরপরই সে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে সিন রুমের দিকে যেতে যেতে বললো….

—”চটজলদি বানান।”
ইলমা তৎক্ষনাৎ কফি বানানোর কাজে মনোনিবেশ করলো। বানাতে বানাতে ওর চোখ ঘড়ির দিকে পড়লো। প্রায় ৬ টা বাজতে চলেছে। ৭টার মধ্যেই তেজের এখানে আসার কথা ইলমাকে নেওয়ার জন্য৷ ইলমা এবার হাতের গতি বাড়ালো। কিয়ৎক্ষণ পর কফি বানানো শেষে সে কফির মগটা নিয়ে আবারও গেলো সেই টেবিলের কাছে। যেখানে পুরুষটি বসেছিলো। কফির মগটা পুরুষটির দিকে এগিয়ে দিয়ে ইলমা বললো…..
—”দ্রুত শেষ করে চলে যাও এখান থেকে। আর কখনও আমার ত্রিসীমানায় যেনো তোমার ছায়াও না দেখি আমি।”
পুরুষটি কফির কাপে ১ম চুমুকটা দিলো। দৃষ্টি তার ইলমার উপরের স্থির। ২য় চুমুক দেওয়ার পর বললো….
—”আজ মার্চের ৭ তারিখ। সময় দিলাম তোমায় এই মাসটা। এরপর আর এক সেকেন্ডও পাবে না অপচয় করার জন্য।”
ইলমা ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে বললো…..

—“Your time means nothing to me.”
(বাংলা – “তোমার সময়ের কোনো দাম নেই আমার কাছে”)
পুরুষটি কফির কাপে তার শেষ চুমুকটা দিয়ে বললো…..
—“Maybe my time is nothing to you, but it’s valuable to me. And, I never asked for your opinion.”

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩

( বাংলা- “তোমার কাছে হয়তো আমার সময়ের দাম নেই, কিন্তু আমার কাছে আছে। আর, আমি তো তোমার মতামত চাই নি।” )
এই বলে পুরুষটি উঠে চলে গেলো। ইলমা পুরুষটির যাওয়ার পানে তাকিয়ে কেবল রাগে ফোঁ*স ফোঁ*স করতে শুরু করলো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪