Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮২

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮২

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮২
অরাত্রিকা রহমান

মিরার রায়ানের এমন ব্যতিব্যস্ত হওয়া দেখে অন্য রকম স্বস্তি অনুভব হলো। রায়ান শান্ত হয়ে মিরার হাতের উপর মাথা ঠেকিয়ে অনুশোচনায় বলল-
“আই অ্যাম সরি..!”
মিরা তৎক্ষণাৎ রায়ানের অনুশোচনার বিরুদ্ধে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-
“এখানে আপনার কোনো দোষ নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা ঠিক আছি এখন। আল্লাহর রহমতে সবাই সুস্থ আছি। আর এটা সম্ভব হয়েছে আপনার জন্য। আপনি ছাড়া এই দুনিয়া আমার বড্ড কঠিন ও জটিল লাগে এখন। আপনি কাছে থাকলে সব সহজ মনে হয়। যেখানে আপনি ধন্যবাদ প্রাপ্য সেখানে দুঃখ প্রকাশ করা তো ভারী অন্যায়।”

রায়ান মাথা উঠিয়ে মিরার শুকিয়ে রুক্ষ হয়ে থাকা ওষ্ঠপুটে কোমলতায় নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল-
“ইউ আর দ্যা স্ট্রংগেস্ট ওম্যান ইন দিস ওয়ার্ল্ড।”
মিরা একগাল হেসে বলল-
“চুমু খাওয়ার অযুহাত একটু ক্যাসুয়াল হয়ে গেল না?”
রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে অকপটে হেঁসে ক্ষণমাত্রই মিরার সাড়া মুখে অগণিত চুমু দিতে দিতে বলল-
“আমার বউকে চুমু দিতে আমার অযুহাতের দরকার পড়বে, এতো দুর্দিন রায়ান চৌধুরীর আসে নি মিসেস।”
মিরা খিলখিলিয়ে হাসছে রায়ানের কাণ্ডে। সে রায়ান কে আরো খেপাতে তার গালে হাত রেখে তাঁকে থামিয়ে বলল-
“হাবি…আমি ভাবছি আপনার দেওয়া প্রথম দেন মোহর টাই গ্রহণ করবো। এমন আরো ১১ টা আন্ডা বাচ্চা হলে আমি আরো আপনার এমন পাগলামী দেখতে পাবো। ভালো হবে না ব্যাপারটা?”
রায়ান বিরক্ত হয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে তার হাত নিজের গাল থেকে নামিয়ে দিল। রক্ত বর্ণের চাহুনি নিক্ষেপ করে বলল-

“না, একদম ভালো হবে না। উই আর নোট হ্যাভিং এ্যানি বেবি ফারদার। ডু ইউ হিয়ার মি? আই অ্যাম নোট গেটিং ইউ প্রেগন্যান্ট এভার।”
রায়ান শেষের লাইনটা এতোটা চিৎকার করে বলল যে মিরাও তার সাথে চেঁচিয়ে উঠলো-
“কি আজে বাজে বলছেন? প্রেগন্যান্ট করবেন না আর..এটা কেমন কথা? আমি হবো..আমার আরো বাচ্চা লাগবে..!”
রায়ান মিরার জেদ শান্ত করতে তার মাথায় একটু জোড়েই টোকা দিয়ে বলল-
“চুপ চাপ এই একটাকেই আদর করে বড় করো। আর কখনো বাচ্চার কথা মুখে আনলে আমি আবার আমেরিকা চলে যাবো।”
মিরা ঠোঁট ফুলিয়ে নিলো সঙ্গে সঙ্গে। রায়ান নিজেকে সামলে মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বোঝাতে থাকলো-

“আমার লক্ষ্মী বউ না..এমন বায়না করে না। আমি মরে যাবো যদি আর কখনো তোমাকে এই কষ্টের মধ্যে দেখি। আমরা তো একজন আরেকজনের জন্য যথেষ্ট তাই না বলো? আমাদের একটা পরী এসেছে। ব্যাস কাম্প্লিট ফ্যামিলি। উই উইল নোট হ্যাভ এনি কিডস ইন দ্যা ফিউচার। ইটস ফাইনাল।”
মিরা রায়ানের কথায় আবারো হেঁসে উঠে তার বুকে মৃদু আঘাত করে বলল-
“আমাকে হাসাবেন না আর, ব্যাথা করছে পুরো শরীর হাসতে গিয়ে। চুপ করুন। পরের টা পরে দেখা যাবে।
প্রেগন্যান্ট করবেন কি করবেন না পরে বুঝবো। ”
রায়ান মিরার কথায় কোনো পাত্তা দিলো না এখন। সে কিছু না বলে কেবল মিরার গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে স্থির হয়ে রইল। মিরা রায়ানের এই একটুকরো তৃপ্তির মাঝে খুব গম্ভীরতা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“আপনার আমার প্রতি আসক্তি টা একটু বেশিই বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে না আপনার?
রায়ান ওভাবে থেকেই মিরার কণ্ঠদেশে মুখ ঘষে নিজের জায়গা আরো গভীরে স্থাপন করে বেপরোয়া জবাব দিল-
“তাই তো মনে হয়। ভেবেছিলাম নিয়ন্ত্রণে আছি, এখন বুঝতে পারছি মাদকের চেয়ে মানব আসক্তি একটু বেশিই তাড়াতাড়ি ছাড়ায়।”
মিরা রায়ানের জবাবে সন্তুষ্ট মনে হেঁসে ছেলেটার কাকের বাসায় ন্যায় এলোমেলো চুল গুচ্ছতে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ভুক্তভোগী হয়ে আফসোস হচ্ছে না?”
রায়ান মিরার গলা ছোট্ট ছোট্ট ভেজা চুমুতে সাজিয়ে দিতে দিতে আওড়ালো –

“আফসোস কিসের? নিজের ইচ্ছায় গা ভাসিয়েছি তোমাতে। ডুবে গেছি বলে কি তোমাকে দোষ দেওয়া চলে?”
-“তা অবশ্য ঠিক। আমি তো আগেই আমাতে ডুব দেওয়ার জন্য নিষেধাজ্ঞা বোর্ড দেখিয়ে দিয়েছিলাম।”
মিরা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাটা বলতেই রায়ান মিরার গলা থেকে মুখ উঠিয়ে বলল-
“তাতে কি? আমি তো অন্ধ।”
মিরা ঔজ্জ্বলিত চক্ষু রায়ানের চোখ জোড়ায় স্থাপন করে বেশ উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“মেয়ে কে দেখেছেন?”
রায়ান সরল ভাবে মাথা নিচু করে নিল-
“উঁহু..! না। এখনো দেখি নি।”
মিরার কপালে আশ্চর্যতার ভাঁজ পড়লো-
“কিহ? দেখন নি মানে?”
রায়ান মলিন কণ্ঠে আওড়ালো-

“আমাদের দুজনের ভালোবাসার প্রতীক আমাদের মেয়ে। তুমি ব্যতীত আমি একা ওকে কিভাবে দেখতে পারি বলো!?”
মিরা রায়ানের দিকটা বোঝার চেষ্টা না করে উল্টো রেগে গিয়ে বললো-
“এটা কোনো কারণ হলো নিজের সদ্য জন্মানো মেয়েকে না দেখার? বাচ্চা টা জন্মের পর থেকে এখন অব্দি আমাকে পেল না। এখন শুনছি তার বাবা কেউ পায় নি। এটা কেমন কথা?”
রায়ান বিমর্ষ মুখ ভঙ্গিতে বলল-
“মেয়েকে দেখার সুযোগ হলো কখন? আমার সুন্দরী বউয়ের অজ্ঞান হওয়া দেখে তো আমি পত্নী নিষ্ঠ ভদ্রলোক নিজেও অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম..!”
মিরা চিন্তিত হয়ে উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করলো-

“এটা কখন হলো আবার? আপনি অজ্ঞান হলেন কিভাবে? বাচ্চা তো আমি জন্ম দিলাম। কোথাও লাগে নি তো? এখন ঠিক আছেন? মাথা ঘুরছে না তো?”
রায়ান মিরার কথা তুচ্ছ জ্ঞ্যান করে বলল-
“আরে না, অজ্ঞান হয়ে ভালোই হয়েছিল। একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম জানো। একটা সুন্দরী মেয়ে এসেছিল স্বপ্নে।”
মিরা ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্নাত্মক ভঙ্গিতে বলল-“তাই?”
-“হ্যাঁ..!”
-“মেয়েটা নিশ্চয়ই একা এসেছিল, তাই না?”
রায়ান দাঁত বের করে হেঁসে জবাব দিল-
“হুম, একাই তো এসেছিল। কিন্তু তুমি কি করে জানো?”
এবার মিরাও ছোট ছোট চোখ করে জবাব দিল-
“আমি জানবো না তো কে জানবে? ওই মেয়ের বর ও আমার স্বপ্নে এসেছিল। একা…!”
রায়ান হাঁসি মুখ টা মলিন হয়ে যেতেই মিরা হিহি করে দাঁত বের করে হেঁসে দিল।

-“ঠক ঠক, ভেতরে আসতে পারি?”
স্বামী স্ত্রীর খুনসুটির পূর্ণ মূহুর্তেই নার্স এসে দরজায় কড়া নাড়লে রায়ান দরজার দিকে তাকিয়ে তাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিল। নার্স দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। রায়ান নার্সের কোলে সুভ্র সাদা টাওয়ালে পেঁচানো একটা ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব লক্ষ করে আচমকা উঠে দাঁড়ালো। দূর থেকে অল্প কিছু কোমল ফর্সা ত্বকের অংশ উঁকি দিচ্ছে যা মিরা আর রায়ানের নজর কড়ছে কোনো চেষ্টা ছাড়া।
-“হ্যালো, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চৌধুরী..আপনাদের লিটেল মিস চৌধুরী ইজ হিয়ার..!”
নার্সের কথায় মিরা আর রায়ানের চোখে যেন আলো জ্বলে উঠলো। নার্স এগিয়ে এসে সাবধানে মিরার বুকে বাচ্চা টাকে স্থানান্তর করতে করতে বললো-
“বাচ্চার খিদে পেয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট চোখে মৃদু তাকিয়ে মাকে খুঁজছিল। এখন ঘুমিয়ে গেছে। ওকে খেতে দিন। দেখুন খেতে পাচ্ছে কিনা ঠিক মতো।”

মিরার বুকটা যেন অদ্ভুত এক পূর্ণতায় ভরে গেল। মেয়েটার হাত কাঁপছে। তবুও সযত্নে আগলে ধরলো ছোট্ট সত্তাটাকে। মিরা কৌতুহলী নজরে ঘুমন্ত বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে তার চোখ, নাক, কান, কপাল, মাথা , মুখ সব খুঁটিনাটি পরোখ করে দেখতে থাকলো। মনে হচ্ছে কোনো যেন জীবন্ত পুতুল তার বুকে শুয়ে আছে। মিরার অবিশ্বাস্যে একনজর রায়ানের দিকে তাকালো। এই প্রথমবারের মতো মিরা আবিষ্কার করলো রায়ানের চোখ জোড়া আর তার উপর নিবদ্ধ নেই। এখন সেই চির চেনা চোখের জোড়ায় অন্য কেউ জায়গা দখল করেছে। তবে হয়তো এটাই প্রথমবার যখন রায়ানের চোখে অন্য কারো প্রতিবিম্ব দেখেও মিরার হিংসে হলো না বরং এমন দৃশ্য অবলোকনের মাধ্যমে তার দুচোখ সন্তুষ্টি লাভ করলো। রায়ানের মনোযোগ মিরার উপর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সে ধীর পায়ে এগিয়ে মিরার কাছে বসে ছোট্ট প্রাণপাত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-

“কত্ত ছোট্ট ও..! ঠিক যেন একটা পাখির বাচ্চা।”
মিরা মিষ্টি হেসে বাচ্চার গালে আলতোভাবে আঙুল ঘঁষে আওয়াজ করলো- “হুম..! আপনার হৃদপাখির বাচ্চাই তো।”
রায়ান একটু গম্ভীর গলায় বলল-
“কত করে বলেছিলাম বেশি বেশি খাও। আমার কথাটা শোনি বলে আমার মেয়েটা এত্ত ছোট্ট পাখির বাচ্চার মতো হয়েছে। এখন ওকে ধরবো কি করে আমি? যদি লেগে যায় ওর?”
মিরার একটুও রাগ হলো না উল্টো হাঁসি পেল। “আমার মেয়ে” অধিকার পূর্ণ ডাকটা তার মনে ধরলো বেশ। রায়ান কেবল আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে দেখেই যাচ্ছে বলে মিরা নিজ থেকে জিজ্ঞেস করলো-
“ধরে দেখবেন না মেয়ে কে?”
রায়ান চকিতে মিরার চোখে চোখ রেখে নিশ্চিত হলো সে কি সত্যিই ধরবে? অতঃপর হাত বাড়িয়ে ছোট্ট হাতের উপর নিজের আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে আশ্চর্য কণ্ঠে বলল-
“কত্ত নরমমমম..!”
রায়ানের কথায় মিরাও মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল। নার্স নতুন বাবা মায়ের প্রতিক্রিয়া দেখে মুখ টিপে আসছে। মিরা রায়ান কে উৎসাহ দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“কোলে নেবেন একটু?”
-“আরে না না, পাগল নাকি। আমার হাত অনেক শক্ত। যেই না নরম শরীর ওর, যদি হাড় টার ভেঙে যায়?”
রায়ানের ভয়ে জড়সড় কণ্ঠে এমন কথা শুনে নার্স এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। মিরাও হেঁসে উঠলো। মিরা রায়ানের উদ্দেশ্যে হাসতে হাসতে বলল-
“বাবা দের হাত খোদা শক্তই দিয়ে থাকেন, এই হাত দিয়েই মেয়েকে আগলে রাখতে হবে নাকি? শক্ত হাত নাহলে মেয়েকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন কি করে?”
মিরার কথার যুক্তি যে রায়ান বরাবরের মতো ফেসে গেল। নার্স নিজ থেকে এগিয়ে এসে মিরার থেকে বাচ্চা কে নিয়ে রায়ানের দিকে এগিয়ে এসে বললেন-
“আমি দেখিয়ে দিচ্ছি কিভাবে ধরতে হবে। হাত আগে করুন।”
রায়ান শুকনো ঢোক গিলে হাত আগে করলে নার্স রায়ানের হাতে যত্ন সহকারে শুইয়ে দিল বাচ্চা টাকে। রায়ানের একহাত ও পুরো পড়ছে না। বাচ্চার রক্তিম বর্ণের ফোলা গাল দুটো রায়ানের চোখে বিঁধছে। সে শক্ত করে মেয়েকে বুকে মধ্যিখানে আগলে নিতে চেয়েও যেন পারছে না। ভয় করছে..যদি আঘাত লাগে? রায়ান মিরার কাছে বসলে মিরা সামান্য উঠে বাসলো নার্সের সাহায্য নিয়ে। অতঃপর দুজন একসাথে মেয়ের মাথায় স্নেহের পরশ এঁকে দিল। মিরার ছোট্ট কপালে আঙ্গুল দিয়ে কি যেন আঁকিবুঁকি করতে করতে খিলখিলিয়ে হেসে বলল-

“মাশাআল্লাহ, কি কিউট হয়েছে তাই না?”
রায়ান মিরার কথায় সম্মতি দিল-
“হুম, মাশাআল্লাহ..একদম মায়ের মতো। কিউটনেস ওভারলোডেড।”
মিরা মুচকি হাসলে রায়ান মিরার গালে নিজের উষ্ণ গরম হাত রেখে বলল-
“আজ নিজেকে দুনিয়ার সব থেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে জানো হৃদপাখি?!”
মিরা রায়ান হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে আলতো করে তাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“আমি তো বরাবরই ভাগ্যবতী.. তা না হলে এমন জীবন সঙ্গী পেতাম নাকি!”
রায়ান মিরা গাল টিপে দিল এই কথা শুনে। মিরা লাজুক হেঁসে একটু কৌতূহলী ভঙ্গিতে আনমনে প্রশ্ন করলো-
“আচ্ছা হাবি..এতো প্রিটি একটা মানুষের বাচ্চা আমার এই ছোট্ট পেটে কিভাবে ছিল? আমার তো মাথায় ধরছে না।”
রায়ান মিরার নাক টেনে দিয়ে তাকে ব্যঙ্গ করে বলল-

“আমিও তাই ভাবছি আমার পিচ্চি মানুষ বউটা আরেকটা পিচ্চি মানুষের বাচ্চা কিভাবে তার পেটে রাখলো। কত্ত আশ্চর্য কর বিষয়..! তার পেটে তো ইঁদুরের বাচ্চা থাকার কথা ছিল।”
মিরা রায়ানের কথায় গাল ফোলাবে তার আগেই তাদের মাঝে থাকা শান্ত ঘুমন্ত পরী কেঁদে উঠলো‌। রায়ান মিরা চমকে উঠলো। রায়ান হকচকিয়ে উঠলো, তার থেকে কোনো আঘাতে মেয়েটা কাঁদছে কিনা সে বুঝতে পারছে না। তবে অজান্তেই কি মনে করে যেন মেয়েকে হাত করার চেষ্টা চালালো-
“আমার প্রিন্সেসের কি হয়ে গেল? কাঁদে না সোনা কাদে না। পাপা ব্যথা দেই নি তো‌। কি চাই তোমার আম্মু? চকলেট এনে দেব ঠিক আছে? কাঁদে না। চুপ চুপ..ওওওওও..!”
মিরা রায়ানের তাৎক্ষণিক এমন প্রতিক্রিয়া দেখে হতবাক। রায়ান কপাল কুঁচকে নিয়ে নার্সের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো-
“কি হলো ওর? কাঁদছে কেন এভাবে?”
-“শি ইজ হাংরি, মিস্টার চৌধুরী। আর এখন মেয়েকে চকলেট এর লোভ দেখিয়ে লাভ নেই। সে এখন ভীষণ ছোট ওসব খাওয়ার জন্য।”

-“মায়ের পেটে থাকার সময় থেকে এসব খেয়ে আসছে আমার মেয়ে। এখন কেন পারবে না। এখন তো পেট থেকেও বের হয়ে গেছে। কত্ত বড় হয়ে গেছে আমার আম্মু টা।”
মেয়ের সাথে কথা বলার রায়ানের এমন এক তরফা চেষ্টা দেখে মিরা মুগ্ধ। নার্স এগিয়ে এসে রায়ানের কোল থেকে বাচ্চা টাকে নিতে চাইলে রায়ান অন্যদিকে ঘুরি গেয়ে নার্সের কোলে মেয়েকে দিতে অমত প্রকাশ করে বলল-
“ও ঠিক আছে ওর পাপার কোলে। শি ইজ টোটালি ফাইন। আপনি বলুন ও চুপ করবে কিভাবে? আমি চুপ করাতে পারবো।”
মিরা রায়ানের এমন বাচ্চা সুলভ হিংসাত্মক মনভাব দেখে হতভম্ব। এই সেই দ্যা গ্রেট রায়ান চৌধুরী..! তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম।

-“মিস্টার চৌধুরী, আপনার মেয়ের এখন আপনাকে নয়, তার মা কে প্রয়োজন। খিদে পেয়েছে ওর। মায়ের বুকের দুধ ছাড়া ওকে থামানোর কোনো উপায় নেই। মেয়েকে আপনি এখন মায়ের কাছে দিন।”
রায়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মিরার সাথে বেশ কয়েকবার চোখাচোখি ও হলো তার। অতঃপর বাধ্য হয়েই মেয়েকে মিরার কোলে দিয়ে দিতে হলো। মিরা নার্সের সাহায্যে নিজের হসপিটালের পোশাক টা সামলে মেয়েকে প্রথমবার খাওয়ানো চেষ্টা করলো। প্রথম প্রথম সব কিছুই বেশ অস্বস্তি কর লাগছিল তবে এটা অস্বাভাবিক নয়। রায়ান না চাইতেও অযাচিত ভাব নিয়ে আড় চোখে বিষয়টা খেয়াল করছে। নার্স নবজাতক শিশুদের খাওয়ানোর নিয়ম সমূহের বিষয়ে মিরাকে সম্পূর্ণ অবগত করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। রায়ান এবার সামনে এগিয়ে মিরার দিকে খেয়াল করলো।

নিজের সদ্য জন্মানো বাচ্চা কে তার অধিকারে ভাগ বসাতে দেখে রায়ানের বুকে কোথায় যেন মোচড় দিয়ে উঠছে। নতুন নতুন মাতৃত্বের এই ধারায় মিরাও বেশ অস্বস্তিতে বাচ্চার মুখে তার খাদ্যের উৎস দিয়েছে সেটা তার মুখের ভাবসাব দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এক পর্যায়ে ছোট্ট প্রাণ টি খুদার তাড়নায় নিজের খিদে মেটাতে থাকলে মিরা শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে নিল। তার হাতের মুঠো শক্ত হলো হসপিটালের বেডের চাদরে‌। রায়ান এক নজরে কেবল বাচ্চা টাকে নির্বিকারে তার খিদে নিবারণ করতে দেখছে। মিরার চোখ মুখের অবস্থা দেখে ছেলেটা আরো অস্বস্তিতে জড়িয়ে গেল মনে হয়। মিরা অসহ্য যন্ত্রণায় নিজের চোখ খুলে রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে খেয়াল করলো রায়ানের দৃষ্টি অন্য স্থানে নিবদ্ধ।

মিরা খেয়াল করলো রায়ানের চোখে মুখে এক অসহায় বিরক্তি। মিরা কিছু বলার আগেই দেখলো রায়ান হঠাৎ বাচ্চার খাওয়া দেখে সহসাই নিজের নিচের ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে কামড়ে ধরলো। ছেলেটা শুকনো ঢোঁক গিলছে কোনো এক অজানা হিংসার প্ররোচনায়। মিরা ভ্রু কুঁচকে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রায়ান কে ধমকের স্বরে বলল-
“ওভাবে বাচ্চাটার খাওয়ার দিকে নজর দিচ্ছেন কেন শুনি?”
রায়ান চমকে মিরার দিকে তাকালো। সে নির্বাক। মিরা আবারো জিজ্ঞেস করলো-
“কি? চুপ কেন এখন? বাবা হয়ে সন্তানের খাওয়ার দিকে নজর দিচ্ছেন লজ্জা করছে না?”
রায়ান মিরার প্রশ্নে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই বলে উঠলো-
“সন্তান হয়ে বাবার অধিকারে মুখ দিতে তো ওর লজ্জা করছে না, আমার নজর দিতে লজ্জা করবে কেন?”
মিরার এমনি উক্ত পরিস্থিতি তে মেজাজের ঠিক নেই। রায়ানের এমন বেফাঁস কথা তার কর্ণপাত হতেই ওমনি উড়ন্ত এক বালিশ এলো রায়ানের মুখের উপর। মিরা চেঁচিয়ে উঠলো-

“নির্লজ্জ লোক কোথাকার..! বেরোন বলছি..!”
রায়ান বালিশটা ধরে ফেলল। তবে প্রতি উত্তরে কিছুই বললো না। তার নিজের অবস্থাই এখন বেহাল তর্কে জড়ালে নির্ঘাত ঝগড়া লাগবে। তাই বুঝদার জ্ঞ্যানী ব্যক্তির মতো সে কেবিন থেকে সম্মানের সহিত বেরিয়ে এলো। আর সেখানে দাঁড়িয়ে ওই বিষয়ে চিন্তা না করে চলে গেল ক্যান্টিনের দিকে। গত কাল দুপুর থেকে কিছুই খাওয়া হয় নি। একটু সময় পরিবারের সবার সাথে কথা বলে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে নিজে অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে আবার ফিরে এলো কেবিনে। বাচ্চা কে বুকে জড়িয়ে মিরা বেডেই হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল। রায়ান বুঝলো তার মেয়ের খাওয়া শেষ তবে মেয়ের মায়ের পেটে জানা পড়ে নি।
রায়ান মিরাকে জাগিয়ে তোললো। মেয়েকে কোলে করে বেডের পাশে দোলনায় শুইয়ে দিয়ে মিরাকে হসপিটাল থেকে দেওয়া খাবার টা খাইয়ে তার সকল ঔষধ ঠিক মতো দেখে দেখে খাইয়ে শুইয়ে দিল বেডে। অল্পক্ষণ সময় নিয়ে মিরার চুলে হাত ঘোরাতেই মেয়েটা ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেল। মিরা ঘুমিয়ে গেলে রায়ান ও গিয়ে শুয়ে পড়লো কাউচের উপর।

দেখতে দেখতে আরো দু দিন পাড় হয়ে গেছে। নতুন নতুন মা হওয়ার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বেলা ১২টা অব্দি মিরা ঘুমিয়ে আছে এখন। রায়ান ঘুম থেকে উঠেই মেয়ের সাথে বকবক করতে বসেছে জানালার রৌদ্রের কাছে। বাবা মেয়ের কথায় যেন শেষ নেই। একপর্যায়ে রায়ানের কণ্ঠে মিরার ঘুম ভাঙল। মিরা অভ্যাস গত ভাবেই চোখ খুলে দোলনার উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেয়ে কে না দেখতে পেয়ে হকচকিয়ে উঠে বসলো। অতঃপর রায়ানের কণ্ঠ কানে আসতেই সেদিকে তাকালো। রায়ানের কোলে মেয়েকে উচ্ছ্বসিত হয়ে হাত পা ছুড়ে খেলতে দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। রায়ানের তার এখন তার দিকে কোনো মনোযোগ নেই দেখে মিরা খোঁচা মেরে বলল-
“আরে বাহ্! ভালোই তো। এখনি বাবা মেয়ে টিম আপ করছেন? মেয়েকে তো ভালোই বশ করেছেন।”
রায়ান চকিতে ফিরে তাকালো মিরার পানে। উঠে এসে মিরার কপালে চুমু দিয়ে তাকে সকালের শুভেচ্ছা দিল-
“গুড মর্নিং, মাই মিসেস।”

মিরা আবেশে চোখ বন্ধ কর জবাব দিল- “গুড মর্নিং হাবি..!”
রায়ান মিরার কাছে বসতেই ডক্টর একজন নার্স এর সাথে ভেতরে ঢুকে এলেন। মিরাকে রুটিন চেকাপ করে বাচ্চা কেও একবার চেকাপ করে নিয়ে তিনি অভিনন্দন জানিয়ে বললেন-
“বাহ, মা মেয়ে দুজনই মাশাআল্লাহ এখন সম্পূর্ণ সুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ। আপনারা চাইলে আজকের দিনেটা থেকে কালকের মধ্যেই বাড়িতে যেতে পারবেন।”
রায়ান উঠে দাঁড়িয়ে ডক্টরের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলো-
“থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।”
মিরাও রায়ানের কথায় সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে ডক্টর সন্তুষ্ট মনে বেরিয়ে যান‌। মিরা বাড়ি ফেরার কথায় খুশিতে বাকবাকুম হয়ে রায়ান কে জড়িয়ে ধরলো-
“উফফ্, ফানালি। হসপিটালে মানুষ দিনের পর দিন কিভাবে যে থাকে! বাড়ির মতো শান্তি কোথাও নেই।”
মেয়ের গালে আঙ্গুল রেখে তাঁকে উদ্দেশ্য করে উৎসাহ নিয়ে বলল-
“আর ইউ এক্সাইটেড প্রিন্সেস, নিজের প্যালেসে যাওয়ার জন্য? ওখানে দাদু-দিদা, চাচ্চু-চাচি, খালামণি-খালু সবাই থাকবে তোমাকে ওয়েল কাম করতে। অনেক মজা করবো আমরা।”
রায়ান মিরার উৎসাহ দেখে কোনো মতো একটা রাত্রি যাপন করেই পরের দিন সকালে রওনা দিয়েছে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে। মিরার কোলে হাস্যোজ্জ্বল মুখী বাচ্চা মেয়ে টা হাত পা ছুড়ছে অনবরত। মিরাও হাত দিয়ে মেয়ের সাথে খেলছে। চৌধুরী বাড়ি পৌঁছে গাড়ি থামলে রায়ান সাবধানে মিরাকে ধরে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করলো। দুজনেই এখন মোটামুটি সুস্থ। শরীরের দুর্বলতা আছে তবে অসুস্থতা নেই। মেয়েকে নিয়ে রায়ান মিরা বাড়ির মূল দরজা পার করতেই ঠাস ঠাস কিছু পার্টি ব্লাস্টার্স ফুটলো। মিরা চমকে একটা পিছাতেই রায়ান তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।

-“সামলে…! ঠিক আছো?”
রায়ান চিন্তিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো। মিরা নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই সোরায়া দৌড়ে এসে মিরার কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিল তাদের কাঙ্ক্ষিত অতিথিকে।
-“ওলে লে লে, আমাল ছোত আম্মু তা কত্ত কিত্তুস হয়েছে.. মাশাআল্লাহ, কিত্তুস আন্ডা বাচ্চা।”
-“কিরে ? তুই আগে কোলে নিলি কেন? আমি বড়..আগে আমি নেব বলেছিলাম না?”
সোরায়ার আধ স্পষ্ট কথার মাঝে রুদ্র হঠাৎ তেড়ে এসে চেঁচিয়ে উঠলো।
-“প্রিন্সেস..তোমার বোরিং চাচ্চু কে বলে দাও তো- শুধু বলে রাখলেই হয় না, যে আগে এগিয়ে এসেছে তার কোলেই আগে এসেছো তুমি। এত্ত কিউট একটা বেবি অবশ্যই তার কিউটি ছোট আম্মুর কোলেই আগে উঠবে।”
-“কিউটি না ছাই.. শাকচুন্নী একটা..!”

রায়ান ও মিরা একে অপরের ভাই বোন কে শুধু মাত্র কোলে নেওয়ার জন্য লড়তে দেখে হতবাক। রিমি আর মাহির সোফার কাছে বুকে হাত বেঁধে একে অপরের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে আছে। দুজনেই অসহায়। রায়ান মিরা আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো পুরো ড্রয়িং রুম গোলাপী রঙের বেলুন ও রিবন দিয়ে সুসজ্জিত। লম্বা একটা রশ্মিতে বড় বড় করে ল্যাটার বেলুনে তৈরি একটা লিখা ঝুলছে-“ওয়েল কাম প্রিন্সেস..!”
রুদ্র জোড় পূর্বক সোরায়ার কোল থেকে বেবিকে নিজের কোলে নিয়ে তার ছোট্ট হাতে নিজের এক আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিল। রিমি এই সুযোগে দ্রুত এগিয়ে এসে রুদ্রর কোলে উঁকি দিয়ে দেখলো তাদের নয়নের মণি কে। রিমি মুচকি হেসে তার কোমল হাত বেবির রক্তিম গালে স্পর্শ করে বলল-
“মাশাআল্লাহ, আমার চাচি আম্মু কত্ত মিষ্টি দেখতে হয়েছে। পুরো রসগোল্লা।”
রুদ্র ও মুচকি হেঁসে রিমির কাঁধে দুষ্টুমির চলে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল-
“আমাদের টাও এমন হবে দেখো।”
রুদ্রর কথা শেষ হতে না হতেই মাহির এগিয়ে এসে বিরক্ত ভঙ্গিতে রুদ্রর কোলে থেকে বেবি কে কেড়ে নিতে নিতে বলল-

“হয়েছে, অনেক দেখেছিস। এরপর নিজেরটা কেই দেখিস। এখন আমাকে দে। আমার টার প্রসেসিং হয়ে দুনিয়াতে আসতে বহু দেরি।”
রুদ্রর ভ্রু কুঁচকে এলো কিন্তু রিমি তাকে আটকে নিল এখন এই নিয়ে লড়াই করার থেকে। মাহির বেবিকে কোলে নিতেই সোরায়া দৌড়ে মাহিরের কাছে চলে গেল। মাহির বড় বড় চোখ করে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই বেবি আরো জোড়ে হেঁসে উঠলো। সোরায়া মাহিরের হাত ঝাঁকিয়ে আঙ্গুল তাক করে তা দেখিয়ে বলল-
“দেখুন দেখুন, আপন কে দেখে কেমন হাসছে। ওর মনে হয় আপনাকে পছন্দ হয়েছে।”
অতঃপর অবুঝ বাচ্চার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো-
“ছোট্ট আম্মুর বর টা সুন্দর না বলো সোনাই? তোমার ছোট আম্মুর চয়েস কিন্তু সেই লেভেলের। তোমার জন্য কত্ত হ্যান্ডসাম একটা ছোট আব্বু খুঁজেছি বলো..! তুমি বড় হলে তোমাকে অনেক ভালো করে ইংলিশ শিখাতে পারবে।”
সোরায়ার কথা শুনে রায়ান গোমড়া মুখে মিরার কানের কাছে ঝুঁকে এসে বলল-

“আমার তিন দিনের মেয়েকে কেমন ইংলিশ শিখানোর ভয় দেখাচ্ছে দেখছো? নিজে তো ইংলিশের কেবল আগা জানে কিন্তু মাথা জানে না। তাও আবার ইংলিশের প্রফেসর কে বিয়ে করে বসে আছে।”
মিরা রায়ানের কথা তুচ্ছ জ্ঞান করে এড়িয়ে গেল। মাহির বেবির কোমল ত্বকে আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলল-
“মাশাআল্লাহ, দেখতে তো পুরো নিজের ছোট আম্মুর মতো কিউট চড়ুই পাখির বাচ্চা।”
মাহিরের কথায় সবাই হাসলেও রায়ান হাসলো না। মেয়েকে নিয়ে সবার টানাটানি তার পছন্দ হচ্ছে না হয়তো। রায়ান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মাহিরের কোল থেকে মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে বলল-
“আমার মেয়ে আন্ডা বাচ্চা, রসগোল্লা, চড়ুই পাখি এসবের মতো কেন দেখতে হবে কি অদ্ভুত। ভালো কোনো তুলনা পাস না নাকি! ধুর.. আম্মু তুমি পাপার সাথে চলো তো। এরা সবাই পাগল।”
এই বলে রায়ান হাটা ধরলো সিঁড়ির দিকে। মাহির পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো-
“আরে কি আজব! একটু দেখতে তো দিবি। একটু খেলতে ও তো দিলি না।”
রায়ান সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যেতে যেতে বলল-
“আমার মেয়ে কি কোনো পুতুল নাকি! নিজের ফ্যাক্টরি তে পুতুল লঞ্চ করে ওর সাথে খেলবি।”
মাহির হতবাক। সে সোরায়ার দিকে তাকাতেই সোরায়া এক দৌড়ে পালিয়ে গেল-

“আসছি মামণি, ডাকলে আমায়? আসছি..!”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবার সামনে এসে অনুশোচনায় বলল-
“তোমরা কেউ কিছু মনে করো না প্লিজ। তোমাদের ভাই মেয়ে পেয়ে পাগল হয়ে গেছে। খাওয়ানো ছাড়া আমাকেও ধরতে দেয় না। মেয়েকে ধরলে তার গায়ে ফোস্কা পড়ে। যত্তসব আদিখ্যেতা!”
সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মিরা ও রায়ানের পিছু পিছু উপরে উঠে এল নিজের ঘরে। মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে ও চেনা ঘরটা কেমন অচেনা লাগছে। মিরা সেই দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে রায়ানের দিকে এগিয়ে এলো। মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রায়ান মিরার কিছু বলার আগেই জিজ্ঞেস করলো-
“মেয়ের নাম রাখতে হবে তাড়াতাড়ি। নামাজ নেই বলে আমার মেয়েকে সবাই আবলতাবল ডাক নামে ডাকছে। নাম বলো ওর।”
মিরা বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে ছোট ছোট চোখ করে রায়ানের দিকে তাকালো। মিরা বিরক্ত হয়ে গেছে রায়ানের মুখে ‘আমার মেয়ে, আমার মেয়ে’ শুনতে শুনতে। এমন ভাব যেন তার কোনো অবদানই নেই। মিরা বিরক্ত কণ্ঠে বলল-

“আপনার মেয়ে তো আপনিই রাখুন নাম। নাম তো ঠিক করে রাখার কথা।”
মিরা রেগে মুখ ফুলিয়ে রায়ান কে এড়িয়ে মেয়ের কাছে যেতে চাইলে রায়ান মিরার কোমর আঁকড়ে এক টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। মিরা আকস্মিক টানে সোজা রায়ানের বুকে এসে অবাক চোখে মুখে তুলে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ান মোহাচ্ছন্ন গম্ভীর গলায় বলল-
“মুড সুয়িং সহ্য করার সময় সীমা ফুরিয়েছে মিসেস। এমন মুখ ফেরানো তো এখন সহ্য করবো না প্রিয়া। অতীতের সকল হিসেবের হাল খাতা হবে। তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখো‌।”
মিরা অবুঝের মতো ছলছলে ডাগড় ডাগড় দৃষ্টিতে তাকাতেই রায়ান শুকনো ঢোক গিলে বলল-
“এভাবে তাকাবে না একদম। শরীরের যেই অবস্থা। কিছু করে বসলে হিতেবিপরীত হবে। মেয়ের নাম বলো তাড়াতাড়ি।”

মিরা সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখ নামিয়ে নিল। মুখ নিচু করে মিনমিনে আওয়াজে বলল- “রিয়ানা..!”
রায়ানের কানে নামটা হালকা প্রতিধ্বনিত হতেই সে পুনরায় নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করলো-
“কি নাম বলে ?”
মিরা বোকা বোকা মুখ করে রায়ানের বুকে থুতনি ঠেকিয়ে মুখ উঠিয়ে বলল-
“রিয়ানা রাখলে কেমন হয়?”
রায়ান খুশিতে মিরার দু গালে হাত রেখে আঁতকা তার ওষ্ঠযুগলে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল-
“কেমন হয় এটা কেমন প্রশ্ন হলো? অনেক ভালো হয়। আমার নামের সাথে কত্ত মিল। রায়ান চৌধুরীর মেয়ে রিয়ানা চৌধুরী। জাস্ট পারফেক্ট।”

মিরা ইচ্ছে করেই মেয়ের নামটা তার বাবার নামের সাথে মিলিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ধারণা অনুযায়ী নিজের স্বামীকে দেওয়া একমাত্র শ্রেষ্ঠ উপহার হয়তো রিয়ানাই। তাহলে নামেও যদি তা প্রকাশ পায় ক্ষতি কোথায়!? রায়ান মিরাকে বিছানায় বসিয়ে মেয়ের দিকে ঝুঁকে এসে খুব উৎসাহ নিয়ে বলল-
“পাপার প্রিটি প্রিন্সেস এর এখন একটা প্রিটিয়েস্ট নামও আছে। বলো তো কি.. প্রিন্সেস রিয়ানা চৌধুরী..! তোমার কি নাম টা পছন্দ হয়েছে আম্মু? মাম্মা তার জিনিয়াস ব্রেন খাটিয়ে সাপার সাথে মিলিয়ে তোমার নাম ঠিক করেছে। সুন্দর না?”
অবুঝ শিশু টা কি বুঝলো কে জানে। প্রথমবারের মতো হালকা শব্দ করে হেঁসে উঠলো। এই হাঁসি যেন রায়ানের খুশির বাঁধ ভাঙলো। রায়ানের মুখে সেই চির তৃপ্তি, সন্তুষ্টি ভরা আনন্দ দেখে মিরার চোখ জোড়া আনন্দ অশ্রু তে পরিপূর্ণ। একটা মেয়ের জীবনের আসল সার্থকতা হয়তো এটাই।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর~
চৌধুরী বাড়ির দোতালার দুই ঘরে রীতিমতো দুই বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ড্রয়িং রুমে অর্ধ বয়স্ক দম্পতি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন এবং খবরের কাগজ পড়ছেন। এনারাই রিয়ানার দাদু- দিদা ওরফে রামিলা চৌধুরী এবং রায়হান চৌধুরী। সময়ের স্রোতে তাদের চুলে পাক ধরেছে। তবে মনে পাক ধরেছে কিনা তা তর্ক বিতর্কের বিষয় বস্তু হতে পারে।
২০২৬ শেষ করে ২০২৭ এর মধ্য সময়ে রিমি ও রুদ্রর ছোট্ট সংসার আলোকিত করে আবির্ভাব হয় তাদের ছেলে- রক্তিম চৌধুরীর। এখন ২০৩০। সময়ের পরিক্রমায় এখন সে চার বছর। মায়ের সাথে, আবার কখনো জেঠিমার সাথে বড় বোন রিয়ানার কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া হয় তার। রিয়ানা যেমন দুষ্টু রক্তিম ঠিক ততটাই শান্ত স্বভাবের। বোন যা বলবে সেটাই তার জন্য বেদ বাক্য। আজ রিয়ানার কিন্ডারগার্টেনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। মায়ের জোড়া জোড়িতে তার নাম উঠেছে যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায়। বাবার আদুরী মেয়ে ঠিক করেছিল সে প্রিন্সেস সাজবে। রিয়ানা চেয়েছে আর তা চৌধুরী বাড়িতে গন্য করা হয় নি ৫ বছরে এমন বিরল দৃষ্টান্ত দেখা যায় না।
তবে কোনো এক ভাগ্যের লিখনে আজ মিরা তার মেয়ের সাথে নেই। থাকবে কি করে! একই দিনে মেয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে আর মায়ের কনভোকেশন। ৫ বছরে মিরা ঢাবি থেকে আইন নিয়ে পড়ে পাস করে বেরিয়েছে। সামান্য সেশন জটের দরুন কনভোকেশন টা একটু দেরিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই রিমির ও একই অবস্থা। বাড়িতে এখন দুই জানার পেছনে ছুটছে তাদের বাবা রা। রক্তিম সম্পূর্ণ মা পাগল ছেলে আর রিয়ানা ঠিক উল্টো। তাই রুদ্রর রক্তিম কে রিমিকে ছাড়া সামলানো একটু কষ্ট সাধ্য হলেও রায়ানের জন্য রিয়ানাকে সামলানো কষ্ট করে কিছু নয়। তবে মেয়েকে সত্যি সত্যি প্রিন্সেস সাজাতে গিয়ে তার ঘাম ছুটে যাচ্ছে।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টা একটা যুদ্ধ করার পর রায়ান রিয়ান্নাকে তৈরি করে বিছানার উপর থেকে নিচে নামালো।
-“পার্ফেক্ট..মাই লিটেল প্রিন্সেস ইজ এ্যাকচুয়াললি লুকিং লাইক আ প্রিন্সেস নাউ।”

রিয়ানা মলিন মুখে তার মাথার দুহাতে দিয়ে বলল-
“নো পাপা, ইট’স নোট পার্ফেক্ট। প্রিন্সেস এর ক্রাউন কোথায়?”
রায়ান জিভে কামর দিয়ে তাড়াতাড়ি রিয়ানার মাথায় তার চিকচিকে পাথরের ক্রাউন পড়িয়ে দিতে দিতে বলল-
“সরি ভাই হাইনেস, পাপা ইজ সো আন মাইন্ড ফুল। নাও ইউ আর লুকিং পারফেক্ট।”
-“লাইক প্রিন্সেস ডায়না?”
রিয়ানার উৎসুক মনোভাবে প্রশ্ন করলে রায়ান তার কপালে ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে বলল-
“নোট, প্রিন্সেস রিয়ানা..!”
রিয়ানা বাবার কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। রায়ান এবার নিজে দ্রুত রেডি হয়ে নিয়ে রিয়ানা কে কোলে তুলে নিয়ে বলল-
“তাহলে যাওয়া যাক প্রিন্সেস রিয়ানা?”
রিয়ানা রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল-
“প্রিন্সেস রিয়ানা পাপার ভ্রুমভ্রুম এ করে স্কুলে যেতে চায়।”
রায়ানের মেয়ের এমন উদ্ভট আবদার বুঝতে একটুও সময় লাগলো না। রিয়ানার মূলত বাইকে করে যেতে চাইছে। যেটা তার ভাষায় ভ্রুমভ্রুম। রায়ান অমত প্রকাশ করতে যাবে তার আগেই রিয়ানা টুপ করে রায়ানের গালে চুমু খেয়ে বলল-
“পাপা প্লিজ..!”

এরপর আর কিছু বলার থাকে না। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে বাইকের চাবিটা বের করতে করতে বলল-
“মা মেয়ে দুটোই বাইক পাগল। মায়ের থেকে ট্রেনিং নিচ্ছে, কিছু তে না করার আগেই না কে কিভাবে হ্যাঁ করতে হয়।”
রিয়ানা ধমকির স্বরে বলল-
“মাম্মা কে বলে দেব কিন্তু। তুমি ব্যাংক বিচিং করছো?”
রায়ান রিয়ানা কে নিয়ে নিচে নামতে নামতে থাকে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ব্যাংক বিচিং? এসব ওয়ার্ড কে শিখিয়েছে তোমাকে আম্মু?”
রিয়ানার নিজের কপাল ঢাকা ব্যাঙস গুলো হাত দিয়ে ভাব নিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“উফ্ পাপা, তুমি কিছু জানো না। মাম্মা নোস এভরিথিং।ইটস কল্ড স্ল্যাং ল্যাংগুয়েজ। দেরি হচ্ছে তো। তাততাড়ি চলো। প্রিন্সেস রিয়ানার শুড নোট বি লেইট।”
রায়ান হাঁফ ছেড়ে বিড়বিড় করলো-
“ইংলিশ মিডিয়াম এ পড়ানোর সাইড ইফেক্ট। স্কুল চেঞ্জ করতে হবে মেয়ের।”
অতঃপর দাদু-দিদার আদর নিয়ে, চাচ্চু আর ছোট ভাইয়ের থেকে গুড লাক নিয়ে রওনা হলো চৌধুরী বাড়ির প্রিন্সেস।

অপরাহ্ন~
রিয়ানার পারফর্মেন্সের সম্পূর্ণ ভিডিও করেছে রায়ান। মিরাকে দেখাবে বলে। মেয়ের পারফরম্যান্স শেষ হতেই রায়ান ভিডিও করা বন্ধ করে ব্যাংক স্টেজে গেল। রিয়ানার ব্যাকস্টেজে আসতেই মেয়েকে বুকে আগলে কোলে তুলে নিয়ে স্টেজ থেকে নামিয়ে তার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিল।
-“দ্যাট’স মাই প্রিন্সেস, পাপা ইজ সো প্রাউড অফ ইউ আম্মু।”
রিয়ানার খিলখিলিয়ে হেঁসে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে রায়ানের গালে ছোট্ট করে চুমু দিয়ে বলল-
“থ্যাঙ্কস পাপা। আই লাভ ইউ।”
-“পাপা লাভস ইউ মোর প্রিন্সেস। চলো এখন মাম্মার কাছে যাওয়া যাক। মাম্মার জন্য ফ্লাওয়ার নিতে হবে তো, আজ না মাম্মার কনভোকেশন।”

-“কন..কনভেকেশন কি পাপা?”
-“কনভেকেশন না আম্মু, কনভোকেশন..তোমরা যেমন বছর শেষে রিপোর্ট কার্ড আসে। তেমন মাম্মার ও তো রেজাল্ট এসেছে আর সেই রিপোর্ট কার্ড এর স্বীকৃতি একটা সম্মান স্বরূপ আজ তোমার মাম্মা কে দেওয়া হবে সবার সামনে, অনেক বড় স্টেজে। এটাকেই মূলত কনভোকেশন বলে। আজ মাম্মার জন্য একটা স্পেশাল ডে রাইট? আমাদের তো থাকতে হবে মাম্মার সাথে।”
রায়ান মেয়ের বোঝার স্বার্থে সাধারণ উদাহরণে কনভোকেশনের মানে বোঝানোর চেষ্টা করলেও রিয়ানার মাথায় ঠিক রায়ানের বলা কথা গুলো স্পষ্টভাবে ধরা দিল না। তবে সে এইটুকু বুঝেছে আজকের দিনটা তার মায়ের জন্য স্পেশাল আর সেখানে তাকে থাকতে হবে। রিয়ানার হুজুগে সঙ্গে সঙ্গে মাথা উপর নিচ নেড়ে বলল-
“ইয়েস, লেটস গো পাপা। আই অ্যাম মিসিং মাম্মা সো মাচ।”
রায়ান রিয়ানার চোয়াল আলতো করে টিপে দিয়ে নিজেও কাতর কন্ঠে বলল-“মি টু প্রিন্সেস। লেটস গো।”
-“মাই প্রিটি বেবি, ইউ ডিড গ্রেট। সো প্রাউড অফ ইউ ডিয়ার।”
রায়ান অডিটরিয়াম থেকে বের হতে উদ্যত হতেই, মিষ্টি করে কথাটা বললো রিয়ানার কিন্ডারগার্টেনের ক্লাস টিচার। রায়ান থমকে গেল হালকা হেঁসে। রিয়ানা বেশ লাজুক ভাবে হেসে রায়ানের গলায় মুখ লুকালো। অতঃপর মিনমিনে আওয়াজে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮১ (৪)

“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম।”
-“মিস্টার চৌধুরী, রিয়ানা আজ সাচ আ কিউটি। লাইক আ প্রিটি ডল। ক্লাস রুম ছাড়াও কোকারিকুলার অ্যাক্টিভিটিছেও ভীষণ অ্যাক্টিভ। সাচ এ লিটেল জিনিয়াস।”
মেয়ের প্রশংসা শুনে রায়ান রিয়ানার দিকে গর্বিত নজরে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে আনমনে হেঁসে বলল-
“জাস্ট লাইক হার মাদার।”
রিয়ানা ও সাথে সাথে তাল দিল-“ইয়েস, মাম্মা ইজ বেস্ট। আমিও মাম্মার মতো হবো।”
রায়ান মেয়ের কথায় মুচকি হাসলো গৌরবে। অতঃপর বাবা মেয়ে বেরিয়ে এলো। বাইক ছুটলো এবার মিরার গন্তব্য ঢাবির দিকে।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৮৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here