Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৭

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৭

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৭
ইশরাত জাহান জেরিন

সকালের আলোটা আজ এলাহী বাড়ির আঙিনায় একটু বেশি উজ্জ্বল হয়ে নেমেছিল। রাতের বৃষ্টি ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে রোদ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। বড় ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কদমগাছের পাতা বাতাসে দুলছে। আজকের সকালটা আরো অন্যরকম। কারণ বহুদিন পর বাড়িতে আসছে নাহিয়ান আর ফারিহা। ড্রয়িংরুমে বসা সবাই অধীর অপেক্ষায়। নিরু বারবার জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। রুমানা কি যে খুশি। ভেবেছিল নিজের মেয়েটাকে আর বোধহয় কোনোদিন দেখতেই পারবে না৷ হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। নিরু প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
“এই তো এসেছে!”
ফটক খুলতেই নাহিয়ান গাড়ি থেকে নামল। তার পাশে ফারিহা। দুজনের মুখেই দীর্ঘদিন পর আপনজনদের কাছে ফেরার উজ্জ্বলতা। ভেতরে ঢুকতেই সবাই যেন একসাথে গলা মেলাল,

“এসেছো!”
“কেমন আছো?”
“এইদিকে আসো!”
রুমানা এগিয়ে এসে নাহিয়ানের মাথায় হাত রাখলেন।
“এতদিন পর এলি বাবা… মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে।”
নাহিয়ান হেসে বলল, “আপনাদের মিস করছিলাম তো আম্মু।”
ফারিহা সবাইকে সালাম করতেই নদী আর নিরু তাকে জড়িয়ে ধরল। “তুই তো একেবারে বদলে গেছিস!” নিরু বোনের গলা জড়িয়ে বলল। এরই মাঝে চিত্রা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। সুতির একটা শাড়ি পড়েছে। বাটিকের কাজ করা তাতে। কি যে সুন্দর লাগছে আগুন সুন্দরীকে। নাহিয়ান তাকে দেখেই মুচকি হেসে বলল,
“গুড মর্নিং, বস!” চারপাশে কেউ কেউ হেসে ফেলল।
কিন্তু চিত্রা সাথে সাথেই ভ্রু কুঁচকে বলল, “একদম এসব চলবে না।”
নাহিয়ান একটু থমকে গেল। “কেন?”
চিত্রা হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল, “আমি তোমার বস নই।” তারপর একটু এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,

“আমি তোমার ভাবী। তাই ভাবী বলেই ডাকবে।”
নাহিয়ান মাথা নত করে হাসল। “ঠিক আছে ভাবী। আদেশ মেনে নিলাম।”
ফারাজ পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “দেখলে তো! এলাহী বাড়িতে ঢুকেই রুলস বুঝে নিতে হয়।”
সবাই হেসে উঠল। কিছুক্ষণ পর সকালের নাস্তার টেবিলে সবাই একসাথে বসেছে। বড় টেবিলজুড়ে খাবারের আয়োজন৷ পরোটা, ডিমভাজি, গরুর মাংস, ফল আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। কিন্তু খাবারের চেয়ে বেশি জমেছে খুনসুটি। নিরু প্লেটে পরোটা তুলতেই বজ্র বলে উঠল, “এই যে, আমারটার দিকে হাত দিচ্ছো কেন?”
নিরু ভ্রু তুলে বলল, “তোমারটা? টেবিলের খাবারও কী তোমার নামে রেজিস্ট্রি করা?”
বজ্র গম্ভীর মুখে বলল, “হ্যাঁ। বিশেষ করে এই পরোটাটা। এটা আমার প্রিয়।”
নিরু বিন্দুমাত্র ভাব না করে পরোটাটা নিজের প্লেটে নিয়ে নিল। “তাহলে আরো একটু জেনে রাখো, ওটা তোমার বউয়েরও প্রিয়।”
টেবিলে আবার হাসির রোল উঠল। ওদিকে পিয়াস আর নিশু যেন আলাদা এক নাটক করছে। পিয়াস নিশুর প্লেটে ডিমভাজি তুলে দিতে দিতে বলল, “এইটা খাও। এটা খুব হেলদি।”

নিশু চোখ ছোট করে তাকাল। “তুমি যে কত হেলদি জিনিস খাও, সেটা দেখে তো মনে হয় না।”
পিয়াস নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল। “তুমি কি বলতে চাচ্ছো তাহলে তুমি আমার জন্য আনহেলদি?”
সবাই গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল। রুমানা লজ্জায় খাবার আনার অযুহাতে রান্না ঘরে চলে গেলেন। ছেলে গুলোর মুখের ভাষা বুঝি আর ঠিক হবে না। অভ্র চুপচাপ খাচ্ছিল, কিন্তু আয়েশা তার প্লেটে বাড়তি ফল দিতে যেতেই সে বলল,
“এইসব কেন?”
আয়েশা শান্ত গলায় বলল, “তুমি ঠিকমতো ফল খাও না। তাই।”
অভ্র মৃদু হেসে বলল, “আমার এত চিন্তা করার জন্য আই লাভ ইউ।”
আয়েশা চোখ পাকিয়ে বলল, “ইশ ওইসব রুমে গিয়ে বলবে।” অভ্র মাথা নিচু করে হেসে ফেলল।
টেবিলের এক কোণে বসে চিত্রা আর ফারাজ এই দৃশ্য দেখছিল। চিত্রার চোখে অদ্ভুত এক শান্তি।
ফারাজ ধীরে ধীরে বলল, “দেখছো? এই বাড়িটা আবার হাসতে শিখেছে।”
চিত্রা নরম গলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ… কারণ কালোরাত্রি শেষ।”

সকালের নাস্তার টেবিলের সেই হাসি-খুনসুটি ধীরে ধীরে একটু থিতিয়ে এসেছে। তবু এলাহী বাড়ির ডাইনিংরুমে এখনও উষ্ণতার কোমল আবহ ভাসছে। টেবিলের মাঝখানে বসে আছে চিত্রা। তিন মাসের এক অদৃশ্য স্পন্দন এখন তার শরীরের ভেতর নিঃশব্দে বেড়ে উঠছে। দিনকে দিন এই মেয়ের লাবণ্য আরো বেড়ে যাচ্ছে। চিত্রার একটু পর পর খিদে পায়। তাই খাবার আর তার মধ্যে এখন ভালো সম্পর্ক হয়ে উঠেছে। এইতো সকালেই নাস্তা করেছিল যদিও সামান্য। এখন আবার বসেছে। চিত্রা প্লেটে রাখা পরোটার ছোট্ট একটা টুকরো নিতেই ফারাজ হঠাৎ বলল,
“এত শুকনো করে খাচ্ছো কেন?”
চিত্রা তাকাল তার দিকে।

“কী হলো?” ফারাজ ইতিমধ্যেই হাত বাড়িয়ে তার প্লেটের পাশে রাখা দইয়ের বাটি টেনে নিয়ে পরোটার উপর একটু দই দিয়ে দিল। “এভাবে খাও। মনে নেই বজ্র বলেছে , বেশি শুকনো খাবার খেতে না।”
চিত্রা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। “আপনি তো বেশ মন দিয়ে সব শুনেছেন।”
ফারাজ গম্ভীর মুখে বলল, “শোনারই কথা।”
পাশ থেকে যাওয়ার সময় অভ্র তা দেখে মুচকি হেসে বলল, “ভাই, আপনি তো একেবারে পার্সোনাল নিউট্রিশনিস্ট হয়ে গেছেন।”
পিয়াস হেসে যোগ করল, “আর আমরা ভাবছিলাম ভাই শুধু ভয় দেখাতে জানে।”
ফারাজ ঠাণ্ডা চোখে তাকাল তাদের দিকে। “তোরা যাবি এখান থেকে।”
টেবিলে আবার হাসি উঠল। চিত্রা তখন ধীরে ধীরে খাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ তার কপালে একটু ভাঁজ পড়ল।
ফারাজ সাথে সাথে খেয়াল করল। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
চিত্রা মাথা একটু নেড়ে বলল, “না… কিছু না। একটু মাথা ঘুরল।” কথাটা শেষ হতে না হতেই ফারাজের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ চেয়ার থেকে একটু এগিয়ে এসে বলল, “চিত্রা, দাঁড়িও না।”
তার হাত আলতো করে চিত্রার কাঁধে গিয়ে ঠেকল।

“এইভাবে হুট করে উঠবে না। ধীরে ওঠো।”
চিত্রা হেসে বলল, “আপনি এমন আচরণ করছেন যেন আমি খুব অসুস্থ।”
” জানি তুমি অসুস্থ না।”
সে ধীরে ধীরে বলল, “কিন্তু তুমি এখন একাও তো নও।”
চিত্রার চোখ মুহূর্তে নরম হয়ে এলো। ফারাজ টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি তুলে তার হাতে দিল। “আগে এটা খাও।”
চিত্রা পানি খেল। ফারাজ তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পাশ থেকে নিরু মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল বজ্রকে, “দেখছো? এই মানুষটাই একসময় পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে রাখত।”
বজ্র হেসে বলল, “ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়।”
ফারাজ ধীরে ধীরে চিত্রার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে বলল, “চলো, একটু বারান্দায় বসবে?”
চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল।

“এখন?”
“হ্যাঁ। সকালবেলার হাওয়া ভালো। আর তুমি একটু হাঁটলেও ভালো লাগবে।”
চিত্রা মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল। ফারাজ তার হাতটা আলতো করে ধরে রাখল। হঠাৎ চিত্রা বলল, “সবাইকে রেখে গেলে ওরা কি ভাববে? এভাবে সবার মাঝ থেকে উঠা যায়?”
“আরে বউ ওরা সব ছোটলোক। ছোটলোকদের যত এড়িয়ে চলবে ততই মঙ্গল। তুমি কি যাবে? নাকি তোমার সতিন জমেলাকে নিয়ে যাবো।”
হঠাৎ জমেলা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে বলল,”হেন্ডু বয় আইএম খামিং।”
তাকে দেখামাত্র ফারাজ আস্তে করে চিত্রার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,”এটা কী আসলেই সুস্থ মানুষ?”
“এমনিতে তো সুস্থই। মাঝে মাঝে কালুরবাপের কথা মনে পড়লে মাথার দশ বারোটা তার একটু লুস হয়ে যায়।”
“বউ চলো তো। আমি সকাল সকাল বুড়ির খপ্পরে পড়তে চাই না।”
খাওয়া শেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে বারান্দায় চলে গেল চিত্রা আর ফারাজ। বারান্দায় এসে চিত্রা বসতেই ফারাজ পাশে দাঁড়িয়ে রইল। নরম রোদ এসে পড়েছে তার মুখে।ফারাজ নিচু হয়ে ধীরে বলল,

“ক্লান্ত লাগছে?”
চিত্রা মাথা নেড়ে বলল, “না… শুধু একটু অদ্ভুত লাগছে।”
“কেন?”
চিত্রা খুব আস্তে বলল, “ভাবতে পারছেন? আমাদের জীবনে সত্যিই কেউ আসছে…”
ফারাজ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চিত্রার হাতটা নিজের দুহাতে ঢেকে বলল,
“হ্যাঁ। আর তাই আমি চাই না তোমার কোনো কষ্ট হোক।”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “তুমি তো এমনিতেই আমাকে খুব সামলে রাখো।”
ফারাজ একটু ঝুঁকে তার কপালে খুব আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। “এখন থেকে আরও বেশি রাখব।”
চিত্রা আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসে আছে। হাতে একটা বই নিয়েছে। তবে পড়ছে না। অনেকক্ষণ ধরেই কেবল শুধু পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে। এই কয়েকদিনে তার চলাফেরা, বসা সবকিছুতেই একটু ধীরতা এসে গেছে। অভ্র একটু নিচে ডেকেছিল ফারাজকে। সে চিত্রাকে রুমে রেখে নিচে গিয়েছে। চিত্রা একটু বইয়ের দিকে তাকায় আবার একটু পুকুরের দিকে। ঠিক তখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ফারাজ। চিত্রাকে দেখে সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

“এখনও বিশ্রাম করোনি?”
চিত্রা মুচকি হেসে বলল,
“করছি তো। বসে আছি।”
ফারাজ একটু ভ্রু তুলল।
“বইটা পড়ছো?”
চিত্রা বইয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
“না… শুধু ধরে আছি।”
ফারাজ হাসল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চিত্রা অবাক হয়ে বলল,
“এই কী করছেন?”
ফারাজ কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে চিত্রার পেটের দিকে। যেখানে এখনো খুব একটা পরিবর্তন চোখে পড়ে না। ফারাজ খুব আস্তে হাত রাখল চিত্রার পেটের উপর। চিত্রা একটু লজ্জা মিশ্রিত হাসিতে বলল, “ফারাজ… কী করছেন?”
ফারাজ মাথা একটু ঝুঁকিয়ে নরম স্বরে বলল,
“চুপ… কথা বলছি।” সে খুব আলতো করে চিত্রার পেটের উপর একটা চুমু দিল। চিত্রা বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল। ফারাজ মৃদু গলায় বলল,

“শোনো পাপার ছোট্ট জানটা… আমি তোমার পাপা।”
ফারাজ আবার আস্তে বলল, “তুমি এখন খুব ছোট, তাই না? কিন্তু তবু জানো… আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
সে একটু থামল, তারপর হাসল। “বিশেষ করে আমি।”
চিত্রা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারাজ আবার পেটের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার আম্মু যেন ভুলেও তোমার নামে পাপার কাছে অভিযোগ না দেয়। দেখো না তোমার আম্মুর শরীরের কি কন্ডিশন? তুমি না পাপার লক্ষী? মাকে একটু কষ্ট দিও না। মাকে কষ্ট দিলে পাপার বুকের বাঁপাশে অঝোরে আঘাত লাগে। বুঝলে তো? আমি জানি আমার সন্তান কতখানি লক্ষী। মাকে সে মোটেও বিরক্ত করবে না।”
চিত্রা এবার হেসে ফেলল। “আপনি কি সত্যিই ভাবছেন সে এখনই শুনতে পাচ্ছে?”
ফারাজ মাথা তুলে তাকাল।“পাচ্ছে।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৬

তারপর আবার নরম গলায় বলল, “কারণ সে আমাদেরই অংশ।”
চিত্রার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। ফারাজ ধীরে ধীরে উঠে এসে তার পাশে বসল। চিত্রা ফিসফিস করে বলল, “আপনি এত ভালো বাবা হবেন ভাবিনি।”
ফারাজ মৃদু হেসে তার কপালে চুমু খেয়ে বলল,” “আমি জানি না আমি কেমন বাবা হবো। কিন্তু একটা কথা জানি… তোমাদের দুজনকে আমি পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি আগলে রাখব।” চিত্রা ধীরে ধীরে মাথা রেখে দিল ফারাজের কাঁধে। এরচেয়ে সুখী হয়তো সে হতে চায় না।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৮