প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৫
সাইদা মুন
—আসসালামু আলাইকুম, দিস ইজ মি রাফি, এন্ড সি ইজ মাই সেক্রেটারি ফারিন…
তার এহেন পরিচয়ে ফারিন পেছন থেকে ঠাস করে এক কিল বসাল রাফির পিঠে। “ওমা” বলে লাফিয়ে উঠতেই ফারিন এগিয়ে এলো। মুহূর্তেই নিজের ভঙ্গি পাল্টে নিল। এখন ঠোঁটে ভদ্র হাসি, চোখে মৃদু লজ্জা। সবার উদ্দেশ্যে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম, আংকেল-আন্টি। কেমন আছেন আপনারা?
বড়রাও সালামের উত্তর দিলেন। এদিকে যেন বাঁধভাঙা আনন্দে ছুটে এসেছে তাহিয়া আর মেহরীনের। এতদিন পর প্রিয় মুখগুলোকে সামনে পেয়ে উচ্ছ্বাস আর ধরে রাখা গেল না। ছুটে গেল দুজন। ফারিনকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে আত্মহারা একেকজন। অন্যদিকে রাফি যেন খানিকটা অসহায় দর্শক। বেচারা ছেলে হয়ে একা হয়ে গেল। মেয়ে হলে হয়তো এই মিলনে সেও সঙ্গি হতো।
তার অসহায়ত্ব টের পেয়ে মেহেদি হেসে এগিয়ে এলো, চোখে তার দুষ্টু ঝিলিক,
—চলুন ভাইয়া, আমরাও একটু কোলাকুলি করে নিই।
বলেই জড়িয়ে ধরল রাফিকে। পরক্ষণেই দু’জনের হাসিতে জমে উঠল পরিবেশ। তাহিয়া এরই মধ্যে ছুটে গেছে মায়েদের ডাকতে। আজ তার সব বেস্ট ফ্রেন্ড একত্র হয়েছে, সকলের সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে তো । একে একে তিতলি বেগম, তানিয়া বেগম, সালমা বেগম, সবাই এলেন। পরিচয়ের পর পরিচয়, হাসির পর হাসি, ঘরটা যেন প্রাণ ফিরে পেল। সকলের কথাবার্তায় ভরে উঠলো।
এইসব উচ্ছ্বাসের মাঝেই নিরবতা নিয়ে এসে থামল তালহা, সঙ্গে রিতু আর ফাইজা। মুহূর্তেই যেন পরিবেশের সুর বদলে গেল। কথা থেমে গিয়ে নিঃশব্দ প্রশ্ন ভেসে উঠল সবার চোখে, কী হলো? কী সিদ্ধান্ত নিল তালহা?
তালহাকে দেখতেই রাফি এগিয়ে গেল,
—আসসালামু আলাইকুম, দুলাভাই। কেমন আছেন?
তালহা স্মিত হাসল,
—ওয়ালাইকুম আসসালাম। এই তো, আলহামদুলিল্লাহ। তুমি বলো, কি অবস্থা?
—আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই।
ফারিনও এগিয়ে এসে সালাম জানাল, একই সম্বোধনে, “দুলাভাই”। তালহাকে পরপর একই সম্বোধন করতে শুনে সোহেল হোসেন আর আমেনা বেগমের মনে প্রশ্ন জাগলল। কৌতুহল বাড়ল দুলাভাই কেন ডাকছে তা জানতে। কৌতূহলটা আর চেপে রাখতে পারলেন না। সোহেল সাহেব প্রশ্ন করেই বসলেন,
—তালহা বাবা, তুমি কি বিবাহিত?
বিল্লাল সাহেবের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। নিজেই উত্তর দিলেন,
—জি, আমাদের ছেলে বিবাহিত।
তা শুনে দু’জনেই বলে উঠলো ” মাশাল্লাহ”। তবে মনে খানিকটা বিস্ময় রয়েই গেছে। উৎসুক কণ্ঠে জানতে চাইলেন আমেনা বেগম
—তা পুত্রবধূ কোথায়, এখনো অব্দি দেখলাম না তো?
এইবার যেন নিজের সময় পেয়ে গেলেন তালহার দাদি। চোখে গর্বের দীপ্তি। মুখ প্রশারিত করে বড়সড় এক হাসি দিয়ে বললেন,
—তালহা, আমার চাঁদমুখখানা নাতবউকে ডাকো তো।
দাদির কথায় মৃদু হাসল তালহা। একটু লজ্জা পেল নিজের বউয়ের প্রশংসায়। মাথা চুলকে ধীর দৃষ্টিতে তাকাল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ির নিচে ফাঁকা জায়গায় তিনজন বসার মতো একটা সোফা আছে। সেখানেই নিয়ে গেছে বান্ধুবিদের। সেখানে বসেই গল্পে মশগুল ছিল তাহিয়া আর মেহরীন। তালহা ডেকে উঠল,
—মেহরীন…
হঠাৎ নিজের নাম ধরে ডাক শুনে মেহরীন চুপ করে গেল। কে ডাকছে বুঝতে চেষ্টা চালানোর মাঝেই তালহা আবারও ডাকল,
—মেহরীন একটু এদিকে আসো।
তালহার গলা বুঝতেই দ্রুত উঠে দাঁড়াল। মাথার ওড়নাটা ঠিক করতে করতে এগিয়ে গেল সেদিকে। গুটিগুটি পায়ে তালহার সামনে গিয়ে থামল। আস্তে করে উত্তর নিল,
—জ্বি ডাকছিলেন?
তালহা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেই আচমকা এক হাতে মেহরীনের বাহু টেনে নিজের সঙ্গে দাঁড় করালো। মেহরীন চমকে তালহার গা ঘেঁষে দাড়াল। তার দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকাতেই সে পকেটে দু’হাত গুঁজে সামনে ফিরল। হাসিমুখেই বলল,
—উনিই মিসেস তালহা সিকদার।
বিস্মিত হলেন আমেনা বেগম,
—মেহরীন তোমার বউ?
তালহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই উনি বললেন,
—কিন্তু বয়স তো অল্প, তনিমার সঙ্গের না?
উনার বিভ্রান্তি দূর করতে পাশ থেকে তিতলি বেগম এগিয়ে এলেন। হাতে উনার নাস্তার থালা। পিছে বাকি দু’জা ও এসেছেন। নানান নাস্তায় টেবিল সাজাচ্ছে তারা। ট্রেটা রেখেই আমেনা বেগমের দিকে ফিরলেন।
—আসলে ভাবি, ছেলে-মেয়ে একে অপরকে পছন্দ করে। হালাল কাজে দেরি কিসে? তাই আর দেরি করিনি, আকদ পড়িয়ে রেখেছি। তবে বয়স হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হবে। আপাতত মেহরীন আমার মেয়ে।
এবার যেন তিনি একটু শান্ত হলেন। উনার বিভ্রান্তি দূর হলো। হালকা হেসে বললেন,
—ওহ, খুব ভালো করেছেন। মেয়েটাও ভীষণ মিষ্টি দেখতে। তনিমার থেকে কত শুনেছি ওর নাম। খুব ভালো লাগলো জেনে।
মেহরীন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে লজ্জার ছাপ। কারো সামনে তাকে বউ বলে পরিচয় দিলেই কেমন যেন লজ্জা এসে ঘিরে ধরে। বড্ড লজ্জা লাগে “তালহার বউ” পরিচয়টা কেউ সকলের মাঝে বললে। তালহা একপলক মেহরীনকে পরখ করে তার অস্বস্তি কাটাতে বলল,
—তুমি যাও, ওদের সময় দাও।
মেহরীন মাথা নেড়ে সরে যেতেই ঘরের আবহটা ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠল। গিন্নিরাও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সবাই একসঙ্গে বসতেই তাহিয়ারাও এদিকটায় এগিয়ে এলো, বিয়ের কথা উঠবে, এই ভেবেই তাদের চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা। তালহা চুপ করে আছে দেখে সোহেল হোসেন নিজেই কথাটা তুললেন,
—তা বাবা, এখন তোমাদের মতামত কী?
তালহার মুখটা কঠিন হয়ে এলো। কিছু যেন ভাবছে সে। ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বোনদের দিকে একবার তাকাল। তারপর গম্ভীর স্থির কণ্ঠে বলল,
—পরিবারের কাছে সন্তান সবসময়ই ছোট থাকে, স্নেহের থাকে। মেয়েরা কখন যে বড় হয়ে ওঠে, তা বুঝে ওঠা যায় না। মনে হয় চোখের পলকেই বেড়ে উঠে তারা। রিতু, ফাইজা, তাহিয়া, ওরা শুধু আমার না, আমাদের সবারই খুব আদরের। এই বাড়ির তিন রাজকন্যা। রিতুর বিয়ের কথা নিয়ে হালকা পাতলা ভাবলেও, ফাইজার বিয়ের কথা এখনো মাথায়ই আসেনি কারো। তাই হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, একটু কঠিনই।
একটু থেমে তার গলাটা নরম হয়ে এল,
—যেহেতু আমার বোন ইতিমধ্যেই কাউকে পছন্দ করে ফেলেছে, সেক্ষেত্রে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর মতো ভাই আমি নই। ছোটবেলা থেকে তারা আমাদের দেখে বড় হয়েছে, তাদের বাবা ও ভাইদের চরিত্র, মূল্যবোধ সবকিছুই তারা খুব কাছ থেকে দেখেছে।
ঘাড় হালকা কাত করে তাকাল রিতু-ফাইজার দিকে,
—আই হোপ, নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা একজন উপযুক্ত মানুষকেই বেছে নিয়েছে। যে তাদের আমাদের মতোই আগলে রাখবে। তাছাড়া আরিয়ান আর রায়হানকে পার্সনালি আমি দেখেছি, চিনি। তাই এখানে আমার আর কোনো আপত্তি বা দ্বিধা নেই। আমার বোন যেখানে সুখী, সেখানে আমারও সম্মতি আছে।
এই কথাগুলো যেন সোজা গিয়ে আঘাত করল রিতু আর ফাইজার হৃদয়ে। এতক্ষণ শক্ত হয়ে থাকলেও হঠাৎই যেন একটা ভয় মনে কাজ করতে লাগলো। হারানোর ভয়, পরিবার হারানোর। বুক ব্যথা করে উঠল। দুজন একসঙ্গে এগিয়ে গেল তালহার কাছে, ঠিক যেমন ছোটবেলায় মারামারি করে একসঙ্গে বিচার দিতে দুজন এগিয়ে যেত। ছলছলে চোখে চেয়ে আছে ভাইয়ের মুখের দিকে। মনে হচ্ছে তাদের ভাই এখনই তাদের পর করে দিয়েছে। ধরে রাখা চোখের জল আর থামল না। গড়িয়ে পরতে লাগল। তা দেখে তালহা তাদের হাত রাখতেই তারা ছোট্ট বাচ্চার মতো হুহু করে কেঁদে উঠলো, ভাইয়ের বুকে মুখ লুকাল। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে তাঁরা।
তালহা দু’হাত তাদের মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছে। মৃদু হাসল, কণ্ঠে স্নেহের পরশ,
—আরে পাগল, এখনই কি চলে যাচ্ছিস নাকি? বললেই দিয়ে দিব? বিয়ে এত তাড়াতাড়ি দিচ্ছি না, দেরি আছে।
কথাটা যেন সান্ত্বনা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু উল্টো কান্না আরও বেড়ে গেল। এই ঘর, এই মানুষগুলো, যাদের সঙ্গে এতদিনের বেড়ে ওঠা হাসি-কান্না সব। তাদেরই নাকি ছেড়ে যাওয়ার কথা চলছে। এতক্ষনের বিয়ে নিয়ে এক্সাইটেড তাহিয়াও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সেও ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল দু’জনকে। তিন বোনের এই জড়াজড়ি, কান্না সামলাতে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে যেন তালহা।
ঘরে উপস্থিত সবার চোখেই জল চিকচিক করছে। আসলেই এই সময়টা অনেক হৃদয়বিদারক। যেই মানুষগুলো ছাড়া একমুহূর্ত ও কাটানো যায় না, একসময় তাদের ছাড়াই বাকি জীবন পার করতে হয়। বিয়ে যেমন খুশির আমেজ নিয়ে আসে তেমনই দুঃখ দিয়ে সমাপ্তি ঘটায়। তালহা বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে, নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলেও সে ভাঙতে চাচ্ছে না সামনে। ভাই-বোনের সামনে সে তো স্ট্রং।
একপাশে দাঁড়িয়ে ফারিন, তনিমা, মেহরীন, তিনজনই চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তাদের চোখেও জল, নিরব তারা। ঘরের কোণের দিকে মেহেদি বসে ছিল ঠোঁট উল্টে। ছেলেরা নাকি কাঁদে না, কিন্তু তার চোখের লালচে ভাব বলছিল অন্য কথা। শেষমেশ আর নিজেকে সামলাতে পারল না, হঠাৎ শব্দ করে কেঁদে উঠল।
সবাই চমকে তাকাল তার দিকে। রিতু-ফাইজা-তাহিয়াও থেমে গেল। বিল্লাল সাহেব তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন,
—এই তুই কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে বাবা?
মেহেদি কাঁদতে কাঁদতেই উনাকে জড়িয়ে ধরল,
—আপুর, বিয়ে হয়ে যাবে। বি…য়ে দিও না।
কথাগুলো ঠিকমতো জোড়াও লাগাতে পারছে না সে কান্নার ফলে। তার এই সরল উক্তিগুলো শুনে মুহূর্তেই ঘরে হাসির ঢেউ উঠল। বোন বুঝি সারাজীবন ঘরে রাখা যায়? রিতুরা এগিয়ে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে নিল।
তবে আরিয়ান আর চুপ থাকতে পারল না বলে উঠল,
—বউয়ের সাথে নাকি শালি ফ্রি থাকে। আমার শালি লাগবে না, শালাকেই ফ্রি দিলেই চলবে।
তারপর মেহেদির দিকে তাকিয়ে বলল,
—এই শালা, এত কান্নাকাটির কী আছে? বউয়ের সাথে তোমাকেও নিয়ে যাবো। কয়দিন এই আপুর বাড়ি, কয়দিন ওই আপুর বাড়ি থাকবে। তারপর সময়মতো বউ এলে সব ভুলে যাবে.. কেমন?
তার কথায় আবারও হেসে উঠল সবাই। তবুও মেহেদি চুপচাপ, রিতুকে শক্ত করে ধরে আছে, যেন ছাড়তে চাইছে না। পরিস্থিতি হালকা করতে তিতলি বেগম বললেন,
—আচ্ছা, আপনারা নাস্তা নিচ্ছেন না কেন? খাওয়া শুরু করেন। এই তাহিয়া, তোর ফ্রেন্ডদেরও বসা সেই কখন থেকে সবাই খালি মুখে আছে।
তারপর একে একে সবার হাতে নাস্তা তুলে দিতে লাগলেন। সাথে মেহরীনও হাত লাগিয়েছে । রান্নাঘরে বাকিরা দুপুরের রান্না চাপিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরভর্তি হয়ে উঠল কোলাহলে, আড্ডা, হাসি, গল্পে জমজমাট পরিবেশ। এইসবের মাঝেই তালহা উঠে গেল, রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে আস্তে করে মেহরীনকে বলে গেল, রুমে যেতে।
মেহরীন শুনলেও হুট করে যেতে ইতস্তত করল। শাশুড়ির সঙ্গে নিজে থেকেই কাজে লেগেছে, আবার হুট করে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে? এই ভেবেই হাত চালাতে লাগল। এর মাঝেই তিতলি বেগম হঠাৎ বললেন,
—মেহরীন, দেখে আয় তো তালহার কিছু লাগবে কিনা।
কথাটা শুনেই চমকে তাকাল সে। তিতলি বেগম চোখের ইশারায় আবার যেতে বলতেই মেহরীন মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে সরে এল। ঘরে ঢুকতেই দেখল তালহা শার্টের বোতাম খুলছে। সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—আজ আর অফিসে যাবেন না?
তালহা মাথা নেড়ে বলল,
—উহু।
মেহরীন এগিয়ে গেল ওয়ার্ড্রবের দিকে। ড্রয়ার খুলে একটা নেভি-ব্লু কালার পাঞ্জাবি বের করল, সঙ্গে সাদা প্যান্ট। তারপর গেল বারান্দায়, টাওয়াল হাতে এসে সব এগিয়ে দিয়ে বলল,
—নিন, ফ্রেশ হয়ে আসুন।
তালহা কাপড়গুলো বিছানায় রাখল। মেহরীনকে টেনে নিয়ে গেল আয়নার সামনে।
—আপাতত এসব রাখো, চুপ করে দাঁড়াও এখানে।
বলেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকাল। মেহরীন আয়নায় তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে দেখছে, কি করছে সে! পরপরই তালহা পকেট থেকে বের হলো একটা গোলাপ। পকেটে থেকে চেপে যাওয়ায় ফুলটা একটু বেঁকে গেছে, কিছু পাপড়ি ঝরে পড়ার উপক্রম। তালহা সেগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর মাথা থেকে ঘোমটা-টা নামিয়ে দিল।
মেহরীনের খোঁপায় লাল গোলাপটা গেঁথে দিচ্ছে তালহা। ফুল দেখে বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
—এই ফুল কোথায় পেলেন?
তালহা ভাবলেশহীনভাবে বলল,
—বাহিরে…
মেহরীনের চোখ গোল হয়ে গেল।
—কিইই! আপনি ওই ভ্যান থেকে ফুল চুরি করেছেন?
—ওই ফুল দেখে আমার ফুলের কথা মনে পড়ে গেল, তাই একটা নিয়েছি। ও চুরি-টুরি না…
কথাটা শুনে মেহরীনের মুখে হাসি ফুটে উঠল, একেবারে মনভরা হাসি। হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও মানুষটা তার কথা ভুলে না। বিষয়টা মনে ধরল। আলাদা এক স্নিগ্ধ বাতাস ছুঁয়ে গেল তাকে। আয়নায় তালহার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলক। কত মন দিয়ে সে খোঁপায় ফুলটা গেঁথে দিচ্ছে, যেন এটাই এখন তার সবচেয়ে জরুরি কাজ।
ফুলটা গুঁজে দেওয়া শেষ হতেই তালহা তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মোবাইল বের করল। ব্যাক ক্যামেরা অন করে এক হাতে মেহরীনের কোমর টেনে কাছে নিয়ে আসলো। মেহরীনও অজান্তেই দু’হাতে তালহার গলা ধরল। কপালে কপাল ঠেকতেই আয়নায় টানা কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল সে।
ছবি তোলা শেষ হতেই তালহার হাতের বাধন ছুটলো। সুযোগে মেহরীনও সরে এল। দরজার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৪
—কেউ যদি চলে আসত! আপনিও না..
তালহা কাপড় হাতে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে হেসে বলল,
—এক কাপ কফি হবে, ম্যাডাম?
মেহরীন হালকা মাথা নেড়ে বলল,
—জ্বি অবশ্যই, আপনি গোসল সেরে আসুন, আমি নিয়ে আসছি…
