না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩ (২)
মাইশা জান্নাত নূরা
নির্ঝর ফিসফিসিয়ে তেজকে বললো….
—”ভাই এবার কি করবে?”
তেজ কিছু বলার আগেই নিশা কান্নারত স্বরে বললো….
—”আমি তো তোমাকে ভালোবাসি তেজ, আমার ভালোবাসার মূল্য তুমি এভাবে দিচ্ছো?”
তেজ দাঁতে দাঁত পি*ষে বললো….
—”এই চুপপ, তোর ঐ মুখে আমাকে ভালোবাসার কথা আর একটাবার বললে তোর ভালোবাসাকে আমি জু*তো বানিয়ে আমার পায়ে পরে টয়লেটে যাওয়া-আসা করবো।”
নিশা শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে বললো….
—”আমাকে একটু মায়া করে চাইলে তোমার কি বড্ড ক্ষ*তি হয়ে যেতো?”
—”হুম হতো। তোদের মতো ছুঁ*চো স্বভাবের মেয়েকে আমি পছন্দ করি নি কখনও।”
—”আমি তো ১০ ঘরের জল ঘুঁ*টে খাওয়া মেয়ে নই। ছুঁ*চো হলে তোমার জন্যই হয়েছিলাম। তোমাকে পাওয়ার লোভ আমায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছিলো। ঘুরঘুর শুধু তোমাী পিছনেই করেছি। এটাই কি আমার দো*ষ ছিলো?”
—”প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে আত্মসম্মানবোধটা থাকা উচিত। যেখান থেকে একবার ‘না’ শব্দ শোনা হয়, প্রত্যাখান পাওয়া যায় সেখানে আর ফিরেও না তাকানোর মতো প্রখর আত্মসম্মানবোধ যে মানুষের মাঝে থাকে না সেই মানুষকে এটলিস্ট আমি তেজ ভালোবাসার কথা চিন্তাও করতে পারি না।”
নিশা ঢোক গিললো একবার। শরীরের উপর ঘুরতে থাকা পোকাগুলোকে নিয়ে এখন আর কোনো ভ*য়, কোনো গা গুলিয়ে উঠার মতো অনুভূতি হচ্ছে না নিশার। ওর চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে বললো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। নিশা বললো….
—”এই মূহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি তোমার জন্য একটাই চাওয়া চাইছি খুব করে। জানতে চাও কি সেই চাওয়া?”
তেজ কিছু বললো না। বির*ক্তিতে কুঁ*চকে এলো ওর কপাল। নিশা আবারও বললো….
—”চাওয়া না চাওয়ার হিসাব আর না করে বলেই ফেলি, ‘আমি চাই, তোমার জীবনেও কখনও না কখনও ভালোবাসা আসুক তেজ। সত্যিকারের ভালোবাসা। এমন একজন মানুষকে তুমি ভালোবাসো যাকে ভালোবাসার পর প্রতি পদে পদে তুমি ফিল করবে ভালোবাসার মাঝে ইগো, লজ্জা, সম্মান এসবকে আসতে দিলে ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে ফেলতে হবে। আমি যতোটা না বেহায়ার মতো তোমায় চেয়ে তোমার চোখে ছ্য*চ*ড়া হয়েছি তার থেকেও বেশি বেহায়াপনা যেনো তোমায় করতে হয়, তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়ার চেষ্টায় সর্বোচ্চ ছ্য*চড়া হওয়ার পদবীটা যেনো তুমিই পাও তেজ, তুমিই পাও।”
তেজ হেসে বললো….
—”শ*কু*নের অভিশাপে মাঠে গরু ম*রে থাকে না রে।”
নিশা হাসলো। কেনো যেনো মনে হলো নিশার এই হাসির মাঝে ওর মধ্যে চলতে থাকা য*ন্ত্র*ণারা মাথা চাড়া দিয়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর নিশা বললো….
—”কি চাও তুমি? ছেড়ে দেই তোমার পিছু?”
—”এটা নতুন বুঝতেছিস?”
—”বেশ, দিচ্ছি ছেড়ে। তোমাকে পাওয়ার জন্য তো কম বে*হায়াপনা করলাম না। এবার আমিও ক্লান্ত বোধ করছি। তাই আজকের পর আমার এই মুখ তোমাকে আর কখনও দেখাবো না বলেই ঠিক করলাম।”
তেজ ভ্রু উঁচিয়ে বললো….
—”বিশ্বাস করবো কিভাবে?”
নিশা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো….
—”সঠিক প্রশ্ন করেছো। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তোমার মুখ থেকে এমন প্রশ্নই আশা করা যায়। আগামীকাল এসো এয়ারপোর্টে। নিজ চোখেই না হয় আমাকে তোমার জীবন ও বাংলাদেশ থেকে চিরতরের জন্য চলে যেতে দেখতে পারবে। তখন আশা করছি বিশ্বাস হবে তোমার।”
—”নাটক করছিস নাকি আমার থেকে সিমপ্যথি পাওয়ার আশায়?”
—”বেহায়াপনা করে ভালোবাসাই পেলাম না আর এই শেষ সময়ে এসে সিমপ্যথি পাওয়ার মতো আশা করাটা যে আমার জন্য মূর্খতার কাজ হবে তা আমি জানি ভালো ভাবেই।”
—”হুম, বুদ্ধির উদয় হয়েছে তবে।”
—”পরিস্থিতি মানুষকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে সাহায্য করে তেজ।”
তেজ নিশার কথার পিঠে ওকে কিছু না বলে নির্ঝরকে বললো….
—”ওর শরীরের সব বাঁধন খুলে দে।”
নির্ঝর তাই করলো। নিশা উঠে বসে শরীরের সাথে লেগে থাকা গুটিকয়েক তেলাপোকাগুলো হাত দিয়েই ঝেড়ে ঝেড়ে নিচে ফেলে দিতে শুরু করলো। তেজ বললো…..
—“আজ তোর এই অবস্থার জন্য একমাত্র তুই দায়ী এটা মনে রাখিস। তাই শেষ বারের মতো বলছি, যদি তোর ভিতর নূন্যতম লজ্জাবোধ থাকে তাহলে যে কথা আমায় দিয়েছিস সেই কথা তুই রাখবি। এই ভ*য়টা তোর মনে আজীবন গেঁ*থে থাকবে। নির্ঝর চল এখান থেকে। অনেক সময় নষ্ট হলো।”
অতঃপর ওরা দু’জনে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। নিশা ওদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টিতে। তেজ ও নির্ঝর করিডোর পেরিয়ে মূল দরজা ঠেলে বাইরে চলে এলো। রিসোর্টের বাহিরটা আগের মতোই শান্ত, নিরিবিলি রূপ নিয়ে আছে। তেজ বাইকে উঠে বসলো। নির্ঝর পিছনের সিটে বসে বললো…
—“ভাই, ঐ মেয়েকে কি সত্যিই বিশ্বাস করা যায় বলে মনে হচ্ছে তোমার?”
—”যে ইমোশনাল সব ডায়লগ ছাড়লো একের পর এক মনে তো হচ্ছে ছ্য*কটা একেবারে জায়গা মতো গিয়েই লেগেছে।”
—”যদি আচমকা উদয় হয়ে পা*ল্টা প্রতি*শোধ নেওয়ার মতো কিছু করে তখন?”
তেজ বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট করতে করতে শান্ত স্বরে বললো….
—”দেখা যাক কি হয়।”
নির্ঝর আর কিছু বললো না।
এয়ারপোর্টের আগমন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সারফারাজ। চারপাশে শত-শত মানুষের ভিড়। ট্রলি ব্যাগ ঠেলতে ঠেলতে একের পর এক যাত্রীরা বেরিয়ে আসছে কাঁচের স্বয়ংক্রিয় দরজা পেরিয়ে। কারও হাতে ফুল, কারও আবার প্রিয় মানুষটিকে দেখার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। চোখের তৃষ্ণা। কেউ প্রিয় মানুষের দেখা পাওয়া মাত্রই ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরছে, কেউবা আনন্দে কেঁদেই ফেলছে।
সারফারাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই কিন্তু ওর চোখ দু’টো বারবার সেই দরজার দিকেই ছুটে যাচ্ছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস কাজ করছে এইমূহূর্তে সারফারাজের। আজ সে প্রথমবারের মতো নিজের ভাগ্নেকে সামনে থেকে দেখবে। নিজের একমাত্র ছোট বোনের সন্তানকে সে।
কেমন হবে মুহূর্তটা? ছোট্ট সেই শিশুটাকে কোলে তুলে নিলে কেমন লাগবে? সেই ভাবতেই অদ্ভুত এক শিহরণ দোলা দিয়ে যাচ্ছে সারফারাজের ভিতরটাতে। ঠিক তখনই দূর থেকে সারফারাজের চোখে পড়লো প্রায় পঁচিশ বছরের মতো বয়সী এক মেয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। মেয়েটির কোলে একটা ফুটফুটে ছেলে বাচ্চা আছে। বাচ্চাটার গোল টমেটোর মতো ফুলো ফুলো গাল, হালকা কুঁকড়ানো চুল, বড় বড় কৌতূহলী চোখে সে দেখছে নিজের চারপাশের সবকিছু। বাচ্চাটির পরণের রয়েছে সফট হালকা হলুদ ও লালের কম্বিনেশনে তৈরি ফুল হাতা গেন্ঞ্জি ও ফুল প্যন্ট। পায়ে সফট সু। বাম হাতে একটা ঘড়ি পরা। গুলু-মুলু দুই হাত দিয়ে ধরে আছে একটা কালো সানগ্লাস।
সারফারাজ এক নজর দেখেই মেয়েটিকে চিনে ফেলেছে।
নীরা আগেই ছবি পাঠিয়েছিলো ওর কেয়ারটেকারের। মূলত এই মেয়েটির কাছেই নীরা ওর ছেলে নির্বাণকে রেখে কানাডা থেকে বাংলাদেশে এসেছিলো। সারফারাজের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেনো করে উঠলো। প্রশ্ন জাগলো, ‘এই আমার ভাগ্নে নির্বাণ?’
সারফারাজ অজান্তেই কয়েক কদম এগিয়ে গেলো তাদের দিকে। মেয়েটিও সারফারাজকে দেখে থেমে দাঁড়ালো। চিনতে পারার সুবিধার্থে মেয়েটি বিনয়ের সাথে বললো…
—“আপনিই সারফারাজ স্যার?”
সারফারাজের চোখ তখন আর মেয়েটির দিকে পড়ছে না।ওর দৃষ্টি আটকে আছে শিশুটার মুখশ্রীপানে। নির্বাণও কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে সারফারাজের দিকে। যেনো অপরিচিত এই মানুষটাকে দেখে সে বোঝার চেষ্টা করছে, ‘কে উনি?’
সারফারাজ নির্বাণের দিকে ধীরে হাত বাড়িয়ে বললো….
—“নির্বাণ?”
মেয়েটা মৃদু হেসে বললো….
—“জ্বি স্যার। ও-ই নির্বাণ, আপনার ভাগ্নে।”
পরমুহূর্তেই মেয়েটি আলতো করে নির্বাণকে সারফারাজের দিকে এগিয়ে দিলো। সারফারাজ দুই হাতে তুলে নিলো ছোট্ট নির্বাণকে নিজের কোলে। নির্বাণের দেড় বছরের নরম শরীরটা সারফারাজের বুকের সাথে লাগতেই ওর ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি ঢেউ খেললো। এতোদিন পর যেনো নিজেরই একটা অংশকে ছুঁয়ে দেখছে সারফারাজ।
নির্বাণ প্রথমে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সারফারাজের মুখের দিকে। তারপর ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে সারফারাজের খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো ছুঁয়ে দিলো। সারফারাজ হেসে ফেললো। চোখের কোণে অজান্তেই চিকচিক করে উঠলো খুশির অশ্রুরা। সারফারাজ মৃদু গলায় বললো…..
—“আমি তোমার মামা জানবাচ্চা, সারফারাজ মামা।”
নির্বাণ কিছুই বুঝলো না অবশ্য। কিন্তু ওর ছোট্ট মুখে ফুটে উঠলো এক টুকরো হাসির রেখা। কি নিষ্পাপ আর উজ্জ্বলই না লাগছে সারফারাজের কাছে নির্বাণের মুখটা! নির্বাণের এই হাসিটা দেখে সারফারাজের মনে হলো….
“এই দুনিয়ায় এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়তো আর কিছুই নেই।”
বাংলো বাড়ির মেইন গেইট পেরিয়ে বাইক নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো তেজ ও নির্ঝর। বাইক থামাতেই নির্ঝর সিটের উপর দু’হাত রেখে ভর দিয়ে পিছন দিকে একপ্রকার লাফিয়ে নামলো। তেজ বাইকটা পার্কিং-এ রাখার জন্য চলে গেলো। নির্ঝর ওর প্যন্টের দু’পকেটে হাত গুঁ*জে শিশ বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যাচ্ছিলো বাড়ির ভিতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। খানিক এগোতেই নির্ঝরের চোখ পড়লো বাম পার্শের বাগানের দিকে। শরীরে ভালো ভাবে ওড়না জড়ানো অবস্থায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে সেখানের বারান্দা মতো জায়গায়। নির্ঝর কয়েক কদম সেদিকে ফেলতেই বুঝতে পারলো সেখানে অনু দাঁড়িয়ে আছে। নির্ঝর এবার একটু আশেপাশে চোখ বুলালো। কেউ নেই। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে নির্ঝর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো অনুর কাছে।
ঠিক তখুনি অনু পিছন ঘুরে নির্ঝরের দিকে না তাকিয়েই বললো….
—”কি চাই এখানে?”
নির্ঝর কিছুটা থতমত খেয়ে গেলো অনুর প্রশ্নে। বিরবিরিয়ে বললো….
—”এই মেয়ের কি সামনে দু’চোখ থাকার পাশাপাশি পিছনেও চোখ আছে নাকি! নয়তো না তাকিয়েই বুঝলো কিভাবে আমার উপস্থিতি!”
—”আপনার শরীর থেকে ভেসে আসা গন্ধেই আপনার উপস্থিতি টের পেয়েছি। এর জন্য পেছনেও চোখ থাকা জরুরি নয়।”
নির্ঝরের মুখ হা হয়ে গেলো অনুর কথায়। পরপরই সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো….
—”আপনি মনের কথা পড়তে পারেন কিভাবে?”
—”আপনার মন এতো জোড়ে জোড়ে কথা বলছিলো যে আমার কান তার শোনার দায়িত্ব পালন করা থেকে নিজেকে আটকে রাখতে পারে নি।”
নির্ঝর নীরার হাতের বাম পাশে এসে দাঁড়ালো। রেলিং এর সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দৃষ্টি স্থির করলো অনুর মুখশ্রী পানে। অতঃপর বললো….
—”একা একা কি করছেন এখানে?”
—”পৃথিবীতে আসার সময় কি আমার সঙ্গ কেউ দিয়েছিলো নাকি যাওয়ার সময় দিবে? আমার কবরের ভাগ কেউ নিবে?”
নির্ঝরের মুখের রং বদলে গেলো অনুর সিরিয়াস মুডের সিরিয়াস প্রশ্ন শুনে। নির্ঝর বললো….
—”আমি তো এমনেই প্রশ্ন করলাম এতো সিরিয়াস হয়ে উত্তর দেওয়ার কিছু ছিলো না।”
—”জীবনটাকে গুরুত্বহীন ভাবতে ভাবতে জীবন আমায় এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে এখন সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়।”
নির্ঝর কথার মোড় ঘুরাতে বললো…..
—”আপনার শখ কি?”
—”একবার আমার গ্রামে যাওয়া। আমার জন্মদাত্রী মা’টা কি ক*বরে ঠাই পেয়েছিলো তা জানা। যদি পেয়ে থাকে তাহলে তার কবরটাকে জড়িয়ে ধরে খুব করে কাঁদার শখ আমার। যারা সেই রাতে আমার মা’কে নির্ম*ম ভাবে লাঠির আ*ঘা*তে আ*ঘা*তে মে*রে ফেলেছিলো তাঁদের এক এক করে খুঁজে বের করে কলিজা চিঁ*ড়ে কু*ত্তা*কে খাওয়ানোর শখ আমার।”
অনুর প্রথম কয়েকটা শখের কথা শুনে নির্ঝরের মনে বিষাদের মেঘেরা এসে ভির জমালেও পরমূহূর্তেই পরিশোধাত্মক শখের কথা শুনে ওর সর্বশরীরের লোপকূপগুলো শিউরে উঠেছে। নির্ঝর একবার ঢো*ক গি*লে বললো…..
—”যদি আপনার ১ম শখ গুলো আমি পূরণ করার দায়িত্ব নেই তাহলে বিনিময়ে আপনি আমায় কি দিবেন?”
অনু নির্ঝরের দিকে অন্যরকম চোখে তাকালো। নির্ঝর অনুর চোখের ভাষা পড়তে ব্যর্থ হলো। না রাগ, না ক্ষো*ভ, না দুঃখ! কেমনই যেনো লাগছে অনুর এই দৃষ্টি নির্ঝরের কাছে। অনু বললো…..
—”বিনিময় লাগবে আপনার?”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক জবাব দিয়ে বললো….
—”না না, কিচ্ছু লাগবে না আমার। ফ্রী-তেই পূরণ করবো আমি আপনার শখ।”
অনু ওর দৃষ্টি সরিয়ে নিলো নির্ঝরের উপর থেকে। অতঃপর বললো….
—”কেবল ১ম শখগুলোই কেনো পূরণ করার দায়িত্ব নিবেন? শেষ শখটা কেনো নয়?”
—”ঐ শখ পূরণ করার মানে তো খু*ন করা। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। আর সেটা তো অপরাধ।”
—”বিষে বিষে মিলে গেলে বিষের ক্ষয় হয়। তাহলে কেউ আমার সাথে অপরাধ করলে সেই অপরাধীকে আমি নিজে শা*স্তি দিলে তা অপরাধ হয়ে যাবে কেনো? এ কেমন আইন?এমন আইন সবাই মানলে আমার মা কি আজ জীবিত থাকতেন না নির্ঝর সাহেব?”
নির্ঝরের কাছে এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। অনু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো….
—”উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না তাই তো? পাওয়ার কথাও না।”
এই বলে অনু স্থান ত্যগ করতে অগ্রসর হলো বাড়ির ভিতরে যাওয়ার রাস্তা পানে।
কফিশপে আজ কাস্টমাররা যেনো মেলা জমিয়ে ছিলো। ২টো মিনিট স্থির হয়ে বসার উপায় মিলে না ইলমার। একটার পর একটা কাজ ধরিয়ে দিয়েছে ওকে নাহিদ ছেলেটা। যার আন্ডারে ইলমাকে কাজ করতে হয়। যাকে ইলমা খা*রুশ উপাধি দিয়েছিলো ১ম দিনেই।
এখন বিকেলের শেষ সময়। একটু পর সন্ধ্যা নামবে বলে। ইলমা নাহিদের পাশে দাঁড়িয়ে সারাদিনের হিসাব মিলাতে ওকে সহযোগীতা করছিলো। সেইসময় তেজের বন্ধু এই কফিশপের ওনার জাকির ভিতরে প্রবেশ করলেন। জাকির এসে রিসিপশনের সামনে দাঁড়াতেই নাহিদ তাকে সালাম দিলো। অতঃপর ওরা একে-অপরের কুশল বিনিময় করলো।
ইলমা নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে আঁড়চোখে দেখছে ওদের। জাকির ইলমাকে উদ্দেশ্য করে বললো…..
—”কি খবর ইলমা এখন সব ঠিকঠাক তো? নিয়মিত কাজে আসা হবে নাকি আবারও অনিয়মিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে তোমার, হুম?”
ইলমা লজ্জা জনক হাসি হেসে বললো….
—”হ্যা স্যার, আলহামদুলিল্লাহ সব ঠিকঠাক আছে এখন। চেষ্টা থাকবে আর অনিয়মিত না হওয়ার।”
—”স্যার ডাক শোনার মতো ওতো বড় যোগ্যতা অর্জন আমি করি নি ইলমা। নাহিদের মতো তুমিও আমায় জাকির ভাই বলেই ডাকতে পারো।”
—”ঠিক আছে জাকির ভাই।”
—”তো আজকের দিন কেমন কাটলো তোমাদের?”
নাহিদ সংক্ষিপ্ত ভাবে বললো ‘ভালো ছিলো ভাই। বসবেন আপনি?’
জাকির বললো….
—”না থাক, আজ আর না বসি। সকাল থেকেই শরীরটা কেমন ম্যজম্যজ করছিলো। তাই সারাদিন বের হতে পারি নি বাসা থেকে৷ এখন একটু ভালো অনুভব হওয়ায় বের হলাম। বাকি রেস্টুরেন্ট গুলোতেও একটু যাবো ভাবছি।”
—”আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, সাবধানে যাইয়েন। নিজের খেয়াল রাখবেন।”
জাকিরও আচ্ছা বলে কফিশপ থেকে বেড়িয়ে গেলো। ইলমা বিরবিরিয়ে বললো….
—”কেমন খারু*শের খা*রুশ এই ছেঁ*মড়া। কফিশপের ওনার আসলো অথচ একটা কফির অফার পর্যন্ত করলো না। একবার কি বসতে বললো তাও নিজের খা*রুশ মার্কা স্টাইলে এতেই হয়ে গেলো!”
নাহিদ বললো….
—”মিস.ইলমা আপনার বিরবিরানো হয়ে গেলে ১০ মিনিট হলো টেবিল নাম্বার ১৩ তে বসা কাস্টমারের কাছে যান এবার। তার কি প্রয়োজন দেখুন।”
ইলমা নাক-মুখ কুঁ*চকে ‘হুম যাচ্ছি’ বলে এগিয়ে গেলো টেবিল নাম্বার ‘১৩’ এর দিকে। সেখানে এসে দাঁড়াতেই একজন সুদর্শন ব্লাক কোর্ট-প্যন্ট পড়ুয়া ২৮-২৯ বছর বয়সী এক পুরুষকে নজরে পড়লো ইলমার। পুরুষটির উদ্দেশ্যে ইলমা বললো….
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ৩৩
—”অর্ডার প্লিজ স্যার।”
পুরুষটি ইলমার দিকে তাকাতেই ইলমা কিছুটা অবাক হলো। চোয়াল শক্ত করে ধীর স্বরে বললো….
—”তুমি! তুমি এখানে কেনো এসেছো?”
