আবির ভাই পর্ব ৯
উর্মিলা মজুমদার
রাত ন’টা পঞ্চাশ। ঘড়ির কাঁটা অলস ভঙ্গিতে এগোচ্ছে। আবির আর রায়হান মির্জা সাহেবের ড্রয়িং রুমে ঢুকল। এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠান নিচে ড্রয়িং রুমে হলেও পরবর্তী হুল্লোড়ের আয়োজন ছাদে। মির্জা সাহেব মানুষটি বেশ জাঁকজমক পছন্দ করেন। উনার ছেলে অয়ন মির্জার এনগেজমেন্ট বলে কথা। আধুনিক রুচির সব মানুষ। যাদের হাসি আর কথার ভেতরে কর্পোরেট গন্ধ পাওয়া যায়। আবির গম্ভীর, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাঁটছে। চারপাশের মানুষগুলো যেন ফুটন্ত কড়াইয়ের খৈ। ওদের দেখেই কয়েকজন এগিয়ে এল। বড়োলোকি পার্টিতে পরিচিত মুখ দেখতে পাওয়াটা ব্যাধির মতো।
“আরে আবির! কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখা।”
কেউ হ্যান্ডশেক করল, কেউ আবার অতি উৎসাহে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আবির শুধু হাসল। যে হাসির কোনো অর্থ নেই।
“কখন আসলে? বড়ো খান সাহেব আসেননি?”
আবির গলার স্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে আওড়াল, “না, বাবা আসতে পারেননি। শরীরটা ইদানীং একটু অসুস্থ উনার।”
মিথ্যা নয়, বাবা আসলেও হয়তো এই কোলাহল সহ্য করতে পারতেন না। রায়হান আবিরের পাশে পাশে হাঁটছে। সে বেশ উপভোগ করছে চারপাশটা। তার চোখে মুগ্ধতা আছে, যেটা আবিরের নেই। বোধহয় জোরপূর্বক এসেছে এখানে কিন্তু মনটা পরে আছে বাড়িতে। বড় বড় বিজনেসম্যানদের ভিড়ে ওরা হাঁটছে। হঠাৎ সামনে পড়লেন চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মিজান চৌধুরী। রাশভারী মানুষ, কিন্তু হাসলে গাল দুটো অদ্ভুতভাবে ফুলে ওঠে। সপরিবারে এসেছেন তিনি।
“আসসালামু আলাইকুম,” আবির ছোট করে সালাম দিল।
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আরে এই যে খান সাহেবের ছেলে আবির! কেমন আছো তুমি? তোমার ড্যাডি কোথায়?”
আবির একগাল হাসল। বলল, “আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আব্বু অসুস্থ, তাই আসতে পারেননি। আপনি ভালো আছেন তো? ওয়াজেদ এসেছে?”
মিজান সাহেব উৎসাহী গলায় ডাক দিলেন, “ওয়াজেদ! এদিকে আসো সপরিবারে।”
ওয়াজেদ ভাই আসলেন, সাথে তার স্ত্রী এবং এক তরুণী। মিজান সাহেব পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন।
“আবির, এ হলো আমার মেয়ে—মিরা। শাহরিয়ার মিরা চৌধুরী। মাত্র কানাডা থেকে অনার্স শেষ করে ফিরল। আর মিরা, এ হলো আবির। খান গ্রুপের চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে।”
মিরা মেয়েটা বেশ মর্ডান। সে প্রথাগত সালামের ধার ধারল না। ‘হ্যালো’ বলে অবলীলায় এগিয়ে এল আবিরকে জড়িয়ে ধরতে। অর্থাৎ যাকে বলে ‘হাগ’ করা। আবির মুহূর্তের মধ্যে এক পা পিছিয়ে গেল। বেশ বিরক্ত হলো সে। অনেকটা দাবাড়ু যেমন রাজাকে বাঁচাতে সরে যায়, ঠিক তেমন। মেয়েটি একটু থতমত খেল। তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত দুটো শূন্যে ঝুলে রইল কয়েক সেকেন্ড।
আবির চোখে মুখে কাঠিন্য নিয়ে তাকিয়ে রইল। মিরা অপ্রস্তুত হলো ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখে চমক দেখা দিল। সাধারণত তার মতো সুন্দরী আর আধুনিকা মেয়েকে কেউ এভাবে ফিরিয়ে দেয় না। আবিরের এই ‘অ্যাটিটিউড’ মিরার মনে সম্ভবত লাড্ডু ফুটিয়েছে। সে মুগ্ধ চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। রায়হান পাশ থেকে বিড়বিড় করে বলল, “কাজটা ঠিক করলি না আবির। মেয়েটা অপমানিত বোধ করতে পারত।”
একটু দূরে গিয়ে রায়হান ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে আবিরের কাঁধে চাপড় মারল। নিচু স্বরে হাসতে হাসতে বলল, “ভাই, মিরার মুখটা দেখেছিস? তুই তো ওকে একদম ছ্যাঁকা দিয়ে দিলি। ও তোকে হাগ দিতে চেয়েছিল আর তুই যেভাবে এভয়েড করে অপমানটা করলি—সত্যিই দেখার মতো ছিল।”
আবির নির্লিপ্ত গলায় বলল, “সো হোয়াট? এসব আবির কখনো পাত্তা দেয় না।”
“আমি জানি তুই দিবি না,” রায়হান হাসল, “আবির আসলে ‘ওয়ান পিস’। আর এই ওয়ান পিস একজনের জন্যই নির্ধারিত, তাই না?”
ততক্ষণে এনগেজমেন্টের মূল পর্ব শুরু হয়েছে। হরেক রকমের আলো জ্বলছে চারদিকে। নীল, লাল, সোনালি আলোর কারসাজি।
লাউডস্পিকারে মৃদু ভলিউমে একটি রোমান্টিক গান বাজছে। অয়ন মির্জা আর তার বাগদত্তা মঞ্চে দাঁড়িয়ে। আংটি বদল হলো। চারদিকে তালি আর হর্ষধ্বনি। আবির দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। তার মুখ গম্ভীর। হাসি নেই।
পার্টি এখন মধ্যগগনে। এই এক সমস্যা, বড়লোকদের পার্টি কখনও ঠিক সময়ে শুরু হয় না, আবার যখন জমে ওঠে তখন আর থামতে চায় না। ড্রয়িং রুমের এক কোণে একটা প্রকাণ্ড থামের আড়ালে আবির দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা কাঁচের গ্লাস। আবির দেখল মিরা ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে। আবির ভুরু কুঁচকাল। মিরা এসে ঠিক আবিরের সামনে দাঁড়াল। ওর গা থেকে দামী ফরাসি পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ আসছে। গন্ধটা সুন্দর, তবে দমবন্ধ করা। আবির বিরক্ত হয়ে জানালার বাইরের দিকে তাকাল। মিরা মুচকি হেসে বলল, “সবাই তো আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য লাইন দেয়। আপনি উল্টো পিছিয়ে গেলেন? রিজেকশনটা কিন্তু বেশ ইউনিক ছিল।”
আবির গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “পিছিয়ে যাওয়া মানেই রিজেকশন নয় মিস মিরা। ওটা ছিল ডিসট্যান্স। সবার ব্যক্তিগত একটা সীমানা থাকে, আবির শুধু সেটা রক্ষা করেছে।”
মিরা একটু ঝুঁকে এল। ওর চোখের মণি চিকচিক করছে। হয়তো রাগে। সে বলল, “কানাডায় থাকতে অনেক ছেলে দেখেছি, কিন্তু আপনার মতো এমন ‘রুড অ্যাটিটিউড’ আর কারো মধ্যে দেখিনি। আপনি কি সব মেয়েদের সাথেই এমন করেন? নাকি আমি স্পেশাল?”
আবির হাসল। মিরার হৃদয় স্পন্দন বেড়ে গেল। আবির বলল, “স্পেশাল হওয়ার জন্য আলাদা কিছু করতে হয় মিস মিরা। শুধু দামী পোশাক, উগ্র পারফিউম আর হুট করে হাগ করতে এগিয়ে আসাতে স্পেশাল হওয়া যায় না। ওটা সস্তা সিনেমাটিক দৃশ্য হতে পারে। আপনি সম্ভবত ভুল মানুষকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছেন। আবির মানুষ ইমপ্রেস করার ফ্যাক্টরি অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।”
মিরার চেহারায় মুহূর্তের জন্য মেঘ খেলে গেল। ঠিক যেন শ্রাবণ মাসের আকাশ। কিন্তু পরক্ষণেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ড্রয়িং রুমের কয়েকটা মাথা ঘুরে গেল ওদের দিকে। কিছু লোক ভাবল, হয়তো আবির খুব মজার কোনো জোকস বলেছে।
“ইন্টারেস্টিং! ভেরি ইন্টারেস্টিং,” মিরা তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা সোনালি কার্ড বের করল। কার্ডটা সরাসরি আবিরের হাতে গুঁজে দিল। “এই যে আমার পার্সোনাল নাম্বার। আবির সাহেব, আমি শিওর, আপনি নিজেই আমাকে একদিন কল করবেন। চ্যালেঞ্জ রইল।”
আবির কার্ডটার দিকে তাকালামও না। কার্ডটা হাতে নিয়ে ভাবলেশহীন গলায় বলল, “চ্যালেঞ্জ আবিরের খুব একটা প্রিয় নয়। তবে আপনার আত্মবিশ্বাসটা মন্দ না। ভালো থাকবেন।”
আবির আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। রায়হানকে ইশারায় ডাকল। রায়হান বেচারা কাবাব খেতে ব্যস্ত ছিল, বিরক্তি নিয়ে এগিয়ে এল। ওরা দরজার দিকে হাঁটা দিল। মিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সিনেমার স্লো-মোশন দৃশ্যের মতো আবির ভিড় ঠেলে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর মিরা পেছন থেকে তাকিয়ে দেখছে। পেছন থেকে রায়হান ফিসফিস করে বলল,
“মামা, খেলা তো জমে গেল! মেয়েটা তো তোর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে মনে হয়। তুই তো দেখি বিনা যুদ্ধে কেল্লা ফতে করে দিলি!”
আবির কোনো কথা বলল না। ড্রয়িং রুমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আভিজাত্য ছেড়ে বাইরে আসতেই ঝিরঝিরে বৃষ্টির ছোঁয়া পেল। আহ! শান্তি। আবহাওয়াটা একদম খাপ খেয়ে গেছে। আবির আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। এই বৃষ্টির শব্দের কাছে ইনডোর মিউজিক বড়ই বেসুরো আর খেলো মনে হয়।
রায়হান বলল, “কিরে, কথা বলছিস না কেন? কার্ডটা দেখবি না?”
আবির ভাই পর্ব ৮
আবির প্রতুত্তর করল না। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরল। মেঘ থেকেই তো বৃষ্টি হয় তাই না? হাতের তালুতে থাকা মিরার দামী ভিজিটিং কার্ডটা বৃষ্টির পানিতে ভিজতে শুরু করেছে। কালির লেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবির সেটা ফেল দিল।
