Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫১ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫১ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫১ (২)
অরাত্রিকা রহমান

বাগান বাড়ি~
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে, অবশেষে বিয়ের জন্য সবকিছু সুন্দরভাবে আয়োজিত হয়ে গেছে। বাসরঘর সাজানো হয়েছে, সম্পূর্ণ বাড়িও আলোতে চকমক করছে। মাহির আর সোরায়া শপিং থেকে ফিরেই বাড়িটাকে সম্পূর্ণ রূপে সুসজ্জিত দেখে অবাক হয়ে গেছিল। রুদ্র রিমি ছাদ ঘর থেকে নেমে এসেছে এখন দুই জনেই ড্রয়িং রুমে। সোরায়া ড্রয়িং রুমে রিমিকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে রিমির পাশে বসে মাথাটা হেলিয়ে দেয় রিমির কাঁধে। শপিং করে খুব ক্লান্ত সে, রিমিও হালকা হেঁসে সোরায়া কে জিজ্ঞেস করলো-

“ক্লান্ত লাগছে বনু?”
সোরায়া চুপ থেকে মাথা নাড়ালো। রুদ্র আর মাহির ছোট্ট সোরায়ার ক্লান্তি দেখে হালকা হাসলো। মাহির বাড়ির চারদিকে টা দেখে বলল-
“বাহ্! অনেক সুন্দর সাজিয়েছিস তো। একদম বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি ভাইব…! ”
রুদ্র মাহিরের কথার বেশ গর্ব করে বলল-
“দেখতে হবে না কাজের তদারকি কে করেছে!”
রুদ্র কথাটা যে রিমিকে ইঙ্গিত করে বলল তা রিমি বুঝেছে, কিন্তু সে তো কিছুই করে নি, তাই ক্রেডিট কেন নেবে?
রিমি উল্টো মুখ ফুলিয়ে বলল-
“হ্যাঁ মাহির ভাই, তদারকি তো নয় যেন মশা মারার কাজ। হা করে শুধু দেখতে থাকো আর সব কাজ এমনি এমনি হয়ে গেল চোখের পলকে।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রিমির খোঁচা দিয়ে কথা বলায় রুদ্র আর মাহির দুইজনেই হেঁসে ফেললো।
সবার কথায় মাঝে সোরায়া বেশ হতাশ হয়ে রিমিকে বলল-
“দেখেছ রিমি আপু, আমার ভাইয়া কত ভালো! তোমাকে কিচ্ছু করতেও দেয় নি। আর আমার পার্টনার! সব কিছু আমাকে দিয়েই করিয়ে নিলেই যেন তার লাভ।”
সোরায়া কথাটা মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল- কারণ শপিং মলে ছোট থেকে ছোট জিনিস গুলোও বাছাই করতে মাহির সোরায়ার মতামত নিয়েছে। যদিও সেটা শুধু সোরায়ার সাথে কথা বলার ছুতো ছিল, তবে সোরায়া ভেবেছে মাহির ইচ্ছে করে সব ওকে দিয়ে করাতে চেয়েছে।
সোরায়ার কথায় রুদ্র একটু ভাব নিয়ে মাহিরকে বলল-

“কি গো মাহির ভাই, আমার বোন টার এই হাল কিভাবে? সব ওকে দিয়ে করিয়েছ কেন?”
মাহির উল্টো সোরায়াকে খোঁচা দিতে রুদ্র কে বলল-
“তোর বোনকে বল নিজের যত্ন নিতে। সব শপিং ব্যাগ বহন করলাম আমি আর শুধু শপিং ব্যাগের ভেতরে থাকা জিনিস গুলো বাচাই করে ক্লান্ত সে নিজে। আমি কোথায় যাবো বলতো?”
রুদ্র হেঁসে উঠতেই সোরায়া প্রতিবাদের সুরে বলল-
“আপনি আপনার যেখানে মন চায় সেখানে যান।”
মাহির সোরায়ার কথা শুনে সরাসরি গিয়ে সোরায়ার পাশে গিয়ে বসলো। সোরায়া আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকাতেই মাহির বলল-

“What! What are you looking at? তুমিই না বললে যেখানে আমার ইচ্ছে যেতে?”
সোরায়া চোখ বাঁকা করে চাইলে হঠাৎ রুদ্র বলল-
“যাক গে, সব কাজ ডান, আলহামদুলিল্লাহ। এবার শুধু কাজি আসবেন আর বিয়ে হবে।”
মাহির রুদ্রর দিকে তাকিয়ে তুচ্ছ হেঁসে বলল-
“এতো কিছু যাদের জন্য তারা কই? রায়ান কোথায় গেছে? এখনো এলো না, একটা খবর দিলো না, ভাবিকে ঘরে লক করে রেখে গেছে। তার ও কোনো সারা শব্দ নেই।”
রুদ্র ও চিন্তায় পরে গেলো কিছু টা-
“ভাইয়া তো আমাকে কিছু বলে যায় নি কোথায় গেছে। আর মিরার সাথে কথা বলার সময় ও হয় নি। ঘর থেকে মিরাও ডাকেনি সারাদিনে।”
সোরায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল-

“If যার বিয়ে তার হুশ নেই, পাড়া পড়শীর ঘুম নেই had a face..”
রিমি একটু সিরিয়াস হয়ে বলল-
“সারাদিনে মিরা একবার ও আওয়াজ করলো না বিষয়টা কেমন না? আমার তো খেয়ালই ছিলো না।”
হঠাৎ মাহিরের ফোন বাজলো- “রায়ান কল করেছে, চুপ। কথা বলতে দে।”
সবাই চুপ হয়ে গেলে মাহির কলটা ধরলো।
রায়ান ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“সব আয়োজন করা শেষ তোদের?”
মাহির উৎকন্ঠা হয়ে বলল-

“আমাদের কাজ অনেক আগেই শেষ। তুই কোথায়? সকাল থেকে যে হাওয়া হয়েছিস আর খবর নেই।”
রায়ান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল-
“আমি আসছি। সব ঠিক ঠাক থাকে যেন। (হঠাৎ কিছু একটা ভেবে প্রশ্ন করলো) আচ্ছা, মিরা কি কিছু খেয়েছে?”
মাহির অবাক হয়ে বলল-
“কিছু খেয়েছে মানে? আমি কিভাবে বলবো খেয়েছে কি না। খাবার ভেতরে নিয়ে গেলি তুই, আর বের হলি ভেজা অবস্থায়।”
রায়ান বিরক্ত হয়ে বলল-

“খাবার নিয়ে গেলেই খাবে এতো লক্ষ্মী আমার বউ হলে তো চাচ্চু হয়ে যেতিস কবেই। মহারানি আমার তখন সব খাবার রাগে ফেলে দিয়েছেন। তোরা সারাদিনে আমার বউটা কে কিছু খাওয়াতে পারলি না?”
মাহির রায়ানের বিরক্তি দেখে নিজে উল্টো বিরক্তি দেখিয়ে বলল-
“ছাগল তুই বউ সামলাতে পারিস না এটা কি আমাদের দোষ নাকি? আর কিভাবে খাওয়াবে কেউ তোর বউকে? দরজা লক রেখে গেছিস।”
মাহির কথা শুনে রায়ানের খেয়াল হলো সে ওদের হাতে চাবিটা দিতেই ভুলে গেছে, আর সারাদিনে খেয়ালও হয়নি নানান ব্যস্ততায়।
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহির কে বলল-

“চাবি আমার ঘরে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে আছে। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে কিছু খাওয়াতে বল রিমি কে বা সোরা কে। বিয়ের সময় অজ্ঞান হয়ে গেলে অনেক সমস্যা।”
মাহির ও রায়ানের কথা মেনে নিলো। অতঃপর চাবি সংগ্রহ করে মিরায়ার ঘরে রিমি আর সোরায়া খাবার নিয়ে গেল
-“আপু..!”
-“মিরা..!”
ঘরের অবস্থা দেখে তাদের চোখ পুরো বিস্ফোরিত হয়ে থাকলো। ফ্লোরে খাবার পড়ে আছে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বিছানায় কাপড় চোপড় ছড়িয়ে আছে মিরায়ার লাগেজের যা নয় তা অবস্থা। রিমি সোরায়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করে শুকনো ঢোক গিলে সম্পূর্ণ ঘর আবারো খেয়াল করলো। ঘরটা জন মানব শুন্য । মিরায়া ঘরে নেই দেখে সোরায়রা রিমি ওয়াশ রুম ঘরের সব জায়গা খুঁজতে থাকলো-

“আপু…কোথায় তুমি?”
“মিরা…বাইরে আয়।”
খুঁজতে খুঁজতে বারান্দায় গেলে- দেখতে পেলো একটা বড় দড়ির মতো কিছু একটা কয়েকটা ওড়না গিট দিয়ে বানানো হয়েছে। সোরায়া ভালো করেই জানে মিরায়ার এই কাজ নতুন কিছু না। প্রায়ই এই টেকনিকে রাইডিং করতে যেত মিরায়া। তাদের বুঝতে আর বাকি নেই মিরায়া পালিয়েছে। কিন্তু তাদের গলা শুকিয়ে আসছিল এই ভেবে যে এই কথা যদি রায়ান জানতে পারে তাহলে তো কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে।
রিমি আর সোরায়া তাড়াতাড়ি দৌড়ে বাইরে গেলো-

সোরায়া কাঁপা গলায় বলল-
“আপু ভেতরে নেই রুদ্র ভাইয়া।”
মাহির আর রুদ্র অবাক হয়ে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“নেই মানে? বন্ধ ঘর থেকে হাওয়া হয়ে যাবে নাকি?”
রুদ্র কথাটা বলতেই রিমি ওড়না দিয়ে বানানো দড়ি টা রুদ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
“এটা বারান্দায় ঝুলে ছিলো। এটার সাহায্যে গেছে।”
রুদ্র হা হয়ে তাকিয়ে রইল-
“এইসব তো মুভি যে হতে দেখেছি। মিরা এসব ও পারে?”
সোরায়া মনে মনে বিড়বিড় করছে-
“আরো যে কত কি পারে তোমার ধারণা নেই ভাইয়া। এ কোনো সাধারণ মেয়ে নয় লা.. এ হলো রাইডার কুইন রায়া। উফ্, এই বিয়ের কি হবে এখন?”
মাহির হঠাৎ ফোন বের করতেই রুদ্র মাহির কে প্রশ্ন করলো-

“মাহির ভাই , কি করছো?”
মাহির রায়ানের নাম্বার ডায়েল করে কানে ফোন দিয়ে বলল-
“যা করা উচিত তাই করছি। তোর ভাই খুন করে ফেলবে যদি জানতে পারে ওর বউ পালিয়েছে কিন্তু ওকে জানানো হয়নি।”
রায়ান মাহিরের কল ধরতেই মাহির রায়ান কে সোজাসাপ্টা সত্যি কথা বলল হেয়ালি না করে-
“হ্যালো দোস্ত, শোন। রাগারাগী করিস না ঠান্ডা মাথায় কথা শোন আমার।”
রায়ান স্বাভাবিক ভাবেই বলল-

“হ্যাঁ বল শুনছি। কি হয়েছে?”
-“ভাবি ঘরে নেই। সম্ভবত পালিয়েছে। রিমি আর সোরায়া ঘরে খাবার নিয়ে যাওয়ার পর ঘরের ভাবিকে না দেখতে পেয়ে খুঁজতে থাকার পর বারান্দায় ওড়না দিয়ে…!”
-“ব্যাস হয়েছে, আর বলতে হবে না। সম্ভবত না, সত্যিই পালিয়েছে। কখনকার ঘটনা এটা? কখন গেছে?”
রায়ানের রিয়েকশন এতো স্বাভাবিক ছিলো যেন সে জানে এসব। জানার কথাও রেসের দিন একই ভাবে চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিল মিরায়া সেটা তার জানা। এমন কিছু হতে পারে এটা তারা আন্দাজ করা ছিল।
-“কখন হয়েছে তা কিভাবে বলবো। সারাদিন ই তো একা ছিল ভাবি ঘরে। কখন বাড়িয়েছে কে জানে।”
রায়ান মাহির কে বলল-

“ঘরের বুক সেল্ফে দেখ ছোট্ট ক্যামেরা লাগানো আছে ওইটা দেখেই বল কখন বেরিয়েছে।”
রায়ানের কথায় মাহির অবাক হয়-“ঘরে ক্যামেরা আছে!”
আসলে মিরায়ার জ্ঞান যখন ছিলো না তখন রায়ান রাতের বেলা মিরায়ার দিকে নজর রাখতে ক্যামেরা টা সেট করেছিল যেটা আর অফ করা হয়নি।
-“হ্যাঁ আছে দেখ। ওটা দেখে বল।”
হঠাৎ রায়ানের মাথা এলো রাতের আর সকালের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের সৃষ্টি হয়েছিল তার আর মিরায়ার মাঝে এসবও ক্যামেরা যে আছে। সবাই দেখলে বিষয়টা মোটেও ভালো দেখাবে না। তাই আবারো হকচকালো সে-
“আচ্ছা ওয়েট, শোন। তোর দেখতে হবে না। আমাকে ফুটেজ টা পাঠা‌।”
মাহির উত্তর করলো-“ওকে। পাঠাচ্ছি।”
কিন্তু রায়ান তাকে আবারো সাবধান করলো-

“আবারো বলছি। আমাকে পাঠাবি শুধু ফুটেজ যেন প্লে না হয়।”
মাহির বুঝতে পারেছিল শুরু তেই রায়ান কি বলতে চাইছে। আবারও একই কথা বলে অবিশ্বাস দেখালে মাহির বিরক্ত হয়ে বলল-
“বুঝেছি তো ভাই, আমি আন্দাজ করতে পারি কি থাকতে পারে ওই ফুটেজে। বিশ্বাস কর, আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই তোদের রোমান্স দেখার।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-“আচ্ছা ঠিক আছে পাঠা। ফাস্ট।”

মাহিরের ফোন কেটে দেওয়ার পর রায়ান গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে স্টেয়ারিং এ জোরে আঘাত করে বলল-
“কি বউ পেয়েছি আমি হাহ! একটা চুমু, জাস্ট একটা চুমু সহ্য করতে পারে না, কিন্তু বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। ডক্টর আবার বলে ও নাকি দূর্বল। সব দূর্বলতা আমি ধরলেই আসে ওর শরীরে।”
মাহির রায়ান কে ফুটেজ টা পাঠালে রায়ান গাড়ি থামিয়ে সম্পূর্ণ ফুটেজ টা দেখলো। রায়ান ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, মিরায়া ঘরের ভেতরে জামা কাপড় চেঞ্জ করেছে। মিরায়া জামা খুলতে শুরু করতেই ওই সময়টা রায়ান চোখ বন্ধ করে নেয় আর সাথে স্ক্রিনের উপর ও হাত রেখে ঢেকে দেয়। পৌরুষ আত্মা চাওয়ার পরও বউয়ের অনুমতি ছাড়া বউকে দেখার কোনো শখ তার ছিলো না।

-“ওয়াশ রুম থাকতে ঘরের ভেতর কেউ জামা ছাড়ে! কেমন বুদ্ধি নিয়ে চলে কে জানে?”
ফুটেজে দেখা যায়, মিরায়া জামা কাপড় বদলে কিছু টা সময় বিছানায় উঠে চুপ চাপ বসে ছিলো। তার পর হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে। বিকালের দিকে ঘুম ভাঙতেই তার মাথায় পালানোর কথা আসলে সে নিজের পুরনো টেকনিক খাটিয়ে বারান্দা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। সম্ভবত তখন রুদ্র রিমি বাসর ঘর সাজাতে ছাদ ঘরে ছিল তাই দেখে নি। কিন্তু সময় খুব একটা আগের নয়। এখন প্রায় ৪৫ মিনিট এর মতো হয়েছে মিরায়া বাগান বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। এই অবস্থায় বেশী দূরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ও নয় যেহেতু রাস্তাঘাট কিছুই তেমন চেনে না।

রায়ান হালকা হাসলো-“কি একটা অবস্থা, পালাবেই যেহেতু ভেবেছ আর একটু আগে পালাতে পাখি। এখন তো তোমার সাথে আমার রাস্তাতেই দেখা হয়ে যাবে। এটা কিছু হলো! থ্রিল কোথায় থাকলো আর। খোঁজার আগেই তোমাকে পেয়ে যাবো এমনটা হলে তো মজা থাকবে না।”
রায়ান টেনশন ফ্রি হয়ে গাড়ি অতি দ্রুত ছটালো বাগান বাড়ির দিকে।

বাগান বাড়ি ঘন জঙ্গলের ভেতরে হওয়ায় মিরায়ার বেশ হ্যাপা পোহাতে হয়েছে রাস্তা খুঁজে বের করতে। দেখা যাচ্ছিল রাস্তা চেনেনা বলে একই রাস্তা বারবার অতিক্রম করতে হয়েছে। এক প্রকার গোলোক ধাঁধার ন্যায় ঠেকছিল জায়গাটা তার কাছে। শরীর নড়বড়ে কিন্তু শক্তি যোগাচ্ছে মন, খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একা একটা মেয়ে হাটছে, চোখে মুখে ক্লান্তি আর বিরক্তি স্পষ্ট-
“ধুর! কোথায় এনেছে এটা আমাকে? বের হওয়ার রাস্তাই পাচ্ছি না। ইচ্ছে করে করেছে সব যেন চাইলেও চলে যেতে না পারি।”
হাঁটতে হাঁটতে একটু এগিয়ে আবার আওড়ালো-

“আমিও দেখে নেব। ইহহহ শখ কত বিয়ে করবে! করবো না বিয়ে আমি ওই অশ্লীল লোকটাকে। এত বছর আর এই এক মাসের হিসেব আমার চাই তা না হলে কোনো কিছু স্বাভাবিক হবে না। যখন তখন অসভ্যতামি করে। দুইবার ঠোঁট স্পর্শ করেছে আমার, সাহস কত! আমি কি অনুমতি দিয়েছিলাম চুমু খাওয়ার?! যত্তসব!”
মিরায়ার বাড়ি থেকে পালানোর উদ্দেশ্য মোটেও বিয়ে না করতে চাও ছিল না, থাকবেই বা কেন! এতো গুলো বছর এই স্বীকৃতির অপেক্ষাই তো সে করেছে,বরং রায়ান তাকে তাদের মধ্যে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টির কারণ বলে নি তাই জেদ চেপেছে মাথায় যতক্ষণ না সব পরিষ্কার হচ্ছে সে বিয়ে করতে চায় না। পালানোর চিন্তা মাথায় আনার কারণ ও এটাই রায়ান কে উত্তেজিত ও বিরক্ত করা যেন বাধ্য হয় সব বলতে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মিরায়ার পায়ে ধারালো কিছু একটা দিয়ে পায়ে আঘাত পেতেই মিরায়া অস্পষ্ট আর্তনাদ করলো-
“আআহহহ্…!”

সাথে সাথে পা মাটি থেকে তুলে নিয়ে একপায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে একটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে পায়ের নিচে তাকাতেই খেয়াল করলো পায়ে একটা বড় কাঁটা ফুটে গেছে। মিরায়া ছোট থেকেই বেশ শক্ত। কোনো ব্যাথা তার গায়ে লাগে না, এভাবেই বড় হয়েছে কিন্তু এখন শরীর টাই ভালো না তার তার উপর কিছু খায়নি ঠিক মতো কত দিন হয়েছে তার ঠিক নেই। পা থেকে কাঁটা টা টেনে বের করে ছুঁড়ে ফেলে আবারো হাঁটতে থাকলো। যদিও মিরায়া নিচে তাকায় নি কিন্তু বেশ ভালো রকমের রক্তপাত হচ্ছে।

কিছুটা পথ হাঁটার পর মিরায়া একটা রাস্তা পেল। আর তা ধরেই আগোতে থাকলো। এমন সময় তার মনে হচ্ছিল তার পেছন পেছন কেউ তাকে অনুসরণ করছে। তবে পিছন ফিরে দেখলো না। আচমকা দুদিক থেকে দুইজন ছেলে মিরায়ার সামনে এসে তার পথ আটকায়- দুই জনের পড়নে উগ্র পোশাক, চেহারার ভাব নমুনা, চোখের চাহনি ও কেমন অশালীন। মিরায়া ভয় না পেয়ে সোজা গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“কি চাই? পথ আটকালেন কেন?”
ছেলে গুলো দুইজন দুইজনের সাথে চোখাচোখি করে বিকট হেঁসে বলল-
“চাই তো তোমাকেই সুন্দরী । বোঝো না তুমি? ছোট খুকি নাকি?”
মিরায়ার লড়াইয়ের ক্ষমতা আছে তবে শক্তি নেই তাই বখাটে ছেলেদের পাত্তা না দিয়ে তাদের ঠেলে সামনে এগোতে চাইলো-

“সামনে থেকে সুরুন দুইজন। আমাকে যেতে দিন।”
ছেলে গুলো মিরায়াকে দুই দিক থেকে ঘিরে ধরে তাদের একজন বলল-
“রাস্তায় নয় সুন্দরী তোমাকে বিছানায় বেশি মানাবে। যাবে নাকি?”
মিরায়ার মেজাজ বিগড়ে গেলো সাথে সাথে ছেলেটার কথা শুনে। নিজেকে আটকানোর চেষ্টা টুকু করলো না। প্রতিবাদের জন্য হাত শক্ত করে মুঠো পাকাতেই ছেলে গুলোর কাঁধে দুটো হাত পড়লো, আর তারই সাথে হওয়ায় ভেসে এলো এক পরিচিত গলা-

“তোদের কে সুন্দরীর সামনে নয়, কবরে মানাবে। যাবি নাকি?”
ছেলে গুলো পিছন ফিরে তাকাতেই তাদের দুই জনের মুখে পড়লো সজোরে এক একটা ঘুষি। মিরায়া চমকে পিছনে সরে যেতেই দেখলো রায়ান দাঁড়িয়ে। রায়ান মিরায়ার দিকে একনজর দেখেই হাত উঠিয়ে হেঁসে বলল-
“হাই, সোনা। কোথায় যাচ্ছিলে!? বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছ বুঝি? বর কে না বলে এভাবে বাড়ি থেকে বের হওয়া ঠিক নয় বেইবি। এইসব জানোয়ারের রাস্তায় অভাব নেই।”
মিরায়া স্তব্ধ হয়ে আছে, ওই ছেলে গুলো কে ভয় না পেলেও রায়ানের উপস্থিতিতে তার এখন ভয় করছে- তবে নিজের জন্য না বরং ছেলে গুলোর জন্য। রায়ান মিরায়ার থেকে নজর সরিয়ে লোকগুলো কে মাটিতে ফেলে এক এক করে ইচ্ছে মতো মারতে থাকে-

“হোটেলে নিয়ে যাবি তাই না? চল তোদের কবরস্থান ঘুরিয়ে আনি।”
-“মা..মাফ করে দেন স্যার আর করবো না। আর হবে না।”
কে শুনে কার কথা। রায়ান নিজের মতো হাত চালাচ্ছে। লোক গুলোর মুখও রক্তাক্ত হয়ে গেছে। মিরায়ার গলা শুকিয়ে এই দিকে কাঠ। রায়ান কে থামাবেই বা কিভাবে! আর না থামালে খুন ও হয়ে যেতে পারে। রায়ানের মারের তীব্রতা বাড়লে মিরায়া চেঁচিয়ে রায়ানকে বলল-
“থামুন না। ছেঁড়ে দিন। মরে যাবে। পুলিশের হাতে তুলে দিলেই হয়। মারছেন কেন?”
রায়ান মিরায়ার কথায় বিরক্ত হয়ে বলল-
“খুব মায়া লাগছে এদের জন্য? কই আমার জন্য তো লাগে না! আমি কি মানুষ না? আমার জন্য তোর মনে মায়া নেই কেন? পালাচ্ছিস কেন আমার থেকে? সাহস কি করে হলো! এদের তো আজকে মেরেই ফেলবো। পুলিশ মাই ফুট।”
মিরায়া রায়ানের জেদ ঠিক কোথায় তা বুঝতে পারছে না। রাগ কার উপর আর ঝাড়ছে কোথায়। মিরায়া উল্টো রেগে বলল-

“আমার উপর রাগ এদের উপর দেখাচ্ছেন কেন? আমার উপর ঝাড়ুন দরকার পড়লে।”
রায়ান মিরায়ার কোনো কথাই শুনছে না যেন। মিরায়া ও বুঝলো রাগ দেখিয়ে কাজ হবে না। রায়ান ছেলে গুলো কে মারতে মারতে অধমরা করে ফেলেছে। মিরায়া না পারতে রায়ান কে ধরতে গেল। দুই হাতে রায়ানের এক বাহু আঁকড়ে ধরে টেনে উঠাতে চেষ্টা করতে করতে বলল-
“ছেঁড়ে দিন এবার। অনেক হয়েছে, মরে যাবে। আমি যাচ্ছি না কোথাও। থামুন এবার।”
রায়ান উঠে গেলেও ছেলে গুলো কে পা দিয়ে লাথি মারতে থাকে। মিরায়া রায়ান কে টেনেও সরাতে পারছে না-
“উফফফ্, থামবেন আপনি? বলছি তো যাবো না কোথাও। আমার এতো শক্তি নেই আপনাকে সামলাব। তাই দয়া করে নিজে নিজেকে সামলান।”

রায়ান হঠাৎ মিরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে এক হাতে মিরায়ার চোয়াল চেপে ধরে বলল-
“তোর কি মনে হয় আমার তোকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোর অনুমতি লাগবে? তোর কর্ম ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না, তুই নিজেই করবি। বাড়ি চল আগে। পরে বোঝাচ্ছি।”
মিরায়া রায়ানের চোখে তার জন্য অন্য রকম পাগলামি দেখলো আজকে কিন্তু রায়ানের কথার ভয় না পেয়ে সে স্বাভাবিক থেকে রায়ান কে শান্ত করার জন্য বলল-
“আচ্ছা ভালো কথা, নিতে হবে না অনুমতি, বাড়ি চলুন। বাড়ি গিয়ে বুঝবো যা বোঝাবেন, ওকে?চলুন, এদের বাদ দিন।”

মনে মনে ছেলে গুলো কে গালি দিচ্ছে-
“হারামজাদারা কেন এলি আমার সামনে? আমাকেও বিপদে ফেললি নিজেরাও মার খেলি। ধুর, পালাতে পারলাম না। চাচার কাছে গেলেও হতো। কপালই খারাপ।”
রায়ান মিরায়ার কথায় একটু শান্ত হলেও ছেলে গুলো কে আবার মারতে উদ্যত হলে মিরায়য়া রায়ানের কোমর জড়িয়ে আটকে দিয়ে বলল-
“আবার মারতে যায়! বললাম তো বাড়ি চলুন যা বোঝাবেন তাই বুঝবো।”
রায়ান মিরায়ার নরম গলায় গোলে গেলেও মিরায়া ইচ্ছে করে তাকে শান্ত করার জন্য মিষ্টি ব্যবহার করছে তা বুঝতে তার বাকি নেই। রায়ান মিরায়ার কোমর এবার দুই হাতে আঁকড়ে নিজের কাছে টেনে ইচ্ছা করে মিরায়াকে ভয় দেখাতে বলল-

“ওকে বেইবি, চলো। রাতে বোঝাবো সব ক্লাস রুমের বেঞ্চে।”
মিরায়া অস্বস্তিতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“রাতে ক্লাস রুমের বেঞ্চে মানে?”
রায়ান নিজের মুখ মিরায়ার কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করলো-
“তোমার জন্য স্পেশাল অর্থ বহন করে এগুলো বেইবি, ক্লাস রুম=বেড রুম, আর বেঞ্চ=বেড। Let’s go.”
মিরায়া গাল দুটো সাথে লাল হয়ে উঠলো মিরায়া আচমকা ছুটতে চেয়েও পারলো না এক সেকেন্ডে নিজেকে শুন্যে আবিষ্কার করে মিরায়া সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিলো। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে, পুলিশে কল করে ওই ছেলে গুলোর বিষয়টা সামলে নিয়ে নিজেও গাড়িতে চড়ে বসলো।
মিরায়া গাড়িতে কিছু সময় বসার পরই খেয়াল করলো ব্যাংক সিটে কিছু একটা আছে। তার চেনা পরিচিত একটা শব্দ ভেসে আসছে সেখানে থেকে। ব্যাংক সিটে তাকিয়ে মিরায়ার চোখ দুটো কপালে উঠার উপক্রম –
“জুলি…আমার জুলিয়েট?!”

মিরায়া ঘুরে বসে ব্যাক সিট থেকে জুলিয়েট যে বক্সে আছে তা নিতে চাইলে রায়ান মিরায়া কে জোর করে ধরে সোজা করে বসিয়ে সিট বেল্ট লাগিয়ে দিতে দিতে বলল-
“তোমার জন্যই এনিছি ওকে, শান্ত হয়ে বসো। আমি দিচ্ছি।”
মিরায়া বাধ্য মেয়ের মতো রায়ানের কথা শুনলো, ঠিক পর মুহূর্তেই রায়ান জুলিয়েট যে বাস্কেট এ ছিলো সেটা সামনে এনে মিরায়ার কোলে জুলিয়েট কে দিতেই মিরায়া খুব যত্ন সহকারে আলতো হাতে জুলিয়েট কে কোলে নিয়ে পাগলের মতো আদর করতে থাকলো-

“উম্মাহ, উম্মাহ, আমার বাচ্চা, আমার সোনা মেয়ে, কেমন আছিস তুই? রাগ করেছিস বুঝি মাম্মার উপর? মাম্মা কথা রাখতে পারি নি, কি করবো বল তোর পাপা তো তোর মাম্মাকে…!”
মিরায়া চুপ হয়ে গেল হঠাৎ আর সাথে সাথে রায়ানের দিকে তাকাতেই চোখা চোখি হলো। মিরায়া রায়ানের তাকে আনতে না যাও আর কথা টাই বলতো এটা রায়ান বুঝতে পারছিল কিন্তু তার এখন এ্যাকসিডেন্ট নিয়ে কিছু বলার ইচ্ছে নেই। তাই কিছুই বললো না মিরায়া কে। মিরায়া জুলিয়েটের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে আর জুলিয়েট এতো দিন পর মিরায়াকে পেয়ে খুব আনন্দে আদর খাচ্ছে। সে স্থির নেই মিরায়ার কোলে কেমন লাফাচ্ছে হয়তো খুশিতে, উল্লাসে, মিরায়াও ওকে নিয়ে খেলছে। রায়ান গাড়ি চালাতে চালাতে আড় চোখে একবার পাশের সিটে দেখে জুলিয়েট কে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-

“পাপা, এতো লাফাচ্ছো কেন? মাম্মার লেগে যাবে। চুপচাপ কোলে বসে মাম্মার আদর খাও।”
রায়ানের কথায় মিরায়া জুলিয়েট দুই জনের মনযোগ রায়ানের উপর গেল জুলিয়েট রায়ানের কথা ঠিক কি বুঝলো কে জানে- চুপচাপ মিরায়ার কোলে বসে পড়লো আর নড়লো না। মিরায়া না চাইতেও বাপ মেয়ের এমন বোঝা পড়া দেখে ফিক করে হেঁসে উঠে আবারো জুলিয়েটের উপর মন দিলো। হঠাৎ বাস্কেট থেকে একটা বাড়তি আওয়াজ এলো-
“মিয়াওও…”
মিরায়া ভ্রু কুঁচকে বাস্কেটের দিকে তাকাতেই দেখলো সেখানে আরো একটা বিড়াল আছে-

“ওটা কি?”
প্রশ্নে রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ওহ্ ওটা? ওটা আমাদের জামাই বাবাজি।”
-“মানে…?”
রায়ান দ্বিতীয় বিড়াল টা বাস্কেট থেকে বের করে মিরায়ার কোলে দিয়ে বিড়ালকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“রমিও সোনা, এটা হচ্ছে তোমার শশুর মশায়ের বউ, হবু বউয়ের মাম্মা। সম্পর্কে তোমার শাশুড়ি হবে। সালাম দাও।”

মিরায়া রায়ানের কথা অবাক হয়ে শুনতে শুনতে রোমিও কেও কোলে নিয়ে প্রশ্ন করলো –
“কি বলছেন এসব যাতা। শশুর শাশুড়ি, জামাই, মানে কি?”
রায়ান স্পষ্ট ভাবে সব টা বুঝালো –
“দেখ বেইব, আমি জুলিয়েট কে কথা দিয়েছিলাম ওকে একটা রোমিও এনে দেব। আর আজকের থেকে পারফেক্ট দিন হয় না, আজ বাগান বাড়িতে ধুমধাম করে বাপ আর মেয়ে বিয়ে করবো ঠিক করেছি।”
মিরায়া হা হয়ে আছে। মিরায়ার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে রায়ান আবারো বলল-
“কি হয়েছে হৃদপাখি? এমন অবাক হয়ে আছো কেন? খুশি হওনি তুমি- আজ আমাদের সাথে সাথে আমাদের মেয়ের ও বিয়ে।”

মিরায়া অকপটে মাথা নাড়ালো হ্যাঁ সূচক কিছু না বুঝেই শুধু হুজুগে পড়ে। রায়ান সাথে সাথে উত্তেজিত হয়ে বলল-
“সত্যি তুমি খুশি আমাদের বিয়েতে!? উফফফ্! শান্তি লাগলো শুনে।”
মিরায়া আহাম্মক হয়ে গেলো রায়ানের কথা শুনে, কি হলো এটা! সে তো রায়ানের কথার পেচে পড়ে গেছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কিছু বলার সুযোগ রায়ান দিলে তো। রুদ্র কে কল করে রায়ান এক বাক্যে বলল-
“রুদ্র…! কাজি ডাক, তোর বোন বিয়েতে খুশি মনে রাজি।”
মিরায়া কিছু বলার সুযোগ ও পেল না শুধু এক নজরে রায়ান কে দেখে যাচ্ছে। তার মনে কথা উড়ছে -“যদি এতোই চান আমাকে কেন এসব হলো? কেন আমাকে কষ্ট দিলেন? আর এখন কেনই বা আমাকে এতো করে নিজের করতে চাইছেন?”
মিরায়া রায়ানের আনন্দ ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গেল। চোখ দুটো ছলছল করছে তার সেটা রায়ানের চোখেও স্পষ্ট ধরা পড়ছে কিন্তু সেও কিছু বলছে না।

বাগান বাড়ি~
বাড়িতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সব গোছাতে। সোরায়া রিমি মিরায়ার লেহেঙ্গা গহনা সাজগোজের জিনিস গুলো বের করে রেখেছে। মিরায়ার ঘরটাও এখন পরিষ্কার। মাহির রুদ্র কাজির সাথে বিয়ের বিষয়ে কথা বলছে।
হঠাৎ ই মূল দরজা দিয়ে রায়ান মিরায়াকে কোলে করে ভেতরে প্রবেশ করায় কাজি সাহেব সেই দিকে তাকিয়ে অবাক হন, কিন্তু রুদ্র মাহির স্বাভাবিক থাকলো। রায়ান বাড়িতে ঢুকেই রুদ্র কে বলল-
“রুদ্র..গাড়িতে জুলিয়েট আর রোমিও আছে‌। ওদের নিয়ে আয়।”
-“হ্যাঁ…! জুলিয়েট রোমিও?”

রুদ্র অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেও রায়ান উত্তর না দিয়েই মিরায়াকে নিয়ে মিরায়ার ঘরে গিয়ে মিরায়াকে খাটের উপর বসালো। ঘরে সোরায়া রিমি ছিলো কিন্তু রায়ানের চোখে তারা পড়লো না এমন মনে হলো।
রায়ান সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে মেডিসিনের বক্স বের করে মিরায়ার পায়ের কাছে বসলো। রায়ান মিরায়ার পা হাত দেওয়ার সময় হঠাৎ মিরায়া পা কুঁচকে নিয়ে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কি করছেন? পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?”
রায়ান চোখ রাঙালো আর তারই সাথে মিরায়া পা সোজা করে চুপ হয়ে গেলো। এরপর মিরায়ার পায়ের কাটা জায়গায় রায়ান ঔষধ লাগাতেই মিরায়া মৃদু কঁকিয়ে উঠলো-
“আআউউ, ইসস্…!”

রায়ানের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়লো। মিরায়া পা খিচিয়ে নিতে চাইলে রায়ান পা ধরে আলতো করে ফু দিয়ে ঔষধ লাগলো। মিরায়া রায়ানের এমন যত্নবান রূপে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইল। খালি পায়ে হেঁটেছে বলে পায়ে নোংরার অভাব নেই অথচ মানুষটার তাতে কোনো ফারাক পড়ছে না।
রুদ্র মাহির জুলিয়েট কে আর রোমিও কে নিয়ে ঘরের ভিতর এলে সোরায়া রিমি ওদের দেখতে পেয়ে অবাক হয়-
সোরায়া-“জুলি? আর এই বিড়াল টা কোথা থেকে এনেছো ভাইয়া?”
রুদ্র মুখের ভাব এমন করলো যে সে জানে না। তবে রায়ান মনযোগ দিয়ে মিরায়ার পা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করতে করতে বলল-

“ও রোমিও। জুলিয়েটের হবু বর। আজ আমাদের বিয়ের পর ওদের ও বিয়ে হবে।”
সবাই হা হয়ে আছে রায়ানের কথা শুনে। মাহির অবাক হয়ে আওড়ালো-
“আজ কাল বিড়ালের ও বিয়ে হয়?”
কারো মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ জুলিয়েট আর রোমিও দুইজনেই মিরায়ার কাছে লাফ দিয়ে চলে এলো। জুলিয়েট তো মিরায়ার পোষা তাই তার আবেগ মানা যায়, কিন্তু এইটুকু সময়ে রোমিও মিরায়ার কাছাকাছি থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। মিরায়া রোমিওর শরীরে হাত বুলিয়ে ওকে কোলে নিয়ে প্রশ্ন করলো-
“আদর খেতে চাইছিস? মায়া তো ভালোই লাগাচ্ছিস? তোকে আদর করবো মাম্মা? একটা চুমু খাই?”
এই বলে রোমিও কে মিরায়া আদর করে চুমু খেলো। রায়ান ও মিরায়ার পায়ে ব্যান্ডেজ করে উঠতে উঠতে বলল-
“আদর তো আমিও খেতে চাই, কই কারো তো চোখে পড়ে না। হয় তো মায়া লাগাতে পারি নি এখনো। এখনকার দিনে পশুরাও ভালো জীবন যাপন করে মানুষের থেকে।”
মিরায়া মুখ উঁচু করে রায়ানের দিকে তাকালো। বাকিরা মুখ টিপে হেসে উঠতেই মিরায়া বিড়বিড় করলো-
“অশ্লীল, নির্লজ্জ, বেহায়া লোক…!”

রায়ান সোরায়া আর রিমিকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“আমার প্রিয় শালি সাহেবারা, আমার বউকে আমার জন্য সুন্দর করে বউ সাজিয়ে নিয়ে এসো।”
পর পরই রুদ্র আর মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
“আর তোরা চল বাইরে কাজির সাথে কথা বলে আমিও রেডি হবো।”
হঠাৎ তখনি মিরায়া প্রতিবাদ করে চেঁচিয়ে বলল-
“আমি কারো জন্য বউ সাজবো না। বিয়েও করবো না।”
রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে ঝুঁকে বলল-

“দেখ সোনা, রাগিও না আমাকে। বিয়ে তো হবেই। ভালোই ভালোই রাজি হলে শুধু তোমার আমার বিয়ে হবে। আর যদি জোর করতে হয় তোমার বোন আর বান্ধবী ওদের ও জোর করে বিয়ে দিয়ে দেব আমার বন্ধু আর ভাইয়ের সাথে। আর এতে ওদের মত না থাকলে সবাইকে খুন করে জেলে চলে যাবো। সুন্দর হবে না?”
রায়ানের কথার আগা মাথা কেউ বুঝলো না ঘরের দুইজন মানুষ ছাড়া আর সেই দুজন ছিল- রুদ্র আর মাহির। রিমি আর সোরায়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রুদ্র আর মাহির একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে কি বলাবলি করলো তারাই ভালো জানে। হঠাৎই রুদ্র মিরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“দেখ মিরা, তুই আমার বোন। তোকে জোর করবো নি কিছুর জন্য। ইচ্ছে না করলে বিয়ে করবি না। না বলে দিতে পারিস।”

রায়ান, মিরায়া, সোরায়া, রিমি চারজন একসাথে চোখ বাঁকা করে রুদ্রর দিকে তাকালো। কিন্তু মাহির কেবল পিছন থেকে এগিয়ে এসে রুদ্রর কথায় তাল দিয়ে বলল-
“জি ভাবি, আপনি তো আমারো বোনের মতোই। মতের বিরুদ্ধে বিয়ে করা ঠিক নয়। চাইলে বিরোধীতা করতে পারেন। আমরা আপনার সাথে আছি।”
এবার চারজনই একসাথে মাহিরের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। মিরায়ার মাথায় এমনিও কিছু ঢোকে নি তার উপর রুদ্র মাহিরের কথা উল্টো মুসিবত। রায়ান আহাম্মক হয়ে গেছে, সে ভাবতে পারে নি নিজের ভাই আর বন্ধু বিয়ের কথায় এইভাবে পোল্টি খাবে, মনে থেকে যেন আর্তনাদ বের হচ্ছে তার-
“ওহ্ আল্লাহ! আমার কপালে তুমি সব বিভীষণের বংশধর কেন দিয়েছ? এই দুটোই আমার ঘর শত্রু।”
রিমি আর সোরায়া এবার একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো-

“আমরা সাথে নেই।”
সোরায়া দৌড়ে গিয়ে মিরায়ার কাছে বসে হাত ধরে বলল-
“আপু বিয়ে করে নাও। আমার বয়স মাত্র ষোলো। আমি বিয়ে করবো না।”
সোরায়ার এমন রিজেকশনে মাহিরের মনটাই ভেঙে গেলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“ডার্ক রোমান্স পড়া মেয়ে, পাকনা বুড়ি, তার নাকি বয়স কম।”
রিমিও মিরায়ার কাছে গিয়ে বলল-
“দোস্ত আমি তো তোর বিয়ে খেতে এসেছি। নিজের না। বিয়েটা করে নে। আমি বিয়ে করবো না।”
রিমির কথায় রুদ্র ও বেশ কষ্ট পেল মনে হয়, রিমির দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে মনে মনে প্রশ্ন করল- “কেন রিমি?”

রায়ান এদিকে কেমন গর্বিত চোখে সোরায়া আর রিমিকে দেখে আবেগ প্রবণ হয়ে যাচ্ছে মনে মনে-
“এরাই..এরাই আমার আসল বিপদের বন্ধু। আল্লাহ সকল বদ নজর থেকে আমার বোন গুলোকে রক্ষা করো “(রুদ্র আর মাহিরের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে)
মিরায়া একে একে সবার চেহারার ভাব নমুনা দেখলো। নিজেকে হয়তো এর আগে কখনো তার এতো হ্যাল্প লেস মনে হয়নি, যতটা এখন লাগছে। মিরায়া বিছানায় গা হেলিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে শুয়ে পড়লো, কিছুই বলল না। এদিকে রিমি আর সোরায়া বিয়ে করার জন্য বলেই যাচ্ছে দেখে রুদ্র আর মাহির নিজেদের পক্ষে কিছু বলার আগেই রায়ান ওদের কলার ধরে দাঁতে কটমট করে বলল-
“তোদের আর কিছু বলতে হবে না। বাইরে আয় আমার সাথে বোঝা পড়া বাকি আছে আমার, নেমকহারামের দল।”
অতঃপর রায়ান রুদ্র আরা মাহিরকে নিয়ে বাইরে চলে গেলে রিমি সোরায়া ঠেলে ধাক্কিয়ে মিরায়াকে রেডি করায়। রায়ান ও এক দফা ভাই আর বন্ধুর সাথে লড়াই করে নিজে তৈরি হয়ে নিয়েছে।
রাত ৮টা~

রায়ান কাজির সাথে বিয়ে সম্পর্কে ও পরিবার গঠনের সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস ও ঘটনা শুনছিল মন দিয়ে। মূলত কাজির কাছে তার প্রশ্ন ছিলো ঠিক কিভাবে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী হতে পারবে তার স্ত্রীর জন্য। আর যার প্রেক্ষিতেই কাজি রায়ানকে নিজের উত্তর শোনাচ্ছিলেন।
এমন সময় রিমি ও সোরায়া মিরায়াকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে রায়ান মিরায়াকে বউ সাজে দেখে সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। চোখ খুলে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে তার, হাত দুটো বুকের বাম দিকে আটকে গেছে যেন হৃৎস্পন্দন ও থেমে গেছে, মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট, তবে মিরায়ার হৃদয় ছেদ করার মতো একটা শব্দ-
“মাশাআল্লাহ!”

শব্দটা মিরায়ার কানে পৌঁছানো মাত্র তার শরীরে কাঁটা দিলো। মিরায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে নিলো, মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি যা এর আগে কখনো হয় নি। চির তরে কারো হয়ে যাওয়ার জন্য যে সাজে সেজেছে সে এই প্রথমবার তাও সেটা তার শখের পুরুষের জন্য। রায়ান খেয়াল করলো বাকি সবাই ও মিরায়াকে দেখছে। রায়ান ভ্রু কুঁচকে বাকিদের উদ্দেশ্যে বললো-
“মাশাআল্লাহ বল, নজর লেগে যাবে আমার বউয়ের।”
মাহির আর রুদ্র হেঁসে রায়ানের কাঁধে হাত রাখলো। মাহির উল্টো বলল-
“মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ জিকির তুই কর। যেভাবে দেখছিস সবার আগে তোর নজরই লাগবে।”
রায়ান কি ভাবে যেন মাহিরের কথা খুব সিরিয়াসলি নিয়ে সত্যি সত্যি মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ জিকির করতে থাকলো। ঘরের সবাই মিরায়া সহ হেঁসে উঠলো। বেচারা রায়ান বুঝতে পারে নি মাহির মজা উড়িয়ে বলেছে কথা টা। রিমি মিরায়ার কানে কানে বলল-

“না কিভাবে করবি জান? এতো কিউট লোকটা। শুধু তোর জন্য।”
মিরায়া মুখে প্রকাশ না করলেও মনে মনে সম্মতি জানালো। রায়ান সবার হাসি দেখে লজ্জা বোধ করলো না বরং সাথে সাথে মিরায়ার কাছে গিয়ে পকেট থেকে এক বান্ডিল টাকা বের করে মিরায়ার মাথায় চারদিকে ঘুরিয়ে বলল-
“আল্লাহ আমার বউয়ের উপর যেন কারো নজর না লাগে। ওকে সব বদ নজর থেকে হেফাজত করার ক্ষমতা দিও আমাকে।”
রায়ান টাকা গুলো সোরায়া আর রিমির হাতে দিলে সোরায়া আর রিমি মুচকি হেঁসে সরে দাড়ালো। রায়ান নিজের হাত এগিয়ে দিলো মিরায়ার দিকে। মিরায়া চেয়েও নিজের হাত রায়ানের হাতে দিলো না, রায়ান ও অপেক্ষা না করে সাথে সাথে মিরায়াকে কোলে নিয়ে নিলো। মিরায়া হকচকিয়ে গেলো কিন্তু বাকিরা হাততালি দিচ্ছে। কাজি সাহেবও বেশ আবেগ নিয়ে বিয়ের জোড়া দেখছেন।
রায়ান চিন্তিত কন্ঠে মিরায়াকে প্রশ্ন করলো-

“কষ্ট হচ্ছে তোমার হৃদপাখি?”
মিরায়া বুঝলো না কোলে নিলো রায়ান কষ্ট তার কেন হবে-
“কিসের কষ্ট?”
রায়ান স্পষ্ট করে বলল-
“এত ভারী লেহেঙ্গা পড়েছ, কষ্ট হচ্ছে না বহন করতে?”
মিরায়া কি বলবে বুঝতে পারলো না। ঘরের বাকি সবাই লাইভ মুভি দেখছে কোনো, এমন ভাবে তাকিয়ে আছে। যে কোলে নিয়েছে সে, যে লেহেঙ্গা পড়ে আছে তাকে জিজ্ঞেস করছে তার বহন করতে কষ্ট হচ্ছে কিনা!
মিরায়া আরো লজ্জিত হয়ে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বোঝালো তার কষ্ট হচ্ছে না। রায়ান মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে ফুল দিয়ে সাজানো সোফায় বসিয়ে মিরায়া লেহেঙ্গা, ওড়না, ঘোমটা সব ঠিক করে দিয়ে নিজেও তার পাশে বসলো। মিরায়ার মনে খচখচানি যাচ্ছে না কিছুতেই। সবাই নিজেদের জায়গায় বসলে রায়ান কাজি সাহেবর উদ্দেশ্যে বলল-

“কাজি সাহেব বিয়ের কাজ শুরু করুন।”
কাজি সাহেব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন করলেন-
“বিয়ের দেন মোহর কত লিখবো বাবা?”
মিরায়া মনে মনে ভাবলো এবার রায়ান কে একটু হলেও জব্দ করতে পারবে যদি কথা ধন-সম্পদের হয় যে কারো গায়ে লাগবে- “বিয়ে করার খুব শখ তাই না! দেখাচ্ছি বিয়ের করতে কত মজা!”
রায়ান কিছু বলার আগে মিরায়া বলল- “কাজি সাহেব..বিয়ে আমার তো দেন মোহরও আমি ঠিক করবো।”
রায়ান ভালো করেই জানে মিরায়ার মনে জিলাপির পেচ চলছে এখন তবে হিসেবে যখন বউ আছে তার হারানোর মতো কিছু নেই। রায়ান মিরায়ার কথার উপর বলল-
“Of course, baby..তুমি যা চাইবে তাই দেন মোহর ধরা হবে। তবে আগে আমি বলি, পরে আরো কিছু লাগলে যোগ তুমি করে দিও।”
মিরায়াও রাজি হলো। কাজি সাহেব রায়ান কে বললেন-

“”জি, বলুন। দেন মোহর কত লিখবো?”
রায়ান কোনো প্রকার কপট ছাড়া বলল-
“”হ্যাঁ, লিখুন। রায়ান চৌধুরীর স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি, রায়ান চৌধুরীসহ তার অনাগত এক ডজন বাচ্চা- এগুলো বিয়ের দেন মোহর।
(আল্লাহর রহমতে সন্তান সংখ্যা বেড়ে গেলে সেটা
তার জন্য বোনাস তার স্বামীর তরফ থেকে)।”
নিজের মতো একটানে কথাগুলো বলে মিরায়ার দিকে ফিরে বলল-
“Baby? Did I miss anything? তোমার আর কি চাই? যা ইচ্ছে এ্যাড করো, তোমার বর সব দেবে।”
মিরায়া থ মেরে গেছে। কি ভাবলো আর কি হলো কিছুই বুঝলো না। রুদ্র,মাহির হাইফাই করে একে অপরকে আগাম সাধুবাদ জানালো-

“ভবিষ্যতে এক ডজন আন্ডা বাচ্চার চাচ্চু হওয়ার অভিনন্দন রুদ্র।”
-“তোমাকেও মাহির ভাই। তুমি ব্রেক করবে নাকি রেকর্ড?”
মাহির সোরায়ার দিকে একনজর চেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“নাহ থাক, চাপ হয়ে যাবে।”
সোরায়া বুঝলো না কি বলল মাহির তার দিকে তাকিয়ে। মাহির রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো –
“তোর ইচ্ছে আছে ব্রেক করার?”
রুদ্র রিমির দিকে আড় চোখে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“না থাক, চাপ হয়ে যাবে।”
রিমি সোরায়ার সাথে বসে রায়ানের কথা নিয়েই হাসা হাসি করছে। কাজি সাহেব নিজের এতো বছরের অভিজ্ঞতায় এমন দেন মোহর শোনেন নি বলে বেশ বিস্মিত- “এ..এক ডজন?”
কাজি সাহেব-“বাবা, ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী বউকে স্পর্শ করার আগে তাকে তার দেন মোহর পরিশোধ করতে হয়।”

রায়ান একটা কাগজ বের করে তাতে সাইন করে দিয়ে বলল-
“নিন এতে সব কিছুর মালিকানা ওকে দেওয়া হয়ে গেছে। আর নিজের মালিকানা কবুল বলার সাথে সাথে ওকে দিয়ে দেব। বাকি..”
শান্ত ভাবে বলল-“আমার বউ যদি আগে দেন মোহর চায় তার পর বিয়ে আমার সমস্যা নেই। দশ বছর সময় দিক আমাকে দেন মোহর পরিশোধ করে পরে আবার প্রকৃত বউ হিসেবে স্পর্শ করবো।”
সবাই হেসে উঠল একসাথে। কাজি সাহেব আর মিরায়াই নিজেদের জগতে হা হয়ে আছে। অতঃপর কাজি সাহেব মিরায়াকে বললেন উপদেশ দিয়ে বললেন-

“মা, আমার পাঁচ বাচ্চা। সব কয়টা হাড়ে বজ্জাত। এক ডজন অনেক বেশি। কথা বলে কমাও।”
মিরায়া কাজি সাহেবর কথা শুনল কিন্তু সে ভালো ভাবেই জানে রায়ান ইচ্ছে করে এমন করছে। মিরায়া রায়ানের সাইন করা কাগজ টা নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে কাজি সাহেব কে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫১

“কাজি সাহেব, ইসলামের অনুযায়ী ঠিক যতটুকু দেন মোহর দেওয়ার নিয়ম আছে ততটুকুই লিখুন। আর আমার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত।”
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো, যেন পুরো টা তার কল্পনা করা ছিলো। মিরায়ার কথা মতো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন হলে কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করেন।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫২