আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৪
অরাত্রিকা রহমান
দেড় মাস পর~
গত এক সপ্তাহ ধরে রহমান বাড়িতে একটা উৎসব মুখর পরিবেশ এলাকার সবার নজর কেড়েছে। কানাঘুষোতেই গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে- রহমান বাড়ির ছোট মেয়ের আজ বাদে কাল বিয়ে। সোরায়া বিয়ে টা চট্টগ্রামে নিজের পৈত্রিক বসতিতেই করবে ইচ্ছে প্রকাশ করায় সেই ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়ে শেষমেশ সব আয়োজন সেখানেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গত সপ্তাহেই ঢাকা থেকে গোটা চৌধুরী পরিবার চট্টগ্রামে এসে এঠেছে। ছোট মেয়ের বিয়ে বলে কথা তাদের উপস্থিতি তো আবশ্যক। একদিকে বোনের বিয়ের জন্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম চলে আসা নিয়ে সব চেয়ে বেশি খুশি ছিল মিরা। আর অন্য দিকে এই বিষয়ে সবচেয়ে অভক্তি দেখিয়েছে রায়ান। সে চায় নি মিরা তার শরীরের ওমন অবস্থায় ঢাকা টু চট্টগ্রাম এতো লম্বা একটা জার্নি করুক। কিন্তু সোরায়া আর মিরা দুইজনেই জেদ ধরে ছিল বলে সে হার মানতে বাধ্য হয়।
অবশেষে সবাই এখন একসাথে ব্যস্ত বিয়ের তোরজোর করতে। দুই বাড়ির কর্তা- শফিক রহমান আর রায়হান চৌধুরী নিজেদের দায়িত্বে নেমন্তন্নের কাজ শেষ করেছেন। আর বাড়ির দুই কর্তী রোকেয়া বেগম এবং রামিলা চৌধুরী মিলে বিয়ের সকল কেনা কাটা শেষ করেছেন। রুদ্র আর রায়ানের কাঁধে পড়েছে ডেকোরেশনের দায়িত্ব। আর দুই বাড়ির মেয়ে বউরা আছে – বিয়েতে ঠিক কি কি করা যায় সেই প্লান নিয়ে।
সকাল—
সময় এখন প্রায় আটটা পেরিয়ে নয়টার দোরগোড়ায়। সূর্যটা আর লাজুক নেই, পুরো আকাশ জুড়ে নিজের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। সোনালি রোদ এসে পড়ে আঙ্গিনায়, দেয়ালে, গাছের পাতায়—সবকিছু যেন ঝকঝক করে উঠেছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতায়। আকাশ একদম ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার, গভীর নীলের মাঝে কোথাও একটুকরো মেঘও নেই। রোদটা তীব্র, কিন্তু তার মধ্যে একটা আলগা উষ্ণতা আছে, যা গা ছুঁয়ে যায়, তবে ক্লান্ত করছে না। বাড়ির বাইরে হালকা গরম বাতাস বইছে তবে বাড়ির ভেতরের পরিবেশ যে তার ব্যতিক্রম তা নয়। বাড়ির বাইরে রায়হান চৌধুরী এবং শফিক রহমান হাক ডাক পারছেন। আজকের জন্য তাদের তদারকি চলছে বাবুর্চি দের রান্নার স্থানে। বাড়ির ভেতরটা কেমন খা খা করছে। কারো উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না, মিরার বিষন্ন, মনমরা মুখটা ব্যতীত। ডাইনিং টেবিলের এক কোণে বসে আছে মেয়েটা। তার মুখটা ফুলকো লুচির চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না, চোখ-মুখের গম্ভীরতা যেন অগ্নুৎপাত এর সৃষ্টি করবে এমন অবস্থায়। সামনে সাজানো নাস্তা, তবুও সেই দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। চামচটা হাতের মাঝে ধরা, কিন্তু নাড়ানোরও ইচ্ছা করছে না। মাঝে মাঝে নিচের দিকে তাকাচ্ছে, আবার হালকা বিরক্তিতে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
ঠিক তখনই রায়ান ব্যস্ত কণ্ঠে ফুল ওয়ালার সাথে তর্ক করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। ছেলেটার কণ্ঠে বিরক্তির তীব্রতা স্পষ্ট –
“আমি আপনাকে গোলাপ আর রজনী গন্ধা আনতে বলেছিলাম আর আপনি এনেছেন গাঁদা ফুল। কারণ কি?”
-“স্যার, আপনি তো বললেন আজ মেহেদি না কি যেন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। এসব দিনে তো মানুষ গাঁদা ফুল দিয়াই ঘর বাড়ি সাজায়।”
-“ওভাবে মানুষ সাজায়…আমরা গরু ছাগল তাই গোলাপ আর রজনী গন্ধা দিয়ে সাজাবো। আপনার কোনো সমস্যা তাতে?”
ফুল ওয়ালা সংকোচে মাথা নিচু করে নিলেন। রায়ান আর মেজাজ না দেখিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“এভাবে দাড়িয়ে থাকলে তো চলবে না। গিয়ে আপনাকে যেই যেই ফুলের কথা বলা হয়েছে সেগুলো এ্যারেঞ্জ করুন তাড়াতাড়ি। সময় কম।”
-“জি স্যার, যাইতেছি।”
ফুলওয়ালার প্রস্থানের পরপর ক্লান্তির ভারে ঠোঁটের ফাঁক গলে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো রায়ানের। চোখ ঘুরিয়ে দেখতেই একজোড়া চোখ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। সম্ভবত সেই চোখ জোড়া তাকেই দেখছিল এতক্ষণ যাবত কিন্তু তার দৃষ্টি পড়তেই সরে গেল। উক্ত চক্ষু যুগল যে তার কাঙ্খিত নারীর তা অবলোকন হতেই ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। মিরা রায়ানের কণ্ঠ স্বরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল- লোকটা একরোখা জেদি হলেও তো- তার মনের মানুষ, চোখের সামনে এলে এক নিমিষেই মেয়ে মন গোলে যায়। তাই রায়ান তার দিকে তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিল মিরা। রায়ান গিয়ে ডাইনিং টেবিলে মিরার পাশের চেয়ার টাতে বসে মিরার চেয়ার টা ধরে টেনে নিজের কাছে আনলো। হঠাৎ এমন ঘটনায় মিরা হতবিহ্বলের মতো রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান তার চোখে চোখ রেখে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“নিজের বরকে এমন চুরি করে দেখার কি আছে ম্যাডাম?
মিরা চোখ বড় বড় করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। গলায় সব কথারা এসে ভীর করলো কিন্তু সে কিছু বলছে না। মিরাকে চুপ দেখে রায়ান মিরার ফোলা ফোলা গালে হাত রেখে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“এমন গাল ফুলিয়ে বসে আছো কেন? খাবারও খাও নি। মেডিসিন নিতে হবে না?”
মিরা রায়ানের একটা প্রশ্নের ও উত্তর দিল না। রায়ান মিরার নীরবতার পাত্তা না দিয়ে মজার ছলে তার অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলতে মিরার পেটের কাছে হাত নিল-
“আমার প্রিন্সেস কি করছে..?!”
রায়ান মিরার উদরের উপর হাত রাখতেই গায়ে ফোস্কা পড়ার মতো প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে মিরা রায়ানের হাতের উপর মৃদু জোরে চর দিয়ে ছেলেটার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল-
“দূরে থাকুন বলছি। একদম আমার আর আমার বাচ্চার কাছে আসবেন না আপনি।”
রায়ানের অবাক হয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-
“দূরে থাকবো মানে? তোমার আর তোমার বাচ্চার কাছে আসবো না, এটা কেমন কথা? সর্ট টাইম মেমরি লস হয়ে থাকলে মনে করিয়ে দেই- তুমি আমার বউ, আর তোমার পেটে যে বাচ্চাটা বড় হচ্ছে সেও আমার। আমিই দিয়েছি ওকে তোমার ভেতর।”
মিরা রাগে রায়ান কাঁধ বরাবর আঘাত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
“এই যে সারাদিন আমার বউ আমার বউ করে মাথা খান..বউয়ের কি চাই কখনো তার মূল্যায়ন করেছেন? খালি বউ বউ করলেই হয় না।”
রায়ান আবার মিরার কাছে এসে মিরাকে আদুরে স্পর্শে নিজের কাছে টেনে নিয়ে মিরার কপালে চুমু দিয়ে বলল-
“কি চাই আমার পাখির? তার কোন চাওয়ার মূল্যায়ন করি নি আমি? ভারী অন্যায় হয়ে গেছে তো আমার। ভুল শুধরে নিতে হবে তো। বলো বলো কি চাই।”
মিরা বাঁকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“আগলা পিরিতি দেখাতে আসবেন না একদম। সকালের কথা ভুলি নি আমি।”
মূলত আজ বাড়িতে সোরায়ার মেহেদী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে ছোট্ট করে। আগামী কাল সকালে গায়ে হলুদ আর রাতে বিয়ে সম্পন্ন হবে। মেহেদী অনুষ্ঠান টা ইদানিং বেশ ট্রেন্ডিং এ আছে তাই সোরায়া বায়না করেছে তার ও ছোট্ট করে মেহেদী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হোক। ছোট বোনের আবদারে মিরা আর রিমি একসাথে সমানতাল দিয়েছিল। তাই আজকের এই আয়োজন হঠাৎ করেই। যেহেতু এই সিদ্ধান্তের মূলে মিরা সোরায়া রিমি তিনজনের অবদান বেশি তাই খুঁটিনাটি বিষয় গুলো তারাই সামলে নেবে ঠিক করেছিল।
সকালে প্রয়োজনীয় জিনিস এর কেনাকাটা করতে বের হওয়ার সময় রায়ান বাঁধা দেয় মিরার বাড়ির বাইরে যাওয়া নিয়ে। তার যথাযথ কারণ ও আছে- মিরার প্রেগন্যান্সির এখন কেবল তিন মাস। এ্যাকসিডেন্টের আঘাত গুলো সবে মিলিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসাটা রায়ানের মতের বিরুদ্ধে ছিল। সবকিছু চিন্তা করে সেই আবদার মানলেও, এখানে এসে মিরাকে একা ছাড়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না। মিরা ঠিক আছে এমনটা অনেক বার বোঝাতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছে। রায়ান খুব রাগান্বিত হওয়ায় মিরা শেষমেশ জেদ ধরে যায়ই নি রিমি সোরায়ার সাথে। মিরা যায়নি বলে রামিলা চৌধুরী এবং রোকেয়া বেগম দুজনেই ওদের সাথে গেছেন। আর ফলশ্রুতিতে মিরা এখন গোটা বাড়িতে একা। এই নিয়েই মহারানির মন খারাপ।
রায়ান মিরার গাল টেনে রুক্ষ কণ্ঠে ধমক দিয়ে বলল-
“বউ পাখি.. ইদানিং খুব রূঢ় আচরণ করছেন আপনি। এক মাঘে কিন্তু শীত যায় না।”
মিরা ভ্রু কুঁচকে রায়ানের দিকে নিজের অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল-
“আমি ১০০ বার রূঢ় আচরণ করবো, ঝগড়াও করবো, তর্ক ও করবো, মুখও ফুলাবো, কান্নাও করে দিবো, ভুল করলে সরিও বলবো না। কারণ আমি বউ। কিছু বলার আছে আপনার?”
রায়ান অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের দিকে থেকে কিছু বলতে যাবে তখনি মিরা আবার বলল-
“কিচ্ছু বলবেন না। ভালোবেসেছেন আপনি, পোটিয়েছেন আপনি, বিয়ে করেছেন আপনি। এখন ভোগান্তি পোহান।
এক মাঘে শীত যাবে, না বসন্ত তা পরে দেখবো।”
রায়ান হাফ ছেঁড়ে মুচকি হেঁসে মিরার ফোলা নাকটা টেনে বলল-
“হুম, ঠিক কথা। পরে দেখাবো নে।”
-“কি..!”
-“এক মাঘে শীত যায়, না বসন্ত।”
মিরা আহাম্মক হয়ে গেল। ঠিক কি বোঝাতে রায়ান কথাটা ব্যবহার করলো যেমন ভাবে বুঝে উঠতে পারলো না। কিন্তু ছেলেটা যে তার প্রতি এত ধৈর্যশীল এটা দেখে তার অবাক লাগে। অথচ এই একই মানুষটা অফিসের কাজে সামান্য গড়বড় হলেও পুরো অফিস উঠিয়ে নেয়। রায়ান কে দেখে মিরার তখন মনে হলো- নারীর রাগের মাথায় বলা তেতো কথাতেও যে পুরুষ শান্তি খুঁজে পায় ওই পুরুষের কাছেই নারী সারা জীবন থেকে যায়। হঠাৎ রায়ান মিরার দিকে গাল পেতে দিয়ে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“একটা চুমু দাও। অনেক কাজ বাকি, এনার্জি পাচ্ছি না। চার্জ করে দাও একটু।”
আজকাল রায়ানের এই বদ অভ্যাস টা একটু বেশিই দেখা দিয়েছে। কিছু হলেই এমন আবদার করে মিরার কাছে। এমনকি অফিসে মিটিং থাকলেও তার আগে ভিডিও কল করবে মিরাকে এই একই কারণে। মিরা প্রতিবারই ভালোবেসে সেই আবদার রাখে কিন্তু এখন মন মেজাজ বিগড়ানোর জন্য তার রায়ানের কথা শুনার কোনো ইচ্ছে নেই। মিরা রায়ানের থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে কথা পাল্টা বিরক্তিতে প্রশ্ন করলো-
“আচ্ছা, আপনি কি এমন করেন? আপনার মাথায় সারাদিন চলেটা কি? যে এনার্জি থাকে না।”
রায়ান অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল-
“আমার মাথায় এখন শুধু সোরা মাহিরের বিয়ে, তুমি আর চুমু ঘুরা ঘুরি করে। সেটা কি তুমি বললেও বুঝবা? এতো চাপ নেওয়া যায়? এনার্জি লাগে তো নাকি!?”
-“কই? আপনি আমার কাছে এলে তো মনে হয় আপনার পুরো শরীরে কারেন্ট দৌড়াচ্ছে। এতো এনার্জেটিক থাকেন।”
-“কি অদ্ভুত! চার্জার নিজে সাথে থাকলে তো আর চার্জ করার প্রয়োজন পড়ে না। যখন চার্জার থাকবে না তখন তো ব্যাক আপ লাগে। যেমন এখন আমি বাইরের কাজে যাবো তাই লাগবে।”
মিরা তর্কে হেরে মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল-
“মুড নেই। এখন হবে না। পরে আসুন।”
রায়ান হাতের মুঠো শক্ত করে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলো-
“Control Rayan, control..এখন কিছু করলে তোর প্রিন্সেসের কষ্ট হতে পারে। শান্ত হো।”
রায়ান চোখ তুলে মিরার দিকে তাকাল। মেয়েটাকে দেখে এতোটা বেসামাল হওয়ার কারণ সে আজ অব্দি বুঝে উঠতে পারে না। কি এমন আছে মেয়েটার মাঝে কে জানে! রায়ান মিরার অন্য দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ নিয়ে তার নরম উদরে আলতো করে হাত রাখলো। মিরার শরীর তৎক্ষণাৎ শিহরণে কেঁপে উঠলো। তবু সে তখনও অন্য দিকে ঘুরিয়ে বসে রইল। এই হাতের স্পর্শ তার চেনা। আর প্রেগন্যান্সির পর তো প্রতি মূহুর্তের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রায়ান মিরার উদরে নরম হাতে আদর করতে করতে অদৃশ্য এক সত্তাকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“প্রিন্সেস..তোমার মাম্মা কে বলে দিও, তুমি একবার তার ভেতর থেকে আমার কাছে চলে এলে, তার কথায় কথায় “না” বলা আমি একদম শুনবো না। তখন যেন আমাকে অসভ্য, অভদ্র , নির্লজ্জ বলে গালাগালি না করা হয়।”
মিরা রায়ানের কথায় সামান্য ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে রায়ানের দিকে ছলছল চোখে তাকালো। মিরাকে তার দিকে ঘুরতে দেখে রায়ান মিরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল-
“এমন কাঁদো কাঁদো মুখ করেও তখন লাভ হবে না। ভদ্রতার দাম দিচ্ছো না যেহেতু সময় হলে আমিও অসভ্য হয়ে যাবো।”
রায়ান মিরার গালে পড়ে থাকা কিছু চুলের রতি মেয়েটার কানের পাশে গুঁজে দিয়ে সেই স্বচ্ছ গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে উঠে যেতে চাইলে মিরা হঠাৎ রায়ানের হাত শক্ত করে ধরে নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস –
“এখন এমন ভাবে ভয় দেখানোর কি মানে? আগে কখনো কি না বলেছি?”
রায়ান তবু উঠে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করলো। মিরা শক্ত করে তার হাত আঁকড়ে ধরে কোমল জিজ্ঞেস করলো-
“কোথায় যাচ্ছেন এখন?”
-“বাইরে…অনেক কাজ পড়ে আছে। সন্ধ্যার আগে শেষ করতে হবে সব।”
-“এনার্জি লাগবে না?”
-“হুম, লাগবে।”
-“তো চলে যাচ্ছেন যে..”
-“এনার্জি ড্রিংকস কিনে খেয়ে নেব।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বলল-
“হয়েছে হয়েছে। বুঝেছি। এবার কাছে আসুন..চুমু খাবো।”
মিরা আশা করছিল রায়ান হয়তো আরও একটু রাগ দেখাবে কিন্তু তার সকল ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে রায়ান লক্ষ্মী ছেলের মতো বসে পড়লো তার সামনে। এই দেখে মিরা নিজের হাসি আর ধরে রাখতে পারলো না। খিলখিলিয়ে হেসে উঠে রায়ানের আবদার টুকু পুরণ করলো।
কেনাকাটা শেষে সবাই বাড়ি ফিরলে আসল উৎসব আরম্ভ হলো। মিরা আর রিমি মিলে মেহেদীর ছোট ছোট তিনটা স্টেশন সাজিয়েছে- যেখানে বসে আরামে মেহেদী দেওয়া যাবে, সাথে মেহেদীর ডালা গুলো ও ফুলের পাপড়ি আর মেহেদী কোণ দিয়ে সাজিয়েছে। তাদের গোছগাছ প্রায় শেষ। ব্যস্ত সময়ের শেষের দিকে হঠাৎ রুদ্র এসে উপস্থিত। কানের থেকে ফোনটা নামিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে রিমিকে ডেকে বলল-
“রিমি..মেহেদী আর্টিস্টরা সন্ধ্যার পরপরই চলে আসবে। তোমাদের সাজানো শেষ হলে রেডি হতে শুরু করো। রেডি হতেও তো এক যুগ লাগবে তোমাদের।”
রিমি মিরার রুদ্রর কথায় চোখ বাঁকিয়ে তাকালো। রুদ্র দুজনের চাহুনিতে একটু ভয় পেয়ে কথা টা ঘুরিয়ে বলার বৃথা চেষ্টা করলো-
“না মানে, আমি বলতে চাইছি এতো কষ্ট করে সব কিছু সাজিয়েছ এখন নিজেরা যদি সময় নিয়ে সুন্দর করে না সাজো কেমন কেমন দেখাবে না? আর সুন্দর করে সাজা তো একটু সময় সাপেক্ষ…!”
সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার আগেই রিমি হাত দেখিয়ে রুদ্র কে থামিয়ে দিয়ে বলল-
“হয়েছে থাক। আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করতে হবে না।”
রুদ্র পুরোপুরি চুপ করে গেলে মিরা ভেংচি কেটে বলল-
“সাহস না থাকলে যে মানুষ কেন শুধু শুধু লাগতে আসে কে জানে! আশ্চর্য..!”
রুদ্র ভালো করেই বুঝতে পারলো মিরা তাকেই খোঁচা মেরে কথাটা বলল। কাউন্টার এ্যাটাক করবে বলে ভাবতেই রিমি তাকে একটা কাজ দিয়ে বসলো-
“আচ্ছা, শুনুন না। এই দিকটায় ড্রিল করে একটা প্যারেক লাগিয়ে দিন তো। একটা পর্দা লাগাতে হবে।”
রুদ্র আগলা মেজাজ দেখিয়ে বলল-
“পারবো না আমি। তোমার সাহসী বান্ধবী প্লাস জা কে বলো করে দিতে। এতো দুঃসাহসের কাজ আমাকে দিয়ে হবে না।”
রিমি হতভম্ব হয়ে গেল এই কথা শুনে। মিরা মনে মনে খানিকক্ষণ হেঁসে রিমির কাছে গিয়ে তার কানে কানে কিছু একটা বলল। মিরার কথায় রিমি প্রথম বার চোখ বড় বড় করে নিয়ে মাথা না সূচক নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করলে মিরা চোখের ইশারায় জোর করে রিমিকে শাশালো। রুদ্র সেখান থেকে প্রস্থান করতে উদ্যত হতেই মিরা রিমিকে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“যা নারে শালি, বল যেটা বলতে বললাম। চলে যাচ্ছে তো..!”
রিমি হকচকিয়ে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে ফেলল-
“আরে শুনুন না, যদি লাগিয়ে দেন, একটা চুমু দিব।”
রুদ্র রিমির মুখে এমন কথা কখনো শুনতে পাবে কল্পনা ও করে নি। তার পা গুলো হঠাৎ থমকে গেল। মিরা রুদ্র কে থেমে যেতে দেখে মুখে হাত চেপে হাসতে হাসতে ফ্লোরে বসে পড়লো। আর মনে মনে ভাবছে-
“শালার সব বেডা মানুষই এক।”
রিমি মিরাকে লুটোপুটি খেয়ে হাসতে দেখে নিজের দাঁত কটমট করে বিড়বিড় করলো-
“মিরার বাচ্চা, তোরে যে আমি কি করমু..!”
-“কি বললে? আরেকবার বলো তো।”
রুদ্র পিছন ফিরে পাল্টা প্রশ্ন করতেই। রিমি তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রুদ্রর দিকে কিচ্ছু না বোঝার ভাব নিয়ে তাকিয়ে মাথা না সূচক নেড়ে আমতা আমতা করে বলল-
“কক..কই? কিছু না তো। আমি কিছু বলি নি।”
রুদ্র রিমির দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতে লাগলো। রিমি অজানা ভয়ে মাথাটা সামান্য নিচু করে নিয়ে আড় চোখে মিরা কে চোখ ইশারা করে রুদ্র কে থামাতে বলল। মিরা কোনো মতো নিজের হাসি সামলে উঠে দাঁড়ালো। রুদ্র রিমি কাছে পৌঁছাবে ঠিক তখনই মিরা তাদের দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। রুদ্র কপালে বিরক্তির ছাপ নিয়ে মিরাকে সামনে থেকে সরতে বলবে তার আগেই মিরা তার দিকে ড্রিল মেশিন টা আর একহাতে কয়েকটা প্যারেক এগিয়ে দিয়ে বলল-
“No no brother..আগে কাজ শেষ করুন। তার পর মুজুরীর হিসেব বুঝে নিবেন।”
মিরার কথায় রিমি লাজুক হাসলো। রুদ্র মিরাকে উপেক্ষা করে তাঁর পিছনে উঁকি দিয়ে রিমির লজ্জায় লাল হয়ে উঠা মুখটা দেখে মুচকি হেঁসে মিরার থেকে ড্রিল মেশিন আর প্যারেকটা নিয়ে কাজে লেগে পড়লো। মিরা রিমির কাঁধে মৃদু ধাক্কা দিয়ে তাকে বিরক্ত করতে শুরু করলো। রিমি শুধু তার দিকে চোখ পাকিয়ে যাচ্ছে থামানোর জন্য। তখনি মইয়ের উপর থেকে রুদ্রর চেঁচানোর আওয়াজ এলো-
“ওই..তোর মজা রাখবি? ভাবিকে না জ্বালিয়ে এদিকে আয়। একটু হেল্প কর।”
মিরা বিরক্ত ভাব নিয়ে গা দুলিয়ে মইয়ের নিচে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে? একটা কাজ দিয়েছি তাতেও হেল্প লাগবে? হেল্প লাগলে নিজের বউকে ডাকো আমাকে কেন?”
-“তুই থাকতে তোর ভাবি কাজ করবে এটা কি মানা যায় বল? ভাবির প্রতি তোর একটা সম্মান আছে তো নাকি?”
-“আরে বাপরে..! বউকে দিয়ে কাজই করাতে চাও না দেখছি। ভুলে যাচ্ছো নাকি সম্পর্কের দিকে থেকে আমি বড়। তোমার ভাইয়া যদি শুনে আমাকে ভাবি ডাকো নি কি হবে বলো তো?”
-“হো হইছে, খুব ডরাইছি। এখন এইটা ধর।”
রুদ্র মিরার হাতে ড্রিল মেশিন টা ধরিয়ে দিয়ে প্যারেক লাগতে নিল। তখন মিরার মাথায় কিছু খুরাফাতি বুদ্ধি এলো। সে টেবিলের উপর থাকা মিষ্টির চামচটা তুলে চামচের পিছনের তীক্ষ্ণ অংশটা রুদ্রর পিঠের সাথে লাগিয়ে নিজের হাতের ড্রিল মেশিন টা অন করে দিল। পিঠে খোঁচা আর ড্রিল মেশিনের বিকট আওয়াজে রুদ্রর মনে হলো তার পিঠেই ড্রিল করা হচ্ছে। এই ভেবেই চিৎকার দিয়ে মই থেকে হুড়মুড় করে নেমে পড়লো ছেলেটা-
“ওওও আম্মুউউউ…!”
রুদ্র কে ভয় পেতে দেখে মিরা রিমি খুব জোরে হেঁসে উঠলো। তখনি নিজের দুই হাত ভরা দুই ধরনের চুরি পড়ে দৌড়ে সোরায়া সেখানে প্রবেশ করলো। ভিতরের পরিবেশ ঠিক মতো না খেয়াল করেই উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আপু…কোন চুড়ির সেট টা বেশি সুন্দর বলো তো?”
মিরা রিমি মুখে হাত রেখে হাসতে হাসতে সোরায়ার দিকে ঘুরলো। সোরায়া তাদের হাসতে দেখে কোতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলো-
“এভাবে হাসছো কেন তোমরা? কি হয়েছে?”
মিরা রিমি নিজেদের হাসি যেন থামাতেই পারছে না। সোরায়া খেয়াল করলো মিরা আর রিমি হাসলেও রুদ্রর মুখে এক রাশ বিরক্তি। মেয়েগুলো যে তার উপরেই হাসছে তা বুঝতে আর সোরায়ার সময় লাগলো না। দুষ্টু বুদ্ধির প্ররোচনায় সোরায়াও কিছু একটা ভেবে রুদ্রর সাইডে গিয়ে রুদ্র কে ডিফেন্ড করে বলল-
“আমি সিওর তোমরা আমার ভোলা ভালা ভাইয়াকে কিছু একটা করে বোকা বানিয়েছো। এসব কিন্তু একদম ঠিক না।”
রিমি মিরা দুজনেই সোরায়ার প্রতিক্রিয়ায় অবাক। সোরায়া রুদ্র বরাবরই একে অন্যের পেছনে পড়ে থাকে খেপানোর জন্য। এখন সোরায়া রুদ্রর হয়ে কথা বলছে দেখে রিমি নিজের হাসি থামিয়ে বললো-
“সূর্য আজ কোন দিকে উঠলো? গোটা দিনে যে ভাইয়ার নামে নালিশ দিয়ে কূল পাস না এখন তার হয়ে ওকালতি ও করছিস।”
-“হ্যাঁ করছি। তোমরা একসাথে মিলে আমার ভাইয়াকে বুলি করছো। এটা আমি একটা ভালো বোন হয়ে মেনে নিতে পারি না।”
রুদ্র সোরায়াকে তার হয়ে কথা বলতে দেখে চোখ প্রায় কপালে উঠে গেছে। সোরায়া রুদ্রর দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকালো। রুদ্র বাঁকা চোখে সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বানোয়াট হেঁসে জিজ্ঞেস করলো-
“কিরে? তোর শরীর ঠিক আছে তো? ডাক্তার ডাকবো?”
সোরায়া খুব ইমোশনাল হয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে রুদ্র কে বলল-
“আমি খুব সরি ভাইয়া। আজ বুঝতে পারছি তুমি আমার ঠিক কতটা আপন ছিলে। তোমার কথা আমার খুব মনে পড়বে চলে যাওয়ার পর।”
রুদ্র, মিরা, রিমি তিন জনই হতবাক। এই মেয়ের হঠাৎ কি হলো! কিছুই বুঝতে পারলো না তারা। সোরায়া হঠাৎ রুদ্রর হাত ধোরে আবদার করলো-
“রুদ্র ভাইয়া আমার সাথে একবার আমাদের ছোট্ট বেলার ফেবারিট গেম টা খেলবে। যেটা তুমি আমি একবার খেলেছিলাম।”
রুদ্র ঠিক মনে করতে পারলো না সোরায়া কোন গেমের কথা বলছে। রিমি কিছু বুঝতে না পারায় মিরার দিকে তাকালে মিরার মুখে একই প্রতিক্রিয়া দেখলো। রুদ্র দ্বিধায় পড়ে প্রশ্ন করলো-
“ফেবারিট গেম..! তাও আবার মাত্র একবার খেলেছি.. কোন গেম এইটা?”
সোরায়া উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল-
“আরে কি বলো? তোমার মনে নেই। ওই যে ওই গেমটা। আচ্ছা ওয়েট। আমি দেখাচ্ছি, আমি যেমন যেমন করবো তুমিও যেমন তেমন আরো দেখবে মনে পড়ে গেছে।”
-“না আমি খেলবো না। এখন বড় হয়েছিস না। এসব বাচ্চা দের খেলা খেলতে হবে না।”
-“ভাইয়া প্লিজ, কাল তো বিয়ে করে চলেই যাবো। খেলো না।”
রুদ্র সোরায়ার ইমোশনাল ব্লেকমেইলে গোলে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজি হলো গেমটা খেলতে। সোরায়া খুশিতে লাফ দিয়ে উঠলো। খুব গম্ভীরতা নিয়ে নির্দেশনা দিল –
“আমি যা করবো তাই করবে। ঠিক আছে?”
-“ঠিক আছে।… বল।”
-“সোজা হও।”
রুদ্র সোজা হলো। সোরায়া তার ডান হাত রুদ্রর ডান কাঁধে রাখলো রুদ্র ও সোরায়ার কাঁধে হাত রাখলো। আবার বাম হাত বাম কাঁধে রাখলো রুদ্র তাই করলো। পরবর্তীতে আবার হাত নামিয়ে নিল। মিরা আর রিমি খুব মনোযোগ বসিয়ে দেখছে কি হচ্ছে। সোরায়ার দেখাদেখি রুদ্র ও নিজের হাত নামিয়ে নিল। কি হলো! কিছুই না। সোরায়া আবার নিজের হাত উঠিয়ে রুদ্রর মাথায় রাখলো। রুদ্র ও আবার তাকে অনুসরণ করে সোরায়রা মাথায় হাত রাখলো। মাথা থেকে হাত সরিয়ে সোরায়া রুদ্রর থুতনির নিচে হাত রাখলো। রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে নিজের হাতটা সোরায়ার থুতনির নিচে হাত রাখতেই সোরায়া একটা শয়তানি হাসি দিয়ে রুদ্রর হাতের তালুতে থুতু দিয়ে এক দৌড়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্র তৎক্ষণাৎ নিজের হাত টা ঝাঁকিয়ে দাঁত কটমট করে বলল-
“ওইই দাঁড়া বলছি। আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন। শয়তান কোথাকার। এর নাকি কাল বিয়ে।”
মিরা আর রিমি যতটা নিজেদের সামলে ছিল আগের বার তার থেকেও বেশি লাগামহীন হাসতে লাগলো। দুজনে পারছে না শুধু ফ্লোরের উপর গোড়াগোড়ি করে হাসতে। রুদ্র একনজর রিমির দিকে তাকালো। নিজের বউকে তার বোনদের সাথে মিলে এমন হেনস্থা করে হাসাহাসি করতে দেখে চোখ দুটো ছোট ছোট করে নিয়ে বিড়বিড় করলো-
“বালের জিন্দেগি, নিজের বউ টাও আপন হলো না আমার।”
এভাবেই ভীষণ ব্যস্ততায় দুপুর ও বিকেল পার হলো। সন্ধ্যা নেমেছে চারদিকে। বাড়ির একটা ঘরে সবাই রেডি হচ্ছে। মেকআপ আর্টিস্ট হায়ার করা হয়েছে সাজানোর জন্য যা সম্পূর্ণ রায়ানের সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ একটাই – মিরা যেন বাড়ি থেকে বের না হয়। তিন জনই আজ শাড়ি পড়েছে। একসাথে নাচ করবে সেই প্লেনও করেছে কাউকে না জানিয়ে নিজেরা নিজেরা। রিমি আর মিরার সাজ আগেই শেষ হয়ে গেছে এখন সোরায়াকে সাজানো হচ্ছে। বিছানার এক কোণায় বসে রিমি হাতে চুরি পড়ছে, সোরায়া আয়নার সামনে চোখ বন্ধ করে বসে। হঠাৎ মিরা ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে নিলে রিমি প্রশ্ন করলো-
“কিরে কোথায় যাচ্ছিস? দাঁড়া না, একসাথে নামবো তো।”
মিরা বেরিয়ে গিয়ে দরজা চাপিয়ে দিতে দিতে বলল-
“আরে নিচে যাচ্ছি না। আমার ঘরে যাচ্ছি। পা টা কেমন খালি খালি দেখাচ্ছে। ভাবলাম একটু আলতা পড়ে আসি।”
মিরার চলে যেতেই রিমি পুনরায় নিজের চুরি পড়ার দিকে মনোযোগ দিল। তখনি দরজায় একটা নরম টোকা পড়লো। রিমি ভিতর থেকেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“কে?”
বাইরে থেকে রায়ানের আওয়াজ এলো- “তোমাদের সাজ এখনো কমপ্লিট হয় নি?”
-“জি ভাইয়া, প্রায় শেষের দিকে। আসছি আমরা।”
এরপর এক মিনিটের মতো পার হলো বাহির থেকে কারো আওয়াজ আসে নি। কিন্তু এক মিনিট পর আবারো বাইরে থেকে রায়ানের অধৈর্য কণ্ঠ ভেসে এলো-
“হৃদপাখি…!”
রায়ানের এই ডাক শুনে সোরায়া রিমিকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“আরে রিমি আপু তুমিও..! তোমার কি মনে হয় রায়ান ভাইয়ার কিছু যায় আসে আমরা রেডি হয়েছি কি হই নি। তার সব চিন্তা তার বউকে নিয়ে। বলে দাও আপু নিজের ঘরে গেছে।”
রিমি সোরায়ার কথায় মুখ টিপে হেঁসে রায়ানের উদ্দেশ্যে- চেঁচিয়ে বলল-
“ভাইয়া..মিরা তো এখানে নেই। ওর ঘরে গেল একটু আগে।”
কলমপতন নীরবতা ঘরের বাইরে। রিমি আনমনে বিড়বিড় করলো-“কিরে! কাকে কি বললাম? কোনো উত্তর এলো না যে।”
সোরায়া তুচ্ছার্থে হেঁসে বলল- “যার যা জানার ছিল সে সেটা জেনে চলে গেছে। তুমি মন দিয়ে রেডি হও।”
অন্ধকার ঘরের আলো জ্বালিয়ে মিরা অনেক খুঁজে তার আলতার কৌটা খুজে বের করলো। একটা বাটিতে সামান্য আলতা ও কটনবাট নিয়ে ফ্লোরে বসেছে পায়ে লাগাবে বলে। মিরা হাতে কটনবাট টা তুলে আলতায় ভিজিয়ে পায়ে লাগাতে যাবে তখনি একটা বিকট চিৎকার শুনা গেল-“What the hell..”
হঠাৎ করে এমন চিৎকার কানে যেতেই মিরা গা কেঁপে উঠলো। দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো রায়ান দ্রুত পায়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। মিরা অবাক চোখে ফ্লোরে বসা অবস্থায় মাথা উঁচু করে লম্বা আখাম্বা মানুষ টার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। রায়ান ঘরে এসেই কিছু না বলে মিরাকে ফ্লোর থেকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ধমকের সুরে বলল-
“ফ্লোরে বসেছো কেন?”
মিরা বোকা বোকা চেহারা নিয়ে রায়ানের চোখের দিকে তাকালো। কি এমন করেছে সে? শুধু একটু আলতাই তো লাগাতে বসে ছিল। মিরা হাত দিয়ে ফ্লোরের আলতার বাটির দেখিয়ে দিল। রায়ান সেই দিকে একনজর তাকিয়ে আবার মিরার মুখটার দিকে তাকালো। মেয়েটাকে কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। মিরাকে কখনোই রায়ান এমন সেজে গুজে দেখেনি, তার কাছে তো তার সাদামাটা বউটাই মরণঘাতী। রায়ান না চাইতেও জোরে পূর্বক নিজের চোখের পলক ফেলে বিড়বিড় করলো-
“মাশাআল্লাহ.. মাশাআল্লাহ..! দেখতে এমন অদ্ভুত রকমের অপূর্ব লাগলে কি আর বকা যায়? কি একটা অবস্থা! এসব জুলুম আল্লাহ আমার সাথেই কেন করে?”
ছেলেটা অসহায় মনে, ফ্লোরে চুপ করে বসে পড়লো। মিরা অবাক চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। গাঢ় সবুজ পাঞ্জাবি টা রায়ানের ফর্সা গায়ে বেশ মানিয়েছে বলে মনে হলো তার। কিছু টা মুখ গোমড়া করে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“ছেলে মানুষের এতো সুন্দর হওয়া কি আইনত অপরাধ হতে পারতো না? এমন সুদর্শন কেন দেখতে লাগবে একটা ছেলে কে?”
পেটের উপর আলতোভাবে নিজের হাতটা রেখে ভিতরের ছোট্ট প্রাণের উদ্দেশ্যে বলল-
“এই যে পাপার প্রিন্সেস, তাড়াতাড়ি পৃথিবীতে এসে এই লোকটাকে এক বাচ্চার বাপ বানিয়ে দাও তো। বাচ্চা আছে জেনে অন্তত আমার বরটার উপর কোনো মেয়ে লাইন নাও মারতে পারে।”
রায়ান মুখ উঁচু করে মিরার দিকে তাকাতেই মিরা নিজের চোখ রায়ানের উপর থেকে সরিয়ে নিল। রায়ান মুচকি হেঁসে মিরার পা নিজের হাতে নিল। মিরা একটু হকচকিয়ে গেল। রায়ান কে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করার আগেই রায়ান মিরার পা টা শক্ত হাতে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল-
“নিজের সাজ আর শাড়ির প্রতি মায়া থাকলে আমাকে থামানোর ভুল করবে না আশা করি।”
মিরা এমন ধমকিতে অভ্যস্ত, বলাবাহুল্য ভয় ও পায়। কারণ রায়ানের ধমকি এড়ানোর পরিনতি বেশ অনেক বার ভুগিয়েছে তাকে। মিরা শান্ত হয়ে বসলে রায়ান আলতো হাতে মিরার পায়ে আলতা লাগাতে থাকে। ঘরের নীরবতা দীর্ঘ হতেই রায়ান নরম কণ্ঠে বলল-
“সামান্য একটু আলতা পড়তে ফ্লোরে এমন পেটের উপর প্রেসার দিয়ে বসার বিষয়টা এ্যাক্সপ্লেইন করবেন একটু মেডাম?”
মিরা কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। তার তো কোনো সমস্যা হয় নি ওভাবে বসতে। কিন্তু এটা রায়ান কে বললে সে বিশ্বাস তো করবেই না উল্টো একগাদা কথা শুনিয়ে দেবে। তাই সে পাল্টা প্রশ্ন করলো- “তো কি করতাম আমি?”
রায়ান কঠোর চাহুনিতে চোখ উঁচু করে মিরার দিকে তাকালো। মিরার মনের মাঝে কি চলছে কে জানে কিন্তু চোখের দোরগোড়ায় অশ্রু কণারা প্রস্তুত থাকে এখন। রায়ান মিরার অশ্রুতে চিকচিক করা চোখ জোড়া দেখে নিজের চোখ নামিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল-
“বিছানায় বসতে পারতে। কাউ..না কাউকে না..আমাকে ডাকতে পারতে হেল্পের জন্য।”
-“বিছানায় বসে আলতা কে পড়ে?”
-“কেউ না পড়লে না পড়বে। তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমার বউ প্লাস আমার হবু বাচ্চার মা বিছানায় বসেই আলতা পড়বে। মাথায় গেছে?”
-“হুম..গেছে”
মিরার এক পায়ের আলতা পড়ানো শেষ হলে রায়ান অন্য পা টা ধরলো। মিরা এবার একটু মিটিমিটি হেঁসে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা উপভোগ করছে। হাতের তালুতে গাল লাগিয়ে এক নজরে তার জন্য পাগল পুরুষ টাকে দেখছে। কি মায়া লাগে আছে ছেলেটার মুখে। বেশ কয়েকবার মনে মনে মাশাআল্লাহ বলে নজর তাড়িয়ে নিল। আলতা লাগানো শেষ করে। রায়ান উঠে আলমারির দিকে গেল। কিছু একটা হাতে নিয়ে আবার ফিরে এলো। মিরা কোনো প্রশ্ন ও করতে পারছে না। শুধু দেখে যাচ্ছে। রায়ান হাতে একটা লম্বা গয়নার বাক্স। বাক্সটা খুলে রায়ান একজোড়া রূপার নূপুর বের করলো। মিরার ঠোঁট দুটো হালকা ফাঁকা হয়ে এলো বিস্ময়ে। রায়ান সযত্নে এক এক করে মিরার পায়ে নূপুর গুলো পড়িয়ে দিল। শেষমেষ রূপার নূপুর সজ্জিত মিরার আলতা রাঙা পা দুটো এক করে নিজের হাতের তালুতে নিয়ে আবেশে দুবার ঠোঁট ছোঁয়াল মাঝ বরাবর। মিরার এখন একটু বেশিই অবাক হলো। সে নিজের পা সরিয়ে নিতে চাইলে রায়ান আরো শক্ত করে নিজের হাত আবদ্ধ করে নিয়ে বলল-
“তোমার সাজের প্রতি যতটুকু মায়া আমি দেখাচ্ছি শুধুই তোমাকে কাদানোর ইচ্ছে নেই বলে। শুধু শুধু ছটফট করে আমাকে উস্কানি দিও না।”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৩
প্রতিবারের এমন ধমকে মিরা এখন বিরক্ত। তার বরের দূর্বলতা যে তার মাঝেই এতটুকু সে নিজেও জানে। এই সুযোগে রায়ান কে বিরক্ত করার ইচ্ছে টা মনে হঠাৎ নাড়া দিয়ে উঠলো মিরার। রায়ানের হাত থেকে নিজের বাম পা টা রায়ানের বুকের বা পাশে রেখে ইচ্ছা করে খানিকক্ষণ সময় নিয়ে খুঁতিয়ে খুতিয়ে রায়ান পড়ানো নূপুর টা দেখলো। মিরার এমন কান্ডে রায়ান আশ্চর্য তবে আনন্দ টুকু তার ঠোঁটের কোণে দেখা যাচ্ছে। মিরা নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“বেশ মানিয়েছে, তাই না?”
রায়ান বাঁকা হেঁসে মিরার পা টা তার বুকের উপর থেকে সরিয়ে নিজের কাঁধে রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“এবার একটু বেশি মানিয়েছে।”
