Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৪০

আমার আলাদিন পর্ব ৪০

আমার আলাদিন পর্ব ৪০
জাবিন ফোরকান

“মিসির, তুমি? হঠাৎ এখানে কেন এলে?”
সারিকা ভীষণ অবাক হয়েছে। স্বামীর সাথে তার শেষ কথা হয়েছিল আজ সকালেই। কিন্তু বরিশালে আসার ব্যাপারে কিছুই জানায়নি। আর জন্মদিন? নিজেই সেটা বেমালুম ভুলে বসেছে সারিকা। মিসির কয়েক পা এগিয়ে এলো। তার চেহারা নমনীয়, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
“কেন? ভুল কিছু করে ফেলেছি?”
একটি ঢোক গিলল সারিকা। মাথা দোলালো। টেবিল থেকে ফুলের বুকেটা তুলে নিয়ে আরেক দফায় ঘ্রাণ নিয়ে জোরপূর্বক একটু হাসল।
“না। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্ত তুমি অনেক ব্যস্ত আমি জানি। এতকিছু না করলেও চলত।”
মিসির এগিয়ে এসে সারিকার পাশে দাঁড়াল।

“ব্যস্ততা তো নিত্যসঙ্গী। তাতে পরিবারের জন্য সময় বের না করতে পারাটা ব্যর্থতা।”
“থ্যাংকস। তুমি নিশ্চয়ই ক্লান্ত। আসো, কাপড় পাল্টে বিশ্রাম নেবে কিছুক্ষণ। আমি খাবার দিচ্ছি।”
সারিকা ফুলের বুকেটা নিয়েই রুমের দিকে হাঁটা দিল, ভেবে নিল মিসির তাকে বরাবরের মতন নিঃশব্দে অনুসরণ করবে। কিন্ত মিসির গেলনা। স্বাভাবিক নয়নে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা কত ভাবলেশহীন। পছন্দের মানুষের উপহারে মেয়েরা খুশি হয়, অনেক উত্তেজিতও থাকে। অন্তত সারিকা সেই ধরণেরই মেয়ে সে জানে। অথচ মিসিরের এমন হঠাৎ করে সারপ্রাইজ দিতে উদয় হওয়ার ব্যাপারটা সারিকাকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পেরেছে বলে মনে হয়না। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে মলিন হাসল সে। ঠিক এমন সময়েই উপর তলা থেকে তীক্ষ্ণ কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। উভয়ে জমে গিয়ে মাথা তুলে তাকাল। কিছুক্ষণ বাদেই সিঁড়ির মাথায় উদয় হলো সুগন্ধা। চেহারায় মৃদু আতঙ্ক,
“বাবু তো কানতেসে!”
সুগন্ধার বলতে দেরি, কিন্তু সারিকার ছুটে যেতে দেরি হলোনা। মিসিরও দাঁড়িয়ে থাকল না, পিছু পিছু গেল। উপরের রুমে বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে কাদঁছে ইযান। এক হাত দিয়ে নিজের মাথার চুল নিজেই টেনে ধরেছে, সেই ব্যথায় নিজেই কেঁদে অস্থির। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল সারিকা। ফুলের বুকেটা একপাশের শো কেসের উপর রেখে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল। ইযানকে কোলে নিয়ে যত্ন করে আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিতে নিতে হালকা তালে বকে গেল,
“এই ব্রেইন নিয়ে এসেছে আমাদের বংশের চেরাগ হতে। একেই বলে খাল কেটে কুমির না আসলে কুমিরের লেজ ধরে জোর করে টেনে আনা।”

“আ…বা!”
ইযান নিজের তৈরি করা বিপদ থেকে নিজেই ছাড়া পেয়ে শান্ত হয়ে গেল। নীরবে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ফুফির কাঁধে মুখ গুঁজল। সারিকা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হাঁটতে লাগল, আর বলে গেল,
“না না, এইযে ফুপ্পিমণি এইখানে। ইযান ইয আ স্ট্রং বয়। কে সাহসী? ইযান সোনা সাহসী। কে ভালো বেবি? আম্মুর কুচুপু সোনা ভালো বেবি।”
মিসির অদূর থেকে স্ত্রীর কান্ড দেখে গেল। তার কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেল। চোখের দৃষ্টিতে আরাম ভর করল। কেন যেন কিছুটা বেশি মনোযোগ দিয়েই সে দৃশ্যটি দেখে গেল। সারিকা এবং তার বুকে লেপ্টে থাকা ছোট্ট ইযান তাকে ভিন্ন একটি কাল্পনিক দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিল। যদি তাদের দুজনের মাঝে সবটা অন্যরকমভাবে হতো, তবে কি তাদেরও এমন একটা সন্তান থাকত? সারিকাকে নিজের সন্তানের মা রূপে দেখা কি এতটাই অসম্ভব? প্রত্যেকটা পুরুষই বোধ হয় জীবনে এমন একটি পর্যায়ের ভেতর দিয়ে যায়, যখন তার সন্তান নিয়ে অগাধ মায়া এবং সুপ্ত বাসনা সৃষ্টি হয়, যেমনটা এখন মিসিরের হচ্ছে।
আড়চোখে মিসির তাকাল সুগন্ধার দিকে। ইযানের কান্না থেমে যাওয়ায় স্বস্তি পেয়েছে মেয়েটি। মিসির গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“আমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে দিবি সুগন্ধি?”
সুগন্ধা ঘুরে তাকাল। যবে থেকে বিয়ে হয়েছে, তবে থেকে মিসির তার সাথে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। সুগন্ধি বলে ডাকে। তাতে কেমন যেন ভাইসুলভ আদর মেশানো। এই লোকটাকে খুব পছন্দ তার। মুখটা দেখলেই কেমন যেন সম্মান আসে। সুগন্ধা মুচকি হেসে বলল,
“এখনি যাইতেসি, ভাইয়া।”
দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে। মিসির সংক্ষিপ্ত একটি নিঃশ্বাস ফেলে ঘুরে তাকাল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল স্ত্রীর কাছে। সারিকা তখন জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার কাঁধে মাথা রেখে নির্ঘুম ইযান ড্যাবড্যাব করে শূন্যের উদ্দেশ্যে চেয়ে আছে। মিসির সন্নিকটে দাঁড়াল। একটি হাত তুলে আলতোভাবে ছুঁয়ে দিল ইযানের গাল।
“গাই…গু!”
ছোট্ট শিশুটি তার হাতের লম্বা তর্জনী আঙুলটা আঁকড়ে ধরল তৎক্ষণাৎ। যেন অতি আকর্ষণীয় খেলনা সেটি। একগাল হাসল মিসির, ঝুঁকে ইযানের কপালে আলতো চুমু খেল। নিজের আঙুলটা উৎসর্গ করল তার খেলায়। সারিকা গোটা ঘটনা নিঃশব্দে চেয়ে দেখল। মিসিরকে আজ কেমন যেন একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে বলে মনে হলো তার।

“তোমাকে আজকে ভাবুক দেখাচ্ছে।”
মন্তব্য না করে পারলনা সে। মিসির ইযানের দিকে চেয়েই জবাব দিল,
“হুম, ভাবলে ভাবুক দেখাতেই পারে।”
“কি ভাবছ?”
“তোমাকে মায়ের রূপে কেমন লাগতে পারে, সেটা।”
সারিকা স্তব্ধ হয়ে গেল। নিরেট আঁখি মেলে চেয়ে থাকল স্বামীর মুখের দিকে। মিসির মুখ তুলে তার চোখে নিজের দৃষ্টি মিলিয়ে দ্বিতীয় দফায় বলল,
“আমার কেন যেন মনে হয়, আমি যতটা নড়বড়ে বাবা হব, তুমি ঠিক ততটাই ভালো মা হবে, সারিকা।”
ওই মুহূর্তে সারিকার মুখ থেকে আর একটাও শব্দ উচ্চারিত হলোনা। পারলনা সে। বুকের ভেতর ক্রমশ একটা ভারী চাপ জেঁকে বসল তার।

পার্টি এখন তুঙ্গে। সত্যিকারের ডি জে পার্টি ঠিক কেমন হয় তা একবার দুবার টিভিতে দেখলেও নিজের চোখে কখনো দেখা হয়নি ইরামের। আজ দেখে নিল। হলের ভেতর যেন একটি কনসার্ট চলছে। প্রচলিত জনপ্রিয় গানগুলোকে এডিট করে এমনভাবে বিট এবং মিউজিক কম্পোজ করা হয়েছে যে কানে গেলে আপনা আপনি মানুষের নাচ উঠে যায়। এই কম্পোজিংয়ের কাজটা সূক্ষ্ম, সকলে পারেনা, তাই সবাই ডি জে হয়না। যদিও এই দেশে ডি জে মানেই একটা ভ্রান্ত ধারণা, কারণ এই দিকটা এখনো নতুন। সাইবানের কল্যাণে এই প্রফেশন নিয়ে অবসরে অনলাইনে বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করা হয়েছে ইরামের। এদেশে ডি জে মানে মানুষ সহজ কিছু ভাবে। অ্যাপ দিয়ে তালের বিট বসিয়ে বিয়ে বাড়ির মিউজিক বক্সে ছেড়ে দিলেই হয়। অথচ জিনিসটা মোটেও তেমন না। ডি জে আর পাঁচজন শিল্পীদের মতোই একজন আর্টিস্ট। ইচ্ছামত বিট বসালেই হয়না বরং তার ভেতরেও নিজস্ব সৃজনশীলতা থাকতে হয়। সব মিউজিক মানুষের মনে দোলা দেয়না, সে যতই বিট হোক না কেন। এর নির্দিষ্ট সমীকরণ ডি জেই বোঝে, জানে, চর্চা করে। সামনের বিশাল কন্ট্রোল প্যানেলের হাজার হাজার বোতাম সারাটা সময় জুড়ে এমনি এমনি স্টাইলের জন্য নড়াচড়া করে না সে। গণিতের মতো এখানেও সূত্র আছে, কোন বোতাম কতটুকু সরালে মিউজিক কতটুকু চড়া হবে, কতটুকু কমে আসবে। এই হিসাবটা যে আয়ত্ত্ব করতে পারে, সেই সফল। সফলতার ঊর্ধ্বে কিছু থেকে থাকলে এক্ষেত্রে সাইবান সেটাই।

লাল নীল বাতির ঝলমলে চোখ মাঝে মাঝেই ধাঁধিয়ে যাচ্ছে ইরামের। তবুও সে দেখছে চারপাশের উন্মাদনা। সাইবান অন্য কোনো মিউজিক বাজাচ্ছে না। বরং, নিজের কম্পোজ করা একটা ট্র্যাক চালিয়েছে। তাতেই সবাই বাঁধনহারা পাখির মতন নেচে চলেছে। তালে তালে ইংরেজি আর উদ্ভট ফ্রেঞ্চের মতন মিশ্রিত কোনো একটা ভাষায় কি যেন লাইন বলে যাচ্ছে। ইরামের যে ভালো লাগছে তা না, কিন্তু খুব একটা খারাপও লাগছেনা। তবে এই ধরণের অতিরিক্ত লম্ফঝম্ফটা তার ঠিক পছন্দ নয়। স্টেজের উপরে সাইবান। লালচে আলোয় কেমন যেন আবেদনময়ী দেখাচ্ছে তাকে। বিশেষ করে জ্যাকেটটা খুলে ফেলায় এখন শুধু পোলো শার্ট পরনে, তাতে শক্তিশালী বাহুজোড়া একেবারেই উন্মুক্ত। টানা ঘণ্টা দুয়েক লাফালাফি করার এবং অন্যান্যদের আনন্দ দিতে ঘুরে ঘুরে নেচে চলার কারণে তার শরীরে ঘাম জমেছে, শার্টের বুকের দিকটা একেবারে লেপ্টে গিয়েছে। কপালে চুলগুলো আধভেজা হয়ে লুটিয়ে আছে। লালচে আলোয় দৃশ্যটা ইরামের নিজের কাছেই কেমন মোহনীয় লাগছে, অন্যান্যদের কথা তো বাদ!
স্টেজের উপরে এবং চারপাশে মেয়েরা ঘুরে ঘুরে নাচছে। বিশেষ করে অনেকেই সাইবানের একেবারে গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে। ডি জে হিসাবে কারো আনন্দে বাঁধা দেয়ার সুযোগটা নেই এখানে। ইরাম যে সমস্ত ভিডিও রিসার্চ করার সময় দেখেছে, তাতে এর চেয়েও বাজে অবস্থা দেখেছে। অ্যালকোহল, ছেলেমেয়েদের বেহায়াপনা। কিন্তু এই পার্টিটাতে সেসব নেই। এখানে শুধু উন্মাদ নৃত্য করার জায়গাই আছে, প্রয়োজনে ড্রিংকস চাইলে কোল্ড ড্রিংকসই পাওয়া যাবে। তবুও সাইবানের সঙ্গে সব মেয়েদের এমন ঢলে ঢলে পড়াটা ইরামের ভালো লাগছে না। হ্যাঁ, ডি জে, হ্যান্ডসাম, সুন্দর ছেলে ঠিক আছে। তাই বলে এরকম করতে হবে? এত অ্যাটেনশন দেয়ার কি আছে ডি জে কে? নিজের মতো নাচলেই হয়। অনেক মেয়েরা তাই করছে, নিজেদের মতন গ্রুপ করে করে নাচছে। বাকিরা অমন কেন হতে পারছেনা। এই কারণে ইরাম কিছুই উপভোগ করতে পারছেনা। উপরন্তু লাউড মিউজিকের কারণে তার মাথাটা ভনভন করছে।

তার এবং সাইবানের নাচের পর আশেপাশের সকলের মুখই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কেউ আর একটা কথাও বলেনি। অনেকে বরং এসে ইরামের প্রশংসা করে গিয়েছে। কোথায় নাচ শিখেছে, কি কি জানে, ইত্যাদি। গুঞ্জনের শুরুটা ঠিক তার এবং সাইবানের অসম সম্পর্কের কারণে নয়, বরং হয়েছিল অন্য কারো কূটকীর্তির প্রভাবে সেটা ইরাম জানে। সেই কূটকীর্তিকারী এখন এমন উন্মত্ত প্রাঙ্গণের ভেতরেও এক কোণায় থম মেরে বসে আছে। অদূরে তিতলির বিরক্তিপূর্ণ মুখটা দেখে না চাইতেও খানিক চাপা আনন্দ পেল ইরাম। সেই যে নিজের বান্ধবী রিসাকে বলে এসব ঘটিয়েছে সেটা বোঝাই যায়। নাহলে মানুষ সমালোচনা করলেও এমন মুখের উপর বলে খুব কম, সমালোচনা হয় আড়ালে।

“কি ভাবছ?”
প্রশ্নটা ইরামকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। পাশে দাঁড়ানো কায়সানকে দেখল সে। বন্ধুর জোরাজুরিতে একটু আগেই ছেলেটা নাচতে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এইমাত্র এসে দাঁড়াল ইরামের পাশে। হালকা ঘেমে গিয়েছে। কপালে চিকচিক করছে তা। ঠোঁটে জিভ বোলানোর কারণে আলো আঁধারিতে জ্বলজ্বলে দেখাচ্ছে। শার্টটা গায়ে আঁটসাঁট হয়ে পড়েছে। ইরাম চোখ ফিরিয়ে নিজের হাতের এক পিস কাবাবের দিকে তাকাল। বিশেষ নাচানাচির কাজ নেই তার, তাই খাবারেই মনোযোগ দেবে ভেবেছিল।
“তেমন কিছু না।”
বলে সে কাবাবটা মুখে পুরে দিল। চিবানোর সময় কাঠবেড়ালির মতন গাল ফুলে উঠল তার। দৃশ্যটা কায়সান মোলায়েম হাসি নিয়ে দেখল। একটি আঙুল তুলে না পারতে ছোট্ট একটা গুতো দিল ইরামের গালে। রমণী অবাক হয়ে তৎক্ষণাৎ দুই পা সরে গেল। তব্দা খেয়ে চেয়ে রইল। কায়সান এবার শব্দ করে হাসল,
“কাঠবেড়ালির মতন গাল ফুলিয়ে খাও তুমি।”
ইরাম খাবারটুকু গিলে ফেলল।

“খাওয়ার কাজ খাই, এত ফোলাফুলি দেখে কাজ কি?”
কায়সানের হাসিটা বিস্তৃত হলো। তবে সে দূরত্ব মেটালনা। সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকল। বুকে দুবাহু বেঁধে একবার মাথা কাত করে স্টেজের দিকে তাকাল।
“তুমি যদি নাচটাকে চেজ করতে পারতে তাহলে আজ প্রোফেশনাল ড্যান্সার হতে পারতে।”
ইরাম কোনো মন্তব্য করলনা। আরেকপিস শিক কাবাব তুলে নিল। এই কাবাবটা তার ভালোই লাগছে।
“তোমার হাসবেন্ড তোমাকে খুব ভালোবাসে, তাইনা?”
এই প্রশ্নটা একদম অপ্রত্যাশিত। বিশেষ করে কায়সানের কাছ থেকে। তাই তো ইরাম থমকে গেল। অর্ধেক কাবাব মুখে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। অবাক নয়নে দেখল ট্রেনারকে। কায়সান উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে। এর আগে এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন কখনোই করেনি এই পুরুষটি। আজ করার কারণ কি? নাচের জন্য? নাকি সাইবানের বক্তব্য তার উপর প্রভাব ফেলেছে। ইরাম কোনো জবাব দিচ্ছেনা দেখে কায়সান মৃদু হেসে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“টু বি অনেস্ট, ইরাম, আমার আজকাল মনে হয় তুমি ভালো আছো। আর যদি তুমি ভালো থাকো, তাহলে এভরিথিং এলস ডায নট ম্যাটার। সেটা হোক সম্পর্কের অসমতা বা অন্যকিছু।”
“ভালো আছি?”

বিড়বিড় করল ইরাম। প্রশ্নটা কায়সানের থেকে নিজেকেই বেশি করল সে। তাকে দেখে সত্যিই মনে হয় সে ভালো আছে? এই পরিবর্তনটা কবে হলো? ইরাম নিজেই কি বিশেষ খেয়াল করেনি? আজকাল একটু বেশি হাসা হয়, বেশি প্রত্যাশা রাখা হয়! বুকের ভেতর কেমন যেন আনচান করে উঠল তার। অজান্তেই চোখ ঘুরিয়ে তাকাল স্টেজের দিকে। যেখানে সাইবান কানে হেডফোন গুঁজে কন্ট্রোল প্যানেলের উপর ঝুঁকে আছে। মিউজিকের তালে তালে দুলে উঠছে সে।
“ডি জে…”
“আলাদিন!”
“ডি জে!”
“আলাদিন!”
চারপাশ উল্লাসধ্বনিতে ফেটে পড়ছে। মিউজিক পরিবর্তন হয়ে বহুল জনপ্রিয় একটা গানের সুর বেজে উঠল। তাতে সকলে চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করল। স্টেজের উপর উঠে গেল অনেকেই। সাইবানকে ঘিরে তাদের আগ্রহের শেষ নেই। হেলেদুলে নাচছে সকলে, অনেকে আবার অনুরোধ করে সেলফিও তুলে নিচ্ছে। সবকিছু ইরামের ভেতর কেমন যেন জটলা পাকিয়ে গেল। কায়সানকে কোনো উত্তর করা হলোনা তার। অর্ধেক কাবাব প্লেটেই রেখে দিয়ে ইরাম উল্টো ঘুরে গেল। ভিড় পেরিয়ে সকলের মাঝ থেকে একপ্রকার দৌঁড়েই সে বেরিয়ে গেল হল থেকে।

হলের পিছনে ছোট একটা লেক আছে। একপাশের তীরে শান বাঁধানো পথ। সেই পথের উপর বেশ কয়েকটি স্ট্রিটলাইট। অত্যন্ত মনোরম দৃশ্য। ইরাম একটি স্ট্রিট লাইটের গায়ে হেলান দিয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক কতক্ষণ যাবৎ এখানে দাঁড়িয়ে আছে সে, হিসাব নেই। তবে ভালো লাগছে তার। লেকের উপর থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাস যেন প্রাণটা জুড়িয়ে দিচ্ছে। ভেতরের উচ্চশব্দ এবং কলরলের আড়ালে এক টুকরো শান্তির জায়গা। বাতাসের সাথে সাথে ইরামের শাড়ির আঁচল এবং খোলা চুল দুলছে। সারিকাকে ফোন করেছে সে, রমণী জানিয়েছে ইযান ঠিকঠাক আছে, নিজে নিজে খেলছে। তাই বিশেষ চিন্তা তার হচ্ছেনা। তার মাথায় শুধু কায়সানের কথাগুলো ঘুরছে। সে যেমন করে বলল, বাইরের সব মানুষের কাছেই কি তেমনটাই মনে হয়? প্রশ্নটা কেন ইরামকে এতখানি ভাবাচ্ছে সে নিজেও বলতে পারবেনা।
হুট করে পদশব্দ ভেসে এলো ইরামের কানে। পুরোপুরি না ঘুরে সে শুধু মাথা হেলিয়ে পিছনে তাকাল। অপ্রত্যাশিত দৃশ্যটি তাকে বিস্মিত করল। লম্বা পা ফেলে হেঁটে আসছে সাইবান। গায়ের পোলো শার্টটাও খুলে ফেলেছে। এখন শুধু কালো একটা ট্যাংক টপ আর গাবার্ডিন পরনে। মাথায় ক্যাপ। শো ফেলে চলে এসেছে নাকি?
“তুমি এখা…আহ!”

ইরাম জিজ্ঞেসই করতে যাচ্ছিল কিন্তু পুরোটা উচ্চারণ করার সময়ই পেলনা। সাইবানের শক্তিশালী হাত তার থুতনি চেপে ধরে মুখটা কাছে টেনে নিল। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই সে ঠোঁট বসিয়ে দিল ইরামের গালে। হতচকিত হয়ে গেল রমণী, স্বামীর বাহু চেপে ধরল। কিন্ত ছাড়ানো গেলনা নিজেকে। অপর হাতটি দিয়ে ইরামের দুই হাত একত্র করে চেপে রেখে সাইবান তার গালে একের পর এক চুমু খেতে লাগল। শুধুমাত্র আলতো কিছু ছোঁয়া নয়, বরং ডান গালের একই জায়গায়, বারবার বারবার, গভীরভাবে চুম্বন করে গেল সে। যেন কিছু একটা ঘষেমেজে মুছে ফেলতে চাইছে। এতটাই জোর এই অস্বাভাবিক আদরে যে ইরাম হাসফাঁস করে উঠল। সাইবানের কাঁধ খামচে ধরল।
“কি…করছ…ছাড়ো!”

কিন্তু সাইবান ছাড়লনা। এবার তার গালে আলতো কামড় বসিয়ে অসম্ভব গভীর এক গলায় বলল,
“পরেরবার আমি ছাড়া কেউ এই গাল ছুঁয়ে দিলে বিষয়টা শুধু চুমুতে শেষ হবেনা।”
ইরামের চোখজোড়া প্রসারিত হলো। কায়সান কিছুক্ষণ আগে আঙুল দিয়ে তার ফোলা গাল ছুঁয়ে দিয়েছিল, এইজন্যই কি এত আক্রোশ? ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে টের পেয়ে সাইবান শেষ একটি শুষ্ক চুমু দিয়ে সরে দাঁড়াল। ইরাম তৎক্ষণাৎ গাল চেপে ধরল নিজের, কেমন গরম হয়ে গিয়েছে জায়গাটা, নিশ্চয়ই লাল হয়ে উঠেছে। কিন্তু লজ্জার কারণে তার দেখতে ইচ্ছা হলনা। কিছুটা অভিমানও হলো। তাই সটান উল্টো ঘুরে গেল ইরাম। ঠোঁট ফুলিয়ে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে রইল। কায়সানকে কি সে যেচে যেচে নিজেকে ছুঁতে বলেছে? সাইবান যে হাজারটা মেয়ের সাথে নাচল তার বেলা? ওহ, সে তো আবার ডি জে। জনপ্রিয় মানুষ। মেয়েরা পাত্তা দেবে অত্যন্ত স্বাভাবিক। ইরামই ব্যাকডেটেড। ছোটখাট বিষয় নিয়ে বুম হয়ে বসে থাকে। যত্তসব!
একটা কথাও ইরাম মুখে উচ্চারণ করেনি। অথচ সাইবান তার চেহারা দেখেই গড়গড় করে সব পড়ে ফেলল যেন। একটি নিঃশ্বাস ফেলল সে। হাতের উল্টোপিঠে ঠোঁট মুছে নিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আগের উগ্র ভাবটা এখন আর নেই তার মাঝে।

“জেলাস?”
সাইবানের নরম গলা শুনতেই ইরামের ক্রোধের মাত্রাটা বেড়ে গেল। ঝাঁঝ নিয়ে বলল,
“হিংসা? আমি? কেন মনে হলো তোমার? আমার আবার সেই অধিকার আছে নাকি? তোমারই সব অধিকার। পরপুরুষ ছুঁয়ে দিলে মাথায় আগুন জ্বলে যায়, নিজের ঠিকই ধেই ধেই করে নেচে বেড়ানো হয়। না, তখন সেটা হয়ে যায় শুধু প্রফেশন। যত্তসব!”
ইরামের ঝাঁঝটা বেশ উপভোগ করল সাইবান। আগে তো কিছুই প্রকাশ করতনা। এখন অভিমান হলেও করে! অর্ধাঙ্গিনীর কাছে সরে দাঁড়াল সে। কাঁধে কাঁধ ছুঁয়ে যেতেই ইরাম সরে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু গোত্তা খেল স্ট্রিট লাইটের খাম্বায়। সরার মতন জায়গা নেই।
“ডু ইউ হেইট মাই প্রফেশন?”
কথাটা ইরামকে অবাক করল। সরু দৃষ্টিতে তাকাল সে সাইবানের দিকে। ছেলেটাকে এখন একদম শান্ত দেখাচ্ছে। গভীর চোখে তাকিয়ে আছে সে অর্ধাঙ্গিনীর দিকে।
“টেল মি মাই প্রেশিয়াস, ডু ইউ হেইট ইট?”
ইরাম একটি ঢোক গিলল। বিষয়টা আর রাগ অভিমানে সীমাবদ্ধ নেই। খুনসুঁটিও নয়। বরং, সৎ অনুভূতি।
“হেইট অনেক শক্তিশালী একটা শব্দ। আমি ঘৃণা করিনা। শুধু মেনে নিতে বেগ পোহাতে হচ্ছে একটু, এটাই।”
সাইবান এবার সরাসরি ইরামের সামনে এসে দাঁড়াল। স্ত্রীর মুখটা নিজের বিশাল দুই হাতের আজলায় তুলে চোখে চোখ রাখল।

“এটাই আমি। এটাই আমার জীবন, আমার চরিত্র।”
ইরাম ক্ষণিকের জন্য চোখ সরিয়ে নিতেই তার কানে দ্বিতীয় দফায় ভেসে এলো,
“তবে তার অর্থ এই নয় যে আমি জবাবদিহি করতে বাধ্য নই।”
ঝট করে ফিরে তাকাল ইরাম। সাইবানের চোখজোড়া গুরুতর মাত্রায় গভীর। রং কালো, কিন্তু ওই কালোর মাঝেও কেমন একটা ঐন্দ্রজালিক ভাব।
“আপনার সমস্যা হলে আমি পরেরবার থেকে স্টেজের উপর কাউকে অ্যালাউ করবনা।”
ঝুঁকে এলো সাইবান, অর্ধাঙ্গিনীর কপালে নিজের কপাল ঠেকাল,
“মেয়েরা আমাকে পছন্দ করে। কিন্তু সেটা অন্যরকম পছন্দ করা। তারা আমার বাহ্যিক খোলস দেখে, আমার সৌন্দর্য দেখে, আমার মিউজিক দেখে আমাকে ভালোবাসে। আমি কাউকে ঠেকাতে পারিনা। কেন জানেন? কারণ তারা আমার ফ্যান। তারা আমার সাথে ছবি তুলবে, দুটো গল্প করবে এটা তাদের স্বপ্ন। তাছাড়া এটা আমার অ্যাডভার্টাইজমেন্ট বা প্রচার। আমার শো এর ছবি, সেলফি বিভিন্ন জায়গায় আপলোড হলে নতুন নতুন মানুষ আমায় চিনবে, জানবে। এটুকুই আমার লাভ। আই সোয়্যার, এর বাইরে কাউকে নিয়ে ভিন্ন কোনো চিন্তা আমার মাথায় কোনোদিন ছিল না, থাকে না, থাকবেও না। আপনি যতবার শুনতে চাইবেন, আমি ততবার চিৎকার করে করে বলব, আমি শুধু আপনাকেই চিনি, আপনাকেই জানি এবং আপনাকেই মানি।”
সাইবানের কন্ঠস্বর অনন্য হয়ে উঠল বুঝি, কেমন আকাশের মতন উদার এবং বিশাল শোনাল তার আওয়াজটা, ভাবগম্ভীর এবং প্রাণোদ্দীপক,

“আমাকে রমণীর সমুদ্রে ফেলে দেয়া হলেও চোখ বুঁজে আমি শুধু আপনাকেই কল্পনা করে যাব, কারণ আপনি আমার আস্ত একটা শখের নারী।”
ইরাম কেমন অনুভব করল তা নিজেও বলতে পারবেনা। বুকের মাঝে তীব্র ঢেউ উঠল, আবেগের ঢেউ। না চাইতেও দ্বিতীয় একটি পুরুষের কথা তার মাথায় এলো। অরণ্য কি কোনোদিন তাকে এভাবে বলেছিল? কোনোদিন এত আকুল হয়ে মনের কথা জানিয়েছিল, অন্তত ইরামের শান্তির জন্য হলেও? তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাড়ল রমণী, নাহ্, ভাবা যাবেনা। ওই জঘণ্য পুরুষটার কথা সে এই মায়াবী পুরুষটির সামনে ভাববে না আর, তুলনা করবেনা কোনকিছুতেই। কারণ এই তুলনা চলে না আর।
চোখ মেলে সে সাইবানের দৃষ্টিমাঝে তাকাল। বিস্ময় এবং মুগ্ধতার মিশ্রণ নিয়ে শোনালো,
“শখের নারী হলাম কবে? এতদিন কোথায় ছিলে তুমি এবং তোমার এত সাধের শখ?”
সাইবান হাত তুলে ইরামের উড়তে থাকা চুলগুলো গুছিয়ে আনল। কানের পিছনে সযত্নে গুঁজে দিয়ে সেই কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়ে জানাল,

“আমি আপনার বইয়ের ভূমিকায়ই ছিলাম। শুধু আপনি কখনো পৃষ্ঠা উল্টে দেখেননি।”
স্তব্ধ হয়ে রইল ইরাম। নিষ্পলক চেয়ে রইল স্বামীর মুখপানে।
“তোমার কথাগুলো আজ গুরুতর শোনাচ্ছে।”
“গুরুতর কথা বলছি, তাই। মজা করছি না। আর কত গুরুতর ভাবে বললে আপনি বুঝবেন?”
ইরামের কোমরে দুই বাহু পেঁচিয়ে তাকে কাছে টেনে নিল সাইবান। একদম শান্ত চেহারায় বিনা দ্বিধায় জানাল,
“জন্মের সময় সাতটা থাপ্পড় খাওয়ার পর কেঁদেছি, সাতটা স্কুলে লটারি হওয়ার পর সপ্তম স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছি, ক্লাস সেভেনে প্রথমবারের মতন পুরো ক্লাসে রোল ১ হয়েছি, বারবার রিজেক্ট হওয়ার পর সপ্তমবারে প্রথম শো এর অফার পেয়েছি, সেই শো এর পারিশ্রমিক ছিল সাত হাজার টাকা। সাত সবসময় আমার জন্য লাকি নাম্বার। ঠিক তেমনভাবে, আপনিও।”
ইরাম কোনোকিছু বলতে পারলনা। সাইবান ঝুঁকে এসে তার কপালে কপাল ঠেকাল,
“আপনি বলেছিলেন, যদি আমি না চাই, তাহলে আমার জীবন থেকে চলে যাবেন। আজ আমি বলছি, আপনাকে আমার চাই। যাবেন না, ইরাম।”
ছেলেটা কখনো তাকে শুধু নাম ধরে ডাকেনি। ছোটবেলায় আপু ডাকত, এখনো মাঝে মধ্যেই আপু ডাকে, আবার বেশি পিনিক উঠে গেলে মাই প্রেশিয়াস, হ্যান ত্যান, কতকিছু বলে! কিন্তু, নাম? ইরাম? এটা কি প্রথমবার নাকি সেটাও ইরামের মনে নেই। তবে ওই কন্ঠে নিজের নামটা বুকের মাঝে বুঝি ঘূর্ণিপাক খেলিয়ে দিল। সাইবান গভীর গলায় বলল,

“আমি আর কোনো ডিল চাইনা। আমার শুধু আপনাকে আর পোটলাকে চাই। একান্ত নিজের করে।”
ইরামের গলায় বুঝি শব্দরা সব আটকে গেল। মনে হলো এইতো যেন সেদিনও বাড়ির হলরুমে দাঁড়িয়ে সে এই ছেলেটাকে বলেছিল, ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে গেলে সে সবকিছু ছেড়ে দেবে, মুক্তি দেবে সাইবানকে। কিন্তু আদৌ কি পারবে ইরাম? এই পর্যায়ে এসে?

আমার আলাদিন পর্ব ৩৯

“আর তোমার প্রফেশনাল হাসবেন্ড প্ল্যানের কি হবে?”
না চাইতেও মুখ ফস্কে বলে ফেলল ইরাম। তাতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সাইবান। তীর্যক হাসল। পরক্ষণেই স্ত্রীকে অত্যন্ত কাছে টেনে নিল, মিশিয়ে ফেলল নিজের শরীরের সঙ্গে। স্ট্রিট লাইটের মৃদু হলদেটে আলো যেন গলিত স্বর্ণের মতন তাদের রাঙিয়ে তুলল।
“হব আপনার প্রফেশনাল হাসবেন্ড, বিনিময়ে নাহয় প্রতিদিন তিনবেলা তিনটি করে চুমুর বেতন দেবেন?”

আমার আলাদিন পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here