Home না চাইলেও তুমি শুধু আমারই না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪
মাইশা জান্নাত নূরা

কফিশপের সামনে এসে বাইকের ব্রেক কষলো তেজ। অতঃপর বাইক থেকে নেমে কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই রিসিপশনে থাকা পূর্বের সেই ছেলে নাহিদ আর ইলমাকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অতি মনোযোগের সহিত কোনো কাজ করতে দেখে তেজ ওর বুকের বাঁ’পাশে হাত রেখে মুখ-চোখ হালকা কুঁচকে নিয়ে বললো….
—”কোনদিন জানি এই মেয়েকে এমন ছেলেদের আশেপাশে থাকতে দেখে তাদের সাথে কথা বলতে দেখে আমি হার্ট অ্যাটাক করে বসি! ইসস বুকের বাঁ’পাশটায় কেমন চিনচিনে ব্যথা অনুভব হচ্ছে।”
এই বলে তেজ রিসিপশনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলো। তেজের মন যেনো গেয়ে উঠলো….

❝তুমি কি জানো না!
তুমি কি বোঝ না!
তোমারি বিহনে এ মন জ্বলে….❤️‍🔥
তুমি কি জানো না!
তুমি কি বোঝনা!
তোমারি কথা এ হৃদয় বলে….🎶
ওহ যদি! বাসো! ভালো আমাকে…👉👈
তবে, কেনো থাকো দূরে দূরে…?
সহেনা যাতনা কি করি বলো না…?
যতনে রেখেছি তোমাকে কতো না (২)❞
তেজ রিসিপশনের সামনে এসে দাঁড়াতেই ইলমা ওকে দেখা মাত্র বললো….
—”২মিনিট বসুন ওখানে গিয়ে। একটু কাজ বাকি শেষ হলেই চলে যেতে পারবো।”
তেজ দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বললো….
—”কন্ট্রোল, কন্ট্রোল…!”

অতঃপর তেজ পাশেই একটা চেয়ারে গিয়ে বসলো। রিসিপশনের থেকে কাছাকাছিই রয়েছে তেজের বসার স্থানটা। সে ইচ্ছে করেই এখানে বসেছে যেনো ইলমা আর নাহিদের মধ্যে হতে থাকা সকল কথপোকথন ঠিকঠাক ভাবে সে শুনতে পারে। কিন্তু সেগুরে বালি। ইলমা আর নাহিদ এতোটাই ধীরে কথা বলছিলো যে তেজের কান পর্যন্ত কিছুই পৌঁছাচ্ছিলো না। তেজ তাই সেদিকে একটু হেলে কানের কানের কাছে এক হাত রেখে শোনার বৃথা চেষ্টা করছিলো।
কিয়ৎক্ষণ পর ইলমা এসে পাশে দাঁড়িয়ে বললো…..
—”ওভাবে বসে আছেন কেনো আপনি?”
ইলমার উপস্থিতি টের পায় নি তেজ। ইলমার কথা শোনামাত্র সে উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত স্বরে বললো….
—”আব এমনিই। কোমরের ডানপাশটাতে কেমন ব্য*থা ব্য*থা অনুভব হচ্ছিলো তাই সোজা হয়ে বসতে পারছিলাম না বাঁ’দিকে হেলে বসছিলাম।”
ইলমা ভ্রু কুঁচকে বললো….

—”তো হাতটা কোমরে না রেখে কানের কাছে কি করছিলো?”
তেজ জোরপূর্বক হেসে বললো….
—”ঐ আর কি শরীরের ব্যলেন্স ঠিক রাখার জ…!”
ইলমা তেজকে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে বাহিরের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্য হাঁটা ধরে বললো….
—”পরবর্তীতে মি*থ্যা বলার আগে আধঘন্টা একা একা প্রাক্টিস করে নিবেন। এখন আসুন। দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।”
তেজ ইলমার পিছন পিছন যেতে যেতে বিরবিরিয়ে বললো….
—”ধ্যৎ শা*লা, গুছিয়ে মি*থ্যাটাও বলতে শিখলাম না আজ পর্যন্ত। এ জীবনে তাহলে অর্জন করলাম কোন চুলের গুণ!”

নির্ঝর নীরার রুমের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে হেলে কেবল মাথাটা রুমের দিকে এনে দেখার চেষ্টা করছে নির্বাণ ঘুমিয়ে আছে নাকি জেগে। নির্ঝর দেখলো নির্বাণ ঘুমায় নি। শুয়ে শুয়েই মা-ছেলে একে-অপরের সাথে এতোদিনের জমা সুখ-দুঃখের আলাপ করছে। নীরা নির্বাণের গালে চুমু এঁকে দিয়ে বললো….
—”মাম্মাম তোমায় অনেক মিস করেছে সোনা।”
নির্বাণ ঠোঁট উল্টে বললো….
—”মাম..মাম..মিত কলে নি।”
(মাম্মাম, মিস করে নি)
—”করেছি তো সোনা। কিন্তু তোমার কাছে যাওয়ার কোনো উপায় আমার ছিলো না। তোমাকে রেখে আসার পর থেকে কোনো একটা রাত আমি ঠিকভাবে ঘুমাতে পারি নি। চোখ বুঝলেই কেবল তোমার এই মায়ায় ভরা মুখটা ভেসে উঠেছে। কি যে যন্ত্রণায় কেটেছে এই দিনগুলো…!”
নির্বাণ চোখ পিট পিট করে মায়ের বলা প্রতিটা কঠিন কথা বোঝার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে।নির্বাণ নীরার গাল জড়িয়ে ধরে বলল….

—”মাম..মাম। আমাল মাম..মাম।”
(মাম্মাম, আমার মাম্মাম)
নীরাও হেসে নির্বাণকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল। এই আবেগঘন মুহূর্তে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা নির্ঝর হঠৎ পর্দার সাথে পা পিছলে নিজের ভার সামলাতে না পেরে
‘ধামমম’ শব্দ তুলে সোজা মেঝেতে উল্টে পড়লো। নির্ঝরের পড়ে যাওয়ার শব্দে যেনো পুরো ঘর মৃদু ভাবে কেঁপে উঠলো। নির্বাণ ভ*য় পেয়ে নীরার বুকের আরো গহিনে ঢোকার চেষ্টা করলো ‘আআআ.. বয় কলে বয়…!’ (আআ, ভয় করে ভয়) বলে।
নীরা নির্বাণকে নিজের বুকের সাথে জড়ানো অবস্থাতেই উঠে বসে তাকালো দরজার দিকে। দরজার সামনে নির্ঝরকে উপুড় অবস্থায় একেবারে সোজা হয়ে পড়ে থাকতে দেখে নীরা বিছানা থেকে নেমে এসে বললো…..
—“ছোট ভাইয়া! তুমি এখানে কি করছো?”
নির্ঝর ওভাবেই মেঝেতে শুয়ে থাকা অবস্থায় গম্ভীর মুখ করে বললো….

—“আমি আসলে তোর রুমের সবকিছু ঠিক আছে কিনা আমার ভাগ্নের কোনোকিছুর প্রয়োজন আছে কিনা তা দেখতে এসেছিলাম৷”
নীরা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো…..
—“প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের খোঁজ নিতে এসেছো তাহলে মেঝেতে পড়লে কিভাবে, হুম?”
নির্ঝর উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শরীর ঝাড়তে ঝাড়তে বললো…
—“এ আর নতুন কি! দুনিয়ায় ২৪ বছরের এই জীবনে প্রাণযুক্ত প্রাণীদের থেকেই কোনো ইজ্জত পেলাম না এখন প্রাণহীন বস্তুরা আমার সাথে মীর*জাফরি করলে তার নামে কি আর মামলা ঠুঁ-কে দিতে পারবো!”
নীরা ঠোঁট চেপে হাসি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলো। নীরার কোলে থাকা ছোট্ট নির্বাণ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে নির্ঝরের দিকে। সে আঙুল তুলে বললো…..

—“তুমি পঁতা!”
(তুমি পঁচা)
নির্ঝর ভ্রু কুঁচকে বললো…..
—”নীরা, তোর ছেলে আমাকে কি বললো?”
—”পঁচা বললো।”
—”কিহহ! আমি পঁচা!”
নির্বাণ মাথা নেড়ে আবারও বললো…..
—”তুমি ধাম কলে পচচো, আমি বয় পেয়েচি, তুমি পঁতা।”
(তুমি ধাম করে পড়ছো, আমি ভয় পেয়েছি, তুমি পঁচা)।
নির্ঝর ভ্রু উঁচিয়ে বোঝার চেষ্টা করে বললো….
—”ভাগ্নের ভাষা বোঝার জন্য মনে হচ্ছে আমাকে এই বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হবে।”
নীরা নির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”সোনা বাবা, ও তোমার ছোট মামা হয়।”
নির্বাণ ওর ডান হাত মুঠো করে মুখের কাছে নিয়ে বললো….
—”ও-ও পঁতা…পঁতা..!”
নির্ঝর নির্বাণের সামনে হাত জোর করে ধরে বললো….

—”থাম বাপ আর পঁচা বলিস না তোর এই অধম মামাকে। এমনিতেই কোনো জায়গায় ইজ্জত না পেয়ে তোর মামার কষ্টের শেষ নেই এখন যদি তোর মতো পুঁচকের কাছেও ইজ্জত না পাই তাহলে আমাকে কোমরে দড়ি বেঁধে কঁচু গাছের সাথে ঝুলে গিয়ে আ*ত্ম*হ*ত্যা করতে হবে।”
নির্বাণ চোখ পিট পিট করছে। নির্ঝরের কথা সে কিছুই বুঝতে পারছে না। পরক্ষণেই নির্বাণ ‘হিহিহি’ করে হেসে উঠলো। নির্ঝর ওর মুখের সামনে হাত ভাঁজ করা অবস্থাতেই মাথা হালকা বাঁকিয়ে নির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”বিট্রিশদের দেশে বাচ্চা জন্ম দিয়ে আসলেই বিট্রিশ তৈরি করেছিস তুই নীরা। নয়তো এতোটুকু বাচ্চা আমার সব কথার মানে বুঝে কেমন হাসছে দেখ!”
নীরা হালকা হেসে বললো….

—”তোমার চেহারার অবস্থা দেখে তো আমারই হাসি আটকাচ্ছে না ছোট ভাই ওর কি দো*ষ।”
নির্ঝর উপরের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”আল্লাহ আপনি আমায় একটাই জীবন দিলেন সেই জীবনে সবই দিলেন শুধু ইজ্জতটাই দিলেন না। আপনার বান্দার প্রতি এতো অবিচার আপনি কি করে সহ্য করছেন!”
নীরা এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। নির্ঝর নিজেকে স্বাভাবিক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বুক হালকা ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে নির্বাণের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো….
—”আসো ব্রিটিশ বাচ্চা, ছোট মামার কোলে আসো।”
নির্বাণ ওর মায়ের শরীরের সাথে আরো মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে বললো….
—”না, না।”
—”না বলছো কেনো? আসো মামা!”

—”তুমি ধাম পচচো, আমি যাবো না তোমাল কাচে। না না।”
(তুমি ধাম করে পরছো, আমি যাবো না তোমার কাছে, না না।)
নির্ঝর এবার ঠোঁট উল্টে ফেললো। এই মূহূর্তে ওর যা তা করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। রুম থেকে ছুটে বেড়িয়ে গিয়ে বাগানে নিরিবিলিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে ‘ভ্যাঁ ভ্যাঁ’ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। নীরা নির্বাণকে বললো….
—”যাও সোনা বাবা, ও তোমার নির্ঝর মামা, ছোট মামা। অনেক আদর দিবে, চকলেট দিবে, চিপস দিবে।”
চকলেট আর চিপস এর কথা শোনা মাত্র নির্বাণের চোখ-মুখ খুশি চকচক করে উঠলো। নির্বাণ নিজ থেকে নিজের শরীর এগিয়ে দিলো নির্ঝরের কোলে যাওয়ার জন্য। নির্ঝর তৎক্ষণাৎ খুশি খুশি মুখ করে নির্বাণকে কোলে তুলে নিলো।
নির্বাণ নির্ঝরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো….
—”নি নি-ঝোল মামা, আমাল চক্কেত দাও।”
নির্বাণের মুখে নিজের নামের এমন বি*শ্রি ফ্লেভারে ফালুদা হয়ে যেতে শুনে ওর মুখ হা হয়ে গেলো। নীরা হাসতে হাসতে বিছানায় বসে পড়লো। নির্ঝর বললো….

—”তোকে পুরো চকলেট, চিপসের ফ্যক্টরি দিয়ে দিবো তবুও আমার নামের এমন দশা করিস না বাপ। আমার সাথে সাথে বল। নির..!”
নির্বাণ এক হাতে নির্ঝরের নাক চেপে ধরে বললো…
—”নি!”
নির্ঝর তারপর বললো…
—”শুধু নি না নির বলো বাপ নির।”
—”নি..নি..!”
—”আবার বলে নি..নি..! নির বলো নির।”
নির্বাণ এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বললো…
—”না না, নি…নি..!”
নির্ঝর ঠোঁট কাঁম*ড়ে বললো…
—”আচ্ছা এবার বাকিটা বলো, ঝর।”
—”ঝোল।”
—”আবার বলে ঝোল! আল্লাহ আমি এরে নিয়ে কই যাবো! ঝোল না সোনা বাবা, বলো ঝর, নির্ঝর নাম আমার, নির্ঝর।”
নির্বাণ খুশিতে লাফিয়ে উঠে বললো….

—”নি…নি…ঝোল মামা, নি…নি…ঝোল মামা।”
নীরার হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে এইমূহূর্তে। নির্ঝর ‘আআআ’ বলে একপ্রকার চিল্লিয়ে উঠলো আর না পেরে। নির্বাণ কিছুটা ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে নির্ঝরের নাকে কাঁম*ড়ে ধরলো। নির্বাণ সামনের পাঁটিতে নতুন কয়েকটা দাঁত গজিয়েছে। ধাঁরা*লো যথেষ্ট। তাই কাঁ*ম*ড়ে ধরা মাত্র নির্ঝর ‘আআআআ আমার নাক আআআ’ বলে চিল্লিয়ে উঠলো। নীরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে নির্বাণের কাঁম*ড় থেকে ছাড়িয়ে নিলো নির্ঝরকে। নির্ঝর ওর নাক দু’হাতে চেপে ধরে ধ*প করে মেঝেতে বসে পড়লো। নীরা নির্বাণের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো….
—”এসব কি ধরণের কাজ তোমার নির্বাণ? বলেছিলাম না ও তোমার ছোট মামা হয়? তাহলে এভাবে কাঁ*মড়ে ব্য*থা দিলে কেনো মামাকে?”
নির্বাণ ঠোঁট উল্টে ফেললো মায়ের এমন চাহুনিতে। সব কথার মানে বুঝতে না পারলেও এতোটুকু সে বুঝতে পেরেছে যে নীরা ওর উপর রেগে গিয়েছে। নির্বাণ তৎক্ষণাৎ নীরার দু’গালের উপর নিজের ছোট্ট ছোট্ট গুলুমুলু হাত দু’টো রেখে বললো…

—”মাম..মাম..লাগে না আআ, লাগে না আআ। বাবু কান্না কববে। মাম…মাম…আমাল..মাম…মাম।”
(মাম্মাম, রাগে না আআ, রাগে না আআ। বাবু কান্না করবে। মাম্মাম, আমার মাম্মাম।)
নীরা বললো…
—”দুষ্টু কাজ করেছো তুমি। রাগবো তো অবশ্যই। আদর দেখালে রাগ কমবে না।”
নির্বাণ নীরার বুকে মুখ গুঁজলো। নীরা নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো…
—”ছোট ভাইয়া! খুব বেশি ব্যথা পাইছো কি তুমি? দেখি হাতটা সরাও তো কতোটা ক্ষ*ত হইছে! ঔষধ লাগাতে হবে নয়তো ইনফেকশন হবে। দাঁতের কাঁ*মড়ে বি*ষ থাকে। হোক সেটা ছোট বাচ্চা।”
নির্ঝর ওর নাকের উপর থেকে হাত সরাতেই নীরা ‘ইসস’ বলে উঠলো। অতঃপর বললো….
—”তুমি উঠো ছোট ভাইয়া। এক্ষুণি জায়গাটা পরিষ্কার করে ঔষধ লাগাতে হবে। দাঁত বসে গিয়েছে দু’টো।”
নির্ঝর উঠে দাঁড়াতেই শুনতে পেলো নির্বাণের ফুঁপানোর শব্দ। নির্ঝর আর নীরা দু’জনেই বুঝলো নির্বাণ নীরার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হয়তো নিজের করা ভু*লটা একটু হলেও নির্বাণের ছোট্ট মন উপলব্ধি করতে পেরেছে। নির্ঝর নীরার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বললো…

—”এই ছেঁম*ড়ি, আমার ভাগ্নেকে ব*ক*লি কেনো রে তুই এভাবে? কেমন ফুঁপিয়ে কাঁদছে সোনা বাবা টা আমার। শ*য়*তা*ইন্না ছেঁম*ড়ি কোথাকার।”
নীরা বললো….
—”ওও হো হো ওও,,, যার জন্য করি চু*রি সেই কিনা বলে চো*র! বাহ ছোট ভাইয়া বাহ, তোমায় ব্য*থা দিলো জন্য ব*কলাম ওকে আর তুমি কিনা আমাকেই শা*ষাচ্ছো এখন! ভেরি ব্যড।”
—”চুপ কর। দে বাবাকে আমার কাছে দে।”
এই বলে নির্ঝর নীরার কোল থেকে নির্বাণকে একপ্রকার টেনে নিজের কোলে নিলো। নির্বাণের ফুঁপানোর মাত্রা আরো বেড়েছে। নির্ঝর নির্বাণের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো….
—”ওও আমার সোনা বাবা, কাঁদে না। মাম্মামকে ব*কে দিয়েছি। আর কাঁদে না।”
নির্বাণ ফুঁপাতে ফুঁপাতেই বললো….

—”মাম..মাম ব*কা কলেচে, নি..নি..ঝোল মামা! মাম..মাম ব*কা!”
নির্ঝর মুখ কুঁচকালো আবারও নিজের সেই ঝোলে ডুবানো নাম শুনে। মনে হলো যেনো বুকে ব্যথারা চিন চিন করে উঠলো। নির্ঝর তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো…
—”আমিও তোমার মাম্মামকে ব*কা করে দিয়েছি বাবা। আর তোমাকে কখনও ব*কবে না ও। বুঝলে!”
নির্বাণ কান্না থামিয়ে দু’হাতে নির্ঝরের গলা জড়িয়ে ধরে ওর গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বললো….
—”আমাল ভালো মামা।”
নির্ঝরের মন এতোক্ষণে যেনো খুশিতে নেচে উঠলো নির্বাণের মুখে এই ছোট্ট প্রশংসা শুনে।

তেজ ওর বাইক চালিয়ে ইলমাকে নিয়ে প্রায় অনেকটা রাস্তাই চলে এসেছে কফিশপ থেকে বাংলো বাড়ির পথ ধরে। সময় তখন সন্ধ্যা ৭টা ৩০। পূর্ণিমা পেরিয়েছে অনেকদিন। তবুও সোলার প্যনেলের মতো সূর্য থেকে ধার নেওয়া আলোর শক্তি চাঁদের ভালো থাকলো আকাশের মন খারাপ হওয়ায় মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে চাঁদ মামা। রাস্তার মাঝদিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে রেখে লম্বা খুটির মাথায় ঝুলিয়ে থাকা লাইট গুলোর তেজ খুব একটা নেই। বাংলো বাড়ির এই রাস্তাটায় সন্ধ্যার পর মানুষ ও যানের চলাচল থাকে না বললেই চলো। নিরাপদও না রাস্তাটা।
তখুনি ঘটলো এক ছোটখাটো বি*পত্তি। কড়া ভাবে ব্রেক কষে বাইক থামালো তেজ। ঘটনার আকস্মিকতায় ইলমা ঝুঁকে এসে পড়লো তেজের পিঠের উপর। দু’হাতে তেজের দু’কাঁধ শক্ত ভাবে চেপে ধরেছে ইলমা। তেজ ছোট্ট করে ‘সিট’ শব্দ উচ্চারণ করলো। ইলমা তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে পিছিয়ে বসে কিছুটা রাগ নিয়ে বললো….

—”কি সমস্যা আপনার হুম? কথা নেই বার্তা নেই এভাবে হুটহাট বাইকের ব্রেক কষেন কেনো? আপনার পিছনে একজন মেয়ে বসে আছে সেই জ্ঞান টুকুও নেই না আপনার?”
তেজ ওর নিচের ঠোঁট কাঁ*ম*ড়ে নাক হালকা সিটিয়ে বিরবিরিয়ে বললো….
—”সেড়ের উপর সোয়া সেড় হয়ে পড়েন আপনি। আপনি তো সাধারণ কোনো মেয়ে নন লা। আপনি হলেন আস্ত এক শাক*চু*ন্নি। পারতেন তো যখন তখন আমার ঘা*ড়ে দাঁত বসিয়ে শরীরের সব রক্ত শুষে খেতেন।”
পরক্ষণেই তেজ নিজেকে কন্ট্রোল করে নিয়ে বললো….
—”গাড়ির সামনের চাকা কখন যে লিক হয়েছে টের পাই নি আমি। এতোক্ষণে যখন সামনের চাকার গতি দূর্বল মনে হলো তখুনি ব্রেক কষলাম। আরেকটু দেড়ি করলে হয়তো বড় কোনো দূ*র্ঘ*টনা ঘটতো।”
ইলমা বাইকের পিছন সিট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বললো….
—”এখন কি হবে তাহলে? এই জনমানবহীন শুনশান জায়গায় আমরা তো কারোর সাহায্যও পাবো না। হেঁটে যাওয়া কি সম্ভব? বাইকটার কি হবে তখন?”
তেজ ওর পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখলো নেটওয়ার্কের বক্স দু’টোতে ক্রস চিহ্ন উঠে আছে। তেজের বিরক্তি এবার যেনো আকাশ ছুঁয়ে নিলো। তেজ ওর হাত উঁচু করে ফোনটা তুলে ধরলো নেটওয়ার্ক পাওয়ার আশায়। কিন্তু পেলো না। অতঃপর হতাশ হয়ে বললো….

—”হাঁটতেই হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই।”
—”এতো বড়, এতো ওজনের একটা বাইক নিয়ে কতোসময় হাঁটবেন আপনি?”
—”দেখি কতোটা পারি। এমন আহাম্মকপনা বিপদে এর আগে কখনও পড়তে হয় নি আমায়। আজই ১ম।”
—”হু, চলুন তাহলে।”
অতঃপর তেজ বাইকের দুই হাঁতল ধরে হাঁটতে শুরু করলো আর ইলমাও ওপাশে সমান তালে পা ফেলে ফেলে হাঁটছে। বেশ খানিকটা পথ আসার পর তেজ হাঁটা থামিয়ে বাইকের স্ট্যান্ড ফেললো। ইলমা ভ্রু উঁচিয়ে বললো….
—”ক্লান্ত লাগছে?”
—”উহুহ।”
—”তাহলে থামলেন যে?”
তেজ কিছুটা লজ্জায় পরে গেলো। পরপরই আর সামলাতে না পেরে বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুল দেখিয়ে ইলমাকে বুঝালো ওর প্রসাবের বেগ এসেছে। ইলমা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে হাত উঠিয়ে বললো…

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩ (৩)

—”যান।”
তেজ আড়ালের দিকে যেতে যেতে বললো….
—”২ মিনিট দাঁড়ান আপনি। এই যাবো এই আসবো আমি।”
ইলমা উল্টো ঘুরে দাঁড়ালো বুকের সাথে দু’হাত ভাঁজ করে। ঠিক তখুনি ওর সামনে একটা কালো গাড়ি এসে ব্রেক কষলো। ইলমা খানিক ভরকে গিয়ে দু’কদম পিছালো।

না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৪ (২)