Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬১ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬১ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬১ (২)
অরাত্রিকা রহমান

দুপুরের পর মিরা আর রিমি ক্যাপাস থেকে ফিরেছে। শপিং এ যাওয়া নিয়ে ক্যাম্পাসে থাকা অবস্থাতেই দুইজন বেশ উৎসাহিত ছিল। মিরা রিমি নিজেদের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হওয়ার জন্য রেডি হতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই রায়ান বাড়িতে ফিরলো। মিরা রেডি হওয়ার আগেই রায়ান কে মেসেজ করে দিয়েছিল যেহেতু রায়ান তাকে একা বের হতে না করেছে তাই আর চেষ্টা ও করে নি কথা অমান্য করার। এইদিকে রায়ানও তার হৃদপাখির একটা মেসেজে সব কাজ ফেলে রেখে চলে এসেছে। রায়ান গাড়ি বাড়ির সামনে দাঁড়া করিয়ে রেখে হাতে কোর্ট টা নিয়ে দ্রুততার সাথে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে ড্রয়িং রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে মিরাকে ডাকলো-

“হৃদপাখি…! কই.. এখনো রেডি হও নি? তাড়াতাড়ি নিচে আসো।”
মিরা ঘর থেকে রায়ানের আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে গলা উঁচিয়ে সাড়া দিলো-
“আসছি। ৫ মিনিট।”
রায়ান সোফায় বসে ঠিক ৫ মিনিট অপেক্ষা করলো। ছেলে হয়ে ধৈর্য ও এতো কম যে সময় শেষে হওয়ার সাথে সাথে আবারও চেঁচিয়ে উঠলো-
“কি হলো? আর কতক্ষন?”
মিরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করলো-
“উফফফ্, জ্বালিয়ে ফেলল। একটু মন মতো রেডিও হতে পারবো না নাকি?”
মিরা আবারো জোরে চেঁচিয়ে বলল-
“আর ৫ মিনিট।”
রায়ান সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একই বিরক্তি প্রকাশ করে বলল-
“আমার ঘড়ি কি থেমে আছে নাকি যে ওই ঐতিহাসিক ৫ মিনিট শেষই হচ্ছে না? তাড়াতাড়ি নিচে এসো নাহলে আমি উপরে চলে আসবো।”

মিরা তাড়াতাড়ি নিজের ঘর গুছিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বলল-
“হুম, চলুন। আমি রেডি হয়ে গেছি।”
রায়ান ঘুড়ে দাঁড়িয়ে মিরার দিকে তাকাতেই তার বুকে কেমন যেন ব্যাথা অনুভব হলো তার। রায়ান নিজের জায়গায় স্থির হয়ে গেলো, শুধু ড্যাপ ড্যাপ করে চোখের সামনে থাকা রূপসী কে দেখছে- মিরা যে খুব সেজেগুজে এসেছে এমন কিছু নয়, চোখে কালো কাজল, আর ঠোঁটে লিপস্টিক মেয়েটার, সময় লেগেছে তার লম্বা চুলগুলোকে সামলাতে গিয়ে। রায়ান মিরার দিকে অপলক হয়ে তাকিয়ে আছে কেবল মিরার উপস্থিতিতেই আদতেও বাহ্যিক সৌন্দর্য তার কারণ কিনা বলা মুশকিল। মিরা রায়ানের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“কি হলো? এতক্ষণ যে মাথা খাচ্ছিলেন এবার চলুন!”
রায়ান মিরার দিকে ওইভাবেই তাকিয়ে আছে আর শুকনো ঢোক গিলছে। মিরা নিজের মাথায় হাত রেখে বলল-
“এই যাহ্। আমরা আমরা চলে গেলে হবে নাকি। রিমি আর বনু তো নামেই নি। আর একটু অপেক্ষা করুন আমি ওদের ডাকতে যাই। এক্ষুনি চলে আসবো।”

ঠোঁটে লিপগ্লস লাগানোতে মিরার ঠোঁট জোড়া রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মিরার কথা বলতে থাকার দিকে কান না দিয়ে ঠোঁটের নড়াচড়ায় মন আটকালো তার। মিরা রিমি আর সোরায়াকে ডাকার জন্য যেতে চাইলে রায়ান মিরার এক হাতের কব্জি আঁকড়ে ধরে অন্য হাতে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। মিরা আঁতকা এমন ঘটনায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রায়ান বুকের আছড়ে পড়লো আর শার্টের কলার খামচে ধরলো। রায়ান মিরার দিকে আবারো নিজের নজর স্থির করলে মিরা রায়ানের চাহুনিতে লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে নিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো-

“কি হয়েছে? এই ভাবে কি দেখছেন?”
মিরার গাল দুটো সাথে সাথে লাল বর্ণ ধারণ করলো। রায়ান মিরাকে লজ্জা পেতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে দুষ্টুমি করে বলল-
“বাপরে, এখন তো তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমাদের গন্তব্য আমাদের বেডরুম মাই মিসেস। I am losing it..”
রায়ানের কথায় মিরা সাথে সাথে রায়ানের চোখের দিকে চাইলো- ছেলে টার নজর মিরার ঠোঁট জোড়ার উপর স্থির। মিরার ঠোঁট শিহরণে কেঁপে উঠতেই রায়ান নিজের চোখের পলক ফেলে মিরাকে গম্ভীর গলায় বলল-
“আমি তাকালেই কেন তোমার ঠোঁট কাঁপতে হবে হ্যাঁ? যেখানে দেখলেই লোভ লাগে সেখানে কাঁপতে দেখে ও যখন স্পর্শ করার পরিবেশ থাকে না এই বুকে কি প্রচন্ড রকমের ব্যাথায় তা কি বোঝো? এখন কিছু করে বসলেই আমি অসভ্য হয়ে যাবো।”

মিরা রায়ানের কথা শুনে নিজের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল। রায়ান মিরার প্রতিক্রিয়াতে বুঝতে পারলো মিরা এখন লজ্জায় পড়তে পারে এই ভয়েই এমন করছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটা অভয় দিয়ে মিরাকে ঠোঁট ছাড়ার জন্য বলল-
“আমার হক নষ্ট করবে না একদম। নরমাল হও। ড্রয়িং রুমে সবার সামনে বউকে আদর করে তাকে লজ্জায় ফেলা রায়ান চৌধুরীর স্টাইল নয়। আমার বউয়ের লজ্জা শুধু আমার কাছেই থাকবে আর আমার কাছেই ভাঙ্গবে।”
মিরা রায়ানের এই কথায় সাথে সাথে স্বাভাবিক হয়ে যায়। রায়ান মিরার কোমর ছেড়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করলো-
“ওয়েট করো। একটু পর দেখছি তোমাকে, আর তোমার ঠোঁট…!”
মিরা রায়ানের অস্পষ্ট কথা বুঝতে পারলো না আর না চেষ্টা করলো বোঝার। একটু পরেই রুদ্র বাড়িতে ফিরলো। মিরা অসময়ে রুদ্র কে বাড়িতে দেখে অবাক হলো-
“রুদ্র ভাইয়া..! তুমি আজ এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এলে যে? কিছু ফেলে গেছ?”
রুদ্র স্বাভাবিক ভাবেই বলল-

“না তো। ভাইয়া ফোন করে বলল তুই সোরা আর রিমি শপিং এ যাবি। তাই চলে এলাম।”
মিরা মাথা উঁচু করে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান শান্ত গলায় বলল-
“যার বউ তার দায়িত্ব। আমি আমার বউকে নিয়ে যাচ্ছি। রুদ্র ওর বউকে নিয়ে যাবে। সিম্পল।”
মিরা হতবাক হয়ে কয়েকবার চোখের পলক ফেলল রায়ানের কথায়। একটু পর মাহির ও এসে হাজির হলো। মিরা হঠাৎ করে মাহির কে দেখে আরো অবাক হলো, অদ্ভুত ব্যাপার হলো রায়ানের মুখেও একই ছাপ। মিরা মাহির কে দেখে হেঁসে কথা বলল-
“আসসালামুয়ালাইকুম মাহির ভাই, কেমন আছেন? হঠাৎ করে এলেন যে। আমরা তো বাইরে যাচ্ছি।”
মাহির কিছু বলার আগে রুদ্র মিরাকে বলল-

“আরে আমি ডেকেছি মাহির ভাইকে। আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য।”
মিরা অবাক হলো রুদ্রর কথা শুনে কিন্তু রায়ানের প্রতিক্রিয়া অন্যরকম যেন রুদ্র কে চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে। রায়ান রুদ্রর কাছে গিয়ে রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো-
“তুই মাহির কে আমাদের মাঝে ডেকেছিস কেন?”
রুদ্র উল্টো জবাব দিলো-
“তাহলে তুমি তোমার বউ নিয়ে যাবে বলে আমার আর আমার বউয়ের মাঝে সোরাকে ঢোকালে কেন?”
রায়ান দাঁত কিড়মিড় করে বলল-
“সোরা আমাদের বোন। ওকে নিয়ে যেতে তোর কি সমস্যা?”
-“তো তুমি নাও ওকে তোমার গাড়িতে। আমাকে বলছো কেন।”
-“রুদ্র বেশি বেশি হচ্ছে কিন্তু! তাই বলে মাহির কে ডাকবি? সোরাকে আমার মাহিরের সাথে ছাড়তে ভয় লাগে।”
রুদ্র মাহিরের কাঁধে হাত রেখে বলল-

“তাহলে বুঝো মিরাকে তোমার সাথে ছাড়তে আমার কত ভয় লাগতো? যাক গে, যার বউ তার দায়িত্ব একটু আগে তুমিই তো বললে। সোরা মাহির ভাইয়ের সাথে সেইফ থাকবে। নো টেনশন।”
মাহির দুই ভাইয়ের কথা কাটাকাটি শুনছে শুধু- তার হঠাৎ খুব অপ্রত্যাশিত অতিথির মতো অনুভব হলো। মিরা এখনো তাদেরকে খেয়াল করছে বাঁকা চোখে। মাহির মিরার দিকে তাকিয়ে একটু বানোয়াট হেঁসে বলল-
“ওয়ালাইকুমু আসসালাম ভাবি। আমি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। সরি। হঠাৎ করে চলে আসা উচিত হয়নি আমার। আসলে আমারও কিছু কেনাকাটা ছিল তাই ভাবলাম…!”
রায়ান মনে মনে বিড়বিড় করলো-

“কেনাকাটা না ছাই। সব যে সোরার সাথে চিপকে থাকার ধান্দা বুঝিনা ভেবেছে। উফফফ্, একদিকে আত্মার বন্ধু অন্যদিকে বোন। সোরা আর একটু বড় হলেও হতো, এতো ছোট বয়সে এইগুলো কিভাবে মানবো আমি? খোদা জানে মিরা বুঝতে পারলে কি হবে।”
মিরা মাহিরের কথায় আন্তরিক সুরে বলল-
“আরে কি যে বলেন মাহির ভাই, চলুন আমাদের সাথে। একসাথে গেলে মজাই হবে।”
রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এর মাঝে রিমিও নিচে নেমে এলো। মিরা রিমিকে দেখে রুদ্রর নামে খেপিয়ে বলল-
“এইযে নতুন ভাবি, দেখুন তো কে এসেছে? আপনার বর তো দেখা যায় সম্পূর্ণ বউ পাগল। ভাইয়ের মুখে একবার বউ শপিং এ যাবে শুনেই হাজির।”
রুদ্র মিরার সম্পর্কে ভাই হওয়ায় মিরা এখন হঠাৎ হঠাৎ রিমিকে ভাবি ডেকে খেপায়। রিমি রুদ্রর দিকে অবাক চোখে তাকালে রুদ্র ও একটু অস্বস্তিতে তার দিকে তাকায়। মাহির আর রায়ান ওদের দেখে হাসছে। মাহির রায়ানের দিকে সরে গিয়ে রায়ান কাঁধে হাত রেখে হতাশাগ্রস্থ হয়ে বলল-

“হাহ্! আজ বিয়ে টা হয়নি বলে আমার সাথে কেউ এমন মজা করে না।”
রায়ান হেসে উঠলো আর মাহিরের কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল-
“পিচ্চি বউ পছন্দ করেছিস ধৈর্য তো ধরতে হবে। থাক মনে কষ্ট নিস না।”
মিরা রিমির হাত ধরে নিয়ে গিয়ে রুদ্রর পাশে দাঁড়া করিয়ে দিয়ে বলল-
“আহাহা, কি সুন্দর জুটি!”
রুদ্র হেঁসে নিজের ইচ্ছেতেই রিমির কোমরে হাত রেখে নিজের আরো কাছে টেনে নিলো। রিমি বড় বড় চোখ করে রুদ্রর দিকে তাকালে রুদ্র নিজের হাতের স্পর্শ আরো শক্ত করে চোখের ইশারা করে‌। ড্রয়িং রুমের এই পরিবেশেই হঠাৎ করে সোরা সিঁড়ি দিয়ে গান গাইতে গাইতে নিচে নামলো-

“দুলাভাই দুলাভাই, ও আমার দুলাভাই
দুলাভাই দুলাভাই, ও আমার দুলাভাই ..
চলো না সিনেমা দেখিতে আজই যাই..
সিনেমার নাম নাকি তোমাকে চাই দুলাভাই..
সিনেমার নাম নাকি তোমাকে চাই দুলাভাই..!”
সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোরায়া উৎসাহিত গলায় বলল-
“চলো…আমি রেডি। আমার দুলাভাই কই?”
বেচারি ভাবছিল রায়ান তাদের নিতে এসেছে অথচ ড্রয়িং রুমে মানুষের অভাব নেই। চোখ তুলে সবাইকে এক নজর দেখলো মেয়েটা। সবাই ওর গান শুনে হাসছে। মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে বলল-
“এই যে আমার বোনের দুলাভাই, কিছু বলেন আপনার ছোট শালির উদ্দেশ্যে। সে তো খুব এ্যাক্সাইটেড।”
রায়ান লাজুক হেঁসে সোরায়া কে শুনিয়ে গাইলো –

“না না যাবো না, তুই শালি ভালো না
না না না যাবো না, তুই শালি ভালো না..!”
পরের টুকু আর না গেয়ে কানে ধরে বলল-
“আরে ছিঃ ছিঃ, কি বলি। আমার শালি অনেক ভালো। মন খারাপ করে না শালি।”
সোরায়া বিরক্ত মুখে বলল-
“রায়ান ভাইয়া শালি বলবা না আমাকে। শালি শব্দ টা কেমন গালি গালি শুনায়।”
মাহির এই কথা শুনে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“কলেজে শালি ডেকে সবার গুষ্টি উদ্ধার করে এখন তার কাছে শালি শব্দ গালি শুনাচ্ছে। ওয়াও।”
সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখ সাথে সাথে সরিয়ে নিয়ে বলল-
“সবাই যাবে?”
মিরা সোরায়ার কাছে গিয়ে বলল-

“হুম, সবাই যাবে। চল এবার এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলো। রায়ানের গাড়িতে মিরা, রুদ্রর গাড়িতে রিমি আর মাহিরের গাড়িতে
সোরায়া। সোরায়া গাড়িতে উঠেই প্রথমে মাহিরকে জিজ্ঞেস করলো-
“মাহির স্যার, আপনি আমাদের সাথে কেন যাচ্ছেন?”
মাহির সোরায়ার সিট বেল্ট লাগিয়ে দিয়ে বলল-
“তোমার খেয়াল রাখতে‌।”

-“আমার খেয়াল রাখার কি আছে, আমি কি বাচ্চা নাকি? তাছাড়া ভাইয়ারা তো আছেই।”
মাহির নিজের সিটে বেল্ট লাগিয়ে নিয়ে সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“আমি আমার জান বাচ্চার খেয়াল রাখবো। আর তা ছাড়া তোমার ভাইদের বউ আছে। ওরা ওদের খেয়াল রাখতে ব্যস্ত থাকবে। আমি আমার ফিউচার ওয়াইফ কে একলা কিভাবে ছাড়ি?”
সোরায়া চুপ করে গেলো। মনে মনে বেশ হাজার খানেক প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে তার‌। মাহির গাড়ি স্টার্ট দিলো মুচকি হেঁসে।
রিমি রুদ্র কে একা পেয়ে ধীরে গলায় জিজ্ঞেস করলো-

“আপনি চলে এলেন যে। অফিসের কাজ শেষ? বাবা একা একা সামলাতে পারবেন?”
রুদ্র হালকা হেসে বলল-
“এতো কিছু চিন্তা করে কি আর সংসার করতে পারবো? কাজ থেমে থাকুক একদিন কিছু হবে না। নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে, বউকে সময় না দিলে কপালে আর সেই কাঙ্ক্ষিত ডাল ভাত জুটবে না।”
রিমির গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো‌। রুদ্র রিমিকে লজ্জা পেতে দেখে রিমির দিকে ঝুঁকে আরো একটু খেপাতে বলল-
“মিসেস, ডালভাত, যত অপেক্ষা করাবেন তত ক্ষুদা বাড়বে। দিন শেষে ক্ষুদা নিবারণে কিন্তু চাপ টা খাবারের উপর দিয়েই যায়।”
রিমি রুদ্রর কথা ইঙ্গিত বুঝতে পারে আর এটা তাকে আরো লজ্জায় ফেলছে। রিমি রুদ্রর বুকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করলো-

“বাড়ুক খিদে। ডাল ভাত is not available…”
রুদ্র ঠোঁট কামড়ে হেঁসে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলে বাড়ির সামনে শুধু মিরা আর রায়ানের গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল। মিরা রায়ান কে একটু তাড়া দিয়ে বলল-
“উফফফ্, কি হলো? গাড়ি স্টার্ট দিন। সবাই চলে গেলো তো।”
রায়ান স্ট্যায়ারিং এ হাত রেখে মিরার দিকে ঘোর লাগানো নজরে তাকিয়ে উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“Are you ready baby?”
মিরা ভাবলো হয়তো রায়ান রওনা দেওয়ার কথা বলছে তাই সেও একই উৎসাহ নিয়ে বলল-
“Yes, hubby…”
রায়ান প্রসারিত হেঁসে সাথে সাথে মিরার সিটটা একদম নিচু করে দিয়ে মিরার উপরে চলে এলো। হঠাৎ ঘটনায় মিরা থতমত খেয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে মিরা দেখলো রায়ান তার উপরে অবস্থান করছে।
মিরা অবাক হয়ে বলতে নিলো-

“কি করছেন এসব হঠ…!”
কথা সম্পন্ন হওয়ার আগেই রায়ান মিরার ঠোঁট নিজের ঠোঁটে আঁকড়ে ধরলো। মিরার চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে আছে- হঠাৎ কি হলো কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। কিন্তু রায়ান ঠিকই জানে সে কি করছে যা তার গতিতে বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। মিরার দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলে মেয়েটা ছটফট করতে শুরু করলো, বারবার রায়ান কাঁধে ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছে-
“উউউমমম…!”
রায়ান মিরার গাল ছেঁড়ে মিরার দুই হাত নিজের একহাতে আঁকড়ে ধরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিরতি নিলো শুধু বলতে-

“Be quiet baby. Stay still for a moment…”
মিরা পুনরায় শ্বাস নেওয়ার আগেই রায়ান আবারো একই কাজ করলো। কিছুটা সময় পর মিরা হাল ছেঁড়ে দিয়ে শান্ত হয়ে গেল। রায়ান অবাক হয়ে ওভাবেই চোখ খুলে দেখলো মিরা চোখ বন্ধ করে আছে। রায়ান সময় নিয়ে নিজের কাজ সম্পূর্ণ করে মিরার ঠোঁট ছেড়ে দিল। রায়ান মিরার দিকে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা খুব দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলছে। রায়ান মিরার কপালে চুমু দিয়ে মিরার ঠোঁটের আশে পাশে লেগে থাকা অবশিষ্ট লিপস্টিক টুকু আঙ্গুল দিয়ে মুছে দিয়ে সেই আঙ্গুল মুখে নিয়ে ভারি কন্ঠে বলল-
“Now, you can say you are ready…”

মিরা নিজের চোখ খুললো। মেয়েটার চোখে পানি টলমল করছে। কষ্টে বা দুঃখে নয় বরং রাগে। মিরা সাথে সাথে রায়ানের গালে মৃদু জোরে একটা থাপ্পড় মারলো। রায়ান কিছু বলল না। মিরা আবারো রায়ানের অন্য গালে একই ভাবে থাপ্পড় মারলো সাথে বুকেও অনেক গুলো প্রহার করলো এক সাথে। চোখের পানি এমনি বের হচ্ছে চোখ দিয়ে। রায়ান দূরে না গিয়ে উল্টো মিরার চোখের পানি মুছে দিলো বলে আরো রেগে মিরা চেঁচিয়ে উঠলো-
“অসভ্য লোক দূরে থাকুন আমার থেকে। কাছে ঘেঁষবেন না একদম।”
রায়ান তাও মিরাকে জাড়িয়ে ধরে মিরার কানে কানে বলল-
“ওই ঠোঁট গুলোতে আমার হক আছে হৃদপাখি। লিপস্টিকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল তোমাকে। অন্যকেউ আমার হক দেখবে তা কিভাবে সহ্য করি বলো? I just can’t bare it..”
মিরা রায়ানের বন্ধন থেকে ছাড়া পেতে চেষ্টা করে বলল-

“ঠিক আছে আপনার হক আপনারই থাক। যাবো না আমি কোথাও। ছাড়ুন। বাড়ির ভেতরে যাবো আমি।”
রায়ান আরো শক্ত করে মিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল-
“তোমার বর তার বউকে সব বদ নজর থেকে রক্ষা করার সক্ষমতা রাখে হৃদপাখি। বাড়িতে কেন থাকবে তুমি? আমি শুধু চাইনা তোমাকে কেউ ওভাবে দেখুক। একটু বোঝো।”
মিরা রায়ানের দিকটা বুঝলো। কিন্তু তার রাগ কমেনি। রায়ান উঠে মিরার সিটটা পুনরায় ঠিক করে মেয়েটার চোখের পানি মুছে দিতে গেলে মিরা অভিমানী গলায় বলল-
“এইটার প্রতিশোধ আপনার ব্যাংক কার্ড গুলোর থেকে নেওয়া হবে আজ। টাকা উড়াউড়ি করবে এই বলে দিলাম। সময় আছে এখনি নামিয়ে দিন বাড়ির ভেতরে চলে যাই।”
রায়ান মিরার সামনের চুল গুলো নরম হাতে পিছনে সরিয়ে দিতে দিতে বলল-
“যেই টাকা আমার বউয়ের জন্য উড়বে না ওই টাকা দিয়ে কি হবে আমার? আমার কার্ড গুলোর দায়িত্বই আমার বউ যা চাইবে সেটা তার পায়ের সামনে এনে দেওয়া।”
মিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করলো-

“আজ বড়লোক বলে বউয়ের জন্য এতো পিরিতি।”
রায়ান হেঁসে নিজের সিটে বসে পরে সিট বেল্ট লাগাতে লাগাতে বলল-
“বউয়ের সাথে পিরিতি করতে টাকা ছাড়া আরো একটা জিনিস লাগে সোনা।”
মিরা চোখ বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“আর কি লাগে?”
রায়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল-
“গোপন জিনিস। রাতে দেখাবো নে।”
মিরা রায়ান কাঁধে ঠাস করে একটা চোর মেরে বকাঝকা করলো-
“এত ঠোঁট কাঁটা কেন আপনি হ্যাঁ? অসভ্য। গাড়ি চালান চুপ চাপ।”
রায়ান মিরার প্রহার থেকে বাঁচতে একটু সরে গিয়ে বলল-
“আউউউ্ , সত্যি বললেই আমি অসভ্য হয়ে যাই তোমার কাছে।”
মিরা নিজের হাত ডলতে ডলতে বিড়বিড় করলো-

“ইস, কি শরীর বানিয়েছে! যে মারতে যাবে তারই ব্যাথা লাগবে বেশি। ধুর ধুর।”
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মিরা গাড়ির সামনের আয়না নিচু করে ঠিক করে নিয়ে নিজের ঠোঁটের অবস্থা দেখতে শুরু করলে রায়ান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“তোমার কি তোমার বরের উপর কোনো বিশ্বাস নেই নাকি? তোমার সন্দেহ আছে যে আমি ওই ঠোঁটে এখনো কিছু বাকি রেখেছি যে এতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছ? There is nothing left..”
মিরা রায়ানের কথায় ভেংচি কেটে বলল-
“না না এই ভুল ধারণা নেই আমার। আমি জানি আমার বর অস্ত একটা রাক্ষস।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখন আর তর্কে গেলে ভালো হবে না। সম্পর্কের সৌন্দর্যই এটা- পরিস্থিতি বুঝে চুপ করে যাওয়া, খুব ছোট্ট একটা তর্ক হেঁড়ে গিয়ে ফিউচার সুন্দর করে তোলা।

শপিং মলে পৌঁছে অন্য এক দৃশ্যে তৈরি হয়েছে। তিনজন মেয়ে নিজেরা একা একাই একসাথে মিলে সামনে হাঁটছে আর ঠিক তাদের পিছনে তিন ছেলে তাদের বডিগার্ড এর মতো হাঁটছে। তিন মেয়ে হেঁসে খেলে গটগট করে সামনের দিকে এমন ভাবে হাঁটছে যেন তারা ছাড়া আশেপাশে আর কেউ নেই। রায়ান খেয়াল করলো রিমি কথা বলতে বলতে মিরার হাত ধরেছে- আর এটা দেখেই সে রুদ্রর মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
“ওই..তোর বউ আমার বউয়ের হাত ধরছে কেন?”
রুদ্র আহাম্মক হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলল-

“আমি কেমনে বলি? আর আমার বউ কি একলা ধরছে? তাকাই দেখ- তোমার বউও ধরছে।”
-“রিমি আগে ধরছে পরে মিরা ধরছে।”
-“যেই লাউ ওই কদু। ধরছে তো নাকি?”
মাহির দুইজনের কথায় বিরক্ত হয়ে বলল-
“ধুর বাল..! ধরাধরি নিয়ে কাহিনী না করে যে যার যার বউকে নিয়ে আলাদা রাস্তায় চলে যানা?”
রায়ান এবার মাহিরের পিঠ চাপড়ে দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিলো-
“হ্যাঁ, তুই তো এটাই বলবি। আমরা অন্য দিকে চলে
যাই আর এই সুযোগে তুই সোরার কাছে চলে যাবি। কি মনে করো, কিছু বুঝি না!?
মাহির রায়ানের হাত নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“বুঝিস যখন যা না রে ভাই। নিজেরা তো বিয়ে করে বসে আছিস তাই টেনশন নাই। আমার তো বউ বানাইতে হবে। একটু ছাড় দে! আমি না তোর জিগরি?”

রায়ান মাহিরের কথায় রুদ্রর সাথে চোখাচোখি করলো। ভাইয়ে ভাইয়ে আর কোনো কথার ঠিক প্রয়োজন পড়লো না। দুইজন দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে মিরা আর রিমির মাঝে ঢুকে গেল। রায়ান মিরার হাত নিজের হাতে নিয়ে নিলো আর রুদ্র রিমির হাত নিজের হাতে নিয়ে নিলো। মিরা আর রিমি দুইজনেই অবাক।
মিরা-“কি হলো! কিছু চাই?”
রায়ান-“আমি লাঞ্চ করি নি।”
মিরা-“তো?‌ আমি কি করবো?”
রায়ান-“লাঞ্চ করবে আমার সাথে এখন। চলো।”
রায়ান কথা টা বলেই মিরার হাত টেনে খাওয়ার কোনো একটা জায়গার উদ্দেশ্যে যেতে থাকলো।
এইদিকে রিমির ও এক অবস্থা~

রিমি-“কিছু বলবেন?”
রুদ্র -“আমার খুব খিদে পেয়েছে। ডালভাতে মন ভরবে কিন্তু পেট ভরবে না। সেটা না হয় পরে খাবো। এখন কিছু খেতে হবে।”
রিমি রুদ্রর কথার আগা গোড়া কিছু বুঝলো না-
“কিহ..?”
রুদ্র-“আগে চলুন কিছু খেয়ে নেই আমরা।”
রুদ্র ও রায়ানের পিছন পিছন রিমির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।
পাশে সোরায়া এই দৃশ্য দেখে ওইখানেই দাঁড়িয়ে গেলো-
“এটা কি হলো..! ও মা। আমি কি করবো এখন?”
মাহির মনে মনে রায়ান আর রুদ্র কে ধন্যবাদ বলে দ্রুত পায়ে সোরায়াকে ছাড়িয়ে গেল। সোরায়া সেদিকেও খেয়াল করলো। মাহির হঠাৎ থেমে গিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে নিজের হাত পিছনের দিকে এগিয়ে দিয়ে কয়েকবার মুঠো করলো আবার খুললো যেন কিছু ধরতে চাইছে। সোরায়া মাহিরের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে খুশি মনে দৌড়ে গিয়ে মাহিরের হাতে নিজের হাত দিয়ে দিলো।মাহির মুচকি হেসে সোরায়ার হাত ধরে একসাথে হাঁটতে লাগলো‌।

রায়ান আর রুদ্রর জোড়াজুড়ি তে মিরা আর রিমি বাধ্য হয়ে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে বসলো। ওয়েটার মেনু দিয়ে গেলে রায়ান মিরার দিকে মেনু এগিয়ে দিল আর রুদ্র রিমির দিকে। অতঃপর একসাথে বলল যা তাদের পছন্দ অর্ডার দিতে। রিমি আর মিরা চোখাচোখি করলো। মিরা রায়ান কে স্পষ্ট ভাষায় জিজ্ঞেস করলো-
“ক্ষুধা পেয়েছে আপনাদের , অর্ডার আমাদের করতে বলছেন কেন?”
রিমি চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল-
“আমরা তো এখানে চলে এলাম সোরা আর মাহির ভাই কোথায়?”
রায়ান মাহিরের হয়ে কিছু বলল না বলে রুদ্রই বলল-
“ওদের খিদে পায়নি তাই ওরা সোজা শপিং করতে গেছে। আমাদের খিদে পেয়েছে তাই আমরা এখানে।”
মিরা উল্টো জবাব দিয়ে রুদ্র কে বলল-

“আমাদের না। তোমার আর তোমার ভাইয়ার খিদে পেয়েছে। এমনটা বলো।”
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-
“হ্যাঁ হ্যাঁ, খাবার সার্ভ হলে তো মনে হয় তুই খাবিই না চাটবি।”
মিরা রেগেই যাচ্ছিল তখনি রায়ান মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“দুপুরে তো আমাদের কারোরই খাওয়া হয়নি। এসেছ যখন খেয়ে নাও শপিং করতে এনার্জি পাবা। মাহির আর সোরার কথা বাদ দেও। ওরা ওদের মতো শপিং শেষ করুক নিজেদের।”
মিরা রায়ানের কথায় শান্ত হয়ে গেল। তার পর রিমি আর মিরা একসাথে বেশ কিছুক্ষণ গবেষণা করেও কি অর্ডার করবে বুঝতে না পারলে রায়ান আর রুদ্র কেই অবশেষে অর্ডার করতে হলো খাবার। মেয়ে মানুষ বেশি অপশন দেখলে এমনি কনফিউজড হয়ে যায় তার উপর খাবারের মেনু তো…!
খাবার টেবিলে চলে আসলে মিরা হতাশ হয়ে বসে রইল- তার সামনে তার পছন্দের প্রণ রাখা তবু বেচারি খেতে পারছে না, বেছে দেবে কে! রায়ান মিরাকে ওইভাবে দেখে হালকা হাসলো- সে বুঝতে পারছিল মিরা তার হাত ব্যবহার করে খেতে পারবে না, যতই হোক মেয়ে মানুষ। রায়ান মিরার পছন্দ অনুযায়ী খাবার অর্ডার দিয়েছিল- চাইনিজ খাবার। মিরা খাচ্ছিল না বলে রায়ান নিজের হাত ধুয়ে একটা প্রণ হাতে নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে মিরার মুখের সামনে ধরে বলল-

“আআআআ করো।”
মিরা রায়ানের কাজে বেশ খুশি। তাই খিলখিলিয়ে হেসে বড় করে আ করলো। রায়ান মিরাকে খাইয়ে দিয়ে নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“মজা?”
মিরা উৎকন্ঠায় মাথা উপর নিচ নাড়ালো। রিমি রায়ান আর মিরা কে দেখে মুচকি হাসছিল। রুদ্র বড় ভাইয়ের কাজ দেখে খুবই বেশি আগ্রহী মনে রিমির জন্য চামচে চাউমিন উঠিয়ে রিমির মুখের সামনে ধরলো। রিমি একটু চমকে পরপর চামচটা আর রুদ্রর দিকে তাকালো- মুখে হালকা লজ্জার ছাপ। মিরা রায়ান রিমি আর রুদ্র কে দেখে মিটিমিটি হাসছে। রুদ্র অনেক্ষণ চুপ করে চামচটা ওই ভাবেই ধরে থাকলে রিমি বাধ্য হয়ে খাবারটা নিজের মুখে নিলো। দুইজন নিজেদের ভালো লাগা হয়তো মুখে প্রকাশ করতে পারছিল না তবে অনুভূতি গুলোই করি বলছিল।
অনেক এমন ভাবেই খাওয়া দাওয়া চলল। বলা বাহুল্য খিদে পেয়েছিল রায়ান আর রুদ্রর অথচ দুইজন মিলে খাইয়েছে নিজের নিজের বউকে। খাওয়া শেষে রায়ান মিরার দিকে পানি এগিয়ে দিল আর মিরাও তা পান করলো। রায়ান নিজের বুড়ো আংগুল দিয়ে মিরার ঠোঁটের কাছে লেগে থাকা খাবার মুছে নিয়ে সেই আঙ্গুল নিজের মুখ নিলো। মিরা এই ঘটনায় রিমি আর রুদ্রর নজর খেয়াল করে রায়ানের উরুতে হালকা শক্ত যে চিমটি কাটলো‌। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে উঠলো। হঠাৎ করেই মিরা তার পাশের আর টেবিলে বসা কিছু মেয়েদের কথা শুনতে পেলো-

“ওয়াও ওই ছেলে দুটোকে দেখ। পাশের টেবিলের। কি হ্যান্ডসাম রে দোস্ত। এরা এমন ছেলে কই পায়?”
-“হুম, কি কেয়ারিং দেখেছিস? কালো শার্ট পড়া ফর্সা ছেলেটাকে দেখ একবার (রায়ানকে) হাতের ভেনিস গুলো কি স্পষ্ট। টু হট।”
মিরা সাথে সাথে রায়ানের দিকে খেয়াল করলো রায়ান শার্টের হাতা বটানো- খাওয়ার জন্যই করেছিল, যার দরুন ছেলেটার পেশি আর ভেনিস গুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মিরা ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোট ছোট করে নিয়ে দ্রুত রায়ানের হাত নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। রায়ান অবাক হয়ে মিরার দিকে চাইলো কিন্তু মিরার নজর রায়ানের হাতে। রায়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো মিরা তার বটানো শার্টের হাতা নামিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ হাত ঢেকে দিল, আর রায়ানের আঙুলের ভাঁজে ইচ্ছে করে নিজের আঙুল রাখলো। রায়ান বুঝতে পারছিল না হঠাৎ কি হলো কিন্তু বউ তাকে স্পর্শ করছে এতে তার আপত্তি নেই এক বিন্দু ও। পাশের মেয়ে গুলো হতাশ হয়ে বলল-

“কি একটা অবস্থা, হাত টা ঢেকে দিলো!”
-“আরে হাত বাদ দে, ছেলে গুলোর বাইসেপস দেখেছিস? মনে হচ্ছে এখুনি শার্ট ফেটে বের হয়ে যাবে।”
মিরা তাড়াতাড়ি টেবিলের নিচ দিয়ে রিমির পায়ে লাথি দিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বোঝালো। তারপর সে নিজেও রায়ানের একহাতে নিজের হাত দিয়ে অন্য হাত দিয়ে ইচ্ছে করে দেখিয়ে দেখিয়ে রায়ানের বাইসেপ জড়িয়ে ধরলো। সম্ভব রিমিকে একই কাজ করে নিজের স্বামীর উপর অধিকার দেখানোর ইঙ্গিত করেছে। মেয়ে মানুষ জন্মগত হিংসুটে যখন সেটা তার প্রিয় মানুষের ব্যাপার হয়। রিমি আগে পিছে কিছু না ভেবে একই ভাবে রুদ্রর এক হাত সম্পূর্ণ জড়িয়ে ধরে। রায়ান রুদ্র বেচারা দুজন হতবাক- দুইভাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান ভ্রু নাচিয়ে রুদ্র কে- কি চলছে জিজ্ঞেস করার রুদ্র মাথা না সূচক নেড়ে বোঝালো – সে জানে না। মিরা ইচ্ছা কৃত রায়ানের শরীরে নিজের হাতের বিচরণ করলে রায়ান মিরার হাতের উপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ওই…কি হয়েছে তোমার?”

মিরা চমকে উঠলো কিন্তু নাটকীয় যেন না লাগে তাই মিষ্টি হেসে বলল-
“কই কিছু হয়নি তো। আপনার হাত অনেক আরামদায়ক তাই ধরে আছি।”
কথাটা বলেই আবার রায়ানের বাইসেপে নিজের হাত বুলাতে লাগলো। এইদিকে রায়ার অবস্থা বেহাল হওয়ার পথে। রায়ান মিরার দিকে ঝুঁকে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“Baby…are you in the mood?”
মিরা চোখ বড় বড় করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“কি এক জ্বালা রে। সুন্দর বরের হেফাজত করবো না বরের থেকে নিজেকে!”
মিরা সাথে সাথে না সূচক মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালে রায়ান উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল-
“আরে ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? এখানে অনেক ট্রায়েল রুম আছে। Completely private space…”
মিরা এই কথায় সাথে সাথে রায়ানের হাত ছেড়ে দিয়ে বলল-

“আমার খাওয়া শেষ আমি এখন আইসক্রিম খেতে চললাম। অনেক আইসিক্রম খেতে ইচ্ছে করছে আমার।”
কথাটা বলেই মিরা উঠে দ্রুত পায়ে ওই স্থান ত্যাগ করলে রায়ান ও চটজলদি বিল পে করে মিরার পিছনে ছুটলো। রুদ্র রিমি ওদের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকলো অতঃপর রুদ্র রিমির দিকে তাকালো – রিমি রীতিমতো রুদ্রর উপরে উঠে যাচ্ছে কাছে আসতে আসতে আর হাত তো ধরেই আছে। রুদ্র আর রিমির চোখাচোখি হতেই রিমি রুদ্রর হাত ছেঁড়ে দিয়ে একটু দূরে সরে বসে মাথা নিচু করে বলল-
“সরি।”
রুদ্র নিজের ঠোঁট কামড়ে হেসে রিমির কোমর ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে বলল-
“It’s fine… Stay like this..”

মিরা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে একটা সুপার শপের ভিতরে ঢুকলো আইস্ক্রিম কিনতে। রায়ান মিরার পিছন পিছন চলে মিরা ডাকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
“আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
রায়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বলল- “বউয়ের উপর টাকা উড়াতে।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো। যখন সে সেল্ফের অন্যান্য প্রডাক্ট গুলো দেখছিল তখনি হঠাৎ করে মিরার চোখ আটকে গেল একটা জায়গায় – যেখানে অনেক ফ্লেভার এর বার্থ কন্ট্রোলিং সেফটির প্যাকেট ছিল‌। ওইগুলো দেখেই মিরার অতীতের এক স্মৃতি মনে পড়লো যখন সে আর রায়ান প্রথম বাইক রাইডে বের হয়েছিল।
রায়ান খেয়াল করলো মিরার নজর। সে মিরার সাথে মজা করতে পিছন থেকে মিরার কাঁধ অব্দি ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলো-

“কোন ফ্লেভার চাও তুমি।”
মিরা চমকে উঠে পিছন ফিরে রায়ানের দিকে তাকালো। মেয়েটার গাল দুটো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মিরা একটু অন্য চিন্তা থেকেই রায়ান কে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো-
“মা..মানে কি?”
রায়ান দুষ্টু ভংঙ্গিতে শব্দ করে হেঁসে মিরার মাথায় হাত দিয়ে মেয়েটার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল-
“আমি আইসক্রিম এর ফ্লেভার কি চাও সেটা জিজ্ঞেস করেছি।”
মিরা বোকা বনে গেলো সাথে সাথে। রায়ান মিরার মূখ বরাবর ঝুঁকে আবারো দুষ্টু হেঁসে জিজ্ঞেস করলো-
“তুমি কি ভাবছিলে হৃদপাখি?”
মিরখ থতমত খেয়ে তৎক্ষণাৎ বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬১

“কই কিছু না তো। আমি কি ভাববো।”
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সোজা দাড়িয়ে বলল-
“তুমি যা ভেবেছ সেটাও খারাপ না। But I like doing it bare and raw..তুমি চাইলে ট্রায় করা যেতে পারে নতুন কিছু।”
মিরা লজ্জায় লালা হয়ে যাচ্ছিল রায়ানের ঠোঁট কাটা কথাবার্তায়। সে আর কথা না বাড়িয়ে রায়ানের সামনে থেকে সরে গিয়ে চুপচাপ একটা আইসক্রিম নিয়ে মেয়েটা বেরিয়ে গেল।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬২