আমার আলাদিন পর্ব ৫০
জাবিন ফোরকান
ইরাম একটা খয়েরী রঙের সুতির শাড়ি পড়েছে। পাড়ের কাছে কালো জরির ডিজাইন। যদিও বিয়ের মাস তিনেক ইতোমধ্যে পেরিয়ে গিয়েছে তবুও একটা নতুন বউ নতুন বউ ধরণের ভাব এসেছে তার মাঝে। নাক ফোঁড়ানো হয়েছিল অরণ্যর সময়েই। তবে নাকফুল সে প্রথমবার আঘাত পাওয়ার পরেই খুলে ফেলেছে। তবে আজ, কেন যেন ইচ্ছা হলো বেশ। ভাগ্যিস একটা সিটিগোল্ডের নাকফুল এনেছিল সঙ্গে করে। সেটাই নাকে দিয়েছে, ফুটো যে এখনো আছে এটা সৃষ্টিকর্তার রহমত। চুলগুলো তার খোলা। বাতাসে উড়ছে ঢেউয়ের মতো। এতটা স্বাধীনতা এবং আহ্লাদ শেষ কবে অনুভূত হয়েছিল ভুলে বসেছে সে। পূব আকাশে কমলা রঙের ছটা। দিনের সূচনার এক শুভ লগ্ন। তাই বুঝি মন থেকে আজ সকল বিষণ্নতা বিদায় নিয়েছে।
সড়কপথ নির্জন। শুধু কিছু সড়কবাতি জ্বলছে টিমটিম করে। ইরাম ফুটপাথ বেয়ে হাঁটছে মনের সুখে। পিছু পিছু আসছে তার স্বামী। কাকতালীয় ভাবে নাকি ইরামের সাথে মিলিয়ে জানা নেই, সাইবানের পরনেও খয়েরী রঙের একটা ঢোলা শার্ট আর কালো জিন্স। সকাল থেকে খাটাখাটনি, ঝড়ঝাপটা শেষে সারাটা রাত একফোঁটা ঘুম হয়নি দুজনের। অথচ কারো চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। উভয়ের মাঝে গাঢ় প্রশান্তি। হুট করে বাতাসের ঝাঁপটায় ইরামের শাড়ির আঁচল উড়ে গেল। পিছনে থাকা সাইবান সেটা এক হাতে পাকড়াও করে নিজের আঙুলে পেঁচিয়ে ফেলল। ওভাবেই ধরে রাখল, ছাড়লনা আর, হাঁটতে লাগল স্ত্রীর আঁচল ধরে। ইরাম মাথা ঘুরিয়ে পিছনে চেয়ে মুচকি হাসল।
“দেখো আবার। বাড়ি ফিরে যেন শুনতে না হয় বউ আঁচলে ছেলেটাকে বেঁধে ফেলেছে, তাবিজ করেছে।”
“কে বলবে? ব্রো? আপনি আমার ব্রো এর ফেভারিট চাইল্ড।”
“শ্বশুর আব্বু কি কোনো অংশে কম?”
ইরামের কথায় সাইবান তার আঁচলটা আরও শক্তভাবে পেঁচিয়ে নিয়ে কাছাকাছি এলো, দূরত্ব মেটাল।
“বলুক ড্যাড। আমিও বলব, আপনার নামের তাবিজও কবুল।”
ইরাম মুখে হাত চেপে সশব্দে হাসল। এই ছেলেটা আসলেই পাগল। পাগল না হলে এরকম করা যায়? সাইবান চকিতে আশেপাশে তাকাল। এই ভোররাতে অদৃশ্য অতৃপ্ত আত্মা বাদে কোনো মানুষ আছে বলে মনে হয়না। তাই সে অর্ধাঙ্গিনীর কোমরে হাত জড়িয়ে এক ঝটকায় নিজের পাশে টেনে নিল। শরীরের সাথে মিশল শরীর। শীতল বাতাস কাটিয়ে ছড়াল উষ্ণতা। ইরাম আজ কিছুটা লাজুক মুডে আছে। তাই তার উজ্জ্বল শ্যামল গাল দুটো হালকা রেঙে উঠল। সাইবান প্রাণভরে তার লজ্জা দেখল। হাঁটতে হাঁটতে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করল,
“লজ্জা পাবেন না।”
“তোমার কথায় পাবো না? আমার লজ্জা, আমার ইচ্ছা, যখন তখন পাব।”
“আপনার গাল, আমার ইচ্ছা, যখন তখন কামড়াব।”
বলেই একেবারে অতর্কিতে ইরামের নরম গালে ধারাল দাঁত বসিয়ে দিল সাইবান। সে কি এক ভয়ানক আক্রমণ! ইরাম চমকে গিয়ে তার কলার আঁকড়ে ধরে ব্যাথাতুর শব্দ করে উঠল। সাইবানের সুঁচালো দাঁত দুটোর একটা বুঝি গেঁথেই গিয়েছে ত্বকে।
“জংলী কোথাকার! ছাড়ো!”
সাইবান তো ছাড়লই না উল্টো ইরামের ধস্তাধস্তি করতে থাকা শরীর শক্তভাবে চেপে ধরল। প্রাণ ভরে স্ত্রীর গালের লালিমা হরণ করতে লাগল। এদিকে ইরামের আত্মা যায় যায় অবস্থা।
“আমার দাদার বাড়িতে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন লোক ছিল। রুমি পাগলা বলে ডাকত সবাই। মানুষ দেখলেই ধরে ধরে কামড়াত।”
ইরামের কথা শুনে এবার সাইবান হেসে ফেলল। তবে সরলনা। তবে কামড়ে ক্ষান্ত দিয়ে এবার নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে রাখল। তার ত্বকের বিপরীতে ফিসফিস করে শুধাল,
“তা আপনি কামড় খেয়েছেন কটা?”
“একটাও না। জংলী স্বামীর কামড় ছিল যে কপালে। উফ বাবাগো!”
এবার ইরাম ধাক্কা দিয়ে সাইবানকে দূরে সরিয়ে নিজের গাল ঘষতে লাগল। কেমন জ্বলছে। আয়নার অভাবে সে দেখতে পারলনা। তবে স্বামী ঠিকই দেখল নয়ন ভরে, তার গালে নিজের অধিকারের চিহ্নকে। দাঁতের হালকা ছাপ বসে গিয়েছে ইরামের গালে, লালচে হয়ে উঠেছে। সময় পেরোলে আরও গাঢ় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মনে মনে কুটিল হাসল সাইবান। বৃদ্ধাঙ্গুলে নিজের ঠোঁট ঘষে ভাব নিল। অর্ধাঙ্গিনীর উপর সিলমোহর মেরে সে বেজায় খুশি। ইরাম ততক্ষণে তার উপর চটেছে। পিছনে না তাকিয়েই হনহন করে হাঁটা দিল সে বাড়ির দিকে।
“আর ভোরভ্রমণ করতে হবে না। আমার ছেলেটা ওদিকে কেঁদে অস্থির হলো কিনা কে জানে! যেমন এক ছেলে, তেমন তার বাপ। কামড়া কামড়ি তাদের রক্তে রক্তে!”
স্ত্রীর গজগজ শুনতে শুনতে পিছু নিয়ে সাইবান বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করল,
“তা আমার পোটলা আবার আপনার কোথায় কামড়াল?”
ইরাম মাথা কাত করে চোখ পাকিয়ে তাকাল,
“অসভ্য!”
সাইবান এক লহমা বোকার মতন দাঁড়িয়ে রইল। যাক বাবা, সে আবার উল্টাপাল্টা কি শুধিয়ে বসল? ভালোমানুষীর আর দাম নেই। ইরাম ততক্ষণে অনেকটা দূর এগিয়ে গিয়েছে। সাইবান দ্রুত পা চালাল। স্ত্রীর নাকের ডগায় রাগটা তাকে ছন্নছাড়া করে তুলল। আরও বেশি জ্বালাতন করতে ইচ্ছা হলো। মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসল। সে পিছন থেকে মনের সব ভাদাইম্মা ঢংয়ের মাধুরী মিশিয়ে হঠাৎ ডেকে উঠল,
“বেবি?”
ইরাম হাঁটা থামালনা। বরং মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। সাইবানের ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি খেলে গেল। রমণীকে এক্ষুণি আবার লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখলে বেশ লাগবে তার। অথচ ইরাম মুচকি হেসে পাল্টা বলল,
“বলুন, বেবি।”
সাইবানের ঠোঁট থেকে হাসিটা মিলিয়ে গেল। তাতে ভর করল নিরেট বিস্ময়। বজ্রাহত হলে বুঝি মানুষকে এমনি দেখায়। ইরাম অবশ্য দেখতে পেলনা, কারণ সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দুহাত চেপে মনে মনে জয়ের হাসি হাসল সে। তার যেকোন কথা যে ছেলেটার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, সেটা সম্পর্কে সে মোটামুটি নিশ্চিত। পিছন থেকে জবাব আসছেনা। শুধু পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সাইবানের গাট্টাগোট্টা শরীরের ছায়াটাও চোখে পড়ছে সড়কে। ইরাম কোনো উত্তর না পেয়ে দ্বিতীয় দফায় হালকা গলা উঁচিয়ে বলল,
“বললেন না বেবি? কি বলছিলেন?”
টাং!
ধাতুর সঙ্গে শক্ত কিছু বাড়ি খেলে যেমন একটা ধাতব শব্দ হয়, তেমন শব্দেই ছেয়ে গেল চারপাশ। ইরাম কেঁপে উঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে গেল। সাইবান সোজা গিয়ে ল্যাম্প পোস্টের সঙ্গে মোক্ষম এক ধাক্কা খেয়েছে। এক্কেবারে মাথা ঠুকিয়ে ধপাস করে পিছনে হেলে আছাড় খেল বেচারা। হাত পা ছড়িয়ে ঠান্ডা ফুটপাথের উপরেই শুয়ে পড়ল। ইরাম শাড়ির কুঁচি চেপে হন্তদন্ত হয়ে দৌঁড়ে গেল। সাইবানের কপালের একপাশ টকটকে লাল। এর মাঝেই হালকা ফুলে উঠতে শুরু করেছে। জায়গাটা দেখেই ইরামের ভীষণ মায়া হলো অথচ সাইবান প্রতিক্রিয়াহীন। চোখজোড়া তার প্রসারিত। চেয়ে আছে খোলা আকাশের দিকে। যেন আকাশের কোনো পরী তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে তাই ব্যথা বেদনা আর গায়ে লাগেনা। ইরাম তার পাশেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ঘাড়ের নিচে হাত দিয়ে মাথাটা তুলে নিজের কোলে রাখল।
“আরে, দেখে শুনে চলতে পারো না? বেশি ব্যথা লেগেছে? ইশ! কীভাবে ফুলছে!”
সাইবান চোখ ঘুরিয়ে ইরামের মুখের দিকে তাকাল। এবারেও কোনো কথা বললনা। ইরাম অবশ্য তার জবাবের আশায় নেই। শাড়ির আঁচল গুটিয়ে একটা কাপড়ের বলের মতন তৈরি করে মুখে ঠেকিয়ে গরম ভাপ দিল। অতঃপর সেটা সাইবানের কপালের ফোলার উপর চেপে ধরল। সাইবান এবার ব্যথা টের পেল, হিসিয়ে উঠল। ইরাম ভ্রু কুঁচকে শাসাল,
“হাঁটার সময় চোখ কি আসমানে থাকে?”
“উহু, আপনার কোমরে।”
“আবার নির্লজ্জের মতন জবাবও দিচ্ছে। থাপড়ে সোজা করে দেব একদম!”
“নিজেকেও একটা থাপ্পড় দিন তবে।”
“কেন? আমি কি করেছি?”
“এমন সব কথা বলেন যে আমার দুনিয়া নড়ে যায়। তখন সামনের ল্যাম্প পোস্টকেও ইরাম কিবরিয়া মনে হয়।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইরাম। এই ছেলের সঙ্গে তর্কে জেতা অসম্ভব। তাই সেই চেষ্টা বাদ দিয়ে সাইবানকে টেনে তুলল সে। ভোররাতে বাষ্প গলে শিশির পড়েছে। ফুটপাথে হালকা পানি কাদা জমেছিল। সেই কাদায় বিশিষ্ট ডি জে মহাশয় আছড়ে পড়েছে বিধায় তার শার্ট, ঘাড়, পিঠ এখন কাদায় মাখামাখি। ইরাম কথায় বিশেষ সময় ব্যয় না করে স্বামীর বাহু টেনে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। এই ছেলের পরিকল্পনায় রুম থেকে বেরোনো উচিত হয়নি। শান্ত সময়কেও দুর্যোগ বানিয়ে ফেলার ভয়ংকর ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিল ছেলেটা।
মূলত বাড়ি ফিরে সাইবানকে সোজা বাথরুমে ঢোকানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা সফল হলোনা। ভেতরে ঢুকতেই পিছনে চলে এলো সাইবান, থামল পুকুরপাড়ে। ততক্ষণে ভোর অনেকটা হয়েছে। কমলার ক্ষীণ আলো চারিদিকে ছড়িয়ে গিয়েছে। সূর্যের মাথাটা হালকা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে দিগন্তে। সেই আলোর প্রতিফলন ভাসছে পুকুরের টলটলে পানিতে। চাষের মাছগুলো টুপটাপ লাফাচ্ছে এদিক সেদিক। সেসবের কোনো তোয়াক্কা না করেই সাইবান অভিজ্ঞ হাতে শার্ট খুলে পুকুরের সিঁড়িতে ফেলে দিল। ইরাম পিছন থেকে তার কর্দমাক্ত শক্তিশালী পিঠ দেখতে পেল।
“অ্যাই! পাগল হয়েছ? ভোরভোর পুকুরের ঠান্ডা পানিতে নামলে হয়েছে। জ্বর এসে বলবে আসসালামু আলাইকুম, ভালো আছেন? ভালো থেকে লাভ নেই, আমি আপনাকে খারাপ করতে এসেছি।”
সাইবান ততক্ষণে তরতর করে কয়েক সিঁড়ি নেমে গিয়েছে। পানি তার হাঁটু অবধি। পিছনে ঘুরে তাকাল সে।
“বরিশাইল্লা মানু মুই। ডোন্ট এভার আন্ডারেস্টিমেট দ্যা পাওয়ার অব আ বরিশাইল্লা!”
ইরাম তর্ক করার সুযোগটাও পেলনা। সাইবান পুকুরে ঝাঁপ দিল। তার বৃহৎ শরীরটা পানির নিচে আড়াল হয়ে গেল। মাছের বসবাস আছে বিধায় খুব একটা কাজে পুকুর ব্যবহৃত হয়না। গোসল তো নাই। তবে সাইবানের মতিগতি দুনিয়ায় একমাত্র সেই বোঝে। ইরাম কপাল ঘষল। ছেলেটার সঙ্গে সংসার বেঁধে তো ফেলেছে। কিন্তু এখন অস্থায়ীর বদলে স্থায়ীভাবে সারাটা জীবন এই টর্নেডোকে কীভাবে সামলাবে সেটা ভেবেই বুক কাঁপছে তার। মাথা ঝাঁকিয়ে শেষমেষ বাড়ির ভেতরে চলে গেল সে। রুম থেকে তোয়ালে আর সাইবানের শুকনো টি শার্ট, প্যান্ট নিয়ে এলো।
ইরাম ফিরতে ফিরতে সাইবান গোটা সাতেক ডুব দিয়ে উঠেছে। পুকুরের একদম শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পানি তার উদরসমান। রমণী ক্ষণিকের জন্য থমকাল। সদ্য উঠতে শুরু করা সূর্যের মায়াবী আলো সাইবানের উদাম শরীরে খেলা করছে গলিত স্বর্ণের মতন। প্রশস্ত রোমহীন বুক বেয়ে টপটপ করে গড়াচ্ছে পানির ফোঁটা, যেন মুক্তদানা। কালো চুলগুলো পিয়ার্সিং এর উপর লেপ্টে আছে। শক্তিশালী মাংসপেশীগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছে। এমনকি কপালে ফুলে ওঠা ঘোড়ার ডিমখানাও কেমন যেন মাদকীয় দেখাচ্ছে। ইরাম শক্ত একটি ঢোক গিলল। চোখ সরিয়ে নিল মুহূর্তেই। পাগল হয়ে গিয়েছে সে? ছিঃ! পরক্ষণেই আবার চোরা দৃষ্টিতে ঠিকই তাকাল। কি হয়েছে তাকালে? স্বামীই তো তার! ব্যক্তিগত সম্পত্তি!
অর্ধাঙ্গিনীর চোরা দৃষ্টি ঠিকই খেয়াল করল সাইবান। তাতে আরও ভাব নিয়ে দাঁড়াল। ঘাড় কাত করে ইচ্ছাকৃতভাবে জিম করা শরীর শো অফ করতে চাইল। তবে জমে গেল পুরাতন একটা স্মৃতি মনে হতেই। উষ্টা সে কিছুক্ষণ আগেও খেয়ে এসেছে। পুকুরের মাঝে উষ্টা খেলে প্রাণ নিয়ে ফেরার কোনো আশা নেই। বিধায় শো অফ বন্ধ করে অন্য ভং ধরল। কয়েক সিঁড়ি এগিয়ে হাত বাড়াল,
“তোয়ালে দিন।”
ইরামের সম্মোহন কাটল। মাথা নেড়ে জিভ কেটে দ্রুত সে বলল,
“উঠে আসো।”
“এখানে দিন।”
“আশ্চর্য্য। আর কতক্ষণ ঠান্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে থাকবে?”
“যতক্ষণ না আপনি এসে তোয়ালে দিচ্ছেন। উফ, কি ঠান্ডা!”
মিছিমিছি শরীর কাঁপিয়ে শীতের ভং ধরল সাইবান। ইরাম বুঝল, সবটাই নাটক। চোখ উল্টে সে মনে মনে অভিসম্পাত করে শেষে সিঁড়ি টপকে কাছে এলো। তবে পুরোপুরি নামলনা। তোয়ালেটা ছুঁড়ে দেয়ার ভঙ্গি করে বলল,
“ক্যাচ ধরো তবে।”
সাইবান এবার বেজায় চটল। এই মেয়ে একটা পাক্কা খেলোয়াড়! না, ময়দানে না নামলে একে ডোবানো যাবেনা। তাই তড়িঘড়ি করে বাকি কয়টা সিঁড়ি টপকে এলো সে চোখের পলকে, তোয়ালে ধরে মারল এক টান! তাতে তোয়ালে আর মালকিন দুজনই তার বুকে আছড়ে পড়ল। হুড়মুড় করে পড়ল একেবারে পুকুরের পানিতে। এই ভয়টাই ইরাম পাচ্ছিল। কে জানে কি আঁকড়ে ধরে চোখ বুঁজে সে চিৎকার ছুঁড়ল,
“আলাদিন! আমি সাঁতার জানিনা!”
পুকুরের পানিতে মুহূর্তেই ভিজে একাকার হলো ইরাম। মনে হলো সে পানির মাঝে নাকানিচুবানি খাচ্ছে। পরক্ষণেই শক্তিশালী বুকের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করল সে। খোলা বাতাসে টেনে তোলা হলো তাকে। থু করে মুখে ঢুকে যাওয়া পানি ফেলে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল ইরাম। দুহাতে আঁকড়ে ধরে রাখল জীবনের একমাত্র অবলম্বনকে। সাইবান অর্ধাঙ্গিনীকে চেপে একেবারে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে। হাঁপাতে থাকা ইরামের ঘাড়ে হাত রেখে তার কানে ঠোঁট মিশিয়ে সে ফিসফিস করে জানাল,
“আমি থাকতে আপনি ডুববেন না ইরাম, ভাসবেন, হাসবেন আর ভালোবাসবেন।”
ইরাম বিপরীতে কিছু বলার সুযোগ পেলনা। ঠোঁটের উপর তৎক্ষণাৎ আরেক জোড়া ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ পেল সে। সকল শব্দ বিলীন হলো। পুকুরের ঠান্ডা পানির সকল শীতলতা মুহূর্তেই বিদায় নিল। তপ্ত অনুভব ঘিরে ধরল চারিপাশ থেকে, শৃঙ্খলের মতন। ইরামের হাতের নখ গেঁথে গেল সাইবানের খোলা পিঠে। তাতে একটুও দমলনা অনুভূতির বিনিময়। বেশিক্ষণ অবাধ্যতা দেখানো গেলনা। আত্মসমর্পনে বাধ্য হলো ইরাম। পানিতে নয়, ডুব দিল অনুভূতির গভীরতায়। উদীয়মান সূর্য তাদের স্বর্ণের শৃঙ্খলের মতন বেঁধে ফেলল চারিদিক থেকে। যেন পৃথিবীর বুকে ছোট্ট এক টুকরো স্বর্গভূমি।
ইরামের ঠোঁট ছেড়ে তাকে শ্বাস নেয়ার সুযোগ দিয়ে সাইবান মুখ ডোবাল গলায়। সিক্ততা সময়টাকে করে তুলল মাতাল। যত জোরে বাতাস বইল, তত উন্মাদ হয়ে উঠল সাইবান। তার ঠোঁটজোড়া এসে থামল ইরামের নাকফুলের উপর। দারুণভাবে ছুঁয়ে গেল তা। কুসংস্কার হলেও মেয়েদের নাকফুল যেন একজন স্বামীর আলাদা রকম গর্বের বিষয়। সেই গর্ব সাইবানও আজ অনুভব করল।
“গ্রহণ করেছেন আমায়?”
ইরাম চোখ খুলে তাকাল। সাইবানের জ্বলজ্বলে দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টি মিলিত হলো তার। বুকের ভেতর দামামা বাজল। মুহূর্তেই অজানা ভয়েরা ঘিরে ধরল আবার। নতুন শুরু? যদি পরিণতি একই হয়? যদি আবারও ঘটে বিচ্ছেদ, মনোমালিন্য? তবে কি ইরাম সইতে পারবে? পারবে না। কিন্তু এই ছেলেটা, নিরপরাধ নিষ্পাপ ছেলেটা, সেই শিশুকাল থেকে তার জন্য অপেক্ষার চাদর বিছিয়ে বসেছে, আবেদন নিবেদনে তাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। তার সন্তান? আজকাল ইরামও মাঝে মাঝে ভুলে বসে ইযান অরণ্যর সন্তান! নিজের সন্তানের মায়াভরা মুখটা দেখলে হুট করে কোথা থেকে সাইবানের চেহারাটাই মানসপটে ভর করে। এই হাসিখুশি পুরুষটি, যার মজা – ঠাট্টায় জগৎ নাচে, সেই নিরালায় নিভৃতে একলা কাঁদে। তার কান্না কেউ দেখে না। অজান্তেই সাইবানের কাঁধে তার দুহাত আরও শক্তভাবে চেপে বসল। আঙুলের দাগ পড়ল ফর্সা ভেজা ত্বকে। মনে মনে ভাবল ইরাম, আজ থেকে তার দায়িত্ব বেড়ে গেল। একটা বাচ্চাকে নয়, এখন থেকে দুটো বাচ্চাকে মানুষ করতে হবে তার, আগলে রাখতে হবে তার ব্যক্তিগত সকল কলুষতা থেকে।
একটি নিঃশ্বাস ফেলল ইরাম। মুখে জবাব দিলনা। দুহাতে আলতোভাবে সাইবানের মুখটা ধরে নিজের কাছে টেনে নামিয়ে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। সময় নিয়ে চুমু খেল ঠিক যেখানটায় আঘাত লেগে ফুলেছে, সেখানটায়। ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমার আলাদিন, শুধু আমার।”
এটুকুই যথেষ্ট ছিল সাইবানের জন্য। ভেজা মুখের কারণে তার বাম চোখ বেয়ে গড়ানো একফোঁটা অশ্রুর অস্তিত্ব বোঝা গেলনা। মাথা কাত করে অর্ধাঙ্গিনীর ঠোঁটজোড়া পুনরায় দখলে নিল সে। পানির অন্তরালে বিনা দ্বিধায় তার হাত ছুঁয়ে গেল অর্ধাঙ্গিনীর শরীরের দাগে দাগে, যেন ধুয়েমুছে সাফ করতে চাইল অতীতের সকল দগদগে ঘা। সূর্যের আভা ঘিরে রাখল তাদের, নতুন সূচনার বলয় হয়ে।
সুগন্ধা ইযানকে নিয়ে বাড়ির খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা তার। কিন্তু ইযান মাত্রই ফুঁপিয়ে উঠেছে। খুব বেশি কাঁদছে না যার দরুণ সরাসরি সাইবানের বেডরুমে যায়নি সে। গেলেও ওই বান্দা যে তাকে আস্ত ছেড়ে দেবে না ভালোই জানা আছে তার। ইযানকে নিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করলেই পুনরায় ঘুমিয়ে পড়বে। তাই সে এদিক সেদিক ঘুরছে। তবে বারান্দায় না এলেই ভালো হতো সে বুঝল যখন আধঘুমে ভারী হয়ে থাকা চোখ গিয়ে পড়ল বাড়ির পিছনদিকে। অদূর থেকে দৃশ্যটা ঠিক স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না কারণ বাড়ির বারান্দাটা আবার সামনের দিকে। তবে যতটুকু দেখলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় কাহিনী কি, ততটুকু অবশ্যই দেখা যাচ্ছে। ঘুম এক ঝটকায় গায়েব হলো সুগন্ধার। চোয়াল ঝুলে পড়ল কয়েক ইঞ্চি, চাইলে মশা, মাছি থেকে শুরু করে একটা ব্যাঙও লাফিয়ে ঢুকে যেতে পারে ভেতরে।
পুকুরের দৃশ্যটা ব্যক্তিগত। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে ইরাম এবং সাইবান। সূর্যের হালকা আলোয় অস্পষ্টভাবে নজরে আসছে অবয়ব দুটো। সুগন্ধার ঘাড়ের লোম অব্দি দাঁড়িয়ে গেল। তার উত্তেজনা অনুভব করেই বুঝি ঘুমে ঢুলুঢুলু ইযান মাথা কাত করে তাকাতে গেল। কিন্ত সুগন্ধা ক্ষীপ্রতার সঙ্গে নিজের একটি হাত ইযানের চোখে চেপে ধরল।
“মা বাপের বিয়া খাইসো, তবে এইডা খাওয়ার বয়স হয়নাই। ঘুমাও বাপ, ঘুমাও।”
ইযানকে ঠেলে নিজের কাঁধে জোর করে চেপে রেখে নিজে ঠিকই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে লাগল সুগন্ধা। এমন দৃশ্য মিস দেবে? মাথার ব্যামো তার? একটা লম্বা সিটি বাজাবে নাকি? সাইবানের চেহারাটা একেবারে দেখার মতন হবে! ঠিকই আছে, সুগন্ধার কি দোষ? ফষ্টিনষ্টি করতে পুকুরে যাওয়া লাগবে কেন? সত্যি সত্যিই সে সিটি বাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু এর আগেই পুরুষালী একটি হাত সুগন্ধার চোখ ঢেকে নিল। জমে গেল মেয়েটা। চেনা একটি সুঘ্রাণ নাকে ঠেকল, চন্দন আর লেবুর মতন। তার কানে ফিসফিসে একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“মানুষের ব্যক্তিগত সময়ে উঁকিঝুঁকি দেয়াটা অভদ্রতা, মেয়ে।”
সুগন্ধার মুখ রাঙা হয়ে উঠল। কর্কশ গলায় সে বলল,
“তবে আপনি দেখেন ক্যান? আপনেই তো এক নম্বরের অভদ্র অনুরাগ দা!”
অনুরাগের মৃদু হাসি ভেসে এলো। খানিকটা বিব্রত হয়ে সে জানাল,
“আমি চোখ বুঁজে আছি।”
“কই দেহি! প্রমাণ ছাড়া কিচ্ছু এই সুগন্ধা বিশ্বাস করে না।”
“হুশ। বড্ড বেশি কথা বলো মেয়ে!”
অপর হাতটা সুগন্ধার ঠোঁটের উপর চেপে জোর করে তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল অনুরাগ। ইযান সাথে থাকায় বিশেষ প্রতিবাদ করলনা সুগন্ধা। তাছাড়া মুখের উপর যে হাতটা চেপে আছে সেই হাতের স্পর্শ তাকে অন্যরকম এক অনুভূতিতে ফেলে দিয়েছে। কিছুক্ষণ আগেও রীতিমত সিনেমা ফাঁস করে দেয়ার ধান্দা মিলিয়ে গিয়েছে, আর কোনো ইচ্ছা নেই। সবটুকু ইচ্ছা এখন শুধু পুরুষটিকে দেখার। তাই চোখের উপরের হাতটা ঠেলে সরাল সে, নয়ন তুলে তাকাল। সত্যিই চোখ বুঁজে আছে অনুরাগ, চোখের পাপড়িগুলো ঘন এবং ভীষণ লম্বা। সুগন্ধা তাকাতেই মিটমিট করে চোখ মেলে তাকাল অনুরাগ। মৃদু হেসে বলল,
“তুমি তো ভয়ানক দুষ্টু!”
“ক্যান? আপনার কি ভদ্র মাইয়া পছন্দ?”
প্রশ্নটায় আটকে গেল অনুরাগ। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সুগন্ধার মুখপানে। এর বেশি কিছু করাই অবশ্য সম্ভব হলোনা। এর আগেই বিকট একটা শব্দে কেঁপে উঠল বাড়িটা। অনুরাগ তৎক্ষণাৎ উল্টো ঘুরে দৌঁড় দিল। সুগন্ধাও ইযানকে বুকে চেপে ছুটল। দুজনই পৌঁছাল বসার ঘরে। অতঃপর জমে গেল সম্পূর্ণ।
বাড়ির সদর দরজা হাট করে খোলা। আর চৌকাঠের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে তিতলি। পরনের আঁটসাঁট পোশাকটা গায়ে লেপ্টে আছে। হাতে একটা কালচে বোতল, সেটার মুখ বেয়ে স্বর্ণালী তরল মেঝেতে গড়াচ্ছে।
“তিতলি!”
আমার আলাদিন পর্ব ৪৯
না পারতে অনুরাগ উদ্বিগ্ন হয়ে চেঁচিয়ে উঠল। তিতলি মাথাটা কাত করে তাকাল, চুল এলোমেলো হয়ে মুখে লেপ্টে আছে তার। ফিক করে হাসল সে, টানা টানা মাতাল কন্ঠে বলল,
“আমার ডাউনফল মোবারক দোস্ত…মোবারক!”
