Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯
অরাত্রিকা রহমান

রায়ান ধীরে ধীরে মিরার দিকে ঝুঁকে এলো। তার চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা, ঠোঁটে একগুঁয়ে দাবির ছাপ। মিরা কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন বেড়েই চলেছে। মিরা নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করলো আর দুহাতের মুঠোয় নিজের ওড়না খামচে ধরলো। রায়ানের মুখটা যখন ঠিক মিরার মুখের খুব কাছে, ঠিক তখনই—
“রিভান, আমি এই বক্সে কিছু খাবার দিয়ে দিলাম। খিদে পেলে খেয়ে নিস তোরা।”
রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে দু’জনই যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সরে দাঁড়াল। মিরা তাড়াহুড়ো করে নিজের চুল আর ওড়নাটা ঠিক করে নিল, মুখ লাল হয়ে গেছে লজ্জায়। আর রায়ান দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করল, বিরক্তিতে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো-“এতো বাজে টাইমিং কিভাবে হয় মানুষের?”
রায়ানের মুখ থেকে অস্পষ্ট কথাটা বেরিয়ে এলো। ভেতর থেকে শফিক রহমান আর রোকেয়া বেগম দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দুজনে মুচকি হেসে দু’জনের দিকে তাকালেন। তাদের চোখে ছিল এক ধরনের বুঝে ফেলার ইঙ্গিত। রোকেয়া বেগম তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন-

“কি হলো? এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
মিরা মাথা নিচু করে ফেলল। তার গাল লাল টুকটুকে, যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া কোনো অপরাধী। শফিক রহমান দৃশ্যটা দেখে মৃদু হাসলেন মনে মনে। রায়ানের মুখের বিরক্তি তার চোখ এড়ালো না।
রায়ান ঠোঁট কামড়ে জোর করে হাসলো-
“তেমন…কিছু না চাচি। তোমাদেরই অপেক্ষা করছিলাম।”
কিন্তু তার চোখের ভাষা যেন বলছিল—”আর পাঁচ মিনিট পরে এলেও হতো!”
রোকেয়া বেগম এগিয়ে এসে মিরার মাথায় হাত রেখে বললেন-
“নিজের খেয়াল রাখবি। সময়মতো খাবি, বিশ্রাম নিবি।”
মিরার চোখ নরম হয়ে এলো। সে ভেজা গলায় বলল- “জ্বি, চাচি।”
শফিক রহমানও স্নেহভরা গলায় বললেন-
“ভালো থাকিস মা। কোনো দরকার পড়লে আমাকে জানাবি কিন্তু। আর রায়ান তো আছেই। ও যেহেতু আছে চিন্তা একটু কমই হবে আমার।”

মিরা রায়ান উভয়ই শফিক রহমানের মুখে রায়ানের প্রশংসা শুনে অবাক হলো। রায়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হাসলো। মিরা সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। তার চোখে কৃতজ্ঞতা, মায়া আর বিদায়ের কষ্ট একসাথে মিশে আছে। সবশেষে রায়ান গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ালো। তবে রায়ানের মুখে এখনো বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। মিরা সেটা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো। গাড়িতে ওঠার আগে ধীরে বলল-
“এতো হ্যান্ডসাম মুখটাকে এমন করে রেখেছেন কেন?”
রায়ান নিচু স্বরে জবাব দিল-
“কারণ আমার খুব দরকারি একটা কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।”
মিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। মিরা রায়ানের জবাবে ঠোঁট কামড়ে হালকা হেসে ফেলল। তার চোখে তখন লজ্জার সঙ্গে মিশে ছিল একরাশ কোমলতা। সে ধীরে ধীরে রায়ানের একটু কাছে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল—

“এত মন খারাপ করবেন না… আপনার পাওনা আমি বাকি রাখবো না।”
রায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো- “মানে?”
মিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নরম গলায় বলল—
“এত মানে বোঝাতে পারবো না‌‌। আপনার ক্রেভিংস মেটালেই তো হলো, তাই না?”
রায়ানের বিরক্ত মুখে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠলো। চোখে সেই আগের দুষ্টু ঝিলিক ফিরে এলো- “ইউ প্রমিস দ্যাট?”
মিরা ছোট্ট করে মাথা নাড়লো। সবকিছু শেষে দু’জন গাড়িতে উঠে বসল। পিছনে দাঁড়িয়ে রোকেয়া বেগম মুচকি হাসছিলেন আর শফিক রহমান মাথা নেড়ে বললেন- “যৌবন জিনিসটাই আলাদা। আহ, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেলো।”
রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের কথায় অস্বস্তি প্রকাশ করে বললেন- “বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে নাকি আপনার। বাচ্চারা শুনলে কি ভাববে? চুপ করুন।”
মিরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, আর রায়ান স্টিয়ারিং আঁকড়ে ভেতরে ভেতরে ঠিক করলো— অসম্পূর্ণ হিসাবটা সে খুব শিগগিরই মিটিয়ে নেবে। গাড়ি চলতে শুরু করলে কিছুটা দূরত্বে গিয়ে রায়ান একবার পাশ ফিরে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল—

“সময়ের সাথে সাথে ক্রেভিংসের দৈর্ঘ্য সীমা বাড়লে তোমারই সামলাতে কষ্ট হবে। আমি কিন্তু কারো দেওয়া প্রমিস সহজে ভুলি না।”
মিরা রায়ানের কোলে নিজের দু পা তুলে, জানালার বাইরে তাকিয়ে আপেল কামড়ে খেতে খেতে নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিল— “আমিও না।”
মিরা আপেলে বড় করে একটা কামড় দিয়ে সেই আপেলের অংশ টুকু মুখ থেকে বের করে হাত বাড়িয়ে রায়ানের মুখের দিকে এগিয়ে দিল। রায়ান এতে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে মুখ খুলে সেটা মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে হতাশ হয়ে বলল-
“চাইলাম স্ট্রবেরি, খাওয়াচ্ছে আপেল..! এটা কিছু হলো?”
মিরা রায়ানের কথায় মুচকি হাসলো। রায়ান কে আরেকটু জ্বালাতে মিরা রায়ানের কোল থেকে তার পা নামিয়ে গাড়ির ফ্রন্ট মিরর টা নিজের দিকে সেট করলো। রায়ান ড্রাইভিংয়ের পাশাপাশি অবাক চাহুনিতে মিরার কান্ড কারখানা দেখছে বারংবার। মিরা তার মিনি পার্স থেকে একটা লিপ বাম বের করে সেটা খুব মনোযোগ সহকারে নিজের ঠোঁটে লাগালো। রায়ান আড়চোখে তাকে খেয়াল করছে দেখে মিরা নিজের মুখ রায়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে তার ঠোঁটে গোল করে জিজ্ঞেস করলো-

“দেখুন তো স্ট্রবেরির মতো দেখতে লাগছে কিনা..!”
পাহাড়ি পথের নীরবতা যেন এক মুহূর্তে আরও ঘন হয়ে উঠলো। রায়ান বিস্ময়ে মিরার দিকে তাকিয়ে আছে।
রায়ানের চোখে এখন অদ্ভুত এক অস্থিরতা— যেন সে নিজের সংযমটুকু ধরে রাখতে লড়ছে নিজের সাথে। তবে প্রতিবারের মতো সে পরাজিত তার প্রিয়তমার মায়ার কাছে। রায়ান অস্থির হয়ে ধীরে ধীরে মিরার দিকে ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বলল—
“স্ট্রবেরিস শুড বি ইটেন নট জাস্ট সিন, হার্ট বার্ড।”
অতঃপর রায়ান দ্রুত গাড়িটা হঠাৎ রাস্তার ধারে থামিয়ে দিল। ব্রেক কষার শব্দে মিরা সামান্য চমকে তার দিকে তাকালো। তারপরই বুঝলো— রায়ানের চোখের ভেতর কিছু বদল ঘটেছে। একটু আগের সেই স্বাভাবিক, ঠান্ডা দৃষ্টি নেই সেখানে। বরং এক ধরনের অস্থিরতা, চাপা উন্মাদনা— যেন মিরার ওই একটুখানি দুষ্টুমি তার সমস্ত সংযম এলোমেলো করে দিয়েছে। রায়ান কিছুক্ষণ শুধু তার ঠোঁটের দিকেই তাকিয়ে রইল। যেন পৃথিবীর আর কিছুই তার দৃষ্টিতে ধরা পড়ছে না।

মিরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি থাকলেও তার চোখে লজ্জার নরম পরত দেখা দিল। রায়ান এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন অনুমতি চাইছে চোখের ভাষায়। তারপর খুব আলতো করে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। মিরার লিপবামের হালকা স্ট্রবেরির স্বাদ এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়াল রায়ানের মাঝে। মিরার আঙুল অজান্তেই রায়ানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরলো। তার চোখ বুজে এলো, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন নিজের ছন্দ ভুলে গেছে। রায়ান একটু সরে এসে কপাল ঠেকালো তার কপালে। নিঃশ্বাস দুটো তখনও এলোমেলো। মিরা উষ্ণ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ফিসফিসিয়ে বলল—
“স্লো ডাউন হাবি.. প্লিজ!”
রায়ানের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটলো। সে মিরার নাকের ডগায় আলতো টোকা দিয়ে বলল—
“শুশ… খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই, হৃদপাখি। আই ডোন্ট লাইক ইট। লেট মি হ্যাভ মাই মিল।”

খান বাড়ি~
অনেকক্ষণ শাড়ি নিয়ে যুদ্ধ করার পর হাঁপিয়ে উঠে ড্রেসিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল সোরায়া। একদম নিরুপায় হয়ে। বিরক্তি ও পরিশ্রমে কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে তার। শশুর বাড়িতে তার প্রথম সকাল, শাড়ি না পড়লে খারাপ দেখায় এমন ধারণা সোরায়া। যার জন্যই এতো কশরত। হঠাৎ ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল এক পরিচিত কণ্ঠ,
— “আর ইউ স্ট্রাগলিং, মাই ডিয়ার বউ জান?”
হঠাৎ মাহিরের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল সোরায়া। অবাক চোখে বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল, মাহির আরাম করে বসে আছে নিজের হাতের উপর ভর দিয়ে। ছেলেটার চোখে নিজের জন্য একরাশ মুগ্ধতা দেখতে পেল সে, আর ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। সোরায়ার হৃদয় কম্পিত হলো। নিজের অবস্থার কথা মনে পড়তেই সোরায়ার মুখ লাল হয়ে উঠল। শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোটে দাঁড়িয়ে আছে সে মাহিরের সামনে। তাড়াহুড়ো করে উল্টোপাল্টা শাড়িটা গায়ে জড়াতে গেল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেটাও পা ছুঁয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। দৃশ্যটা দেখে মাহির মৃদু হেসে কম্ফোরটারের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফেলল লজ্জায় আর বলে উঠলো-
“সকাল সকাল এমন কিউট এর মধ্যে হট কাজ কারবার দেখলে আমি সিওর পাগল হয়ে যাবে। দয়া করো আমার উপর একটু জান।”
সোরায়া অসহায়ের মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মাহিরের এমন কথার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে? মাহির মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় বলল,

— “কাছে এসো।”
সোরায়া নড়ল না। মেয়েটার মনে অদ্ভুত এক ভয় বাসা বেঁধেছে। হয়তো সেটা ভালোবাসা ও আদরের ভয়। মাহির এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,
— “কাছে আসতে বলেছি আমি।”
সোরায়া ভয়ে হালকা করে না সূচক মাথা নাড়তেই মাহির চোখ সরু করে বলল,
— “তুমি নিজে কাছে এলে যতটুকু অংশ তোমার গায়ে আছে, ততটুকুই থাকবে। কিন্তু যদি আমাকে গিয়ে আনতে হয়… তখন কী হবে, তার দায় আমি নেব না।”
কথাটা শুনে সোরায়ার বুক ধক করে উঠল। তাড়াতাড়ি মেঝেতে পড়ে থাকা শাড়িটা গুছিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে মাহিরের কাছে গিয়ে বসল বাধ্য মেয়ের মতো। তবে একটু দূরত্ব রেখেই বসলো। মাহির সেটা খেয়াল করল। সে একটানে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। সোরায়া ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় তার গায়ে গিয়ে পড়ল।
মুহূর্তের জন্য দু’জনেই চুপ। তারপর মাহির মাথাটা আলতো করে সোরায়ার কাঁধে রেখে শান্ত স্বরে বলল,
— “এত জেদ করে একা একা সব করতে হবে কেন জান? ইউ হ্যাভ আ হাসবেন্ড। রাইট? ইউজ হিম‌।”
সোরায়ার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। লজ্জা, অস্বস্তি আর এক অদ্ভুত অচেনা অনুভূতি মিলেমিশে তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। মাহির সোরায়ার ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলো-
“একা শাওয়ার নিতে সমস্যা হয় নি?”

সোরায়া কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। তার গলা শুকিয়ে আসছে। শুধু মাথা নাড়লো সে। মাহির সোরায়ার কাঁধে উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল বলল-
“তোমার সমস্যা না হলেও, আমার সমস্যা আছে তোমার একা শাওয়ার নেওয়া তে।”
সোরায়া এবার আর চুপ থাকতে পারলো না। অন্তরের ভয় তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। সোরায়া নিচু কণ্ঠে বলল- “আপনি তো ঘুমাচ্ছিলেন। তাই জাগাই নি।”
মাহির সোরায়ার কথা শুনতে শুনতে মেয়েটার উন্মুক্ত মসৃণ পিঠে নিজের গালের ঘর্ষণ করে আনমনে বলল-
“তাহলে তুমিও আমার সাথে ঘুমাও নি কেন? এসব ক্রিমিনালাইজড কাজ কর্মের শাস্তি ভীষণ অসহ্যকর হবে তোমার জন্য।”
হোরায়রা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল-
“এ্যালার্মে ঘুম ভেঙে গেছিল তাই আর ঘুমাতে পারি নি। আর হবে না। সরি।”
মাহির সোরায়াকে ভয় দেখাতে সফল হয়েছে বলে মুচকি হাসলো। অতঃপর এক টানে সোরায়াকে বিছানায় ফেলে দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে সোরায়ার বুকের কাছে ঠেস দিয়ে শুয়ে পড়ল, যেন এই মুহূর্তের শান্তিটুকুই তার দরকার। সোরায়া থমকে গেল হঠকারিতায়। তার হৃদস্পন্দন যেন আরও দ্রুত হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ দ্বিধায় থাকার পর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মাহিরের মাথায় আলতো করে হাত রাখল।
ঘরজুড়ে নেমে এল এক নীরব, কোমল শান্তি। সোরায়ার হৃদস্পন্দনের শব্দ মাহিরছর কানে বাজতেই মাহির এক গাল বাঁকা হেঁসে বলল-

“শান্ত হও। হার্ট ব্লাস্ট করবে তো।”
সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে জিজ্ঞেসা সূচক ভঙ্গিতে বলল-
“অনেক সকাল হয়ে গেছে। উঠবেন না?”
মাহির শান্ত গলায় বলল-
“উঁহু, আরেকটু সময় এভাবে থাকি।”
সোরায়ার অস্থির কণ্ঠ -“আর কতক্ষন..!”
-“যতক্ষণ না তুমি নিজে আমাকে উঠাবে..!”
মাহিরের উত্তরে সোরায়া অবাক হলো। সজাগ মানুষ কে কিভাবে উঠাবে সে? তখনই মাহির তার সকল প্রশ্নের জবাবে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছোয়ালো সোরায়ার গোলাপ রাঙা ওষ্ঠে। সোরায়া হতভম্ব। রক্তের প্রবাহ থেমে গেল বোধহয়। মাহির নিজেকে সরিয়ে নিল। সোরায়া পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারছে না। সে এমনি বলে বসলো-
“কলেজের জন্য লেইট হয়ে যাবো আমরা।”

মাহির এবারও আর কোনো জবাব দিল না। পুনরায় মত্ত হলো সোরায়ার মাঝে। সোরায়া অবিশ্বাস্যে কেবল চোখ বন্ধ করে মাহিরের বিচরণ অনুভব করছে। তার শিথিল দেহে আর কোনো ইন্দ্রিয় কাজ করছে না। আরো আধ ঘণ্টা পর তারা দুজন বিছানা ছাড়লো‌। মাহির সোরায়া কে সাহায্য করলো শাড়ি পড়তে ইউটিউব দেখে দেখে। সোরায়া মাহিরের শাড়ি পড়ানো দেখে অবাক। এতো তাড়াতাড়ি শিখে শাড়ি পড়িয়ে দিল অথচ তার মাথায়ও আসে নি এই আইডিয়া তখন, নাহলে তো এতোটা জ্বালাতন তার ওষ্ঠযুগল কে সহ্য করতে হতো না। সোরায়া একটু খোঁচা মেরে মাহির কে বলল-
“এমন ভাবে পড়ালেন যেন খুব অভিজ্ঞ আপনি! শাড়ি বিষয়ক জ্ঞান ভালোই আছে দেখছি।”
মাহির সোরায়ার মুখের দিকে ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দুষ্টুমি করে বলল-
“শাড়ি বিষয়ক সবচেয়ে ইমপোর্টেন্ট জ্ঞান আছে আমার।”
-“কিসের?”
-“শাড়ি খোলার..দেখাবো?”
সোরায়ায মুখ চুপশে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। মাহির শব্দ করে হেঁসে সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ে জ্ঞান আছে। ধীরে ধীরে দেখতে পাবে।”

দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো তিনটে মাস। মিরার ভেতরকার ছোট্ট প্রাণ টা সময়ের সাথে সাথে বড় হচ্ছে তার মাঝে। মিরা আপাতত পড়াশোনা আর বাচ্চা কে নিয়েই ব্যস্ত আর বাড়ির সবাই তাকে নিয়ে। তবে মিরার আচার আচরণে ইদানিং বেশ ভালোই ভিন্নতা ধরা পড়ে। মাঝে মাঝেই একটা ছোট্ট বিড়াল ছানার ন্যায় আদুরে হয়ে যায় আবার মাঝে মাঝেই তার মেজাজ থাকে সাত আসমানের তুঙ্গে। তবে মিরার এই পরিবর্তন গুলো বেশিরভাগ রায়ানেরই সহ্য করতে হয় কারণ মিরার এই ছোট্ট ছোট্ট মুড সুইং গুলো কেবল রায়ানের কাছেই প্রশ্রয় পায়। যেটা মূলত তাকে মানসিক শান্তি দেয়। আর রায়ান ও মিরার মুড সুইং গুলো উপভোগ করে বিধায় মিরা কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই রায়ানের কাছে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে। কিছু মজার মূহুর্তের সাক্ষী হওয়া যাক তবে~
কোনো এক বিকেলের কথা, রায়ান তার রিডিং রুমে বসে লেপটপে কাজ করছে। আজকাল রায়ান দুপুরের সময় বাড়ি ফিরে আসে। লাঞ্চ এরপর আর অফিস যায় না সে। প্রেগন্যান্সির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টা সে মিরার সাথে কাটাতে চায় বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। হঠাৎ করেই রিডিং রুমের দরজা খুলে মিরা সেখানে প্রবেশ করলো। তার একহাত নিজের ফোলা পেটের উপর রেখে অন্য হাত দিয়ে নিজের মাথার একগুচ্ছ চুল মুঠো করে ধরা।
-“উফফ্, মাথাটা যেন ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমি কি মারা যাচ্ছি?”

রায়ান চমকিত চাহুনিতে দরজার দিকে তাকালো। মিরার কথার তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। রায়ান নিজের চেয়ারে বসে থেকেই তার বা চোখের ভ্রু নাচিয়ে শাসনের সুরে জিজ্ঞেস করলো-
‍”এইসব কি ধরনের অলক্ষুনে কথা বার্তা হৃদপাখি?”
মিরার চোখ অশ্রুর ভীরে চিকচিক করে উঠলো, যেন এখনি গড়িয়ে পড়বে কয়েক ফোঁটা। সে নিজের দু বাহু ছড়িয়ে দিয়ে মৃদু চাপা জেদ দেখিয়ে বলল-
“আহ্, কি প্রচন্ড ব্যাথা..! একটুও নড়তে পারছি না।”
রায়ান মিরার নাটক দেখে মনে মনে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে শুন্যে তুলে নিল। মিরা নিজের বিলাপ থামালো। মিরা এখন যথেষ্ট ভারী..! মিরাকে কোলে নিতেই রায়ানের পেশিবহুল বাহু তার শার্টের গায়ে আঁটসাঁট হয়ে এলো। মিরা রায়ানের গলা জড়িয়ে থাকায় খুব সহজেই কয়েক মূহুর্তের জন্য রায়ানের বাইসেপে হাত রেখে তার কঠোরতা অনুভব করে বিস্ময়তায় বলে উঠলো-
“ইউ আর সো স্ট্রং হাবি..!”
রায়ান ভ্রু উঁচিয়ে নিশ্চিত হতে প্রশ্ন সূচক কণ্ঠে বলল-
“তাই নাকি..?”
মিরা দাঁত বের করে হিহি করে হেঁসে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল-
“হুম হুম, টু মাচ স্ট্রং এ্যান্ড হ্যান্ডসাম..!”

রায়ান সামান্য লাজুকতায় নিজের নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। অতঃপর মিরাকে কোলে নিয়েই চেয়ারে গিয়ে বসলো। আলতো করে মেয়েটার গালে হাত রেখে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতেই মিরা রায়ানকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটার গলায় মুখ গুঁজে দিল। রায়ানের মূলত মিরার এই দিকটা এখন বেশ ভালো লাগে যখন তার ছোঁয়ায় মিরা খুব সহজেই গোলে যায়‌। ওভাবেই মিনিট দশেক পাড় হতেই মিরা রায়ানের কোল থেকে মেনে যেতে চাইলো। রায়ান মিরাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলো-
“কি হলো পাখি? আন কমফোর্টেবল লাগছে? নামতে চাইছো যে?
মিরার নজর গিয়ে স্থির হলো তার ফুলকো উদরের উপর। রায়ান মিরার দৃষ্টি অনুসরণ করলো। মিরা আবারো রায়ানের কোল থেকে নামার চেষ্টা করতে করতে বলল-
“প্রিন্সেস কাপ কেক খাবে। ফ্রিজে রাখা আছে। ওকে খাইয়ে আসছি আবার।”
রায়ান মুচকি হাসলো। সে মিরার নাকটা আলতো হাতে টেনে দিয়ে বলল-
“বাচ্চা টাকে ভালো কিছু খাওয়ানো যায় না? জন্মের আগে থেকেই ওর খাদ্যাভ্যাস বিগড়ে দিচ্ছো।”
মিরা রায়ানের কথায় কোনো পাত্তা দিল না। মুখে একটু বিরক্তি দেখিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। মনে মনে বিড়বিড় করলো- “রায়ান চৌধুরীর বাচ্চা বলে কথা, এমনিতেও ওর বিগড়ানোরই কথা। জেনেটিক্স বলতেও তো কিছু আছে!”

রায়ান নিজের কাজে মন দিলো আবারো। মিনিট পাঁচেক পরে রায়ান মিরাকে ফিরে আসতে না দেখে নিজেই উঠে নিচে নামলো। মিরা যখন তার প্রেগন্যান্সির ক্রেভিংস সামলাতে না পেরে সোফায় বসে কান্না করছে তখন রায়ান মিরাকে দেখে চিন্তিত হয়ে উঠলো। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে মিরার পাশে গিয়ে বসলো। মেয়েটার ভেজা গালে হাত রেখে তার অশ্রু কণা মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো-
“হয়েছে কি? আমার হৃদপাখি কাঁদছে কেন?”
সেখানে রুদ্র আর রিমিও উপস্থিত। রুদ্রর মুখের বিরক্তি ভাব, আর রিমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে লজ্জায়। মিরা গাল ফুলিয়ে ফুপাতে ফুপাতে বলল-
“আপনার ভাই আমার সব পেস্ট্রি আর কাপ কেক খেয়ে নিয়েছে।”
রায়ান হা হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এইটুকু কারণের জন্য এভাবে কাঁদা সম্ভব তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে পুনরায় মিরার দিকে মনোযোগ দিল‌। সে মিরার চোখের জল মুছতে মুছতে বলল-

“তাই বলে কাঁদতে হবে? আমি আবার এনে দেব। কাঁদে না বেইবি।”
রুদ্র মিরার ফোলা পেটের উদ্দেশ্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে খোঁচা মেরে বলল-
“আর কত খাবি? খেয়ে খেয়ে ফুটবল হয়ে যাচ্ছিস।”
রুদ্রর কথায় রিমি সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রর পায়ে পা মারলো-
“কি সব বলছেন? ও প্রেগন্যান্ট। চুপ করুন। মন খারাপ হবে ওর।”
মিরা সোফার থেকে একটা কুশন উঠিয়ে সজোরে রুদ্রর দিকে ছুঁড়ে মারলো। রায়ান রুদ্রর দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। সে জানে এই ভাই বোনের তর্ক বিতর্কের মাঝেই সে ঠিক পিষবে। রায়ান মিরার মন ভোলানোর তাকে শান্ত করতে দুষ্টুমির ভাব নিয়ে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৮ (৩)

“আচ্ছা শান্ত হও এখন। যত রাগ হচ্ছে আমার উপর দেখাও‌। আমাকেই খেয়ে নাও, আমি কিছু মনে করবো না।”
মিরা রায়ানের দিকে তাকালো। সে রাগে সত্যি সত্যি রায়ানের হাতে নিয়ে কামড়ে দিল। রায়ান নিজের চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে নিলে মিরা রায়ানের কষ্ট হচ্ছে দিখে রায়ানের হাত মুক্ত করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। অতঃপর নিজের পেটে হাত রেখে বিড়বিড় করতে করতে উপরে চলে গেল-
“থাক প্রিন্সেস, মন খারাপ করে না। মাম্মা এখুনি তোমাকে কাপ কেক খাওয়াবো। চলো।”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৯ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here