Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৪

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৪
সাইদা মুন

—গেটের সামনে ইয়াব্বড় লাইন লেগেছে…
কথাটা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই তারা হুড়মুড় করে দরজার দিকে ছুটল। আচমকা এমন সংবাদে বাড়ির ভেতর মুহূর্তেই কৌতূহল, উৎকণ্ঠা আর অজানা আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল। মেইন দরজা খুলতেই দেখা গেল দারোয়ান তাড়াহুড়ো করে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। মুখজুড়ে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।
—ম্যাডাম, দেখেন না কারা জানি আইছে! এতগুলা গাড়ি, আবার পুলিশের গাড়িও আছে লগে। বাড়িত স্যারেরা কেউ নাই, ভয়ে আমি তো গেটে তালা দিয়া দিছি!
তার কথা শুনে তিতলি বেগমসহ বাড়ির সকলেই মুহূর্তে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। বাড়িতে এখন কেবল নারীরাই উপস্থিত, পুরুষ মানুষ কেউই বাড়িতে নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি আতঙ্কিত করলো তাদের। কারও মনে শঙ্কা জাগল, আবার কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ ঘটতে যাচ্ছে না তো? কেউ কি হামলা করতে এলো? শত্রুর তো অভাব নেই।
সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা ঘন হয়ে উঠল একেকজনের। যেন কেউই বুঝে উঠতে পারছিল না, এখন ঠিক কী করা উচিত। ওদিকে গেটে প্রতিনিয়ত কারা যেন ডেকেই চলেছে। মেহেদি ইতোমধ্যেই গেট পর্যন্ত গিয়েছে তবে তালাবদ্ধ দেখে বিরক্ত মুখে ফিরে এলো।

—এই মামা, চাবি দাও! গেটে তালা কেন দিছো?
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সালমা বেগম দ্রুত এগিয়ে এসে ছেলের হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।
—বেশি বাড়ছিস? বাহিরে কারা না কারা এসেছে, কি না কি বিপদ হয়। এখন কোনো গেট খুলা হবে না। আগে তোর আব্বুরা আসুক।
মেহেদি বিস্মিত চোখে মা ও চাচির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
—বিপদ কেন হবে? তনিমা আপুরা সবাই এসেছে।
“তনিমা” নামটি কানে পৌঁছাতেই এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীন-তাহিয়া বিস্ময়ে প্রায় লাফিয়ে এলো মেহেদির সামনে।
—তনিমা?
মেহেদি দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলল,
—আরে হ্যাঁ! আমি নিজে দেখছি তনিমা আপু আর তার ভাই ওইযে আরিয়ান ভাই গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কথাটি শোনামাত্র তিতলি বেগমের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই পাল্টে গেল। তনিমা নামটি চিনতে ভুল হলো না, এই তো সেই মেয়ে যে তাহসানকে বাঁচিয়েছে। সে পরিবার সহ এসেছে মানে আইনমন্ত্রী সপরিবারে তাদের বাড়িতে এসেছে? আর তারা কিনা গেটে তালা ঝুলিয়ে বসে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় হাত গেল।
দারোয়ানকে প্রশ্ন করল,

—আপনি পরিচয় জিজ্ঞেস করেননি?
উনি মাথা ঝাকিয়ে বললেন,
—না গেটের সামনে একেরপর এক গাড়ি থামতে দেখে তালা মেরে দিয়েছি।
তিতলি নেগমের চোখমুখ কুঁচকে উঠল। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে আছেন,
—বলছি, আপনার কি আক্কেল-জ্ঞান বলতে কিছুই নেই? কেউ আসলে অন্তত পরিচয়টা তো মানুষ জিজ্ঞেস করে?
দারোয়ান মাথা নিচু করে ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
—ইয়ে মানে… এত গাড়ি, পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গেছিলাম। ভাবলাম কারে না কারে ধরতে আইলো।
তিতলি বেগম গম্ভীরমুখে বললেন,
—কারে না কারে ধরবে বলতে? আপনার কি বলতে চাচ্ছেন, সিকদার পরিবারের লোকজন এমন কাজ করেছে যার জন্য পুলিশ এসেছে বাড়িতে?
তিনি অনবরত মাথা এদিক ওদিক ঝাকিয়ে বললেন,
—না না ম্যাডাম ভুলেও এমন মনে হয়নাই। ভুল হইয়া গেছে।
তিনি বিরক্ত স্বরে বললেন,

—তো এখন দাঁড়িয়ে আছেন কেন? দ্রুত গেট খুলুন! মেহমান এসেছে আমাদের।
বলেই মাথার আঁচলটা পরিপাটি করে টেনে নিয়ে নিজেও গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে বাড়ির বাকিরাও।
অন্যদিকে বাড়ির বাইরের গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তনিমা। চোখেমুখে তার স্বভাবসিদ্ধ দুষ্টুমি। সানগ্লাসটা আঙুল দিয়ে ঠিক করতে করতে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—ছ্যা ছ্যা! হবু শ্বশুরবাড়িতে এমন দিনদুপুরে অপমান। দেখে কিনা গেটেই তালা মেরে দিল। আমি হলে তো এক্ষুনি গিয়ে কচুগাছের সঙ্গে ফাঁসি দিতাম। এ অপমান কি সহ্য করা যায়?
তার এই আজাইরা বিলাপে আশেপাশের কয়েকজন গার্ডের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল। আরিয়ান অবশ্য বিরক্ত চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ধমক দিল,

—তনির বাচ্চা, বেশি কথা বলছিস। ভোল্টেজ এমনিতেই হাই, আরও বাড়াস না।
ভাইয়ের ধমকে তনিমা ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেও মুখের কোণে চাপা হাসিটুকু থেকেই গেল। পেছনের গাড়িতে থাকা তনিমার মা এবার স্বামীকে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বিরক্ত স্বরে বললেন,
—ছেলের কথায় নাচতে নাচতে চলে এলে। তা কেমন পরিবার, মেহমান দেখে দরজায় কুলুপ এঁটে বসেছে?
সোহেল হোসেন অবশ্য যথারীতি সংযত। স্ত্রীকে শান্ত করতে বললেন,
—আহ বউ এই পরিবারের সবাই অত্যন্ত আন্তরিক। আমার নিজের দেখা, মাটির মানুষ তাঁরা। না জানিয়ে এসেছি আমরা। হয়তো এত গাড়ি দেখে একটু হকচকিয়ে গেছে। দাঁড়াও, একটু অপেক্ষা করো এত তাড়া কিসের।
তার পরিমিত উত্তরে পরিস্থিতির অস্বস্তি অনেকটাই প্রশমিত হলেও রাগ এবার গেল ছেলের উপর,
—সব তোমার ছেলের দোষ বলেছি দুটো দিন পরে আসবো। তাদের জানিয়েই আসি। না সে নাছুরবান্দা আজই আসবে।

—আহ বাদ দাও যা হওয়ার হয়ে গেছে তো। এখন চেচিয়ে লাভ আছে?
এদিকে তনিমাও মোবাইল বের করে কল লাগাল।
—কিরে, তোরা কই?
ওপাশ থেকে রাফির বিরক্ত, তেতে ওঠা গলা ভেসে এলো,
—এই ফারিনের বাচ্চা এখনো রেডি হয়নি! ওর জন্যই দাঁড়িয়ে আছি। এলেই একসাথে রওনা দিব।
বিরক্তিতে “চ” উচ্চারণ করে তনিমা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
—আমার ভাইয়ের বিয়ে কি আজই দিয়ে দিচ্ছি নাকি। বিয়ের দিন মনভরে সাজতে বলিস, এখন যেমন আছে তেমনভাবেই যেন তাড়াতাড়ি চলে আসে।

এদিকে আরিয়ান একের পর এক ফোন করেই যাচ্ছে ফাইজাকে। কিন্তু ফাইজা নিজেকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলেছে। দরজা-জানালা শক্ত করে আটকে, নিঃশব্দে বসে আছে সে। হাত-পা কাঁপছে আতঙ্কে। কিছুক্ষণ আগেই মেহেদির চেঁচামেচি শুনে বারান্দা দিয়ে উঁকি মেরে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আরিয়ানকে দেখে এখন যেন তার আত্মা উড়ে যাওয়ার পালা। এই ছেলে সত্যিই যে চলে আসবে এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। এখন কী করবে সে? বাড়ির লোকদের কী বলবে? অসংখ্য দুশ্চিন্তা, লজ্জা, ভয় আর অপ্রস্তুত ভাবনায় তার মাথা যেন ঘুরপাক খেতে লাগল। শেষমেশ সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, আজ সারাদিন এই ঘর থেকে একচুলও বের হবে না।
অন্যদিকে মেইন গেট খুলতেই পুলিশের পোশাক পরা দু’জন সদস্য এগিয়ে গিয়ে বলল, “গেট খুলেছে”। তা দেখে তনিমা তো এক ছুট লাগালো। ভেতরে ঢুকেই চোখ খুজতে লাগলো পরিচিত মুখ। মেহরীনদের দেখামাত্র সে কি দৌড় লাগাল। তাদের সামনে গিয়ে পড়তে পড়তে থেমেছে। তাহিয়া মেহরীন তাকে কোনোরকমে সামলে নিয়েছে। এরপর তিন বান্ধবী এমনভাবে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরল, যেন বহু যুগ পর তাদের পুনর্মিলন ঘটেছে। উত্তেজনায় তিনজনই লাফাতে লাফাতে ঘুরছে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে তাদের গলা। তাদের বাচ্চামিতে সকলেই মিটিমিটি হেসে উঠলোম
এদিকে বড় গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শোঁ শোঁ শব্দ তুলে দু’টি গাড়ি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল, বাকিগুলো বাইরে অবস্থান নিল। প্রথম গাড়ি থেকে আরিয়ান নামল। পেছনের গাড়ি থেকে নেমে এল তার বাবা-মা। বাড়ির গিন্নিরাও তাদের দেখামাত্রই হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে গেলেন।
সোহেল সাহেব গাড়ি থেকে বের হতেই তিতলি বেগম সালাম জানালেন,

—আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন?
সোহেল সাহেবও আন্তরিক হাসিতে সালামের জবাব দিলেন। এরপর নিজের স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচিত হতেই তিতলি বেগম, সালমা বেগম ও তানিয়া বেগম সৌজন্যের সঙ্গে তনিমার মায়ের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
তাদের কথার মাঝেই আরিয়ান এগিয়ে এসে প্রথমে ভদ্রভাবে সালাম দিল। তারপর সরাসরি তানিয়া বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ঠোঁটে লাজুক হাসি টেনে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম, শাশুড়ি আম্মু। মেয়ের জামাইকে বুঝি এভাবে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে?
তার কথা শুনে আশেপাশের হাসিখুশি পরিবেশ মুহূর্তেই খানিক থমকে গেল। সকলেই অবাক চোখে চেয়ে আছে আরিয়ানের সম্মোধনে। পাশ থেকে আমেনা বেগম তাদের পরিস্থিতি বুঝে অস্বস্তিতে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকে টেনে পাশে নিয়ে গেলেন। চোখ রাঙিয়ে, দাঁত চেপে নিচু স্বরে বললেন,
—বেয়াদব ছেলে। মেয়ে দেখতে এসে কেউ শাশুড়ি বলে ডাকে?
আরিয়ান মায়ের কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালেও নিজের কথা একচুলও কমাল না। বরং পুনরায় তানিয়া বেগমের দিকেই তাকিয়ে নির্ভার কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল,
—আন্টি, আপনাকে এখনই শাশুড়ি আম্মু ডাকলে কোনো প্রবলেম আছে?
এমনিতেই আকস্মিক ডাকে তিন জা-ই যথেষ্ট হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে তানিয়া বেগমের অবস্থা তো আরও করুণ, “শাশুড়ি” সম্বোধন শুনে তার মাথাই যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, সবকিছু যেন তার বোধের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ওপর এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে তিনি কি উত্তর দিবেন কিছুই বুঝে উঠতে না পারলেন না। তবে উত্তর দেওয়া উচিত মনে করে কেবল বোকাসোকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়লেন ভদ্রতার খাতিরে বললেন,

—না… না, সমস্যা নেই।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গেই মুখভরা এক বিজয়ী হাসি নিয়ে বলল,
—দেখলে তো, আম্মু? আমার শাশুড়ির যখন কোনো সমস্যা নেই, তখন তোমার সমস্যা কিসে?
ছেলের এমন লাগামছাড়া কথাবার্তায় আমেনা বেগম রাগী চোখে শাসালেন বটে, তবে এত মানুষের সামনে আর কিছু বললেন না। কেবল দৃষ্টিতেই বুঝিয়ে দিলেন, হিসাব পরে হবে। থমথমে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিতলি বেগম অনুশোচনা প্রকাশ করে বললেন,
—আসলে খুব দুঃখিত। হঠাৎ এতগুলো গাড়ি দেখে দারোয়ান একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষও নেই, তাই না বুঝেই গেটে তালা মেরে দিয়েছিল। চিনতে পারেনি আপনাদের। কিছু মনে করবেন না। আপনারা ভেতরে আসুন।
সোহেল হোসেন সৌজন্যমিশ্রিত হাসলেন আশ্বাস দিলেন এতে তারা কিছু মনে করেনি। অতঃপর বললেন,
—আমরা কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে করে এনেছি। অনুমতি দিলে সেগুলোও ভেতরে আনতে বলি।
তিতলি বেগম ইতস্তত করে বললেন,

—অবশ্যই, নিয়ে আসতে পারেন।
অনুমতি মেলার সঙ্গে সঙ্গেই গার্ডদের নির্দেশ দেওয়া হলো। তারপর একের পর এক গার্ড বড় বড় থালা হাতে ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল। প্রায় দশজনের মতো ঢোকার পর সবার নজর হঠাৎ স্থির হয়ে গেল শেষের দৃশ্যে। একটি ভ্যানগাড়ি ধীরে ধীরে টেনে আনছে দুজন মিলে, ভ্যানের চারপাশ নান্দনিক ফুল দিয়ে সুসজ্জিত। আর তার মাঝখানে, এক বিশাল ডলের গায়ে সাজানো ব্রাইডাল একটা লেহেঙ্গা। চারপাশে পরিপাটি করে সাজানো জুতো, মেকআপ কিট, অলংকার, প্রয়োজনীয় প্রসাধন, এক কথায়, একটি কনের জন্য যা যা প্রয়োজন, তার পূর্ণ আয়োজন।
তা দেখে বাড়ির সবার চোখেমুখে বিস্ময়ের মাত্রা হাজার গুন বেড়ে গেল। তানিয়া বেগম খোঁচা দিয়ে বললেন,
—এসব কি?
—কি জানি, এমন বিয়ের ডালা নিয়ে আসলো কেনো?
—আমিও তো বুঝছি না।
তিনজনের ফুসুরফুসুর এরমধ্যে গাড়িটি ভেতরে এসে থামল। তিতলি বেগম আর চুপ থাকতে পারলেন না। অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
—এসব কার জন্য?
সোহেল হোসেন বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
—আমার হবু পুত্রবধূর জন্য।
কথাটি যেন চারপাশ আরও ভারী করে তুলল। পুত্রবধূ? তবে তাদের বাড়িতে উনার পুত্রবধূ কে? কৌতূহল একেকজনের মুখে ফুঁটে উঠতেই। সোহেল হোসেন আরেকটু স্পষ্ট করে বললেন,
—আসলে আমরা আজ আপনাদের কাছে মেয়ে চাইতে এসেছি।

তালহা, বিল্লাল সাহেব, আফতাব সাহেবসহ বাকিরা অফিস থেকে মাত্রই ফিরেছে। গেট থেকে শুরু করে মেইন দরজা পর্যন্ত ডালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দেখে একেকজন থমকে দাঁড়াল। সাধারণত বিয়ের অনুষ্ঠানে এমন ডালা দেখা যায়। কিন্তু তাদের বাড়িতে তো কারও বিয়ে না! সোহেল হোসেন কিছুক্ষণ আগে ফোন করে জানিয়েছিলেন, তারা আসছেন। হঠাৎ কেন আসছেন তা বলেননি তবে গুরুত্বপূর্ণ দরকার এটা জানেন। তাই তো সবাই কাজ রেখে ফিরেছে। কিন্তু এবার সঙ্গে এত আয়োজন দেখে স্পষ্ট বিষয়টা কিছুটা হলেও স্পষ্ট হলো।
সোফায় বসে আছেন দুই পরিবারের বড়রা। টুকটাক কথার মাঝে একটা বিষয় নিশ্চিত যে মেয়ে দেখতে আসা হয়েছে। হুট করে এত আয়োজনের সাথে না জানিয়ে এসেছে। তাই একটু তাড়াহুড়োই মনে হলো বিল্লাল সাহেবের। বিল্লাল সাহেব কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করলেন। তারপর ধীরে বললেন,
—তা ভাইজান মেয়ে দেখতে এসেছেন ভালো কথা। আমাদের মেয়েরাও বড় হচ্ছে, বিয়ে-শাদি তো দিতেই হবে। কিন্তু সঙ্গে এত আয়োজন কেন? মানে মেয়ে দেখতে এসে এমন বিয়ের আয়োজন..
তার কথা শেষ না হতেই আরিয়ান বলে উঠল,

—সবই আপনার মেয়ের রিপোস্ট।
বিল্লাল সাহেব কপাল কুঁচকে তাকালেন। শব্দটার মানে যেন মাথায় ঢুকল না। প্রশ্ন করলেন,
—রিপোস্ট?
আরিয়ান প্রতিউত্তরে বলল,
—জ্বি আংকেল, আপনার মেয়ে রিপোস্ট করেছিল, এমন ডালা ছাড়া আসলে নাকি সে বিয়ে করবে না। আর আমি চাই না বিয়েতে কোনো বাধা আসুজ, তাই আগেই নিজের দিক ক্লিয়ার করে রাখছি।
কথাগুলো যেন একেকজনের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল। তালহা চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু চোখে স্পষ্ট তীক্ষ্ণতা, আরিয়ানকে পর্যবেক্ষণ করছে।
সবাই অবাক, থতমত। কি বলছে এই ছেলে কিছুই তেমন বুঝে উঠছে না। আফতাব সাহেব একটু দ্বিধা নিয়ে বললেন,
—না মানে বাবা, এই রিপোস্টটা কী?
এবার মেহেদি এগিয়ে এসে বলল,
—আব্বু, এটা ইনস্টাগ্রামের ব্যাপার। ধরো কেউ কিছু পোস্ট করল, আর তোমার তা ভালো লাগলো তাই সেটা নিজের প্রফাইলে শেয়ার করলে, ওটাই রিপোস্ট।
তবুও স্পষ্ট হলো না কেউ তেমন। এসব প্রযুক্তি কমই ব্যবহার করেন সকলে, তাই এই নতুন জগতটা তাদের কাছে কিছুটা অচেনা। শেষে আফতাব সাহেব বললেন,

—আচ্ছা বুঝলাম। কিন্তু হুট করে তো বিয়ের কথা আগানো যায় না। আগে দেখি, আপনারাও দেখেন।
এরমধ্যেই আরিয়ান একটা ফাইল এগিয়ে দিল,
—আপনাদের দিক থেকে কিছু দেখার নেই আমাদের। আপনাদের সুবিধার্থে এই ফাইলে আমাদের পরিবারের ইচ অ্যান্ড এভরিথিং ডিটেইলস আছে। চেক করে নিবেন আংকেল।
বিল্লাল সাহেব আর আফতাব সাহেব একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের অস্বস্তি দেখে সোহেল হোসেন হালকা হেসে বললেন—
—চিন্তা করবেন না, আমার ছেলের কোনো ব্যাড রেকর্ড নেই।
কথাগুলো শোনার পরও সিকদার পরিবারের ভেতরে একধরনের অস্বস্তি রয়ে গেল।
কারণ আলোচনা এগোচ্ছে খুব দ্রুত, যেখানে এখনো ঠিকভাবে দেখাদেখিই হয়নি। তাদের পারিবারিক একটা আলোচনা আছে তাও হয়নি। মেয়ের বিয়ের জন্য প্রস্তুত ও নন তারা এখন। তিতলি বেগম এবার নিজেই কথা বললেন,

—আসলে আপনাদের নিয়ে বা আপনাদের ছেলেকে নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বিয়ে তো একটা সময়ের বিষয়। এমন হুটহাট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আর এটা তো সারাজীবনের ব্যাপার, মেয়ের মতামতও তো গুরুত্বপূর্ণ। তাই চাচ্ছি আস্তে ধীরে কথা আগাতে।
তনিমা এবার মুচকি হেসে বলল,
—আন্টি, মেয়ে তো রাজি। ফাইজা আপু বলেছে বলেই তো আমরা এসেছি।
চমকের উপর চমক পেয়েই যাচ্ছে যেন। তাদের মেয়ে বলেছে আসতে? কই, তাদের তো কিছুই জানানো হয়নি। বুঝলেন ঘটনা এবার। বিল্লাল সাহেব স্ত্রীর দিকে ইশারা করলেন মেয়েকে আনতে। আগে ঘটনাটা ক্লিয়ার হওয়া দরকার। তানিয়া বেগম মেয়েকে আনতে যেতেই বাকি দু’জা উঠে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। শত হোক, মেহমান এসেছে, খালি মুখে এতক্ষণ বসিয়ে রাখা যায় নাকি।
ফাইজা বসে আছে মাথা নিচু করে, সবার সামনে। এই মুহূর্তে সেই-ই যেন সবার কেন্দ্রবিন্দু। বিল্লাল সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে তালহাকে বোঝালেন প্রশ্ন করতে। তিনি সরাসরি মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছেন না। তা বুঝে তালহা সোজা হয়ে বসল।

—ফাইজা, তুই আরিয়ানকে আগে থেকে চিনিস?
ফাইজার তো ভয়ে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সে শক্ত করে ওড়নাটা খামচে ধরে রেখে চুপটি করে বসে আছে। তালহা আবারও একই প্রশ্ন করতেই ফাইজা এবার কাঁপা গলায় বলল,
—হুম..
—পরিবার নিয়ে আসতে বলেছিস?
—ন..না।
—তো তারা কি বলছে?
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

—এই এই, মিথ্যা বলছো কেন? কাল রাতেই না বললে আসতে।
ফাইজা রাগে চোখ তুলে তাকাল, রাগে কিরমিরিয়ে বলল,
—আমি তো এমনিই বলেছিলাম। বললেই আসতে হবে নাকি?
—সে যাই হোক, তুমি বলেছো বলেই এখনই এসেছি।
ফাইজা কটমটে কণ্ঠে বলল,
—কই, আর কথা তো শুনেন না, এই কথা শুনতে গেলেন কেন?
এদের তর্কাতর্কি বাড়তে যাবে, তার আগেই তালহা থামিয়ে দিল
—ওয়েট।
তালহার গলা এবার গম্ভীর হয়ে এলো,
—কাহিনি কী, সব খুলে বল ফাস্ট।
ফাইজা মাথা ফের নিচু করে নিল। আরিয়ান সোজাসাপটা বলল,

—আমার দিকের কাহিনি, আমি তোর বোনকে ভালোবাসি এন্ড আই ওয়ান্ট টু মেইক হার মাই ওয়াইফ। দ্যাট’স ইট..
সবার সামনে এমন নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তিতে ফাইজা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। নিজের বাবার সামনে প্রেমিকের এমন কথা! বিল্লাল সাহেব নড়ে চড়ে বসলেন। বউয়ের দিকে আড়চোখে তাকালেন একবার। উপস্থিত সকলেরই চোখ চাওয়াচাওয়ি চলছে। তালহা এবার সরাসরি ফাইজাকে প্রশ্ন করল,
—আর তুই?
তবে ফাইজা ভয়ে চুপসে আছে। বাপ ভাইয়ের সামনে কি এসব স্বীকার করা যায় নাকি? তার অবস্থা বুঝে তালহা গলার স্বর নরম করল,
—ফাইজা, স্পিক আপ, আমরা শুধু ক্লিয়ার হতে চাচ্ছি। তোর ফিলিংস কি?
ভাইয়ের কথায় এবার ফাইজা আস্তে করে বলল,

—আমিও..
—তুইও কী?
সবার দৃষ্টিই এখন তার দিকে। ফাইজা একটু সময় নিয়ে বলল,
—আমিও পছন্দ করি।
কথাটা শুনতেই আরিয়ান চেঁচিয়ে উঠল,
—এই জাস্ট পছন্দ?
ফাইজা কেঁপে উঠে বলল,
—মানে.. ভালো লাগে।
আরিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল বেশ বিরক্ত হয়েই বলে বসলো,
—জাস্ট ভালো লাগা থেকেই আমাদের বাচ্চার নামও সিলেক্ট করে ফেলেছো?

ব্যস, ফাইজার এখন যেন মাটির নিচে ঢুকে যেতে মন চাইলো। বিল্লাল সাহেবসহ বাকিরাও কেশে উঠলেন। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন সকলেই। তালহা নড়েচড়ে বসে একবার মেহরীনের দিকে তাকালো। এদিকে মেহরীন, তাহিয়া, তনিমা, রাফারা তারা তো পারছে না, অটঠাসিতে ফেটে পড়তে। মুখ চেপে একেকজন হাসি নিয়ন্ত্রণ করছে।
ফাইজা মাথাটা আরও নিচে নামিয়ে ফেলেছে। চোখ কান নাক দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে কখন বের হবে সেই সময়ই গুনছে এখন। তাকে এমন গুজো হয়ে বসতে দেখে আরিয়ান চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠলো,
—ফাইজা, সোজা হয়ে বসো। ঘাড় ব্যথা করবে।
এবার যেন ফাইজার ইচ্ছে করলো গ্লাস একটা তুলে আরিয়ানের মাথায় এক বারি মেরে বলতে, “শালা, মুখটা বন্ধ রাখ আল্লাহর ওয়াস্ত।” তবে পারল না কিছুই করতে। রিতু বোনের অবস্থা বুঝে তার পাশে তাকে ধরে বসল। সঙ্গে সঙ্গে ফাইজা রিতুর এক বাহু আঁকড়ে ধরল। রিতুর মুখেও চাপা হাসি, তবে বড় বোনের হাসা উচিত হবে না তাই নিজেকে সংযত রেখেছে। সোহেল সাহেব ছেলেকে এবার থামালেন। ধমক দিয়ে বললেন,

—তুমি আর একটাও কথা বলবে না, বেয়াদব।
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—আচ্ছা, কিন্তু আগে ফাইজাকে বলো সোজা হয়ে বসতে।
আমেনা বেগম পাশ থেকে রিকোয়েস্ট করে বললেন,
—মা দয়া করে সোজা হয়ে বসো নয়তো এই ছেলের মুখ বন্ধ করাতে পারবো না।
হবু শাশুড়ির প্রথম আদেশ চাইলেও অমান্য করতে পারলো না। একটু সোজা হয়ে বসলো তবে মাথা নিচুই রয়েছে। উপস্থিত সকলেই বুঝলো তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেকটাই গভীর। ছেলে পাগল তাদের মেয়ের জন্য, এতে কারো সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়ের বিয়ের কথা কী করে এগোয়?
তাদের নীরবতা দেখে সোহেল সাহেব আর আমেনা বেগম বুঝলেন তাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলা প্রয়োজন। তাই বললেন,

—হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই আপনাদের। আপনারা একবার নিজেদের মধ্যে কথা বলে দেখতে পারেন। আমাদের এতে কোনো আপত্তি নেই।
তারপর সিকদার পরিবার উঠে গেল কিছুক্ষণের জন্য। রান্নাঘরে জমলো তাদের কথাবার্তা। তালহার মামাদের ডাকা হয়েছিল তবে তাদের পারিবারিক বিষয়ে উনারা কি বলবে তাই তারা আসেননি এ বিষয়ে। কিছুক্ষণ নিজেদের মতো কথা বলে বড়রা আবার ফিরে এলো। বিল্লাল সাহেব তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন,
—ছেলে-মেয়ে যেখানে রাজি, সেখানে আপত্তি তো আমাদেরও নেই। কিন্তু বড় মেয়ে রেখে ছোট মেয়ের বিয়ের কথা এগোনোটা কেমন না?
কথাটা শুনতেই আরিয়ান অবাক সুরে বলে উঠল,
—রায়হান ভাই এখনো পরিবার পাঠায়নি?
“রায়হান” নামটা শুনতেই রিতু খুকখুক করে কেশে উঠল। তাও যেই সেই কাশি না, বিষম খেয়েছে সে। মেহরীন তাড়াতাড়ি পানি এনে দিতেই এক ঢুকে একগ্লাস পানি খেয়ে নিল। চোখে-মুখে বেচারির অস্থিরতা ফুটে উঠেছে। এদিকে বিল্লাল সাহেব কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,
—রায়হান কে?
আরিয়ান রিতুর দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন করল,
—আপু এখনো পরিবারে জানাননি?
রিতুর তো চোখ ছানাবড়া। বিল্লাল সাহেব এবার মেয়ের দিকে ফিরলেন, কিছু একটা আন্দাজ করে রাগী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

—রায়হান কে, রিতু?
রিতু ঢোক গিলে বলল,
—আ..আমার ফ্রেন্ড।
তালহা প্রশ্ন করল,
—জাস্ট ফ্রেন্ড?
রিতু নড়েচড়ে বলল,
—মানে একটু ক্লোজ ফ্রেন্ড।
তালহা এবার উঠে দাঁড়াল। বুঝলো বোনেরা আর ছোট নেই, নিজের লাইফের ডিসিশন নিজেই নেওয়ার পর্যায়ে চলে এসেছে। তাদের সঙ্গে এবার তার কথা বলা উচিত এবার। বিল্লাল সাহেবের দিকে ফিরে বলল,
—ওদের সঙ্গে একা কথা বলতে চাই।
উনি মাথা নেড়ে অনুমতি দিতেই তালহা রিতু আর ফাইজাকে নিয়ে দাদির ঘরের দিকে চলে গেল। এদিকে তালহার দাদি-নানি আরিয়ানের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছে, ছেলেটাকে তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে। আরিয়ানও কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই বুড়ির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছে, হাসি-ঠাট্টায় যেন একেবারে ঘরের ছেলেই হয়ে উঠেছে সে।
তনিমা মেহরীনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সেই কখন থেকে। অস্বস্তিতে পড়েছে মেহরীন। শেষমেশ ঝাড়ি মেরে উঠল,

—এভাবে দেখার কী আছে, আজব?
তনিমা সন্দিহান চোখে চেয়ে বলল,
—মুখটা একটু বেশি গ্লো করছে, কিছু ইউজ করিস নাকি?
মেহরীন অবাক হয়ে বলল,
—কী ইউজ করব?
—তো এত সুন্দর হয়ে যাচ্ছিস কেন?
পাশ থেকে তাহিয়া বলে উঠল,
—আরে বুঝিস না, জামাইর আদরে। জামাইর সোহাগ পেয়ে সুন্দর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
শুরু হলো দুটোর এসব কথাবার্তা। নাক-কান গরম হয়ে উঠল মেহরীনের। এদের লাগামছাড়া কথাবার্তা থামাতে ঝাড়ি মেরে উঠল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৩

—চুপ, ফালতু কথা বাদ দিবি?
এর মধ্যেই হঠাৎ একটা গলা শোনা গেল। পরিচিত গলা শুনে অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখা গেল রাফি আর ফারিন দাঁড়িয়ে আছে। রাফি ঢুকেই সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিল,
—আসসালামু আলাইকুম, দিস ইজ মি রাফি, এন্ড সি ইজ মাই সেক্রেটারি ফারিন…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৫